কুমিরের কবলে দেশ : দেশবাসী হুশিয়ার!

বুদ্ধদেব গুহ’র সবিনয় নিবেদন বইটি পড়েননি এমন সচেতন পাঠক খুব কমই আছে। আর যারা পড়েছেন তাদের সবারই কুমিরের গল্পটি মনে আছে নিশ্চয়। ইদানিং কুমিরের গল্পটি খুব খুব মনে পড়ে। বাংলাদেশের দূর্ণীতি নিয়ে টিআইবির গতকালের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার হীন উদ্দেশ্য থেকে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে” মর্মে আইনপ্রতিমন্ত্রীর ভাঙ্গা রেকর্ডটি শুনে আজ আমার কুমিরের গল্পটি মনে পড়ে গেল। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাসায় বইটি পেলাম না, বই পাগল কবি বোনকে ফোন দিলে সেও তার সংগ্রহশালায় উল্টে পাল্টেও খোঁজ পেল না। তবু ভাগ্য ভালো গুগলি মামার কল্যাণে  একুয়া রেজিয়ার ব্লগে সবিনয় নিবেদন বইটির প্রয়োজনীয় অংশটুকু পেয়ে গেলাম। তার অনুমতি ছাড়াই কম্পোজ করা অংশটুকু পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম। যারা গল্পটি আগে পড়েছেন তারা জানেন বর্তমান সময়ে বাংলাদেশকে কিভাবে কুমিরে গ্রাস করছে, আর যারা একেবারেই প্রথমবারের মতো গল্পটি পড়বেন তারা  একবার মিলিয়ে নেবেন, দিনের পর দিন বাংলাদেশটা কিভাবে কুমিরের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। যদি সত্যি মনে হয় দেশটাকে রক্ষায় আপনারও কিছু দায়িত্ব আছে, তবে খাল কেটে যে কুমিরকে ডেকে এনেছেন সে কুমির তাড়িয়ে দেশটাকে কুমির পুজারী শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই।

***      *     ***
এক মাষ্টারমশায়ের এক ছাত্র ছিল। এটা কোন গল্প নয়, অগণ্য মাষ্টারমশায়দের অগণ্য ছাত্র থাকে, কিন্তু এই ছাত্রের বিশেষত্ব ছিল এই যে এ কোন সাব্জেক্টেই পাঁচের বেশি নম্বর পায়না। মাষ্টারের লজ্জার সীমা পরিসীমা নেই। ব্যবসাদার বাবা। তিনিও ভাবেন, মাষ্টারের পিছনে এত টাকা খরচ হচ্ছে আর রেজাল্টের বেলা এই। অল ডেবিট নো ক্রেডিট।
একদিন তো তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন মাষ্টারমশাইকে। ভেতর থেকে বড় বড় ডিশে খাবারো এলো। ছেলের বাবা বললেন-ব্যাপার কি? মাষ্টারমশায় বল্লেন-ব্যাপার আর কিছুই নয়,কুমীর।
-কুমীর? সেকি কথা!!
-হ্যাঁ স্যার, কুমীর। আপনি স্বকর্ণেই শুনুন। শেখাইতো আমি সবই, কিন্তু আপনার ছেলের কুমীরের জন্য সাধ্য কি যে স্কুলের মাষ্টারমশায়রা নম্বর দেয়!
-তাকি করে হয়? কুমীর না হয় এক বিষয়ের নাম্বার খেলো, কিন্তু সব বিষয়ের নাম্বার খায় কিভাবে? দেখি আমার ছেলেকে কি পড়িয়েছেন? আপনি প্রশ্ন করুন,আর ও আমার সামনেই জবাব দিক। ওর কুমীর মেরে তার চামড়া দিয়ে আমি গিন্নীকে ১টা ব্যাগ বানিয়ে দিব।

-বল তো খোকন, আচ্ছা প্রথমে কঠিন প্রশ্ন নয়, গরুর উপরেই মুখে মুখে ১টা নিবন্ধ রচনা কর।
বাচ্চা ছেলেটি বলল-গলু? মাত্তালমশাই?
-হ্যা বাবা গলু।
ছেলেটি গড়্গড় করে বলল-গলু একটি উপকালি জন্তু। গলুল দুধ আমলা থকলে খাই। গলুর দুধ দিয়ে থানা হয়, থন্দেশ হয়, দই হয়। গলুর তামলা দিয়ে দুতো হয়,গলুর থিং দিয়ে কত্বো কিছু হয়। কিন্তু মাত্তালমশাই…
-কি বল…
-বল খোকন…
-একদিন একটা গলুতা বিতেল বেলা বেলাতে বেলাতে একতা নদীল ধালে যেই না গেলো আর মাত্তালমশাই…চোখ ছানাবড়া করে বলল খোকন…এক্তা কুমীল এতে না, গলুতার পা কামলে ধরে এক্কেলে জলের তলায়-ও মাত্তালমশাই!!! গলু থেথ…
-দেখলেন তো স্যার গরু আরম্ভ না হতেই শেষ হয়ে গেল। এমন লিখলে কেন সে নাম্বার পাবে? আপনি বলুন…
-এটা কোন কথা নয়, এ অবিশ্বাস্য ব্যাপার…সব বিষয়েই কুমীর আমার ছেলেকে খাচ্ছে!!  মামদোবাজি পেয়েছেন?  কুমীরের দোহাই দিচ্ছেন আমার ছেলের ফেল করার পিছনে?
-আহা, আপনি রাগ করছেন কেন? আমি স্কুলের টিচার নই।
-ঐ হল, আচ্ছা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার ছেলে কিছু জানে? বাঙ্গালি ছেলেকে রবি ঠাকুর সম্পর্কে কিছু শিখাননি?
-আমার বিদ্যা অনুযায়ি যতটা পারি শিখিয়েছি। বলেই বললেন-বলতো বাবা, রবি ঠাকুর কে নিয়ে তুমি কি জানো?
-লবি ঠাকুল মাত্তালমশাই! লবি ঠাকুল খুব বালো কবি থিলেন…টিনি গীতাঞ্জলি বলে একতা বইলিকে নোবেল প্লাইজ পেয়েথিলেন…অনেক গানও লিখেথিলেন।সে গানেল নাম লবিন্দথংগিত। কিন্তু একদিন না তিনি বেলাতে বেলাতে থিলাইদহের পদ্মার পাথে গেতেন,আল মাত্তালমশাই!
-কি????
-আল কি? একতা কুমীল না এথে তাঁর ঠ্যাং ধলে দলে টেনে নিয়ে তোলে গেল…
-একি জ্বালারে বাবা!! ছেলের বাবা রীতিমত বিরক্ত হয়েই বললেন। সাহেব কবি নিয়ে কিছু পড়িয়েছেন? এই কুমীর কে যদি সাহেব দিয়ে জব্দ্ব করা যায়…
-হ্যাঁ, এইবার স্যার আপনি নিজের প্রশ্ন করুন।
-বল তো খোকন, উইলিয়াম শেক্সপীয়র কে ছিলেন?
-থেকথপিয়ার ইংল্যান্দের মহাকবি থিলেন। তিনি অনেক বই লিখেথেন। নাতোক,কবিতা আলো কত্ত কি…জন্মেথিলেন ত্যাথফোর্ড অন এভনএ। কিন্তু মাত্তালমশাই…
-কি?
-একদিন না তিনি তাঁর বালি থেকে বেলিয়ে এভন নদিল পাশে বেলাতে যেই গেছেন, সে নদিতে অনেক হাঁথও ভাসছিলো কিন্তু মাত্তালমশাই একতা কুমীল, কি কি পাজি কুমীল, এত্বো বলো বলো ল্যাজ, হাঁথগুলো কে না ধলে থেকথপিয়ারের পা কামলে ধলে নদিল মধ্যে এক্কেবালে…ও মাত্তালমশাই…

ছেলের বাবা অত্যন্ত চিন্তান্বিত গলায় বললেন-আরে! সত্যি তো কি কুমীর ব্যামোয় পরলো বলুন তো দেকি। জ্যোতিবাবু ভাষায় বলা যায়-এযে দেখি গভীর চক্রান্ত।

-কি আর বলব আমি?আমি এখন শুধুই দেখি স্যার। অসহায় গলায় বললেন মাষ্টারমশায়।
-ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করুন তো।দেখি কুমীল কিভাবে আসে।
-তাও আসবে স্যার, আপনার ছেলের অসীম ক্ষমতা। এই ছেলের কুমীর লখীন্দর-বেহুলার বাসরঘরের ঢোকা সাপেরই মত। বড় সূক্ষ্ণ শরীর সে সর্বনাশার।
-আচ্ছা খোকন, শাজাহান সম্বন্ধে কিছু জানো তুমি? এইবার বাধ্য হয়ে বাবাই প্রশ্ন করে।
-হ্যাঁ জানি বাবা। সাজাহান খুন বল নবাব থিলেন,দিল্লির নবাব, তাঁর বউয়ের নাম মমতাজমহল, তাই তিনি তামহল বানিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন সে দমুনা নদীল পালে বতে তাঁর তলোয়াল পলিস্কার কলছিলেন আর ওমনি মাত্তালমশাই।। একতা কুমীল এতে তাঁর পা ধলে একদম দলের নিচে…

ছেলের বাবা Exasperated হয়ে মাথায় হাত দিয়ে মাষ্টারমশায় কে বল্লেন-মাটির উপরে তুলে দেখেছেন কখোনো? সেখানেও কি কুমীর?
-হ্যাঁ,স্যার…
-সেকি নানা এইটা আপনার বাড়াবাড়ি…দাঁড়ান আমিই প্রশ্ন করি-খোকন এরোপ্লেন নিয়ে তুমি কি জানো? এরোপ্লেন দেখেছ তো?
-জানিতো বাবা…এয়ালোপ্লেন আকাশের দাহাত, আকাথে উলে, উলে উলে তলে। তাল দুতো দানা আতে… অনেত মাল আর মানুথ তাল পেতেল মধ্যে বথে থাতে। এইটা দিনে ও লাতেও উলতে পালে বাবা।
-এইতো কেমন ফ্লুয়েন্টলি বলে যাচ্ছে বাহ বাহ। আপনারা না…
তাঁর কথা শেষের করার আগেই খোকন বলল-একদিন এয়ালোপ্লেনটা এক্তা নদিল উপল দিয়ে যেতে যেতে কালাপ হয়ে গেলো…তারপর মাত্তালমশাই…
-নদীর নাম কি?
-কঙ্গো নডি মাত্তালমশাই…অনেক কুমীলে ভলা!

মাষ্টারমশাই এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন-ঐ দেখুন! এরোপ্লেনও কি আর বাঁচবে?
-মাত্তালমশাই, এলোপ্লেনতা দেই দলে এতে পললো একতা কুমীল দুতো কুমীল অনেক অনেক কুমীল এসে পাইলতদের আগে তাপ্পর…মাত্তালমশাই……………!!!!……।

3 Replies to “কুমিরের কবলে দেশ : দেশবাসী হুশিয়ার!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.