তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু : বিকল্প প্রস্তাব

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বাংলাদেশ আবার নিশ্চিত অনিশ্চিয়তার মাঝে ডুবতে বসেছে। হরতালের সংস্কৃতি থেকে প্রায় বেরিয়ে আসা বাংলাদেশের গণতন্ত্র আবারো সহিংস রূপ ধারণ করছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে যে সমুদ্রসম অবিশ্বাস আর হিংসার বিচরণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুকে ঘিরে তা আজ পরিণত হয়ে অতলান্ত মহাসাগরে। যে অবিশ্বাস আর অনিশ্চয়তার হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে রাজনৈতিক দলগুলো ১৭৩ দিনের হরতাল আর অসংখ্য মায়ের বুক খালি করে অর্জন করেছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ (?) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, আদালতের অনাকাঙ্খিত রায়ে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পুরণো সেই দগদগে ঘায়ে আজ প্রবল রক্তক্ষরণ। ২০০৬ সালে সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল যে ব্যবস্থাটি, ২০০৪ সালে হাইকোর্টের রায়ে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আজ তা কোন অশুভ ইশারায় উচ্চ আদালত বাতিল করে দেশকে আজ নরকের ওমে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতে উঠে পড়ে লাগল তা ভেবে ভেবে পুরো জাতি ক্লান্ত।

নিন্দুকেরা বলেন, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এক ঢিলে দু’ পাখি শিকারের ফন্দি এটেছে; এক) অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, দুই) বিচারবিভাগকে বিতর্কিত করা, যাতে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতর সৃষ্টি হয়, যাতে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করা যায়। হ্যা, এ কথা সবার কাছে স্পষ্ট যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হন দলীয় দৃষ্টিকোন থেকে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয় নি। তবে বিচারপতিদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল যে তারা যে রাজনৈতিক মতাদর্শীই হোন না কেন বিচারের ক্ষেত্রে অন্তত তারা নির্লজ্জভাবে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করবেন না। কিন্তু সবকিছু দেখে মনে হয় দলীয় নেত্রীকে খুশী করতে সরকারের নির্দেশেই বিগত ১০ মে ২০১১ তারিখে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি খাইরুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলে  রায় দেয়। নয়তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় ঘোষণার তিন তিনটি মাস আগেই ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে কি করে বিচারকদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে না রাখার বিষয়টি লিপিবদ্ধ হলো? এটিকে প্রিন্টিং মিসটেক হিসেবে চালিয়ে দেয়া চলে না, যেহেতু সংবিধানের একটি কমা কিংবা দাড়ী সংযোজন বা বিয়োজনেও দুই-তৃতীয়াংশের বেশী সাংসদের সম্মতির প্রয়োজন। কিংবা সংবিধান সংশোধন বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যদের অজ্ঞাতে এমনটি ঘটেছে, এমনটি ভাবারও কোন কারণ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের রায় যে পরিপূর্ণভাবে সরকার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, পুনঃমুদ্রিত সংবিধান আজ পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয় নি। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক সরকারী নির্দেশনায় ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রায় দিয়ে উচ্চ আদালতকে যেভাবে কলুষিত করেছেন তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রহসনের বিচারব্যবস্থাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলে রায় দিয়েছে, তবে জাতীয় সাংসদদের মতামতের ভিত্তিতে আগামী দু’টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলেও অভিমত দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ঐক্যজোটের নেতারা বার বার বিরোধী দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে সংসদে এসে আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, “আদালতের রায় স্বত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না রাখার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ অনঢ় নয়” । আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, “বিএনপির দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংসদে এসে বলেন, নতুন কী তত্ত্ব আছে। রাস্তায় গিয়ে কেউ খালেদা জিয়াকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে পারবে না“। সরকার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী অনঢ় না হয়েই থাকে তবে আদালতের অভিমতের ভিত্তিতে আগামী দু’টি সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল রাখতে দোষ কোথায়? তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার মতো পরিবেশ বাংলাদেশ আজো সৃষ্টি হয় নি, সিকি শতাব্দীতেও তা হবে বলে মনে করার কোন কারণ দেখছে না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাহলে আর কি বিকল্প পথ তাকতে পারে? সেনাবাহিনীর অধীনে নির্বাচন? না, সে পথে হাটারও কোন সুযোগ নেই, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মাঝে সুযোগ সন্ধানী উচ্চাভিলাসী দু’য়েকজন সেনা নায়ক থাকতে পারেন যারা মঈন উ আহমেদের মতো মসনদে জেকে বসতে পারেন। তাহলে আর বিকল্প কি? প্রধানমন্ত্রী কি চান দিল্লি সরকারের অধীনে বাংলাদেশ নির্বাচন?

সরকার এ কথা ভালো করেই জানে, জানে বিরোধী দলগুলোও যে জাতীয় সংসদে এসে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে কথা বলা আর না বলা সমান কথা। জাতীয় সংসদে চারদলীয় জোটের যে কজন সাংসদ রয়েছেন, তারা সমস্বরে চিৎকার করে করে নিজেদের গলাই ফাটাতে পারবেন মাত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে কোন প্রস্তাব মানতে সরকারকে বাধ্য করার ন্যূনতম শক্তিও সেখানে তাদের নেই। আর বিএনপি দাবী করলেই যে আওয়ামী লীগ মেনে নেবে এমন দিবাস্বপ্ন না দেখাই ভালো, বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, বুদ্ধীজীবী, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন জনের দেয়া পরামর্শ সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটি পাত্তাই দেয় নি। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনা করতে বলাটা নিছকই লোকদেখানো ও সময় অপচয়ের কৌশল মাত্র। তাই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন রুখতে বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর রাজপথে লড়াই করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

তবে শেখ হাসিনা যেহেতু বার বার বিকল্প প্রস্তাব চেয়ে চেয়ে গণমাধ্যম গরম করছেন, এবং তার কথায় সাড়া দিয়ে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাসহ কেউ কেউ বিকল্প প্রস্তাবও দিচ্ছেন, তাই সুযোগ পেয়ে আমিও আমার বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরছিঃ

১। আমি নিজেও মনে করি রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান এক বিষয় নয়। খেলোয়ার ও সমালোচন এক নয়। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করবেন, বিশেষজ্ঞরা রাজনীতির পথ বাতলে দেবেন। তবে দর্শক গ্যালারীতে বসা সমালোচকরা যদি খেলোয়ারের ভূমিকায় নামে তখন দলের ভরাডুবি ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। তাই রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ একদল অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া অযৌক্তিকই মনে হয়। এছাড়া পূর্বে আরেকটি লেখায় বলেছি যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের নিয়োগের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বিচারবিভাগকে কলুষিত করে ফেলেছে, প্রধান বিচারপতিদের দলীয় ভৃত্যে রূপান্তর করেছে। কিন্তু যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবিশ্বাস থেকে এ ব্যবস্থার উদ্ভব, তাই হঠাৎ করে এ ব্যবস্থাকে বিলোপ না করে ধীরে ধীরে মূল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যেতে হবে।

২। দলীয় সরকারের অধীনে এ যাবৎকালেরঅনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনই ছিল জোরজবরদস্তিমূলক, প্রহসনের নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে ক্ষুধার্ত  ব্যাঘের মুখে স্বাধীন ছাগলের তুলনা চলে, যে স্বাধীনভাবে দৌড়াতে পারে, তবে বাঘের গ্রাসকে এড়াতে পারে না। তাই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা আদৌ সম্ভব হয় না? ছাগলকে স্বাধীনভাবে ঘাস খাওয়ার সুযোগ দিতে হলে আগে বাঘকে বন্দী করতে হবে, যেখান থেকে ক্ষুধার্ত বাঘ শুধু গর্জেই যাবে। তবে অহেতুক সে গর্জনেও যদি নির্বাচন কমিশন ভরকে যায় তবে শেষ রক্ষাও হবে কি? তো, নির্বাচনের সময় সরকার প্রভাবিত করতে পারে এমন বিষয়গুলোকে আগেই রোধ করতে হবে। যেমনঃ

ক) নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের পদোন্নতি, পদচ্যুতি, ট্রান্সফার ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহার করা হয় সরকার। তাই সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত প্রশাসনের সকল প্রকার পদোন্নতি, পদচ্যুতি, ট্রান্সফার ইত্যাদি প্রভাবকগুলো রহিত করতে হবে, তবে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে বদলী নিয়ন্ত্রণ করতে পারেব। যতদিন একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয় ততদিন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল রাখতে হবে। এতে করে প্রশাসন নিজেদের স্বার্থেই বাধ্য হয়ে দ্রুত একটি নির্বাচন উঠিয়ে নিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তবে কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কোন কর্মকান্ডে জড়িত হলে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে পদচ্যুত করা যাবে।

খ) সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব প্রভৃতি বাহিনীর সকল প্রকার পদোন্নতি, পদচ্যুতি, ট্রান্সফার ইত্যাদি প্রভাবকগুলো রহিত করতে হবে, তবে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে বদলী নিয়ন্ত্রণ করতে পারেব। তবে কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কোন কর্মকান্ডে জড়িত হলে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে পদচ্যুত করা যাবে।

গ) সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের ১৫ দিন পূর্বে দেশব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। তারা একই সাথে অস্ত্রউদ্ধার অভিযান ও ভোটারদের ভোট নির্বিঘ্ন করার অভিযান পরিচালনা করবেন।

ঘ) নির্বাচনের সাতদিন পূর্ব থেকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত দেশের ভেতরে সকলমন্ত্রীর প্রটোকল প্রত্যাহার করতে হবে। তবে দেশের বাইরে গেলে নিয়মানুযায়ী সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন।

ঙ) নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত দেশের ভেতরে সকল প্রতিমন্ত্রী,উপমন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার সকল ব্যক্তিদের প্রটোকল প্রত্যাহার করতে হবে। তবে দেশের বাইরে গেলে নিয়মানুযায়ী সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন।

চ) তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর থেকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীদ্বয়ের সমান প্রটোকল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ছ) নির্বাচন কমিশন সরকারী ও বিরোধী দলের সম্মতিক্রমে গঠিত হতে হবে।

জ) এ ব্যবস্থায় অবশ্যই আগামী ২ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সাফল্য যাচাই করে পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায় সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সরকারের অধীনে নির্বাচন করার মাধ্যমে মূল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা যাবে। ব্যর্থ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বহাল থাকবে।

৩। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে সখল রাজনৈতিক দলের মাঝেই গণতন্ত্র চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিরোধীদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সর্বাগ্রে প্রয়োজন, প্রয়োজন দলমত নির্বিশেষ দেশের স্বার্থে রাজনীতি। মোদ্দাকথা দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেদের চরিত্রকেই সর্বাগ্রে পরিবর্তন করা জরুরী।

জানি, জনগণ যত প্রস্তাবনাই নিয়ে আসুক না কেন আওয়ামী সরকার তাদের পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তেই অটুট থাকবে, যদি না জনগণ তাদের দাবী আদায় করে না নেয়। তাই নতুন নতুন প্রস্তাবনার খোঁজাখুঁজি না করে আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বহাল রাখা হোক। তবে হ্যা, প্রধানবিচারপতিদের বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যাপারে সংবিধান সংশোধন জরুরী।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু : বিকল্প প্রস্তাব” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. শাহরিয়ার বলেছেন:

    দৈনিক আমারদেশ পত্রিকায় ১৪ জুন ২০১১ তারিখে প্রকাশিত এম এ নোমানের রিপোর্ট

    আদালত রায় না দিতেই রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধন : যোগসাজশের সন্দেহ ঘনীভূত

    তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার তিন মাস আগেই এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে সরকার। রায় না দিতেই রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের এ ঘটনায় সরকার ও উচ্চ আদালতের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশের সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নতুন বিধানের প্রতিফলন ঘটেছে গত ১০ মে বিদায়ী প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চের রায়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে সরকার আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তা আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞরা। প্রবীণ আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল এখন মারমুখী অবস্থানে রয়েছে। অথচ রায় ঘোষণার আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সরকার নতুন করে সংবিধান ছাপিয়েছে। এটি কোনো হালকা বিষয়। অবশ্যই এটি একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন কেউ যদি সরকার আর উচ্চ আদালতের মধ্যে যোগসাজশের প্রশ্ন তোলেন সেটা অমূলক হবে না। আর ওই সময় বিচারপতি খায়রুল হকই ছিলেন প্রধান বিচারপতি। কাজেই তার সঙ্গে সরকারের যোগসাজশের অভিযোগ উঠলে সেটাও অবাক হওয়ার মতো হবে না। যদিও এ ধরনের অভিযোগ বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আইন মন্ত্রণালয় কিভাবে জানল যে তিন মাস পরে তাদের সিদ্ধান্তই সুপ্রিমকোর্ট রায়ে উল্লেখ করবেন। বিষয়টি বড়ই আশ্চর্যের।
    প্রসঙ্গত, মুন সিনেমা হলের মালিকানা দাবি করে দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের আলোকে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সংবিধানের গোটা পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। পরবর্তীতে কিছু সংশোধনীসহ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায় বহাল রাখে। আপিল বিভাগের এ রায় প্রকাশের পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবিধান থেকে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে আইন মন্ত্রণালয়। পুনর্মুদ্রিত এ সংবিধানে ৯৯ অনুচ্ছেদে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের আগের সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি অতিরিক্ত বিচারকরূপে দায়িত্ব পালন ব্যতীত বিচারক পদে দায়িত্ব পালন করিয়া থাকিলে উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণের কিংবা অপসারিত হইবার পর তিনি কোন আদালত বা কর্তৃপক্ষের নিকট ওকালতি বা কার্য করিতে পারিবেন না অথবা বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় পদ অথবা প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে বহাল হইবেন না।’ পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে ‘প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদ’ এই শব্দগুলোর পরে ‘ব্যতীত’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের অধিষ্ঠিত হওয়ার বিধান রহিত হয়ে গেছে পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের মাধ্যমে। নতুন করে ছাপানো সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘কোন ব্যক্তি (এই সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী অনুসারে অতিরিক্ত বিচারকরূপে দায়িত্ব পালন ব্যতীত বিচারকরূপে দায়িত্ব পালন করিয়া থাকিলে উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণের বা অপসারিত হইবার পর তিনি কোন আদালত বা কর্তৃপক্ষের নিকট ওকালতি বা কার্য করিবেন না এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না। [আধা-বিচার বিভাগীয় পদ অথবা প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদ]। এদিকে গত ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্বলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান পরিপন্থী। দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার স্বার্থে আগামী দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা উচ্চ আদালতের কোন বিচারককে যুক্ত করা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এবং গত ১০ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের বিষয়ে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও দেশের খ্যাতিমান আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আমার দেশকে বলেন, ৯৯ অনুচ্ছেদের বিষয়ে পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের বিধানাবলী ১০ মে’র রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি মারাত্মক বিষয়। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে থাকবে কি থাকবে না এ বিষয়টি নিয়ে দেশে তুমুল বিতর্ক চলছে। আন্দোলন-সংগ্রাম ও হরতাল হচ্ছে। অথচ সরকার এ ব্যবস্থায় আগেই পরিবর্তন এনেছে। সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এবং পরে একই বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের রায় প্রদানের ঘটনায় সরকার এবং সুপ্রিমকোর্টের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশের প্রশ্ন উঠতে পারে। যদিও আমি মনে করি এ ধরনের প্রশ্ন ওঠা উচিত নয়, এটা কাম্যও নয়। তারপরও বিরোধী দল একটি ইস্যু পেয়ে যাচ্ছে। সংবিধানে সরকারের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটার পর উচ্চ আদালতের রায় দেয়ার সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন এবিএম খায়রুল হক। স্বাভাবিকভাবেই সরকার ও বিচারপতি খায়রুল হকের মধ্যে যোগসাজশের প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয়। তবে এ ধরনের বিতর্ক থেকে আমাদের উচ্চ আদালতকে রক্ষা করাটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
    এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আমার দেশকে বলেন, সরকার সব বিষয়ে জাতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। দেশবাসী এখন সাংবিধানিক প্রতারণার শিকার। জাতিকে ব্লাকমেইল করেছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ মহলের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন বিদায়ী প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। ১০ ফেবু্রয়ারি সংবিধান সংশোধন এবং এর তিন মাস পরে ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। বিচারপতি খায়রুল হক মূলত আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গেছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে তিনি সংবিধান সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো তড়িঘড়ি করে লিস্টে এনে সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে যান। অ্যাডভোকেট মাহবুব বলেন, তিন মাস পরের রায় তিন মাস আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কোনো দেশে আছে বলে কারও জানা নেই। সরকার অনিয়ম করার ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, তাদের হাত থেকে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ও রেহাই পায়নি।
    এ বিষয়ে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে উচ্চ আদালতের দেয়া রায়ের আলোকেই আমরা সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করেছি। ওই সময় রায় মেনে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। রায় অনুযায়ী আমরা করেছি। রায়ের বাইরে যাইনি। এখন কেউ যদি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকেন তাহলে তিনি ঠিক কাজ করেননি। মুদ্রিত সংবিধানের পরেও সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে সংবিধানের সংশোধনী নিয়ে বিশদ আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সুপারিশ তৈরি হয়েছে। মুদ্রিত সংবিধানে কোনো অসঙ্গতি থেকে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

    [উত্তর দিন]

  2. শাহরিয়ার বলেছেন:

    দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৪ জুন ২০১১ তারিখে প্রকাশিত হাবিবুর রহমানের রিপোর্ট

    তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সিদ্ধান্ত রায়ের ৩ মাস আগেই!
    পুনর্মুদ্রিত সংবিধানেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হতে পারবেন না উল্লেখ করা হয়

    সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তির যে কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আইন বিশেষজ্ঞরা তার সাথে একমত নন। তারা মনে করেন, সংবিধানের পুনর্মুদ্রিত কপির মধ্যে অনেক বিষয় যেমন বৈপরীত্য রয়েছে ঠিক তেমনি রায়ে সরকারি মতের প্রতিফলন রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ার আগেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। পুনর্মুদ্রিত সংবিধানেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয়। আদালতের রায় হয়েছে তার পর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বাতিলের রায়কে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে চরম বিপর্যয়কর বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরা।
    আইনজীবীদের অভিযোগ, সরকার আদালতের রায়ের অনেক আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। আর আদালতের রায়ের তিন মাস আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সরকার পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে। পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
    ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি (এই সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদে বিধানাবলি অনুসারে অতিরিক্ত বিচারকরূপে দায়িত্ব পালন ব্যতীত) বিচারকরূপে দায়িত্ব পালন করিয়া থাকিলে উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণের বা অপসারিত হইবার পর তিনি কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের নিকট ওকালতি বা কার্য করিবেন না এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না। [আধা-বিচার বিভাগীয় পদ অথবা প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদ] অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।
    অথচ এ ধরনের কোনো কথা পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সুপিম কোর্ট বলেননি। আর আগের সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা সম্পর্কে বলা হয়েছে [আধা-বিচার বিভাগীয় পদ অথবা প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পদ] ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে বহাল হইবেন না।
    বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের রায়ে যা নেই তা ছাপা সত্ত্বেও প্রধান বিচারপতি থেকেও দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি। অপর দিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবীদের মতে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইঙ্গিতে এই রায় হয়েছে কি না সে বিষয়টি এখন সামনে চলে এসেছে। আবার পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না এ অপব্যাখ্যা দেয়ার চার মাসের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন।
    অন্য দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে (আদালতের বন্ধু) সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ড. এম জহির, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এ ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দেন। তবে গত ১০ মে আদালতের রায়ে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ এখন থেকে বাতিল ও সংবিধানপরিপন্থী ঘোষণা করা হলো।
    ২০০৪ সালের আগস্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ও সংবিধানসম্মত। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদে কোনো সংশোধন আনা হয়নি। এ কারণে কোনো গণভোটের প্রয়োজন ছিল না। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেনি বিশেষ করে গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে।
    এ বিষয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সাংবাদিকদের বলেন, পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে এ ধরনের ভুল ঠিক নয়। যেখানে ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। তার চার মাস আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করা হয়। এতে বিরোধী দল মনে করতে পারে সরকার জুডিশিয়ারিকে ব্যবহার করেছে। নানা প্রশ্ন আসতে পারে। তবে আমি তা মনে করতে চাই না। তবে সংবিধান দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে এ ধরনের ভুল-ভ্রান্তির অবকাশ নেই। সরকারকে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত ছিল।
    এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনীর জাজমেন্ট বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ফরমায়েসি জাজমেন্ট। সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইঙ্গিতেই তিনি এই রায় দিয়েছেন। এ রায়ের জন্য তাকে কি ত্রাণের টাকা দেয়া হয়েছিল? এই প্রশ্ন এখন জাতির সামনে চলে এসেছে। আর পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হতে পারবেন না বলার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ বলে রায় দেয়াই পক্ষপাতিত্বের বিষয় সামনে চলে আসে।
    এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক লিখিত বক্তৃতায় বলেন, যেটা মুদ্রিত হয়েছে সেটাকে সংবিধান মনে করার কোনো আইন সঙ্গত কারণ নেই। অসংখ্য ভুলে ভরা। আমি যে অনুচ্ছেদ নিয়ে কাজ করি অর্থাৎ রিটসংক্রান্ত ১০২ অনুচ্ছেদেই প্রচুর ভুল আছে। এসব ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি।
    গত ১০ ফেব্রুয়ারি ৫০০ কপি সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করা হয়। পুনর্মুদ্রণের প্রায় পাঁচ মাস পরও সংবিধানের কপি দেশের নাগরিকেরা হাতে পাননি। পুনর্মুদ্রিত সংবিধান অসংখ্য ভুলে ভরা থাকায় সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলার পরও আইনমন্ত্রী পুনর্মুদ্রিত সংবিধানকেই বাংলাদেশের সংবিধান হিসেবে উল্লেখ করেন। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। প্রধান বিচারপতি থাকাকালে তিনি বলেছিলেন, রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রিত হবে। পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তার ওই বক্তব্যের পর আইন মন্ত্রণালয় সংবিধান পুনর্মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেয়।

    [উত্তর দিন]

  3. mushfiqur rahman বলেছেন:

    chamotkar kintu choray kin dormer kahini shunben

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন