মতানৈক্যের মাঝে ঐক্য

মুরাদ স্যার। কলেজের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর। পেশার সাথে মানানসই অকুতোভয় শরীর, গল্পের মাসুদ রানা যেন।

সবার সাথেই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। কলেজের বিভিন্ন কাজে তার সরব উপস্থিতি, ক্রীড়া অনুষ্ঠান হলে তো আর কথাই নেই, তিনিই তখন কলেজের প্রিন্সপ্যাল বনে যান যেন।

ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর বলে কথা, ধরে ধরে অংকের সূত্র তো আর মুখস্ত বলতে বলে না, তাই সহজেই তার সাথে মিশে যাই আমরা, আড্ডা দেই অকৃত্রিম বন্ধুর মতো।

তবে দোষ তার একটাই, সারাক্ষণই প্রিন্সিপ্যাল স্যারের উপর ক্ষেপে থাকেন, যদিও মাসুদ রানার মতো বুক উচিয়ে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের সামনে দাড়ানোর হিম্মত হয় না তার। প্রিন্সিপ্যাল সারকে দেখলেই “বাঘের বাচ্চা বিলাই” হয়ে যান, এই যা তার আফসোস।

প্রিন্সিপ্যাল স্যারের বিরুদ্ধে তার এই যে এতো অভিযোগ, অভিমান, তা ছাত্র-শিক্ষক কারোই অজানা নয়। অজপাড়া গায়ের কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ছাত্রদের সাথে সাথে এ কথা রটে যায় শহরের অলিগলি, চোরাগলি সর্বত্র।

এমনই এক চোরাগলির মুখে স্যারের সাথে জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম সেদিন। স্কুল-কলেজ-পাঠ্যবই ছাড়িয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি সব বিষয়েই আড্ডা চলে, চলে হাসাহাসি, মাঝে পিঠের উপর বাঘের থাবার সাথে চলে গুরুগম্ভীর কন্ঠে স্যারের দু’একটা ধমক।

স্যারের সমবয়েসী কিংবা কিছুটা বড় হবেন ভদ্রলোক, একটু দূরে ডেকে নিয়ে গেলেন স্যারকে, আড়ালে কিছু জরুরী কথা শোনাতে। নেতৃত্বহীন আমরা তবু দমে যাওযার পাত্র নই, হাসাহাসির মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলে, আবার থেমেও যায় হঠাৎ করেই। থেমে যায় বজ্রপাতের তীব্র শব্দে, হাতের পাঁচ আংগুল বাম গালে এঁকে দিলে অমন বজ্রনিনাদের সৃষ্টি হয়, না দেখলে তা বিশ্বেস করাই কঠিন।

শব্দের উৎসমূলে ছুটে যাই সদলবলে, দেখি মাথা নীচু করে দাড়িয়ে আছেন ভদ্রলোক, হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে আছেন বাম গালটি সজোরে চেপে রেখে। মুখের ভেতর লবনাক্ত লালার রং লাল হয়েছে কি না পরীক্ষা করে নিলেন ফাকেঁ, পায়ের কাছে পিচিৎ করে একদলা থুথু ফেলে।

বুনো মোষের মত ফুঁসে আছেন মুরাদ স্যার, হড়বড় করে বলেই চলেছেন, “ব্যাটার এতবড় স্পর্ধা, আমার প্রিন্সিপ্যালের বিরুদ্ধে আমার কাছেই কুৎটা রটাতে এসেছে, কতবড় বুকের পাটা”।

স্যারের কথা শুনে আমাদের আক্কেল গুড়ুম। এতদিন জেনে এসেছি, তিনি প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে একদমই সহ্য করতে পারেন না, কিন্তু একই পরিবারের লোকের বিরুদ্ধে যখন বাইরের কেউ আজেবাজে কথা বলে ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়, বন্ধুত্বের মাঝে ফাটল ধরিয়ে শত্রু যখন মজা লুটতে চায় তখন সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে, সকল বিরোধ ভুলে গিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হয়, এক থাপ্পরে হাতে কলমে তিনি শিখিয়ে দিলেন আমাদের।

United we stand, divided we fall, কথাটি এতদিন বইয়ে পড়েছি, পড়েছি divide and rule ফর্মূলাও। কিন্তু কি করে মতানৈক্যের মাঝেও ঐক্য গড়া যায় তা যেভাবে সেদিন শিখেছিলাম, আমৃত্যু তা আর ভুলে যাওয়ার নয়।

তাই আজ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যের গান গাই, ঐক্যের জয় হোক।

6 Replies to “মতানৈক্যের মাঝে ঐক্য”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.