এশিয়ার রোল মডেল ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

“Good Fences Make Good Neighbors” আর প্রতিবেশী যদি হয় আকার-আকৃতি, অর্থ-প্রতিপত্তি, ধনে-মানে অনেক বেশী শক্তিশালী তবে সে সব প্রতিবেশীদের সাথে গড়ে তোলা উচিত “মান্দারগাছ সর্ম্পক”, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় মাখামাখি না করাই শ্রেয়। মনে রাখা দরকার, বড়দের সাথে অতিরিক্ত সম্পর্ক স্থাপনে ছোটরা উপকারের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্থই হয় বেশী।  সম্পর্ক যত বৃদ্ধি পায় ছোটদের রান্নাঘর-শোবারঘর সবকিছুতেই বড়দের একটা জোরজবরদস্তিমূলক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, অথচ বৈঠকখানা ডিঙ্গিয়ে অন্দরমহলে প্রবেশের সুযোগ মেলেনা অপেক্ষাকৃত দূর্বল প্রতিবেশীর। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, বাজার সওদায়, ফুট-ফরমায়েশ খাটতে প্রতিনিয়ত ডাক পড়ে দূর্বল প্রতিবেশীর, যদিও কঠিন দূর্যোগেও সাধারণত বৃহৎ প্রতিবেশীরা ছোটদের খুব একটা উপকারে আসে না। তবে ব্যতিক্রম যে একেবারে নেই তা নয়, তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের যতগুলো দিক রয়েছে সবক্ষেত্রে বাংলাদেশ নাজুক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেবলই ভারতকে সবকিছু উজার করে দেয়ার সম্পর্ক, যদিও ভারতের মতে এশিয়ার রোল মডেল ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক। আজ পর্যন্ত যতগুলো চুক্তি হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ভারতের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকার হয়েছে বরাবরই উপেক্ষিত। তবে এর কোন কিছুই ভারত একতরফা ভাবে করেনি, বরং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা এদেশীয় কিছু রাজনীতিবিদ ও বিশেষ রাজনৈতিক দল দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারত সরকারের মনোরঞ্জনে নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। এ ক্ষেত্রে খুবই চোখে পড়ার মতো বিষয় এই যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে আসছেন আগামী সেপ্টেম্বরে, পূর্বে ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক একটি যুগ পরে। সেবার শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকারের আমলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। অবশ্যই সার্ক সম্মেলন উপলক্ষেও এর মাঝে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এ দেশ সফর করেছেন তবে তা দ্বিপাক্ষিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ভারত সরকার বাংলাদেশের সাথে নয়, বরং আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী এবং এ কারনে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করায় ভারত উচ্ছসিত হয়েছে এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রনব মুখার্জী শুভেচ্ছা সফরে ঢাকা এসে সে উচ্ছাস প্রকাশ করে গেছেন। আর এর একটাই কারন, শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের দৃঢ় আস্থা রয়েছে, এ কথা উইকিলিংকস থেকেই জানা যায়।

ভারতের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যেমন দূর্দান্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক, ভারতীয় কংগ্রেস এবং আওয়ামী লীগের মাঝে সে সম্পর্ক আরো বেশী গভীর ও মজবুত। তো ভারতে আজ কংগ্রেস ক্ষমতায়, বাংলাদেশও ক্ষমতাশীন কংগ্রেসেরই ছায়া আওয়ামী সরকার। আর তাইতো একে একে রথি-মহারথী সবাই বাংলাদেশ বেড়াতে আসছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেড়িয়ে গেলেন, ভারতের শীর্ষ রাজনীতিক সোনিয়া গান্ধী আসছেন, আসবেন সোনিয়া গান্ধীর আশীর্বাদপুষ্ট প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। শেখ মুজিব আমলে ৩০ বছরের গোলামী চুক্তি হয়েছে, শেখ হাসিনার ১ম আমলে পদ্মার পানির হিস্যা ছেড়ে দেয়া হয়েছে ভারতের হাতে আর এবার একইভাবে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে তিস্তার পানির নায্য হিস্যা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, ফেনী নদীর পানি দেয়া হবে, টিপাইমুখে বাঁধ নির্মানে সম্মতি দেয়া হবে, বাংলাদেশের গ্যাস তুলে দেয়া হবে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রান্সজিট ও ট্রান্সশীপমেন্টের নামে ভারতের জন্য করিডোর খুলে দেয়া হবে, ছিটমহল বিনিময়ের নামে তুলে দেয়া হবে বাংলাদেশের ভূমি।

তো আসুন একবার চোখ বুলাই এশিয়ার রোল মডেল ঢাকা-দিল্লী ঐতিহাসিক সম্পর্কের দিকে:

* বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে সকল চুক্তি হয়েছে আগেই বলেছি তাতে কেবল ভারতের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ফারাক্কা চুক্তি একটা উদাহরণ হতে পারে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের জন্য ফারাক্কা বাঁধ নির্মানের জন্য তোড়জোড় শুরু করে। তবে ফারাক্কা বাঁধের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে এমন আশংকায় পাকিস্তান সরকারের প্রতিরোধের মুখে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে পারে নি। এ কারনে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথেই পুরোপুরি ভারতের করায়ত্বে থাকা মুজিব সরকারের সাথে যৌথ নদী কমিশন গঠনের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত ৫৫টি নদী থেকেই পানি প্রত্যাহারের সুযোগ করে নেয়। মুজিব সরকারের শেষ দিনগুলোতে ভারত মাত্র ৪১ দিন পরীক্ষামূলক ফারাক্কা বাঁধ চালু করার চুক্তি করে, যা আজ পর্যন্ত বন্ধ হয় নি। মুজিব সরকারের পতনের পরে ভারত তার বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ছেদ ঘটায় এবং একতরফাভাবে পদ্মার পানি প্রত্যাহার শুরু করে। ভারতের এমন দাদাগিরি স্বভাবের কারনে বাংলাদেশ ফারাক্কা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরে, ১৯৭৬ সালে ইসলামিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে এবং ন্যাম সম্মেলনে ইস্যুটি তুলে ধরা হয় এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘে অভিযোগের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে শ্রীলংকা, সেনেগাল ও অস্ট্রেলিয়ার তদারকিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক কমিটি ভারত ও বাংলাদেশকে সমাধানে পৌছতে তাগিদ দেয়। সিরিয়া, মিশর, শ্রীলংকা, আলজেরিয়া ও ঘানার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ও ভারত আলোচনায় বসে এবং ১৯৭৭ সালে ৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকার ২ দফায় সর্বমোট ৫ বছরের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। তবে এরপরই বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে ভারত চুক্তির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করেনি।

আগেই বলেছি ভারত বাংলাদেশের সাথে নয় বরং আওয়ামী লীগের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। আর তাই যেমন শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় ঠিক তেমনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শক্তি সরকার গঠন করলেও ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আর এরই ফলশ্রুতিতে ভারত একতরফা ভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে এমনকি ১৯৯৩ সালে ভারত বাংলাদেশকে ১০ হাজার কিউসেকের চেয়েও কম পানি প্রদান করে। ফলে বাংলাদেশ ইস্যুটিকে আবারো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং কমনওয়েলথ সম্মেলনে তুলে ধরে। তবে বাংলাদেশে ভারতবান্ধব আওয়ামী লীগের সরকার বিরোধী ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে এবং অসহযোগ আন্দোলনে সচিব-আমলারাও রাজপথে নেমে আসলে বিএনপি কোনঠাসা হয়ে পড়ে, ফলে বিএনপি সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক ইস্যু গুলো নিয়ে খুব বেশী সফল হওয়া সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে ভারতের মদদপুষ্ট আওয়ামী সরকার আবারো ক্ষমতায় আসলে তড়িঘড়ি করে ৩০ বছর মেয়াদী ফারাক্কা পানি বন্টন চুক্তি করে যাতে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে শতভাগ ভারতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আগ্রহী পাঠকগণ দু’টো চুক্তি তুলনামূলকভাবে পাঠ করে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেন। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবং জিয়াউর রহমানের দুঃসাহসী দেশপ্রেমী ব্যক্তিত্বের কাছে ভারত অপেক্ষাকৃত নমনীয় চুক্তি করতে বাধ্য হয় ১৯৭৭ সালে যেখানে বাংলাদেশের জন্য পদ্মার নায্য পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী সরকার চুক্তির মাধ্যমে ভারতের স্বার্থকেই রক্ষা করেছে। আর এর ফলে মরুময়তার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ, ভূগর্ভস্থ পানির স্থর নীচে নেমে গেছে, দেশের অধিকাংশ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি আর্সেনিকে বিষাক্ত হয়ে গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে লবনাক্ত পানির প্রভাবে জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন আজ ধ্বংসের মুখোমুখি।

* ভারতের সাথে পাকিস্তান, চীন কিংবা অন্যান্য দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত বেশী, অথাৎ ৪১৬৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত। ভারতের ৫টি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সাথে এই দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে আছে। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত, এক দিকে বঙ্গোপসাগর, কথাটা পুরপুরি সঠিক নয়, বলা যায়, বাংলাদেশের প্রায় চারদিক ঘিরেই ভারত। দক্ষিণে বঙ্গোসাগরে রয়েছে ভারতের আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। তাই ছোট্ট একটা দেশকে ঘিরে ভারতের সীমান্ত রক্ষায় বিপুল অঙ্কের খরচ, বিশাল জনশক্তিকে সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত করা বেশ বিরক্তিকর।  আর তাই  এ বিশাল সীমান্তজুড়ে প্রতিনয়ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ চালাচ্ছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ভাবতে অবাক লাগে, পৃথিবীর সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ দেশ ফিলিস্তিনী সীমান্তে ইসরায়েল যতজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, ভারতের বিএসএফ তারচেয়েও বেশী মানুষ হত্যা করে বাংলাদেশ সীমান্তে। ভাবতে আরো অবাক লাগে যে, বিএসএফ যতজনকে হত্যা করে সীমান্তে তার মাঝে ৪০ শতাংশই ভারতীয় নাগরিক। সীমান্তে নিজ দেশের জনগণকেও নির্বিচারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে যারা এতটুকু করুণা দেখায় না, তাদের কাছে প্রতিবেশী জনগণ কতটা নিরাপদ তা সহজেই অনুমেয়।

* বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্য। আর এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দেখে এসেছে কেবলই বাণিজ্য ঘাটতি যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে রপ্তানি করেছে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশী যেখানে বাংলাদেশ ভারতে মাত্র অর্ধ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানীর সুযোগ পেয়েছে।

* সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই একই বৈষম্য। আওয়ামী সরকার আমলেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি করেছে, অথচ প্রতিনিয়ম ভারত বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। শাহরুখ খান, সালমান খান, রাণী মুখার্জীর মতো ভারতের সেরা শিল্পীগণ বাংলাদেশে এসে অপসংস্কৃতির ব্যাপক চাষাবাদ করে গেলেন গত বছর অথচ বাংলাদেশ থেকে এ ধরণের কোন সুযোগ ভারতে পাননি এদেশের শিল্পীবৃন্দ। তেমনি ভাবে বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো দখল করে আছে ভারতীয় অর্ধশতাধিক সাটেলাইট চ্যানেল, যেখানে বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে প্রদর্শনের অনুমোদন নেই। অথচ ভারতীয় চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের পণ্যের প্রচার ও প্রসার ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশী পণ্য ও সংস্কৃতির ভারতে ব্যপক চাহিদা থাকা সত্যেও সেদেশে তা কিছুতেই প্রবেশ করতে পারছে না।

* বিপদে আপদে যে পাশে এসে দাড়ায় সেই প্রকৃত বন্ধু। একানব্বইয়ের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ভয়াবহ সিডরে বাংলাদেশের উপকূল লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সারা বিশ্ববাসী বাংলাদেশের পাশে অকৃত্রিম বন্ধুর মতো দাড়ায়, যার মাঝে সৌদি আরব একভাবেই নগদ ১০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করে। আর আমাদের তথাকথিত সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু ভারত বিশাল প্রতিশ্রুতির বহর নিয়ে পাশে দাড়িয়েছিল, যার একটিও বাংলাদেশের ভাগ্যে জোটেনি। এমনকি ভারতের আশীর্বাদে শেখ হাসিনা ক্ষমতাশীন হওয়ার পরই কৃতজ্ঞতা জানাতে ভারত সফর করেছিলেন, ভারতও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশে ৫ লাখ টন চাল রপ্তানি করার যা আজও বাংলাদেশের এসে পৌছে নি। একই ভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানীর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, অথছ এ সরকারের আমলে সে বিদ্যুৎ আর পাওয়া যাবে না বলে স্পষ্টত জানা গেছে।

* ট্রানজিট বলতে মূলত দ্বিতীয় কোন দেশের উপর দিয়ে তৃতীয় কোন দেশে পণ্য, যানবাহন, জনশক্তির যাতায়াতকেই বুঝানো হয়। আর এ ক্ষেত্রে ২য় কোন দেশের ভূখন্ডকে ব্যবহার করে একটি দেশের পন্য এক প্রান্ত থেকে সহজভাবে অন্য কোন প্রান্তে পৌছানোর প্রক্রিয়াকে বলে করিডোর। বাংলাদেশকে একটি করিডোর হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যম্যে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে পণ্য ও সমরাস্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলের সমালোচনায় ভারত সমরাস্ত্র বহন করবে না বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। যে দেশে অবাধে ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ইত্যাদি অনুপ্রবেশ ঘটছে, যেখানে ভারতীয় জেলেরা নির্বিঘ্নে বাংলাদেশের জলসীমায় মৎস্য আহরণ করছে, যেখানে বাংলাদেশে রয়েছে ভারতের প্রেমী বিপুল জনগোষ্ঠী যারা ভারতকেই তাদের তীর্থস্থান মনে করে, রয়েছে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট রাজনৈতিক দল, সেখানে ট্রানজিট ও ট্রান্সশীপমেন্ট চুক্তি হয়ে গেলে বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় সেনাবাহিনী দম্ভভরে রণসাঁজে ঘুরে বেড়াবে না তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

* ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো ভারতের দাদাগিরি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান পতন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি সবকিছুতেই ভারতের নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ আছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতারোহনের পেছনে ভারতের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। এইতো কিছুদিন আগে কনকো ফিলিপসের সাথে বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে চুক্তি হয়ে গেলো, অতচ এ ক্ষেত্রেও যেমন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল ঠিক তেমনি চাপ ছিল ভারতের পক্ষ থেকে। ভারতের চাপেই ২০০৫ সালে সার্ক সম্মেলন স্থগিত করে বাংলাদেশ। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পিলখানায় যে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটে গেল তার পেছনেও প্রতিবেশী দেশের হাত রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিশেষ করে রৌমারীতে সাধারণ জনতা ও বিডিআরের যৌথ প্রতিরোধের মুখে যেভাবে বিএসএফ পর্যুদস্ত হয়েছিল তার একটি উচিত শিক্ষা বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরী ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

এভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যতগুলো দিক রয়েছে তার সবক্ষেত্রেই ভারতের সাফল্যের পাল্লা প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে, বাংলাদেশের হিসাবের খাতা ঋণাত্মক চিহ্নে ভরে উঠছে। আর এতকিছু সুবিধা ভারতকে পাইয়ে দেয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশ নয় বরং আওয়ামী লীগের সাথেই কূটনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন আরো জোরালো করছে। কারন, আওয়ামী লীগ ভারতপন্থী রাজনৈতিক দল। ভারতের সাথে আগরতলা ষড়যন্ত্র করে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের সাথে অঙ্গীভূত করতে চেয়েছিলন, যদিও ৭১এ দেশপ্রেমী সাধারণ জনতা ও সেনা কর্মকর্মাদের বীরত্বে ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেমন পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ঠিক তেমনি ভাবে ভারতের সাথে অঙ্গীভূত করার ষড়যন্ত্র থেকেও বাংলাদেশকে রক্ষা করেছিল।  আগরতলা ষড়যন্ত্র সত্যি ছিল বলে সংসদে সম্প্রতি ডেপুটি স্পীকার স্বীকার করেছেন, একই সাথে উণসত্তরেই ভারতের ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলতে শেখ মুজিব পরিকল্পনা করেছিলেন বলে শেখ হাসিনা মুখ খুলেছেন। এমনকি স্বাধীনতার পরে শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বানানোর ক্ষেত্রে সম্মত হয়েছিলেন যার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে ভারতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।

আরো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ভারত-আওয়ামী লীগ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে রয়েছে। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণবমুখার্জীর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন এবং তিনি প্রয়োজনে মুভ করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন। ইউকিলিকসের তথ্যে কি ধরণের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল এবং প্রয়োজনে কি ধরনের সাহায্য শেখ হাসিনাকে ভারত করবে তা স্পষ্ট নয়। তবে পিলখানা হত্যাকান্ডে যেখানে সেনাবাহিনী নজিরবিহীন ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং সঠিক সময়ে শেখ হাসিনা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সেনাবাহিনীর মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে ভারত কি ধরণের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। সেনাবাহিনীর রোষাণল থেকে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে ভারতীয় সেনা আগ্রাসনই যে একমাত্র প্রতিশ্রুত সহায়তা ছিল তা স্পষ্ট। এছাড়া শেখ হাসিনার নিরাপত্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী প্রেরণ, কূটনৈতিক পাড়ায় ভারতীয় নিরাপত্তরক্ষীদের সশস্ত্র প্রহরা, বিমানে ভারতের স্কাই মার্শাল নিয়োগের ব্যাপারে আলোচনা সবকিছুই বাংলাদেশে ভারতের নগ্ন দাদাগিরিকে প্রকট করে তুলে।

বাংলাদেশে সফরে আসছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। আসবেন বাংলাদেশকে কিছু গোলামী চুক্তিতে বন্দী করতে। চুক্তি করতে কোন বাধা নেই, বিশেষ করে এদেশে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট সরকারই ক্ষমতায়। তবু ভয়, গণরোষে যদি চুক্তি করতে ইতস্তত করেন শেখ হাসিনা। কিংবা ভারত কর্তৃক প্রদেয় বিভিন্ন মিথ্যে প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে যেন কোন প্রশ্ন না ওঠে মনমোহনের সফরে তাই আগে ভাগেই শেখ হাসিনাকে সতর্ক বরে দিলেন তিনি, যে কোনও সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে, একই সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোণঠাসা হাসিনার এখনও ভারতকে যথেষ্টই প্রয়োজন, এ কথা মনে করিয়ে দিতেও ভুলছে না ভারতীয় পত্রপত্রিকা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ এবং সোনিয়া (ভারত) শেখ হাসিনার ভরসা তাও জানিয়ে দিচ্ছে তারা। উদ্দেশ্য একটাই, গড়িঘড়ি শেখ হাসিনাকে চুক্তি করতে বাধ্য করা।

কিন্তু এভাবে কেবলমাত্র ভারতকেই একমাত্র আশ্রয়স্থল ভেবে তড়িঘড়ি করে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কেবলমাত্র ভারতের স্বার্থে চুক্তি করলেই কি আওয়ামী লীগ জনরোষ থেকে বেঁচে যাবে? জনরোষ থেকে বাঁচতে মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতই ভরসা, এ কারনে যুদ্ধাপরাধ নামের কল্পকাহিনী দিয়ে দেশের আলেম সমাজের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফেরানো হচ্ছে, আর নিজেদের পিঠ বাচাতে তড়িঘড়ি তল্পিতল্পা গুছিয়ে ফেলছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বারবার বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতে পাড়ি দিয়ে জনরোষ থেকে কিছুতেই বাচতে পারবে না আওয়ামী লীগ। বিডিআর নেই, তবু ক্ষতি নেই, এবার সীমান্ত পাহারায় বাংলাদেশের ষোলকোটি অতন্ত্র প্রহরী। পালানোর যে আজ কোন পথ খোলা নেই। কান পেতে শোন, চারিদিকে একই ধ্বনি, হুশিয়ার! হুশিয়ার!! হুশিয়ার!!!

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন