মা, আমার জুনিয়র মা

তহুরা। আমার কন্যা। আমার মায়ের নামেই নাম রেখেছি। আজ ওর বয়স তিনমাস নয় দিন পূর্ণ হলো। আমার খালা বলেন, এত নাম থাকতে এ নাম কেন? দূনিয়ায় তুই আর নাম খুঁজে পেলিনা? তাঁর কথার সাথে সুর মেলায় অনেকেই। বন্ধুরা বলে মায়ের নাম ধরে সারদিন ডাকবি, আমরা ডাকবো, এতে তো মায়ের সাথে বেয়াদবিই করা হলো। আমি হেসে জবাব দেই, শুধু নাম ধরে না ডেকে ‘মা তহুরা’ বলে ডাকলেই পারিস। আমি কি করে ওদের বোঝাই পৃথিবীর সব সুন্দর নাম এক করলেও তা আমার মায়ের নাম হয় না।

বাবুটা সেদিন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল আমার কোলে। মা দেখে আফসোস করে বললেন ‘আহারে! আমিও যদি বাবুটার মতো ছোট হতাম তাহলে তো তোর কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম’। মাকে আমি কেমন করে বলি মা আমিতো বাবুকে কোলে নেই নি, আমি বাবু রূপে তোমাকেই কোলে নেই, তোমাকেই আদর করি।

এখন আমি অনেক বড়, ইচ্ছে করলেই আগের মতো যখন তখন মাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না, চুমো খেতে পারি না। যখন আমি অনেক ছোট, এখনো মনে আছে, মা ঘুমিয়ে পড়লে মায়ের পায়ের পাতায় চুমো খেতাম। অথচ আজ ইচ্ছে থাকলেও কি আর অমনটি করা যায়?

কেউ আমাকে বলেনি, এমনকি মা তুমিও না। তিন তিনটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে, সেই স্বাধীনের পরে, কি ভীষণ যে মনকষ্টে কেঁদেছ। সেদিনকার সমাজতো আর কন্যারূপী মা কামনা করতো না, বংশের প্রদীপ চাইতো। সেই বহু সাধনার ধনটিকে তুমি যে কত ভালবাস সে আমি ছাড়া আর কে জানে? অথচ তোমাকে আমি মনভরে কিছু দিতে পারি না। আমাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়ে সেই যে তোমার বাতের অসুখটি বাঁধিয়েছ ওটি ছাড়া আর কিই বা আমি তোমায় দিয়েছি। এখনো মাঝে মাঝে যখন বাতের ব্যাথায় কষ্ট পাও, নিজেকেই বড্ড অপরাধী মনে হয়। অথচ তুমি মুখফুটেঁ কোন অভাব অভিযোগ করোনি আমার কাছে। তোমার চোখের জ্যোতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে।তুমি ভাবো, ও তো আছে, ওর চোখ দিয়েই আমি বিশ্ব দেখবো, এই তো অনেক ভালো। মা, তোমরা এমন কেন?

মনে আছে মাকে একদিন ইংরেজী একটি উপন্যাসের কাহিনী পড়ে শুনিয়েছিলা। অসুস্থ মায়ের অসহ্য কষ্ট সইতে না পেরে ছেলেটি মাকে ঘুমের অসুধ খাইয়ে চীরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। মাকে গল্পটি বলার পর মনে হলো, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছি। আল্লাহ না করুন, মা যদি অমনঅসুখে পরেন তবে কী মায়ের মনে একবারও ও গল্পের কথা মনে হবে না? একবারও কি আমাকে ঘাতক বলে সন্দেহ হবে না? আমি তো জানি আমি মাকে যতই ভালোবাসি, ভালবাসার জন্য অতটা নিষ্টুর হওয়ার সাহস আমার নেই, তা আমি কি কাউকে বোঝাতে পারব? হে আল্লাহ অমন পরিস্থিতি হওয়ার চেয়ে আমাকে তুমি মৃত্যু দিও আর নয়তো আমার মমতাময়ী মা কে যতদিন বাঁচিয়ে রাখতে চাও, সুস্থ রেখে। একজন ছেলে হয়ে আমি মায়ের জন্য এটুকু দাবী তো তোমার কাছে করতেই পারি খোদা। তুমি আমার দোয়া কবুল কর।

সবাই সময় চলে যায় বলে দুঃখ করে, আর আমি দিন গুনি, কবে সময় শেষ হবে, কবে বাবা রিটায়ার্ড করবেন, আর আমি আমার মা-বাবাকে আমার কাছে ফিরে পাবো। আমার ছোট্ট ভাড়া বাসায় হয়তো তাদের কষ্ট হবে তবু মাকেতো কাছে পাবো। সেদিন খোদা আমাকে কৃপণ করোনা, ভালোবাসায় পূর্ণ করো এ হৃদয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.