তৌহিদকে মনে পড়ে

ক্রিং ক্রিং টেলিফোনের শব্দ বিরক্তিকর অফিসের কাজকে আরো তিক্ত করে তুলে।
তারপরও রিসিভার কানে ঠেকাতে হয়, না জানি কোন রাঘোব বোয়াল ওত পেতে আছে ফোনের ওপারে খুঁত ধরার আশায়।
রিসিভারটা কানে ঠেকাতেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। চৈত্রের দুপুরে যেন একপশলা বৃষ্টি ভিজিয়ে দিল মনের খটখটে জমিনটা।মনে হলো আমি যেন হাজার বছর ধরে এ ফোনেরই অপেক্ষায় ছিলাম।
কারো নাম আমি একবারে মনে রাখতে পারি না। ক্ষণিকের দেখায় চিনতেও কষ্ট হয়। তবুও ফোনের ওপারের জগত থেকে ভেসে আসা শব্দে আমার মনের রূপালী পর্দায় ভেসে ওঠে সুন্দর মায়াবী এক তরুনের মুখচ্ছবি। বছর খানেক আগে প্রথমবারের মতো দেখা মুখ, তার সেই মোহময় কন্ঠস্বর আমার চিনতে ভুল হয় না। জিজ্ঞেস করি, তৌহিদ? এতো দিন পরে তবে মনে পরলো?
অফিস ছুটির পরে ক্লান্ত শ্রান্ত দেহটাকে টেনে টেনে মতিঝিল বাস কাউন্টারে এসে রাজধানী বাসের টিকেটটা সংগ্রহ করে আগেভাগে বাসে ওঠার যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। কেমন করে যেন অন্যদেরকে পাশ কাটিয়ে ঠিকই আমি অনেকের আগেই বাসের সিট দখল করে ফেলি। পাশে এসে বসে একুশে পা দেয়া মিষ্টি একটি তরুন। দেখে মনে হলো ছাত্র, তবে এই প্রচন্ড ভিড়ের সময় মতিঝিল পাড়ায় কি করছে ছেলেটা, মনে মনে একটু অবাক হই।
প্রচন্ড গরমে হাসফাস করছি আমি, আমরা সবাই। দরদর করে ঘেমে নেয়ে উঠছি। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শরীর বেয়ে ঘাম আমার আন্ডারপ্যান্ট, এমনকি মোজা পর্যন্ত ভিজে যাচ্ছে।
একেক স্টপিজ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিআইপি লোকাল যাত্রী উঠছে, কারো পায়ে কারো হাইহিল গজালের মতো বিদ্ধ হচ্ছে, আবার হয়তো কোনো শিকারী পুরুষের হাত ছুয়ে যাচ্ছে সহযাত্রীর গা। সমস্ত বাস জুড়ে গা ঘিনঘিনে অবস্থা।
পাশের ছেলেটার অবস্থা খুবই সঙ্গীন মনে হলো। গরমে হাসফাস করছে, ফাঁদেবন্দী ভয়ার্ত পাখির মতো অনুনয় করে বললো, আমি কি জানালার পাশে বসতে পারি। জানালা আমার যতই প্রিয় হোক না কেন ছেলেটার করুন মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারলাম না। জানালার পাশে বসার পরে কিছুটা কর্তৃত্বের সুরেই বললাম, গরমে তো মরে যাবেন, টি শার্টটা তাড়াতাড়ি খুলে ফেলুন, আহা! মেয়ে তো নন, এতো লজ্জার কি আছে?
ইতস্তত করে টিশার্টটি খুলে ফেললো।
বাসটা মৎস্য ভবন থেকেই জামে আটকে আছে, শম্ভুক গতিতে এগোচ্ছে শাহবাগের দিকে, আর বিদু্যতের গতিতে বাড়ছে আমাদের দুভের্াগ। ছোট্ট একটা বাচ্চা নিয়ে এক ভদ্রমহিলা বাসে উঠলেন। দাড়ানোর যায়গাই যেখানে নেই সেখানে বসার চিন্তাকরাই অবান্তর। দাড়িয়ে সিটটা ছেড়ে দিতেই ধপ করে বসে পড়লেন, গরমে ধন্যবাদ দেয়ার মতোও অবস্থা হয়তো তার ছিলনা।
আমার পাশের সেই ছেলেটার অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল। সাইন্সল্যাবের কাছে জ্যামে পড়তেই ছেলেটি নামার জন্য দাড়ালো। বললো, আমার সাথে কি একটু নামবেন? এ বয়েসি একটি ছেলে সহজে অন্যের সাহায্য চায় না, বুঝলাম অবস্থা যতটা ভাবছি তার চেয়েও খারাপ।
আমার গন্তব্য আদাবরে বোনের বাসা। অর্ধেক পথ বাকি, তবু্ও ছেলেটার সাথে নেমে গেলাম। হাতটা ধরতেই টের পেলাম বেশ কাপছে ছেলেটা, ভারী মায়া হলো ওর জন্য। পাশেই একটা শিতাতপনিয়ন্ত্রিত ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকে পড়লাম। বেশ কিছুটা সময় কাটানোর পরে কিছুটা সুস্থবোধ করছে দেখে ওয়েটারকে লাচ্ছি দিতে বললাম। ধীরে ধীরে লাচ্ছি খেতে খেতে জানলাম ছেলেটির নাম তৌহিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দোকানীকে বিল দিতে গেলে ছেলেটা আপত্তি জানালো, কিন্তু পরিবেশটা আসলেই সৌজন্য দেখানোর উপযোগী নয়, তাই জোরকরে বিল মিটিয়ে দিলাম।
পরে আবার একসাথে যাত্রা শ্যামলীর দিকে। ও বাস থেকে নামার পরে আমার বার বার মনে হয়েছে, ছেলেটাকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া উচিত ছিলো। না জানি আবার রাস্তায় বিপদ না ঘটিয়ে ফেলে।
তৌহিদ বললো, ভাইয়া, মাকে আপনার কথা বলেছি, তিনি আপনাকে বাসায় নিয়ে যাইনি বলে আপসোস করেছেন।
আজ এতোদিন পরে আবার যখন তৌহিদের ফোন পেলাম, তখন মনটা আনন্দে ভরে গেল যে, ছেলেটা ভালো আছে, সুস্থ আছে।
ভালো থেকো তৌহিদ এ কামনা করছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.