ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ০৩

ইসলামী অর্থনীতি সমাজকে কতটুকু স্বচ্ছল করতে সক্ষম তা আগেই পরিষ্কার করা দরকার । অনেকেরই ধারণা ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে গরীব ধনীর মাঝে আর কোন ভেদাভেদ থাকবে না, সমাজে কেউ দশ তলা আর কেউ গাছ তলায় অবস্থান করবে না, বরং সবাই প্রাচুর্যের মাঝে আয়েশী জীবন যাপন করবে। আমার জানা মতে ইসলাম আদৌ তেমন কোন স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখায় নি। বরং ইসলাম এমন একটি অর্থব্যবস্থার কথা বলে যে অর্থব্যবস্থা কায়েম হলে ধনী-গরীবের ব্যবধান সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। ইসলাম অন্তত এতটুকু স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখায় যে সমাজে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রতিটি নাগরিক পর্যাপ্ত সম্পদের অধিকারী হবে। ইসলাম অনাহারে না থাকার নিশ্চয়তা দেয়, সবার জন্য কোরমা-পোলাওয়ের নিশ্চয়তা দেয় না।

ইসলামী সমাজেও ধনী থাকবে, গরীব থাকবে, তবে দারিদ্র্যের চিত্র বর্তমান থেকে ভিন্নতর হবে। যেহেতু সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী নয়, সবার কর্মক্ষমতা এক নয়, সবার যোগ্যতা এক নয় তাই সবার পক্ষে একই রকম সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করা অসম্ভব, বরং বলা যায় এটি প্রকৃতি নিয়মবিরুদ্ধও বটে। তবে ইসলামী অর্থনীতিতে সকল মানুষের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে, সমান অধিকার বলতে কাজ পাওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে বংশ মর্যাদা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রতিবন্ধক হবে না বরং যোগ্যতার মাপকাঠিতে যে উতরে যাবে সে তার উপযোগী প্রয়োজনীয় কাজ পেয়ে যাবে। অর্থাৎ যোগ্যতা অনুযায়ী ইসলাম সবার জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয়। তাই এ ক্ষেত্রে শ্রেণীভেদ থাকাই স্বাভাবিক, তবে তা কোনভাবেই চরম দারিদ্র্যাবস্থার মাঝে কাউকে ঠেলে দেবেনা, বরং যত গরীবই হোক না কেন তারও মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত থাকবে।

ইসলামী অর্থনীতিকে বুঝতে হলে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ইসলামী অর্থনীতি এমনই একটি অর্থনৈতিক বিধান যার পরিপূর্ণ স্বাদ গ্রহণের জন্য ইসলামী সমাজব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরী। তেঁতুল গাছ থেকে আঙ্গুরের ফলন আশা করা যায় না, হয়তো আঙ্গুরের লতা তেতুল গাছের ডালে পেঁচিয়ে বেড়ে উঠতে পারে, তাতে তেতুলের গুণগত কোন পরিবর্তন আসে না। আঙ্গুরের ফলন পেতে হলে আঙ্গুরের চাষই সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তেমনি ইসলামী অর্থনীতির সুফল পেতে হলে সর্বাগ্রে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এ সবের বালাই নেই, সুনির্দিষ্ট কোন মতবাদের বাস্তবায়ন জরুরী নয় বরং সমাজে সুনির্দিষ্ট যে কোন মতবাদের অনুপস্থিতিই পুঁজিবাদের উপযুক্ত পরিবেশ। বলা যায় নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে যে অর্থব্যবস্থা চলে তাই পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা, কিংবা সব মতবাদের সংমিশ্রণে একটা জগাখিচুরী সমাজব্যবস্থাই মুক্তবাজার অর্থনীতির উপযুক্ত স্থান। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যিশু-খোদা-ভগবান এবং নাস্তিকতা সবকিছুকেই খুশী করা হয়, সবার মতবাদ থেকেই কিছু না কিছু নিয়মনীতিকে মেনে নেয়া হয় আবার কিছুই মেনে নেয়া হয় না। তাই এ মতবাদ বিশ্বথেকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে না পারলেও জনপ্রিয়তায় এটি সবসময় শীর্ষেই থেকে যাচ্ছে।

কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে চলে বিধায় এটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন। ইসলামী অর্থব্যবস্থার সুফল পেতে সমাজে ইসলামী অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সর্বাগ্রে জরুরী। ইসলামী অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যারা একটি সমৃদ্ধ সুখী সমাজের স্বপ্ন দেখেন তাদের উচিত মানুষের মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি অনুগত হওয়ার অনুভূতি জাগ্রত করা, ইসলামকে আন্তরিকভাবে মেনে চলার ক্ষেত্রে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা তথা ইসলামী সমাজবিপ্লবের জন্য মুসলমানদেরকে সর্বোতভাবে প্রস্তুত করা। আর ইসলামী সমাজব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে অর্থনৈতিক মুক্তি তথা দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে ইসলামী অর্থনীতিও চমক দেখাতে সক্ষম হবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ০৩” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    আবারো ধন্যবাদ।
    ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন।

    [উত্তর দিন]

  2. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন