নীলকষ্ট

শেষ পর্যন্ত দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়ে গেল। সবারই মন খারাপ। ভেতরে ভেতরে আমিও প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে আছি, বিশেষ করে রিমান্ড সমর্্পকে এতোসব কিচ্ছা-কাহিনী শুনেছি যে পিলে চমকে যাওয়ার যোগার।
হাত-পা ছড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদলেই তো আর রিমান্ড বন্ধ হবে না বরং ওতে পুলিশের উদ্যম আরো বেড়ে যাবে, তাই স্বাভাকিভাবেই পরিস্থিতি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। যতণে রিমান্ডের জন্য ডাক না আসে ততণ ভয়ে নিজের উপর নিজেই রিমান্ডের আযাব চাপিয়ে দেয়ার কোন মানে হয় না।
ধানমন্ডি থানার নীচতলার এই বড় রুমটাতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। আসামী আমরা এগারো জন আর অচেনা দু’টো ছেলে। আমি সবার সাথেই হেসে খেলে সময় কাটাতে চাইলাম। আমার সাথীরা এতোটাই মনমরা যে তাদেরকে আর স্বাভাবিক করতে পারলাম না, বরং দু’একজনের ঝাড়ি খেলাম।
অগত্যা আমি অন্য ছেলে দু’টোর সাথেই ভাব জমালাম। বেশ হৈ হুল্লোরেই সময় কাটতে লাগলো।
মুরগী মিলন (অরিজিনালটা না, এটাও মুরগী মিলন, তবে মুরগীর ব্যবসা করে বলে এই নাম) চুপচাপ স্বভাবের, তবে অনেক কিছুই জানে বলে মনে হলো। পুলিশের সাথেও দেখি ভালো খাতির আছে। হুমায়ুন আহমেদের আহম্মক মার্কা চরিত্রের এক পুলিশ রঙ-তামাশা করে কি সব যেন দিয়ে গেল ওকে। সেই থেকে মুরগী মিলন বাথরুমে ঢুকে বসে আছে, বের হওয়ার নাম পর্যন্ত নেই। এদিকে আমার অবস্থা খারাপ, ছোট বাথরুমে না গেলেই নয়, সাহস করে কোমর সমান উচু ওয়ালে ঘেরা বাথরুমের কাছে যেতেই দেখি মুরগী মিলন ছোট একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে কি যেন করছে। মোমবাতির শিখার উপরে সিগারেটের রাঙ্তা কাগজে কি যেন একটা পদার্থ দিয়ে হালকা ধোঁয়া উড়ছে আর মুরগী মিলন কাঁপা কাঁপা হাতে দু’টাকার একটা নোট মুড়িয়ে ধোঁয়াগুলো টেনে টেনে মুখের ভেতর নিচ্ছে। পরে মুরগী মিলন একটু সুস্থ হলে জানলাম ও হিরোইনসেবী। থানার ভিতরে হেরোইন পায় কিভাবে জিজ্ঞেস করতেই বললো, পুলিশই ওর কাছে হিরোইন সাপ্লাই করে।
দুপুরে একজন পুলিশ অফিসার এসে রুমটা তল্লাশি করলো, অবৈধ কোন কিছু আছে কিনা, ভাবলাম এবার বুঝি মুরগী মিলনের আর রা নেই। কিন্তু “যার নুন খাই তার গুণ গাই” এ বাগধারা সত্য প্রমাণ করতেই বোধহয় সেই পুলিশটাই সবার অগোচরে মুরগী মিলনের হেরোইন তার নিজের পকেটে চালান করে দিব্যি ওকে বাঁচিয়ে দিল।

বিকেল বেলা একটা ছেলের আহাজারির শব্দ শুনে সামনের সেলের দিকে এগিয়ে গেলাম। নোংরা পোশাকের একটা শীর্ণকায় ছেলে গড়াগড়ি খেয়ে অস্ফুট স্বরে কি যেন বলে কান্নাকাটি করছে। ছিনতাইয়ের অপরাধে ওকে ধরে আন হয়েছে। মুরগী মিলন বললো, ছেলেটার ব্যাড়া উঠেছে, এ সময় হোরোইন না পেলে ছেলেটা এ গোর আযাব চলতেই থাকবে।
হুমায়ন আহমেদের সেই আহম্মকটা এসে সামনের সেলে ঢুকলো। লাঠি দিয়ে বেশ ‘ক ঘা বসিয়ে দিল ছেলেটার পিঠে তবুও ওর কান্না থামলো না বরং কান্নার শব্দ আরো বেড়ে গেল। সকল ভয়কে জয় করে ছেলেটি বারবার বলে চলেছে, “স্যার একটু হেরোইন, স্যার একটু হেরোইন”।
পুলিশটার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। কতগুলো কাচামরিচ নিয়ে আবার ঢুকলো ছেলেটার সেলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাঁচা মরিচ ভেঙে ওর চোখে ঘষা শুরু করলো। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পুলিশটাকে থামতে বললে হেসে বললো, “আরে ভাই, ভয় পাবেন না, প্রতিদিন এমন অনেক হেরোইঞ্চি সামলাই, মরিচ ঘষে দিলেই দেখবেন সব ঠান্ডা, বোম্বাই মরিচ দিতে পারলে বেশি ফায়দা হতো”।
পুলিশের কথা শুনে আমার রক্ত হিম হয়ে আসে, বলে কি আহাম্মকটা, ছেলেটার চোখইতো নষ্ট হয়ে যাবে। এই পুলিশটাই মুরগী মিলনকে হেরোইন সরবরাহ করে আর এখন হেরোইনের দায়ে ছেলেটার চোখে মরিচ ঘষে দিচ্ছে, ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে।
কি আশ্চর্য, কিছুণ পরই ছেলেটা শান্ত হয়ে ঝিমাতে শুরু করলো। বিষে বিষ য় বলে একটা কথা শুনেছি কিন্তু আজ চাুষ দেখলাম। যাক, শেষ পর্যন্ত ছেলেটা সুস্থ হয়েছে এটা ভেবে আস্বস্ত হলাম, কিন্তু তা স্থায়ী হলো না। দশ মিনিট যেতেই আবার ছেলেটার গোঙ্গানী শুরু হলো। এবার আরো উচ্চস্বরে, আরো রক্তহীম করা আর্তচিৎকারে ছেলেটা দেয়ালে মাথা ঠুকতে লাগলো। ধীরে ধীরে ওর শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল, মুখ দিয়ে রক্তমাখা কষ গড়াতে লাগলো।
খবর পেয়ে পুলিশের ডিউটি অফিসার ছুটে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ হা…… বাচ্চারে কে আনছে। সবাই চুপ, কোন পুলিশই আর স্বীকার করে না। শেষে ডিউটি অফিসার বললেন, যেখান থেকে ধরে এসেছিস, সেই খানে ফেলে আয়, শু.. … বাচ্চা যেখানে মনে চায় সেখানে মরুক, আমার অফিসে না”।
পুলিশগুলো দ্রুততার সাথে আদেশ পালন করলো। আমি মন মরা হয়ে ভাবি, এ ছেলেটাতো কারো না কারো সন্তান, সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারলে, এক সময় সংসার হতো, ঘরে আসতো ঘরণী, আর আজ পথে পথে লাঞ্ছনা আর ছিনতাই করে গণধোলাই খেয়ে জীবন শেষ করছে। পুলিশ আমাদের সোনালী ভবিষ্যত ধ্বংস করে দেবে এ আমরা মেনেই নিয়েছি কিন্তু এদের বাাঁচাতে কি কোন মানবতাবাদী পুরুষ এগিয়ে আসবে না?

One Reply to “নীলকষ্ট”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.