আয় ঘুম আয় ………

রাতে নগর ভ্রমনের অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে তারা জানেন ঢাকা কত বিচিত্র, কত রঙ্গিন, আলোকোজ্জল নগরী। তবে চোখ ধাঁধানো আলো সয়ে গেলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ঝলমলে সালু কাপড় দিয়ে দগদগে ঘা ঢেকে রাখার কি নিরন্তন প্রচেষ্টা। তবুও উগ্র প্রসাধন গলে গলে ঠিকই বেড়িয়ে পড়ে অদ্ভুতুরে ঢাকা শহরের বিকৃত ক্ষতবিক্ষত মুখ।

সমস্ত ফুটপাত জুড়ে অসহায়, নিরাশ্রয় খেটে খাওয়া মানুষের সারি। কাওরান বাজারে যে ফেরিওয়ালারা জাতির বিবেক ফেরি করে বেড়ায়, তাদের অফিসগুলোর সামনে দল বেধে টুকরির মাঝে কুন্ডুলি পাকিয়ে ঘুমায় কাঁচাবাজারের কুলিমজুরের দল। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে কায়িক শ্রমে কান্ত মানুষগুলো জীর্ণ মলিন এক একটা লুঙ্গিতে গা ঢেকে ঘুমায়, একই সাড়িতে নারী-পুরুষ আর বেওয়ারিশ কুকুর। শীতের রাতে একটু উষ্ণতার জন্য এরা আরো ঘনিষ্ট হয়, জড়াজড়ি করে, অন্যের গতরের উত্তাপে বেঁচে থাকা, নিজের উত্তাপটুকু আবার তাকে ফিরিয়ে দিয়ে ঋণ শোধের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা চলে। আর উষ্ণতার জন্য কুকুরগুলো চেয়ের আদর্শ সঙ্গী আর কে হবে। হাজারো কষ্ট, জীবন যন্ত্রনা সত্ত্বেও ওরা ঘুমায় অবোধ শিশুর মতো প্রশান্তিতে। ওদের চিন্তা শুধু একটাই, দুবেলা দুমুঠো পেটপুড়ে খাওয়া।

ফুটপাথের পাশের সুরম্য প্রাসাদের বন্দীশালায় নির্ঘুম রাত কাটান প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা, হোমরা-চোমরা যত বড় মানুষগুলো। দারিদ্র্য দূরীকরণের চিন্তায় চিন্তায় রাতের পর রাত কেটে যায়। অথচ যাদের জন্য এতো চিন্তা, যে দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে কোটি কোটি ডলার বিদেশ থেকে ঋণ করেও কুল পাচ্ছেন না তারা, আর সেই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো ফুটপাথটাকে বেহেস্ত বানিয়েছে দেখে পিত্তি জ্বলে যায়। ঢাকা শহর থেকে ভিক্ষুকগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় না করলে ঝকঝকে তকতকে স্বপ্নীল নগরী গড়া অসম্ভব বলে মনে হয় ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

অঢেল টাকা, অফুরন্ত প্রাচুর্য, সম্মান আর সীমাহীন ক্ষমতার উত্তাপ এদের হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা মানবতাকে বাষ্পের মতো হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়, একই সাথে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুমগুলোও আকাশে ডানা মেলে হারিয়ে যায় কোন এক অচিন পুরে। অথচ দেয়ালটাকে ডিঙ্গিয়ে অস্পৃশ্য মানুষগুলোর সামনে এসে দাড়ালে, কত সহজে, কত স্বল্প মূল্যেই না স্বপ্ন কেনা যায়, তা হাজারো থিসিসের ভারে ভারাক্রান্ত মাথাগুলোয় কোন দিনই হয়তো প্রবেশ করবে না!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.