নৈঃশব্দের গান

কুয়াশার চাদরে ঢাকা মায়াবী চন্দ্রিমা রাত। নির্ঘুম জেগে একা একা। অবিরাম কেঁশে চলেছি, রেলগাড়ীর কুঁউ ঝিকঝিক যেন। থেকে থেকে পাল্লা দিয়ে কেঁশে চলেছে আশপাশের ফ্লাটের অচেনা কোন নারী। আমাকেই ব্যঙ্গ করে নাকি আমার মতোই সত্যিকারের অসুখী কি না, কে জানে। তবু ভালো লাগে, কেউ একজন আছে, জেগে আছে খুব কাছাকাছি, যদিওবা আমারই মতো হাপানীর যন্ত্রণা নিয়ে।
একা একা নির্ঘুম জেগে থাকা যে কতটা যন্ত্রণার তা কে না জানে? সেদিন মধ্য রাত থেকে মা সবাইকে ডাকতে শুরু করেন। ছোটভাইটার নাক ডাকার অভ্যেস। মা বলেন, “আমি একা একা জেগে আর সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমে, সজীব প্রতিরাতে এতো নাক ডাকে আর আজ একটুও সাড়া শব্দ নেই, এই নৈঃশব্দের মাঝে কি জেগে থাকা যায়?”
বুকে বালিশ চাপা দিয়ে ল্যাপটপে দেখি চিত্রবিচিত্র দেশ। গুগল আর্থে চোখ রেখে ছুটে যাই মিশরের পিরামিড, দুবাইর আর্টিফিশিয়াল আ্য়ল্যান্ডস থেকে মাউন্ট এভারেস্ট পর্যন্ত, শেষে ধানসিঁড়ি নদী বেয়ে বেয়ে রাজাপুর পাইলট হাইস্কুল মাঠে কিছুক্ষণ আড্ডা দেই, তবু নির্ঘুম রাত যেন বেড়েই চলে।
যে কোন কষ্ট উপশমে মেডিটেশন বেশ কাজ দেয়, ল্যাপটপ এক্ষণে আমার মেডিটেশনের জানালা। জানালায় উকি দিলেই সমগ্র বিশ্ব চোখের পাতায় আছড়ে পড়ে, কল্পনার মায়াজাল বুনে বুনে প্রজাপতির রঙ্গীন ডানায় ভেসে ভেসে বেশ কেটে যায় সময়, তবুও ঘড়ির কাটা কেন যেন দু’টোর ঘর পেরোয় না। মাঝে মাঝে টিকটিকি ডেকে যায়, “বন্ধু কি খবর বল, কতদিন দেখা হয় না”।
পূবের চাঁদ ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে যায়, তবু ঘড়ির কাটা কিছুতেই  এগোতে চায় না, দুঃসহ রাত রাবারের মতো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।
একাকী থাকায় যন্ত্রণা আছে, আছে জানা অজানা যত ভয়। তবুও কেউ কেউ নির্জনতাকেই ভালোবেসে যায়। অন্ধকারকে সাথী করে নির্জন বৃক্ষতলে কেউ কেউ স্নিগ্ধ দখিনা বাতাসে প্রাণ জুড়ায়। কেউবা অপ্রশস্ত অন্ধকার হেরাগুহা থেকে বের করে আনেন মহাবিশ্বকে দীপ্ত করার অফুরন্ত সোনালী আলো। একাকী ধ্যান করে করে, নির্জনে রাতের পর রাত কেটে কেটে এরা মানুষকে দেখান সঠিক পথের দিশা, যে পথ কল্যাণের পথ, ভালোবাসার পথ, মানবতার পথ।
তবে কেন অন্ধকারে এত ভয়? অন্ধকারে শুধু শয়তানের আনাগোনা এমন তো নয়, যদি তাই হবে তবে অন্ধারের বুক চিরে বিজলির চমকের মতো আলোকচ্ছটায় পৃথিবী আলোকিত হতো না। যারা আধারে ভয় পায় তারাই শয়তানের উপাসনা করে, যারা আধারে সন্ধান করে আলোকের পথ, তারা শয়তানের ভয়ে ভীত নয়।
তবে আমার কোন পথে চলা উচিত? অন্ধকারের ভয়ে শয়তানের উপাসনা আমার ইগোতে বাধে, তাই যত ভয়ই হোক আলোর প্রতিক্ষায় আমি নৈশব্দের মাঝে আধারের সাথী হতে চাই।
রাত গভীর থেকে আরো গভীর হয়,  ঘুমের চাদর মুড়িয়ে নিশ্চিন্ত পৃথিবী। আর আমি পুব আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে নির্ঘুম রাত কাটাই, জানি আলো আসবেই, জানি সোনালী সূর্যালোকে পৃথিবী জাগবেই। ‌
Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“নৈঃশব্দের গান” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    লেখাটি এ নিয়ে তিন বার পড়লাম। তিন বারই মন্তব্যের ঘরে কারসরটা রেখে কীবোর্ডে হাত রেখে এলোমেলো চিন্তা করেছি। অসম্ভব রকম একটা অনুভূতিতে মন্তব্য করা হয়নি। এবার করেই ফেললাম। কিন্তু কী মন্তব্য লিখলাম? কোন বক্তব্য নেই।

    [উত্তর দিন]

  2. mahfuz বলেছেন:

    এত ভালো লিখছেন কি বলব

    [উত্তর দিন]

  3. শাহরিয়ার বলেছেন:

    হা হা হা, আরাফাত ভাই, আপনি আপনার কবি মনটা ভুলে থাকলে কি হবে, কাব্য ছাড়া আপনার গতি নাই, কলম আপনাকে ধরতেই হবে এবার।
    পালানোর রাস্তা খুঁজতাছি @ মাহফুজ স্যার।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন