হোলি মোবারক

বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাঙালী জাতির ব্যাপক পরিচিত রয়েছে। বারো মাসে তেরো পার্বন। সারা বছরই একটা না একটা উৎসব লেগেই থাকে এ দেশে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো যেমনি আড়ম্বরের সাথে পালন করা হয়, অন্যান্য ধর্মের অনুষ্ঠানও সমান গুরুত্বের সাথে উৎযাপিত হয় এখানে। এমন কি ভিন্ন দুটি ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানও একই সময়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মহানন্দে উৎযাপিত হওয়ারও ইতিহাস আছে। এছাড়া ঈদের সাথে একুশে ফেব্রুয়ারীসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানও বিভিন্ন সময়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় সমারোহে পালিত হয়েছে।

গত ২৫ অক্টোবর ২০০৬ পালিত হলো মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। ঈদ মোবারক শব্দটির যতটুকু চর্চা হয়েছে তার চেয়েও বেশী হয়েছ সংলাপ নামক মন্ত্র উচ্চারণ। কুশল বিনিময়ের পরেই সংলাপ নিয়ে সংলাপ, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি মোটকথা পুরো ঈদ জুড়েই ছিল টানটান উত্তেজনা।

ঈদ শেষ হতেই সেই টান টান উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হোলি খেলা। রক্তের নেশায় উন্মত্ত সারাদেশ, দ্বিগিদিক হোলিখেলার সাজসাজ রব পরে গেছে, এখন শুধু রক্ত চাই, রক্ত।

আজ শনিবার, ২৮ অক্টোবর ২০০৬। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ ছেয়ে আছে শনির বলয়। তাই বুঝি রক্তের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দিয়েছে। আজ আর আপন পর ভেদাভেদের সময় নেই, আজ প্রয়োজন টগবেগ তাজা রক্ত। আজ যারা রক্তের খেলায় জয়ী হবে, এদেশ তাদের। আজ যে কান্ডারী রক্ত গঙ্গায় সুনিপুন হাতে হাল ধরে নাও চালাবে তার হাতেই উঠে আসবে চৌদ্দকোটি মানুষের শাসন-শোষণের কাঙ্খিত হাতিয়ার। আজ যে বীর সাঁতারু রক্তগঙ্গা সাতরিয়ে উঠে আসবে প্রত্যাশিত বন্দরে, তার করায়ত্বে থাকবে গাধার খোয়ারের দ্বার। আর যারা ভেসে যাবে, তাদের স্থান হবে জিরোপয়েন্ট আর পল্টন ময়দান।

গত দু’দিন ধরেই ১৪ দল দখল করে আছে রাজপথ। সবাই উৎফুল্ল। কিন্তু আমি ভাবি অন্য কথা। গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত ৪ দলীয় জোট ছিল ক্ষমতায়। ক্ষমতায় থাকলে কিছু অক্ষমতা কুয়াশার মতো ঘিরে থাকে। ফলে ইচ্ছে করলেও রাজনৈতিকভাবে ময়দানে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু আজতো আর কোন বাধা নেই। আজ ৪ দলীয় জোট মুক্ত-স্বাধীন, দায়িত্বশীল কোন ভূমিকা পালনের দায় আর আজ তাদের নেই। তাই আজকের হোলি খেলায় পূর্ণউদ্যমে তাদের নেমে পরায় নেইতো কোন বাঁধা।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে আজ। সবাই বলে নির্বাচন নাকি এদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে সুষ্ঠু পথ। কিন্তু আমি ভাবি ভিন্ন কথা। আজ যদি ৪ দলীয় জোট রাজপথে আকড়ে থাকতে না পারে, রক্তের হোলি খেলায় জয়ী হতে না পারে তবে নির্বাচন তার কোন পুঁজোয় আসবে? ঠিক তেমনি ১৪ দলীয় জোটও যদি আজ হোলি খেয়ায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ না করতে পারে তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে ২৩ বছর হয়তো আবার রাজপথ আকড়ে ধুকে ধুকে মরতে হবে না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। তাই যে করেই হোক আজ জিততেই হবে, চৌদ্দকোটি প্রাণের বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পরতে হবে রক্ত সাগরে।

ঈদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি নতুন চমক দেখিয়েছে। তবে এমন আনন্দঘন মুহূর্তে তা নিয়ে ভাবার মতো তেমন কোন অবসর দেখছি না। গাছের তাগড়া তাগড়া ডালপালা যদি মনে করে গাছ থেকে খসে পড়লেই মুক্তি, তবে তাদের গন্তব্য লাকরী হিসেবে চুলো ছাড়া আর কোথাও কি হতে পারে? গাছের সুন্দর সুন্দর ফুলগুলো ফ্লাওয়ার ভাসে দু’চারদিন সুবাস বিলায়, পরে আপনাই নেতিয়ে পরে, ফ্লাওয়ার ভাসের বদ্ধ পানিতে পঁচে পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। তাই লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি নিয়ে ভেবে ভেবে চলমান হোলি খেলার মজাটাই নষ্ট করার কোন মানে হয় না।

সবাই দিন গুণে তত্বাবধায়ক সরকারের সুশাসনের। যে নেতার জন্য পাঁচ পাঁচটি বছর অন্য নেতারা লুটে পুটে খেতে পারে না, তাদের প্রতিশোধ নেয়ার এটাই উৎকৃষ্ট সময়। এ সময়েই বিগত পাঁচ বছরের সকল দেনা পাওনা শোধ করে নিতে হয়। এ সময়ে যতটুকু দখল করা যায়, ততটুকুই আপনার হয়। এ সময়ে যে যতটুকু পেশী শক্তির প্রদর্শন করতে পারে পরবর্তী পাঁচটি বছর সে পায় নিশ্চিন্তে পুটপাটের অবাধ স্বাধীনতা। তাই নির্বাচনে কিছুই যায় আসে না, কাঙ্খিত তত্বাবধায়ক সরকার এসে যাচ্ছে, সবাই মরচে পরা দা বটিতে সান দিয়ে তৈরী থাকো, খোজা তত্বাবধায়ক সরকারের এই সুশাসনের দিনে হোলি খেলায় জয়ী হওয়ার জন্য ঝাপিয়ে পরো। যারা আজ দা-বটির ধার সুনিপুন হাতে পরীক্ষা করতে পারবে, আগামী নির্বাচন তাদের, ব্যালট বাক্স তাদের, গাধার খোয়ার তাদের।

অতএব বন্ধুগণ, এবার তবে চলো যাই পল্টন ময়দান, মেতে উঠি পবিত্র হোলি খেলায়।
হোলি মোবারক।

One Reply to “হোলি মোবারক”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.