ব্যাগভর্তি ভারতীয় টাকায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়

নির্বাচনের কিছুকাল আগের কথা। আমার জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থানীয় এক ভদ্রলোক স্বগোত্রীয় জনৈক ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আমার অফিসে পরামর্শের জন্য আসেন। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আমার কিছুটা জানাশোনা থাকায় এবং এলাকায় খুবই শান্তিপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকায় ভদ্রলোক তাদের সমস্যার জন্য সম্ভবত আমার পরামর্শ নেয়াটাই নিরাপদ মনে করেন। সমস্যাটি মূলত ভদ্রমহিলার। জানতে চান, ভারত থেকে বেশ কিছু টাকা আসবে, তা কিভাবে তিনি পেতে পারেন তার সহজ পদ্ধতি আমাকে বাতলে দিতে বললেন। ভাবলাম, সম্ভবত তার কোন আত্মীয় বা স্বামী-সন্তান জীবিকার টানে ভারতে বসবাস করে থাকবেন। আমি জানি, সবচেয়ে দ্রুততার সাথে দশ মিনিটেই টাকা গ্রহণ করা সম্ভব, যা ব্যাংকের ভাষায় ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ, স্পীড ক্যাশ কিংবা স্পট ক্যাশ ইত্যাদি নামে পরিচিত। তবে তার একটা সীমা আছে, তখনকার সময় সাধারণত ৩ লাখ টাকার বেশী একসাথে পাঠানোর সুযোগ ছিল না। তাদেরকে জানালাম, যতদূর জানি, সহজে পেতে হলে অমুক অমুক এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে দশ মিনিটেই টাকা পাঠানো সম্ভব, তবে তার পরিমান ৩ লাখের বেশী হবে না, আর স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার যেহেতু বাংলাদেশে শাখা আছে, ওদের মাধ্যমেও টাকা আসতে পারে, তাতে কয়েকটা দিন বেশী লাগবে সময়। ভদ্রমহিলা এবার কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, এর চেয়ে বেশী হলে টাকা পেতে কত সময় লাগবে? এবার আমি কিছুটা বিস্মিত, ভদ্রমহিলার বেশভূষা এবং কথাবার্তায় তাকে স্বচ্ছল পরিবারের ঘরণী বলে মনে হয়নি, অবশ্য এদেশীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চলনবলনে অর্থনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয় না। হিন্দু ধর্মাবলম্বী যে লেইস-ফিতা ফেরীওয়ালা গ্রামে গ্রামে চূড়ি লিপস্টিক ফেরী করেন তিনিও তার মেয়ের বিয়েতে লক্ষাধিক টাকার যৌতুক দেন, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। তাই ভদ্রমহিলার প্রশ্নে কিছুটা বিস্মিত হলেও সামলে নেই। জানতে চাই কত টাকা আসবে বিদেশ থেকে। এবার আরো কিছুটা কুন্ঠিত হয়ে ভদ্রমহিলা জানালেন বেশ কয়েক কোটি টাকা। ভদ্রমহিলার কথায় আমার আক্কেল গুড়ুম, বলেন কি মহিলা, মাথার স্ক্রু ঠিক আছে তো? জিজ্ঞেস করলাম, এত টাকা কেন আসবে, কে পাঠাবে? ভদ্রমহিলা জানালেন, তাদের একটা সংগঠনের জন্য দান হিসেবে এ টাকা পাঠানো হবে। পাশে বসা ভদ্রলোক ইতোমধ্যেই উঠে পড়ার জন্য হাসফাস করছেন, সম্ভবত ভদ্রমহিলা প্রয়োজনের বেশী কথা বলে ফেলেছেন। তাদের জানালাম, বেশী টাকা হলে ইসলামী ব্যাংকে একটা একাউন্ট খুলে টাকা পাঠাতে বলেন, ওদের নেটওয়ার্ক বেশ বড়, সহজেই টাকাটা ওরা কালেকশন করে দিতে পারবে। তবে এ পর্যন্ত ওদের সাথে আমার আলাপ-আলোচনা, ভবিষ্যতে ওরা আর আমার কাছে আসে নি, টাকাগুলো কোন ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে, কাদের কাছে এসেছে, কি কাজে এসেছে, এর উপকারভোগীই বা কারা তা আর জানা হয় নি।

এর কিছুকাল পরেই নির্বাচন। নির্বাচনে একটি সেন্টারে আমাকেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক কথায় আমার সেন্টারে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এখনো আমার মোবাইলের সেন্ড আইটেমে সংরক্ষিত আছে, নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বাসার মোবাইলে লেখা এসএমএস “Free & Fare election going on, no problem”. তবে নো প্রবলেম বললেও একটা ভয়ংকর প্রবলেম আমার চোখে ধরা পড়ে। নির্বাচন শুরু থেকে দুপুর ১২ টার মাঝেই প্রায় শতভাগ হিন্দু ভোটারদের ভোট কাস্ট হয়ে যায়, বাকীর খাতায় কেবল মুসলমানদের নাম, এবং আরো স্পষ্ট করে বলতে অধিকাংশই জাতীয়তাবাদী-ইসলামী শক্তির ভোটারদের ভোটই বাদ থেকে যায়। আমি আমার সেন্টারে নির্বাচনী কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য এতটাই নিমগ্ন ছিলাম যে, এ নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য সুক্ষ্ম কিংবা স্থুল কোন কারচুপির চিন্তাভাবনা করারই ফুসরত ছিল না আমার। কিন্তু দেশব্যাপী নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরই সবকিছু পরিস্কার হতে শুরু করে, সহজেই দুয়ে দুয়ে চার মিলতে শুরু করে।

বিগত নির্বাচনে সমঝোতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে এমন তথ্য ফাঁস করে ফেঁসে যান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ওরফে ট্র্যাম্পকার্ড জলিল। বিগত চারদলীয় সরকারের আমলে বিশেষ কোন শক্তির সহায়তায় আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ছক কষেছিল যা ট্র্যাম্পকার্ড ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত হয়। তবে সে যাত্রায় আবদুল জলিলের অতি কথনে সরকার সতর্ক হয়ে যায়, ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আবদুল জলিল অতি কথনের ফাঁদে আবারো ফাঁস করেন নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা, স্বীকার করেন আতাতের মাধ্যমে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ী হওয়ার কথা। সে সময়ে আব্দুল জলিলের কথায় অনেকে কর্ণপাত করেছেন, আবার অনেকেই আব্দুল জলিলের মাথাটাই নষ্ট হয়েছে বলে সন্দেহ করেছেন। তবে দিনে দিনে ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগের একতরফা আত্মসমর্পন, দেশ বিরোধী একের পর এক চুক্তি, দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে ভারতকে করিডোর প্রদান সবকিছুই বিগত নির্বাচনে ভারতের অনৈতিক ক্রীয়াকর্মকে স্পষ্ট করে। আর সবকিছুকে ছাঁপিয়ে যখন “ভারতের ব্যাগভর্তি টাকা ও বুদ্ধিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে” দ্যা ইকোনমিস্ট পত্রিকা রিপোর্ট ছাঁপে তখন বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ আরেকবার পরিস্কার হয়ে যায়। হ্যা, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের চরিত্র ধুতুরা ফুলের মতো পবিত্র প্রমাণে প্রতিবাদ জানিয়েছে, ইকোনমিস্ট পত্রিকা তা ছেঁপেছেও, তবে মূলত যাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে পত্রিকাটি রিপোর্ট করেছে, সেই ভারত সরকার কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের দাদাগিরিকে অস্বীকার করে নি, কোন প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন বোধ করে নি। আর এ দ্বারা আরেকবার স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলাদেশের রাজনীতি এদেশের জনগণের হাতে নয়, এদেশের রাজনীতিবিদদের হাতে নয় বরং রাজনীতির নাটাই প্রতিবেশী দেশের দাদাদের হাতেই শোভা পায়।

আওয়ামী লীগ ভারতের টাকায় চলে, আওয়ামীপন্থী কিছু পত্রপত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ভারতের অর্থে পরিচালিত হয় এমন গুজব অনেক পুরনো। আর ইকনমিস্টের এ রিপোর্টের ফলে কিংবা পরবর্তী সময়ে কোন গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতেই যে ভারতের দাদাগিরি থেমে যাবে তার কোন যুক্তি নেই বরং ভারতের টাকাগুলো বাংলাদেশের কোন কোন খাতে ঢালা হয়, কাদের কাদের হাতে দেয়া হয়, কিভাবে খরচ হয় ভারতীয় ঘুষের টাকা তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কারন ভারতের আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে শুধু জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতায় আসলেই চলবে না বরং ভারতের টাকায় রোপন করা বৃক্ষগুলো চিহ্নিত হওয়া উচিত এবং সম্ভব হলে নিশ্চিহ্ন করা উচিত।

ধারনা করা যায়, ভারত তাদের বিশ্বস্ত বিশেষ এক জনগোষ্ঠির মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে চলেছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঐ বিশেষ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে অভ্যস্ত নয়। আর এ কারনে ঐ বিশেষ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগকেই একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করে, যেহেতু আওয়ামী লীগও ভারতের আস্থাভাজন ও বাংলাদেশের চেয়ে হিন্দুস্তানের প্রতি বেশি অনুগত। কিন্তু এ বিশেষ জনগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তির মাথাব্যথার কারন নয়, বিশেষ করে এ জনগোষ্ঠীর প্রায় শতভাগ বিরোধিতা সত্ত্বেও অতীতে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তি দেশ শাসন করেছে। তাই আগামীতেও এ জনশক্তির একটি ভোটও যদি জোটের বাক্সে না পরে তবে তাতেও খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি খতিয়ে দেয়া প্রয়োজন তা হলো ঘরের শত্রু বিভীষণ। বিগত নির্বাচনে ভারতের ব্যগভর্তি টাকায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে এ কথা যেমন দিবালোকের ন্যায় সত্যি, ঠিক তেমনি সত্যি এ টাকা শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের নেতারা হজম করে নি। এ টাকার ভাগ পেয়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত, ভাগ পেয়েছে সম্ভবত দেশের প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ। তবে যে আশংকাটি আমাকে সবচেয়ে বেশী ভাবিয়ে তোলে তা হলো বিএনপির নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা ভারতপন্থী ও বামপন্থী নেতৃত্ব। স্পষ্ট মনে আছে বিগত নির্বাচনে যেখানে আওয়ামী লীগ একজন ভোটারের কাছে দশবার ভোট ভিক্ষা চেয়েছে, রাতের আধারে ভারতীয় টাকা গুজে দিয়েছে, সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে অনেকক্ষেত্রেই একজন ভোটারের কাছে একটিবারও ভোট চাওয়া হয় নি এমন নজীর বিরল নয়। অন্তত আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় এমন হাজারো নজীর দেখাতে পারি। যেখানে আমার এলাকায় আওয়ামী লীগের পতিত নেতাদের পক্ষে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব, সেখানে বিএনপির নেতৃত্বকেও আড়ালে আড়ালে কখনো বা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্যাম্পেইন করতে দেখেছি। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ২৮ শে অক্টোবরের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পরেও বিএনপির অনেক নেতা কেন রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন না, দলের প্রতি কেন মিছে অভিমানের ভান করে পরোক্ষভাবে, কখনো বা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষেই কাজ করেছেন?

গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাবীতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন উর্ধ্বমূলের প্রতিবাদে, শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ে দেশ আজ বিস্ফোরণমুখ আগ্নেয়গিরিতে পরিনত। যে কোন মুহুর্তে বাংলাদেশ পরিনত হতে পারে বিক্ষুব্ধ সিডরে। পতন হতে পারে সীমাহীন দূর্ণীতি আর ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে যাওয়া আওয়ামী জালিমশাহের। আর সে ক্ষেত্রে আবারো জাতীয়তাবাদী-ইসলামী শক্তিকেই যে সাধারণ জনতা তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেবে তা প্রায় নিশ্চিত। তবে এ সব সমীকরণ তখনই সম্ভব হবে যখন ঘরের শত্রু বিভীষণদের চিহ্নিত করা যাবে, তাদের অপতৎপরতা নিশ্চিহ্ন করা যাবে। তাই ভারতের সেবাদাস সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হলে সর্বাগ্রে নিজেদের মাঝেই শুদ্ধি অভিযান জরুরী। যেখানে ঐক্যই সাফল্যের মূল কথা, সেখানে সর্বদিক থেকে কোনঠাসা বিএনপির নেতৃত্ব যখন প্রকাশ্য রাজপথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে হাসির পাত্রে পরিণত হন, তখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ব্যাগভর্তি ভারতীয় টাকায় উদরপূর্তি করা লোকের সংখ্যা বিএনপিতেও কম নয়। তাই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষার স্বার্থে, দেশের ১৬ কোটি মানুষের ভবিষ্যতকে ভারতীয় আগ্রাসনের কবল থেকে মুক্ত রাখার প্রত্যয়ে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে অবশ্যই নিজেদের ঘর গোছাতে হবে, ব্যাগভর্তি ভারতীয় টাকায় উদরপূর্ণকারী নেতাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং সময়-সুযোগমতো দল থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। নচেৎ রাজনৈতিক এসকল বিষফোড়া থেকেই ভয়ংকর ক্যন্সার সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়।

তাই আসুন, সোনার বাংলার গুলবাগে ভারতীয় টাকায় বেড়ে ওঠা আগাছাগুলো চিহ্নিত করনে সর্বশক্তি নিয়োগ করি।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন