তবু তুমি জাগলে না ……

ঢাকা শহর। স্বপ্নের শহর। স্বপ্ন ভাঙ্গার শহর। ইট পাথর আর শৃংখলের শহর। রহস্যময়ী এ ঢাকা শহরের প্রতিটি ইট পাথরের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো বিশ্ময়।

শহরের অগুনতি সুউচ্চ অট্টালিকার একটাতে আমার অফিস। দোতলার অফিস রুমের জানালার ভারী পর্দাগুলো সরালেই রঙিন ঝলমলে ঢাকা শহরের আড়ালের কুৎসিত দগদগে ঘা-টা দৃষ্টিসীমায় আছড়ে পড়ে। পাশের নোংরা কালো ঝিলের দূর্গন্ধ মাঝে মাঝে জানালার শার্সি গলে নাসারন্ধ্রে আঘাত হেনে ওদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায়।

ঝিলের পাড়েই সারি সারি ঝুপড়ি ঘর নোংরা জলে যেন হাসের মতো সাতার কেটে চলেছে। আধার ছাড়া যেমন আলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় না, সুরম্য অট্টালিকার কোল ঘেষে বস্তিঘর না থাকলেও তেমনি প্রাসাদের সুখগুলো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা যায় না বলেই বোধ হয় সাদাকালোর এমন বিচিত্র সহাবস্থান।

অফিসের পাশেই একটা ডাকসাইটে রাজনৈতিক দলের অফিস। সব সময় হৈ হুল্লোর লেগেই আছে। প্রতিদিন কোন না কোন উৎসব আর অবশ্যই এন্তার খাবারের ছড়াছড়ি। দলে দলে লোকজন হায়েনার মতো হামলে পড়ে খাবারের প্লেটে, যেন মিনিট দশেক পড়েই কেয়ামত নাজিল হবে, যেন এ খাওয়াই জীবনের শেষ খাওয়া। খাওয়ার প্রতিযোগিতায় যতটুকু তারা খায় তার চেয়ে ঢের বেশি খাবার উচ্ছিষ্ট হিসেবে ফেলে দেয় নর্দমায়।

মনটা খুব একটা ভালো নেই। জানালার পর্দা সরিয়ে অনেক্ষণ ধরে দাড়িয়ে দাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি, চঞ্চল মন মেঘের মতো উড়ে উড়ে যায়, চিন্তাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বাঁধনহারা দস্যি ছেলের মতো, কোন কিছুতে আজ মন বসানো দায়। তবু চোখ আটকে যায় ঝিলের পাড়েই গড়ে ওঠা উচু একটা আবাসিক ভবনের দিকে। দেয়াল টপকে দূরন্ত এক টোকাই টেনে টেনে হাপিস করে দিচ্ছে ব্যালকনিতে শুকোতে দেয়া বিলাস বসন। অভাব মানুষকে কতটা বেপরোয়া করে ফেলে তা দিনে দুপুরে এই ছিচকে চোরের দু:সাহসিক অভিযান দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।

আমি আবার আমার ভাবনায় জগতে হারিয়ে যাই। ভাবনাগুলো শরাহত পাখির মতো ডানা ঝাপটায়, কিছুতেই আজ মন বসে না। ভাবনার পাগলা ঘোড়ায় চেপে মা এসে সামনে দাড়ান। বলেন, তোরা যে এতো বলিস, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, দেশের অর্থনীতি এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে মজবুত, তাহলে দেশে এতো অভাব কেন? দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি কেন?

মা সহজ সরল সাধারণ গৃহিনী। অর্থনীতির জটিলতর সংজ্ঞা তার কাছে হায়ারোগ্লিফিক্সের মতো দূর্বোধ্য মনে হয়। কি করে সে বুঝবে যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির চরিত্রই এমন, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা হবে, রাস্তাঘাট-অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে, একদল অর্থের পাহাড় গড়বে কিন্তু আরেকটা দল কখনোই অর্থনীতির পাগলা ঘোড়ার নাগাল পাবে না। সমাজের সিংহভাগ সম্পদের অধিকারী একটা ক্ষুদ্র অংশ সম্পদের যথেচ্ছ অপচয় করবে কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠী দু’বেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করতেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাপিত্যেশ করবে। বাজার অর্থনীতি কিংবা পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সবকিছুই যোগ্যতমের জন্য, অক্ষম, অযোগ্য আর অসহায় মানুষের কোন স্থান নেই অর্থনীতির ডারউইনবাদে।

ছাইপাশ ভেবে ভেবে আবার দৃষ্টি ফেরাই রাজনৈতিক দলের ভবনটার দিকে। ঝিলের দিকে বেশ কিছুটা যায়গা ভবনের উচ্ছৃষ্ট খাবারে ঢেকে আছে। গতকাল সমাবেশ শেষে নষ্ট হওয়া খাবার দাবার ওখানেই ছোটখাটো টিলার মতো স্তুপাকারে জমানো হয়েছে।

বেশ কিছুটা সময় ধরেই ঘুর ঘুর করছে একটা আট-ন বছরের কিশোর, মস্তবড় ভাঙ্গারীর ব্যাগে নু্ব্জ, হাতে ভাঙ্গারী টোকানোর রড জাতীয় কিছু একটা। এটা ওটা টোকাতে টোকাতে এক সময় ময়লার ভাগাড়ের কাছে এসে ওর চোখ পড়ে বিরানীর টিলার ওপর। অভুক্ত পেটে মুহুর্তেই ক্ষিধেটা চাগিয়ে ওঠে। বিরানীর ভাগাড় ঘেটে একটা রানের হাড় তুলে মুখে পুড়ে চুষতে থাকে। বাসী বিরানীর টক টক স্বাধ অপুষ্ট অভুক্ত কিশোরের কাছে অমৃত বলে মনে হয়।

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি অবহেলিত, বঞ্চিত, অভুক্ত এই শিশুটির দিকে। দারিদ্র্য দূরীকরণের গালভরা বুলি আর অর্থনীতির জটিল জটিল সংজ্ঞা কপচিয়ে আমরা আমাদের আদরে সন্তানদের ময়লার ভাগাড়ে টেনে এনেছি। শেরাটন-সোনারগাঁয়ে নিত্য যাতায়াত আমাদের, দু’টাকার খাবার হাজার টাকায় কিনে খাই, সে খাবার মুখে তোলার সময় একবারও কি আমাদের চোখে অভুক্ত সন্তানদের ছবি ভেসে ওঠে না? সারাদিন রোজা শেষে গোগ্রাসে ইফতার করি, পারলে পুরো পৃথিবীটাই গিলে ফেলতে চাই, অথচ একবারও ওদের কথা ভাবার সময় পাই না, দারিদ্র্যের কষাঘাতে বসে যাওয়া চোখগুলো আমাদের বিবেককে একটুও নাড়া দেয় না। বিবেকহীন মানুষ আর পশুর মাঝে বিভেদটা কি তা কি আমরা কোনদিনই বুঝতে পারবো না?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.