বিচার বিভাগ সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপ ২০১০ প্রকাশ
কোনো কোনো খাতে কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও সার্বিকভাবে দুর্নীতি বেড়েছে

বিচার বিভাগ সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত, তারপর আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা ও ভূমি প্রশাসন; ঘুষ আদায়ের ক্ষেত্রে পুলিশ, তারপর ভূমি প্রশাসন ও বিচারবিভাগ

ঢাকা, ২৩ ডিসেম্বর: আজ জাতীয় খানা জরিপ ২০১০ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, ২০০৭ সালের তুলনায় সার্বিকভাবে দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। সারাদেশের ৬০০০ খানার উপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে ১৩টি সেবাধর্মী খাতের মধ্যে বিচার বিভাগ সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত। এর পরেই অবস্থান যথাক্রমে আইন্তশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ভূমি প্রশাসনের। জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশের ৮৪.২% সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো দুর্নীতির শিকার হয়েছে। খানাগুলোর প্রায় ৭১.৯% বছরে প্রায় ৯,৫৯১.৬ কোটি টাকা ঘুষ বা নিয়মবর্হিভূর্তভাবে অর্থ প্রদানে বাধ্য হয়েছে, যা খানা প্রতি বার্ষিক গড় ব্যয়ের প্রায় ৩.৫% এর সমান। ঘুষ আদায়ে শীর্ষে রয়েছে আইন্তশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। এরপর ভূমি প্রশাসন ও বিচারবিভাগ। জরিপ অনুযায়ী ২০০৭ এর তুলনায় ২০১০ এ বিচার বিভাগ, ভূমি প্রশাসন ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও হয়রানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে পুলিশ, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতির মাত্রা কমেছে।

‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১০’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় জরিপের ফল উপস্থাপন করে বলা হয়, নগর বা পল্লীতে দুর্নীতির মাত্রা প্রায় একই রকম, যা সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপকতার উদ্বেগজনক প্রতিফলন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব গোলাম রহমান। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম.হাফিজউদ্দিন খান। এ সময় জনাব গোলাম রহমান বলেন, ‘টিআইবি’র এ জরিপে দুর্নীতির আংশিক চিত্র উঠে এসেছে। দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা আরো বেশি। দুর্নীতির সার্বিক চিত্র দেখতে হলে উচ্চ পর্যায়ে যে দুর্নীতি হয়, তাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, জরিপে বিচার বিভাগ সংক্রান্ত যে তথ্য উঠে এসেছে, তা এই বিভাগের সংশোধনীর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। দেশে আইনী প্রত্রিয়ায় যে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে, তাতে দশটি দুর্নীতি দমন কমিশনকে বসিয়ে দিলেও কোনো কাজ হবে না। আইনী প্রক্রিয়ার সংশোধন করা না হলে সুফল পাওয়া সুদূর পরাহত। তাছাড়া আমাদের দেশের বিচারকরা কাজের ব্যপারে নিষ্ঠাবান হলেও বিচারক স্বল্পতা যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, সুযোগ-সুবিধাও কম দেয়া হয়। তাই এ বিভাগের আমূল পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে।’ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ, অধ্যাপক এম কবির প্রমূখ। জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং সিনিয়র ফেলো মো: ওয়াহিদ আলম।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ জরিপে দুর্নীতিকে শুধুমাত্র ঘুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি, আত্মসাৎ, প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্থ বা সম্পদ দখল এবং অন্যান্য অনিয়মও দুর্নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ জরিপ বর্তমান সরকার ও ক্ষমতাসীন জোটের দুর্নীতি-বিরোধী অঙ্গীকার ও কার্যμমকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য এবং এই সদিচ্ছার কার্যকর বাস্তবায়নই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক হতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতির প্রকৃতি অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে এই জরিপের ফলাফল সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া এই জরিপ জনগণকে দুর্নীতি বিষয়ে সচেতন করতে ও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমকে সহায়তা করবে।’

টিআইবি ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় খানা জরিপ পরিচালনা করেছে। ২০১০ সালের খানা নির্বাচনের ক্ষেত্রে Three Stage Stratified Cluster Sampling পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রণীত Integrated Multi-Purpose Sampling Frame (IMPS) অনুসরণে জরিপ পদ্ধতিটি পরিচালিত হয়েছে। এই জরিপে মোট খানার সংখ্যা ৬,০০০। এর মধ্যে ৩,৪৮০টি খানা (৫৮%) পল্লী এবং ২,৫২০টি খানা (৪২%) নগর এলাকায় অবস্থিত। এই খানাগুলো IMPS অনুসরণে সারা দেশের ৬৪টি জেলার ৩০০টি Primary Sampling Unit (PSU) থেকে বাছাই করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪টি পল্লী এবং ১২৬টি নগর এলাকায় অবস্থিত। জরিপ কালে সার্বিকভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার প্রাক্কলিত হারের Relative Standard Error (RSE হচ্ছে) ১.২% এবং সার্বিকভাবে ঘুষ দেওয়া খানার প্রাক্কলিত হারের RSE হচ্ছে ১.৮%।

২০১০ সালের ৯ জুন থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলায় ১৭টি তথ্য সংগ্রহকারী দলের মাধ্যমে এই খানা জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্যের গুণগতমান বজায় রাখতে টিআইবি’র গবেষক ও তত্ত্বাবধায়করা পূরণকৃত প্রশ্নপত্র যথাযথভাবে সরেজমিনে ব্যাক চেক ও স্পট চেক করেন। এছাড়াও জরিপের বৈজ্ঞানিক মান, জরিপ পদ্ধতি, প্রশ্নমালা তৈরি ও বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উৎকর্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পরিসংখ্যান ও জরিপ সংক্রান্ত গবেষণায় বিখ্যাত পাঁচজন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি টিআইবিকে সার্বিকভাবে সহায়তা ও পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ হিসেবে ছিলেন, অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ, অধ্যাপক ড. এম কবির, অধ্যাপক সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান, অধ্যাপক পিকে মোহা.মতিউর রহমান এবং অধ্যাপক মো. শোয়ায়ব।

২০১০ সালের জরিপে যে ১৩টি সেবা খাতের ওপর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, বিচার বিভাগ, কৃষি, ভূমি প্রশাসন, বিদ্যুৎ, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক, ব্যাংকিং, বীমা ও এনজিও। অন্যান্য সেবা খাতের মধ্যে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, গ্যাস, মানবসম্পদ রপ্তানি, পাসপোর্ট অন্যতম। এই জরিপে ২০০৯ এর জুন থেকে শুরু করে ২০১০ এর মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের খানাগুলো বিভিন্ন খাত থেকে সেবা নিতে গিয়ে যে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে, তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

জরিপের খাতভিত্তিক বিশে−ষণে দেখা যায়, বিচার বিভাগে দুর্নীতির মাত্রা ছিল সর্বাধিক। দুর্নীতির মাত্রায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ (৭৯.৬%) ও ভূমি প্রশাসন (৭১.২%) খাত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে সেবাগ্রহীতা খানার যথাক্রমে ১৫.৩% ও ৩৩.২% দূর্ণীতির বা অনিয়মের শিকার হয়।

বাংলাদেশে সেবা খাতে সংঘটিত দুর্নীতিগুলোর মধ্যে ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে বাধ্য হওয়া অন্যতম। সেবা খাতগুলো থেকে সেবা নেওয়া খানাগুলোর ৭১.৯% ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ দিয়েছে। যারা আইন্তশৃঙ্খলা সম্পর্কিত সেবা গ্রহণ করেছেন সেই খানাগুলো সর্বাধিক হারে (৬৮.১%) ঘুষ দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। ঘুষ নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে ভূমি প্রশাসন ও বিচার বিভাগ- যেখানে সেবাগ্রহীতা খানার যথাক্রমে ৬৭.০% ও ৫৯.৬% ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে।

সেবাগ্রহীতা খানাগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচ্য সময়ে বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে গড়ে ৪,৮৩৪ টাকা ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে। গড় পরিমাণ সর্বাধিক পাওয়া গিয়েছে বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে, যেখানে বিচার সম্পর্কিত সেবাগ্রহীতাদেরকে গড়ে ৭,৯১৮ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ভূমি প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা খাতে ঘুষ দেওয়া খানাগুলো যথাক্রমে গড়ে ৬,১১৬ ও ৩,৩৫২ টাকা দিয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে ঘুষ দেওয়া খানাগুলো যথাক্রমে গড়ে ১৬৮ ও ৫২১ টাকা ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ দিয়েছে।

২০০৯ এর জুন থেকে ২০১০ এর মে পর্যন্ত খানাগুলো বিভিন্ন সেবা খাতে জাতীয়ভাবে যে পরিমাণ ঘুষ বা অবৈধ অর্থ দিয়েছে তার একটি প্রাক্কলন করা হয়েছে। তা থেকে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে বাংলাদেশের খানাগুলো এই সময়ে ৯,৫৯১.৬ কোটি টাকা বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ বা অবৈধ অর্থ হিসেবে দিয়েছে। এ প্রাক্কলনের পরিমাণ সর্বাধিক পাওয়া যায় ভূমি প্রশাসনের ক্ষেত্রে, যা ৩৫১৯.৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে বিচার বিভাগ (১,৬১৯.২ কোটি টাকা) ও বিদ্যুৎ (৮১২.৬ কোটি টাকা)।

বিভিন্ন কর সংক্রান্ত সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ৪৩.৯% খানা বাধ্যতামূলকভাবে ঘুষ দিয়েছে এবং অন্যান্য হয়রানির শিকার হয়েছে ৩০.৩% খানা। এছাড়াও জটিল কর পদ্ধতি (১.৪%), কর কর্মচারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার (৬.৪%) এবং অন্যান্য দুর্নীতি ও হয়রানির (যেমন ঘুষ না দিলে সময়ক্ষেপন, ফাইল হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি) (১৮%) উল্লেখ করে। এছাড়াও কোনো কোনো তথ্যদাতা আইনের দুর্বোধ্য ভাষা, শুল্কায়নে সমস্যা, কর মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কথা উলে−খ করে। যেসব খানার সদস্য আয়কর দিয়েছে তারা গড়ে ৭,০৯৭ টাকা কর দিলেও একই সময়ে গড়ে ৩,৪৭৭ টাকা (গড় আয়করের প্রায় ৪৯%) ঘুষ দিয়েছে। একইভাবে গড়ে ৯,১৬৬ টাকা কর দিয়েছে, কিন্তু একই সময়ে গড়ে ৪,৪৯১ টাকা (সার্বিক গড় করের প্রায় ৪৯%) বিভিন্ন ধরনের কর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঘুষ দিয়েছে।

সার্বিকভাবে ৪৫.৯% খানা বিদ্যুৎ সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ৫২.৬% খানা মিটার রিডিং ও বিলিং এর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং নতুন সংযোগ ও বৈদ্যুতিক উপকরণ পরিবর্তন বা সংযোজনের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে প্রায় ৩০% খানা হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে। বিভিন্ন বিতরণ সংস্থায় নতুন সংযোগ ও বৈদ্যুতিক উপকরণ পরিবর্তন বা সংযোজনের ক্ষেত্রে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে সর্বোচ্চ (৩৭.৮% খানা) এবং মিটার রিডিং ও বিলিং এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ (৭২% খানা) ডিপিডিসি থেকে সেবা নিতে যেয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। পুনঃসংযোগের ক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১৯% খানা হয়রানির শিকার হয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থায় সংযোগ পেতে বা উপকরণ পরিবর্তন বা সংযোজন করতে ঘুষ দিতে হয় এবং অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়। সংযোগ নিতে বা উপকরণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খানা বা গ্রাহককে গড়ে ৮৩ দিন (প্রায় ৩ মাস) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং একই সুবিধা পেতে ২৭.৬% খানাকে ঘুষ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থাতে সংযোগ বা উপকরণ পরির্বতনের ক্ষেত্রে সেবা গ্রহণকারী খানাকে গড়ে ১,৬৮২ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

জরিপে দেখা যায়, কৃষি খাত থেকে যারা সেবা নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৪৫.৩% খানাকে কোনো না কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এসব খানার ৩৮.১% সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাকে ঘুষ কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দিয়েছে। তবে জরিপে কৃষি সেবাগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও হয়রানির তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। যেসব খানা সার পেতে দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়েছে তাদের ৯৫.৪% খানাকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ (গড়ে ৩১৪ টাকা) দিয়ে সরবরাহকারীর কাছ থেকে সার নিতে হয়েছে। এছাড়াও ৮৫.৯% খানা সময়মতো সার পায়নি এবং ৪.৬% খানা সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ করেছে। বীজ পেতে যেসব খানা দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে ৭৮.১% খানাকে বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্যাকেট মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ (গড়ে ২০৭ টাকা) দিয়ে বীজ সংগ্রহ করতে হয়েছে। অন্যদিকে ১২.০% খানা নিম্নমানের বীজ পেয়েছে, ১০.৬% খানা অযথা সময়ক্ষেপণের শিকার, ৩.৮% খানা বীজ পেতে প্রভাবশালীদের দ্বারা তদবির করেছে, এবং ৩.৩% খানা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ করেছে।

জরিপে অন্তর্ভুক্ত খানার মধ্যে ৭৯.৯% গত এক বছরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নিয়েছে, যার মধ্যে ৪৩.৯% খানা দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়। সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ দেয় ৩৬.৭%, দায়িত্বে অবহেলার শিকার ১১%, প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপের শিকার ৬.৩%, আত্মসাতের শিকার ১.৫%, প্রতারণার শিকার ০.১%, এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হয় ০.০২% খানা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে সার্বিকভাবে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় খানা প্রতি গড়ে ৯১৩ টাকা।

জরিপে ৯৭.১% খানা সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে ২০% সরকারি এবং ৮০% বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। যেসব খানা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল হতে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছে তাদের ৩৩.২% সেবা নিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালের ধরনভেদে এ হার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে−ক্সে ৩৮.৪%, জেনারেল হাসপাতালে ৩৫.২% এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৩.৬%। অন্যদিকে ১৩.২% সেবা গ্রহণকারী খানাকে বিভিন্ন সেবা পেতে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে গড়ে ৪৬৩ টাকা দিতে হয়।

যারা বিভিন্ন ধরনের বীমা সেবা নিয়েছে, তাদের মধ্যে সার্বিকভাবে ১৯.২% খানা হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে। সর্বাধিক ৩৯% খানা বিভিন্ন সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বীমা করানো এবং প্রতিশ্রুত সেসব সুবিধা না দেওয়া, এবং ৩১.১% খানা বিভিন্ন অনির্ধারিত চার্জ ধার্য করার ঘটনার কথা বলেছে। অন্যান্য ঘটনার মধ্যে বীমার দাবি পরিশোধে অতিরিক্ত সময় নেওয়া (৫.৬%), নির্ধারিত ঘোষণা ছাড়া বিভিন্ন ফি কেটে নেওয়া (৬.৫%) এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার (৪.৬%) উল্লেখযোগ্য। যারা ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা নিয়েছে তাদের মধ্যে সার্বিকভাবে ১৭.৪% খানা হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে। দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হওয়া খানার মধ্যে ৩৭.৯% খানার সেবা পেতে অতিরিক্ত সময় লেগেছে এবং ১৮.২% খানা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যান্য ঘটনার মধ্যে বিভিন্ন অনির্ধারিত চার্জ ধার্য করা (১২.৯%), ব্যাংকে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার (৭.৯%), নির্ধারিত ঘোষণা ছাড়া বিভিন্ন ফি কেটে নেওয়া (৪.৭%), অযথা বিভিন্ন ধরনের কাগজ ও দলিল জমা দেওয়ার জন্য চাপ প্রদান (৫.২%) উল্লেখযোগ্য।

যেসব খানা গত এক বছরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সেবা নিয়েছে তাদের ১৫.৩% সেবা নিতে গিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষা সেবা নিতে গিয়ে ১৫% খানাকে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের খানা প্রতি গড় পরিমাণ ১৬৮ টাকা। শিক্ষার্থী ভর্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রাপ্তি এবং উপবৃত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে খানাগুলোকে উল্লি−খিত অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে।

এনজিও’র সাথে এর সেবাগ্রহীতাদের সার্বিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায় ১০.১% খানা এনজিও খাত হতে সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ৭.২% গড়ে ৫৪৯ টাকা ঘুষ দিয়েছে। ন্যূনতম ২০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে তাদের। ঋণ গ্রহণকারী ২৬.৭% খানা ঋণ গ্রহণের সময় অপ্রয়োজনীয় অন্য সেবা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে (যেমন গাছের চারাসহ নানা পণ্য নিতে বাধ্য হওয়া)। আবার ৩৬.৩% ঋণ গ্রহণের সময় ঋণের পরিমাণ থেকে কম পেয়েছেন। ঋণের নির্ধারিত উদ্দেশ্য পূরণে সাফল্য/ব্যর্থতার তথ্য দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে সংশি−ষ্ট এনজিও বীমা, কিস্তি, সঞ্চয় ইত্যাদি নানা অজুহাতে ঋণের প্রকৃত পরিমাণ থেকে অর্থ কেটে রেখেছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি-নির্ধারণী এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ১৫ দফা সুপারিশ উত্থাপিত হয়। এগুলো হলো: দুর্নীতি প্রতিরোধে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রনালয়গুলোর কার্যকর পদক্ষেপ, স্বাধীন ও শক্তিশালী দুদক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করা, সরকারি খাতে সীমাবদ্ধ আয়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রণোদনার সুষম ভারসাম্য নিশ্চিত করা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কঠোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার পদ্ধতি শক্তিশালীকরণ এবং নীতিকাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলো কার্যকর করা, সরকারি μয়ে স্বচ্ছতা ও সততা প্রতিষ্ঠা করা, মেধা ও কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সেবা খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি নিশ্চিত করা, সবার জন্য নাগরিক সনদ সহজপ্রাপ্য করা, জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের (UNCAC) বাস্তবায়ন এবং সব সরকারি খাতে ন্যায়পাল নিয়োগ।

এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদানের দাবি জানিয়ে বলা হয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদের হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে সুস্পষ্ট আইন থাকা উচিত। দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশে গুণগত মান নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমগুলোর নিজেদের নীতি কঠোরভাবে পালন করা উচিত। এছাড়া তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবার তথ্য জানার অধিকার, তথ্য সরবরাহ ও তথ্যের উন্মুক্ততার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ই-গভর্নেন্স চালু জাতিসংঘ কনভেনশনের অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং জনগণের দুর্নীতিবিরোধী ভূমিকা পালনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়।

সুপারিশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং কারো প্রতি ভয়, করুণা ও পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োগের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

গণমাধ্যম যোগাযোগ
এস. এম. রিজওয়ান-উল-আলম
পরিচালক- আউটরিচ এন্ড কমিউনিকেশন
ফোন: ০১৭১৩০৬৫০১২
[email protected]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.