যুদ্ধকালীন সালাতের পদ্ধতি

প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বিদ্যা অর্জন করা ফরজ এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এর মানে এই নয় দূনিয়ার যাবতীয় জ্ঞানের ভান্ডার হতে হবে একজন মুসলমানকে। তবে জ্ঞানার্জনের মধ্যে একজন মুসলমান হিসেবে আল্লাহ নির্দেশিত যে সকল হুকুম আহকাম মেনে চলতে হয় তা সঠিকভাবে রাসূল (সাঃ) এর দেখানো পদ্ধতিতে পালন করার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগ্রহণ করা সর্বাগ্রে ফরজ। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলমানই সালাতের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন জানেন না এমনটি কখনো কখনো যে নামাজের আরকান পর্যন্ত সংক্ষেপ করার সুযোগ আছে সে সম্পর্কে অনেকরই ধারণা নেই এবং এসব মৌলিক বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়া হয় না। আসুন আজ আমরা আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম রচিত ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থের ইবাদত অধ্যায়ের সালাত সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ থেকে জেনে নেই যুদ্ধকালীন তথা শত্রুভীতিকালীণ নামাজের পদ্ধতিসমূহঃ

তোমাদের নামাযগুলো সংরক্ষণ করো, বিশেষ করে এমন নামায যাতে নামাযের সমস্ত গুণের সমন্বয় ঘটেছে আল্লাহর সামনে এমনভাবে দাঁড়াও যেমন অনুগত সেবকরা দাঁড়ায়। অশান্তি বা গোলযোগের সময় হলে পায়ে হেঁটে অথবা বাহনে চড়ে যেভাবেই সম্ভব নামায পড়ো। আর যখন শান্তি স্থাপিত হয়ে যায় তখন আল্লাহকে সেই পদ্ধতিতে স্মরণ করো, যা তিনি তোমাদের শিখিয়েছেন, যে সম্পর্কে ইতিপূর্বে তোমরা অনবহিত ছিলে। সূরা আল-বাকারা: ২৩৮-২৩৯)

আর যখন তোমরা সফরে বের হও তখন নামায সংক্ষেপ করে নিলে কোন ক্ষতি নেই। (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, কাফেররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে। কারণ তারা প্রকাশ্যে তোমাদের শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আর হে নবী! যখন তুমি মুসলমানদের মধ্যে থাকো এবং (যুদ্ধাবস্থায়) তাদেরকে নামায পড়াবার জন্য দাঁড়াও তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দলের তোমার সাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া উচিত এবং তারা অস্ত্রসস্ত্র সঙ্গে নেবে। তারপর তারা সিজদা করে নিলে পেছনে চলে যাবে এবং দ্বিতীয় দলটি, যারা এখনো নামায পড়েনি, তারা এসে তোমার সাথে নামায পড়বে। আর তারাও সতর্ক থাকবে এবং নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র বহন করবে। কারণ কাফেররা সুযোগের অপেক্ষায় আছে, তোমরা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিস পত্রের দিক থেকে সামান্য গাফেল হলেই তারা তোমাদের ওপর অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে। তবে যদি তোমরা বৃষ্টির কারণে কষ্ট অনুভব করো অথবা অসুস্থ থাকো, তাহলে অস্ত্র রেখে দিলে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু তবুও সতর্ক থাকো। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ‌ কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সূরা আন-নিসা : ১০১-১০২

প্রথম পদ্ধতিঃ

শত্রুভীতি কালীন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সালাতের পদ্ধতি ছিলো এই যে, শত্রু যদি তাঁর ও কিবলার মাঝে অবস্থান করতো, তাহলে তাঁর সঙ্গী-সাথী সকল মুসলমানকে তাঁর পিছে সালাতে দাঁড় করাতেন। তিনি তকবীর বলতেন, তাঁরাও সবাই তকবীর বলতো। তিনি রুকুতে যেতেন, তারাও সবাই রুকূতে যেতো। তিনি রুকূ থেকে মাথা উঠিয়ে দাঁড়াতেন তারাও সবাই মাথা তুলে দাড়াতো। তারপর তিনি যখন সাজদায় যেতেন, তখন তাঁর নিকটবর্তী (সামনের) সফ তাঁর সাথে সাজদায় যেতো আর পেছনের সফ শত্রুমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। এভাবে যখন তিনি পয়লা রাকাত শেষ করতেন এবং দ্বিতীয় রাকাতের জন্যে সোজা হয়ে দাড়াতেন তখন পিছের কাতারের লোকেরা সামনে চলে যেতো আর সামনের লোকেরা পিছের কাতারে চলে আসতো। পিছের কাতারের লোকেরা যাতে ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাকাতে দু’টি সাজদা করবে পারে, সেজন্যেই তারা সামনে আসতো, যেমনটি পয়লা রাকাতে সামনের কাতারের লোকেরা করেছিল। এভাবে ইমামের সাথে উভয়ের নামায সমান হতো।
অতপর রসূলুল্লাহ সা. যখন দ্বিতীয় রাকাতের রুকূতে যেতেন, তখন পয়লা রাকাতের মতো সামনে-পিছের সকলেই তাঁর সাথে রুকূতে যেতো। কিন্তু তিনি যখন দ্বিতীয় রাকাতের সাজদায় যেতেন, তখন সামনের কাতারের লোকেরা তাঁর সাথে সাজদায় যেতো আর পিছের কাতারের লোকেরা শত্রুর মোকাবেলায় দাড়িয়ে থাকতো। অতপর তিনি যখন তাশাহ্‌হুদের জন্য বসতেন, তখন পিছের কাতারের লোকেরা দুটি সাজদা সেরে নিতো এবং তাঁর সাথে তাশাহ্‌হুদে শরীক হতো। অতপর সবাই একত্রে তার সাথে সালাম ফিরাতো।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ

শত্রু যদি কিবলার দিকে না হয়ে অন্য কোন দিকে হতো তাহলে তিনি সাথিদের দুই গ্রুপে ভাগ করে নিতেন। একটি গ্রুপ শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতো। অপর গ্রুপটি তাঁর সাথে এক রাকাত সালাত আদায় করে শত্রুর মোকাবেলায় দাড়িয়ে থাকা গ্রুপের স্থলে গিয়ে দাড়াতো এবং দাড়িয়ে থাকা গ্রুপটি এসে তাঁর সাথে দ্বিতীয় রাকাতে শামিল হয়ে এক রাকাত নামায পড়তো। অতপর তিনি সালাম ফিরাতেন আর তারা উভয়গ্রুপ পালাক্রমে নিজস্বভাবে এক রাকাত করে পড়ে নিতো।

তৃতীয় পদ্ধতিঃ

শত্রু কিবলার দিকে না হয়ে অন্য দিকে হলে আবার কখনো তিনি সাথিদের দুই গ্রুপ করে নিয়ে প্রথম গ্রুপকে নিয়ে পয়লা রাকাত পড়ে দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়াতেন। তাঁর এই দাঁড়ানো থাকা অবস্থাতেই এই প্রথম গ্রুপ নিজেরা আরেক রাকাত পড়ে নিতো এবং সালাম ফিরিয়ে চলে যেতো। এ সময় দ্বিতীয় গ্রুপ এসে তাঁর সাথে দ্বিতীয় রাকাতে শরীক হতো। এদের নিয়ে দ্বিতীয় রাকাত পড়ে যখন তিনি তাশাহ্‌হুদের জন্যে বসতেন তখন তারা উঠে দাড়াতো এবং রয়ে যাওয়া এক রাকাত নিজেরা পূরা করে নিতো। এসময় তিনি তাদের এক রাকাত শেষ করার জন্যে তাশাহ্‌হুদের বৈঠকে অপেক্ষা করতে থাকতেন। অতপর তাদেরও তাশাহ্‌হুদ শেষ হলে তিনি তাদের নিয়ে একত্রে সালাম ফিরাতেন।

৪র্থ পদ্ধতিঃ

আবার কখনো এমনটি করতেন যে, একটি গ্রুপকে নিয়ে দুই রাকাত পড়ে তাশাহ্‌হুদের জন্য বসতেন। এসময় সে গ্রুপটি নিজেরা সালাম ফিরিয়ে চলে যেতো এবং তাদের স্থলে অপর গ্রুপটি আসতো। তখন তিনি তাশাহ্‌হুদের বৈঠক থেকে দাঁড়িয়ে এদেরকে সাথে নিয়েও দুই রাকাত পড়াতেন অতপর সালাম ফিরাতেন। এ পদ্ধতিতে তাঁর হতো চার রাকাত আর সাহাবাগণের হতো দুই রাকাত করে।

৫ম পদ্ধতিঃ

আবার কখনো তিনি একটি গ্রুপকে সাথে নিয়ে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলতেন। পুনরায় আরেকটি গ্রুপকে সাথে নিয়ে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাতেন। এ পদ্ধতিতে তাঁর সালাত হতো দু’বার।

৬ষ্ঠ পদ্ধতিঃ

কখনো তিনি একটি গ্রুপকে নিয়ে এক রাকাত পড়তেন। এ গ্রুপটি এক রাকাত পড়েই চলে যেতো। দ্বিতীয় রাকাত এরা পড়তোনা। অতপর আরেকটি গ্রুপ এসে তাঁর সাথে দ্বিতীয় রাকাত পড়তো। এ পদ্ধতিতে তাঁর হতো দুই রাকাত এবং সাহাবাগণ মাত্র এক রাকাত এক রাকাত পড়তেন।

ইবনে আব্বাস, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, তাউস, মুজাহিদ, হাসান বসরি কাতাদা হাকাম ও ইসহাক ইবনে রাহুইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মযহাব হলো প্রত্যেক গ্রুপ এক রাকাত এক রাকাত করে পড়বে।

**** যুদ্ধকালীন পদ্ধতিগুলো ভালো করে জেনে নিতে আজই বিশ্বস্ত আলেমদের স্বরনাপন্ন হোন এবং যে কোন দূর্যোগে বিপর্যয়ে আল্লাহকে সঠিক নিয়মে স্মরণ করতে নিজে শিখুন অন্যকেও শেখান।jihad

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন