লাশের রাজনীতি


রাজা যায় রাজা আসে নূর হোসেনদের লাশের সিঁড়ি মাড়িয়ে, তবু গণতন্ত্রের মুক্তি মেলে না, স্বৈরাচার নিপাত যায় না।
স্বৈরাচার এরশাদকে সিংহাসন থেকে টেনে হিঁচড়ে নামাতে শেখ হাসিনা রাজনীতির বলির পাঠা বানিয়েছিলেন শহীদ নূর হোসেনকে, উৎসর্গীত পশুর মতো বুকে “স্বৈরাচার নিপাত যাক//” পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক//” স্লোগানে সাজিয়ে মিছিলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল তাকে, এমটাই মনে করেন সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। আমরা দেশবাসীও অবাক বিস্ময়ে প্রতিনিয়ত অবলোকন করি একের পর এক আওয়ামী লাশের রাজনীতি।

লাশ আর মিথ্যাচার এ দুই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বৈরাচার এরশাদের পতনে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিলেন শহীদ নূর হোসেন। বারবার অভিযোগ এসেছে নূর হোসেন আওয়ামী লাশের রাজনীতির শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আরোহনে যেমন লাশের রাজনীতে পারদর্শী, ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতেও লাশের রাজনীতিকেই বরাবর বেছে নিয়েছে। আর এ সবকিছুর সাথে দ্বিতীয় মূলমন্ত্র “মিথ্যাচার” কাজ করেছে সর্বরোগের মহৌষধ হিসেবে। একের পর এক লাশ পড়েছে, কুমিরের মায়ের মতো শেখ হাসিনা আছড়ে পড়ে বিলাপ করেছেন, জনতার আবেগকে কাজে লাগিয়ে একটার বদলে দশটি লাশ ফেলার নির্দেশ দিয়ে কর্মীবাহিনীকে মহাহত্যাযজ্ঞে লেলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশে গ্রামগায়ে কিছু মাতুব্বর শ্রেণীর লোক আছে যারা সবসময় বখাটেদের লালন করে। গ্রামগায়ে মারামারি হলেই তারা গুন্ডাপান্ডাদের শাসিয়ে থাকেন, “মার খেয়ে নয়, মার দিয়ে ফিরতে হবে”। ঠিক একই ভাবে শেখ হাসিনা বিগত শাসনামলে ‘চট্টগ্রামের আওয়ামী নেতাকর্মীরা কি শাড়ি-চুড়ি পরেন? আর যদি একটি লাশ পড়ে তার বদলে দশটি লাশ ফেলতে হবে’ এভাবেই সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিয়েছিলেন।

বিগত শাসনামলে আওয়ামী লীগের পতনকে ঠেকাতে যেমন একটার বদলে দশটি লাশের সন্ধান করেছিলেন শেখ হাসিনা এবার ক্ষমতায় যেতেও একই ফর্মূলা মেনে চলেছে আওয়ামী লীগ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ঢাকার রাজপথে চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। বাংলাদেশী সাধারণ মানুষের মতো সেদিন বিশ্ববিবেক শিউরে উঠেছিল, পশ্চিমা বিশ্ব এ কথা নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করেছিল যে আওয়ামী লীগকে যদি ক্ষমতায় না বসানো হয় তবে শেখ হাসিনা প্রয়োজনে সমগ্র বাংলাদেশকে শশ্বান বানাতেও কুন্ঠিত হবে না।

কিন্তু ক্ষমতা পেলেই কি চরিত্র বদলে যায়? তাহলে তো প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত “ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” প্রবাদের প্রবচনের প্রয়োজন হতো না। তাইতো দেখি ক্ষমতায় এসে বিরোধী পক্ষকে কোনঠাসা করতে একের পর এক লাশের রাজনীতির ছক কষে চলেছে আওয়ামী লীগ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ্যরাজপথে নাটোরে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, উপজেলা চেয়ারম্যানকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যাকরে আওয়ামী লীগ। ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর মতো, বিরোধী নেতাদেরকেও জানিয়ে দেয়া হলো, বেশি বাড়াবাড়ি করলে পরিণতি এর চেয়ে ভালো কারোই হবে না।

লাশের রাজনীতির জন্য পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্ত জানবাজ ছাত্রলীগ ক্যাডারদের দিয়ে যেভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারুককে হত্যা করে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল তা যেকোন বিবেকবান মানুষকেই হতবিহ্বল করে। আর ‘মিথ্যাচারের ফ্যাক্টরী’ আওয়ামী লীগ আগেই মিডিয়াকে লেলিয়ে দিয়েছে, যে পত্রিকা লাশের ছবি ছাপে না বিভৎসতার দোহাই দিয়ে তারাই ফটোগ্রাফির কারিশমা দেখাতে ম্যানহোলে ফারুকের লাশের ছবি ছাপিয়ে রমরমা ব্যাবসা লুটেছিল। দেখেশুনে মনে হয়, আওয়ামী লীগ শপথ করেছে, “যাহা বলিব মিথ্যা বলিব, মিথ্যাবৈ সত্য বলিব না”। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববাসী জানে ও টিভির সংবাদে দেখেছে ২৮ অক্টোবর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আওয়ামী লীগ, অথচ আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে আজো মিথ্যাচার করা হচ্ছে জামাত-শিবিরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল সেদিন জামায়াত কর্মী ও শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশনের ইউনিট সভাপতি হাবিবের লাশকে আওয়ামী লীগের বলে চালানোর চেষ্টার মাধ্যমে।

২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির কথা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চারদলীয় জোটের হরতালের সমর্থনে বের হওয়া একটি মিছিল এবং ডা. ইকবালের নেতৃত্বে হরতাল বিরোধী অপর একটি মিছিল মালিবাগ মোড়ে মুখোমুখি হলে ইকবালের নেতৃত্বাধীন মিছিলের মধ্য থেকে বিএনপির মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ৪ জন কর্মীকে। সেদিন বিশ্বব্যাপী যে নিন্দার ঝড় উঠেছিল তা দেশবাসীকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা আবারও দেশবাসীর মনে দানা বেধেঁছে। বিশেষ করে বিএনপির ৩টি হরতালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যে বর্বরতা দেখিয়েছে, বিশেষ করে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের বাসায় র‌্যাবের পোষাকে ছাত্রলীগ যে বর্বরতা চালিয়েছে তা আওয়ামী লীগের ভয়াবহ লাশের রাজনীতির ইঙ্গিত বহন করে। তবে শেখ হাসিনা এবার অনেকটা সতর্ক, আগে ভাগেই ঢাকার সাংসদের নির্দেশ দিয়েছেন হরতালের মিছিলে তারা যেন নেতৃত্ব না দেন। ২০০১ সালের সেদিন মালিবাগে ডা. ইকবালের নেতৃত্বে যদি হত্যাকান্ড না হতো তবে আওয়ামী লীগের গায়ে অতটা দোষ হয়তো নাও লাগতে পারতো। তাই এবার সাংসদরা নেতৃত্বে থাকবেন না, সম্ভবত আড়াল থেকে আরো বেশি হত্যাযজ্ঞের স্ক্রীপ্ট রচনা করে যাবে।

লাশের রাজনীতির শেষ কোথায় জানে না দেশবাসী। বাংলাদেশের শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় আওয়ামী লীগ লাশের রাজনীতির দূষিত রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। যতদিন আওয়ামী লীগ থাকবে, বাংলাদেশে লাশের রাজনীতির একের পর এক নাটক মঞ্চায়িত হবেই হবে। অপশক্তি যেমন কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ত হয় না, সাময়িক দমিত হয় মাত্র, আওয়ামী লীগও ঠিক তেমনি দূর্ভাগা বাংলাদেশের বিষফোঁড়া হয়ে টিকে থাকবে যুগের পর যুগ, একের পর এক নিত্য নতুন লাশের রাজনীতির ফাঁদে ফেলে, নিত্য নতুন মিথ্যাচারের মাধ্যমে।

2 Replies to “লাশের রাজনীতি”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.