১১/১১/১১ @ ১১:১১

হঠাৎ করেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম। লেখাপড়া শেষ হয়নি, সবেমাত্র অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পরীক্ষা শেষ করেছি। নিজের টিউশন ফি জোগার করতেই জান কোরবান, এক বেলা খাই তো দু’বেলা উপোস থাকি এই যখন অবস্থা, তখন বিয়ের চিন্তাটা স্রেফ পাগলামী ছাড়া আর কিছু হতে পারে কি? তবুও ভেবে দেখলাম, বিয়ে করার মতো সবচেয়ে সুন্দর সময়টা কিছুতেই অবহেলায় দূরে সরিয়ে দেয়া যায় না। সবাই শুভ কাজের জন্য শুভ সময় খোঁজে, যদিও শুভ দিন বলতে আদৌ কিছু থাকার কথা নয়। দিন গুলো শুভ হয় শুভ কোন কাজের জন্য।  শুভ কাজের পথ প্রদর্শক মহামানবদের পরিভ্রমনে সময় হয় পরিশুদ্ধ।

সময়টা ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর। কয়েকটা দিন পরেই একটি সহস্রাব্দ মহাকালে হারিয়ে যাবে, বিংশ শতাব্দী শেষ হয়ে শুরু হবে একবিংশ শতাব্দী। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বজুড়ে টানটান উত্তেজনা, উত্তেজনা আমার নিজের শিরায় শিরায়। আমার চ্যালেঞ্জ একান্তই আমার, নিতান্ত ব্যক্তিগত। ঠিক করলাম, বিয়ে সেরে ফেলব এ ডিসেম্বরেই, দুই সহস্রাব্দের মহামিলনক্ষণে। ৩১ ডিসেম্বর রাত কাটাবো সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। মাঝ রাতে বিয়ে। বিয়ে পড়ানো শুরু হবে সহস্রাব্দের শেষ সময়ে, ইজাব কবুল শেষ হবে পরবর্তী সহস্রাব্দের প্রথম মিনিটে। হাজার বছর ধরে চলা এ বিয়ের অনুষ্ঠানে সময়ের মহাসমুদ্রে জানি আদৌ কোন ঢেউ তুলবে না, তবে আমার জীবনে যে ভয়াবহ সুনামী বয়ে যাবে তাতে আর সন্দেহ কি?

সুন্দরী শ্যালিকা কিছুতেই বিয়ের পিড়িতে বসতে নারাজ। ভালো ভালো প্রস্তাব আসে, প্রবাসী প্রকৌশলী, ডাক্তার, ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কোন কিছুতেই তার মন গলে না। মনের মাঝে কোন প্রেমিক বাসা বেধে আছে এমনটিও নয়, অন্তত তার কোন ছেলে বন্ধু আছে এমন খবর আমাদের কানে আজো পৌঁছেনি। বিয়ের জন্য যতই যন্তরমন্তর পড়ি না কেন, তার এক কথা কিছুতেই সে বিয়ে করবে না। অবশেষে তাকে সংখ্যার ফাঁদে আটকানোর চেষ্টা চালালাম। সামনেই একন একটি দিন আসছে যে দিনটি হবে সহস্রাব্দের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর দিন। এর চেয়েও সহস্র বছর আগে আরো একটি দিন এসেছিল, বরং বলা যায় সময়ের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর দিন ছিল সেটি, এগারশত এগার সনের এগারই নভেম্বর বা ১১/১১/১১১১ ইং। তবে হাজার বছর আগে জন্মানোর সুযোগ হয়নি বলে তাকে কাজে লাগানো যায় নি, কিন্তু এ বছরেই যেহেতু সহস্রাব্দের আরেকটি সেরা দিন পাওয়া যাচ্ছে, তাই ১১/১১/১১ এ দিনটিতেই রচনা করা উচিত জীবনের সেরা কোন গল্পের। আর হ্যা, যারা বিয়ে করেছে, ইচ্ছে করলে (আর ভাগ্য সহায় হলে) এ বছরের নভেম্বরের ১১ তারিখে পৃথিবীর আলোয় হাসাতে পারেন প্রিয় সন্তানকে, আর জন্মদিন হিসেবে  ১১/১১ এর চেয়ে সুন্দর উপহার আর কি হতে পারে? বাংলাদেশী পাসপোর্ট ধারী অধিকাংশের মতো মিথ্যে জন্ম তারিখ পহেলা জানুয়ারী লেখার প্রয়োজন পড়বে না, বরং গর্ব করে লেখা যাবে এগারোই নভেম্বরে জন্ম আপনার সন্তানের। (দয়া করে আমার মতো পাগলের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে ১১ নভেম্বরে সন্তান জন্মানোর পাগলামিটি করবেন না যেন, তাহলে এ দিনটিতেই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী শিশু জন্ম নেবে, এবং অবশ্যই তাদের অধিকাংশের জন্ম হবে সিজারিয়ান অপারেশনে, ফলে অস্বাভাবিক সিজার করতে করতে হাসপাতাল-ক্লিনিকে বিপর্যয় নেমে আসবে, আবার কারো কারো জেদের কাছে হার মেনে সময়ের অনেক আগেই সিজার করাতে গিয়ে সন্তানকেই হারাতে হতে পারে। এগারোই নভেম্বরে সন্তান জন্ম দেয়ার অলৌকিক একটি সুযোগ আমারও হাতে এসেছিল, যদিও ব্যস্ত ডাক্তারের আগ্রহে নভেম্বরের ৯ তারিখেই সিজার করানো হয়, ইচ্ছে করলেই ১১/১১ এর পাগলামীটা করে ফেলা যেত, তবু আমার কাছে দিনের চেয়ে সন্তানের জীবনটাই অধিক প্রিয় বিধায় ঝুকিটা নেয়া হয় নি )

তবে হ্যা, সন্তান তো আর ইচ্ছে হলেই জন্ম দেয়া যায় না, তবে ইচ্ছে করলেই বিয়েটা সেরে ফেলা যায়। আর শালীর সাথে আর যাই হোক সন্তান জন্মদানের মতো অশালীন কথা তো আর তাকে বলতে পারি না তাই তাকে নভেম্বরের এগারো তারিখে বিয়ের পিড়িতে বসতেই পীড়াপীড়ি শুরু করে দিলাম। এগার নভেম্বর যদিও বাংলাদেশে বামপন্থীদের আন্দোলন সংগ্রামের দিন, বিশেষ করে অতীতে ১১ দল সাধারণত নভেম্বরের ১১ তারিখে হরতাল-অবরোধ ডেকে দিনটি উদ্যাপন করে বাংলাদেশে, তবে ১১/১১/১১ তারিখে বিশ্বব্যাপী উপযুক্ত বয়সী তরুন তরুনীদের বিয়ের মাধ্যমে এ দিনটিকে করে রাখা যায় চীরস্মরণীয়, হরতাল অবরোধের দিনটিকে পরিণত করা যায় সহস্রাব্দের সবচেয়ে শুভ দিনে। আর সবচেয়ে মজার বিষয় এই যে, ১১/১১/১১ শুধু মাত্র একটি অসাধারণ দিনই নয়, বরং বলা যায় প্রকৃতিও এ দিনটি বরণ করে নিচ্ছে অতি উৎসাহে। দিনটি হবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের দিন, উথাল-পাথাল জোঁছনা ভরা দিন, কার্ত্তিকের শেষে উন্মাতাল পূর্ণিমার দিন।

সময় যায় সময়ের পথে, বর্তমান হারিয়ে যায় অতীতে, তবু কিছু কিছু সময় হৃদয়ের আচড় কেটে যায়, একেঁ যায় চীরস্থায়ী ভালোবাসার ছাঁপ। ১১/১১/১১ @ ১১:১১ হোক আপনাদের জীবনেরও তেমনি স্মরণীয় অধ্যায় এমন শুভকামনা রইলো।

One Reply to “১১/১১/১১ @ ১১:১১”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.