বসে আছি চরমতম শাস্তির অপেক্ষায় …

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঠিক পেছনেই একটা ঝিল। ঝিল না বলে নর্দমা বলাই ভালো। তবে এখনো নর্দমাটিতে নৌকা চলে। অফিসগামী স্বল্প আয়ের চাকুরীজীবীরা নতুন জামাইয়ের মতো নাকে রুমাল চেপে দিনে দু’বার খেয়া পেরোয়। ঢাকা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে আজো খেয়াঘাটের অস্তিত্ব রয়েছে তা না দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন। অথচ এ নর্দমার খেয়াঘাটেও বাঁধা পরে আছে বেশ কিছু মাঝি পরিবারের হাসি কান্না আর ভালোবাসার প্রাণ।
খেয়া পেরিয়েই জীবন বীমা ভবন। ভবনের কোনায় সিটি কর্পোরেশনের মস্তবড় ময়লার ভাগাড় আর তার পাশেই ছোট্ট একটু যায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে জাতীয়তাবাদী দলের কোন এক ওয়ার্ড অফিস। ময়লা আবর্জনা আর রাজনীতির কত সুন্দর সহবাস। আসলে চলমান রাজনীতিকে নর্দমার চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ আজ আর কেউ ভাবে কিনা বলা মুস্কিল।

জীবন বীমা ভবনের সামনে বেশ প্রশস্ত একটা রাস্তা। রাস্তা জুড়ে কাঁচাবাজার। দেশী বিদেশী মুরগী বিক্রি হচ্ছে, ওখানেই জবাই করেই ড্রেসিং করে ব্যাগে ভরে দেয়া হচ্ছে। ফরমালিন দেয়া মাছেরও রমরমা বাজার এখানে। অফিস ফেরত লোকগুলো সময় বাঁচাতে ও বউয়ের বটির কোপ থেকে ঘাড়টাকে বাচাতেই বুঝি এখান থেকেই প্রয়োজনীয় সওদাপাতি করতে ব্যস্ত সবাই।

এতোসব ব্যস্ততার পাশেই কচ্ছপের মতো হাত-পা ছড়িয়ে অসহায়ভাবে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে বারো তের বছরের একটি ছেলে। ভিক্ষেই ওর পেশা। নড়াচড়ার শক্তি নেই, হাত-পা কোনভাবে নাড়িয়ে একটু আধটু এদিক সেদিক করার যেটুকু ক্ষমতা অবশিষ্ট আছে তা ব্যবহার করে চলতে ওর প্রাণবায়ু বের হবার জোড়াগ। সেই সাত-সকালে কে যে ওকে এখানে ফেলে রেখে যায় তা জানি না তবে প্রতিদিন দেখি এক টুকরো টায়ারে বুকটা ঢেকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে জীবন বীমা ভবনের পাশের নোংরা ফুটপাতে। পথচারীরা একে একে ছেলেটির পাশের ড্রেনে প্রস্রাব করে ভারমুক্ত হয়, কেউ কেউ এ অবসরে অবহেলাভরে ছেলেটার দিকে তাকায় কি তাকায় না।

একটা টিনের থালা মুখের কাছে রেখে একটা দু’টো কয়েনের আশায় বসে থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কারো দয়া হয়, দু একটা কয়েন কিংবা অচল এক দু’ টাকার নোটের সৎগতি করতে ওকে দান করে। অনেকে আবার নাক সিঁটকে চলে যায়। নাক সিটকাবেই না কেন? ভারী নোংরা ছেলেটা। বহু কষ্টে বুক ঘষে ঘষে একপা পেছনে এসে সবার সামনেই প্রাকৃতিক কর্ম সাড়ে, আবার অচল শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে আরেকটু সামনে এগিয়ে আবার কচ্ছপের মতো শুয়ে থাকে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে হয়তো কোনদিন পানি ব্যবহারের সুযোগও হয় না বেচারার। আর ওর মুখটাও এমন, যা-ই খায় না কেন নষ্ট হয়ে যাওয়া ওয়াসার বেওয়ারীশ পানির কলের মতো অনবরত ওর মুখ থেকে লালা ঝড়ে, সাথে বেরিয়ে আসে যত খাবার দাবার। এসব দেখে কার না ঘেন্না হয় বলুন। অনেকেই তাই ঘেন্নায় ওর দিকে তাকাতেই চায় না, দ্রুত পা চালিয়ে এমন বিপদজনক যায়গাটা পেরিয়ে যায়।

অনেকেই আবার প্রতারণার গন্ধ শুকে। এ সব ভিক্ষুকদের পেছনে নাকি আছে সংঘবদ্ধ দল। ওরাই ভিক্ষুকের উপার্জিত সক টাকা কেড়ে নেয়, ওদের আস্তানায় নাকি এমন অনেক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের বাস। সকালে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ওদের ছেড়ে দেয়, রাতে আবার নিয়ে যায় আস্তানায়। টাকাগুলো সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের হাতে যাবে বলে অনেকেই আবার কিছুতেই ভিক্ষে দিতে চান না। কিন্তু একটুও তারা ভেবে দেখে না, ঐ প্রতারকচক্র না থাকলে হয়তো ওরা না খেয়েই মরে যেত, আমরা যারা প্রতারকদের ঘৃণা করি, নিজেদেরকে সভ্য বলে গর্ব অনুভব করি তারা কিন্তু ওদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যুনতম খাবারটুকুরও সংস্থান করতে এগিয়ে আসি না, যা প্রতারকরা ওদের জন্য করে।

সকালে অফিসে আসার পথে জীবন বীমা ভবনের পাশে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ আটকে যায়। নোংরা, পুতিগন্ধময় ভিক্ষুক ছেলেটার শরীর জুড়ে নিঃশব্দে বসে আছে একঝাক মাছি। দেখেই বুঝে যাই ছেলেটির নোংরা দেহে আর প্রাণ নেই। হয়তো অনেক আগেই মরে গেছে। আশপাশ দিয়ে ত্রস্ত পায়ে লোকজন ছুটে যাচ্ছে। অনেকেই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সবাই বুঝতে পারছে ছেলেটি বেঁচে নেই, তবু জেনেও না জানার ভান করে দ্রুত পায়ে ছুটে চলে অফিস পানে। আমারও অফিসে বেশ তাড়া আছে। আমিও ছুটে চলি, ছেলেটি যে মরে গেছে আমি যেন তা জানি না কিংবা ছেলেটি হয়তো মরে যায় নি, আমার মতিভ্রম হয়েছে, কিছুক্ষণ পরই হয়তো ছেলেটি জেগে উঠবে এমন ভেবে ভেবে অফিসে এসে হাজির হই।

বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকায় অফিসে এসে কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। আধো ঘুম আধো জাগরণে আমি ছেলেটিকে দেখতে পাই। বিশাল একটি বিচারালয়ে আমাকে হাত পা বেঁধে আটার বস্তার মতো ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে শক্ত মার্বেল পাথরের ফ্লোরে। ভিক্ষুক ছেলেটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, মহামান্য আদালত, এই সেই পাষন্ড, যে আমাকে মৃত অবস্থায় দেখেও আমার সৎকার করে নি, এই সেই মুসলমান নামধারী নরপশু যে আমাকে জানাযা না দিয়ে নর্দমার কীটের মতো নোংরা, দূর্গন্ধময় অবস্থায় তোমার দরবারে ঠেলে পাঠিয়েছে, এই নরাধমকে খোদা তুমি কিছুতেই ক্ষমা করো না”।

আমি নতজানু হয়ে শুয়ে থাকি, আমার জবাব দেয়ার কোন ভাষা নেই, আমার আত্মপক্ষ সমর্থণের কোন সুযোগ নেই। আমি অনুতপ্ত হৃদয়ে বসে আছি চরমতম শাস্তির অপেক্ষায়…

One Reply to “বসে আছি চরমতম শাস্তির অপেক্ষায় …”

  1. মহামান্য আদালত, এই সেই পাষন্ড, যে আমাকে মৃত অবস্থায় দেখেও আমার সৎকার করে নি, এই সেই মুসলমান নামধারী নরপশু যে আমাকে জানাযা না দিয়ে নর্দমার কীটের মতো নোংরা, দূর্গন্ধময় অবস্থায় তোমার দরবারে ঠেলে পাঠিয়েছে, এই নরাধমকে খোদা তুমি কিছুতেই মা করো না”।

    আমি নতজানু হয়ে শুয়ে থাকি, আমার জবাব দেয়ার কোন ভাষা নেই, আমার আত্মপ সমর্থণের কোন সুযোগ নেই। আমি অনুতপ্ত হৃদয়ে বসে আছি চরমতম শাস্তির অপেক্ষায়…

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.