ইচিং বিচিং চিচিং চা…

“ইচিং বিচিং চিচিং চা

প্রজাপতি উড়ে যা

ইস্ বিষ ধানের শীষ

নৌকা মার্কায় ভোট দিস”।

 

পৌঁনে চার বছর বয়সী মেয়ে তার বন্ধুদের সাথে ছড়া কেটে কেটে খেলছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা যে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছতে পারে তা ভেবে অবাক হতে হয়। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতার আর রাজপথ কাঁপানো কলাকৌশলের ঝুঁলি যে কত সমৃদ্ধ তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এ কারনেই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা উঠানামা করলেও কখনো বিপদসীমা অতিক্রম করে না।

 

আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়, কারন এর একটা স্বতন্ত্র আদর্শ আছে। তবে সে আদর্শ মোটেই বামপন্থী আন্দোলন কিংবা ইসলামী আন্দোলনগুলোর মতো নয়। সমাজতন্ত্রের একটি কঠোর আদর্শ আছে, আছে ইসলামী আন্দোলনেরও কঠিন কঠিন কর্মতৎপরতা। যে কোন সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো সহজ নয়, বরং সাধারণ মানুষ চায় আল্লাহ খোদা ভগবান কার্ল মার্কস সবাইকে খুশি রেখে নশ্বর পৃথিবীটাকে কোনভাবে গুডবাই জানাতে। গণতান্ত্রিক দলগুলো মানুষের এই চাওয়া পাওয়া বোঝে আর তাই তাদের চাওয়া পাওয়াকে পুঁজি করে যেমন খুশি তেমন ভাবে তাদের নাচাতে ভালোবাসে।

 

গনতান্ত্রিক রাজনীতিগুলোর একটি থেকে অন্যটির আসলে আলাদা করার তেমন সুযোগ নেই, অন্তত আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষেতো নয়ই। এরপরও বিএনপি বা জাতীয় পার্টি থেকে আলাদা আওয়ামী লীগ । বরং আওয়ামী লীগের সাথে আকবরের শাসনের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারন সময়ে অসময়ে এরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাজনীতিতে ধর্মের কোন স্থান নেই এবং ধর্মনিরপেক্ষতা প্রমান করতে কখনো কখনো সংখ্যাগুরুদের ধর্মকে অবজ্ঞা করে দেশ বিদেশের প্রশংসার পাত্রে পরিণত হয়েছে দলটি। বিশেষ করে সারা বিশ্বে যখন ইসলাম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ইসলামকে অবজ্ঞা করার মতো সৎগুণ আর কি হতে পারে? স্বাভাবিক ভাবেই আমোদপ্রিয় মুসলমানদের জন্য আওয়ামী লীগ একটি স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। একই ভাবে পুঁজো পার্বনের জাতি হিন্দুরা আওয়ামী লীগকেই তাদের আশ্রয়স্থল মনে করেছে, তাই সব সময়ই হিন্দু ভোটারদের প্রায় শতভাগ ভোট আওয়ামী লীগই পাচ্ছে।

 

এ ছাড়া দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দলটিকে আলাদা মর্যাদার আসন দিয়েছে, ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আওয়ামী লীগ কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই অকুন্ঠ সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো দেশের সাধারণ মানুষের কাছে দেশপ্রেম ও ইসলাম এমন একটি বিষয় যা নিতান্তই আবেগের, এর সাথে কাজকর্মের কোন সম্পর্ক নেই। দেশের কথা উঠলে, জাতীয় সঙ্গীত শুনলে কার না হৃদয় আর্দ্র হয়? এদেশে মুসলমান হলেই যেমন ইসলামের অনুশাসন মানার বাধ্যবাধকতা নেই বরং মুসলমান বলেই ইসলামের গুষ্ঠি উদ্ধার করা যায়, ঠিক তেমনি দেশপ্রেমী বলে কাউকেই দেশের জন্য কোন কাজ করতে হয় না। বরং দেশের যাবতীয় দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং যতটুকু পারা যায় লুটে পুটে দেশটাকে হজম করাই দেশপ্রেমের শুদ্ধ ব্যাখ্যা বলে সাধারণ মানুষ মনে করে। আর এ কাজের উপযুক্ত স্থান হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুসলমান হলে ইসলামের কোন বাধ্যবাধকতাই মানতে হয় না বরং একে ছুড়ে ফেলাই প্রগতিশীলতা, তেমনি দেশপ্রেমী বলেই দেশের কোন ভালো মন্দের তোয়াক্কা করার দরকার হয় না। এ দেশ তারাই স্বাধীন করেছে অতএব নিজের সন্তানকে মারবে না কাটবে, ডাক্তার বানাবে না কৃষক বানাবে নাকি অন্যের চাকর বানাবে এটা নিতান্তই যেন সন্তানের বাবা মায়ের একান্ত ব্যক্তিগত দায়িত্ব। কারো এ নিয়ে কথা বলারও অধিকার নেই। আর আওয়ামী লীগ জানে স্বাধীনতা আন্দোলনের পোষাকটি তাদেরকে অন্য গণতান্ত্রিক দল থেকে আলাদা করে রেখেছে, তাই স্বাধীনতা, যুদ্ধাপরাধী বিভিন্ন ইস্যুকে জিইয়ে রেখে সাধারণ মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখে তারা জনপ্রিয়তার সিড়িটিকে পাকাপোক্ত করে রাখে।

 

পলিটিক্স ইজ দ্য আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। আর আওয়ামী লীগ কোন সময়ে কার সাথে কম্প্রমাইজ করতে হবে সে ব্যাপারে সবচেয়ে পটু। কখনো বামপন্থীদের সাথে, কখনো ইসলামপন্থীদের সাথে কখনো বা স্বৈরাচারের সাথে, বাতাস যে দিক থেকেই আসুক না কেন আওয়ামী লীগ জানে কোন পথে পাল ধরতে হবে, কোন পথে যেতে হবে গন্তব্যে। তাই পথ দলটির কাছে মূখ্য নয় বরং গন্তব্যই প্রাধান্য পেয়েছে বার বার। এটাই আওয়ামী লীগের আদর্শ।

 

মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, কি যাদু জানে আওয়ামী লীগ? কেন আওয়ামী নৌকা ডুবে যেতে যেতে আবার স্বগর্বে পাল তোলে উত্তাল সাগরে?  তাদের জয়জয়কার দেখে কখনো মনে হয় আওয়ামী লীগের পালে হাওয়া কোনদিন বুঝি থেমে যাবে না।

 

তারপর কখনো হাওয়া জোরসে বয়, ঘুর্ণিঘরে আওয়ামী লীগের পাল ছিড়ে যায়, হাল ভেঙ্গে যায়, দিশেহারা নাবিকের দল অথৈ সাগরে অন্ধের মতো পথ হাতরায়। কারণ আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু  আওয়ামী লীগ নিজেই। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি আজো কোন শক্তিশালী আদর্শ তৈরী করতে পারে নি। বরং বলা যায় আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা থেকে বিএনপির জন্ম, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাই বিএনপির সফলতা। তাই বিএনপির নেতৃত্বের মাঝে তেমন দৃঢ়তা দেখা যায় না যতটা দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়ার মাঝে। বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে তার জন্য আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীর বড় অবদান আছে। জামায়াতের রিজার্ভ ভোট আর আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা বিএনপিকে ক্ষমতার স্বাদ দিয়েছে বার বার।

 

তবে এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা এতোই নাজুক যে মাথা ঢাকতে গেলে পা রেরিয়ে যায় আবার পা ঢাকতে গেলে মাথা উদোম হয়। আর এ দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে আনতে দলগুলো যতটা চেষ্টা করে তার হাজার গুণ সচেষ্ট হয় অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে। ফলে গদি উল্টে যায়, আওয়ামী লীগ যায় আসে বিএনপি আবার বিএনপি ভুপতিত হয় উঠে আসে আওয়ামী লীগ। সাধারণ জনগণ এতটাই দিশেহারা যে কাকে ছেড়ে কাকে ধরবে বুঝতে পারে না ফলে কখনো উত্তপ্ত কড়াইয়ে পুড়ছে আবার কখনো বা চুলোয় অঙ্গার হচ্ছে দেশবাসী।

 

বিগত জোট সরকারের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা এরই ফসল, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতায় সাধারণ মানুষ তাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে ছিল, পাঁচ বছর যেতে না যেতেই মহাজোটকে তারচেয়েও বেশী সংখ্যাগরিষ্টতা দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে এ সংখ্যাগরিষ্টতা কিছুতেই স্থায়ী নয়, আওয়ামী লীগের দিক থেকে জনগণ যে কোন সময়েই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, আর তার আলামতও দেখা যাচ্ছে। ফলে বিএনপি কঠোর কর্মসূচী না দিলেও তাদের ভাগ্য খুলে যাবে, কারণ আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাই যে তাদের সফলতা, জনগণের যাবার আর কে কোন যায়গা নেই।

 

আগেই বলেছি আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু  আওয়ামী লীগ। তাদের ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, অঞ্চলভিত্তিক ব্যাপক বৈষম্য, দলীয়করণ, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, শিক্ষাঙ্গণে নৈরাজ্য এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর ব্যাপক দাপট আওয়ামী লীগকে ইতিহাসের কঠিন শিক্ষার দিকে নিয়ে যাবে। কোমড় ভেঙ্গে পড়ে থাকা বিএনপিকে দৃঢ় পায়ে দাড়াতে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাই সহায়ক হবে। আর এভাবেই চলবে আবাহনী মোহামেডানের লাথালাথি, জয় পরাজয়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ইচিং বিচিং চিচিং চা…” লেখাটিতে 7 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    সময়োপযোগী লেখা।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ আরাফাত ভাই, লুটপাটের রাজনীতির অবসান হোক, জনগণের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটুক রাজনীতিতে।

    [উত্তর দিন]

  2. শাহাবুদ্দিন আহমদে বলেছেন:

    তদদ;তবকতদ;কত্ব

    [উত্তর দিন]

  3. shauqat বলেছেন:

    apnar sait ta onek valo legece আপনাকে ওনেক টেনক্স

    [উত্তর দিন]

  4. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ শাহাবুদ্দিন এবং শওকত।

    [উত্তর দিন]

  5. ABU OBAIDE বলেছেন:

    ধন্যবাদ শাহরিয়ার ভাই, লুটপাটের রাজনীতির অবসান হোক, জনগণের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটুক রাজনীতিতে।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    আপনাকেও ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন