হুমকির মুখে বাংলাদেশ

“তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি”। কেউ কথা রাখে না। স্বাধীনতার তেত্রিশ বছরে ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে বারে বার। এসেছে বাকশাল, এসেছে স্বৈরাচার, ’৯০-এর গণঅদ্ভুত্থানের পর এসেছে অস্থিতিশীল গণতন্ত্র।  কথার ফুলঝুরিতে সুখী-সমৃদ্ধশালী শান্তির নীড় রচনার স্বপ্নে বিভোর হয়েছে বাংলাদেশের হৃদয়। প্রতিবারই প্রতারিত হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষ, সোনালী স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে বিষাক্ত ছোবল হেনেছে হৃদয়ের গভীরে। এখন দেশের মানুষ ভুলে গেছে স্বপ্ন দেখতে। এখন প্রভাতে সূর্য ওঠে অনিশ্চিত জীবনের বিভীষিকা নিয়ে।

একের পর এক চলছে বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা। অকাতরে ঝরে পড়ছে একেকটি নিরপরাধ প্রাণ, যাদের অনেকেই জানে না কেন তাদের মরতে হবে, কেন তাদের বেঁচে থাকতে নেই। সন্ত্রাসীদের ক্রস ফায়ারে বাবার কোলে নিথর হয়ে যাচ্ছে সদা কলকাকলিতে মুখর দুধের শিশু, ব্যালকনিতে উন্মাতাল হাওয়ায় চুল শুকোতে গিয়ে রমণী মারা পড়ে পুলিশের গুলিতে, ৭০০ বছরের সুপ্রাচীন মাজারে আহত হন বিদেশী কূটনীতিক, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত বেঘোরে প্রাণ হারায় জনসভায়। টেলিফোনের কিং কিং শব্দ এখন আজরাইলের করাঘাতের মতো হৃদয়ে বাজে, ই-মেইল পেলে অজানা  আশংকায় সাদা কাগজের মতো মুখ শুকিয়ে যায়। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিমান বন্দরে, লঞ্চে, বাণিজ্যিক ভবনে এমনকি শিশুদের কিন্ডারগার্টেনেও। এখন আর সিঙ্গেল মার্ডার, ডাবল মার্ডার, ট্রিপল মার্ডারে পত্রিকার রিপোর্ট জমে না। পত্রিকায় খুনের মতো লাল কালিতে শোভা পায় এইট মার্ডার, ডজন ডজন মার্ডারের ভয়াল সংবাদ। এখন আর যেন স্বাভাবিক খুনেরও নিয়ম নেই, এখন মরতে হয়, টুকরো টুকরো হয়ে চলে যেতে হয় পচা-পুতিগন্ধময় ড্রেনে, হতে হয় আফ্রিকান মাগুরের খাবার কিংবা ইটের ভাটার জ্বালানি। অংকের সহজ-সরল সমাধান এই যে, চরম অরাজকতায় ছেয়ে গেছে দেশ। আজ কারো জান-মাল, ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা নেই।

একদিকে যেমন দেশে চলছে অস্থিতিশীল পরিবেশ, অপরদিকে দেশী-বিদেশী মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা (?) মেতে উঠেছে বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করার হীনষড়যন্ত্রে। বিদেশী কূটনীতিকরা ঔদ্ধত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র এদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে সতর্ক করে দিচ্ছেন। ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে সর্বত্র। গরীব ঘরের সুন্দরী মেয়ে যেমন অভিশাপ, ঠিক তেমনি সম্পদের উপর ভাসমান আমাদের এ সোনার দেশটি আজ ইঙ্গ-মার্কিন ও হনুমানের গোষ্ঠী তথা সারাবিশ্বের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। টার্গেট করেছে হয়তো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীচক্রও। Dow Jones & Company- র পত্রিকা Far Eastern Economic Review- এর ৪ এপ্রিল ২০০২ সংখ্যায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপে-“Bangladesh: A Cocoon of Terror” শিরোনামে যা তখন তুমূল হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিল ঘরে-বাইরে। যথানিয়মে সরকার এর প্রতিবাদ করেছে, ঐ সংখ্যার সকল কপি নিষিদ্ধ করেছে, বাজেয়াপ্ত করেছে, কিন্তু অঘটন থেমে থাকেনি, একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ধারাবাহিকভাবে মঞ্চস্থ হচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেই তো আর প্রলয় থেমে যায় না।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকেই উদ্ধার করা হয় দশ ট্রাক অত্যাধুনিক অস্ত্র। সমপ্রতি সুনামগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় একটি কোম্পানীর নামাঙ্কিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিষ্ফোরকসহ গ্রেফতার হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দু’জন, যারা ইতোপূর্বেও বিষ্ফোরকের চালান এনেছে এ দেশে। বিগত ৫ বছরে বোমা হামলায় নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৬৫ জন, আহত হয়েছে দেড় হাজারের মতো। ১৯৯১ থেকে এ পর্যন্ত বড় ধরনের ১৬টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে যার একটি বাদে অন্য কোন ঘটনার চার্জশীঠ তৈরী হয়নি। ফলে দিনে দিনে হামলা হচ্ছে আরো শাণিত, ব্যবহৃত হচ্ছে নতুন নতুন আগ্নেয়াস্ত্র। দেশটি পরিণত হচ্ছে অবৈধ চোরাচালানের ট্রানজিটরূপে, পোয়াবারো হচ্ছে মাফিয়াদের, আগ্রাসী শক্তির আর এর বিষাক্ত হাওয়া লাগছে দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে।

অথচ এসকল ঘটনার পর যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হতো কিংবা কোন ক্লু উদ্ঘাটন করা যেত তবে এ ধরণের পৈশাচিক ঘটনার হয়তো পরিসমাপ্তি হতো। সমপ্রতি ই-মেইলে হত্যার হুমকি ঘটনার আপাতত অবসান হয়েছে, কারণ অত্যন্ত সফলতার সাথে অপরাধীদের বা অপরাধের সহযোগীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে পেরেছে গোয়েন্দা পুলিশ। ঠিক তেমনি অতীতের ঘটনাগুলোর একটিরও যদি তথ্য উদ্ঘাটিত হতো তবে এ ধরনের ঘটনা অনেক কমে যেত।

অতীতে দেখা গেছে যে কোন একটি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটলেই প্রথমে দোষ চাপানো হয় ইসলামপন্থীদের ঘাড়ে। প্রতিবারই বোমা হামলার পর প্রচার মাধ্যম সর-গরম হয়ে ওঠে, মিডিয়ার মুখ বন্ধ করতে তাড়াহুড়ো করে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, বিশেষ গোষ্ঠীকে টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমে তাদের সন্দেহকে পাকাপোক্ত করার জন্য গলদঘর্ম হয়, গ্রেফতার করা হয় যাকে তাকে এবং পিটিয়ে তাকে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয় তা-ই যা সে আদৌ হয়তো করেনি। এভাবে কিছুদিন গেলেই মিডিয়া শান্ত হয়ে যায়, ঝিমিয়ে পড়ে তদন্তও।

একটি দেশের সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতি, আইন-শৃংখলা সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব সরকারের। জনগণের জানমাল, ইজ্জত-আব্রু সবকিছুর নিরাপত্তার জন্যই জনগণ ভোট দিয়ে সরকারকে ক্ষমতায় বসায়, তামাশা দেখার জন্য নয়। একটি সরকার যদি এসকল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তাহলে সরকারের প্রয়োজনটাই ফুরিয়ে যায়। যে কোন একটি ঘটনা ঘটলেই তার সাথে সরকারের বা সরকারের সহযোগী কারো হাত নেই বললেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিভিন্ন মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে দেশকে তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র চলছে কিংবা দেশে আল-কায়েদা নেটওয়ার্ক বা একই ধরনের একাধিক সংগঠন এ সকল অপকর্ম ঘটাচ্ছে। সরকার প্রতিবারই একে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি বিশেষ মহলের তৎপরতা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সরকার জোরগলায় প্রচার করছে যে দেশে কোন উগ্র মৌলবাদী সংগঠন নেই, আন্তর্জাতিক অপরাধীচক্রের ঘাঁটি হয়ে যায়নি এদেশ। তাদের এ দাবী বিশ্বাস করতে আমাদেরও ইচ্ছে হয়। কিন্তু দেশে যদি কোন সুসংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী না-ই থাকে তাহলে এ ঘটনাগুলো কারা ঘটাচ্ছে তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার, নিশ্চয়ই সরকারের।

দেশে বোমা হামলার কালচার শুরু হয় আওয়ামী শাসনামলে। আর গ্রেনেড হামলার সূত্রপাত খুলনা থেকে। তখন ব্যবহৃত হয়েছিল ভারতীয় গ্রেনেড। এরপর একের পর এক গ্রেনেড হামলা হয়েছে। সিলেট ও ঢাকায় যে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয় তা উন্নত বিশ্বে তৈরী। এসকল ঘটনাই প্রমাণ করে দেশে এক বা একাধিক সুসংঘবদ্ধ দল সক্রিয় রয়েছে, যাদের সাথে রয়েছে বিদেশী অপরাধ নিয়ন্তাদের সখ্যতা, তারা হতে পারে ভারতপন্থী, হতে পারে সাম্রাজ্যবাদীদের ভাড়াটিয়া আবার হতে পারে উগ্রমৌলবাদী। মোদ্দা কথা, এ ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটানো কোন আনাড়ি লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। এসকল ঘটনা সংগঠিত করতে প্রয়োজন কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ। এ ধরনের ঘটনা যেনতেন ছাপোষা কেউ যে ঘটায়নি তা মোটামুটি স্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর এতটা সাংগঠনিক শৃংখলা নেই যে তারা একের পর এক বোমা হামলা ঘটিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে। কারণ তাদের নেটওয়ার্ক ও জনশক্তি সুবিশাল হওয়ায় কোন না কোনভাবে এ সকল অপারেশনের তথ্য বেরিয়ে আসতো। কিংবা জিহাদী যযবায় যাদের রক্ত টগবগ করছে তাদের দ্বারাও এ ঘটনা হয়তো ঘটেনি। এ ঘটনাগুলোর কোনটি যদি আত্মঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা যেত, তবে অনেককেই টার্গেট করা যেত। কেননা আত্মঘাতী হামলার জন্য বিশেষ কোন প্রশিক্ষণের দরকার হয় না, দরকার হয় টগবগে আবেগ। অনেকেই মনে করছেন এ সকল অপকর্মের সাথে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে। এ বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সাথে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে তাদেরকেও আমাদের বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করা দরকার। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় একলা চলো নীতি কোন কাজেই আসবে না।

যারাই এ ঘটনার পিছনে থাকুক না কেন তাদের খুঁজে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি দেয়া সকল মহলেরই দীর্ঘ দিনের দাবী। আর এ দাবীকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার এ কার্যক্রমকে বাস্তবায়নের জন্য সাহায্য নেবে পুলিশ প্রশাসনের। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী শতভাগ গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দেশে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে পুলিশ বাহিনী। এমন কোন অপরাধ নেই যাতে হাতেখড়ি হয়নি পুলিশের। এমনকি সংরক্ষিত জেলখানার ভিতরেও অপরাধের স্বর্গরাজ্য কায়েম করে রেখেছে পুলিশের প্রায় শতভাগ লোক। হিরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সন্ত্রাসী, নেশাখোরদের হাতে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছি দিচ্ছে পুলিশের লোকেরা। ধানমন্ডি হাজতে দেখেছি একই পুলিশ একজনকে হিরোইন সরবরাহ করছে, আবার অন্য এক হিরোইনসেবী ছিনতাইকারীকে (যার কাছে টাকা নেই) চোখে কাঁচা মরিচ ঢলে দিচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই আছে। বার্লিনভিত্তিক “ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল” তো বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ছেড়েছে। আর দুর্নীতির সুতিকাগার হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। “ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল” পুলিশ বাহিনীকে “সন্ত্রাস নির্মূলে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ” বলে রিপোর্ট করেছে। আজ পাবলিক প্লেসে যখন কোন পুলিশের প্রবেশ ঘটে তখন গায়ে তেলাপোকা পড়লে যেমন অস্বস্তি লাগে ঠিক তেমনি অস্বস্তি ভোগে সাধারণ মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ প্রশাসনের উপর ভরসা করে এরকম স্পর্শকাতর তদন্ত সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হয়তো জনতার পেরেশানী বোঝেন। তাই তিনি ২০০২-এর ১৬ অক্টোবর “অপারেশন ক্লিন হার্ট” পরিচালনার নির্দেশ দেন। ৫০,০০০ সৈন্য মোতায়েন করা হয় এ অপারেশনে, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৪,০২৩ জন, নৌবাহিনীর ৩৩৯ জন এবং বিপুলসংখ্যক বিডিআর জওয়ান অংশগ্রহণ করে। এ অভিযানে গ্রেফতার হয় ১১,২৮০ জন যাদের মধ্যে ২,৪৮২ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। উদ্ধার করা হয় ২,০২৮ টি অস্ত্র এবং ২৯,৭৫৪ টি এ্যামিউনিশন। কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয় এ অপারেশন ক্লিন হার্ট। সরকারী দলের কর্মীরা এ অভিযানে বেশী গ্রেফতার হলেও বড় মাপের নেতা ধরা পড়ে বিরোধী দলের। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সহজেই গা ঢাকা দেয় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য পশ্চিমবঙ্গে। ফলে মূল সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সিদ্ধান্তে দলের ভিতর শুরু হয় মান-অভিমান। অনেকেই এ অপারশেন মেনে নিতে পারেনি, সমালোচনাও হয়েছে বেশ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আরেকটি অপারেশন হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে “অপারেশন স্পাইডার ওয়েভ” নামে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে শুরু করায় সম্পূর্ণরূপে এ অভিযান ব্যর্থ হয়। ১৪,০০০ সেনা, বিডিআর, আনসার, কোস্টাল গার্ড এ অভিযানে অংশ নেয় কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, ভুল কর্মকৌশল এবং সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশের গোপন সম্পর্কের কারণে এ অপারেশন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় বলে মিডিয়া রিপোর্ট করে।

সরকারের এ উদ্যোগগুলোকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বারে বারে সেনা তলব করে দেশে শান্তি আনা যায় না। আবার একাধারে অনেক দিন সেনা মোতায়েনও কারো কাম্য নয়। কারণ কে না জানে “যে যায় লংকা, সে হয় রাবন”। বারে বারে সেনা অভিযান এবং একাধারে অনেকদিন সেনা মোতায়েন সেনাদেরকে পুলিশ বানিয়ে ফেলতে পারে অর্থাৎ তারাও পুলিশের মতো বিপথগামী হতে পারে। অথচ দেশে অন্তত একটা বাহিনী তো পরিশুদ্ধ থাকা দরকার।

মূলত এ সকল সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন পুলিশ বাহিনীর মৌলিক গলদগুলো খুঁজে বের করে তাদের সংশোধনের ব্যবস্থা করা। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ যে পুলিশকেও সেনাদের মতো দায়িত্বশীল করতে পারে তার প্রমাণ “র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান”। এ বাহিনী  ইতোমধ্যেই জনগণের মনে বেশ আশার সঞ্চার করেছে। এদের হাতে বেশ কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে যদিও রহস্যজনক “ক্রস ফায়ার”-এ পড়ে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। এসকল সন্ত্রাসীর হাত অনেক বড়ো হওয়ার কারনে সহযেই আদালত থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, তাই হয়তো এ বিকল্প পন্থা। অনেক সাধারণ লোক অবশ্য এ রহস্যজনক “ক্রস ফায়ার”-এ স্বস্তি পাচ্ছেন।

আমরা এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শতভাগ পুলিশ দুর্ণীতিগ্রস্ত নয়। পুলিশ বাহিনীতে এখনো অনেক সৎ, যোগ্য, কর্তব্যনিষ্ঠ লোক রয়েছেন। মূলত পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজালেই একে কার্যোপযোগী করা যায়। পুলিশ বাহিনীকে কার্যোক্ষম করতে কিছু সুপারিশ এখানে তুলে ধরা হলোঃ

এক) পুলিশ প্রশাসনে চৌকস লোক নিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে গোয়েন্দাবাহিনীতে স্বাস্থ্যের চেয়ে মগজের ধারের গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান অবস্থা হচ্ছে যাদের কোথাও চাকরি হয়না তাদেরকেই পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ছাগল দিয়ে আর যাই হোক অন্তত হালচাষ হয়না।

দুই) পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণ দিলে পুলিশ যদি র‌্যাব হতে পারে তবে বর্তমান পুলিশও আরো দক্ষ হবে।

তিন) পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন করতে হবে। পুলিশ বাহিনীর সনাতনী অস্ত্রশস্ত্রের বদলে নতুন যুগোপযোগী অস্ত্রশস্ত্রে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি, কলাশৌশল দিয়ে যুগোপযোগী করা দরকার।

চার) পুলিশ বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা দরকার। পুলিশ বাহিনী হয়তো জানেই না তাদের কাজটা কি। একটা সমাবেশে যখন তারা দায়িত্ব পালন করে তখন সমামেশ বা মিছিলের লোকদের ঠেঙ্গানোকে তাদের প্রধান কাজ মনে করে, সমাবেশের নিরাপত্তা নয়। বরঞ্চ সমাবেশের নিরাপত্তার চেয়ে নারী শরীরের আঁকেবাঁকে দৃষ্টি বুলিয়ে কাজে বৈচিত্র্য খোঁজায় তৎপর থাকে এ বাহিনী।

পাঁচ) পুলিশ বাহিনীকে আদর্শিক ট্রেনিং দেয়া সবচেয়ে বেশী জরুরী। ন্যায়-অন্যায়বোধ না জাগিয়ে তাদের কাছ থেকে কিছুই পাওয়া যেতে পারে না। পুলিশী চাকুরী শুধু চাকুরী নয়, এটা তাদের দায়িত্ব-এই বোধে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

ছয়) পুলিশ বাহিনীকে নিয়মিত বদলি করা দরকার। এক স্থানে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও অপরাধীচক্র তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার সুযোগ পায়।

সাত) পুলিশের বেতনভাতা বৃদ্ধি করা দরকার। দারিদ্র্য ঈমান নষ্ট করে। তাই অর্থাভাব যেন দুর্নীতিগ্রস্থ হওয়ার কারণ না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

আট) পুলিশ বাহিনীর জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার। বিনোদনের অভাবে অনেকেই আশপাশের এলাকাবাসীর সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে ফলে কোথাও কোথাও এ সুযোগে ফাঁড়ি লুটের ঘটনাও ঘটে।

নয়) পুলিশী দুর্নীতি দমনে সেনা সহায়তায় বিশেষ বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং অযোগ্য কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরের ব্যবস্থা করলে পুলিশী দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে।

আমরা আর কোন রক্তপাত চাই না, সংঘাত চাই না, আর শুনতে চাই না সন্তানহারা মায়ের বিলাপধ্বনি। আমরা চাই সরকার আন্তরিকতার সাথে এ সকল সমস্যা মোকাবেলা করুক। শুধু চারদলীয় জোট সরকারই নয় আগামীতে যেসকল সরকার ক্ষমতায় আসবে তাদের সবার কাছেই আমজনতার দাবী একটি স্থিতিশীল গনতন্ত্র, একটি নিরাপদ রাষ্ট্র। আজ আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ এসেছে তা শুধু চারদলীয় জোট নয়, পুরো দেশের জন্যই হুমকি। এ হুমকি মোকাবেলায় সরকার এবং বিরোধী দল সকলকেই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আর এক্ষেত্রে সরকারকেই প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা কি আশা করতে পারি না সরকার ও বিরোধী দল নব্বইয়ের মতো আরেকবার ঐক্যবদ্ধ হবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, দেশের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন