কুরবানী একমাত্র আল্লাহর জন্য

মা বিছুদিন ধরে বেশ অসুস্থ, মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়েছেন। ইদানিং এলেমেলো কথা বলছেন, অতীতের অম্ল-মধুর স্মৃতিচারণ করছেন।
আজ মা বললেন, “ভেবে দেখ তো, আজকের এই ঈদের দিনে এমন একটি পরিবারও (মুসলিম) কি পাওয়া যাবে যারা কোরবানীর উপকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? এমন কোন মুসলিম কি আছে যে আজ একবেলা গোশতের স্বাদ পাবে না?” অন্য দেশের কথা জানি না, হয়তো দেশের অন্য এলাকার কথাও আমার অজানা তবে আমাদের এলাকার ধনীদের তুলনায় আজ কোন কোন গরীবের উনুনেই বেশী গোশতের রান্না হবে। একটি দিনের জন্য হলেও আজ সব গরীব-ধনীর মাঝে ব্যবধানটা কত কমে যায়, একই গরুর গোশত সবার পাতে, শুধু পাত্রটি আলাদা, কেউ মাটির শানকিতে, আর কেউ লাখ টাকার ডিনার সেটে।
আজ পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত দিনটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর রাহে সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করার মাধ্যমে আল্লাহ প্রেমের যে নজীর রেখেছিলেন তা পবিত্র ঈদ-উল-আযহার মাধ্যমে সারাবিশ্বের শতকোটি মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।
ইসলাম ধর্ম মানবতার ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম। মানবতার কল্যাণকে ঘিরেই ইসলামের যত রেসম রেওয়াজ, নিয়ম কানুন। ইসলামের শিক্ষা হলো, মুমিনের নামাজ, কুরবানী, জীবন-মরণ, জীবনের সব কিছু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিচালিত হবে। কাউকে ভালোবাসা কিংবা কাউকে ঘৃণা করা, কাউকে কিছু দান করা বা দান করা থেকে বিরত থাকা, সব কিছুই যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হবে তখন মানুষের দ্বারা কেবল কল্যাণই সাধিত হতে পারে, আর মানব কল্যাণের চেয়ে উৎকৃষ্ট ধর্ম আর কি হতে পারে?
ইসলামের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলাম সব কিছুতে মধ্যপন্থা পছন্দ করে। চরমপন্থা কিংবা উদারতা, নমনীয়তার নামে অন্যায়ের প্রশ্রয় কোনটাই ইসলাম পছন্দ করে না। তাইতো দেখি ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট। অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সমরনীতি, সকল নীতিতেই ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের কথা বলে।
আর এ কথা কে না জানে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অধ্যায় হলো অর্থনীতি, কিংবা বলা যায়  জীবনের জন্য অর্থই সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ। অর্থনৈতিক জুলুম, দারিদ্র্যের অভিষাপমুক্ত সহজ স্বাভাবিক জীবন যাপনের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর্যাপ্ত অর্থের নিশ্চয়তা দিতে বিভিন্ন বিধান দিয়েছে ইসলাম। এরই একটি যাকাত। অর্থ যাতে শুধু ধনীদের মাঝে আবর্তিত না হয় বরং মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণের মতো পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদ থাকে সবার হাতে, তা নিশ্চিত করতে বিত্তশালীদের অর্থের উপর গরীবের সুনির্দিষ্ট অধিকার ইসলাম নিশ্চিত করেছে। আর এ আর্থিক নিরাপত্তা সমাজের ধনী-গরীবের মাঝে ব্যবধান কমিয়ে একটি ভারাসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
কোরবানীর এ শিক্ষাটি যদি আমাদের চিন্তার সাগরে এতটুকু নাড়াও দিতে পারে তবে সমাজে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে কেন? কেন এখনো ক্ষুধার তাড়নায় অসহায় মানুষগুলো ছুটে যায় দূর্গন্ধময় ডাস্টবীনে। প্রতিদিন দেশে মসজিদের জৌলুস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়, বাড়ে মসজিদে সংখ্যা, বাড়ে মুসল্লীর দল। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে অধিকার বঞ্চিত মানুষের ঢল, বাড়ে জ্যামিতিক হারে। হাসপাতালে বাড়ে চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীর ভীড়, বাড়ে ছাবির ত্যানার মতো শাড়ী পড়া বাসন্তীদের দল।
তাহলে আমাদের এ কোরবানী কাদের জন্য, ত্যাগের এ মহান শিক্ষা কি তবে শুধু মাত্র একটি দিনের জন্য? শুধুমাত্র গোশত বিলালেই কি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বছরের সাড়ে তিনশ দিন ওরা বাড়ী বাড়ী খুদকুড়ো ভিক্ষে করে খাবে আর একটি দিন ওদের হাতে একটুকরো গোশতো তুলে দিলেই কি ঈমানের দাবী পূরণ হতে পারে?
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক মুসলমানের অন্তর, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগে মানবেতর জীবন উঠে আসুক মানুষের কাতারে, তবেই তো গর্ব করে বলা যায়, আমি ঈমানদার, আমি মুসলমান।

5 Replies to “কুরবানী একমাত্র আল্লাহর জন্য”

  1. লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো। স্বপ্ন দেখানো একটি লেখা।

    সারা বছর যদি আমরা ঈদের এই শিক্ষাকে মনে রাখতে পারতাম তাহলে আসলেই আমাদের সামাজিক জীবনে শান্তি ফিরে আসত।

    [উত্তর দিন]

  2. ধন্যবাদ আরাফাত ভাই। সবকিছুর আনুষ্ঠানিকতাই টিকে আছে, কিন্তু এর শিক্ষাগুলো আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।
    ধন্যবাদ হেলাল ভাই। সব সময়ই লিখে যেতে চাই, তবুও মাঝে মাঝে অনাকাঙ্খিত ব্যস্ততা আমাকে কিছুতেই সচল হতে দেয় না। দোয়া করবেন।
    ধন্যবাদ পাশা ভাই।
    ধন্যবাদ ভাবী। আমার সাইট প্রতিদিন ভিজিট করেন জেনে খুব খুব খুব অনুপ্রাণিত হলাম। লেখা যাতে সুন্দর হয় সেদিকে খেয়াল রাখব ইনশাআল্লাহ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.