দিন বদলে রাত্রি নামে

চারিদিকে পরিবর্তনের হাওয়া। সব কিছু ক্যামন বদলে যায় দিনে দিনে। যে ছেলেটি পথে ঘাটে লম্বা করে সালাম দিত, তাকে দেখি বুক টান করে হাটে সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে।

আগে সুবেহসাদেকের ঘোষণা দিত গৃহপালিত মোরগের দল। ইদানিং বিদ্যুতের আলোতে বিভ্রান্ত কোন কোন মোরগ অসময়েও ডেকে ওঠে, ভোর হওয়ার সুসংবাদ দেয়, যদিও অমন ভোরের অপেক্ষায় হয়তো ওত পেতে থাকে চোরছ্যাচরের দল। আবার কিছু কিছু মোরগতো  পুরোপুরি বিভ্রান্ত। দেহঘড়ির কাটা আগুপিছু করে ডাকাডাকির সময়ও পাল্টিয়ে ফেলেছে। আমাদের এ পাড়ার এক মোরগ নিয়ম করে প্রতি রাত সাড়ে এগারোটায় ডেকে ডেকে সকালের সুসংবাদ দেয়, ভারী অবাক ব্যাপার।

জানিনা এসব ক্লাইমেট চেঞ্জের লক্ষণ কি না। চারিদিকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সভা-সেমিনার সিম্পোজিয়ামের উৎসব। যে যেমন পারছে, পরিবর্তনে তার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে। কেউ বা পানির নীচে মন্ত্রীসভা বসাচ্ছে, কেউ কেউ সি-বীচে করছে মানব বন্ধন।

পরিবর্তন থেকে রেহাই পায় নি স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পত্তিও। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনে ধুম লেগেছে। কেউ কেউ পাথরে খোদাই করে নাম জারি করতে ব্যস্ত, কেউ বা গাইতি শাবল দিয়ে নামফলক তুলতে ব্যস্ত। এ যেন পরিবর্তনের মহোৎসব।

পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিছিয়ে নেই, শিক্ষা বলে কথা, তাদের তো এগিয়েই থাকতে হয়। শিক্ষাঙ্গণে শেখার পরিবেশের ব্যাপক পরিবর্তন, কেতাবী জ্ঞানের “বেইল নাই”, তাই চলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাকটিক্যাল ক্লাস, চলে খুনো-খুনি, চুলোচুলি, অস্ত্রের ঝনঝনানি। অথবা মন্ত্রীদের সুভাগমনে রাস্তায় রাস্তায় চলে ভিটামিন ডি সংগ্রাভিযান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ পোহাতে পোহাতে ভিটামিনের ভারে ঘাড়কুজো করে বাড়ী ফেরে শিক্ষার্থীর দল।

পরিবর্তন অফিস আদালত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সর্বত্র। সম্মানি না দিয়ে নিস্তার মেলেনা কোথাও। স্ব-উদ্যোগে কেউ ট্যাক্স দিতে চাইলে তাকেও মাশুল গুণতে হয়। ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিন) সংগ্রহের পথও গরু মার্কা ঢেউটিনের মতো বাঁকা, সম্মানী ছাড়া মেলেনা কিছুই। পরিবর্তন টেন্ডারবাজিতেও । টেন্ডার সে তো সরকারী দলের নেতাদের খাবার, পাতিনেতাদের জন্য সেরেল্যাক। এখন আর লটারিতে অংশ নিতে হয় না, বড়রাই ঠিক করে দেয়, কে কোন কাজের দায়িত্ব নেবে, হোক না সেটি স্কুলে চক পেন্সিল সাপ্লাইয়ের কাজ কিংবা বড় কোন রাস্তাঘাট ইমারত নির্মান। অবশ্য নিয়ম রক্ষার্থে বড়দের ইশারায় যে পাতি নেতারা টেন্ডার দাখিল করে তাদের জন্য সেরেল্যাক কেনার পয়সার ব্যবস্থাও আছে।

দিন বদলের দিন এসেছে আবার। পরিবর্তনে পরিবর্তনে বর্তমান হারিয়ে যাচ্ছে অবর্তমানে।আগে গ্রীষ্মের গরমে বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হত, এখন সব কিছুতে সমান অধিকার। গ্রীষ্মে যতটুকু বিদ্যুত পাওয়া যাবে শীতে তার চেয়ে বেশী পাওয়া যাবে না, সব সময় সমানতালে চলবে লোডশেডিং।

পরিবর্তন থেকে রেহাই পায় না কেউ। দিনের পর দিন বদল হতেই থাকে। হয় হাত বদল। এ হাত ঘুরে ও হাতে যায় ক্ষমতা, পরিবর্তনের আঁচে ঝলসায় আমজনতা। কখনো উত্তপ্ত কড়াইয়ে, কখনো গণগণে চুলোর মাঝে লাফালাফি, ছুটোছুটি। বিএনপি ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ানোর স্বপ্ন দেখায়, আওয়ামী লীগ দেখায় ভাতের সাথে ডাল খাওয়ার প্রলোভন। যেই লাউ সেই কদু বুঝেও আমরা এ দোকান সে দোকানে ধর্ণা দেই, হয়তো সাদা লাউয়ের পরিবর্তে কিনি সবুজ কদু, কিংবা সবুজ লাউয়ের বদলে সাদা কদু ।

এভাবেই দিনের পর দিন যায়, হয় দিন বদল। হয়তো এভাবে দিন বদল হতে হতে এক সময় দিন হয়ে যাবে রাত, রাত হয়ে যাবে দিন, রাত দেড়টায় সবাই দৌড়ে যাব জুম্মার জামায়াতে, ক্লান্ত সকালের ঘুম শেষে পৌঁছে যাব কর্মমুখর আরেকটি রাতে দোরগোড়ায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“দিন বদলে রাত্রি নামে” লেখাটিতে 10 টি মন্তব্য

  1. পাশা বলেছেন:

    ভাল লেখছেন ভাই।

    এভাবেই আমরা দিন বদলের স্বপ্ন দেখি।

    কোন দিনও পাব না আমরা দিন বদল।

    [উত্তর দিন]

  2. helal বলেছেন:

    এক নি:শ্বাসে পড়ে ফেললাম। 🙂 🙂

    [উত্তর দিন]

  3. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ পাশা ও হেলাল ভাই। পরিবর্তনের হাওয়া শুধু অন্ধকারের দিকেই বারে বারে নিয়ে যায়, আলোর মুখ দেখা আর হয় না, গাঢ় অন্ধকারে চোখ ব্যাথা হয়ে আছে, এবার আলো দেখতে চাই

    [উত্তর দিন]

  4. শাহরিয়ার বলেছেন:

    যখন এ লেখাটি লিখছিলাম রাতে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও চলছে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের তুমুল সংঘর্ষ। জয়তু দিনবদল।

    [উত্তর দিন]

  5. sabbyasachi বলেছেন:

    বদলাতে দিন। এ এোমেো বদল হতেই পাওয়া যাবে কানখিত সুবাতাস।

    [উত্তর দিন]

  6. মোস্তাফিজ চার্চিল বলেছেন:

    ভাই, কাজেতো পারি না, তাই কথা দিয়ে চিড়ে ভিজাই। আসুন আমরা ও …………..

    [উত্তর দিন]

  7. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ। জটিল বলেছেন চার্চিল ভাই।

    [উত্তর দিন]

  8. helal বলেছেন:

    জটিল বলেছেন চার্চিল ভাই।

    [উত্তর দিন]

  9. Redwan বলেছেন:

    Are Vai Din Bodoler Sloganto Thikoi ase…..

    Jonogoner Din Na bodlaleo ODER dinto Bodlasse…taina?

    [উত্তর দিন]

  10. দূয়ারে রক্ষীবাহিনী | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] ভাবতে অবাক লাগে এ কোন আজব দেশে বাস আমাদের। যেন দু:স্বপ্নের মাঝে বিচরণ। যে দেশে প্রতিদিন ১০ জন মানুষ প্রাণ হারায় সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে, দিনে ৩ জন নারী হারান সম্ভ্রম, যার এক তৃতীয়াংশই শিশু, যে দেশে দিনে গড়ে গণধর্ষণের শিকার হয় ১ জন করে নারী, সে কেমন ডিজিটাল বাংলাদেশ। জাতীয় দৈনিকের সংবাদের ভিত্তিতে সেন্টার ফর মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (এমআরটি) গবেষণায় ২০১০ সালের মে মাসের প্রথম ১৫ দিনে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা মতে ১-১৫ মে পর্যন্ত শুধু খুনের ঘটনা ঘটেছে ১৫১টি, যা প্রতিদিন গড়ে ১০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। আত্মহত্যা করেছে ২০ জন। আর ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ শিশুসহ ৪২ জন। যার মধ্যে ১৪ জন গণধর্ষণের শিকার। আর বলাই বাহুল্য এগুলো শুধু পত্রিকার হিসেব, প্রকৃত অনেক অপরাধই থেকে যায় মিডিয়ার আড়ালে, অনেকেই কিল খেয়ে কিল হজম করে ফেলেন, লোকলজ্জার ভয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মুখ বুজে সয়ে যায় সবকিছু। সেসব অজানা সত্যগুলো প্রকাশিত হলে পরিসংখ্যান যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সবকিছু অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে যে দেশে আর যাই থাকুক না কেন, আইন-শৃংখলা বলে কিছু নেই। দিন বদলের অলীক স্বপ্নে বিভোর করে যে সরকার গঠিত হয়েছিল তারা দিন বদলে সুদিন আনতে পারে নি, দিন বদলে নেমেছে কাল রাত্রি। […]

মন্তব্য করুন