জাহেলিয়াত

উনুনের মতো উত্তপ্ত মরু পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ফিরে এলাম মক্কায়। ঘরে ঢুকেই যে খবর পেলাম তা মেজাজটাকে মরুভূমির তপ্ত বালুর চেয়েও বেশী উত্তপ্ত করে তোলে। আমার মতো শরীফের উরসে কন্যা জন্মেছে, এর চেয়ে অপমানের আর কি হতে পারে? মেজাজটাকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না, মুহুর্তেই হাত চলে যায় তরবারীর বাটে। তবু হাত থেমে যায়, সবার ওজর আপত্তির কাছে আপাতত পরাজিত হয় ক্রোধ। অথচ মুখ দেখানোর পথ নেই কোন, কিভাবে দাড়াবো মেয়ের বাবা হয়ে আবু জেহেল, আবু লাহাব, শাইবা ওতবার দরবারে?

দিনে দিনে দিন কেটে যায়, অক্ষম আক্রোশ কুড়ে কুড়ে খায় আমায়। তবু মেয়েটার বয়স বেড়ে দাড়ায় ছ’য়ে। ভান করি সব কিছু ভুলে গেছি, যদিও  আছি অপেক্ষায় সুযোগের, যে কোন মূল্যে শোধরাতে হবে অপমান। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, হয় দুঃসহ প্রতীক্ষার অবসান।

মামা বাড়ী বেড়ানোর নাম করে মেয়েটিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি বাড়ী থেকে। মাঝ পথে উট থামিয়ে নেমে পড়ি মরুভূমির তপ্ত বালুর মাঝে। খুঁড়ে চলি দ্রুত হাতে, কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটি চাঁপা দিতে চাই বুকের মাঝে পুষে রাখা অপমান। প্রখর সূর্যকিরণে ঘাম ঝরে ঝরে মিলিয়ে যায় হাওয়ায় , তবু ক্লান্তি নেই কোন, আজ যে চরম প্রতিশোধের দিন। সারা শরীর ধুলোয় মাখামাখি, তবু অবসর নেই কোন। বাবার শ্রমে চোখ ভিজে যায় কন্যার, কাছে এসে দাড়িতে জমা ধুলো ঝেড়ে ঝেড়ে বলে, “খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা”? নিজেকে শক্ত করি তবু, কিছুতেই হৃদয় আর্দ্র হওয়ার সুযোগ নেই, আভিজাত্যের কাছে ভাবাবেগের নেই কোন প্রশ্রয়, অপমানের শোধ নেয়ার দিন আজ, মর্যাদা আর আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের দিন আজ।

কতটা নিষ্ঠুর হলে, কতটা নির্দয় হলে সন্তানকে নিজ হাতে কবর দেয়া যায়! পশুরাওতো এভাবে হত্যা করে না নিজের সন্তান। যে শিশু বাবা বাবা রবে ছুটে এসেছে এতটুকু স্নেহের আশায়, যে শিশু বাবার সাথে বেড়াতে যেতে সওয়ার হয়েছে মরুভূমির জাহাজে, আলতো হাতে যে ঝেড়ে দিয়েছে ধুলোমলিন বাবার দাড়ি, সে শিশুকে নিজের হাতে কবর দিয়েছি। অথচ আজ নিষ্পাপ মায়াবী মুখটি ভেবে ভেবে চোখের জলে দাড়ি ভিজিয়ে বুক চাপরাই। মা, মাগো, একটি বার এসে বুড়ো খোকার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে যাও না মা।

দয়ার নবী, “জানি কোন ক্ষমা হয় না এ নিষ্ঠুরতার, কোন অনুকম্পার যোগ্য আমি নই, তবু দয়া করুন, অধমের জন্য একটু দোয়া করুন, যেন অনুশোচনায় অনুশোচনায় দ্বগ্ধ হওয়ার চেয়ে দ্রুততর হয় জীবনাবসান। আর যে সইতে পারি না, আর যে বইতে পারি না পাপের পাহাড়”।

নবীজির মন আর্দ্র হয়ে আসে, করুণার পরশ বুলান সাহাবীর গায়ে, করেন আশ্বস্ত , “ইসলাম খতম করে দেয় জাহেলী সব অপরাধ”। জাহেলিয়াতের শৃংখল ভেঙ্গে যে ফিরে এসেছে খোদার আশ্রয়ে, জাহেলিয়াতের সব অন্যায়, আভিজাত্যকে পায়ে দলে যে ফিরে এসেছে ইসলামের ছায়ায়, সে ইসলাম মুক্ত করে জাহেলি অপরাধের বোঝা, মিটিয়ে দেয় সকল পাপের হিসেব।

যতদিন বেঁচে থাকি খোদা, ভুলেও যেন মুখ না ফেরাই আর সে অভিশপ্ত অতীতে। শক্তি দাও, শক্তি দাও প্রভূ আমৃত্যু যেন চলতে পারি দৃঢ়পায়ে সুপথে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“জাহেলিয়াত” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. Roksana বলেছেন:

    প্রায় চৌদ্দশত বছর আগের সেই ঘটনা আজও অশ্রু ঝরায়। আল্লাহ্‌ কতো মহান ক্ষমাশীল আর মানুষ কতো পাপী! আল্লাহ্‌ পথ ইসলাম আনুসরনের মাধ্যমে সেই পাপী মানুষ(?)পরিণত হয় আশরাফুল মাখলুকাতে।

    [উত্তর দিন]

  2. Roksana বলেছেন:

    প্রায় চৌদ্দশত বছর আগের সেই ঘটনা আজও অশ্রু ঝরায়। আল্লাহ্‌ কতো মহান ক্ষমাশীল আর মানুষ কতো পাপী! আল্লাহ্‌র পথ ইসলাম আনুসরনের মাধ্যমে সেই পাপী মানুষই(?)পরিণত হয় আশরাফুল মাখলুকাতে।
    [উত্তর দিন]

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    অথচ আমরা বার বার ভুলে যাই আমাদের দায়িত্ব, জড়াতে চাই নিজেদেরকে জাহেলিয়াতের মায়াজালে। কত দূর্ভাগা আমরা। আল্লাহ আমাদের সকল দূর্বলতা ক্ষমা করে সঠিক পথের উপর সুদৃঢ় রাখুন।

    [উত্তর দিন]

  3. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন:

    অসাধারন কিছু কথা, চোখে পানি এসে গেল । আসলে ইদানিং নাস্তিক আর তথাকথিত মুক্তমনা দের ভিরে এমন করে ভাবাটাও জেন অন্যায় । গালগালাজ আর মৌলবাদী বলেতে ছারবে না এক সেকেন্ড ও । আনুগত্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা এই পোস্ট টা পরে দেখার অনুরোধ রইল 🙂

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন