ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ০৪

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি এক, অদ্বিতীয় ও মুখাপেক্ষীহীন। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশালী। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়্। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সকলই তাঁর। দৃষ্টির সামনে কিংবা দৃষ্টির আড়ালে যা কিছু রয়েছে সে সব কিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞান সীমা থেকে কোন কিছুই গোপন করা সম্ভব নয়, তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই রাতকে দিনের ভেতর প্রবেশ করার, দিনকে প্রবেশ করান রাতের আধাঁরে, তিনি জীবিত কে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন, মৃতকে বের করেন জীবিতের ভেতর থেকে। তিনি যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন, তাঁর হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। তিনি সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। তিনি না কাউকে জন্ম দিয়েছেন আর না তাঁকে কেউ জন্ম দিয়েছে, বরং তিনি জন্মমৃত্যু থেকে পবিত্র। তিনি জীবিত সবকিছুর ধারক।

পৃথিবীর জীবনই শেষ কথা নয়, সকল জীবিতকেই এক সময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, হাজির হতে হবে মহাপরামক্রমশালী আল্লাহর দরবারে। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে পার্থিব সকল বিষয়ের চুলচেরা হিসেব গ্রহণ করা হবে। যে অনু পরিমান ভালো কাজ করেছে তার প্রতিদান সে দেখতে পাবে আবার যে অনু পরিমাণ অন্যায় কাজ করেছে তার প্রতিদানও সে প্রত্যক্ষ করবে, সেখানে কারো প্রতিই যুলুম করা হবে না।

ইসলামের মূলভিত্তি তাওহীন। এ তাওহীদ থেকেই ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিগুলো উৎসারিত। ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালার নিরংকুশ আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেননা তাওহীদ ছাড়া ইসলামী অর্থনীতি একটি ফাঁকাবুলি মাত্র। যখনই এক আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করে নেয়া যায় তখনই তার প্রতি জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর পরের জীবনে যদি অটুট বিশ্বাস জন্মে তাহলে সবার মাঝেই জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি হতে বাধ্য। আর জবাবদিহিতা ইসলামী অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য বিষয়।

মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। এই পৃথিবীতে হাজারো প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, কেউ মানুষের চেয়ে শতগুণ বড়, কেউ বা মানুষের তুলনায় কোটি গুণ ক্ষুদ্র। কিন্তু সকল প্রাণীর মাঝে একমাত্র মানুষেরই রয়েছে অন্য সবকিছুর উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা। একমাত্র মানুষেরই রয়েছে উদ্ভাবনী ক্ষমতা যা দিনের পর দিন মানুষকে ক্রমোন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্যা কিছু প্রাণীর মাঝেও বুদ্ধিবৃত্তি দেখা যায় তবে তা নিতান্তই ছঁকে বাধা। সহস্র বছর ধরে বাবুই পাখি একই ভাবে বাসা বুনে যাচ্ছে, মৌমাছি মোচাকে মধু সাজিয়ে যাচ্ছে, কোন কিছুতেই নতুনত্ব নেই। কিন্তু মানুষ এ সবকিছু থেকে ভিন্ন। এসব কিছু বিবেচনা করলে বুঝকে অসুবিধা হয় না যে মানুষকে আল্লাহ তা’য়ালা ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর সেটি হলো মানুষ আল্লাহ প্রতিনিধি। যেহেতু আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সকল দোষ-গুণ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। আর তাই তিনি মানুষের স্বভাব-চরিত্র উপযোগী করে নাজিল করেছেন তাওরাত-যবুর-ইঞ্জিল-কোরআন। পাঠিয়েছেন অগনিত মহাপুরষ নবী-রাসূল (সাঃ)। তারা ছিলেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি।

বিশ্বের সকল মানুষও আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে মানুষ সবকিছু করার ক্ষমতা পাবে, সব কিছু ব্যবহারের সুযোগ পাবে, তবে তা হতে হবে আল্লাহ তা’লার নির্দেশিত পন্থায়। পৃথিবীর সব কিছুর একচ্ছত্র মালিকানা আল্লাহ তা’য়ালার, গাছপালা, পশুপাখি, জল-স্থল, পাহাড় পর্বতন সবকিছুই তাঁর, তবে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সব কিছুর উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা তিনি মানুষকে দিয়েছেন, অবশ্যই সে ক্ষমতার প্রয়োগ হবে আল্লাহ নির্দেশিত পথে।

মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি, তাই মানবজাতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। একে অন্যের সুখ-দুঃখে সমব্যাথী হবে। আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের দায়িত্ব ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। যার যা প্রাপ্য তাকে তা সুষ্ঠুভাবে বুঝিয়ে দেয়া, অন্যের হক নষ্ট না করা, হোক সে মানুষ পশু বা বনের গাছপালা। মানুষ এমন কিছুই করবে না যা মানব সমাজ ও জীবজগতের জন্য হুমকি হয়ে দাড়ায়, বরং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাবে গোটা পৃথিবী।

আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ শুধু ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষ্যান্ত হবে না বরং আদলের সাথে এহসানের চর্চাকেও উৎসাহিত করবে। যার যা প্রাপ্য তা দেয়াই যথেষ্ট নয় বরং সুন্দর ব্যবহার ইসলামের একটি সৌন্দর্য। সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে লেনদেন, আচার-আচরণ, বিচার-ফায়সালা তথা যার যা প্রাপ্য তার চেয়ে উত্তম কিছু দিতে ইসলাম শিক্ষা দেয়। ত্যাগ ও কুরবানীর মহিমায় সমুজ্জল ইসলামী সমাজ, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে একে অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া স্বার্থপরতাহীন ইসলামী সমাজ বৈশিষ্ট।

তাওহীদ, খেলাফত ও আদলের ভিত্তিতে একটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে, সে সমাজে ক্ষুধামুক্তির মূলমন্ত্র ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ০৪” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    এটাও ভালো লাগলো। বুকমার্কড।

    [উত্তর দিন]

  2. rafiqul Islam বলেছেন:

    ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    [উত্তর দিন]

  3. Rusafie বলেছেন:

    সব ই বুঝলাম ভাই, একমত ও হলাম কিন্তু লেখার কোথাও ব্যাঙ্কিং সম্পর্কিত তেমন কিছু দেখলাম না । এটি সম্পর্কে জানালে আনন্দিত হব । আর বাংলাদেশে ১০০ ভাগ ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যাঙ্কিং এর ব্যাবস্থা আছে কি?
    জানালে খুশি হব ।

    ধন্যবাদ ।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ।
    আসলে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে লেখাটা শুরু করেই হঠাৎ করেই অন্য কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তাই ভূমিকা লিখেই থেমে যেতে হয়। ইনশাআল্লাহ বাকী কয়েকটি পর্বে মূল বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করবো।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন