আর কত নীচে নামবে বন্ধু?

খুব ছোট সময়ে বেড়াল পোষার শখ ছিল। বেড়ালকে ঘিরে প্রতিবেশী বন্ধুর সাথে মারামারি পর্যন্ত হয়ে গেল একবার। আর ওর অকাল মৃত্যু কতটুকু যে আচর কেটেছিল হৃদয়ে তা শুধুমাত্র শিশুমনই উপলবদ্ধি করতে পারে।

 একটা প্রাণীর জন্য আমাদের মায়ার শেষ নেই। না, খুব যে কোন উপকারের কথা ভেবে কুকুর-বেড়ালকে আদর করি তা নয় বরং কাছে থাকতে থাকতে, আদর করতে করতে ভালো বাসতে শুরু করি ওদের।

 অথচ মানুষ হয়েও আমরা কিন্তু সাধারণ মানুষদের জন্য দরদ অনুভব করি না। আমার এক কলিগকে সোমালিয়ার দূর্ভিক্ষপীড়িত দরিদ্র মানুষের কথা বলেছিলাম। তিনি ভ্রুকুটি করে বলেছিলেন, সভ্যতার উন্নতিতে ওদের কি কানাকড়িও অবদান আছে? তাহলে ওরা মরল কি বাঁচল তাতে আমাদের কি যায় আসে? ওরা জন্মেছেই কুকুরের মতো মরার জন্য।

 কথাটি তিনি পুরো সঠিক বলেন নি, কারন একটা কুকুরকে মরতে দেখলেও আমাদের চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে, বুক ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে দীর্ঘনিঃশ্বাস, আহা! অবলা প্রাণী, না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে। দরিদ্র মানুষগুলো মরণেও কুকুর বেড়ালের মতোও সহানুভূতি পায় না, অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে, সভ্য সমাজের বিরক্তির কারণ হয়ে একসময় ওরা দূনিয়ার পাঠ শেষ করে।

 ওরা এতটাই নীচ যে ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করা, রান্না-বান্না, বাসনকোসন-কাপড়চোপড় ধুয়ে পরিস্কার করা এমন অচ্ছুৎ কাজই ওদের সাজে। তাই যারা সভ্য সমাজের বাসিন্দা ওদের দিয়ে যাবতীয় নোংরা কাজ গুলো করিয়ে নেই, আর কাজগুলো এত নীচুশ্রেণীর যে এ জন্য ওদের দু’বেলা পেট পুরে খাবার দেয়াও অনুচিত, বরং কাজের অবহেলার জন্য খুন্তি দিয়ে দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান স্থানে ছেঁকা দিয়ে তবেই ওদের ছাড়া উচিত।

 কিন্তু একবারও ভাবি না ওরা যদি এসব অচ্ছুৎ কাজ থেকে গুটিয়ে নেয় হাত তবে এগুলোতো আমাদেরই করতে হবে, তখন আমাদের গা দিয়েও ঘামের দূর্গন্ধ ছড়াবে, ময়লা-আবর্জনার গন্ধে মাছি ভনভন করবে আমাদের চারপাশে।

 হয়তো আবার অনেকেই ভাবে এসব। দারিদ্র্য না থাকলে থাকবে না দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য সভা সেমিনার, থাকবে না শেরাটন সোনারগাঁয়ে বাহারী নৈশভোজ, থাকবেনা বিশাল অংকের উন্নয়ন বাজেট। তাই তো দারিদ্র্যের চাষ হয় সুন্দর সুন্দর নামের আড়ালে। মাইক্রোকেডিট নামের সুগার কোটেট বিষ ছড়িয়ে দেয়া হয় তাই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আর তাই দরিদ্র হয় আরো দরিদ্র, দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠানোর নাম করে দেশটাকেই দারিদ্র্য যাদুঘর বানানোর জন্য কাবুলিয়ালাদের চলে রমরমা ব্যবসা।

 একটি বারও মনে হয় না ওরা মানুষ, একটা কুকুরের জন্য যে মায়া হয় আমাদের তার চেয়ে হাজারগুণ বেশী স্নেহ পাওয়ার অধিকারী এইসব দরিদ্র মানুষ। দারিদ্য দূরীকরণে কিছুই না হয় না-ই করলাম কিন্তু যে খালা, যে মামা, যে চাচা-ফুপুরা আমাদের কোলে পিঠে করে বড় করেছেন তাদের কেউ যখন দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত হয়ে মরণকে বরণ করে নেয় তখনও কি আমাদের কিছু করার থাকে না? একটি কুকুরের সাংস্পর্শে থেকে থেকে যদি তার কষ্টে মন কাঁদে,পোষা কুকুরের নাওয়া খাওয়ার আগে যখন আমরা লাঞ্চ করার ফুসরত পাই না তখন দুধের অভাবে যদি কোন নিকট আত্মীয় শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তখনও কি আমাদের মানবতাবোধ জাগ্রত হতে পারে না? যদি পশুর সাথে থেকে থেকে আমাদের মানবিকতা লুপ্ত হয়ে থাকে, যদি আমাদের মন হয়ে থাকে কুকুরের বেড়ালের মনের মতোই তবে কুকুরও তো তার স্বজাতির কষ্টে কষ্ট পায়, দুঃখে চোঁখের জল ফেলে।

 তাহলে মনুষত্বকে বিসর্জন দিয়ে যারা পশু হয়ে গেছ তাদের প্রতি একটাই অনুরোধ, দয়া করে পশুরও অধম হয়ো না, অন্তত পশুর মতো আচরণ করতে শেখ, স্বজাতির দুঃখে দু’ফোটা চোখের জল ফেলতে শেখ।

5 Replies to “আর কত নীচে নামবে বন্ধু?”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.