সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে ঈদ ও শবে ক্বদর পালন কতটা যৌক্তিক?

ঈদ মোবারক! পূর্ণ একটি মাস সিয়াম সাধনার পরে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণের সেই অপার আনন্দময় পবিত্র সময় আমাদের সামনে।  আল্লাহ আমাদের ৩০ দিনের সিয়াম সাধনা কবুল করুন, আমাদেরকে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত দান করুন এবং পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনা যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ আমাদের উপর ফরজ করেছেন সেই তাক্বওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

এবার সৌদি আরবেও রমজান ৩০ দিনে পূর্ণ হয়েছে। ১৮ তারিখ পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতি এলাকায় ঈদ উদযাপিত হয়েছে, ১৯ তারিখে সৌদি আরবসহ বেশ কিছু দেশে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, বাংলাদেশসহ বাকী দেশগুলোতে ২০ আগস্ট ২০১২ রোজ সোমবার ঈদ উদযাপিত হবে।  ফলে এবারও বিশ্বে ৩ দিনব্যাপী ঈদ পালিত হচ্ছে।

সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে রমযানের রোজা রাখা, শবে ক্বদর পালন এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উদযাপন নিয়ে ইদানিং বেশ আলোচনা চলছে, বিশেষ করে মিডিয়ায় ৩ দিনব্যাপী বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের খবর সচিত্র সম্প্রচারিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে ইসলামী অনুষ্ঠানাদি পালনে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার অনেকেই পাল্টা যুক্তি দিয়ে তা খন্ডন করছেন। উভয় পক্ষই যুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোরআন-হাদীসকেই সাক্ষী মানছেন। তবে আমার কাছে ঈদ যেমন আনন্দের, ঈদ উদযাপন নিয়ে ভিন্ন মতের কারনে দেশে ৩ দিনব্যাপী ঈদ উদযাপিত হওয়াও কম আনন্দের নয়। আর আনন্দের বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটাও আনন্দের, তাই স্বাভাবিকভাবে আমিও এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরছি।

বিশ্বব্যাপী একই দিনে ঈদ উদযাপন করা যায় কি না তা নিয়ে আলেমসমাজও গবেষণা করছেন যদিও ঐক্যমত হওয়া আজো সম্ভব হয় নি। বিশেষ করে ওআইসি রীতিমতো একই দিনে ঈদ উযপান করাটাকে তাদের প্রধান এজেন্ডায় পরিণত করেছে, বিশ্বব্যাপী ৩ দিন ঈদ উদযাপতি হওয়ায় শোকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিলেন ওআইসির মহাসচিব, যদিও বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার ব্যাপারে তাদের কার্যক্রম শূণ্যের কোঠায়। বিশ্বব্যাপী একই দিনে ঈদ উদযাপনের পূর্বে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোকে একই খেলাফতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা আসুন আগে চোখ ফেরাই ঈদ বিষয়ে ইসলামে কি নির্দেশনা রয়েছেঃ

ইসলামের নির্দেশনা হলো চাঁদ দেখে রোজা শুরু করতে হবে এবং চাঁদ দেখেই ঈদ উদযাপন করতে হবে।

” আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযানের কথা আলোচনা করে বললেনঃ চাঁদ না দেখে তোমরা সাওম পালন করবেন না এবং চাঁদ না দেখে ইফতার করবে না। যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে তার সময় (ত্রিশ দিন) পরিমাণ পূর্ণ করবে।” বোখারী ১৭৮৫

“আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) অথবা বললেন, আবুল কামিস (সাঃ) বলেছেনঃ তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম আরম্ভ করবে এবং চাঁদ দেখে ইফতার করবে। আকাশ যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে শা’বানের গণনা ত্রিশ দিন পুরা করবে।” বুখারী ১৭৮৮

“ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেনঃ আমরা উম্মী জাতি। আমরা লিখি না এবং হিসাবও করি না। মাস এরূপ অর্থাৎ কখনো উনত্রিশ দিনের আবার কখনো ত্রিশ দিনের হয়ে থাকে।” (বুখারী ১৭৯২)

অনেকে প্রশ্ন করেছেন চাঁদ দেখা বলতে এখানে কোন এলাকার চাঁদ বলা হয়েছে। প্রশ্নটা আমার কাছে বণী ইসরাইলী প্রশ্নের মতোই মনে হয়, কেননা কোরআন শুধুমাত্র আরববাসীদের জন্য নাজিল হয় নি, ইসলাম শুধুমাত্র আরববাসীদের দ্বীন নয় বরং সমগ্র মানবজাতিরই দ্বীন। তাই ইসলাম যখন কোন দিক নির্দেশনা দেয় তখন তা গোটা মানবজাতির কথা বিবেচনা করেই দেয়। এখানে চাঁদ দেখার কথা বলে শুধু আরববাসীদের চাঁদ দেখার কথা বলা হয় নি বরং প্রত্যেক এলাকার জন্যই একই নির্দেশনা। যে এলাকায় চাঁদ দেখা যাবে সে এলাকা সেই অনুযায়ী রোজা রাখবে এবং ঈদ করবে। এক্ষেত্রে বহুবিধ হাদীসগ্রন্থে উল্লেখিত হাদীসটি স্মরণ করা যেতে পারেঃ

“মূসা ইবন ইসমাঈল …..কুরায়ব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মে ফাযল বিনত আল-হারিশ তাঁকে মু’আবিয়ার নিকট শাম (সিরিয়া) দেশে প্রেরণ করেন। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া পৌঁছে, তার প্রয়োজন পূর্ণ করি। আমি সিরিয়া থাকাবস্থায় রামাযানের চাঁদ ওঠে এবং আমরা উহা জুমু’আর রাত্রিতে অবলোকন করি। এরপর রামাযানের শেষের দিকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি। ইবন আব্বাস (রাঃ) আমাকে সফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন এবং বিশেষ করে চাঁদ দেখা সম্পর্কে বলেন, তোমরা রামাযানের চাঁদ কখন দেখেছিলে? আমি বলি, আমি তা জুমু’আর রাতে দেখেছি। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তুমি নিজেও কি তা দেখেছিলে? আমি বলি, হ্যা এবং অন্যান্য লোকেরাও দেখে এবং তারা রোযা রাখে, এমনকি মু’আবিয়াও রোযা রাখেন। তিনি বলেন, আমরা তো তা শনিবারে দেখেছি। কাজেই আমরা ত্রিশ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রোযা রাখব অথবা শাওয়ালের চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রেখে যাবো। আমি জিজ্ঞাসা করি, মুআ’বিয়ার দর্শন ও রোযা রাখা কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, না। আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরূপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।” (আবু দাউদ ২৩২৬) (মুসলিম ২৩৯৬)

হাদীসটি দ্বারা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে অঞ্চলভেদে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোজা ও ঈদ ভিন্ন হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি এলাকার সকলকেই চাঁদ দেখতে হবে বা প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় বা গ্রামে গ্রামে চাঁদ দেখতে হবে। বরং এ ক্ষেত্রে অনেক আলেমের মত হচ্ছে একজন নামাজীর যতটুকু পথ অতিক্রম করলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতে হয় তথা কসর নামাজ আদায় করতে হয় ততটুকু দূরত্বকে ব্যাসার্ধ কল্পনা করে উক্ত এলাকাবাসী একই চাঁদ দেখার উপর আমল করতে পারে। এক্ষেত্রে নিম্নের হাদীসটি উল্লেখযোগ্যঃ

“আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একদা কয়েকজন আরোহী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর খেদমতে হাজির হয়ে বলেন যে, তারা গতকাল চাঁদ দেখেছেন। তখন তিনি তাদেরকে রোযা ভংগ করতে এবং পরের দিন সকালে ঈদের নামায আদায় করতে বলেন।” আবুদ দাউদ (১১৫৭)

এখানে আগের হাদীসে দেখা গেল যে সিরিয়ার চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে মদীনায় রোজা পালন ও ঈদ উদযাপন হয় নি আবার অল্প দূরত্বের কারনে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রাসূল (সাঃ) রোজা ভেঙ্গেছেন এবং ঈদ পালন করেছেন।

বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে অনেকেই চোখে চাঁদ দেখাটাকে অবৈজ্ঞানিক মনে করেন এবং সৌদি আরবের সাথে তাল মিলিয়ে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করতে চান। তবে তাদের এ দাবীটাই যে অবৈজ্ঞানিক তা তাদের চিন্তায় কেন যে আসে না তা বিস্ময়কর। মুসলিম বিশ্বকে সৌদি সময়ের সাথে বেঁধে দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টার আদৌ কোন যুক্তি নেই বরং ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত ইসলামের অগ্রগতি, উন্নতি, মুসলামনদের স্বার্থ সংরক্ষণ, জালিমদের হাত থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা তথা সামগ্রিক ইসলামী কর্মকান্ডে। কিন্তু ঐক্যের নাম নিয়ে একই সময়ে ইবাদতসমূহ পালন করার প্রচেষ্টায় ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্যই সৃষ্টি হচ্ছে। কোন পাগলও এ কথা বলবে না যে সৌদি আরবের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একই সময়ে নামাজ পড়তে হবে। তাহলে জাপানীদের ফজরের নামাজ পড়তে হবে জোহরের সময়ে লন্ডনে পড়তে হবে এশার সময়, আমেরিকায় ফজরের নামাজ হবে আসরের সময়ে। আবার যদি সৌদি আরবের চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করতে হয় তবে জাপানীদেরকে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুপুরের পরে, ততক্ষণ তারা কি করবে? না খেয়ে থাকবে? নাকি খেয়ে দেয়ে সৌদি আরবের ঘোষণার অপেক্ষা করবে এবং ঘোষণা শোনার সাথে সাথে নিয়ত করে পরক্ষণেই আবার সূর্যাস্তে ইফতার করবে? নাকি সৌদি আরবের সূর্য ডোবা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? যারা ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞান রাখেত তারা দেখতে পাবেন যে পৃথিবীর সর্বত্র একই সময়ে চাঁদ উদিত হয় না এবং একই সময়ে দিন গণনা হয় না এবং একটা দেশের সময়কেই প্রামান্য সময় হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যারা বিজ্ঞান পুজারী তারাও এটা জানেন যে প্রশান্ত মহাসাগরে ১৮০ ডিগ্রী অক্ষাংশে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অবস্থিত যার দুপাশে মাত্র কয়েকগজের ব্যবধানেও দুটো ভিন্ন দিন কল্পনা করা হয়, দুটো ভিন্ন তারিখ গণনা করা হয়। তাহলে অহেতুক হিজরী দিন তারিখ নিয়ে এতো তর্ক কেন?

বিজ্ঞানের উন্নতির কারনে অনেকেই এখন সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেলে মোবাইলে খবর পাওয়ার ভিত্তিতে রোজা রাখছেন, আবার অনেকে বলেন পৃথিবীর যে কোন স্থানে প্রথমে চাঁদ দেখা গেলেই রোজা হবে। কিন্তু তা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয়। চাঁদ নিয়ে গবেষণার ইতিহাস প্রায় ৪ হাজার বছরেরও পুরনো। চাঁদের গতিপথ, চাঁদের গ্রহণ, আমাবস্যা, পূর্ণিমা প্রভৃতির প্রায় নিখুঁত হিসেব নিকেশ করা হচ্ছে হাজার বছর ধরে। আজকের দিনেই বলে দেয়া সম্ভব যে এক হাজার বছর পরে কোন এক তারিখে চাঁদের অবস্থান কেমন হবে। তবে তারপরও মাসের প্রথম চাঁদটি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেমন বিজ্ঞানের গবেষণা অনুযায়ী (নিচে চিত্র ৩টি দেখুন) এ বছরের ঈদুল ফিতরের চাঁদের যে অবস্থান তাতে ১৭ তারিখে পৃথিবীর কোথা থেকেও  চাঁদ দেখতে পাওয়ার কথা নয়, বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে তো চাঁদ দেখার প্রশ্নই আসে না। তবুও বিস্ময়করভাবে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতি এলাকায় চাঁদ দেখা গেছে এবং ১৮ তারিখে সেখানে ঈদ উদযাপিত হয়েছে, যদিও এরও পশ্চিমের দেশ তথা সৌদি আরবে চাঁদ দেখা যায় নি। তাহলে শুধু বিজ্ঞানের উপর কেন ইসলাম নির্ভর করে নি তা স্পষ্ট। আবার পৃথিবীর যে কোন যায়গায় চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে ঈদ উদযাপন করা হলে সৌদি আরবকে কিন্তু ১৮ তারিখেই ঈদ করতে হতো, যদিও তারা তা করে নি। তাহলে ওআইসি যে নিয়মকানুন করছে তা কিন্তু তারা নিজেরাই মানছে না। একই দিনে যদি ঈদ উদযাপনে আল্লাহর আগ্রহ থাকতো তবে চান্দ্র মাস গণনা করা হতো না, সৌর মাসেরই নির্দেশ দেয়া হতো ইবাদত বন্দেগীর জন্য।

এবার ইসলামের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো যা ঈদ ও শবে ক্বদরের বিষয়টিকে বুঝতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। ইসলাম একটি সার্বজনীন দ্বীন, এখানে যা কিছু বিধানাবলী দেয়া হয়েছে তা সাধারণের বোধগম্য করে দেয়া হয়েছে এবং কোনকিছুকেই বিজ্ঞানের জটিল জটিল আবিস্কারের উপর নির্ভরশীল রাখা হয় নি। কিছু উদাহরণ নিম্নে দেয়া হলোঃ

প্রথমেই আসা যাক কোরআন প্রসঙ্গে। আল্লাহ পবিত্র কোরআন শরীফ নিজেই রক্ষণাবেক্ষণের ওয়াদা করেছেন এবং তা তিনি বৈজ্ঞানিক পন্থায় নয় বরং খুবই সাধারণ অথচ সবচেয়ে কার্যকর পন্থায় সংরক্ষণ করছেন।

“এই যিকির-ইহাকে আমরাই নাযিল করিয়াছি আর আমরা নিজেরাই ইহার হিফাযতকারী”। সূরা আল-হিজ্‌র, আয়াত ৯

একবার ভেবে দেখুন কোরআন কিন্তু পাথরে খোদাই করে রাসূল (সাঃ)এর কাছে নাজিল করা হয় নি ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল হযরত মুসা (আঃ) এর কাছে। পাথরে খোদাই করে নাজিল করার পরও তা কিন্তু অবিকৃতভাবে টিকে থাকে নি এবং নবীর উম্মতেরা তার যথাযথ হেফাজত করে নি, মান্য করেনি। প্রকৃতপক্ষে জাগতিক যে কোন উপায় উপকরণের মাধ্যমেই কোরআনকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হোক না কেন তা সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনকে হেফাজতের জন্য সবচেয়ে সহজ ও সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তথা মানুষের হৃদয়ে কোরআনকে খোদাই করে দিয়েছেন। আজ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ হাফেজে কোরআন রয়েছেন যারা কোরআনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বর্ণ মুখস্ত করেছেন এবং কোরআনকে উত্তম পন্থায় সংরক্ষণ করছেন। আল্লাহ না করুন, আজ যদি পৃথিবীতে কোন বিপর্যয় নেমে আসে, বিজ্ঞান প্রযুক্তির সকল কারিশমা যদিও ধুয়ে মুছেও যায় সুনামিতে, তবে পৃথিবীতে হয়তো কোন কিতাবেরই চিহ্ন থাকবে না, শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনই টিকে থাকবে, যদি মানুষের অস্তিত্ব থাকে, আর মানুষের অস্তিত্ব না থাকলে কোরআনের অস্তিত্ব থাকারও কোন প্রশ্ন নেই। এভাবেই দেড় সহস্র বছর ধরে কোরআন অবিকৃত অবস্থায় বিশ্বের প্রতিটি কোনে কোনে সংরক্ষিত রয়েছে হাফেজের কোরআনদের অন্তরে, যা টিকে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।

এবার আসুন নামাজ প্রসঙ্গেঃ

প্রতিটি গ্রামেই দু’য়েকজন আরজ আলী মাতুব্বর বাস করেন, যারা অশিক্ষিত হলেও বেশ জ্ঞান রাখেন এবং তারা যে কতটা জ্ঞানী তা প্রমাণের জন্য সহজ উপায় হিসেবে আল্লাহর বিভিন্ন বিধানাবলী নিয়ে কটাক্ষ করা পছন্দ করেন। তেমনি এক আরজ আলী আমার গ্রামে বেশ পরিচিত ছিলেন। তার জ্ঞানের খড়তাপে গ্রামবাসীকে ঝলসে দিতেই নিত্যদিন যত কসরত তার। একদিন প্রশ্ন করলেন, আল্লাহ ৬ হাজার ৬শত ৬৬টি আয়াত নাজিল করতে পারলেন, আর একটা মাত্র আয়াতে বলে দিতে পারলেন না যে নামাজ ৫ ওয়াক্ত ফরজ?” না, তিনি নিজে এতে বিস্মিত নয়, বরং আল্লাহর কিতাবের একটা খুঁত যে তিনি ধরতে পেরেছেন এবং এ প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি যে সাধারণ মুসলমানদের বিব্রত করতে পেরেছেন এতেই তার আনন্দ। হ্যা, তার এ প্রশ্নে সেদিন জ্ঞানী-গুণী অনেককেই বিচলিত হতে দেখেছি।

কিন্তু কেন কোরআনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরজের কথা বলা হয় নি? কারন কোরআন যদিও এমন এক সময়ে নাজিল হয়েছে যখন সাধারণ মানুষ পৃথিবীকে সমতল ভাবতো, যখন আমেরিকার মতো বিশাল একটি মহাদেশ আবিস্কৃত হয় নি, এন্টার্কটিকার মতো বরফাচ্ছাদিত আরেকটি মহাদেশ ছিল কল্পনারও অতীত, ঠিক তখন কোরআন ৫ ওয়াক্ত নামাজকে ফরজ করে আয়াত নাজিল না করে ইসলামের সার্বজনীনতা ও বিজ্ঞানময়তাই প্রমাণ করেছে। কোরআনে নামাজের ব্যাপারে কিছু দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যে নিদর্শন গুলো দেখে দৈনিক সালাত আদায় করতে হবে, যেমনঃ

“নামায কায়েম কর সূর্য পশ্চিমে ঢলিয়া পড়ার সময় হইতে রাত্রির অন্ধকার আসন্ন হওয়ার সময় পর্যন্ত। আর ফজরে কুরআন পাঠের স্থায়ী নীতি অবলম্বন কর; কেননা ফজরের কুরআন পাঠে উপস্থিত থাকা হয়। আর রাত্রিবেলা তাহাজ্জুদ পড়। ইহা তোমার জন্য নফল। সেদিন দূরে নয়, তোমার রব্ব তোমাকে মাকামে মাহমুদে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবেন।” (সূরা বনী-ইসরাইল, আয়াত ৭৯)

“নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্ত সময় আর রাত্রির কিছু অংশ অতীত হওয়ার পর।” (সূরা হূদ, আয়াত ১১০)

“আর তোমার রব্ব-এর হামদ সহকারে তাঁহার তসবীহ পড়িতে থাক সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রিকালে আবার তাসবীহ কর এবং দিনের প্রান্তসমূহে।” (সূরা ত্বা-হা, আয়াত ১৩০)

“অতএব আল্লাহর তসবীহ কর যখন তোমাদের সন্ধ্যা হয় আর যখন সকাল হয়। তাঁহারই জন্য হামদ আসমান ও জমিনে আর তাঁহার তাসবীহ কর দিনের শেষ ভাগে আর যখন তোমাদের দ্বিপ্রহর হয়।” (সূরা রূম, আয়াত ১৬-১৮)

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ যদিও মাত্র একটি আয়াতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করার কথা বলতে পারতেন, তথাপি তা না বলে নামাজের কিছু সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পৃথিবীর অনেক স্থান আছে যেখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অসম্ভব, ফজর হতে না হতেই মাগরিব হয়ে যায়, কিংবা মাগরিব হতে না হতেই ফজরের সময় হয়ে যায় এমন জটিল সময় রয়েছে পৃথিবীর বেশ কিছু স্থানে। ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করার ঘোষণা তাদের জন্য আদৌ ইনসাফপূর্ণ হতো না, বরং নফল এবাদতের অপশন রাখা হয়েছে এসকল সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য। মূলত নামাজ ৫ ওয়াক্ত ফরজ করার বিধানটি হাদীসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

“ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলিয়াছেন, জিবরাইল (আ) দুইবার আমার দ্বারা আল্লাহর ঘরের নিকট নামায পড়াইয়াছেন। প্রথম দিন যোহরের নামাজ এমন সময় পড়াইলেন, যখন সূর্য কেবলমাত্র পশ্চিম দিকে ঢলিয়াছে এবং ছায়া জুতার এক ফিতার বেশী লম্বা হয় নাই। তারপর আসরের নামায পড়াইলেন এমন সময়, যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া উহার দৈর্ঘের সমপরিমাণ হইয়াছিল। উহার দৈর্ঘের পর মাগরিবের নামায পড়াইলেন তখন, যখন রোযাদার ইফতার করে। অতঃপর এশার নামায পড়াইলেন পশ্চিম দিকে সূর্যাস্তের লালিমা বিলীন হইয়া যাওয়ার পরই। আর ফজরের নামায পড়াইলেন তখন, যখন রোযাদারের প্রতি পানাহার হারাম হইয়া যায়। দ্বিতীয় দিন তিনি আমাকে যোহরের নামায পড়াইলেন তখন, যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া উহার সমপরিমাণ হইয়াছিল। আর আসরের নামায সেই সময় পড়াইলেন, যখন প্রত্যেকটি জিনিসের ছায়া উহার দ্বিগুণ ছিল। মাগরিবের নামায পড়াইলেন এমন সময়, যখন রোযাদার ইফতার করে। এশার নামায পড়াইলেন রাত্রির এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর এবং ফজরের নামায পড়াইলেন খুব ভালোভাবে ফর্সা হইয়া যাওয়ার পর। অতঃপর জিবরাঈল (আ) আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেনঃ হে মুহাম্মাদ! নবী-রাসূলগণের নামায পড়ার ইহাই সময় আর নামাযের সঠিক সময় হইতেছে এই দুই সময়ের মাঝখানে।” (আবু দাঊদ ও তিরমিযী)

এবার ভাবুন, পৃথিবী থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, মানুষ আবার আদিম যুগের মানুষের মতো বনে বাদারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সময়ের কাটা থমকে আছে, সময়, মাস, বছর হিসাব করার মতো পৃথিবীতে কোন ক্যালেন্ডার নেই, ঘড়ি নেই। এমন পরিস্থিতিতেও একজন মুসলমানের পক্ষে হিসেব করা সম্ভব যে কবে কবে রমজান শুরু হবে, কবে ঈদ হবে, কবে কোরবানী হবে। আর তা সম্ভব হবে যদি চন্দ্র ও সূর্য দেখে সময় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়।

“লক্ষ্য কর, আমরা রাত ও দিনকে দুইটি নিদর্শন স্বরূপ বানাইয়াছি। রাতের নিদর্শনটিকে আমরা জ্যোতিহীন বানাইয়াছি। আর দিনের নিদর্শনটিকে উজ্জল করিয়া দিয়াছি, যেন তোমরা তোমাদের রব্ব-এর অনুগ্রহ সন্ধান করিতে পার এবং মাস ও বৎসরের হিসাব জানিতে পার। এইভাবে আমরা প্রতিটি জিনিসকেই আলাদা আলাদাভাবে বৈশিষ্টমন্ডিত করিয়া রাখিয়াছি।” (সূরা বনী-ইসরাঈল, আয়াত ১২)

ইসলাম সার্বজনীন জীবন বিধান, এবং ইসলামের বিধানাবলী পালনের জন্য সহজ করে দেয়া হয়েছে। তাই যে কোন সাধারণ মানুষের পক্ষেই হিসেব করা সম্ভব যে কবে রমযান শুরু হবে, কবে ঈদ হবে। সৌদি আরবের সময়ের সাথে মিলিয়ে রোযা রাখার যে রীতি চালু হয়েছে ইসলামের এ সকল সাধারণ ঘটনাবলীর সাথে তা মোটেই খাপ খায় না। ইসলামের বিধান এজন্য সহজ করে দেয়া হয়েছে যে মৌলিক বিধানাবলী পালনের জন্য যেন পন্ডিতদের পেছনে পেছনে সবাইকে সারাদিন ঘুরে মরতে না হয় বরং নিজেরাই যেন অতি সহজে বিধানাবলী জানতে পারে। এখন একজন অশিক্ষিত লোকও যদি পশ্চিমাকাশে নতুন চাঁদ দেখতে পায় তবে তার পক্ষে মাস গণণা করা মোটেই অসম্ভব নয়। ঠিক তেমনি বছর গণনা করাও সম্ভব এবং সম্ভব রোজা, ঈদ, কুরবানী, শবে ক্বদরের দিনক্ষণ নিজে নিজেই ঠিক করে নেয়া।

 

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন