ভার্সিটি পড়ুয়া সন্তানকে লেখা মায়ের চিঠি

বাবা ছোটন,

আশাকরি পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহপাকের কৃপায় কুশলে আছ। বেশ কিছুদিন যাবত তোমার কোন খবর না পাইয়া ব্যাকুল মনে এই চিঠি লিখিতে বসিয়াছি, আশাকরি পত্র পাওয়া মাত্র জবাব দিয়া তোমার এই জনম দুঃখিনী মাকে চিন্তামুক্ত রাখিবা।

ঢাকা হইতে তোমার বন্ধু রহমত দেশে ফিরিয়া আমাদের বাড়ী দেখা করিয়া গিয়াছে। তাহার কাছে তোমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিয়া মনটা ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। তুমি নাকি কোন দলের ছাত্র নেতাদের সাথে ওঠাবসা শুরু করিয়াছ শুনিয়া আমার মন দমিয়া গিয়াছে। তোমার মরা বাপের কসম লাগে, রাজনীতি নামের নর্দমা হইতে একশ হাত দূরে থাকিবা, রাজনীতি তোমার মত গরীরের সন্তানের জন্য না, রাজনীতি বড়লোকদের কারবার, তোমার মত গরীর ঘরের সন্তানদের ঘাড়ে পা রাখিয়া ওরা মন্ত্রীমিনিস্টার হইবে, জুতার তলায় পিষিয়া কে মরিল কি বাঁচিল তাতে ওদের কিছুই যায় আসে না।

তোমার মনে কষ্ট লাগে এমন কোন কথাই তোমাকে কোনদিন শুনাই নাই, দিনের পর দিন রাতের পর রাত কত কষ্টে জীবন কাটাইয়াছি তাহা তোমার বড় বুবু দেখিয়াছে, তোমারে কোনদিন বুঝিতে দেই নাই, দেই নাই এই জন্য যে তোমার মায়ের দুঃখের কথা শুনিয়া তোমার কলিজা ভাঙ্গিয়া যাইবে, মানুষের মত মানুষ বানাইবার যে স্বপ্ন তোমারে নিয়া, তাহা বাতাসে মিলাইয়া যাইবে ভাবিয়া চুপ করিয়া রহিয়াছি, কিন্তু ছাত্রনেতা নামের শকুনেরা যখন তোমার মাথার উপর চক্কর দিতে শুরু করিয়াছে তখন অল্পকিছু তোমারে না শুনাইয়াও উপায় নাই।

তুমি যেদিন ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকা গিয়াছিলে, সেবার তোমার হাতে টাকা তুলিয়া দিবার জন্য তোমার বড় বুবু বাড়ী বাড়ী ধারকর্য চাহিয়াছে, কাহারো কাছ থেকে একটা পয়সাও মেলে নাই, উপায় না দেখিয়া তোমার অভিমানী বুবু তাহার বিবাহের জন্য তুলিয়া রাখা আমার কানের দুল বিক্রি করিয়া টাকা জোগাড় করিয়াছিল। বলিয়াছিল, ছোটন ভার্সিটি হইতে পাশ করিয়া যেই দিন চাকুরী লইবে সেই দিন আমাদের আর কোন দুঃখ থাকিবেন না। যেই দিন ছোটন তার মা আর বুবুকে সোনার চাদরে ঢাকিয়া দিবে সেইদিন পৃথিবীর কোন কষ্ট আর ছুঁইতে পারিবে না।

অথচ কত দূর্ভাগা তোমার এই বড় বোনটা, এইবারও বিয়েটা ভাংগিয়া গেল, গরীব ঘরের কালো মেয়ে, যৌতুক ছাড়া কে আর বিবাহ করিতে চায়। দিনে দিনে বয়স বাড়িয়া যাইতেছে মেয়েটার, দুই একটা চুলে পাকও ধরিয়াছে, আয়নার সামনে পাকাচুল দেখিয়া অভাগিনী লুকাইয়া লুকাইয়া কাঁদে, পাড়া-পড়শীর কান কথায় ঘর হইতে বাহির হওয়া বন্ধ করিয়া গৃহবন্ধী হইয়া রহিয়াছে আজকাল। এতকিছুর মাঝেও আশা একটাই, ছোটন একদিন খুব বড় হইয়া ঘরে ফিরিয়া আসিবে, ছোটনের সব পাওয়াতে না পাওয়ার কোন বেদনাই আর আমাদের কারো বুকে বাঁজিবে না। রাজনীতিবিদ নামের হায়েনাদের হাতে তুমি আমাদের সেই স্বপ্নগুলি তুলিয়া দি্ও না।

রহমত যেদিন তোমার খবর লইয়া আসিয়াছিল আমাদের বাসায়,  সারাদিন চুলায় আগুন জ্বালাইতে পারি নাই। খাবারের অভাবে তোমার ছোটভাই-বোনগুলি ছটফট করিয়াছে সারাদিন। রহমতের আনা বিস্কুটে কামড় বসাইয়া তোমার ছোটভাইটি না খাওয়ার কথা জানাইয়া দিয়াছে, তোমার বন্ধুর সামনে এতবড় লজ্জা আমরা ঢাকিতে পারি নাই। ভারী বুদ্ধিমান ছেলে রহমত, তোমার কাছ হইতে পাঁচশত টাকা ধার নিয়াছিল এই বাহানায় জোর করিয়া আমার হাতে গুজিয়া দিয়া পালাইয়া বাঁচিয়াছে। জানি, তোমার পক্ষে পাঁচশত টাকা ধার দেয়া অসম্ভব, তবু তোমার ছৌটভাইবোনের দিকে তাকাইয়া নির্লজ্জের মতো হাত পাতিয়া নিয়াছিলাম টাকাগুলি, শুধু এই ভাবিয়া যে একদিন তুমি বড় হইবে, খুব বড় চাকুরী লইবে যেদিন, ঠিকই তুমি এর উত্তম প্রতিদান দিয়া তোমার মায়ের লজ্জা ঢাকিয়া দিবে। তুমি আমাদের সেইসব স্বপ্নগুলি মিথ্যা হইতে দিও না বাবা।

জীবনে তোমার কাছে কিছুই চাহিনাই বাজান, জনমদুখিনী মা, অভাগিনী বড় বুবু আর অভাবের সাথে খেলিয়া খেলিয়া বাড়িয়া ওঠা তোমার ছোট ভাইবোনগুলির পানে চাহিয়া পড়া লেখায় মনোযোগী হও, ছাত্ররাজনীতি নামের মায়ের বুক খালি করা কষাইদের হাত হইতে মুক্ত থাকিয়া মানুষের মত মানুষ হইয়া বাড়ী ফিরিয়া আস এইটুকু শুধু তোমার কাছে চাওয়া।

চিঠি লিখিতে বসিলেই চোখ ঝাঁপসা হইয়া আসে, বয়স বাড়িয়াছে বলিয়া হয়তো চোখে কোন সমস্যা হইয়া থাকিবে। কখন জানি তোমার বাপজান আসিয়া ওপারে ডাকিয়া লইতে আসেন সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। তবু এক্ষুনি আমি তাহার ডাকে সাড়া দিয়া ওপারে যাইতে চাহি না, আমার ছোটনের চাকুরী না দেখিয়া পৃথিবী ছাড়িতে চাহি না, ছোটনের বেতনের টাকায় শাড়ি পড়িয়া পাড়া বেড়াইবার আগে মরিলেও যে আমি সুখ পাইব না। তুমি আমার সেইসব স্বপ্নগুলিকে মিথ্যা করিয়া দিও না।

ইতি

তোমার জনমদুঃখিনী মা।

(জানিনা, এই চিঠি আদৌ ছোটনের হাতে পড়েছিল কিনা, অশান্ত ভার্সিটিতে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিতে পেরেছে কবে কে বা?)

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ভার্সিটি পড়ুয়া সন্তানকে লেখা মায়ের চিঠি” লেখাটিতে 10 টি মন্তব্য

  1. helal বলেছেন:

    এতো করুন লেখা শেষ করলেন কিভাবে ভাই। অনুমতি দিলে সামুতে দিবো।

    [উত্তর দিন]

  2. পাশা বলেছেন:

    শান্ত ভার্সিটিতে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিতে পেরেছে কবে কে বা?

    [উত্তর দিন]

  3. শাহরিয়ার বলেছেন:

    @হেলাল ভাই, আপনার জন্য সবসময়ই অনুমোদন রইল। ধন্যবাদ।
    ধন্যবাদ পাশা ভাই, আসলেই শান্ত কিংবা অশান্ত সর্বক্ষেত্রেই ভার্সিটি জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।

    [উত্তর দিন]

  4. ABHIMANI বলেছেন:

    মায়ের এ আহাজারির শেষ হবে কি ?

    [উত্তর দিন]

  5. শাহরিয়ার বলেছেন:

    যতদিন রাজনীতিবিদরা শিক্ষাঙ্গণ থেকে তাদের হিংস্র দন্তনখরগুলো ফিরিয়ে না নেবে ততদিন এ আহাজারির শেষ নেই। ধন্যবাদ অভিমানী।

    [উত্তর দিন]

  6. মোস্তাফিজ চার্চিল বলেছেন:

    দুখ পাই, হতাশ হই। কারণ, তাদের বোধোদয় হয়না।

    [উত্তর দিন]

  7. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ চার্চিল ভাই, প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই লাশের খবর। আর কত লাশ পেলে রাজনীতিবিদেরা বাংলাদেশকে প্রশান্ত কাম্পাস দেবে?

    [উত্তর দিন]

  8. মুশিফক বলেছেন:

    নির্বাক হয়ে যাই । আপনার পত্রের ছোটন যেন বাংলাদেশের হতভাগ্য নিরীহ মানুষের প্রতিচ্ছবি ।
    সমগ্র বাংলাদেশ যেন ছোটেনর মােয়র স্বপ্নমাখা । হিংস্র রাজনীতির গ্রাস কুড়ে কুড়ে খায় আমার মা অার স্বপ্নকে ।

    [উত্তর দিন]

  9. শাহরিয়ার বলেছেন:

    বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রসমাজ লেজুরবৃত্তি করতে লজ্জাবোধ করে না, এটা বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামীদামী শিক্ষকগণ অশিক্ষিত-কুশিক্ষিত রাজনীতিবিদদের তৈলমর্দন করেন, এটা বিশ্বয়কর। আত্মসম্মানবোধ তবে আমরা আর কাদের কাছ থেকে শিখব?
    ধন্যবাদ মুশফিক ভাই।

    [উত্তর দিন]

  10. Redwan বলেছেন:

    Allah Ar Kono Mayer Buk Khali Koirona ai Annayvabe…

    Tumi Hayenader Sumuti Dew…

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন