ঐ আসে ছাত্রলীগ, পালাও বাঁধন পালাও

আজকের এ রাতে, হ্যা মাত্র এক যুগ আগে ২০০০ সালের প্রথম প্রহরে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হাজারো ছাত্রের মাঝে, পত্রপত্রিকার ক্যামেরার সামনে ছাত্রলীগের গুন্ডারা মেতেছিল দ্রৌপদীর বস্ত্রাহরণে। ছাত্রলীগের চিহ্নিত নেতা রাসেলের নেতৃত্বে সেদিন শুধু বাঁধনেরই বস্ত্রহরণ করেনি, ওরা পুরো বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ইজ্জতকেই লুটে নিয়েছিল। সেদিন ছাত্রলীগের নেতাদের এমন অপকর্মে অনেকেই সাফাই গেয়েছেন, “দুয়েকজনকে দিয়ে তো আর পুরো দলের বিচার করা যায় না”। হ্যা, তা হয়তো ঠিক কিন্তু যারা রাধুনী তারা জানেন একটি ভাত টিপেই বলা যায় পুরো পাতিলের ভাত তৈরী কি না। কিন্তু না, শুধু একটি নয়, সারা বাংলাদেশের যেখানেই নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ইভটিজিং বিভিন্ন অভিযোগে যত অঘটন ঘটেছে সবক্ষেত্রেই ছাত্রলীগের নামটাই ঘুরে ফিরে বার বার এসেছে। আর এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগের অপকর্মের অভয়ারণ্য। জাহাঙ্গীরনগরে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করে ছাত্রলীগ নেতা মানিক ক্যাম্পাসে মিষ্টি বিতরণ করে নারী নির্যাতনের যে নজীর স্থাপন করেছিল তা আরব্য রজনীর দেশের গল্পকেও হার মানায়। মানিকের মতো ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের অমর কীর্তিতে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক ছাত্রীর ছাত্র জীবন শেষ হয়েছে, বিয়ে, সংসার ভেঙ্গেছে অসংখ্য নারীর।

এরপরও যারা বলবেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই ইডেন কলেজের কথা, দেহ ব্যবসার কর্তৃত্ব নিয়ে ছাত্রলীগের দু’দল প্রতিপক্ষের সংঘর্ষে পুরো বাংলাদেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল, থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়েছিল। জানা গেল দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রীদের জোরপূর্বক আওয়ামী লীগের প্রথম শ্রেণী ও মধ্যম শ্রেণীর নেতা-মন্ত্রী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বাসায় নেয়া ছাড়াও রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, এলিফেন্ট রোড, মালিবাগ, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, মীরপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে সংগঠনের জুনিয়র কর্মী ছাড়াও প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের বাধ্য করে নিয়ে যাওয়া হতো। আর যারা বেশ্যাবৃত্তিতে আপত্তি জানাতো তাদেরকে ছাত্রীসংস্থা বলে নির্যাতন করে হল থেকে বের করে দেয়া হতো। বিষয়টি বুশের ফর্মূলার মতো, “হয় তুমি বেশ্যাবৃত্তি করো, আর না করলে তুমি এন্টি ছাত্রলীগ”। এভাবেই বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রীদের জন্য আতংকের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করেছে।

এখনো কি আপনি দ্বিধায় ভুগছেন? ভাবছেন যত গর্জে তত বর্ষে না, ছাত্রলীগ অতটা পঁচে যায় নি। তাহলে একবার দৃষ্টি ফেরান২০১০ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রভাত ফেরীর শেষে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যের বাসার সামনেই দিন-দুপুরে শত শত মানুষের সামনে ছাত্রীর ওড়না ধরে টানে মুহসীন হল, সূর্যসেন হল ও জসীমউদ্দীন হলের ছাত্রলীগের কিছু কর্মী। ছাত্রীর সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা প্রতিবাদ করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁদের আটকে রেখে হল থেকে হকিস্টিক ও লাঠি নিয়ে এসে ওই ছাত্রী ও তাঁর অভিভাবকদের পৈশাচিকভাবে পিটিয়ে জখম করে। এর কদিন বাদেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নববর্ষের কনসার্টে রাজু ভাষ্কর্যের সামনে বেশকিছু ছাত্রীর শ্লীলতাহানি ঘটায় ছাত্রলীগ।

এখনো যারা বলবেন, এ সব কিছুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা তাদের কাছে প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের যদি কোন দোষই না হবে, যুবলীগের যদি কোন অপরাধ না-ই হবে, ছাত্রলীগের কোন অপকর্ম যদি না-ই হবে তা হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই অন্ধকারের জীবেরা কেন দন্তনখর উচিয়ে বেড়িয়ে আসে? ঝাপিয়ে পড়ে একের পর এক মা-বোনের উপর, লুন্ঠিত হয় বাংলার হাজারো নারীর সম্ভ্রম? এইতো সেদিন, ৩০ জানুয়ারী রাতে আনন্দমোহন কলেজের শতবর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে একদল তরুণ পুলিশ-র‌্যাব, রাজনৈতিক নেতা ও কলেজের শিক্ষকদের সামনেই পাঁচশতাধিক নারীর শ্লীলতাহানি ঘটে

আচ্ছা বলুন তো বাঁধনের শ্লীলতাহানির দায়ে যদি পুরো ছাত্রলীগের গায়ে দোষ না চাপাতে চান তবে ঐ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নরকের কীটগুলোর কি শাস্তি বিধান বাঞ্ছনীয় ছিল না? হ্যা, যদি এমন হতো, কোন তথ্য প্রমাণ নেই, কাউকে দোষী করা যাচ্ছে না, তাই শাস্তিও হলো না, কিন্তু এ ঘটনার ছবি পত্রিকার মাধ্যমে পুরো বিশ্ববাসী দেখেছে, দেখেছে কিভাবে বাঁধনের বসন টেনে হিচড়ে ছিড়ে ফেলা হচ্ছে, কিভাবে হায়েনার হিংস্র নখরে ক্ষতবিক্ষত তার বুক। এ ঘটনার পর মূল আসামী রাসেল পার পাওয়ার জন্য বলেছিল সে উদ্ধার করতে এসেছিল বাধঁনকে। সেদিন বাঁধনের জবাবটা পত্রিকা মারফত পড়েছিলাম, কোনটাকে বলে রক্ষা করা আর কোনটাকে বলে বুকে হাত দেয়া সেটুকু বোঝার মতো বয়স অন্তত হয়েছে”।  অথচ সকল তথ্য উপাত্ত সাক্ষী-সাবুত থাকার পরও কোন বিচার হয়নি বরং ২০০০ সালের ১৪ মে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক রেজাউল করিম তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়ার পর ১৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয়ার পরও আওয়ামী লীগ এবার ক্ষমতায় এসে বাঁধনের বস্ত্রাহরণের সেই তিন আসামী ফজলুল হক রাসেল, খান মেজবাউল আলম টুটুল ও চন্দন কুমার ঘোষ ওরফে প্রকাশকে খালাস দিয়ে দেয়

আসলে শুধু ছাত্রলীগ নয় বরং বিষবৃক্ষের শেকড় থেকে শুরু করে প্রতিটি পাতা পর্যন্ত বিষে নীল। দেহ ব্যবসায় ছাত্রলীগের ছাত্রীদের দায়িত্ব বেশ্যার ন্যায়, ছাত্রলীগের ছাত্রদের দায়িত্ব দালালের, মূল খদ্দের আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা। যেখানে রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার নিজের আবাসিক হোটেলকে বেশ্যাখানায় পরিণত করে, পুলিশ ৩৯ পতিতাসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাইকে গ্রেফতার করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস ও আইজির টেলিফোনে বেশ্যা ও বেশ্যার দালাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাইকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, যেখানে দেশের আইন শৃংখলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্বশীল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বেশ্যাবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতা করে সেখানে দেশের বাঁধনদের বস্ত্রাহরণ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক ঘটনা।

জেগে আছো কি বাঁধন, শুনতে কি পাও? রাসেল, মানিকের চিৎকারে শিৎকারে প্রকম্পিত বাংলাদেশ। বাংলার প্রতিটি প্রান্তে প্রান্তে আজ বস্ত্রাহরণের আদিম আয়োজন। অন্ধকারের জীবেরা আজ উৎসবে মাতে অলি-গলি-রাজপথ। পালাও বাঁধন পালাও, ঐ আসে  ছাত্রলীগ, বাংলার মা-বোনেরা পালাও।

One Reply to “ঐ আসে ছাত্রলীগ, পালাও বাঁধন পালাও”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.