গৃহযুদ্ধের চেয়ে হরতাল শ্রেয়!

আওয়ামী সরকারের সোয়া তিন বছরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ শতাধিক গুম সফল হয় যারমধ্যে গত তিন মাসেই ২৩ জন এবং দুই সপ্তাহে সিলেট বিএনপি ও ছাত্রদলের তিনজন গুম হয়।   ১৮ এপ্রিল ২০১২ তারিখ গুম  হওয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবীতে আজ তৃতীয় দিনের মতো দেশব্যাপী চলছে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। গত বরিবারের মধ্যে ইলিয়াস আলীকে জীবিত ফেরত না দিলে লাগাতার হরতালের হুমকি বিএনপি আগেই দিয়েছিল, তবু রবিবারের ১ দিনের হরতাল ঘোষণায় সরকারী শিবিরে অনেকটা স্বস্তির শীতল হাওয়া বয়ে যেতে শুরু করে। এমনকি বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম গুম হওয়ার পরে দীর্ঘ দু’টি বছর অতিবাহিত হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে কার্যত তেমন কোন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয় নি। সঙ্গত কারনে এম. ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবীতে ১ দিনের হরতাল ঘোষণায় আওয়ামী লীগ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তাদের ধারণা ছিল, এক-দু’ দিনের হরতালকে যদি পুলিশী দমন নির্যাতনের মাধ্যমে প্রতিহত করা যায় তবে চৌধুরী আলমের মতো ইলিয়াস আলীর মতো শক্তিশালী জনপ্রতিনিধিকেও হজম করে ফেলা সম্ভব হবে, এভাবেই সম্ভব হবে বিএনপির নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে মেধাশূন্য করা।

কিন্তু অনেক দেরীতে হলেও বিএনপি তাদের বিপদ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে। চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী, এরপর হয়তো ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নজরুল ইসলাম কিংবা তারেক রহমান যে কেউ চলে যেতে পারে গুমের তালিকায়। তাই বিএনপি অতীতের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর হতাশাকে দূরে ঠেলে ঠিকই অস্তিত্ব রক্ষার মূল আন্দোলনে ফিরে এসেছে। একদিনের হরতালকে টেনে টেনে তৃতীয় দিনে নিয়ে এসেছে, হয়তো এটিকে ঠেলে দেয়া হবে আরো সামনের দিনগুলোতে। অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে বিএনপি, তাৎক্ষণিকভাবে হরতালের ঘোষণা দিয়ে হরতাল বাড়ানোর ফলে সরকার কোনঠাসা হয়ে পড়ছে, ঠিক যেভাবে সরকার কোনঠাসা করে রেখেছে ষোলকোটি বাংলাদেশীকে।

গণবিচ্ছিন্ন বুদ্ধীজীবী, যাদের মাখামাখি মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের সাথে, যারা বাংলাদেশের খেয়ে বিশ্ব নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, তাদের অনেকে তৃতীয় দিনের হরতালে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে হরতালের আদৌ কোন যৌক্তিকতা আছে কি না তা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ টকশো সেরে ফেলেছেন। কিন্তু কেন হরতাল করা হলো, হরতালকে কেন তৃতীয় দিনে টেনে আনা হলো তা মোটেই আমলে নিচ্ছেন না। এদের অনেকেই হরতালের দ্বিতীয় দিনে বিশ্বনাথের গণআন্দোলনের রিপোর্টটি দেখেনি। কিভাবে হাজার হাজার মানুষ সরকারী পেটোয়াবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে, কিভাবে দু;দুটো তাজা প্রাণ পুলিশের গুলি বুকে ধারণ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, কিভাবে মৃত্যু পরোয়া না করে সাধারণ জনতা নব্য বাকশালী পুলিশবাহিনীকে ধাওয়া করে ব্যারাকে পুশব্যাক করেছে, কিভাবে ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার জন্য সিলেটের এককোটি মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত বলে শ্লোগান দিচ্ছে। এরা কি জনগণ নয়? এরা কি সবাই বিএনপির নেতা? মোটেই নয়, একটি উপজেলায় হাজার হাজার নেতাকর্মী থাকে না, বরং এদের কয়েক ডজন বাদে সবাই সাধারণ মানুষ। এসকল সাধারণ মানুষ তাদের জীনববাজী রেখে শুধুমাত্র ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবীতে হরতালে আসে নি বরং এরা রুখে দাড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।

আর যারা সাধারণ মানুষের পক্ষ নিয়ে গলাবাজি করছে তাদের উচিত তাদের প্রভূরাষ্ট্র আমেরিকার দিকে তাকানো। আমেরিকা কথায় কথায় বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক অবরোধ করে, খাদ্য সাহায্য বন্ধের হুমকি দেয়। মায়ানমারে গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের জন্য আমেরিকা মায়ানমারে অর্থনৈতিক অবরোধ করে, সাহায্য বন্ধ করে দেয়। যে জনগণের মুক্তির জন্য এ অবরোধ করা হয় সরাসরি এ অবরোধে ক্ষতিগ্রস্থ কিন্তু সাধারণ মানুষই হয়, এটা যেনেও জাতিসংঘ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে থাকে। কারণ একটাই, এরফলে ঐসকল রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী সরকারগুলো রাষ্ট্রপরিচালনায় ব্যর্থ হয়, ফলে জনগণের সাময়িক ক্ষতি হলেও শেষ পর্যন্ত জনগণের মুক্তিই নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী বাকশালী আওয়ামী সরকারকের অপহরণ, গুম, ক্রসফায়ার, হত্যা, নির্যাতন তথা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান হরতাল আন্দোলনে সাময়কিভাবে জনগণ ক্ষমিতগ্রস্থ হলেও শেষপর্যন্ত জনতারই জয় হয়, উপকারভোগ করে সাধারণ মানুষই।

বলে রাখা ভালো, আমি নিজেও হরতাল বিরোধী একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু হরতালের যে আদৌ কোন প্রয়োজন নেই এ কথা বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসের যতগুলি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সবগুলোর পেছনেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা “ধ্বংসাত্মক” এই হরতালের। এক কথায় বললে বলা যায়, বাংলাদেশ নামক দেশটির সৃষ্টিই হয়েছে হরতালের মাধ্যমে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে যে হরতাল অসহযোগ আন্দোলনগুলো হয়েছে তা-ই বাংলাদেশ স্বাধীনতার মূলে। স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ শহীদ হয়ে যাবে এমন চিন্তা মাথায় থাকলে বাংলাদেশ কোনদিনই পাকিস্তানী নরপিশাচদের থাবা থেকে মুক্তি পেত না, অর্জিত হতো না অহংকারের লাল-সবুজ পতাকা। আর স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কথা যদি ধরা হয় তবে স্বৈরাচারী এরশাদকে ক্ষমতা থেকে টেনে টেনে ডাস্টবীনে ছুড়ে ফেলার জন্যও মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে এই হরতাল। কিংবা যদি আমরা বিএনপির ১৫ ফেব্রুয়ারীর প্রহসনের নির্বাচনের কথা ধরি, সে নির্বাচনের বিরুদ্ধে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবীতে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলগুলোর হরতাল, অসহযোগ আন্দোলনই ছিল প্রধান অস্ত্র।

তাই বাংলাদেশে থেকেও যাদের চোখ পড়ে থাকে ইউরোপ আমেরিকার পার্লামেন্টে, যারা দেশের সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশায় অনভ্যস্ত, যারা দেশের আনাচে কানাচে, নদী-খাল-ডোবায় ভেসে থাকা লাশের সারি দেখেও চোখ বুজে থাকে, যারা পথে প্রান্তরে গুম হয়ে যাওয়া অজ্ঞাত পরিচয় লাশের গন্ধেও নির্বিকার তাদের পক্ষেই চলমান গুমবিরোধী হরতালের যৌক্তিকতা খোড়াখুড়ি করা সম্ভব।

স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী সরকারের অব্যাহত দমন নীপিড়নে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ মৃত্যুকূপের কিনারে পৌঁছে গেছে। অনিবার্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁ!চতে হলে এদেশের মানুষকে স্বৈরাচার পতনের জন্য বীরবিক্রমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবী। আর ভঙ্গুর গণতান্ত্রীক দেশসমূহে স্বৈরাচারী সরকারকে জাতির ঘাড় থেকে আছড়ে ফেলার মাত্র দু’টি পথই খোলা থাকে, এক) হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ আন্দোলনের মতো কঠোর কর্মসূচী, দুই) গৃহযুদ্ধ। এ দু’টি পথের বিকল্প কোন পথ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বিকৃত গণতান্ত্রিক দেশে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই সাধারণ জনগণকেই ভাবতে হবে সিন্দাবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরাচারকে আছড়ে ফেলতে তারা কোন পথটি বেঁছে নেবেন, হরতাল-অবরোধ-অসহযোগ আন্দোলন, নাকি গৃহযুদ্ধ। বুন্ধিমানেরা গৃহযুদ্ধের চেয়ে হরতালকেই লক্ষ কোটি বার শ্রেয় মনে করবে নিশ্চয়।

Be Sociable, Share!

One Reply to “গৃহযুদ্ধের চেয়ে হরতাল শ্রেয়!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।