ক্ষমা করে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করলেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান

একজন খুনি! তার পরিচয় একটাই, খুনী! আইনের দৃষ্টিতে সে কারো সন্তান নয়, নয় কারো পিতা, ভাই, আত্মীয়-স্বজন! আইনের দৃষ্টিতে তার একটাই পরিচয়, সে খুনি। তবে, খুনের কিছু ধরণ আছে, কেউ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে খুন করে বসে, আবার কেউ কেউ ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে খুন করে। আবার রসূ খাঁর মতো কেউ কেউ ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার, খুনই যাদের একমাত্র পেশা, খুনই যাদের অতৃপ্ত নেশা। সব খুন যেমন সমান নয়, সব খুনের বিচারও অনেক সময় এক রকম হয় না। তবে খুন করে কেউ আইনের হাত থেকে বেঁচে যাক তা কারো কাম্য নয়।  কারন নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোন কারণে যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করে সে যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে হত্যা করে।  কিন্তু খুনী সে যত বড় অপরাধীই হোক না কেন তার চেয়েও বড় অপরাধী যে ঠান্ডা মাথায় ন্যায় বিচারকে হত্যা করে, খুনীদেরকে মুক্তি দেয় আর নিরপরাধ মানুষদের উপর চালায় পৈশাচিক নির্যাতন। আর তাই, একজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত খুনের আসামীকে দলীয় স্বার্থে দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দিয়ে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন। তার এ মহানুভবতায় মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হয়েছে, অসত্যের জয় হয়েছে, অপশক্তির জয় হয়েছে।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে যে সকল সন্ত্রাসী গডফাদারদের কারনে আওয়ামী লীগ বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছিল, যে জয়নাল হাজারী, তাহের, হাজী সেলিম, শামীম ওসমান, মায়া, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, ত্রাসে প্রকম্পিত ছিল পুরো বাংলাদেশ, যে গদফাদারদের পাশবিক নির্যাতনের খবরে ভারী হয়ে আছে ইতিহাসের পাতা, সে শীর্ষ গডফাদারদের একজন লক্ষ্মীপুরের কসাই আবু তাহেরের ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের ফাঁসির দণ্ডাদেশ মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুর শহরের বাসা থেকে নুরুল ইসলামকে অপহরণে করে হত্যা করে, টুকরো টুকরো করে শরীর মেঘনায় ভাসিয়ে দিয়েছিল তাহের বাহিনী। ২০০৩ সালে এই মামলার রায়ে বিপ্লবসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন বিচারিক আদালত। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দির পিতা কুখ্যাত সন্ত্রাসী আবু তাহের কর্তৃক ছেলের প্রাণভিক্ষার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জিল্লুর রহমান “মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হলো” লিখে স্বাক্ষর করেছেন। আর এর মাধ্যমে শিষ্টের দমন ও দুষ্টের পালনের কলঙ্ক জনক আরেকটি অধ্যায় রচনা করলেন জিল্লুর রহমান।

শুধু এবারই নয়, এর আগে ৯ মার্চ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ও উচ্চ আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি আওয়ামী লীগ নেতা আহসান হাবিব টিটুকে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে মুক্ত করেছিলেন জিল্লুর রহমান। ১৯৯৯ সালের ১১ অক্টোবর ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী দিবসে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আয়োজিত  মিছিলে সেদিন হায়েনার হিংস্রতায় হামলে পড়েছিল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা,  নির্মমভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ভারতীয় আগ্রাসণ বিরোধী নেতা আবদুর রাজ্জাককে । অথচ ভারতের সেবাদাস আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় এসেই ন্যায়বিচারকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার উৎসবে মেতে ওঠে, একে একে খুনি, সন্ত্রাসীদের মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, দানবীয় উন্মত্ততায় একে একে বাংলার বুকে ছড়িয়ে পড়ে হিংস্র হায়েনার দল। আর এ সকল অপকর্মকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করছেন জিল্লুর রহমান।

না, এগুলোই শেষ নয়, জিল্লুর রহমান এর আগে নাটোরে যুবদল নেতা ও তৎকালিন  ভুমি উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাতিজা সাব্বির আহম্মেদ গামা হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামীকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষনায়  মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়ির ও অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি অদূরে কামারপাড়া মোড়ে আওয়ামী নরপশুরা প্রকাশ্য দিবালোকে গামাকে হত্যা করে সর্বহারাদের নামে স্লোগান দিতে দিতে চলে যায়। গামা খুনের মামলায় ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় ২০ জন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী মুক্তি লাভ করে যার মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) লাল পতাকার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীও মুক্তি পান। শুধু তাই নয়, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা স্থানীয় সার্কিট হাউসে মুক্তিপ্রাপ্ত ১৪ খুনীকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেন। অপরদিকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মানবতাবিরোধী এহেন অপকর্মের সাফাই গেয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, “সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের যে কোনো দণ্ড মওকুফ করতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির নিজস্ব এখতিয়ার। আসামিরা মৃত্যুদণ্ড মওকুফের জন্য আবেদন করেছেন। আবেদন ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রপতি তাদের দণ্ড মওকুফ করেছেন।”

কি চমৎকার। রাষ্ট্রপতি যখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন, দেশের সংবিধান তাকে তেমন ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। ইচ্ছে হলেই যে কাউকে শুলে চড়াতে পারেন, ইচ্ছে হলেই যে কোন অপরাধীকে মুক্তি দিতে পারেন। আর এতসব ক্ষমতার জন্যই তো তিনি মহামান্য, তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। অথচ মানবতার বিরুদ্ধে, ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে, সত্যের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থানের কারনে জিল্লুর রহমান আজ রাষ্ট্রপতির পদটিকে করেছেন কলঙ্কিত, হয়েছেন আওয়ামী দলতন্ত্রী বাংলাদেশের মহাঘৃণ্য রাষ্ট্রপতি। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে চাটুকারিতায় অপ্রতিদ্বন্দী জিল্লুর রহমান শেখ হাসিনার একান্ত আস্থাভাজন হয়েছিলেন, তৈল মর্দনের তার অভিনব পারদর্শিতায় বিশ্বব্যাপী চামচামির একটি নতুন প্রতিশব্দ হিসেবে চালু হয়েছিল জিল্লুর তেল শব্দটি। আর এই তেলবাজির পুরস্কার স্বরূপ রাষ্ট্রপতির মতো দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পদটিকে নোংরা করার দায়িত্বটিও তিনি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। আর কি আশ্চর্য, রাষ্ট্রপতির কোন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা উপস্থিত হলে গৃহপালিত বেড়ালের মতো কি অদ্ভূত কৃতজ্ঞবদনে মিউ মিউ করেন চারিপাশে, যতক্ষণ তিনি থাকেন, তার পাশে হাত কচলাতে থাকেন, যেন তিনি দেশের প্রধান ব্যক্তিটি নন, তিনি রাষ্ট্রপতি নন, বরং তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিব।

 অথচ একটি বারও জিল্লুর রহমান ভাবলেন না, সেই সব হতভাগা সন্তানের কথা যারা হারিয়েছে তাদের বাবা, ভাবলেন না সেই মা-বাবার কথা যারা হারিয়েছেন তাদের নাড়ী ছেড়া ধন, একটি বারও ভাবলেন না সেই নারীর কথা, যিনি অকালে স্বামী হারানো শোকে বিলাপ করে করে আকাশ ভারী করে চলেছে। তিনি একটি বারও ভাবলেন না তার প্রয়াত স্ত্রী আইভি রহমানের কথা, যিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। জিল্লুর রহমান কি পারবেন আইভি রহমানের খুনিদের রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিতে? যদি না পারেন, তবে আইভি রহমান তার স্ত্রী বলেই তার মৃত্যুর বদলা নেয়া যায়? গামার মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তানেরা, নূরুল ইসলামের মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তানেরা কি মানুষ নয়, তাদের হৃদয় কি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাঁদে না? এভাবে একের পর এক দূর্ধর্ষ খুনী সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় হত্যা-সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েমে বেপরোয়া হয়ে ওঠে তবে দেশটি হয়ে পড়বে বসবাসের অযোগ্য, যে দেশের আকাশে কেবল ঘুরে বেড়াবে লাশ খেকো শকুনের দল। রাষ্ট্র যখন ন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্যায়ের পক্ষ নেয়, সত্যের বিরুদ্ধে অসত্যের পাশে দাড়ায়, মানবতার বিরুদ্ধে পাশবিকতা লেলিয়ে দেয়, ন্যায় বিচারকে হত্যা করে দানবীয় হাতে, তবে সে দেশে শান্তি ফিরাতে গজবই কি শেষ কথা?

ক্ষমার অযোগ্য ক্ষমার অপরাধে শেখ হাসিনার একান্ত সচিব জিল্লুর তেল তেমনি যেন আজ ভয়ংকর কোন গজবেরই অপেক্ষায়।

আসুন দেখে নেই বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া:

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ক্ষমা করে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করলেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান” লেখাটিতে 8 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    ভুল করা মানবিক, ক্ষমা করা স্বর্গীয়

    রাষ্ট্রপতি এই প্রবাদ মেনে চলেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    স্বর্গ থেকে তার স্ত্রীর ডাক এসেছে বুঝি?

    [উত্তর দিন]

  2. Abubakar Siddique Mizi বলেছেন:

    কি চমৎকার। ক্ষমা করে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করলেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।

    [উত্তর দিন]

  3. Abubakar Siddique Mizi বলেছেন:

    তার এ মহানুভবতায় মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হয়েছে, অসত্যের জয় হয়েছে, অপশক্তির জয় হয়েছে।

    [উত্তর দিন]

  4. Abu Sayed বলেছেন:

    কিছু বলার নাই শুধু একটাই চাই আল্লাহর কাছে কখন আসবে আর 1 টি August

    [উত্তর দিন]

  5. mamun বলেছেন:

    hasenaje doctor hoese tar kono kagoj nai sob bua takadea kena

    [উত্তর দিন]

  6. Mohammad Jashim Uddin বলেছেন:

    It is possible for Bd. Awami Leagua.

    [উত্তর দিন]

  7. Mohammad Jashim Uddin বলেছেন:

    It is possible for Bd Awami League

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন