সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে ঈদ ও শবে ক্বদর পালন কতটা যৌক্তিক?

ঈদ মোবারক! পূর্ণ একটি মাস সিয়াম সাধনার পরে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণের সেই অপার আনন্দময় পবিত্র সময় আমাদের সামনে।  আল্লাহ আমাদের ৩০ দিনের সিয়াম সাধনা কবুল করুন, আমাদেরকে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত দান করুন এবং পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনা যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ আমাদের উপর ফরজ করেছেন সেই তাক্বওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

এবার সৌদি আরবেও রমজান ৩০ দিনে পূর্ণ হয়েছে। ১৮ তারিখ পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতি এলাকায় ঈদ উদযাপিত হয়েছে, ১৯ তারিখে সৌদি আরবসহ বেশ কিছু দেশে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, বাংলাদেশসহ বাকী দেশগুলোতে ২০ আগস্ট ২০১২ রোজ সোমবার ঈদ উদযাপিত হবে।  ফলে এবারও বিশ্বে ৩ দিনব্যাপী ঈদ পালিত হচ্ছে।

সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে রমযানের রোজা রাখা, শবে ক্বদর পালন এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উদযাপন নিয়ে ইদানিং বেশ আলোচনা চলছে, বিশেষ করে মিডিয়ায় ৩ দিনব্যাপী বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের খবর সচিত্র সম্প্রচারিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে ইসলামী অনুষ্ঠানাদি পালনে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার অনেকেই পাল্টা যুক্তি দিয়ে তা খন্ডন করছেন। উভয় পক্ষই যুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোরআন-হাদীসকেই সাক্ষী মানছেন। তবে আমার কাছে ঈদ যেমন আনন্দের, ঈদ উদযাপন নিয়ে ভিন্ন মতের কারনে দেশে ৩ দিনব্যাপী ঈদ উদযাপিত হওয়াও কম আনন্দের নয়। আর আনন্দের বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটাও আনন্দের, তাই স্বাভাবিকভাবে আমিও এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরছি। Continue reading “সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে ঈদ ও শবে ক্বদর পালন কতটা যৌক্তিক?”

শবে ক্বদর

 শবে ক্বদর কি?

আমি এই (কুরআনকে) ক্বাদ্‌রের রাত্রিতে নাযিল করিয়াছি। তুমি কি জান, ক্বাদ্‌রের রাত্রি কি? ক্বাদ্‌রের রাত্রি হাজার মাসের চেয়েও অধিক উত্তম। ফেরেশতা ও রূহ এই (রাত্রিতে) তাহাদের রব্ব-এর অনুমতিক্রমে সব হুকুম হইয়া অবতীর্ণ হয়। এই রাত্রটি পুরাপুরি শান্তি ও নিরাপত্তাময় ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত। (সূরা আল-ক্বাদ্‌র, আয়াত ১-৫)

শবে ক্বদর কেন?

শপথ এই সুস্পষ্ট প্রকাশকারী কিতাবের; আমরা ইহাকে এক বড় কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ রাতে নাযিল করিয়াছি। কেননা আমরা লোকদিগকে সাবধান করিতে চাহিয়াছিলাম। ইহা ছিল সেই রাত যে রাতে আমাদের নির্দেশে প্রতিটি ব্যাপারের বিজ্ঞোচিত ফায়সালা প্রকাশ করা হইয়া থাকে। আমরা একজন রাসূল পাঠাইতে যাইতে ছিলাম, তোমার রব্ব-এর রহমত স্বরূপ। নিঃসন্দেহে তিনিই সবকিছু শোনেন এবং সবকিছু জানেন। (সূরা আদ্‌-দুখান, আয়াত ২-৬)

শবে ক্বদর কোন মাসে?

রমযানের মাস, ইহাতেই কুরআন মজীদ নাযিল হইয়াছে, যাহা গোটা মানব জাতির জন্য জীবন যাপনের বিধান আর ইহা এমন সুস্পষ্ট উপদেশাবলীতে পরিপূর্ণ, যাহা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কাররূপে তুলিয়া ধরে। কাজেই আজ হইতে যে ব্যক্তি এই মাসের সম্মুখীন হইবে, তাহার পক্ষে এই পূর্ণ মাসের রোযা আদায় করা একান্ত কর্তব্য।…. (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৫)

শবে ক্বদর কোন তারিখে?

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে বলেনঃ তোমরা তাকে (শবে কদর) রমযানের ১৭, ২১ ও তেইশের রাতে অন্বেষণ কর। অতপর তিনি (সাঃ) চুপ থাকেন। (আবু দাঊদ ১৩৮৪)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন এবং বলতেনঃ তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কাদর তালাশ  কর। (বুখারী ১৮৯৩)

আবু সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযান মাসের মাঝের দশকে ই’তিকাফ করেন। বিশ তারিখ অতীত হওয়ার সন্ধ্যায় এবং একুশ তারিখের শুরুতে তিনি এবং তাঁর সংগে যারা ই’তিকাফ করেছিলেন সকলেই নিজ নিজ বাড়ীতে প্রস্থান করেন এবং তিনি যে মাসে ই’তিকাফ করেন ঐ মাসের যে রাথে ফিরে যান সে রাতে লোকদের সামনে ভাষণ দেণ। আর তাতে মাশাআল্লাহ, তাদেরকে বহু নির্দেশ দান করেন, তারপর বলেন যে, আমি এই দশকে ই’তিকাফ করেছিলাম। এরপর আমি সিদ্ধান্ত করেছি যে, শেষ দশকে ই’তিকাফ করব। যে আমার সংগে ই’তিকাফ করেছিল সে যেন তার ই’তিকাফস্থলে থেকে যায়। আমাকে সে রাত দেখানো হয়েছিল, পরে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। (রাসূলুল্লাহ সঃ বললেন)ঃ শেষ দশকে ঐ রাতের তালাশ কর এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তা তালাশ কর। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ঐ রাতে আমি কাদা-পানিতে সিজদা করছি। ঐ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘের সঞ্চার হয় এবং বৃষ্টি হয়। মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সালাতের স্থানেও বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। এটা ছিল একুশ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের সালাত শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তাঁর মুখমন্ডল কাদা-পানি মাখা। (বুখারী ১৮৯১)

শবে ক্বদরের আলামত কি?

ক্বদরের রাতের আলামত বা লক্ষণ হলোঃ সেই রাত শেষে সকালের সূর্য উদিত হবে তা উজ্জল হবে কিন্তু সেই সময় তার কোন আলোকরশ্মি থাকবে না। (মুসলিম ১৬৬২)

শবে ক্বদরে করণীয়?

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রমযানের শেষ দশক আসত তখন নবী (করীম (সাঃ) তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন এবং রাতে জেগে থাকতেন ও পরিবার পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (বুখারী ১৮৯২)

শবে ক্বদরের ফজিলত?

 আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদরে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করবে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমতা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে। বুখারী-১৭৮০

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে রমযান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামে রমযান অর্থাৎ তারাবীহর সালাত আদায় করবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূজ মাফ করে দেয়া হবে। (বোখারী ১৮৮২)

রমযানের রাত্রে যা করণীয়ঃ

হে চাদর মুড়ি দিয়া শয়নকারী! রাত্রিকালে নামাযে দন্ডায়মান হইয়া থাকে; তবে কিছু কম, অর্ধেক রাত্র কিংবা উহা হইতেও কিছুটা করিয়া লও। অথবা উহাপেক্ষা কিছু বেশী বৃদ্ধি কর। আর কুরআন থামিয়া থামিয়া পড়। আমরা তোমার উপর একটা দুর্বহ কালাম নাযিল করিব। প্রকৃতপক্ষে রাত্রিকালে শয্যা ত্যাগ করিয়া উঠা আত্মসংযমের জন্য খুব বেশী কার্যকর এবং কুরআন যথাযথভাবে পড়ার জন্য যথার্থ। দিনের বেলায় তো তোমার খুব বেশী ব্যস্ততা থাকে। তোমার রব্ব-এর নামের যিকির করিতে থাক আর সব কিছু হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া তাহারই জন্য হইয়া যাও। (সূরা আল-মুয্‌যাম্মিল, আয়াত ১-৮)

 হে নবী! তোমাদের রব্ব জানেন যে, তুমি কখনো রাত্রির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় আর কখনও অর্ধেক রাত্র এবং কখনো এক-তৃতীয়াংশ রাত্র ইবাদাতে দাঁড়াইয়া থাক। আর তোমার সঙ্গী-সাথীদের মধ্য হইতেও কিছু সংখ্যক লোক এই কাজ করে। রাত্র ও দিনের হিসাব আল্লাহই রাখিতেছেন। তিনি জানেন যে, তোমরা সময়ের গণনা যথাযথভাবে রাখিতে পার না। এই কারণে তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করিলেন। এক্ষণে যতটা কুরআন তুমি সহজে পাঠ করিতে পার ততটাই পড়িতে থাক। তিনি জানেন, তোমাদের মধ্যে কিছু লোক অসুস্থ হইতে পারে আর কিছু লোক আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে বিদেশ সফর করে। আর কিছু লোক আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। কাজেই যতটা কুরআন খুব সহজেই পড়া যায় তাহাই পড়িয়া নাও। নামায কায়েম কর। যাকাত দাও আর আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিতে থাক। যাহা কিছু ভালো ও কল্যাণ তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম পাঠাইয়া দিবে, উহাকে আল্লাহর নিকট সঞ্চিত ও মওজুদ রূপে পাইবে। উহাই অতীব উত্তম আর উহার শুভ প্রতিফলও খুব বড়। আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাহিতে থাক। নিঃসন্দেহে আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা আল-মুয্‌যাম্মিল, আয়াত ২০)

অবশ্য মুত্তাকী লোকেরা সেই দিন বাগ-বাগিচায় ও ঝর্ণাধারাসমূহের পরিবেষ্টনে অবস্থান করিবে। তাহাদের রব্ব তাহাদিগকে যাহা কিছুই দিবেন, তাহা সানন্দে তাহারা গ্রহণ করিতে থাকিবে। নিশ্চয়ই তাহারা সেই দিনটির আগমনের পূর্বে সদাচারী ও ন্যায়নিষ্ঠ ছিল। তাহারা রাত্রিকালে খুব কম সময়ই শয়ন করিত। এবং তাহারাই রাত্রের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করিত। আর তাহাদের ধন-মালে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের জন্য স্বত্ব ও অধিকার ছিল। (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ১৫-১৯)

রহমানের বান্দাহ তাহারা যাহারা জমিনের বুকে নম্রতার সহিত চলাফিরা করে আর জাহিল লোকেরা তাহাদের সহিত কথা বলিতে আসিলে বলিয়া দেয় যে তোমাদের প্রতি সালাম; যাহারা নিজেদের রব্ব-এর সমীপে সিজদা নত হইয়া বো দাড়াঁইয়া থাকিয়া রাত অতিবাহিত করে। (সূরা আল ফুরকান, আয়াত ৬৩-৬৪)

হে নবী! আমরাই তোমার প্রতি এই কুরআন অল্প অল্প করিয়া নাযিল করিয়াছি। অতএব, তুমি তোমার আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ পালনে ধৈর্য ধারণ কর। আর ইহাদের মধ্য হইতে কোন দুষ্কৃতিকারী কিংবা সত্য অমান্যকারীর কথা মানিও না। তোমার রব্ব-এর নাম সকাল সন্ধ্যা স্মরণ কর। রাত্রি বেলায় তাঁহার হুযুরে সিজদায় অবনত হও আর রাত্রির দীর্ঘ সময়ে তাঁহার তসবীহ করিতে থাক। (সূরা আদ-দাহার, আয়াত ২৩-২৬)

নামায কায়েম কর সূর্য পশ্চিমে ঢলিয়া পড়ার সময় হইতে রাত্রির অন্ধকার আসন্ন হওয়ার সময় পর্যন্ত। আর ফজরে কুরআন পাঠের স্থায়ী নীতি অবলম্বন কর; কেননা ফজরের কুরআন পাঠে উপস্থিত থাকা হয়। আর রাত্রিবেলা তাহাজ্জুদ পড়। ইহা তোমার জন্য নফল। সেদিন দূরে নয়, তোমার রব্ব তোমাকে মাকামে মাহমুদে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবেন। (সূরা বনী-ইসরাইল, আয়াত ৭৯)

প্রতিটি রাতের শেষ সময়ই মাগফেরাতের সময়ঃ

রাসূল (সাঃ) বলেনঃ রাতের শেষ সময়ে আল্লাহ্ দূনিয়ার দিকে নাযিল হন এবং বলেন, “ডাকার জন্য কেউ আছে কি যার ডা আমি শুনব, চাওয়ার জন্যে কেউ আছে কি যাকে আমি দেব, গুনাহ মাফ চাওয়ার কেউ আছে কি যার গুনাহ আমি মাফ করব?” (বুখারী)

 শবে ক্বদরের দোয়াঃ

হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে পছন্দ কর। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করো।