‘বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি’

'বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি' বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কথোপকথন প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে তার পদত্যাগ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশের বর্ষীয়ান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সঙ্গে। পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাতকারটি পাঠকদের উদ্দেশ্য উপস্থাপন করা হলো :

রেডিও তেহরান : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম নিয়মিত বিচারের নানা দিক নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে স্কাইপে আলাপ করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিচারপতি নিজামুল হক বলেছেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে রায়ের জন্য সরকার পাগল হয়ে গেছে। সরকার শুধু একটা রায় চায়।’ তো, ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা নিয়ে এর আগে যে প্রশ্ন বিরোধীদলের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল, স্কাইপে কথোপকথনে কি তার সত্যতা প্রমাণিত হলো?
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : দেখুন! একজন বিচারপতির কাছ থেকে আমরা কেউই এ ধরনের আচরণ আশা করি না। বিচারপতি- বিচার করবেন, কী বিচার করবেন সে বিষয়টি তার স্ত্রীও জানবেন না। কিন্তু এখানে তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে বিচারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন! তিনি বলেছেন, সরকার তাদেরকে যে কোনোভাবে কনভিনস/কনভিক্ট করতে চায়। এ ধরনের কথা বলা তো উচিত না। কারণ বিচারপতিদের একটি (Code of Conduct)আছে।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ২০০০ সালে বিচারপতিদের জন্য সংবিধানের ৯৬(৪) অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি আচরণবিধি (Code of Conduct) তৈরি করেছিলেন। আর সেই Code of Conduct-এ বলা আছে, এ ধরনের কোনো কথা বা আলোচনা করা যায় না। সেক্ষেত্রে এইভাবে আলোচনা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং সেই কাজটি বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম করেছেন। তবে, এ প্রসঙ্গে আমি এ কথাটাও বলবো যে, উনি পদত্যাগ করে অন্তত বিচারপতিদের মান-সম্মানটা বজায় রেখেছেন। We are happy to realise that he should not continue and accordingly he has resigned.

 রেডিও তেহরান: অনেকেই এই ঘটনাকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি’ বলে অনেকে মনে করছেন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেছেন?

 ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : আমিও মনে করি, এটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা। কারণ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আমি আজ ৫৩ বছর প্রাকটিস করছি। এই ৫৩ বছরের ইতিহাসে এ রকম ঘটনা কখনো ঘটেনি। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমকে নিয়ে এবার যেটা হলো তা অকল্পনীয়। সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে অতীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি এবং আশাকরি ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা কখনও ঘটবে না। কেননা জীবনের এতটা বছর সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আছি সেখানে কোনো একটা বদনামের ঘটনা ঘটলে আমাদের গায়েও লাগে। তবে উনি যে পদত্যাগ করেছেন এটাই ভাগ্যের কথা।

 রেডিও তেহরান : অনেকে আবার এ অভিযোগও করছেন যে, হ্যাকিং করে ট্রাইব্যুনাল প্রধানের কথোপকথন প্রকাশ- যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করারই চেষ্টা এবং বিচারাধীন বিষয়ে কথোপকথন প্রকাশ করাটা গুরুতর অপরাধের শামিল। এই অভিযোগ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

 ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : দেখুন! বিষয়টি সম্পর্কে আমি অতটা Detail জানি না। তবে কেউ যদি সন্দেহ করেন এ রকম কিছু সেটা একেবারে অহেতুক নয়। কারণ বিচারের সময় দুই পক্ষের কোনো একটি পক্ষ আছে, যারা চায় না- এই বিচার হোক। আর অন্য একটি পক্ষ চাচ্ছে যে, ডিসেম্বরের মধ্যে বিচার হোক। ফলে যারা চাচ্ছে না বিচার হোক কিংবা বিচার বিলম্বিত হোক তারা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের সফলতা পাবে। তবে বিচার তো আর ডিসেম্বরের মধ্যে হবে না আর যাই বলুক। ১৬ ডিসেম্বরের কথা তো বাদই দিলাম ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেও বিচার হওয়া সম্ভব নয়। আর সে দিক থেকে তারা সফল।

 রেডিও তেহরান : মিডিয়ায় এসেছে- সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিচারের রায় হবে এমন কথা বলা হয়েছে। তো একটি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সরকার কিভাবে এই আগাম রায়ের বিষয়টি বুঝতে পারছেন বা বলছেন?

 ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : দেখুন! আপনি যে কথাটা বললেন-তা ঠিকই বলেছেন, আমরাও এ কথা শুনেছি। তবে এ কথাটি বলা কখনো উচিত নয়। একটা বিচার চলছে সেখানে আগে থেকে প্রেডিক্ট করা- কেউ বলছেন, ওই সময়ের মধ্যে রায় হবে আবার কেউ কেউ বলছেন, ওই সময়ের মধ্যে ফাঁসি হয়ে যাবে। এ ধরনের কথা বলা একেবারেই উচিত না, এটা একদিকে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর একইসঙ্গে বিচারের জন্য ও জুডিশিয়ারির জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে মানুষের বিশ্বাস থাকবে না জুডিশিয়ারির ওপর। সাধারণ মানুষ ভাববে-তারা সবাই জানে কার কী শাস্তি হবে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা খারাপ ধারণার জন্ম নেবে। কারণ তারা তো এতো বিস্তারিত জানে না। তারা মনে করবে বিচারের ব্যাপারে আগে থেকে তাহলে সব ব্যবস্থা ঠিক হয়ে আছে।

 রেডিও তেহরান : আপনি বলেছেন, বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করে অন্তত বিচার বিভাগের মান সম্মান কিছুটা রক্ষা করেছেন। তো আমরা জানতে চাইব-এই কথোপকথনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যত কি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

 ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : দেখুন প্রভাব পড়তে পারে এটা Totally depend করবে কে next judge হচ্ছেন। তার ওপরই নির্ভর করছে বিষয়টি। আমাদের জাজ আছেন ৮১/৮২ জন কিন্তু সব judge তো সমান না। কোন জাজ বিচারটাকে কিভাবে নেবে আর নিজামুলের জায়গায় কাকে নেয়া হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করছে। তবে যে জাজই আসুন না কেন, তিনি কিভাবে নেবেন তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। তবে আমরা ভালো কিছু আশা করি, দেখা যাক কী হয়! #

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন