আলোকিত নেতা মওদূদী (রহ:) : শুভ পরিণয়

বারো বছরের কিশোরী মাহমুদা বেগম এক্কা দোক্কা খেলার ছলে পা দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে ছোট্ট একটা গর্ত তৈরী করেন। গর্তটা থেকে পা উঠিয়ে এবার হাতটি রাখলেন। নরম কাদামাটির গর্তে হাতটি ঢুকাতেই শক্ত পাথরের মতো একটা টুকরোর সাথে হাতে ঠোক্কর লাগে। গর্ত থেকে হাতটি তুলতেই তার চোখ চানাবড়া হয়ে যায়। হাতের তালুতে উঠে আসে জ্বলজ্বলে উজ্জল এক হিরের টুকরো। কিছুতেই দৃষ্টি ফেরানো যায় না অমন হিরে থেকে।

মুহূর্তেই চারপাশে লোক জড়ো হয়ে যায়। সবাই অবাক, এতো সুন্দর হিরে পেল কোথায় মেয়েটা। মুরুব্বীরা সাবধান করে বললো, খুব সাবধানে রাখো হিরেটি বেটি, যত্ন করে রেখো, পাছে আবার কেউ ছিনিয়ে না নেয়।

ভোর রাতে অদ্ভুত সুন্দর এ স্বপ্নে ঘুম টুটে যায় মাহমুদা বেগমের। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসলেন তিনি। বারবার তাকাচ্ছেন হাতের মুঠির দিকে। একটু আগের স্বপ্নটা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এখনো যেন হাতের মুঠোয় রয়েছে হীরের টুকরোটি, হাত খুললেই যেন অদৃশ্য হয়ে যাবে। নামাজের জন্য মা ডাকার আগ পর্যন্ত বিছানায় ঠায় বসে রইলেন হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে।

এক অব্যক্ত ভালোলাগা নিয়ে চোখে মুখে স্বপ্নের আবীর মেখে বার বছরের কিশোরী মাহমুদা ছুটে যান বাবা সাইয়্যেদ নাসির উদ্দিন শামসীর কাছে। খুলে বলেন তাকে স্বপ্নের কথা। বাবাও অবাক, মেয়ের অমন স্বপ্নের কথা শুনে। তিনি কাউকে স্বপ্নের কথা বলতে বারন করে দিলি্ল্লর একজন বড় আলেমের কাছে ছুটে যান। খুলে বলেন মেয়ের স্বপ্নের সবকিছু। আলেম হেসে বলেন, আপনার মেয়ের এমন এক আলেমে দ্বীনের সাথে নিকাহ হবে যার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বময়।

নাসির উদ্দিন দিল্লীর সাইয়্যেদ বংশের সন্তান। লি্ল্লীতে তার যেমন রয়েছে যশ, খ্যাতি, তেমনি বেশ স্বচ্ছলও ছিলেন তিনি। ফলে দিল্লীর সম্বান্ত পরিবারের পক্ষ থেকে মাহমুদা বেগমের জন্য একে একে আসতে থাকে বিয়ের পয়গাম। কিন্তু কিছুতেই যোগ্য পাত্র হিসেবে কাউকে মনপুত হচ্ছিল না।

মওদূদী (রহঃ) এর মা রোকেয়া বেগম যখন ছেলের জন্য নাসির উদ্দিনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন কেন যেন নাসির উদ্দিনের মনে হলো এ পাত্রের জন্যই তিনি অপেক্ষা করছেন। সাদাসিধে অথচ স্পষ্টভাষী মওদূদীর কথা তাকে চমৎকৃত করে। মওদূদী স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দেন, তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিস্কার, তিনি কোনক্রমেই এর সাথে আপোষ করবেন না। আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল অবস্থায়ও তিনি কোনক্রমে তার মিশন থেকে পিছপা হবেন না।

মাহমুদা বেগমের দাদাও অত্যন্ত খুশী হন মওদূদীর (রহঃ) স্পষ্টভাষণে। তিনি পরবর্তীতে চিঠি লিখে বিয়ের সম্মতি জানান। তিনি লেখেন, আমাদের মেয়ে রাজপ্রাসাদেও তোমার সাথী হবে, আর কুড়ে ঘরেও তোমায় সঙ্গ দেবে”। মাহমুদা বেগমের হৃদয়ে দাদার এ কথা এতো প্রভাব ফেলে যে আজীবন যে কোন কাজকর্ম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দাদার এ কথা তাকে সাহসী করে তোলে।

১৯৩৭ সালের ১৫ মার্চ, সোমবার মওদূদী (রহঃ) ও মাহমুদা বেগম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তৎকালীন সময়ে দিল্ল্লীর সম্বান্ত পরিবারে সোয়া লাখ টাকার নীচে মোহরানা বেধে দেয়াকে অপমানজনক মনে করা হতো। তাই সবাই সোয়া লাখ বা তার বেশি মোহরানা নির্ধারণ করলেও আদায়ের ব্যাপারে থাকতেন উদাসীন। কিন্তু মওদূদী (রহঃ) মোহরানা আদায়কে ফরজ হিসেবেই গণ্য করতেন তাই তিনি স্পষ্টভাষায় জানান, দু’হাজার টাকার বেশি তার পক্ষে মোহরানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যে পরিমাণ টাকার মোহরানা আদায় করা তার পক্ষে অসম্ভব তা বেধে তিনি প্রতারণার পথে পা বাড়াতে চান না।

অবশেষে মাত্র দু’হাজার টাকা মোহরানায় বিয়ে করেন মওদূদী (রহঃ)। আর বর পক্ষ থেকে কনেকে দেয়া হয় মাত্র একটি শাড়ী ও একটি আংটি।

বিয়েকে যারা শুধুমাত্র উৎসবই মনে করে, বিয়ের পরে মোহরানা আদায়ের ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে যায় মওদূদী (রহঃ) তাদের দলে ছিলেন না কিংবা বিয়ের জন্য ধার দেনা করে উৎসব করে আগামীর দিনগুলোকে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে হাপিত্যেশ করার দলেও তিনি ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে একজন সচেতন মুসলমান হিসেবে মওদূদীর (রহঃ) এর সাদাসিধে বিয়ে তৎকালীন দিল্লীর সম্বান্ত সমাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

One Reply to “আলোকিত নেতা মওদূদী (রহ:) : শুভ পরিণয়”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.