স্বপ্ন দ্যাখে মন…

আমরা কি সেই বাস্তিল দূর্গের কথা ভেবে দেখেছি যা সাধারণ মানুষের হাতুড়ি-শাবলের আহারে পরিণত হয়েছিল? কিংবা সেইসব রাজপ্রাসাধের কথা যা যুগ যুগ ধরে শোষণের প্রতীক হয়ে দাড়িয়ে ছিল, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বটের চারা যা চুর্ণবিচুর্ণ করে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছিল? কিংবা সেই লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যানের কথা যা  হিরোশিমা আর নাগাশাকিকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল?

সাইজ ডাজ নট ম্যাটার, এ কথাও বলে কেউ কেউ। তারপরও কতটুকু বিশাল হলে কাজের যোগ্য বলা যায়, এ প্রশ্ন মনের ঘুলঘুলিতে বাসা বেধেছে অনেকেরই। নিজেকে সব সময় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হয়, মনে হয় আমার যতটুকু যোগ্যতা আছে তা দিয়ে পৃথীবীর কোন কাজই সম্ভব নয় এমনকি নিজের উন্নয়নও অসম্ভব।

আমরা সব সময়ই বড়দের পানে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে থাকি, সব কাজ ওরাই করে দেবে। ব্যক্তিগত কোন কাজে কিংবা সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক সব কাজেই আমরা অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। সমাজের যত অসংগতি, যত অনিয়ম দূর্নীতি সবকিছুর দায় অন্যের, আমাদের নয় এমন ভেবে দায়িত্ব এড়িয়ে যাই। রাস্তায় নেমে যানজটে গালাগাল করি, আবার নিজে যখন গাড়ি চালাই তখন যত্রতত্র কারপার্কিংয়ে আগ্রহের কমতি থাকেন না আমাদের। চোর, ডাকাত ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে আমাদের কন্ঠ সদা সোচ্চার, তবুও আড়ালে আধাঁরে সুযোগ পেলেই আমাদের হাত নিশপিশ করে, অনৈতিক কাজকে তখন আর ততটা ক্ষতিকর মনে হয় না।

আমরা সমাজের অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের কথা বলি, ওদের কষ্ট আমাদের ভাবায়, হৃদয় আর্দ্র করে। অভুক্ত শিশুর কথা মনে হলে হৃদয় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে, তবু ওদের ভেবে ভেবে একবেলা আহারও ত্যাগ করতে পারি না, আর খাওয়ানো, সে তো বহু দূর।

আসলে পরিবর্তনের জন্য কতটুকু শক্তির প্রয়োজন? কত টাকা হলে সমাজকে পরিবর্তন করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ নয়। আমরা আদৌ খেয়াল করে দেখি না, এই নিজের মাঝেই কি অসীম ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। হ্যা, আমি ইচ্ছা শক্তির কথাই বলছি, এর চেয়ে বড় শক্তি আর কি থাকতে পারে?

দেশের সাত কোটির বেশী লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। ষোল কোটি লোকের দেশ বাংলাদেশে তাহলে নয় কোটি লোক সে অর্থে দরিদ্র নয়। তাহলে একেক জন যদি আমরা শুধু আরেকজনকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করি তবে খুবই কি কঠিন হত দারিদ্র্য বিচোমন? হ্যা কিছু লোক আছেন যারা আরেকজনকে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন না কিন্তু আবার অনেকেই আছেন যারা হাজার জনকে স্বাবলম্বী করার শক্তি ধরেন তাহলে কেন দারিদ্র্য দূর হয় না? কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণে আমাদের প্রবল ইচ্ছেশক্তির অভাবটাই দায়ী।

বাসে প্রায় প্রতিদিনই একটি ছেলেকে দেখি বাদাম বিক্রি করে, প্রতি প্যাকেট দু’টাকা। আমি ওর নিয়মিত ক্রেতা। ইদানীং দশ টাকায় সাত প্যাকেট দিচ্ছে ছেলেটি, বুঝা যায় তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে ব্যবসায়। আলাপ করে জেনেছি এত কষ্ট করে যতটুকু আয় হয় তার সবটুকুই ছেলেটার পেটে যায় না বরং মূল টাকাটাই চলে যায় ঋণ পরিশোধে। অথচ সামান্য এই বাদাম বিক্রির জন্য দু’চারশ টাকার পুঁজি হলেই ছেলেটি আপাত দৃষ্টিতে স্বাবলম্বী হতে পারে। তাহলে এবার একটু ভাবুন, আমরা কি আসলে অক্ষম? আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনের কোন যোগ্যতাই কি নেই? না, বরং আমাদের অনেকেই চা-সিগ্রেট খেয়ে এপরিমাণ টাকার শ্রাদ্ধ করি আর আওয়ামী লীগ, বিএনপির দিকে তর্জনী উচিয়ে ব্যর্থতার দায় গছিয়ে দেই।

হ্যা, এ কথা সত্য, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, দেশের বড় বড় পুঁজিপতিরা ইচ্ছে করলেই দারিদ্র্যকে ঝেটিয়ে বিদেয় করতে পারেন, তা অবশ্য তাদের স্বভাবের সাথে খাপ খাবেনা হয়তো, কিন্তু আমাদের মাঝে মানবতা বোধ এখনো ক্ষয় হয়ে যায় নি, এখনো যারা হাড়জিরজিরে অভুক্ত মানুষের কান্নায় বিচলিত হই তারা কিন্তু ইচ্ছে করলেই এ সকল চা, বাদাম ফেরিকরা উদ্যোক্তাদের পাশে দাড়াতে পারি। আসলে ছোট্ট একটি বীজই একসময় ফুলে ফলে পল্লবে সুশোভিত হয়ে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়, যার ডালে ডালে আশ্রয় নেয় রঙ বেরঙ্গের গানের পাখি, যার ছায়ায় শীতল হয় ক্লান্ত পথিক, বাঁশির সুরে স্বপ্নবোনে রাখাল ছেলের দল। শুধু মাত্র ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোই পারে পৃথিবীকে বদল দিতে, সে যত ছোট স্বপ্নই হোক না কেন।

আজ যদি আমি সিদ্ধান্ত নেই প্রতিমাসে মাত্র পাঁচশত টাকা জমাবো সাধারণ মানুষের কল্যাণে, তবে পঁচিশ বছর পরে তা জমে দেড় লাখ আর মুনাফা জুড়ে দ্বিগুণ হয়ে বটবৃক্ষে পরিণত হবে, যা কয়েকটি পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় কি? এ ক্ষেত্রে আমি লেখায় বিশ্বাসী নই কিংবা শুধু প্রচার প্রচারণায় থেমে থাকতে চাই না বরং দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। তাই মাত্র দশ হাজার টাকা দিয়ে খুলেছি মুদারাবা ওয়াকফ ক্যাশ ডিপোজিট একাউন্ট। খুবই স্বল্প এ পুঁজি তবে লক্ষ্ অটুট রেখে পঁচিশ লাখ টাকার তহবিল গঠনের এগিয়ে যেতে চাই, আর হ্যা অবশ্যই শুধু নিজের পয়সায়, ভিক্ষে দিয়ে নয়। কারণ ভিক্ষে দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা যায় না।

Be Sociable, Share!

2 Replies to “স্বপ্ন দ্যাখে মন…”

  1. তহুরা & তহুরা (জুনিয়র) ফাউন্ডেশন সম্পর্কে আপনার কাছে আগেও শুনেছি। কিন্তু ধারণা পরিষ্কার ছিল না। আজ পরিষ্কার হলো।
    আপনার এ উদ্যোগ আমাকেও অনুপ্রাণিত করেছে। আমিও ঠিক এমনই একটা কিছু ভাবছিলাম। আবারো ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

  2. আপনাকেও ধন্যবাদ। এখানে একটা বিষয় জানানো উচিত যে, এ প্রতিষ্ঠানের সব কিছুই হবে সুদ মুক্ত। অর্থাৎ যতটুকু ঋণ দেয়া হবে ঠিক ততটুকুই কিস্তিতে ফেরত দিতে হবে, কোন বাড়তি ফি লাগবে না।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।