সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অপেক্ষায়

জাপানের ফুটবল খেলা আমাকে বেশ টানে। নিখুঁত খেলা। মাপা মাপা শট। এক ইঞ্চি হেরফের নেই, নির্ধারিত স্থানেই আঘাত হানে বল। দলটির খেলোয়াররা যেমন পারদর্শী তেমনি তার সাপোর্টাররাও অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, দলবেধে উচ্ছাস করে, দলবেধে বিলাপ করে। এত কিছুর পরও দলটি গোলপোস্টের কাছে গিয়ে হেরে যায়, প্রতিপক্ষের জালে কাঙ্খিত গোলটি ঢুকাতে ব্যর্থ হয়। কঠোর শৃংখলাবন্ধ জাপানী দলে ম্যারাডোনার মতো নেই কোন স্ট্রাইকার, তাই তীরে এসে তরী ডোবে বারবার।

বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলনগুলোরও একই অবস্থা। কঠোর নিয়মশৃংখলা মেনে দলগুলো হাটি হাটি পা পা করে সামনে এগিয়ে চলছে। আন্দোলনে নেতৃত্বের অভাব নেই, বরং দলে কর্মীর চেয়ে নেতাই বেশী। তারপরও দলগুলো কাংখিত মানের নেতৃত্বের অভাবে বারবার হোটচ খায়, কিছুতেই ইসলামী আন্দোলনের তরী সাফল্যের সোনালী বন্দরে ভেরানো যায় না, বিশ্বব্যাপী কাংখিত নেতৃত্বের সংকট কিছুতেই কাটে না।

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট কখনোই হয় নি। ইসলামী আন্দোলন এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যাতে সাধারণ মানের একজন নেতার পক্ষেও দলটির নেতৃত্ব দেয়া কঠিন নয়, কঠিন নয় এ কারনে যে, দলটির নেতৃত্ব একক সিদ্ধান্ত সাধারণত নেন না, তাই ভুলত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। কিন্তু তারপরও দলটিতে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ), সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মতো তেজস্বী নেতৃত্বের জন্য হাহাকার। না, দলের নেতৃত্বে ইচ্ছেকৃত কোন ত্রুটি নেই, নেই তাদের আন্তরিকতায় কোন ঘাটতি, বরং নেতৃবৃন্দ তাদের যোগ্যতার ষোলআনাই ঢেলে দেন ইসলামী আন্দোলনে। তবুও দলগুলো কাংখিত সাফল্যের মুখ দেখে না কাংখিত নেতৃত্বের অভাবে।

নেতৃত্ব আল্লাহ প্রদত্ত গুণ, ঘষেমেজে নেতৃত্বকে শানীত করা যায়, বাড়ানো যায় না। দেশের আনাচে কানাচে নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন অনেক ছেলে আছে, হয়তো তারা তাদের যোগ্যতা মেলে ধরার কোন সুযোগ পায় নি, হয়তো তাদের অনেকেই পুরো শক্তি নিয়োগ করেছে ইসলাম বিরোধী আন্দোলনে। সময়, সুযোগ নেতৃত্ব বাছাইয়ের বড় হাতিয়ার। শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান এরা সময়ের ফসল। সঠিক সময়ে এরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, হয়েছেন চীর স্মরণীয়। কিন্তু সময় সুযোগ তো বলে কয়ে আসে না, তাই সময়ই নেতৃত্ব তৈরী করবে এমন ধারনায় অপেক্ষায় থাকারও কোন সুযোগ নেই। বরং এখনই সময় আগামীর নেতৃত্ব বাছাইয়ের।

না, আমি এ কথা বলছি না যে বর্তমান নেতৃত্বে পরিবর্তন প্রয়োজন, বরং আমি আগামীর নেতৃত্বের কথা বলছি। আমি বলছি আরো পঁচিশ বছর পরের আন্দোলনের কথা। এ কথা কিছুতেই ভাবতে পারি না যে চলমান ধারায় দশ বছরেই ইসলামী আন্দোলন সাফল্য পাবে, বরং আমি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা ভাবি। পঁচিশ বছর পরে যে ইসলামী আন্দোলন এ দেশে নেতৃত্ব দেবে, সে আন্দোলনের জন্য কাংখিত নেতৃত্ব এখনই তৈরী করার সময়। ক্রিকেটে যেমন দেশব্যাপী চলে পেসার হান্ট, চলে খুঁদে গান রাজ, ক্লোজআপ ওয়ানের মতো প্রতিভা অন্বেষণ, ছাই উড়িয়ে অমূল্য রতনের মতো চলে নির্মানের তারকা খোঁজার কাজ, ইসলামী আন্দোলনেও তেমনি ভবিষ্যত নেতৃত্ব খুঁজে খুঁজে জড়ো করার সময় এখন। এদের মাঝে যে টুকু নেতৃত্বের গুণ পাওয়া যায় তাকে এখনই ঘষে মেজে পঁচিশ বছর পরের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের উপযোগী করা প্রয়োজন।

ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব তৈরীর জন্য আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান তৈরীর পরিকল্পনা দলের নেতৃত্বের আছে কি না আমার জানা নেই, তবে অবশ্যই একটি ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট চালু করা উচিত। কারো জন্য দীর্ঘ মেয়াদী, কারো জন্য ছ’মাসের স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অবশ্যই করা উচিত। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কখনোই সঠিক নেতৃত্ব আশা করা যায় না। নেতৃত্বের পরীক্ষার জন্য আমাদের বাস্তব ময়দান আছে, সেখানে যাচাই বাছাই চলে, কিন্তু নেতৃত্বের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ না পেলে সঠিক নেতৃত্বের গুণাবলী আশা করা যায় না। যে প্রকৌশলী গাড়ীর ইঞ্জিনের সকল খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন, তিনি যদি গাড়ি চালানোর কঠোর প্রশিক্ষণ নেন এবং শারীরিক শক্তি যদি থাকে অটুট তবে নিশ্চয়ই তিনি হেল্পারী করে করে গাড়ী চালাতে শেখা ড্রাইভারের চেয়ে ভালোভাবে, সঠিকভাবে গাড়ি চালাতে পারবেন। চলতি পথে যদি গাড়ী বিকল হয়ে পরে তবে তাকে সারিয়ে তুলে গন্তব্যে পৌঁছতে তার কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর হেল্পারকে গাড়ি ঠেলে ঠেলে নিতে হবে কাছের সার্ভিস স্টেশনে, তার পক্ষে গাড়ীর রোগ নির্নয় তো প্রায় অসম্ভব।

আমরা যদি নতুন নেতৃত্বকে শুদ্ধভাবে বাংলায় কথা বলা শেখাই, শেখাই যদি বক্তৃতা বিবৃতি দেয়ার কৌশল, একাধিক আন্তর্জাতিক মানের ভাষার প্রশিক্ষণ দেই, প্রচলিত টেকনোলজি সম্পর্কে তাদের যদি থাকে সঠিক জ্ঞান, থাকে যদি অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান, মোট কথা দরকারী সকল জ্ঞান সম্পর্কেই এদেরকে মৌলিক ধারণাগুলো যদি দেয়া যায় তবে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে আগামীর নেতৃত্ব নিজেরাই নিজেদের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানে সফল হবে। নেতাকে যদি প্রতিটি কাজের জন্যই অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়, তবে সে নেতার নেতৃত্বে আন্দোলন হয়ে পরে স্থবির। তাই সব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণাসম্পন্ন প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব তৈরী করা এখনই প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ একাডেমীর।

প্রশিক্ষণ একাডেমীতে কি কি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, কাকে কাকে প্রশিক্ষিত করা হবে, কত মাস/বছর প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, কারা কারা প্রশিক্ষণ দেবেন, প্রশিক্ষণার্থী বাছাই পদ্ধতি কেমন হবে ইত্যাদি যাচাই বাছাই করা সমস্যা নয়, ইসলামী আন্দোলনে এমন অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি আছেন যাদের একটি কমিটি গঠন করে দিলেই ২ সপ্তাহে তারা এটি করতে পারেন। প্রয়োজন শুধু নেতৃত্ব তৈরীর জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমী তৈরীর প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি। আশাকরি বর্তমান নেতৃত্ব পরবর্তী নেতৃত্ব তৈরীর এমন একটি সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চালু করে ইসলামী আন্দোলনের কাংখিত নেতৃত্ব ঘাটতি পূরণে অবিস্মরণীয় অবদান রাখবেন।

2 Replies to “সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অপেক্ষায়”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.