ওরা কালা, বোবা, অন্ধ

সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সামনে এসেই থমকে যাই। সাত সকালে এতোবড়ো ধাক্কা খেতে হবে জানলে হয়তো আজ ঘর থেকে বেরোনো হতো না। এমন কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়ে অন্যরা কেমন করে জানি না, তবে আমি একেবারে বেকুব হয়ে গেলাম।

সূর্যের হাসি ক্লিনিকটা ডাক্তার পট্টিতে। নামে ডাক্তার পট্টি হলেও মূলত পুরো গলিটাই জুয়েলারীর দোকানে ঠাসা। সূর্যের হাসি ক্লিনিকটার পাশে বোধকরি শহরের সবচেয়ে দামী বাড়ীটা সগর্বে মাথা উচু করে দাড়িয়ে। আর ঠিক তার পাশেই মানবতার এমন ভূলুন্ঠিত রূপ দেখে যে কারোরই দিশেহারা হয়ে যাওয়ার কথা।

মোবাইলটা হাতেই ছিল। একবার উঠেও এসেছিল চোখের সামনে। তবুও ছবি তুলতে গিয়েও আবার হাতটা গুটিয়ে নেই। এত বড় লজ্জা তো আর জনে জনে দেখানোর বিষয় নয় অবশ্য বলে বেড়ানোও যে উচিত হচ্ছে তা নয়, তবে নিজের অপরাধবোধটা কিছুটা হালকা করতেই বলছি সবাইকে।

সূর্যের হাসি ক্লিনিকটার সামনেই একটা পঁচা আবর্জনায় ভরা ডাস্টবীন। ডাস্টবীনের সামনেই হাটুগেঢ়ে বসে আছে লোকটা। ডাস্টবীনের ভীতরে ঝুকে নেড়ে চেড়ে বেড় করে আনছে কিসব যেন, আর একমনে চেটেপুটে খাচ্ছে, গর্বের সাথে ডাস্টবীনে ফেলে দেয়া আভিজাত্যের প্রতীক যত উচ্ছিষ্ট।

আমি বারবার ভাবি, কেন আমাকেই বার বার মুখোমুখি হতে হয় এমন বাস্তবতার সাথে। সমাজে যাদের উচু স্তরের বাস, তাদের চোখে কেন ধরা পড়েনা এসব বাস্তবতা। খাবারের টেবিলে আমরা যতটা না খাই তারচেয়ে বেশী অপচয় করা পছন্দ করি বরং বলা যায় অপচয় করা আভিজাত্যেরই প্রতীক।

বেশ কিছু বড় অনুষ্ঠানে থাকার সুযোগ হয়েছে আমার, ঢাকা শেরাটন ও প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডিনার করার সুযোগ হয়েছে, বলা বাহুল্য যে সবই অন্যের পয়সায়। সব অনুষ্ঠানেই একই চিত্র, কে কতটা খেতে পারবে তা মূখ্য নয় বরং কে কতটা খাবার প্লেটে রেখে উঠে যাবে সেটাই যেন সবার ব্রত, সবাই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কতটা অপচয় করে আভিজাত্যের প্রমাণ দেখাতে পারে। আর আমি যখন প্লেট আর আঙ্গুল চেটেপুচে খাই তখন অনেকেই চোখ বড় বড় করে তাকায়, খুব কাছের বন্ধুরা অনেকেই আমার আচরণে বিব্রত হন।

অথচ আমি নিরূপায়, খাবার টেবিলে বসলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে সেসব হাড় জিড়জিড়ে অপুষ্ট শিশুদের মুখ। আমরা যখন তিন বেলা খাবারের অপচয় করি তখন বিশ্বের একশ কোটি লোক দারিদ্রের কারণে অভুক্ত থাকে। প্রতি সাড়ে তিন সেকেন্ডে যখন একটি একটি করে প্রাণ প্রদীপ নিভে যায় দারিদ্রের অভিষাপে তখন অপব্যয়ের নামে আভিজাত্য দেখানোর ধৃষ্টতা কেন? নিজের চোখে বারে বারে দেখছি ডাস্টবিন ঘেটে খাওয়া অসহায় মানুষগুলোকে, তারপরও আভিজাত্যের নামে অপচয় আর অপব্যয় কি করে করি?

দারিদ্র শুধু শহরের বিষয় নয়, কিংবা নয় কেবল গ্রামাঞ্চলের অভিষাপ, বরং দারিদ্র মানবতার কলঙ্ক। ঢাকা শহরে ডাস্টবীন ঘেটে খাওয়া মানুষদের দেখে ভাবতাম, গ্রামাঞ্চলে বুঝি এমন দারিদ্র দেখা যায় না। কিন্তু আজ ঝালকাঠীর মতো ক্ষুদ্র একটি শহরেই যখন ডাস্টবীন ঘেটে খাওয়া মানুষের দেখা পেলাম, আমরা যে কতটা অসহায়, দেশের মানুষ কতটা যে কষ্টে থাকতে পারে তা বুঝতে আর কষ্ট হয় না। আমরা সোমালিয়া, সুদানের দারিদ্রের গল্প করি, কিন্তু আমরা যে কতটা দরিদ্র তার খোঁজ কজন রাখে? দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ যে কত কষ্টে থাকতে পারে তা উচু স্তরের ব্যবসায়ী, আমলা আর রাজনীতিবিদের চোখে ধরা পরে না। ওরা কালা, ওরা বোবা, ওরা অন্ধ। অভিজাতজনেরা আলোর পানে ফিরবে কি কোন দিন!!!

Be Sociable, Share!

3 Replies to “ওরা কালা, বোবা, অন্ধ”

  1. বলেন কি!
    আমারও একটা ধারণা জন্মেছিল গ্রামে মনে হয় দরিদ্র লোক কমে গেছে।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    জি ভাই, আমি যে কিরকম চমকে গেলাম তা কাউকেই বোঝানো সম্ভব নয়, যে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় নি তার পক্ষে কল্পনাও করা কঠিন।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।