ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হরতাল সফল হোক!

আজ রবিবার,১২ জুন সকাল ৬টা থেকে ১৩ জুন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একটানা ৩৬ ঘণ্টা দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল কর্মসূচি পালন করছে সমমনা ১২টি দল; বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, বিজেপি, খেলাফত মজলিস, জাগপা, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, মুসলিম লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), বাংলাদেশ ন্যাপ, এনডিপি ও এনপিপি এবং শুধু আগামীকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদ। দলগুলোএ দাবীদাওয়ার মধ্যে রয়েছে, একতরফা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল,সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্কের ধারা বিলুপ্তির অপচেষ্টা, বিদেশের সাথে সকল চুক্তি সংসদে পেশ করার ধারা বাতিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় সীমাহীন ব্যর্থতার, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি,আইনশৃঙ্খলার অবনতি,গ্যাস-বিদ্যুত্-পানি সঙ্কট,পুঁজিবাজার থেকে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর অর্থ লুট, ধর্মহীন জাতীয় শিক্ষানীতি, নারীর প্রতি অবমাননাকর বৈষম্যমূলক নারীনীতি অনুমোদন, ফতোয়া নিষিদ্ধের চক্রান্ত, ফরজ বিধান বোরকা বা পর্দাকে ঐচ্ছিককরণসহ ইসলাম নির্মূলের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মুক্তি। তবে যে দাবীগুলোর ব্যাপারে সকল দল ঐক্যবদ্ধ তার মধ্যে মৌলিক দু’টি বিষয় হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ও সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ধারাটি বাতিলের প্রতিবাদ।

এ কথা কিছুতেই বোধগম্য নয়, কি করে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে দাড়িয়ে মুসলমান নামধারী কিছু মুনাফিক ইসলামকে বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, হাজারো আউলিয়াদের পূণ্যভূমি বাংলাদেশে দাড়িয়ে মুসলমান নামধারী শয়তানের পুজারীরা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের দাবী করার হিম্মত দেখায়। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা কেন অবৈধ হবে না এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ রুল জারি করে আ’লীগের পদলেহনকারী আদালত। এমনকি ভারতের উচ্ছিষ্টভোগী ছদ্মবেশী সেক্টর কমান্ডার কেএম শফিউল্লাহ “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি—এ তিনটির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, এখন সংবিধানে তা বহাল হলে বা থাকলে তা হবে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা” বলে মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখায়। শুধু তাই নয় “বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে সংবিধান সংশোধন করা হলে হরতালের মতো কঠিন কর্মসূচির ডাক” দেয়ার হুমকি দেয়। তার এ ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘোষণা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং তদানিন্তন সময়ে ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী ইসলামী শক্তিগুলোর পাকিস্তান বিভক্তির বিরুদ্ধে অবস্থানকে যৌক্তিক ভিত্তির উপর দাড় করিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক ইসলামী মৌলিক আকিদায় কুঠারাঘাত করছে। যে সমাজে নারীরা যৌনসন্ত্রাসীদের ভয়ে থমকে যায়, সে সমাজে যখন নারীরা নিজেদের নিরাপত্তায় নৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে, শালীনতার আশ্রয় নিয়ে স্বস্তি বোধ করে, তখন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রামে গঞ্জে শহরে শুধুমাত্র বোরকা পড়ার অপরাধে নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়। এখনো সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বহাল রয়েছে, এখনো সংবিধান সংশোধিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয় নি, অথচ তার মাঝেই আওয়ামী লীগ ইসলামের নাম নিশানা মুছে ফেলতে সর্বোশক্তি নিয়োগ করেছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তারা যদি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাতিল করতে পারে, মুসলিম দেশসমূহের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস তুলে দিতে পারে তবে নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে রাস্তাঘাটে পরিচয় দেয়াটাই হয়ে যাবে জেহাদের সমান। অসম্ভব নয়, পাক হানাদারদের মতো পৌত্তলিক আওয়ামী সরকারও শালীন পোষাকের পুরুষদের প্যান্ট খুলে মুসলমান কিনা তা পরীক্ষা করা শুরু করে। যে করেই হোক আওয়ামী লীগের এ অপতৎপরতা রুখে দিতে হবে।

অপর যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হরতাল পালিত হচ্ছে তা হলো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার দাবী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে ছোট দলগুলোর আন্দোলনে তাদের তেমন কোন ফায়দা আছে কি না জানি না, তবে জামায়াতের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। জামায়াতের সাবেক আমীর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোলাম আযম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপকার। তার তৈরী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলা ১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা গ্রিনে জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জামায়াতের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত আমীর মরহুম আব্বাস আলী খান উপস্থাপন করেন। ১৯৮৩ সালের ২০ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াত আয়োজিত এক জনসভায় মরহুম আব‌বাস আলী খান পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করেন। এমনকি  ১৯৯১ সালের সংসদে তৎকালীন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত একটি বিল উপস্থাপক করেন, যদিও বিলটি নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। পরে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপির সীমাহীন কারচুপির কারনে ১৯৯৬ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে আন্দোলন জোরালো হয় এবং আওয়ামী লীগ এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে কার্যত অচল করে দেয়। অবশেষ বিএনপি জনতার দাবীর কাছে নতি স্বীকার করলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অর্ন্তভূক্ত হয়। জামায়াতের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মূলাটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং দলের সত্তর বছরের ইতিহাসে গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মূলা অন্যতম। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে কিংবা না থাকলে জামায়াতের যদিও খুব একটা ক্ষতি বৃদ্ধির আশংকা নেই, তবুও দলীয় সাফল্যকে টিকিয়ে রাখতে জামায়াতের এ ইস্যুতে আন্দোলন জরুরী।

তবে বিএনপির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আন্দোলন অবশ্যই জরুরী। বিএনপি দীর্ঘ দেড়টি বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। “শিশু ও পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়” এই নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ফর্মূলা কিছুতেই মানবে না বলে গো ধরে থাকলেও অবশেষ গণ দাবীর কাছে পরাস্ত হয়ে এক সময় ঠিকই মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু কেন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল তা বিএনপিই সবচেয়ে ভালো জানে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দাবার ঘুটি উল্টে গেছে, বিএনপির আসনে আ’লীগ, আ’লীগের আসনে আজ বিএনপি। একসময় আ’লীগ যে অমৃতের জন্য সোনার বাংলা শশ্বান বানিয়েছিল, আজ তা হেমলকের মতো বিষাক্ত মনে হয় তাদের কাছে। অথচ হেমলকই আজ অমৃত হয়ে ধরা দিয়েছে বিএনপির কাছে। কিন্তু কেন? কারন একটাই, ক্ষমতাকে চীরস্থায়ী করা। তৎকালীন সময়ে বিএনপি আজীবন ক্ষমতা আকড়ে থাকার বাসনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, আর আজ সেই একই পথে হাটছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগেরও টার্গেট একটাই, ক্ষমতা চীরস্থায়ী করা, অন্তত ২০২১ সাল পর্যন্ত তো বটেই, ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান বলে কথা। এর মহড়াও তারা দিয়েছে ভোলা উপনির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকলে কি সুবিধা তা বিএনপি যেমন ভালো বোঝে, ঠিক তেমনি বোঝে আওয়ামী লীগও। তাই তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আজ অনঢ় অবস্থান।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা টিকে গেলেই কি বাংলাদেশের ইসলাম নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ হবে? সংবিধান সংশোধনের নামে যে ইসলামকে নির্মূলের মহাযজ্ঞে মেতেছে আওয়ামী লীগ তাকে ঠেকাতে হলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন জরুরী। তবে বিরোধী দলীয় চীপ হুইপ ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদীন ফারুকের তত্ত্বাবধায়ক বহাল রাখলে হরতাল বিবেচনা করবে বিএনপি মন্তব্যে জাতি বিস্মিত হয়েছে। দেশের নব্বই ভাগ মুসলমানের ঈমান আকিদাকে চ্যালেঞ্জ করে সংবিধান সংশোধনের যে পায়তারা সরকার করছে তার প্রতিবাদে আন্দোলনটাই বিএনপির কাছে প্রাধান্য পাওয়া উচিত ছিল। বিএনপি যদি ভেবে থাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা টিকে থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, তবে তাদের জানা উচিত যে গণতন্ত্র মুসলমানদের কাছ থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে কেড়ে নেয় সে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলনে মুলমনাদের কি-ই বা আসে যায়। বিএনপিকে বুঝতে হবে, হাজারটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলেও তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না যদি না ইসলামী শক্তিগুলো তার পাশে থাকে। হিন্দুরা ইশ্বর প্রদত্ত (!) নির্দেশনা পেয়েই গেছে যে “যতই অপদস্ত হও না কেন, যতই নির্যাতিত হও না কেন, যতই ধর্ষিতা হও না কেন, যতই ভিটেমাটি ছাড়া হও না কেন, আওয়ামী লীগের কাছে থেকে পাওয়া প্রতি আঘাত আশীর্বাদরূপে মানিয়া লইও”। তাই ওরা নৌকা ছাড়া অন্য কোন প্রতীক চেনে না। ইসলামকে বিএনপি ভালো বাসুক বা নাই বাসুক, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম টিকে থাক এ নিয়ে বিএনপির মাথা ব্যথা থাকুক বা না থাকুক, ক্ষমতায় যদি তাদের আসতেই হয় তবে ইসলামী শক্তিগুলোর ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভুতের মতো চেপেই আসতে হবে। তাই তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নয়, বরং “আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” রক্ষার আন্দোলনকেই বিএনপিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে আপোষ রফা হয়ে গেলেই, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির হালুয়া-রুটি ভাগাভাগি হয়ে গেলেই যদি তারা থেমে যায়, আর ইসলাম যদি প্রতিনিয়ত কোনঠাসা হতে থাকে ধর্মদ্রোহী হাসিনাদের হাতে তবে বিএনপি যেন প্রস্তুত থাকে সেই কঠিন সময়ের যখন শয়তান ছাড়া কাউকেই বন্ধুরূপে কাছে পাবে না।

আজকের এ হরতাল ইসলাম রক্ষার হরতাল। আজকের এ হরতাল মুসলিম বিশ্বের সাথে ভ্রাতৃত্ব রক্ষার হরতাল। আজকের এ হরতাল আমাদের মা বোনদের ইজ্জত আব্রু রক্ষার হরতাল। আজকের এ হরতাল ধর্মদ্রোহী আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল। এ হরতালো এতটুকু ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ পাগলা কুকুরের মতো, শক্তের ভক্ত নরমের যম। শক্ত হাতে আওয়ামী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার মাধ্যমেই ইসলাম ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব। তাই শয়তানের বিরুদ্ধে আজকের এ হরতাল সর্বাত্মক সফল হোক সার্থক হোক এটাই প্রত্যাশা।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হরতাল সফল হোক!” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. mushfiqur rahman বলেছেন:

    mahmudur rahman ar apnatay ekhana e parthakko cg issutay tini khaledakay duder doha monay karen ar amer distitay khaleda hasina aki papay papi. bnp edaning dhormio bishoy nirob. nari niti’r baparay o tara nirob chilo. tara asaly a niti batil habay na. jati tader uporo bhorsa karty pary na.

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন