এইডস প্রতিরোধে করণীয় (দুই)

মাদক বিবেককে হত্যা করে

এইডসের বীজানু সংক্রমিত হওয়ার আরেকটি বিপদজনক মাধ্যম হলো মাদক। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাদকের যে আগ্রাসন চলছে তাতে অন্য মাধ্যমগুলো বাদ দিলেও শুধুমাত্র মাদকের মাধ্যমেই এইডস মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। মহাজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালা তাই মাদককে নিষিদ্ধ করেছেন।

“হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো- যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনো কি নিবৃত হবে না”? সূরা আল-মায়েদাহ ৯০-৯১।

মাদকতো মানুষের চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য মানুষ যে কোন অনৈতিক কাজে ঝাপিয়ে পড়তে পারে মাদকের কারনে। তাই এইডস থেকে বাঁচতে হলে মাদককে অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

রাসূল (সাঃ) বলেন; “তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক, এটা সকল অশ্লীলতার উৎস” -হাকাম।

একজন ঈমানদার কখনোই মাদকের ফাঁদে পা দিতে পারে না। ঈমানদার মাদকে জড়িয়ে পড়লে তার ঈমান চলে যায় এবং তওবা ছাড়া তার পক্ষে আর মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। আর তওবা করে মুমিন অবস্থায় ফিরে এলেও মাদকের কারনে যদি এইচআইভি বীজানু শরীরে প্রবেশ করে তবে তওবা কিন্তু এইডস থেকে মুক্ত করে না।

রাসূল (সাঃ) বলেন: “চোর চুরী করার সময় মুমিন থাকে না। ব্যভিচারী ব্যভিচারে রত অবস্থায় মুমিন থাকে না। মদ্যপায়ী মদপানরত অবস্থায় মুমিন তাকে না। অতপর তওবা করলে মুমিন অবস্থায় ফিরে আসে”। -বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী

 

সিরিঞ্জ ব্যবহারে সতর্কতা জরুরী

প্রতিদিন হাজারো প্রয়োজনে আমাদের চিকিৎসকের সরনাপন্ন হতে হয় এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ দরকার হয়ে পরে। কিছু কিছু জটিল রোগ রয়েছে যা রোগীদেরকে দিনে একাধিকবার ইনজেকশন নিতে বাধ্য করে। এছাড়া রক্ত পরীক্ষার জন্যও ইনজেকশন ব্যবহার জরুরী। আর এর প্রতিটি পর্যায়েই এইচআইভি সংক্রমনের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। তাই শরীরে ইনজেকশনের সুই প্রবেশের পূর্বেই নিশ্চিত হওয়া দরকার যে এটি এইচআইভি বীজানু বহন করছে কি না। এজন্য ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই তা জীবানুমুক্ত করে নেয়া জরুরী। আর এক্ষেত্রে একবার ব্যবহার উপযোগী সিরিঞ্জ ব্যবহার করাই শ্রেয়। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ফেলে দেয়া পুরনো ইনজেকশনের সিরিঞ্জকে পুনরায় বাজারজাত করে থাকে। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন সংক্রমক রোগের বীজানু অনুপ্রবেশের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই এ ব্যাপারে জনসচেতনা এবং সরকারী কঠোর নিয়ন্ত্রন অত্যন্ত জরুরী।

 

রক্ত পরিসঞ্চালনে সতর্কতা

এছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন চিকিৎসা ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। কিন্তু জরুরী প্রয়োজনে রক্ত গ্রহণ করতে গিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে ভয়ংকর এইচআইভি বীজানু। তাই রক্ত গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই সঠিকভাবে রক্ত পরীক্ষা করে নেয়া অত্যন্ত জরুরী। যদিও এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে ব্যাপক অবহেলা পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করে অদক্ষ ও অশিক্ষিত টেকনিশিয়ান দ্বারা রক্ত পরীক্ষা করিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অগ্রিম সীল ও স্বাক্ষরযুক্ত রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে নামী-দামী অনেক প্রতিষ্ঠানের নামেও অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিকে পরীক্ষা করানো উচিত।

মাতৃত্বকালীন সতর্কতা জরুরী

এইচআইভি বীজানু মায়ের শরীর থেকে খুব সহজেই গর্ভস্থ শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে অত্যন্ত সতর্কাবস্থা জরুরী। প্রসবকালী সময়ে এইচআইভি বহণকারী মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে।

এক্ষেত্রে করণীয়:

১। গর্ভাবস্থায় এইচআইভি প্রতিরোধকারী ওষধ নিয়মিত ব্যবহার করা।

২। সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান করা।

৩। বাচ্চাকে বোতলের দুধ খাওয়ানো। তবে জিডোভুডিন ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস করা যায় এবং সন্তানকে মায়ের দুধ পান করানো যায়। কিন্তু এরপরও এইচআইভি সংক্রমনের ঝুঁকি রয়েই যায়। ধারণা করা হয় যে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমনের ১০ভাগ মায়ের দুধের মাধ্যমেই সংক্রমিত হয়।

মনে রাখতে হবে যে মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার শরীরে এইচআইভি সংক্রমন প্রতিরোধে যে সকল সতর্কতার কথা বলা হয়েছে তার কোনটাই শতভাগ কার্যকরী পন্থা নয়, পদ্ধতিগুলো ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে মাত্র, ঝুঁকিমুক্ত করে না।

 

উল্কি হতে পারে এইচআইভি বাহক

ইদানিং পাশ্চাত্য সমাজের অন্ধ অনুকরণে তরুন সমাজ শরীরে উল্কি অঙ্কনের দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছে। তরুন সমাজ শরীরে উল্কি অঙ্কনকে আধুনিকতার নিদর্শন হিসেবে মনে করছে। অথচ উল্কি আদৌ আধুনিক কোন শিল্পকর্ম নয় বরং অন্ধকার যুগেও উল্কি অঙ্কনের প্রচলন ছিল। অথচ পাশ্চাত্য অনুকরনে শরীরে উল্কি অঙ্কন করে আমাদের তরুনরা ভয়াবহ এইচআইভি সংক্রমনের ঝুঁকিকে বাঁড়িয়ে তুলছে। উল্কি অঙ্কনের জন্য ব্যবহৃত সুঁচ এবং কালি হয়ে উঠতে পারে এইচআইভি সংক্রমনের বাহন। অথচ রাসূল (সাঃ) উল্কি অঙ্কনককে নিষিদ্ধ করেছেন।

“আল্লাহর রাসূল অভিষাপ দিয়েছেন উল্কি অঙ্কনকারীনীদের এবং তাদের যারা শরীরে উল্কি অঙ্কন করায়”। -বুখারী।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।