পুলিশের পদতলে হাসিনার জান্নাত!

পুলিশের পদতলে (বুটের তলায়) শেখ হাসিনা খুঁজে পেয়েছেন বেহেস্‌ত (বিশ্বশান্তির মডেল)। শেখ হাসিনা গতকাল জাতিসংঘে ৬৬ তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা না হওয়ায় উপস্থিত সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ শেখ হাসিনার শান্তির মডেলের বিন্দু বিসর্গ বুঝতে পেরেছেন কি না জানি না, তবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্ববিবেক শেখ হাসিনার শান্তি প্রক্রিয়ার সচিত্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। শেখ হাসিনার সচিত্র বিশ্বশান্তির মডেল দেখে বিশ্বের অনেক দেশই নড়েচড়ে বসেছেন, বিশেষ করে গলা বুটের তলায় পিষ্ঠ করে কি করে বিরোধী মতের সমর্থকদের কন্ঠ স্তব্ধ করে দেয়া যায়, কি করে নিরস্ত্র একজন বিরোধী মতের সমর্থককে গলির মাঝে অবরুদ্ধ করে চারিদিক থেকে ঘিরে পিটিয়ে পিটিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে হাকিয়ে নেয়া যায়, কি করে এ্যাপ্রোন পরা ডাক্তারকে হাসপাতাল থেকে ধরে এনে প্রকাশ্যে গরুর মতো পিটিয়ে পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা যায়,  কি করে সরকার দলীয় প্রধান হয়েও সকল মতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বিরোধীমতকে নিশ্চিহ্ন করার মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়, কি করে প্রশাসন আর দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে কলকাকলীতেমুখর বাংলাদেশকে শ্মশানের নিস্তব্ধতায় স্তব্ধ করা যায়।

আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভাড় অথবা ভারপ্রাপ্ত) সাজেদা চৌধুরী অতীতের মতো এবারো প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। দলীয় ক্যাডারদের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে। তার ভাষায় : “একাত্তরের পর জামায়াত-শিবিরকে আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এবার আর ছাড়ব না। যাদের ধরা হয়েছে, তাদের বিচার করা হবে। আর বাকিদের মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। রাজাকারদের ভর্তা করে না খেয়ে আমরা বাড়ি ফিরে যাব না। বঙ্গবন্ধু হত্যা, চার নেতা হত্যাসহ সব হত্যার প্রতিশোধ আমরা নেব”। আর তার এমন জঙ্গীমুর্তি দেখে আতংকিত হয়ে পড়ে দেশবাসী, প্রবীনদের চোখে ভেসে ওঠে স্বাধীনতা পরবর্তী বাকশালের পৈশাচিকতার বিভৎস্য দৃশ্য, ভেসে ওঠে রক্ষিবাহীনির বর্বরতায় ক্ষতবিক্ষত বাংলার মুখ। তাই কৌশলগত কারনে অনিবার্য সংঘাত এড়াতে চারদলীয় জোট আহূত হরতালে মাঠে নামেনি বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা। এর পরও রেহাই মেলেনি সাধারণ জনতার। আট দশজন জামায়াত কর্মীর ছোট্ট একটা মিছিল বেরোতেই হামলে পরে পুলিশের পোষাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রক্ষিবাহিনী। মুহুর্তে দিগ্বিদ্বিগ জ্ঞানশুন্য হয়ে জামায়াত কর্মীরা পালায় আশে পাশের অলি-গলি, অফিস ভবনে। তবে রক্ষে পায় না অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অফিসের পোশাকে সুসজ্জিত অফিসারকে যখন টেনে হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়, তখনো তার শরীরে শোভা পায় প্যান্টে সযতনে ইন করে পড়া ইস্ত্রি করা শার্ট, শার্টের পকেটে বলপয়েন্ট পেন, বুটের পৃষ্টনে পকেট থেকে আস্তে আস্তে ভূলুন্ঠিত হয় জ্ঞানের প্রতীক কলম। আতংকিত যুবক অস্ফুটস্বরে বার বার বলার বৃথা চেষ্টা করে, “আমিতো না স্যার, আমিতো না স্যার’, পাশ থেকে ভেসে আসে পুলিশের পোষাকের আড়ালে এখনো নীভু নীভু মানবতা নিয়ে টিকে থাকা কোন কনস্টেবলের বিলাপ, ‘মাইরেন না স্যার”, তবু পিশাচের উল্লাস বাড়ে বৈ কমে না এতটুকু।  আর এভাবেই যেন পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে ছটফটিয়ে মরে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। অসির চেয়ে মসি শক্তিশালী বলে যে প্রবাদের প্রচল হাজার বছর ধরে, একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে আওয়ামী পুলিশি নির্মমতায় তা ভুল প্রমাণিত হলো। প্রমাণিত হলো বাংলাদেশের সবুজ জমিন মায়ামৃগের বিচরণভূমি নয়, হায়েনা আর শারমেয়র অভায়রণ্যে ক্রমাগত পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ।

উপমহাদেশে হরতাল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশের সকল বড় অর্জনের পেছনে হরতালের ভূমিকাই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে বিগত আমলে অকারণে হরতাল দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে, যুবলীগের নেতৃত্বে গান পাউডার দিয়ে পাবলিক পরিবহনে নিরীহ মানুষদেরকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ হরতাল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতির সঞ্চার করে। হরতালের মাধ্যমে যদিও অতীতে বড় বড় জাতীয় অর্জনগুলি আদায় করেছে বাংলাদেশ তবুও বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ইস্যুবিহীন হরতালে অর্জন ছিল শুন্যের কোঠায় ববং হরতাল নামে দাবী আদায়ের মোক্ষম অস্ত্রটির বেপরোয়া ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হরতালের ব্যাপারে বিতশ্রদ্ধ করে তোলে আওয়ামী লীগ। কিন্তু হরতাল ডেকে যদি সাধারণ মানুষকে হরতাল পালন কিংবা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে সে হরতালে সাধারণ মানুষের সত্যিকারের মতামতের প্রতিফলন হয়। আর তাই সরকারের সর্বোচ্চ বাধারমুখেও বিগত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ডাকা হরতালে প্রায় একযুগ পরে আবার সাধারণ মানুষ অভুতপূর্ব সাড়া দিয়েছে, প্রমাণিত হয়েছে, এ হরতাল নিছক চারদলীয় জোটের হরতাল নয়, এ হরতাল গণমানুষের স্বাধীকার আদায়ের হরতাল, সময়ের প্রয়োজনে হরতাল।

না, এবারের হরতালের আগের রাতে দেশের কোথাও জ্বালাও পোড়ানোর কোন ঘটনা ঘটেনি, হরতালে বিএনপি মাঠে নামতে পারেনি (আ’লীগ সাধারণ সম্পাদকের মতে, অতীতের হরতালের একশ ভাগের একভাগও সক্রিয় ছিল না বিএনপি), মাঠে নামতে পারে নি জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাও (রাজপথে মাত্র ৫টি ঝটিকা মিছিল দেখেছে পত্রিকাগুলো যা শুরু করার সাথে সাথেই পুলিশের নির্যাতনে ভন্ডুল হয়ে যায়), পুরো রাজপথ ছিল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন, র‍্যাব-পুলিশ আর দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের বুটের আঘাতে প্রকম্পিত। আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের দেখা গেছে প্রশাসনের সাথে সাথে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিতে, দেখা গেছে দেশের অলিগে গলিতে আওয়ামী ক্যাডারদের রণসাঁজে। তবে এতকিছুর পরও দেশ প্রায় একযুগ পর প্রত্যক্ষ করলো এমন হরতাল, যাতে জনতার সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল স্বত:স্ফূর্ত। টিভি সংবাদে স্পষ্ট, হরতালে যানবাহন চলেনি, অফিস আদালতে কাজ হয় নি, বন্দরে কাজ পণ্য লোডিং-আনলোডিং হয়নি, স্কুল কলেজ ঘন্টা বাজেনি, কেবলমাত্র যাত্রীশূন্য রেল পথে রেল চলাচল ছিল কিছুটা স্বাভাবিক। এ সব কিছু প্রমাণ করে, দেশের মানুষ কষ্টে আছে। এ সবকিছুই প্রমাণ করে দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারকে ছুড়ে ফেলতে বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে। শুধুমাত্র একটা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা, কেবলমাত্র সঠিক নেতৃত্বের অপেক্ষা।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“পুলিশের পদতলে হাসিনার জান্নাত!” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. আল আমিন বলেছেন:

    দেশের মানুষ অনেক কষ্টে আছে। তাদের মুখে আজ হাসি নাই। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তির মডেল দিলেন। হায়রে দুনিয়া! নিজের ঘরই ঠিক নাই অন্যকে উপদেশ দিতে যায়।

    বাংলার মানুষ আর বসে থাকবে না। আওয়ামী নরক থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য আজ প্রয়োজন সম্মেলিত ঐক্যের।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন