আক্কেল সেলামী

খুব ভোরে বগুড়ায় পৌঁছেছি। স্বপ্নের শহর মহাস্থানগড়, দেশের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক নিদর্শনে ভরপুর এ সমৃদ্ধ জনপদটিকে দুচোখ ভরে দেখার ইচ্ছে ছিল অনেক দিন থেকেই। আজ বগুড়ায় আসায় এ স্বপ্ন সাধটি পূর্ণ হতে চলেছে।
নজরুল ভাই বগুড়ার কয়েকটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। সঙ্গে আমি এসেছি সফরসঙ্গী হয়ে।
সকাল বেলাতেই নজরুল ভাই বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজের ভেতর ডাইভ দিলেন। আর আমিও চুপি চুপি বেড়িয়ে পড়লাম শহর আবিস্কারের নেশায়, প্রকৃতির টানে।
একা একা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় হাটছি, আর শহরটাকে যতটা সম্ভব আপন করে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিকেলে মহাস্থানগড়-এ যাওয়ার আগে আপাতত হাতে তেমন কাজ নেই। মহাস্থান গড়-এর সাথে বিখ্যাত মাজারটিও দেখব বলে মনে মনে ঠিক করে নেই।
হাটতে হাটতে শহরের এক প্রান্তে এসে রেল স্টেশনটি আবিস্কার করি। রেলগাড়ির প্রতি আমার অনেকখানি দূর্বলতা। দেশের একমাত্র রেল বিহীন বিভাগে জন্মেছি বলেই আজো হয়তো রেল ভ্রমন হয়ে ওঠে নি। স্টেশনটাকে ঘুরে দেখার জন্য ধীরে ধীরে প্লাটফরমে গিয়ে দাড়ালাম। ইতস্তত যাত্রীরা রেলের জন্য অপেক্ষা করছে।
দেখতে দেখতে কুউউউ ঝিকঝিক করে একটা ট্রেন এসে থাকল প্লাটফরমে। রঙ-বেরঙের নানান মানুষ ট্রেন থেকে নামছে, আবার হুড়োহুড়ি করে একদল ট্রেনে উঠছে দেখে বেশ মজা লাগলো। ওদের ভাগ্যের প্রতি কিছুটা ইর্ষাও হলো, ওরা ট্রেনের যাত্রী আর আমি আজো ট্রেনে চড়তে পারলাম না।
হঠাৎ করেই শোরগোল শুরু হলো। স্টেশনের সকল প্রবেশদ্বারগুলো বন্ধ হয়ে গেলো। জনে জনে তল্লাশি করে খোঁজ নেয়া হচ্ছে টিকেট ছাড়া কেউ রেল ভ্রমন করেছে কিনা। ভারি অবাক হলাম, টিকেট ট্রেনে চেক না করে স্টেশনে করছে শুনে। যাদেরকে টিকেট ছাড়া পাওয়া গেলো তাদেরকে একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো, আর কি অবাক কান্ড আমাকেও তাদের সঙ্গে যেতে হলো।
বিচারে সাব্যস্ত হলো, দশ টাকা আক্কেল সেলামী দিতে হবে নয়তো দশবার কান ধরে উঠবোস করতে হবে। দেখতে দেখতে বেশকিছু লোক কানধরে মুক্তি নিয়ে পালিয়ে গেল আর আমিসহ কয়েকজন দাড়িয়ে রইলাম। আমি যতই ওদের বোঝাই যে আমি ট্রেনে চড়িনি, ঢাকা থেকে সকালে এসেছি, এই দেখুন তার টিকেট, কিন্তু আমার কথা কারো কানে পশে না। ওদের কর্তব্যরত প্রধান কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালাম তিনিও কোন পাত্তা দিলেন না। এতো অপমান বোধ করছি যে মনে হচ্ছে পুরো প্লাট ফরমটা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেই। আগে শুনেছি লোকজন ট্রেনের টিকেট ফাকি দিয়ে ভ্রমন করে, আর এখন দেখছি উল্টো। প্রাইভেট ট্রেন বলে ট্রেন কর্তৃপক্ষ নিরীহ লোকদের কাছ থেকেও জরিমানার নামে ঘুষ আদায় করে, এমনটা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
অন্য যাত্রীদের দেখি সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রত্যেকেই টাকা দিয়ে কেটে পড়ছে। অগত্যা আমার আর গো ধরে বসে থাকার কোন যুক্তি খুঁজে পেলাম না। ট্রেনে না চড়েও বাধ্য হয়ে আক্কেলসেলামী দিয়ে স্টেশন ত্যাগ করলাম।
আমার স্বপ্নের শহর আমাকে যে দুঃস্বপ্ন দেখালো তাতে স্বপ্ন দেখার সাহসই হারিয়ে ফেলছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.