হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

বাড়ী থেকে ফিরেই দেখি এলাহি কান্ড। নতুন একটা ল্যাপটপ, একটা হ্যান্ডিক্যাম আর একটা প্রজেক্টর কেনা হয়েছে। আর নিশ্চিতভাবেই এগুলো ব্যবহারের পূর্ণ দায়িত্ব আমার হাতে আসবে ভাবতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো।

না, আমি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ নই, কম্পিউটারের উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাও নেই। একটা ভাঙা কম্পিউটারকে গিনিপিগ বানিয়ে নিয়মিত কাটাছেড়া করে যেটুকু শিখেছি তা-ই ওদের কাছে অনেক মনে হয়। অবশ্য “যে বনে বাঘ নেই, সে বনে শেয়ালই রাজা” বলে যে প্রবাদ আছে আমার ক্ষেত্রে তা অনেকাংশে খাটে। অফিসের অন্য সবার দৌড় এমএসওয়ার্ড আর ডিএক্সবল পর্যন্ত সেখানে আমি গেম বাদ দিয়ে যতটুকু পারা যায় তা শেখার জন্য রাতের পর রাত কাবার করেছি।

ল্যাপটপের সাথে প্রজেক্টর জুড়ে দিয়ে পড়লাম বিপদে। ল্যাপটপের স্ক্রীনে ছবি আসে তো প্রজেক্টরে আসে না, আবার প্রজেক্টরে ছবি আসলে ল্যাপটপের স্ক্রীনের ছবি হাওয়া। ল্যাপটপ আর প্রজেক্টরের ম্যানুয়ালগুলোও হাওয়া, বিভিন্ন হাত ঘুরে বিদেশ থেকে আসতে আসতে কার কাছ থেকে যে ওগুলো হাওয়া হয়ে গেছে তা আর জানা হয় না।

কিন্তু এভাবে বসে থাকলে তো চলবে না, একটা প্রশিক্ষণ শিবিরের জন্য পেপার রেডি করা হয়েছে যা প্রজেক্টরের সাহায্যে প্রদর্শন করতে হবে। অথচ ল্যাপটপ আর প্রজেক্টর সতীনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে পারছে না। অবশেষে সাদিক ভাই (মাসিক দ্য বাঙলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক) হাতিরপুলে একটা কম্পিউটার দোকানে নিয়ে গেলেন।

হাসিখুশি চেহারার দোকানের কর্মচারী আশ্বস্ত করে বললেন একহাজার টাকা লাগবে, অল্প সময়েই ঠিক করে দেব। আমাদের সম্মতি দেয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর না থাকায় হ্যা সূচক মাথা নাড়লাম। আমাদের অবাক করে দিয়ে দোকানী কম্পিউটার চালু করে প্রজেক্টরটা লাগিয়ে মাত্র দুটো key fn+f8একবার চেপেই বললেন ঠিক হয়ে গেছে। আমাদেরকে দেখিয়েও দিলেন কোন দুটো key ব্যবহার করতে হবে। আমি আর সাদেক ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি, কত সাধারণ একটা কাজ। কতবার যে ctrl, alt, shift বিভিন্ন keyচেপে আন্দাজে চেষ্টা চালিয়েছি অথচ fn f8 key দুটো একবারও একসাথে আমার হাতে ধরা দিলো না, আফসোস।

অবশেষে বিল পরিশোধের পালা। আমরা পকেট থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করলাম। দোকানী খচখচ করে মেমো লিখে দিল। কিছুতেই মন চাইছিল না দুটো key চাপার জন্য দুটো পাঁচশো টাকার নোট গচ্চা দিতে। কিন্তু স্কুলে পড়া হ্যামিলনের বাশিওয়ালার কথা মনে পড়ে গেল। ইদুর দমনের মতো কঠিন কাজ অল্প সময়ে করে প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিক না পেয়ে কি কান্ডটাই না করেছেন। আসলে কাজটা যত সহজই হোক আমাদের কাছে তো এভারেস্ট জয়ের মতোই কঠিন ছিল। তাই মুখ বুজে বিল পরিশোধ করে শাওনের আকাশের মতো মুখটা কালো করে বাড়ী ফিরলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.