সরকার চায় শিবির অস্ত্র হাতে তুলে নিক; আমরা চাই ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা

নির্যাতনের মাত্রা কোন পর্যায়ে গেলে মানুষ স্বাধীনতার ডাক দেয়? কতটা রক্ত ঝড়লে মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়? কেন বীর বাঙ্গালী স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছিল? কেন বাঙ্গালী বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল, অস্ত্র ধারণ করেছিল, লড়াই করেছিল এবং কুকুরের মতো তাড়িয়ে বাংলাদেশ ছাড়া করেছিল? আজ স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে তেমনি এক প্রেক্ষাপটে দাড়িয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম হচ্ছি।

আইন-শৃংখলা বলতে যা বোঝায় তার ছিটে ফোটাও অবশিষ্ট নেই বাংলাদেশে। পুলিশ নামের কুকুরের মতো ভয়ংকর নির্বোধ একটি বাহিনী আছে বাংলাদেশে যা প্রভূর ইশারায় নিমিষেই দন্ত-নখর ছড়িয়ে নির্দেশিত প্রতিপক্ষের ঘাড় মটকে দিতে পারঙ্গম। ন্যূনতম বুদ্ধি-বিবেচনা এখানে একেবারেই মূল্যহীন। প্রভূর পদলেহনেই ভক্তি, পদাঘাতেই মুক্তি।

ন্যায়-নীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু এখানে আজ মূল্যহীন। আইন আছে, ভয়ংকর যতসব আইন, যদিও আইনের শাসন নির্বাসিত হয়েছে অনেক আগেই। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ফ্রি-স্টাইলে চলছে আজ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চলছে দুষ্টের লালন ও শীষ্টের দমন, চলছে জুডিশিয়াল কিলিং, চলছে ফ্যাসিজমের মহোতসব।  বাঘা বাঘা যতসব ভয়ংকর অপরাধীদের মুক্তি দেয়া হয়, আটক করা হয় নিরীহ ছাত্র-জনতা, আটক হয় ভিন্নমতের নেতা-কর্মী, মিডিয়া কর্মী, আটক হয় বোরখাওয়ালী গৃহবধু, আটক করা হয় বেড়রুম থেকে, আটক হয় আলেম-কামেল, আটক হয় ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কারাগারে নির্যাতনে নির্যাতনে মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয় সাধারণ তৌহিদী জনতার, প্রেসিডেন্সিয়াল ক্লেমেন্সিতে মুক্তি পায় খুনের আসামী। সরকারের প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্যান্য মন্ত্রী-আমলা কামলারা নির্দিধায় হত্যার নির্দেশ দেয়, পুলিশের অন্যতম প্রধান কর্তাবাবু দেয় “শিবির দেখা মাত্র গুলি”র আদেশ। রাজপথে শত শত পথচারী আর গণমাধ্যম চোখের সামনে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আহতদের ফেলে রাখা হয় রক্তক্ষরণে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।

এভাবেই চলছে বাংলাদেশ। এভাবেই হয়তো চলবে আরো অনেকটা সময়, যতক্ষণ না জামায়াত-শিবির পূর্ণ করে সরকারের মনোবাঞ্ছা। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার অজুহাত খুঁজে মরছেন শেখ হাসিনা। অজুহাত খুঁজছেন জামায়াত-শিবিরের রক্ত সাগরে পূণ্যস্নান সেরে ‘বন্দে মাতারম’ ধ্বনিতে ভারতমাতাকে প্রণাম জানাতে। প্রস্তুত সরকারের আজ্ঞাবহ রাম ও বামপন্থী মিডিয়া, প্রস্তুত শত শত ক্যামেরার চোখ। প্রস্তুতি নিয়ে আছে ওরা কয়েক বছর ধরেই। তবু শিবিরকে ঘায়েল করতে মোক্ষম হাতিয়ারের সন্ধ্যান থেকে যায় আধারেই।

মাঝে মাঝে ক্যামেরার ফাঁদে ধরা পরে অস্ত্রহাতে অভ্যস্ত নিশানায় লক্ষ্যভেদী ছাত্রলীগের ভয়ংকর ক্যাডার। ধরা পরে চাপাতি হাতে মাংশের কিমা বানাতে অভ্যস্ত কসাইয়ের হাত। ধরা পরে অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বিশ্বজিতের লাশ। ধরা পরে লগি-বৈঠার আঘাতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার পরে শিবির কর্মীর লাশের উপর পৈশাচিশ নৃত্য। হলে হলে তল্লাশী শেষে আবিস্কৃত হয় ছাত্রলীগের অস্ত্রের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। তবু শিবিরের অস্ত্র থেকে যায় সেই তিমিরেই।

শিবিরের মিছিল নামলেই হা-রে-রে-রে রবে হামলে পড়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-পুলিশ লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। গুলি, টিয়ারসেল আর গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় জামায়াত-শিবির। প্রাণ বাঁচাতে গুলির বিপরীতে এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকা ইটা হাতে শিবির কর্মীদের বালির বাঁধে চলে সুনামী ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা, অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পরে, মাথা-হাত-পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়, পঙ্গু করা হয়, তবুও শিবিরের অস্ত্র গুপ্তধনের মতো থেকে যায় অধরাই।

তবু হাল ছাড়ে না মিডিয়াগুলো। হলুদ সাংবাদিকতার ফ্যাক্টরিতে কলেরার মতো কলকল রবে স্রোতের ধারায় ভেসে যায় পত্রিকার পাতা, ভেসে যায় টিভি স্ক্রীণ। পুলিশের গ্রেনেড, গুলি, টিয়ারসেলে শিবিরের গন্ধ খুঁজে বেড়ায় মিডিয়াগুলো। এক পক্ষের গুলি বর্ষণকে বার বার ‘গোলাগুলি’ কিংবা ‘গুলি বিনিময়’ শব্দের আড়ালে শিবিরকে সন্ত্রাসী প্রমাণের চেষ্টা চলে বাংলানিউজ২৪.কমের মতো আবাঙ্গাল অনলাইন পত্রিকায়। কিংবা সিভিল ড্রেসে পুলিশের সাথে থাকা আওয়ামী পুলিশ, যুবলীগ ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের অস্ত্রসমেত ছবিটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিবির বলে চালিয়ে দেয়ার কসরতও কম দেখা যায় না ইন্ডেপেন্ডেন্ট ইয়েলো জার্নালিজমে বিশ্বাসী ইনডেপেন্ডেন্ট টিভির মতো গণমাধ্যমকে।

শিবিরের হাতে অস্ত্র দেখার খায়েশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই ক্ষমতারোহনের দিন থেকেই। একের পর এক নেতা গ্রেফতার হন, আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা গনমাধ্যমের বন্ধুদের নিয়ে অধীর অপেক্ষায় থাকে, ঐ বুঝি বেরিয়ে এলো শিবিরের গুপ্তধন। কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মুজাহিদ, সাঈদী, নিজামী, গোলাম আযম একের পর এক শীর্ষ নেতাদের জেলে পুরে ওরা অপেক্ষায় থাকে, এই বুঝি অস্ত্র হাতে বেড়িয়ে এলো শিবির, এই বুঝি বেধে গেল সশস্ত্র লড়াই, এই বুঝি জঙ্গীবাদের তমকা সেটে নিষিদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিল জামাত-শিবির। শেখ হাসিনার সে খায়েশ আজো পূরণ করেনি শিবির তবুও একটা অনিবার্য গজবের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছেন শেখ হাসিনা।

সবকিছুই বোঝে হাসিনা, শুধু এটুকু বোঝেন না, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুশৃংখল ছাত্র সংগঠনের হাতে অস্ত্র উঠে আসলে তা হবে কতটা ভয়ংকর। শিবির এমনই একটি দল যাদের হারানোর কিছু নেই, যারা বিশ্বাস করে লড়াইয়ে মৃত্যু হলে পাবে শহীদী মর্যাদা, লাভ করবে কাঙ্খিত জান্নাত, আর বেঁচে থাকলে পাবে গাজীর সম্মান। তাই ওরা লড়াই করে গাজী হওয়ার দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে যদিও শাহাদাতই কাম্য সবার।

শেখ হাসিনার এটাও বোঝা উচিত, প্রাচীন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যার রয়েছে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে শাখা, অন্য দেশের ইসলামী আন্দোলনের সাথেও যার রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক, যার ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা শুধুমাত্র নেতার অঙ্গুলি নির্দেশের অপেক্ষায়, তাদের পক্ষে অস্ত্র সংগ্রহ করা আদৌ কঠিন নয়। ইচ্ছে হলেই জামায়াত-শিবির অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে, ইচ্ছে হলেই অস্ত্র হাতে আওয়ামী জাহেলিয়াত মুক্ত করতে পারে বাংলাদেশ। তবে জামায়াত শিবির চায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চালিয়ে গণরায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি কল্যাণমূলক ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন।

শেখ হাসিনার মনে রাখা উচিত, খাঁচাবন্দী সিংহকে দূর থেকে ভেংচি কেটেই আনন্দ, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বিক্ষুব্ধ করে খাঁচা ভেঙ্গে বাইরে আসতে বাধ্য করা কেবল নির্বোধদেরই শোভা পায়।

 

নিরস্ত্র শিবিরের হাতে পুলিশ অসহায়, অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য করা কতটা যুক্তি সঙ্গত শেখ হাসিনা ভেবে দেখতে পারেন।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন