বোকা লোকে শুধু ধোঁকা খায় …

কথায় আছে সাধ আর সাধ্য একসাথে আসে না। কথাটি যে একেবারে মিথ্যে নয় তা প্রতিনিয়ত প্রমাণ পাচ্ছি। বিশেষ করে দারিদ্র্যের ব্যাপারে এ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হননি এমন বিবেকবান মানুষ সমাজে খুব কমই পাওয়া যায়। তবে সমস্যা হলো যতক্ষণ বিবেক থাকে ততক্ষণ দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনের মতো অর্থকড়ি সাধারণত থাকে না। কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণের অন্যতম চাবিকাঠি অর্থ যখন কারো হাতে এসে যায়, ততক্ষণে হয় তো অনেক দেরী হয়ে যায়, বিবেক মরে যায়, দারিদ্র্য হয়ে যায় অনেকটা সহনীয়। কিংবা বলা যায় ততদিনে দরিদ্র মানুষের নিপীড়ণে (?) তারা দারিদ্র্যকে অভিষাপ দিতে শুরু করেন।

যারা মুসলমান, তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে যাকাত দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রধান হাতিয়ার। এ কারণে যারা ইসলামের কিছুটা জ্ঞান রাখেন তারা সবাই যাকাতের মাসআলা কমবেশী জানেন। আর এদের প্রায় ষোলআনাই যাকাত দেয়ার ক্ষমতা রাখেন না বরং তাদের আর্থিক অবস্থা এমন যে যাকাত তাদেরই প্রাপ্য। কিন্তু এরাই যখন যাকাত দেয়ার মতো ক্ষমতা অর্জন করে, হাতে যখন নিসাব পরিমাণ অর্থ জমে, ততক্ষণে যাকাতের মাসআলায় মরচে পড়ে যায়, নতুন করে শান দেয়ার পরিবর্তে লোভ নামের হাতুড়ির আঘাতে মাসআলার গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ফলে যাকাত না দেয়ার ব্যাপারে তারা পেয়ে যান বিভিন্ন অভিনব যুক্তি।

আমার পরিচিত অনেককেই দেখেছি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে, যাকাত যাকাত বলে আর্তচিৎকার করে গলা ফাঁটাতে কিন্তু যখন জীবনের কোন এক সময়ে যাকাতের সামর্থ এসে যায় ততদিনে মরে যায় তাদের যাকাত দেয়ার আগ্রহ, মাথাচাড়া দেয় উপার্জিত অর্থ আগলে রাখার ধান্দা।

“ছেলের বেতনের পয়সায় চলি, তাহলে আমার টাকায় যাকাত কি করে হয়!, ছেলে যদি না খাওয়াত তবে এতদিনে তো এ টাকা শেষ হয়ে যেত, ও ভাই জিজ্ঞেস কর না এনটিভিতে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সাহেবকে”, “দূনিয়ার কত কিছুই তো আমার দেখার শখ ছিল, টিভিতে তাজমহল দেখি, খুব যেতে ইচ্ছে করে, দার্জিলিং, কাশ্মীর, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কত কি না দেখার ছিল, টাকার অভাবে যাওয়া হয় না, তাহলে হজ্জ ফরজ হয় কিভাবে? কিভাবেই বা এ টাকার যাকাত হতে পারে তা তো ঠিক বুঝে আসে না”-এ ধরণের কথা শুনেছি পরিচিত পন্ডিতদের মুখেই।

আসলে কথায় কথায় জান দিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মাল দেয়া সহজ নয়। ইসলাম ধর্মের মূল পঞ্চস্তম্ভের তৃতীয় হচ্ছে যাকাত। নামাজের পরেই যদিও যাকাতের স্থান তবুও মালের চেয়ে জান দেয়া সহজ বিধায় রোযাকে সবাই তৃতীয় স্থান দিয়েছে, যাকাত চলে গেছে আরেক ধাপ পেছনে। ফলে এটি পালনে বাধ্যবাধকতা অনেকটাই কমে গেছে ভেবে হয়তো সান্ত্বনা পেতে চান কেউ কেউ।

আমরা যা অর্জন করি তার কতটুকু অংশ আমাদের কল্যাণে আসে তা কি আমাদের ভেবে দেখা উচিত নয়? অর্জিত সম্পদের যতটুকু আমরা পানাহার করি, যতটুকু পরিধানে ব্যয় করি আর যতটুকু মানবকল্যাণে ব্যয়ের মাধ্যমে পরকালের একাউন্টে জমা করি ততটুকুইতো আমার। অথচ সম্পদ আগলে রেখে রেখে একসময় চলে যেতে হয় খালি হাতে, সম্পদের হরিলুটে অর্থউপার্জনকারীর নাম জপের জন্য কানাকড়িও হয়তো মেলে না। তাহলে কিসের লোভে গরীবের হক কুক্ষিগত করার এ অপচেষ্টা?

যারা ইসলামকে মানেন না, তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু যারা তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসী তাদের এ কথা অবশ্যই বিশ্বাস করা উচিত যে পৃথিবীর সব চোখে ধুলো দেয়া সম্ভব হলেও আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তাঁর জ্ঞানের বাইরে কোন কিছু করার ক্ষমতা কারো নেই। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শিকে অভুক্ত রেখে, যাকাতের সম্পদে পাহাড় গড়ে আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চাই, অথচ একবারও কি বিবেকের কাছে প্রশ্ন করা উচিত নয় যে, তাঁকে ধোঁকা দিতে যেয়ে আমি নিজেকেই ধোঁকা দিচ্ছি না তো?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন