নির্ভিক গোলাম আযম : শক্তির উৎস কি?

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম-বরিশাল, ঘাতক দালাল নিমূল কমিটি এবং আরো আধডজন কমিটির আয়োজনে শহীদ মিনারে বিজয়ের ৪০ বছর উৎযাপন উৎসবে যোগ দিলাম। চারশ’ এর মতো আসন দিয়ে সাজানো শহীদ মিনার চত্তরের পুরোটাই প্রায় ফাঁকা। প্রথম সারিতে পাঁচ-ছ জন দর্শক, ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কিছু দর্শক এবং শেষ সাড়িতে বেশ কিছু দর্শক নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করছে। সব মিলে অনুষ্ঠানে পয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন দর্শক। মাঝের সারিগুলো প্রায় ফাঁকা রেখে শেষের সারিতে বসা দর্শকদের দেখে সহজেই অনুমান করা যায় পড়ন্ত বিকেলে আমার মতো ক্লান্ত শ্রান্ত পথচারী আর রিক্সাওয়ালারা দখল করেছে আসনগুলো। শহীদ মিনারে কে বক্তৃতা দিল, কি নিয়ে আলোচনা করলো তাতে তাদের কিই বা আসে যায়, কাজের ফাঁকে একটু বসার সুযোগ মিলেছে, এতেই খুশী সবাই। দর্শকদের মাঝে মেয়েদের সংখ্যাই বেশী, পুরুষের মাঝে দাড়ি-টুপীওয়ালা দেখলাম কয়েকজন। বুঝতে পারলাম, এরাই প্রকৃত শ্রোতা, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আগড়ম বাগড়মের জোর কতো তা-ই পরখ করতে এসেছে হয়তো।

একের পর এক বক্তা মেশিনগানের মতো কথার ফুলঝুড়ি ছুড়ছেন, জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধীদের মুন্ডুপাত করছেন, শেষে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে ফিরে যাচ্ছেন নিজের আসনে। প্রতি বক্তার যুদ্ধ শেষেই সভাপতি হাততালি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন, তবে ক্লান্ত দর্শকের কেউই হাততালি দেয়ার মতো ন্যূনতম ভদ্রতাটুকু বজায় রাখলো না। সর্বশেষে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, বরিশাল অঞ্চলের প্রধান সভাপতির বক্তব্য দিলেন। গোলাম আযম কি করে এতো নির্ভিক, তার শক্তির উৎস কি জানতে চান তিনি। বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রত্যয় জানিয়ে তিনিও এক সময় ফিরে আসেন নির্ধারিত আসনে। তবে দূর্ভাগ্য এই যে, এতক্ষণ যিনি সবার বক্তব্য শেষে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করেছেন, তার বক্তব্য শেষে তার প্রতিদান দিতে কাউকেই সক্রিয় দেখা গেল না।

ভারী অবাক হলাম। হাটে ঘাটে একজন সামান্য ক্যানভ্যাচার, যে সকল গোপন রোগ সারানোর মিথ্যে আশা দিয়ে শালসা বিক্রি করে, তার মজমায়ও হাততালির তুফান ওঠে, অন্তত শ’খানেক দর্শক তাকে ঘিরে থাকে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাচার দিয়ে সাজানো মঞ্চে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ হলো, সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র আগ্রহ জাগাতেও তা ব্যর্থ হলো, এর চেয়ে বড় ট্রাজেডী আর কি হতে পারে? সম্ভবত একমাত্র মনোযোগী স্রোতা এই আমি পেছনের সারিতে বসে মনে মনে হেসে উঠি। হায়রে সভাপতি, চোখ থাকতেও অন্ধ কেন তুমি? তোমার সামনে বসা সামান্য কটা দর্শকের মনেও তুমি যুদ্ধাপরাধের বিচার নামে বিরোধীমত দলনের শালসা গেলাতে পারলে না, সামান্য একটা হাততালি পর্যন্তও পেলে না, তারপরও বুঝতে পারো না গোলাম আযমের শক্তির উৎস কোথায়? গোলাম আযমের শক্তির উৎস কোথায় তা জানার আগে তোমার দূর্বলতা কোথায় তাকি একবারও ভেবে দেখবে না? মিথ্যা নাটক দেখে রোমাঞ্চিত হওয়া যায়, বিশ্বাস করা যায় না  । যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে তোমাদের মানবতাবিরোধী অপরাধও আজ আর কারো অজানা নয়। মুখোশ ছিড়ে মিথ্যাচার বেরিয়ে এসেছে।  মিথ্যাচারই তোমাদের মহাদূর্বলতা।

অনুষ্ঠান শেষে আরেকটু এগিয়ে বিবির পুকুর পাড়ে সরকারী অফিস দখল করে সাজানো আ’লীগ অফিসের কাছে দাড়ালাম। “আমার সোনার ময়না পাখি” গানের তালে তালে জনতা উদ্বেলিগ। একের পর এক পল্লী গান গেয়ে গেয়ে মাতানো হচ্ছে দর্শক শ্রোতাকে। রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, আগেই সে পর্ব শেষ হয়েছে হয়তো, এখন কেবলই গানের সময়। তবু ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম পুকুরের পাড়ে আদালত পাড়া মসজিদে মাগরিবের নামাজে। কি আশ্চর্য, মসজিদে আজান হতেই গান বন্ধ হয়ে গেল, ঠিক যেমনটি দেখেছি আমার গ্রামে। একশ ফুটের মাঝে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। সারা বছর এমনকি দূর্গোৎসবের সময়ও আযান হলে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢোলবাদ্য বন্ধ থাকতো। মজার ব্যাপার এই যে, একজন মুসলমান হয়তো  নামাজের জামায়াতের সময়সূচী নাও জানতে পারে, কিন্তু মন্দিরের পুরোহিত ঠিকই সময়সূচী জেনে নিতেন যাতে নির্বিঘ্নে সবাই নামাজ পড়তে পারে। নামাজ শেষে যখন আ’লীগ অফিস পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি, তখনো দর্শকেরা অধীর আগ্রহে বসে। কিছুক্ষণ যেতেই আবার গানের তালে তালে উল্লসিত হয়ে ওঠে জনতা, ঠিক যেমনটি হতো আমার গ্রামে, নামাজে জামাত শেষে বেজে উঠতো যেমন মন্দিরের ঢোল-বাদ্য।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতা জানেন না গোলাম আযমের শক্তি উৎস কোথায়, কিন্তু নামাজ শেষে আমার কাছে পরিস্কার হলো তা। যে একত্ববাদের দাওয়াতে, যে আযানের সুমধুর সুরে মুহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় আ’লীগ মঞ্চের সকল গান-বাজনা, মন্দিরের ঢোল-বাদ্য, সে একত্ববাদের অনুসারী যারা তাদের শক্তির উৎস তো একমাত্র আল্লাহ। আর কেবল আল্লাহতেই যার ভয়, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামের রঙ্গমঞ্চে তার কিই বা এসে যায়?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“নির্ভিক গোলাম আযম : শক্তির উৎস কি?” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. majid biswas বলেছেন:

    যারা অন্ধ তাদেরেক দেখাবেন কি ভাবে?এরাই জাতিকে ধংস করছে।দেশের সত লোকদের বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে তাদের হীন স্বাথ রক্ষায় তারা বঃস্ত

    [উত্তর দিন]

  2. vision2021 বলেছেন:

    Thanks a lot

    [উত্তর দিন]

  3. মোবাশ্বের আহমেদ বলেছেন:

    ভাই ছাপালে ভালো হবে ।
    থার্টিফাস্ট নাইট এ রেড সিগন্যাল !
    অর্থহীন নগ্নতার পিছু নিত্য অযথাই দৌড়ঝাঁপ
    সব ভালোবাসাতেই আজ যৌনতার তীব্র অভিশাপ
    বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সভ্যতাকে প্রলয়ের চৌমাথায়
    সভ্যতা যেথায় হারাচ্ছে নিজেকে রাস্তার ভিন্নতায় ।
    সভ্য নাগরিক কথাটাই আজ অচ্ছুত্‍
    অসভ্যতার ডামাডোলে নীরবে নিয়েছে বিদায়
    নব নব অপসংস্কৃতির আগমনে হারাচ্ছে স্বকীয়তা
    বাঙ্গালীত্ব আর পাশ্চাত্বের নামে অবাধ যৌনতা
    গ্রাস করছে সুস্থ মন সুন্দরের পুজারী মানসিকতা ।
    পার্টি ক্লাব হোয়াইট হ্যালোইন আধুনিক নাগরিকদের রাইট
    যৌনতার পাপের সাগরে ডুবাতে যেন এসেছে থার্টিফাস্ট নাইট ।
    ধর্ম মানবতা সত্যের পথ থেকে ক্রমান্বয়ে ডাকছে আঁধারের ফ্রয়েড
    যৌনতাই যেখানে শেষ কথা সেখানে সর্বদাই সিগনাল রেড !
    এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষ
    রংপুর মেডিকেল কলেজ ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন