খালেদা জিয়ার বাজেট প্রস্তাবনা

উপস্থিত সহকর্মী, সুধী, এক্সিলেন্সিস, সাংবাদিকবৃন্দ,
আস্সালামু আলাইকুম।
৭ জুন ২০১০ সালে চলতি অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে আমাদের কিছু চিন্তা-ভাবনা ও বাজেট প্রস্তাবনা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। আমাদের এই বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণা তুলে ধরা। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতির সামনে একটি দিক-দর্শন তুলে ধরা আমরা দায়িত্ব মনে করি। সেই চিন্তা থেকেই আমরা গত বছর বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার আমাদের ধারণাগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেয় নি। যার ফলে আজ সামষ্টিক অর্থনীতির সকল সূচক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এক কথায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। বিগত দুই দশকেও একই অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহ এমন বিপর্যয়ে পড়েনি। যাইহোক, বিদায়ী অর্থছরের মতো আমরা এবারও একই আঙ্গিকে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরের উপর বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপন করছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমরা এমন এক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবনা উত্থাপন করছি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ের অজুহাতে বাতিলের ঘোষণা দিয়ে সুষ্ঠু বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ রূদ্ধ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। আমরা একদিকে যেমন রাজপথের সংগ্রামে রয়েছি, তেমনি তার পাশাপাশি আমাদের জাতি গঠনমুলক কর্মকাণ্ড সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও অব্যাহত রাখতে চাই।

বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া

সুধী মন্ডলী,
আমরা বিশ্বাস করি, বাজেট হবে মানুষের জন্য, উন্নয়নের জন্য, উৎপাদনের জন্য। আর বাজেট বরাদ্দের নীতি হবে সামাজিক উৎপাদনশীলতার নিরিখে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। বর্তমান বাস্তব অবস্থার নিরিখে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিদু্যৎ ও জ্বালানি খাত, শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্যখাত এবং ভৌত-অবকাঠামো খাত বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের ওপর আমরা বেশ কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলাম। আমাদের দিক-দর্শন এবং প্রস্তাবনা এ বছরেও পুরোনো হয়ে যায় নি। এ কারণে বিদায়ী অর্থবছরের প্রস্তাবনাগুলোও সংক্ষিপ্তরূপে আপনাদের নজরে আনা হলো।

বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শন
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী প্রায় চলি্লশ বছরের মধ্যে আওয়ামী শাসনাধীন প্রথম সাড়ে তিন বছরকে বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ আখ্যায়িত করেছিলেন “দি লস্ট মোমেন্টস” বা “হারানো মুহূর্ত” রূপে। সেই সময় বাংলাদেশ একটি “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলেও পরিচিতি অর্জন করেছিল। সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের নীতি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের অবাধ সুযোগ করে দেয়। গড়ে উঠে একটি উৎপাদনবিমুখ লুটেরা শ্রেণী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া উন্নয়ন ও উৎপাদনের অর্থনীতি প্রবর্তন করে এই ধারা রোধ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু, জেনারেল এরশাদের আমলে স্বৈরশাসনের সমর্থনের ভিত তৈরি করার প্রয়াস একটি ঈৎড়হু ঈধঢ়রঃধষরংস এর জন্ম দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব আজও অব্যাহত। বর্তমান সরকারের শাসনামলে ক্ষমতাবানদের আত্মীয়-স্বজন এবং অনুগত ব্যক্তিদের মধ্যে খাজনা বিতরণের (উরংঃৎরনঁঃরড়হ ড়ভ জবহঃ) প্রবণতা দুঃখজনকভাবে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর ফলে অদক্ষ হাতে সমপদ কুক্ষিগত হচ্ছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আয় বণ্টন এবং কর্মসংস্থানের উপর।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ব্যক্তি উদ্যোগ এবং গণসৃজনশীলতা-নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। ব্যক্তি উদ্যোগ ও গণসৃজনশীলতাকে গতিশীল করার জন্য বিএনপি রাষ্ট্রের সহায়ক ভূমিকায় বিশ্বাস করে। বিএনপি আরও বিশ্বাস করে যে, একটি সুঠাম এবং প্রতিযোগিতার শক্তিতে বলিয়ান ব্যক্তি-উদ্যোক্তা শ্রেণী ছাড়া একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও একটি ব্যক্তি-উদ্যোক্তাগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এই গোষ্ঠীটির মধ্যে সবচাইতে সৃজনশীল ও প্রাণবন্ত গোষ্ঠীটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মূলতঃ নিজস্ব সঞ্চয়ের উপর ভিত্তি করে এবং কোনো প্রকার ব্যাংক ঋণের প্রত্যাশা না করে এরা নতুন নতুন উদ্যোগ সৃষ্টি করছে। এদের মধ্যেই নিহিত আছে আগামী দিনের অর্থনীতির গতিশীল ও প্রাণবন্ত ধারা। নীচ থেকে গড়ে উঠা এই উদ্যোগ (ঊহঃবৎঢ়ৎরংব ভৎড়স নবষড়)ি ক্রমান্বয়ে শক্তি অর্জন করে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে বেগবান করবে। বিএনপির লক্ষ্য হলো, এদেরকে কার্যকর নীতি সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী ও আত্ম-মর্যাদাবোধে বিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে উৎপাদন ও উন্নয়নের পথে উত্তরণ ঘটাতে চায় বিএনপি। বিএনপি পরনির্ভরশীলতার অর্থনীতি থেকে দ্রুততম সময়ে বেরিয়ে আসতে চায়। উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত সংস্থান দেশীয় সম্পদের মাধ্যমে করতে সক্ষম হয়। পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সময় জাতীয় উন্নয়নে দেশীয় সমপদ যোগানোর প্রয়াস শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। সেই সময় সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক সম্পদের উপর নির্ভরশীলতার সৃষ্টি হয়। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশের জন্য এর চাইতে লজ্জ্বাকর অবস্থা আর কি হতে পারে?

বিএনপি একটি কল্যাণমুখী দরিদ্রবান্ধব কর্মসংস্থান সৃজনকারী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। আয় বণ্টনে বৈষম্য হ্রাস করে দেশীয় বাজার সম্প্রসারণের নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি। বিএনপি কৃষি, শিল্প এবং সেবাখাতে সমৃদ্ধ জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। এই লক্ষ্য দ্রুততম সময়ে পুরণের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। বিএনপি তাই শিক্ষা, গবেষণা, কৃৎ-কৌশল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং গবেষণা ও উন্নয়নের প্রতি যথাসাধ্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা প্রদানের নীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা মনে করি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির অব্যাহত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে খাদ্যে স্বয়ম্ভর হওয়ার কোনো বিকল্প জনবহুল বাংলাদেশের নেই।
বিএনপি বাজার প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রের ভূমিকার সর্বোত্তম সমন্বয়ে বিশ্বাসী। জাতীয় অর্থনীতিকে সর্বোত্তমভাবে সংগঠিত করতে ব্যক্তি মালিকানা, সমবায়ভিত্তিক মালিকানা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানার পারস্পরিক পরিপূরকতায় বিশ্বাসী বিএনপি। সামাজিকভাবে অনগ্রসরগোষ্ঠীসমূহকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সহায়তা প্রদানের নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি। শিক্ষার বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, আয়বর্ধন, সামাজিক বৈষম্য নিরসন প্রভৃতি নানামুখী কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠীগুলোকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার নীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী পুরুষকে সমভাবে দেশ গড়ার সৈনিকে পরিণত করতে চায় বিএনপি।
বিএনপি সবসময় নন-গভ:সংস্থা সমূহকে জাতীয় উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে সুযোগ করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
বিএনপি চায় এমন একটি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা কোনো গোষ্ঠীকে এড়িয়ে যাবেনা, প্রতিটি মানুষ মানুষের মর্যাদা পাবে। প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা এবং বাছাই ও পছন্দের অধিকার (ঈযড়রপব) নিশ্চিত হবে। সম্পূর্ণ অবসান ঘটবে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদ বৈষম্যের। বাংলাদেশের মাটিতে এবং এর উন্মুক্ত আকাশের নীচে প্রতিটি মানুষ হবে একে অপরের স্বজন। উন্নত জীবনবোধের নৈতিকতায় প্রত্যেক নাগরিক হবে মানুষের মতো মানুষ। সকল প্রকার বৈষম্য, শোষন বঞ্চণা এবং অবহেলার বিরুদ্ধেই বিএনপির রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জমি ইজারা নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে মন্তব্য করেছে তাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা বলেছে “বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মূলতঃ কয়েকটি পণ্য রপ্তানি এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয়ের উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে খুবই স্বল্প পরিমানে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ। সম্প্রতি রপ্তানি বাড়লেও এর চেয়ে বেশি বেড়েছে আমদানী (রপ্তানি বেড়েছে ৪১%, কিন্তু আমদানি বেড়েছে ৫১%)। প্রবাসী আয়ে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি থাকলেও মূলধন হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ পরিস্থিতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে বৈদেশিক দায় পরিশোধে দেশে বিদেশী মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) চাপের মধ্যে ও তা নিম্মমুখী। এই পরিস্থিতিতে টাকার মূল্যমান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

গত মার্চ ২০১১ পর্যন্ত (বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য) সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। চলতি হিসেবে ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত থাকলেও তা চলতি জুন মাসের হিসাব সমন্বয়ের পর ঘাটতিতে পরিণত হবে। সূত্রমতে, বুধবার (১.৬.১১) দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমান ছিল এক হাজার তেতালি্লশ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা।

সারের দাম বৃদ্ধি
যেখানে উৎপাদনের উপকরণ সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করে কৃষককে উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য প্রণোদনা দেয়ার কথা, সেখানে ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি ১২ টাকা থেকে ২০ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়েছে ্#৯৪৭২; অর্থাৎ দাম বাড়ানো হয়েেেছ ৬৭ শতাংশ। এর ফলে গত বছরের তুলনায় একই পরিমান সার ব্যবহার করলে শুধু এই উপকরণের জন্য উৎপাদন খরচ বাড়বে প্রায় ৪০ শতাংশ। কেননা কৃষকরা ইউরিয়া ব্যাপক হারে ব্যবহার করে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ারও ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

‘ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। লাভ ফড়িয়া মজুদদারদের’ – প্রথম আলো, ২রা জুন, ২০১১। খবরে প্রকাশ সরকারিভাবে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় ঠাকুরগাঁয়ের মজুদদারেরা ফড়িয়াদের মাধ্যমে কমদামে ধান কিনে পরবর্তী সময়ে সরকার ঘোষিত দরে বিক্রির আশায় গুদামজাত করছেন। মজুদদারেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফড়িয়াদের সঙ্গে আলোচনা করে ধানের দর নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে শ্রম ও পুঁজি খাটিয়ে কৃষকেরা ফসলের ন্যায্য দাম না পেলেও ফড়িয়া মজুদদাররা শস্য সংগ্রহ নিয়ে সরকারের সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবে ফায়দা তুলে নিচ্ছে। সরকারই ফড়িয়া মজুদদারদের স্বার্থে কাজ করছে।

মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি
চলতি অর্থবছরে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে স্থিতিশীল রেখে তা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির ধারে কাছে নেই মূল্যস্ফীতির বর্তমান হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্যানুযায়ী সর্বশেষ এপ্রিল মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার ১০.৬৭, মার্চ ২০১১ এ হার ছিল ১০.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে চলমান গড় হিসাবে ২০১১ এর এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৫৪ শতাংশ। দরিদ্র দেশগুলোর জনগণের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। ফলে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দামের উপরই নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির উঠানামা। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার এখন আতঙ্কজনক পর্যায়ে চলে গেছে। গত এপ্রিলে (২০১১) খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১৪.৩৬ শতাংশ। আগে মার্চে ছিল ১৩.৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য বহিভর্ূত মূল্যস্ফীতির হার ৩.৯৭ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৪.৩২ শতাংশ।

ব্যবধান বেড়েছে শহর আর গ্রামের মানুষের মধ্যেও। গ্রামে দারিদ্র্যের হার বেশি। মূল্যস্ফীতির চাপও বেশি। গত এপ্রিলে পল্লী অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১.৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যসূচকে ১৫.৩৮ শতাংশ ও খাদ্য বহিভর্ূত সূচকে ৩.৯২ শতাংশ। অন্যদিকে এপ্রিলে শহর এলাকায় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৬২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে খাদ্যসূচকে ১২.০৪ শতাংশ এবং খাদ্য বহিভর্ূত সূচকে ৪.১৮ শতাংশ। অর্থাৎ গরীব মানুষের উপর বাজেটের আগেই কর বসেছে ১০.৬৭ শতাংশ।
অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বলা হয়েছিল, “দ্রব্যমূল্যের দুঃসহ চাপ প্রশমনের লক্ষ্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।”

অথচ টিসিবির মূল্য তালিকা (মার্চ ২০১১) অনুযায়ী বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় মোটা চালের দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ, আটার দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ এবং ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বু্যরোর ২০০৫ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দরিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষের দৈনিক আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। এর মধ্যে কেবল চালই কিনতে হয় ৩৩ শতাংশ আয় দিয়ে। সুতরাং চালের দাম বাড়লে জনগোষ্ঠী খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যায়। দারিদ্র্য বাড়ে। উচ্চ-মূল্যস্ফীতি আয় বৈষম্য বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই,এম,এফ) মনে করে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াই বিপদজনক। সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশ সেই বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়েছে।

দ্রব্যমূল্যের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত বিশ্বব্যাংকের ুঊংঃরসধঃরহম ঃযব ঝযড়ৎঃ-ৎঁহ চড়াবৎঃু ওসঢ়ধপঃং ড়হ ঃযব ২০১০-১১ ঝঁৎমব রহ ঋড়ড়ফ চৎরপবংচ্ স্ট্যাডি থেকে ২০১০ এর জুলাই থেকে ২০১০ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত খাদ্যমূল্যের বিশ্লেষণে জানা যায়, খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ায় নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ২ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং কিছু মানুষ এ সীমা অতিক্রম করায় (০.৪৯%), সার্বিকভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ। এ পরিসংখ্যান ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের। অবস্থার দ্রুত অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে আরও ৩ শতাংশ মানুষ যে দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। উল্লেখ্য যে, ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪৯ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল।

বৈদেশিক সাহায্য প্রবাহ
বর্তমান অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বিশ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তি আশা করা হয়েছিল। কিন্তু, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এই খাতে পাওয়া গেছে মাত্র ৪,৬২৭ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে প্রাপ্ত সাহায্যের পরিমান ছিল ৯,১৪৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান আর্থিক বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশী ঋণ পাওয়া গেছে ১২৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, কিন্তু বিগত অর্থবছরে একই সময়ে পাওয়া গিয়েছিল ১৭৭ কোটি ডলার যার মধ্যে ৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে তুলনামূলকভাবে বেশ কম সাহায্য পাওয়া গেলেও পরিশোধ করতে হয়েছে বেশি। দুর্নীতি, মানবাধিকার, সুশাসন প্রভৃতি ইসু্যতে সরকারের সঙ্গে দাতাগোষ্ঠীর দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় দাতাগোষ্ঠী পূর্বের ন্যায় অর্থ ছাড় করছে না। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহের পরিমান কমেছে ৩৮%।

স্পেশাল ইকনমিক জোন
ভারতীয় বাণিজ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সিলেটের ছাতকে শুধু মাত্র ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ‘স্পেশাল ইকনমিক জোন’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান সরকার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখছেন। এই স্পেশাল ইকনমিক জোনের জন্য ৪০০ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। যেসব ভারতীয় ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এই স্পেশাল ইকনমিক জোনে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দেখাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছে টাটা, বিরলা, টিভিএস গোষ্ঠীসহ অন্যান্য বড় বড় ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী। এদের লক্ষ্য হল উত্তর পূর্ব ভারতের শিল্প পণ্যের চাহিদা পুরণ করা। বাংলাদেশের শিল্পপতিরা ধারণা করেছিলেন ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু হলে তারাই সীমান্তবর্তি অঞ্চলে কলকারখানা স্থাপন করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে। ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশী শিল্পপতিদের আশাআকাঙ্খা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমার মনে করি এ ধরণের প্রস্তাব অনুমোদনের পূর্বে বাংলাদেশী শিল্পপতিদের স্বার্থ সরকারকে অবশ্যই বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারতের সংগে ১ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণচুক্তি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারত থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই ঋণচুক্তির অধীনে যে সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে তার লক্ষ্য হল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর সুবিধা ব্যবহার সহজতর করা। এই ঋণের জন্য ১.৭৫% হারে সুদ দিতে হবে। অথচ বিশ্ব ব্যাংক এ ধরণের ঋণ দেয় ০.৭৫% সুদে। ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড সহ ১৫ বছরে এই ঋণ শোধ করতে হবে। বিশ্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে শর্তটি হলো ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪০ বছরে পরিশোধ। কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে ০.৫ শতাংশ হারে। এই শর্তটিও বিশ্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। ভারতই প্রকল্পের পরামর্শক সেবা দেবে। ৮৫ শতাংশ উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ভারত থেকেই কিনতে হবে, বাকী ১৫ শতাংশ উপকরণ অন্য সূত্র থেকে সংগ্রহ করা গেলেও ভারতের এঙ্মি ব্যাংকই তা সংগ্রহ করবে। প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী পার্টিগুলোর পাওনা ভারতের এঙ্মি ব্যাংক সরাসরি পরিশোধ করবে। প্রকল্পের কোনো অর্থ বাংলাদেশের হাতে আসবে না। প্রকল্পের কন্ট্রাক্টরগণও হবেন ভারতীয়। জয়েন্ট ভেনচারের ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকবে ভারতীয় কোম্পানীর। সকল পাওনা ডলারে পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে ভারতীয় অনুমোদন ছাড়া এই ঋণের অধিনে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবে না। এই ঋণ চুক্তি শতকরা ১০০ ভাগ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী। কারণ কঠিন শর্তের ভারতীয় ঋণ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর সুবিধা ব্যবহারের জন্যই ব্যয়িত হবে। ইতোমধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিট ব্যবহারের জন্য ফি দাবি করাকে ‘অসভ্যতা’ বলে মিডিয়ার কাছে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমান সরকারের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা ইতিপূর্বে দাবি করেছিলেন ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ সিংগাপুর হয়ে যাবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরো নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

এ, ডি, পি বাস্তবায়ন
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে এখন চলছে নৈরাজ্যকর অবস্থা। মন্ত্রী পরিষদ ও উপদেষ্টা মন্ডলীর দ্বৈত শাসনের ফলে সিদ্ধান্ত-হীনতা, স্থবিরতা এবং সরকারের অভ্যন্তরে চিন্তার ঐক্যের অভাব প্রশাসনকে এমন স্তরে নিয়ে গেছে যে এর দ্বারা জনগণের কোন মঙ্গল আশা করা যায় না। জানা যায়, বর্তমান সরকারের কর্মকর্তারা ভয়ভীতি ও ত্রাসের মধ্যে থাকার ফলে এবং তাঁদের উপর অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক খবরদারি ও হস্তক্ষেপের ফলে এ,ডি,পি বাস্তবায়নে আশানুরূপ উদ্যোগ গ্রহনে তাঁরা সাহস পাচ্ছে না। বর্তমানে এডিপি বাস্তবায়নে অদক্ষতা সরকারের ব্যর্থতারই একটি নজির।

পরবর্তী এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১০৩৯ এর মধ্যে ৯৬২টি প্রকল্প বর্তমান অর্থবছর থেকে স্থানান্তরিত। ৭৭টি প্রকল্পের জন্য নতুন অর্থায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩৪টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১৪৩টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৬২টি জেডিসিএফ দ্বারা অর্থায়নকৃত।

চলতি অর্থবছরে প্রথম ১০ (দশ) মাস শেষে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি মাত্র ৬০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। ৮৭টি প্রকল্পে কোন অর্থই ব্যয় করা হয়নি। অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল ২০১১ পযনর্্ত ২০ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, শেষ দুই মাসে ১৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। প্রতি বছরেই সরকার যে আকারের এ, ডি, পি, করে, তা বাস্তবায়ন না করতে পেরে সংশোধন করা হয়। সংশোধিত এ,ডি, পিও শেষ পযনর্্ত বাস্তবায়ন হয় না।
এ দিকে গত দুই অর্থবছর ধরে বাজেটে সরকারী বেসরকারী অংশীদারির (পিপিপি) আওতায় বিনিয়োগের ব্যাপক আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি নেই। গত বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নীতিনির্ধারণী কাঠামো প্রণয়নে ব্যর্থতার কারণে একটি টাকাও খরচ করা সম্ভব হযনি। আগামী অর্থবছরেও শুনছি তিন হাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ দেয়া হবে। এমনকি পিপিপির দপ্তর গঠনের ঘোষনা দেওয়া হলেও তা’ও করতে পারেনি সরকার। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে খরচ না করে অন্যান্য প্রকল্পে খরচ করার ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের মান ব্যাহত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আমাদের সময়ে গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাই-ওয়ে চার লেন প্রকল্প, যাত্রাবাড়ী ফ্লাই-ওভার ও রেলওয়ের ডাবল লাইন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শুরু না করে বর্তমানে নতুন করে কার্যাদেশ দিয়ে এগুলোর ব্যয় বাড়ানো হয়েছে প্রায় কয়েকগুণ। উল্লেখ্য যে, আমাদের সময় প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কমিটির (চওঈঙগ) নীতি কাঠামোর আওতায় ১৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণ করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।

আমরা মনে করি, সরকারী কর্মকান্ডের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে আস্থার মনোভাব ফিরিয়ে আনতে হবে। সময়মত অর্থছাড় করে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। বছর ব্যাপী সুষম হারে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে বছরের প্রথম থেকেই রাজস্ব সংগ্রহের গতি বাড়াতে হবে। রাজস্ব প্রশাসনের ভিন্নতা বিবেচনায় রাজস্ব প্রশাসন পরিচলনায় নীতি পরিবর্তন ও সংস্কার করতে হবে।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হওয়ায় একদিকে যেমন ব্যয়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি এই দ্বি-মুখী নেতিবাচক চাপ প্রতিহত করার লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রশাসনকে তৎপর করে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পের বাহুল্য কাঙ্খিত উন্নয়ন অর্জনের পরিপন্থি।

আগামী অর্থবছরের জন্য ৪৬ হাজার কোটি টাকার নতুন এ,ডি,পি অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এন,ই,সি)। এই অর্থ আপাতঃদৃষ্টিতে বিগত বছরের এডিপির তুলনায় বড় দেখালেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করলে এই অর্থ তেমন বেশি নয়। এর মধ্যে সরকার যোগান দেবে ২৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা এবং বিদেশী সহায়তার প্রত্যাশা ১৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এই সরকারের আমলে চলতি অর্থ বছরের সময়মত বৈদেশিক সাহায্য না আসার ফলে এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে কি হবে বলা যায় না। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ যোগান দিতে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর অতি নির্ভরশীলতায় একদিকে বেসরকারী খাতে ঋণের সরবরাহ সংকুচিত হবে, অন্যদিকে বেসরকারী খাতে উৎপাদন ব্যাহত হবার ফলে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।

বাজেটের আকার ও বাজেট ঘাটতি
বাজেটের আকার বর্তমানে দিন দিন বাড়ছে বিপুল ভাবে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছেনা এডিপি ব্যয়। বিএনপির শেষ অর্থ বৎসরে অর্থাৎ ২০০৫-০৬ সালে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা যা বর্তমানে অর্থ বৎসরে প্রায় ১২০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু এডিপি ব্যয় এই ৫ (পাঁচ) বৎসরে ৫০ শতাংশও বাড়েনি। ২০০৬ সালে এডিপি ব্যয় ছিল একুশ হাজার পাঁচশত কোটি টাকা যা এ অর্থ বৎসরে পরিকল্পণা মন্ত্রীর উচ্চ প্রত্যাশা সত্য হলেও হবে ৩২ হাজার কোটি টাকা মাত্র। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে তা হবে আরও কম। আমাদের সময় এডিপি ব্যয় ছিল মোট বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ তা বর্তমানে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। ফলে বর্তমানে বাজেটের উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইরধং বা উন্নয়নের প্রাধান্য ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় উন্নয়ন ব্যয় নীট হিসাবে আরও হ্রাস পেয়েছে।

এডিপি ব্যয় আশানুরূপ ভাবে বৃদ্ধি না পেলেও আমাদের বাজেট ঘাটতি বাড়ছে আশংকাজনক ভাবে। ২০০৫-০৬ অর্থ বৎসরে বাজেট ঘাটতি যেখানে ছিল তের হাজার সাতাশ কোটি টাকা তা বর্তমান অর্থ বৎসরে হয়েছে ৩৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা। আগামী অর্থ বৎসর তা ৪০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বৈদেশিক সাহায্য না পাওয়ায় বাজেটের এ ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ভাবে উচ্চ সুদের হারে ব্যাংকিং এবং নন ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ সংগ্রহ করে। বর্তমানে অর্থবৎসরে এ অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। একদিকে প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সাহায্যের অর্ধেকও বর্তমান অর্থবৎসরে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং সেক্টর যেখানে বেসরকারী খাতকে ঋণ দিতে তারল্যের অভাবে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ সংগ্রহ বাড়ালে তারল্যের উপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। অসহনীয় মূল্যস্ফীতি যেখানে সরকারের প্রায় নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে সেখানে বর্ধিত বাজেট ঘাটতি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে আরও ইন্ধন যোগাবে এবং আমাদের সময়ে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে গধপৎড় ঊপড়হড়সরপ ঝঃধনরষরঃু বাংলাদেশ অর্জন করেছে তা এ সরকারের আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে চরম হুমকির মুখে পড়বে।

পরিবহন-রেলওয়ে
অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির কারণে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন করুন অবস্থার মধ্যে আছে। আমাদের সময় (২০০৬ অর্থ বৎসরে) শুরু হওয়া বৈদেশিক সাহায্য বাংলাদেশ রেলওয়ে সেক্টরে ইম্প্রুভমেন্ট প্রকল্পের বরাদ্দের ছয় শতাংশ ব্যয়ই গত অর্থবছরে করা সম্ভব হয় নি। এর কিছু দিন পরই গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি একই রকম। গত চার বৎসরে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ২ ভাগেরও কম।

পরিবহন-সড়ক
সড়ক খাতের উন্নয়ন অগ্রগতি এতই অসন্তোষজনক যে যোগাযোগ মন্ত্রী সংসদে তার নিজ দলের সদস্যদেরই সমালোচনার তোপের মুখে পড়েন। ঢাকা-চট্ট্রাগ্রাম মহাসড়ক চার-লেনে উন্নত করণ প্রকল্প ২০০৬ সালে আমরা গ্রহণ করি এবং শুরু করার জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই কার্যাদেশ বাতিল করে তাদের সময়কালে একাধিকবার টেন্ডার করেও কোন কার্যাদেশ দেয়নি। বর্তমান সরকার পূর্বের দেয়া কার্যাদেশের তুলনায় বহুগুণ ব্যয় বৃদ্ধি করে নতুন কার্যাদেশে দেয়। পত্র-পত্রিকা থেকে দেখা যায় যে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রায়ই বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। প্রকল্পটি পূর্বের দেয়া কার্যাদেশ অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শেষ হয়ে যেত এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বর্তমানে যে ভয়াবহ যানজট সংকটের শিকার হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেত।

দারিদ্র্য বিমোচন
গত বৎসর সরকার বলেছিল যে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা ৩৭.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এক বৎসর পরে সরকার বলছে তা ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ বিশ্ব ব্যাংক এক সমীক্ষায় বলেছে যে মূল্যস্ফীতির কারণে ২০১০ সালের জুলাই – ডিসেম্বর মেয়াদেই নতুনভাবে ১.৫৯ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরিসংখ্যান দিয়ে যে গধহরঢ়ঁষধষঃরড়হ করা হচ্ছে তার এক বড় উদাহরণ হচ্ছে এটি।

বিদু্যৎ ও জ্বালানী
এক সূত্র মতে বর্তমানে বিদু্যৎ উৎপাদনের ক্যাপাসিটি ৫৮৩৬ মেগাওয়াট, তবে প্রকৃত উৎপাদন ৪০০০ থেকে ৪৬৯৯ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৩৪৮১ মেগাওয়াট সরকারি খাতে এবং বাকী ২৪৫৫ মেগাওয়াট বেসরকারী খাতে উৎপাদনের ক্যাপাসিটি আছে। বেসরকারী খাতে উৎপাদনের মধ্যে ৬০৯ মেগাওয়াট রেন্টাল এবং ২৫০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল ব্যবস্থায় ক্যাপাসিটি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহের অভাবে ৫০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট এবং জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণের প্রয়োজনে আরো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, মোট প্রায় ১৫০০ মেগাওয়াট লোড শেডিং হচ্ছে।
সরকার ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৩,০৭০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরমধ্যে সরকারি খাতে ৫৪৫৪ মেগাওয়াট (৪২ শতাংশ) এবং বাকী ৭৬১৬ মেগাওয়াট বেসরকারী খাতে (৫৮ শতাংশ)। সরকারি খাতে খরচ ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫শত ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বেসরকারী খাতে খরচ হবে ৯,৭৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর ফলে বছরে প্রায় গড়ে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে যার ফলে স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭ হাজার ৫শত কোটি টাকার দরকার হবে।

তরল জ্বালানী নির্ভর বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চমূল্যে বিদু্যৎ কিনতে পিডিবির লোকসানের বোঝা দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে জাতীয় বাজেটে ভতর্ুকির পরিমান। বিদু্যতের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তাদের উপর ভতর্ুকির দায়ও চাপানো হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে বিদু্যতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

কুইক রেন্টাল থেকে বিদু্যৎ কিনতে ভতর্ুকির পরিমান বেড়ে যাবে। বিদু্যতের জ্বালানী মূল্যের সংগে মিল রেখে বিদু্যতের দাম নির্ধারণ করা হয়। ৭ টাকা ৮০ পয়সা মূল্য নির্ধারণের সময় ফার্নেস অয়েলের মূল্য ছিল লিটার ২৬ টাকা, এখন তা বেড়ে ৪২ টাকা হয়েছে। দাম বেড়েছে লিটারে ১৬ টাকা। তাই, এ অবস্থায় প্রথম দফায় কুইক রেন্টাল থেকে বিদু্যৎ কিনতে ইউনিট প্রতি চার-পাঁচ টাকা দাম বাড়বে এবং দ্বিতীয় দফায় ভতর্ুকি মূল্যে কমদামে ভোক্তার নিকট বিদু্যৎ বিক্রি করার জন্য ভতর্ুকি ব্যয় বাড়বে।

এ দিকে অপরিকল্পিতভাবে তরল জ্বালানী নির্ভর বিদু্যৎ কেন্দ্র থেকে বিদু্যৎ কেনায় তরল জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে জাতীয় বাজেটে ভতর্ুকির পরিমান আরো বেড়ে যাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। উল্লেখ্য যে ভারতে সরকারি খাতে ৬৫ শতাংশ এবং বেসরকারী খাতে ৩৫ শতাংশ বিদু্যৎ উৎপাদন হয়। বাংলাদেশের প্রবণতা উল্টো দিকে। সরকারের বাজেটে এই অতিরিক্ত ভতর্ুকির চাপ মেটাতে ঋণ করতে হবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

বিদু্যতের চাহিদা সম্পর্কেও সরকারের লুকোচুরি আছে। রিহাবের তথ্যমতে প্রায় ৫০০০ তৈরি ফ্ল্যাটে বিদু্যৎ সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। প্রায় ১৪শত মেগাওয়াট অতিরিক্ত চাহিদা আছে। এছাড়া বিদু্যতের জন্য গত দু’বছরে কোন দরখাস্ত নেয়া হচ্ছে না। এগুলো যোগ করলে মোট চাহিদা অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট হবে। যার সিংহভাগই মেটানো সম্ভব হবে না।

ওঈঞ (ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল)
সংবাদপত্র সূত্রে জানা গেছে, আমাদের সময় গৃহীত নারায়নগঞ্জের খানপুর ও ঢাকার পানগাঁওয়ে নির্মিয়মান ওহষধহফ ঈড়হঃধরহবৎ ঞবৎসরহধষ দু’টি বিদেশী কতর্ৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। তদুপরি দেশীয় অর্থায়নে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেবলমাত্র বিদেশীদের ব্যবহারের সুবিধার্থে আশুগঞ্জে নতুন করে আর একটি ওঈঞ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই তিনটি নদীবন্দরই আন্তর্জাতিক মানের নদীবন্দর হবে বিধায় সামুদ্রিক বড় জাহাজ হতে ছোট জাহাজে করে মালভর্তি কন্টেইনার এই তিনটি টার্মিনালে উঠানো-নামানো সম্ভব হবে। ফলে সমুদ্রবন্দর বাদ দিয়ে কেবলমাত্র আমাদের নৌবন্দর দিয়েই বিদেশীরা তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবে এবং আমরা মারাত্দক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় নিপতিত হব।

মানব সম্পদ রপ্তানি
বিএমইটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিএনপি সরকারের সময় মানবসম্পদ রপ্তানি গড়ে বছরে শতকরা ১৭ ভাগ বৃদ্ধি পায়, অপর দিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তা নেমে দাড়ায় শতকরা ১০ ভাগেরও নীচে। এডিবি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সনের প্রথম ৮ মাসে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ১০.৯% হ্রাস পায়। এ সরকারের ভুল বৈদেশিক নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, কোরিয়াসহ নানা দেশে আমাদের শ্রমশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তদুপরি সম্প্রতি লিবিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া হতে হাজার হাজার শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছে। ফলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন করে দেশে চাকরি সমস্যা ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিদেশে বাংলাদেশীদের চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং রেমিটেন্স যে সামান্য পরিমান বেড়েছে তা পুরানো প্রবাসীদের দীর্ঘদিন চাকরিকালে বেতন বৃদ্ধির ফলশ্রুতি মাত্র। নতুন চাকরি যোগ হওয়ার ফসল নয়।

শেয়ার মার্কেট বিপর্যয়

আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, তখনই শেয়ার মার্কেটে ধ্বস নামে। শেয়ার মার্কেটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ন ব্যবস্থা যেটি হতে পারতো শিল্পায়ন, উৎপাদন ও উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, সেটি হয়ে পড়েছে কিছু সংখ্যক দুর্বৃত্ত চরিত্রের ব্যবসায়ীর বিত্তবৈভব অর্জনের হাতিয়ার। এবার শেয়ার মার্কেটে প্রত্যাশার উচ্ছ্বাস কৃত্রিমভাবে তৈরি করে শেয়ার ইনডেঙ্কে অবিশ্বাস্য পর্যায়ে উন্নীত করা হয় যার সংগে কোম্পানীগুলোর মৌলিক আর্থিক সংগতির কোনো মিল ছিল না। অথচ সিকিউরিটিজ এন্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন এই পরিস্থিতিতে নির্বিকার থেকে অগি্নতে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও আত্মবিনাশী নীতি পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে এক পর্যায়ে শেয়ার মার্কেটে নিদারুন ধ্বস নেমে আসে। লক্ষ লক্ষ শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি-পাট্টা হারিয়ে পথের ভিখারীতে পরিণত হয়। জনশ্রুতি রয়েছে যে ইতোমধ্যে হাজার হাজার ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এই হতাশা থেকে একজন বিনিয়োগকারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। শোনা যায় শেয়ার বাজার থেকে যারা শত শত কোটি টাকা তুলে নিয়েছে তারা নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থাগুলোকে নিজ দখলে নিয়ে নিয়েছিল। এটি ছিল সরকারের চরম গভর্নেন্স ফেইলিউর। একটি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বা রেগুলেটরি বডিগুলো যখন সরকারের মদদে যাদের নিয়ন্ত্রেণ করতে হবে তাদের দখলে চলে যায় তখন আর সেই দেশের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই সরকারের আমলে শুধু শেয়ার মার্কেট নয় অনেক বৃহৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নিয়ম নীতির ব্যত্যয় যেভাবে ঘটানো হয়েছে তাতে বোঝা যায় না কোন ন্যায়নিষ্ঠ সরকার নামক কোনো প্রতিষ্ঠান এদেশে বিদ্যমান। শেয়ার মার্কেটের দুর্যোগের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রতিবাদীরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসে শেয়ার মার্কেটে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনে আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তা নস্যাৎ করে দেয়।

ক্রনি ক্যাপিটালিজম
এ সরকার ক্ষমতাশীন হওয়ার পর হতেই নিজ দলীয় ক্যাডার, নেতা-কর্মী ও ব্যবসায়ীদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অবৈধ উপায়ে ব্যবসায় পাইয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অংগনে এক ভয়ংকর ও ভয়াবহ নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

১। সরকার জাতীয় পর্যায়ে বৃহৎ প্রকল্প হতে শুরু করে এমনকি উপজেলা/ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রকল্প পর্যন্ত বিনা টেন্ডারে কিংবা টেন্ডার কারসাজি করে ছাত্রলীগ/যুবলীগের কর্মিদের কাজ পাইয়ে দেয়।

২। কোনো টেন্ডার ছাড়াই বিদু্যৎ সেক্টরে ছঁরপশ জবহঃধষ চড়বিৎ চষধহঃ সমূহের অধিকাংশই দেয়া হয়েছে সরকার দলীয় ব্যবসায়ীদের।

এ সব জায়েজ করার জন্য পাশ করা হেেয়ছে ইনডেমনিটি এ্যাক্ট এবং সংশোধন করা হয়েছে পিপি এ্যাক্ট।

৩। ঞঈই ডিলারশিপ ঙগঝ ডিলারশীপ ও সার বিতরণের জন্য ডিলার নিয়োগ দিয়ে দলীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সুযোগ বিতরণ করেছে।
৪। এডহক ভিত্তিতে ৪ হাজার দলীয় চিকিৎসক নিয়োগ করেছে চঝঈ কে পাশ কাটিয়ে।
৫। জনপ্রশাসনে ৬৪ হাজার জনবল নিয়োগ করার পদক্ষেপ নিচ্ছে পিএসসিকে পাশ কাটিয়ে।

৬। পুলিশ বিভাগে নিয়োগ, জাতীয় কর্মসংস্থান প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প প্রভৃতি নিয়েও চলছে নির্লজ্জ দলবাজি।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাস্্সের আলী তো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছাড়া কাউকে চাকুরী দেয়া যাবে না বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন।

সরকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন, দুনর্ীতি দমন কমিশন, সিকিউরিটিজ এন্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, উচ্চতর আদালত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন দলীয় দখলে নিয়েছে। ফলে ভেঙ্গে পড়েছে ন্যায়নীতি ও আইনের শাসন।

বিদায়ী অর্থবছরে আমাদের প্রস্তাবনাসমূহ

বিদু্যৎ খাত সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ছিল

ক্ষমতায় আসার প্রায় দেড় বছরেও সরকার বিদু্যৎ উৎপাদনে কোন আগ্রহ না দেখিয়ে, সংকট তীব্রতর হওয়ার পর বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সুষ্ঠু ক্রয়নীতি অনুসরন না করা, বিনা টেন্ডারে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া এবং এ ক্ষেত্রে বিশাল দুনর্ীতির সুযোগ সৃষ্টি করা ও উচ্চমূল্যে বিদু্যৎ ক্রয় করা এবং ইউনিট মূল্য ভোক্তাদের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে গিয়ে জিডিপির বিপুল অংকের লোকসান দেয়া এবং লোকসান পূরণে বিপুল পরিমান ভর্তুকি প্রদান ও ফলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ মারাত্দকভাবে সীমিত হবার আশংকার কথা আমরা ব্যক্ত করেছিলাম। ইতোমধ্যে বিদু্যতের ট্যারিফ বৃদ্ধির কথাও শুনছি।

আমরা বলেছিলাম –
১. বিদ্যমান বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় মেরামত করে আরও ৭ শত মেগাওয়াট বিদু্যৎ জাতীয় গ্রীডে যোগ করা।

২. বিদু্যৎ উৎপাদনে সরকারের স্বল্পমেয়াদি ছঁরপশ জবহঃধষ চষধহঃ এর উৎপাদিত উচ্চমূল্য বিদু্যৎ চাহিদা মেটানোর কোন স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন প্রতি বছর বিদু্যৎ উৎপাদন অন্ততঃ শতকরা ২০ ভাগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদু্যৎ উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন।

৩. জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনায় রেখে আনবিক বিদু্যৎ কেন্দ্র স্থাপনে আমাদের নীতিগত সমর্থন।

৪. একই সাথে বিদু্যৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস অনুসন্ধানের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা।

৫. জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে পেট্রোবাংলাকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করা।
৬. পরিবেশের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে বিদু্যৎ উৎপাদনে জাতীয় সম্পদ কয়লার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৭. একই সাথে নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌরশক্তি, বায়ু শক্তি, জিওথার্মাল শক্তি ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে বিদুাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এসব খাতকে উৎসাহিত করার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত কর মওকুফসহ অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান করা।

শিক্ষা খাত সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম
১. কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে প্রতি পরিবারের অন্ততঃ একজনকে উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করা।

২. শিক্ষার উচ্চতর মান অর্জনের জন্য মালয়েশিয়া, চীন ও কোরিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানরত শিক্ষকদের ব্যাপক হারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাগ্রসর শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা নেয়া এবং এর জন্য বাজেটে প্রতি বছর ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করা।

৩. জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ।

বিজ্ঞান, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে আমাদের প্রস্তাবনা ছিল
১. বিজ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদানের এক শতাংশ বিজ্ঞান ও গবেষণায় এবং অনুরূপভাবে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদানের এক শতাংশ কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বরাদ্দ করা।

২. সরকারি ও বেসরকারী খাতের সমন্বিত উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলায় কম্পিউটার শিক্ষার সুযোগসহ অন্যান্য কারিগরি কোর্স সম্বলিত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিটি বিভাগে একটি করে কারিগরি ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রস্তাবিত একাডেমিক ইনোভেশন ফান্ডের ৬৫০ কোটি টাকা শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়া।

৪. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষাকে জনপ্রিয় ও উন্নত করে তোলার জন্য শিক্ষার্থী বান্ধব বিজ্ঞান পাঠ্য-পুস্তক রচনা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিভিন্ন সিডি প্রকাশনা ও বিজ্ঞান শিক্ষকদের জন্য মৌলিক বিজ্ঞান বিষয়ে অব্যাহতভাবে রিফ্রেশার কোর্স চালু করা।

যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে একে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনায় এনে ২০০২ সালে আমরা আইসিটি পলিসি ২০০২ প্রণয়ন করি। এই খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করার কথাও আমরা প্রস্তাব করেছিলাম। এর মধ্যে সকল উপকরণ সামগ্রীর উপর শূণ্য শুল্ক অব্যাহত রাখা ও বেসরকারী খাতে বিচিত্র মান ও আকারের চালু প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় সাধন করে একটি উপযুক্ত কতর্ৃপক্ষ সৃষ্টি করার মাধ্যমে মান-সম্মত কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব আমরা করেছিলাম।

শিক্ষার মানবৃদ্ধির জন্য প্রাথমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নতমানের পাঠদান নিশ্চিত করতে দেশের সেরা শিক্ষক ও পন্ডিত ব্যক্তিদের দিয়ে সারা বছর মডেল পাঠদান সম্প্রচারের লক্ষ্যে একটি আলাদা সরকারী টিভি চ্যানেল স্থাপন এবং ঐ চ্যানেলে প্রচারিত মডেল পাঠদান সম্বলিত সিডি দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে বিতরণ করার প্রস্তাব করেছিলাম।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার জন্য বিএনপি সরকার ১৯৯৮ পূর্ববতী অবস্থা পূণর্বহাল করেছিল, ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি হৃত-গুরুত্ব ফিরে পেয়েছিল। শিশুদের মধ্যে ১৬ শতাংশ অপুষ্টির হার এবং ৪৩ শতাংশ ওজন স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেবাসামগ্রী সরবরাহ, ধারাবাহিকভাবে মাতৃ ও শিশু মৃতু্যর হার আরো কমিয়ে আনার জন্য জোরদার কর্মসূচি প্রণয়নের প্রস্তাব করেছিলাম এবং শহরে ও গ্রামে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি স্বাস্থ্য-বীমা চালু করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

ভৌত-অবকাঠামো, সড়ক ও রেল ও নৌ যোগাযোগ উন্নত ও সম্প্রসারিত করার জন্যে আমরা নৌ-যোগাযোগ বৃদ্ধি করার জন্য (১) নির্বাচিতভাবে নদী খনন ও নদী শাসনের ব্যবস্থা করা, (২) বিদ্যমান নৌ পথের নিরাপত্তা বিধান, (৩) দুর্ঘটনাজনিত উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করার জন্য উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় নৌযানের সংখ্যা যথোপযুক্তভাবে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

সড়ক যোগাযোগের পরিপূরক হিসেবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উপেক্ষিত রেলওয়ের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য আমরা (ক) বর্তমান রেল লাইনগুলো সম্পূর্ণভাবে পূনঃনির্মাণ, পূর্ণবাসন ও মজবুত করা এবং ডাবল লাইন স্থাপন করা, (খ) মালামাল পরিবহনে রেলওয়ের ব্যবহার বাড়ানো, (গ) ঢাকা মহানগরের সাথে আশ-পাশের ছোট শহরগুলির সঙ্গে কমিউটার রেল যোগাযোগ স্থাপন, (ঘ) রাজধানীর সঙ্গে অন্যান্য বিভাগীয় বড় শহর যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনায় দ্রুতগামী রেল সার্ভিস প্রবর্তন, (ঙ) ঢাকা-লাকসাম ট্রাংক লাইন নির্মাণ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম সংক্ষিপ্ততম সরাসরি রেল যোগযোগ স্থাপন, (চ) যতদূর সম্ভব সকল জেলা সদরের সাথে রেল যোযোগ স্থাপন, (ছ) রেলওয়ের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ইঞ্জিন ও মালবাহী এবং যাত্রীবাহী বগি সংগ্রহ, এবং (জ) রেলের ইঞ্জিন ও বগি সংযোজনের ব্যবস্থাসহ পাহাড়তলী ও সৈয়দপুরে অবস্থিত রেলওয়ে ওয়ার্কশপগুলো আধুনিকীকরণ, সুষমকরণ, অধিকতর সক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

কৃষি ব্যবস্থাপনা ঃ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে কৃষি উৎপাদনের জন্য কৃষককে সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সার ও সেচের উপর ভতর্ুকি প্রদানের প্রস্তাব করেছিলাম।

কৃষকগণ যাতে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের যথাযথ মূল্য পান সে জন্যে প্রয়োজনে সরকারীভাবে যথার্থ মূল্যে কৃষি পণ্য ক্রয় এবং সে সাথে উৎপাদনে (ঠবৎঃরপধষ পড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ) সমবায় সৃষ্টি করা এবং কৃষি পণ্যের বাজারকে মাস্তানমুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। একই সাথে (ক) সারের উপর ভতর্ুকি বাড়ানো, (খ) ডিজেল চালিত সেচযন্ত্রের জন্য ভতর্ুকি, (গ) উন্নত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিসহ যথাযথভাবে বীজ সংরক্ষণের জন্য অধিক মজুদ ক্ষমতার সংরক্ষণাগার, (ঘ) কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা বরাদ্দ বাড়ানো ও গবেষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দেশে ও বিদেশে প্রাগ্রসর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ, (ঙ) গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি বহুমুখীকরণের কর্ম-কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এ ছাড়াও চাষে নিবিড়তা বৃদ্ধি, অব্যবহৃত জমি চাষের আওতায় আনা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচি জোরদারকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল ফসলের উদ্ভাবন, কৃষকদের প্রণোদনা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে মার্কেট চেইনের উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা সৃষ্টিতে ঋণ সহায়তা প্রদান, কৃষকদের সংগঠিত করা ইত্যাদি কর্মকৌশলের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা এবং প্রতিটি কর্মকাণ্ডের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অর্থ বরাদ্দ করার প্রস্তাবও আমরা দিয়েছি।

আমিষ জাতীয় খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে গৃহীত পদক্ষেপের অনুরূপ বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ হিসেবে ডিম আমদানি না করা, পর্যাপ্ত দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য নতুন করে গরুর খামার প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সাথে দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষতঃ উপকূলীয় অঞ্চলে (অনুকূল পরিবেশের কারণে) মহিষ পালনের খামার প্রতিষ্ঠা এবং এর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব করেছিলাম। উল্লেখ্য যে, এ ধরণের মহিষ পালনের প্রকল্প থেকে ভারত অনেক লাভবান হয়েছে। এ ছাড়াও বিএনপি আমলে প্রতিষ্ঠিত কয়েক লক্ষ পোল্ট্রি খামারের জন্য উপযুক্ত ঋণ সুবিধা ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদানের প্রস্তাবও আমাদের ছিল।

কৃষি বীমাঃ প্রান্তিক চাষীদের সহযোগিতা প্রদান ও কৃষি পণ্য উৎপাদনের ঝুঁকি কমানোর জন্য আমরা তিন ধরণের যথা শস্য বীমা, মৎস্য ও পোল্ট্রি বীমা এবং পশু সম্পদ বীমা প্রস্তাব করেছিলাম এবং একই সাথে সরকারী ও বেসরকারী খাতের সমন্বয়ে নতুন কৃষি বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমের শুরুতে সরকার কতর্ৃক ভতর্ুকি প্রদানের মাধ্যমে বীমা চালু করা এবং এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একশত কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছিলাম।

কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে আলু, শাক-সবজি ও ফলমূল সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি বা প্রয়োজনে একাধিক হিমাগার স্থাপনের লক্ষ্যে সহায়তাদানের জন্য আমরা দুইশত কোটি টাকার তহবিল গঠেেনর প্রস্তাব করেছিলাম।

সীমিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য কৃষি জমিতে সকল ধরণের নির্মাণ নিরুৎসাহিত করা সহ পরিকল্পিত জনবসতি কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এর মধ্যে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ, দুই-তিনটি গ্রাম মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে গৃহ নির্মাণের জন্য “নির্ধারিত আবাসন এলাকা” গঠন এবং প্রতিটি আবাসন এলাকাকে বন্যাস্তরের বা সীমার উধের্্ব পাকা রাস্তা দ্বারা সংযুক্ত করা, এবং নির্ধারিত আবাসন এলাকাতে জমি কেনা ও বহুতল বাড়ি তৈরি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করার প্রস্তাবনা আমাদের ছিল।
এসব এলাকায় ভৌত-অবকাঠামোসমূহ যথা রাস্তাঘাটসহ বিদু্যৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা, বন্যা থেকে সুরক্ষা, টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা এবং সামাজিক অবকাঠামো যথা প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র, খেলার মাঠ, পাঠাগার, কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলাম। একই সাথে এসব এলাকায় অব্যাহতভাবে ঋণ সুবিধা প্রদানের জন্য আবাসন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং পর্যায়ক্রমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২৫০ কোটি টাকার নতুন তহবিল গঠনের প্রস্তাবও আমাদের ছিল।

রেল সেক্টর

বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং নৌ-পরিবহন সেক্টর স্বাধীনতার পর হতেই অবহেলিত হয়ে আসছে। আমাদের সরকারের সময় এডিবি’র সহায়তায় রেলওয়ে সেক্টরের উন্নয়নের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মহা-উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তুু বর্তমান সরকার ঐ সমস্ত প্রকল্পকে পাশ কাটিয়ে ভারতীয় ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের আওতায় নতুন কয়েকটি রেলওয়ে প্রকল্প গ্রহন করেছে ভারতের করিডোর সুবিধায় রেলরুট ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়ার জন্য। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে – আমাদের গৃহীত রেল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করলেই জাতীয় উন্নয়নে তা ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।

নৌ-পরিবহন

আমাদের সময়ই প্রথম নৌ-পরিবহন সেক্টরে বিশেষ নজর দেয়া হয়। ঢাকার চারিদিকে বৃত্তাকার নদীপথ (ঈরৎপঁষধৎ ডধঃবৎধিুং) প্রকল্পটির আশুলিয়া-সদর ঘাট পর্যন্ত অংশটির কাজ আমাদের সময় সম্পন্ন হয় এবং আমি নিজে সেটি উদ্বোধন করেছিলাম। তুরাগ-বালুনদী-শীতলক্ষা অংশটুকুর কাজ শেষ হলেই বৃত্তাকার নদীপথ প্রকল্পটির কাজ শেষ হতো এবং জনগণ পুরোপুরি এর সুফল পেতো। আমি আশা করি সরকার তাড়াতাড়ি এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করবে।

সারাদেশে নাব্যতা হারিয়েছে এমন নদীগুলোর জরিপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য কোরিয়া ও স্পেনের সহায়তায় ড্রেজার সংগ্রহ প্রকল্পও গ্রহন করা হয়। প্রাকৃতিক দুযের্াগের সময় লঞ্চ ডুবি জনিত মানবিক সমস্যা সমাধানে উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহের জন্য কোরিয়ান সহায়তায় একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ঢাকা হতে কমলাপুর আইসিডি জয়দেবপুর স্থানান্তরের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। কিন্তু আমাদের সময় প্রকল্প গুলো বাস্তবায়ন করে আসা সম্ভব হয়নি।

আমি আশা করি সরকার এ সব প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে
উপকুলীয় অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এর প্রেক্ষিতে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা বলেছিলাম। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার পর্বত প্রমাণ ব্যর্থতার কথাও আমরা তুলে ধরেছিলাম। উল্লেখ্য, ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৪৬ কোটি টাকা খরচ করা হয় এবং বিদায়ী অর্থবছরেও একই রকম ‘পারদর্শিতার’ কথা নাই বা বললাম। আমরা বলেছিলাম, ভূমি পুনরূদ্ধার, লবনাক্ততার অনুপ্রবেশ রোধ এবং বেড়িবাঁধ সুদৃঢ়করণ প্রক্রিয়াগুলোকে সমন্বিত করে একটি এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা, অধিক লবনাক্ততা সহিষ্ণু ধানের বীজসহ অন্যান্য কৃষি ফসলের বীজ উদ্ভাবনে কৃষি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া, পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা, পরিবেশ বিপর্যয় রোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী, গবেষক ও মানব সম্পদ তৈরি করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নতুনতর কোর্স প্রবর্তনে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ দেয়া, উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধে পর্যাপ্ত বনায়ন সৃষ্টি করা ও তার রক্ষণাবেক্ষনে কার্যক্রম গ্রহণ করা, অংশীদারভিত্তিতে ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষী ও দুঃস্থ মহিলাদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক বনায়নের কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে দেশের অধিক পরিমান পতিত জমিতে বনায়ন সৃষ্টি করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুন্দরবনসহ সকল বনভূমি সুরক্ষিত ও উৎপাদনশীল রাখার স্বার্থে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা, উপকূলীয় ভূমি উদ্ধারের জন্য ক্রস ড্যাম নির্মাণের প্রয়াস নেয়া এবং ইছামতি ও গড়াই নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

পরিবেশ দূষণ ও বিপর্যয় সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম সুপেয় পানি ও চাষাবাদের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে ভূ-উপরিভাগের পানির ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করার কথা আমরা বলেছিলাম। খাল খনন, জলাধার নির্মাণ, সুপেয় পানির জন্য পানি পরিশোধন এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ছোট ও মাঝারি ধরণের প্রকল্প গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলাম। আমাদের প্রস্তাব ছিল, ঢাকার চারপাশের নদী ও ঢাকার মধ্যকার খালগুলো পুনরূদ্ধারের জন্য জরুরিভিত্তিতে এ্যাকশন প্ল্যান নেয়া, ঢাকার পানি সংকট নিরসনের জন্য মেঘনা ও যমুনা নদীকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করা এবং এর জন্য প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগিদের সাথে আলোচনা করা এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে তার বিকাশ ত্বরান্বিত করার জন্য হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী শিল্প সাভারে স্থানান্তর (যা নানা জটিলতার ফলে পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি) এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঊ.ঞ.চ. চষধহঃ স্থাপন করে ট্যানারী শিল্প স্থানান্তরের প্রকল্পটি অতিসত্বর বাজেটে অন্তভর্ুক্ত করা।

সরকারী খাস জমি, খাল-বিল ও বনভূমি সংরক্ষণ ও তার সর্বোত্তম ব্যবহার (ঈচজ)
সরকারী মালিকানায় জমি, খাল-বিল ও বনভূমির একটি বৃহৎ অংশ ভূমিদসু্যদের দখলে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এবং কোথাও আবার অভিন্ন সম্পদ জলাভূমি যথা খাল-বিল যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে, এ সকল সম্পদের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মৎস্য সম্পদের ক্ষতি ও প্রাণ বৈচিত্রের অনুকুল স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘি্নত হচ্ছে। এ কথা সত্য যে বৈশিষ্ট্যগতভাবে অভিন্ন সম্পদ অবলুপ্তির শিকার হয়। সে কারণে গোষ্ঠীগতভাবে ব্যবহারের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা, এ সম্পদ সংরক্ষণের ও সর্বোত্তম ব্যবহারের নীতি কৌশল গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা বলেছিলাম। আমরা এ সকল সম্পদ দখলমুক্ত করা এবং দেশের ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর, প্রান্তিক চাষী, দুস্থ মহিলাদের সমন্বয়ে সমবায় গঠন করে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ সকল সম্পদ সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা আমরা বলেছিলাম।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা
কৃষি, শিল্প, পানীয় জল, মৎস্য ও প্রাকৃতিক জলজ সম্পদ, পরিবেশ রক্ষা ও লবনাক্ততা দূরীকরণের জন্যে পানির ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে, ভূ-গর্ভস্থ ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবং সেচের জন্য কৃষিতে ভূ-গর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশংকাজনকভাবে নীচে নেমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আমরা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার কথা আমরা উল্লেখ করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম,
(ক) যে সকল স্থানে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব, সে সকল স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। উল্লেখ্য যে, আরও ২ মিলিয়ন হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব।

(খ) শীতকালে পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য নদ-নদী, খাল-বিলসমূহ খনন করে গভীরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যা প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

(গ) প্রয়োজনে ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির পরিপূরক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

(ঘ) পানির প্রাপ্যতাবৃদ্ধির প্রয়োজনে গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চীনের সমন্বয়ে অববাহিকাভিত্তিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।

(ঙ) বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পানীয় জলের সরবরাহ পরিপূরণ।

সাামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে সম্প্রসারিত করে দরিদ্র ও বিশেষ করে হত-দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মূল্যস্ফীতির নিরিখে এর মাথাপিছু পরিমান শতকরা ২০ ভাগ বৃদ্ধি করতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (ঝগঊ)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজের কৃষি ও শিল্পখাতের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রেক্ষাপটে এর উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রস্তাব ছিল –
ক) অবিলম্বে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারজাতকরণ, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

খ) বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ঋণদানের কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বীজ তহবিল দ্বিগুণ করা এবং পূণঃঅর্থায়ন কর্মসূচি আরও জোরদারকরণ।

গ) উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদ ঋণ প্রদানের শর্ত আরো শিথিল করা ও পরিশোধ করার সময়সীমা বৃদ্ধিকরণ।

ঘ) নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান।
ঙ) এই খাতের সুষম উন্নয়নের জন্য গবেষণা কার্যক্রম জোরদারকরণ।

উল্লেখ্য যে, এ খাত মূলতঃ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে। ফলে এর বিশাল পশ্চাৎ সংযোগ রয়েছে। এ কারণে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে আমদানি নির্ভরতা থেকে দেশকে রক্ষা করে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে এই খাত, বিশ্বমন্দার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বরং এই সংকটকালে দেশীয় চাহিদা মেটাতে এর জোর প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও নীতি সমর্থন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এই খাতকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসএমই খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারলে রাজধানী ঢাকাসহ প্রধান নগরগুলোতে যে চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে তার বিপরীতমুখী প্রবাহ সৃষ্টি করবে।

বার্ধক্য পেনশন এর জন্য আমরা একটি পেনশন ফান্ড গঠনের প্রস্তাব করেছিলাম এবং ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিলাম। সমগ্র কর্মজীবন জুড়ে সকল শ্রেনীর আয়কারীগণ যাদের পেনশন সুবিধা নেই তাদের আয়ের একটি ক্ষুদ্র্র অংশ স্বেচ্ছামূলক ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে এই পেনশন ফান্ডে জমা হবে। কর্মজীবনের শেষে তাদের জমাকৃত অর্থ এককালীন কিংবা কিস্তি আকারে মুনাফাসহ পরিশোধ করা হবে। পেনশন ফান্ডটি হতে পারে লাভজনক উন্নয়ন অবকাঠামো গড়ে তোলার একটি হাতিয়ার।

নগর পরিবহণ ব্যবস্থা
যানজট ঢাকার নাগরিক জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে এবং এর ফলে জ্বালানী ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াসহ নগর অর্থনীতির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে। যানজট নিরসনে গণপরিবহনের উপর আমরা গুরুত্ব আরোপ করেছিলাম। ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীতে বহুসংখ্যক দ্বিতল বাস চালু এবং ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথ এবং গণপরিবহণে নগরীর ব্যস্তস্থানসমূহে উড়াল সেতু এবং মাস ট্রানজিটের ব্যবস্থা চালু করার কথা বিবেচনা করতে হবে।

আইলা বিধ্বস্তদের পুনর্বাসন
এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে এখন পর্যন্ত সরকার আইলা বিধ্বস্ত এলাকার মানুষজণ যে মানবেতর জীবন-যাপন করছে তার কোনো সুরাহা করে নি। বিভিন্ন এলাকায় তারা লোনাপানিতে বন্দী হয়ে পড়েছে এবং পানীয় জলের অভাবে তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারছে না। আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, দুর্গত এলাকার মানুষকে পূণর্বাসন করাসহ উপকূলীয় বাঁধগুলো পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করণ, আসন্ন বাজেটে আইলা দুর্গত এলাকায় পানি নিষ্কাশন, জ্বলোচ্ছাস প্রতিরোধ বাঁধ এবং এলাকার কৃষি উন্নয়নের বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। এসব এলাকায় পুনর্বাসন কর্মসূচি রাজনীতিকরণের ফলে ব্যর্থ হয়েছে। এই সব বাধা দ্রুত অপসারণের জন্য দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

যুব ও মহিলা উন্নয়ন
বেকারত্ব ও সুশিক্ষার অভাবে যুব সমাজের একাংশ চরম হতাশায় ভুগছে। জাতীয় উন্নয়নে যুবসমাজের প্রাণশক্তিকে ব্যবহারের জন্য বাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যুব উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রস্তাব ছিল নিম্মরূপঃ
ক। বিদ্যমান সরকারী ও বেসরকারী যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে। এইসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেশ ও বিদেশের চাহিদা বিবেচনায় রেখে কারিগরি কলাকৌশল শিক্ষাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশী ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করছি।

খ। যুব মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যুবক-যুবতীদের সংগঠিত করে বিভিন্ন সমাজহিতকর কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব করছি যারা স্থানীয়ভাবে এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে।

গ। মাদকসেবন ও সকল প্রকার বখাটেপনা থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করার জন্য কমিউনিটি কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করছি। এসব কাউন্সেলিং এ শিক্ষাবিদ, সামাজিক নেতা ও ধমর্ীয় নেতাদের সামিল করতে হবে।

ঘ। যুব সমাজের নৈতিকতার মান উন্নয়নের জন্য পারিবারিক বন্ধন ও ধমর্ীয় মূল্যবোধ দৃঢ়করণের জন্য উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

ঙ। আত্মকর্মসংস্থানের জন্য যুবকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করতে হবে।

নারী উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রস্তাব ছিল নিম্নরূপ
ক। গরীব ও দুঃস্থ নারীদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ।
খ। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীদের জন্য বিশেষ কোটা প্রবর্তন।
গ। শ্রমজীবী নারীদের জন্য বিশেষ বাস-সার্ভিস প্রবর্তন।
ঘ। মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহে আউটডোর চিকিৎসা ও গাইনি ওয়ার্ড চালু করা।
ঙ। যেসব দরিদ্র নারী এক সন্তানের অধিক সন্তান নেবে না, তাদেরকে মাসিক ৫০০/- টাকা হারে ৫ বছরের জন্য ভাতা প্রদান।

পুলিশ ও আইন-শৃংখলা
একটি সৎ ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী ব্যতিরেকে দেশে আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং আইন-শৃংখলার উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে এবং জননিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। আমাদের দেশে পুলিশ ও জনসংখ্যার অনুপাত অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। এই অনুপাত বৃদ্ধির জন্য পুলিশ বাহিনীতে কন্সস্টেবল থেকে কর্মকর্তা পর্যায়ে নিয়োগবৃদ্ধির জন্য এই বাজেটে সুযোগ রাখতে হবে ।

সকল স্তরের পুলিশ কর্মচারী ও কর্মকর্তার মান-সম্মত প্রশিক্ষণের জন্য পুলিশ ট্রেনিং একাডেমী ও পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারসমূহকে উন্নত করতে হবে। পুলিশকে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। পুলিশের রেশনের মান ও পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে। পুলিশকে আধুনিক যান-বাহন, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অস্ত্র-শস্ত্রে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। পুলিশ বাহিনীর উপর অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

সামরিক বাহিনী
বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অখন্ডতা রক্ষার জন্য একটি কার্যকর শক্র-প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে সম্প্রসারিত ও উন্নত করতে হবে। সামরিক বাহিনীর প্রতিটি শাখার জন্য আধুনিক সমর-সম্ভারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিডিআর বিদ্রোহের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুরণের জন্য বর্ধিত হারে সেনা-অফিসার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সেনা অফিসারদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপোষ দেশ-প্রেমিক যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সামরিক বাহিনীর ক্ষতিসাধনকারী তৎপরতা রোধে গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে যোগ্য, দক্ষ ও কর্মতৎপর করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার গুরুত্ব অনুধাবন করে নৌ-বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ত্রিমাত্রিক নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সামরিক বাহিনীর জন্য যথাযথ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। এই বরাদ্দ ব্যয়ে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিডিআর
ক্ষিপ্রতা ও দ্রুততার সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহ দমনে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা জাতীয় ইতিহাসের এক কলংকজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিদ্রোহের ফলে বিডিআর বাহিনী প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা বলে আর কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। বিডিআর বাহিনীর দ্রুত পূনর্গঠন, চোরাচালান রোধ, মাদক আমদানি রোধ এবং সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের বেআইনি ও বেপরোয়া তৎপরতা রোধ আজ সময়ের দাবী। আমরা চাই, সেনা অফিসারদের দ্বারা যথাযথ ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই বাহিনীকে দ্রুত পূণর্গঠন করা হোক এবং এর জন্য বাজেটে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রয়োজনের নিরিখে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দেয়া হোক। বিডিআরকে আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র এবং যোগাযোগ সরঞ্জামে সুসজ্জিত করা হোক। সীমান্ত ফাঁড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও মজবুত করা হোক।
বর্তমান বাজেট সম্পর্কে আমাদের কিছু প্রস্তাবনা

কৃষিতে উলম্ব (ঠবৎঃরপধষ) সমবায় ব্যবস্থা গঠন
বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। বিআরডিবি সমবায় প্রথার মাধ্যমে সেচ সুবিধা সৃষ্টি করে কৃষিতে উফশী জাতের শষ্যের আবাদ বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বাজারজাতকরণের উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কৃষক উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির অবসান সম্ভব যদি কৃষক বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তর সমবায়ের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এই ব্যবস্থায় কৃষক খাড়াখাড়িভাবে বিন্যস্ত বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তর, যথাক্রমে সংগ্রহ, গুণগত শ্রেণীবিভাজন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত সরাসরি ক্রেতার মুখোমুখি হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন হবে যাতে মূল্য শৃঙ্খলের (ঠধষঁব ঈযধরহ) প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষক সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এই রকম সমবায়ই উলম্ব সমবায়। এই প্রকল্প কার্যকর করার জন্য বিআরডিবি-কে শক্তিশালী করতে হবে। বিআরডিবি যাতে এই ধরণের উদ্যোগের সূচনা করতে পারে সেই লক্ষ্যে পাঁচশত কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

আইলা দুর্যোগ কবলিতদের পুনর্বাসন
২৫ মে ২০০৯ ঘূর্নিঝড় আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে মারাত্মক আঘাত হানে। এই দুর্যোগের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় খুলনা বিভাগের কয়রা, শ্যামনগর, ও দাকোপ উপজেলা। উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে এই সব উপজেলার বিপুল এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়। এই জলাবদ্ধতা সামুদ্রিক লোনা পানির জলাবদ্ধতা। সাইক্লোন আইলার ফলে প্রাণহানি, বাসস্থান, গবাদি পশু ও ফসলের জমি দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুই বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, নোনা পানি অপসারণ, বৃক্ষ, গবাদি পশুসহ বিলুপ্ত প্রায় প্রাণ বৈচিত্র পূনরুদ্ধারে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয় নাই। সরকারের এই অমানবিক আচরণ ও ঔদাসীন্যের নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নেই। আইলা বিধ্বস্ত এলাকায় পূর্ণাঙ্গ পূনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণ যাতে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে যেতে পারে তার জন্য বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণে একশত পঞ্চাশ (১৫০) কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। গত বছরের বাজেট প্রস্তাবনাতেও আমি আইলা বিধ্বস্তদের পূনর্বাসনের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় আইলা বিধ্বস্ত এলাকার জনগণ মানবেতর জীবন যাপন করলেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকায় ভূমি উদ্ধার
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বিশাল এলাকা সমুদ্র গর্ভে তলিয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠি তাদের জীবন জীবিকা হারিয়ে পরিবেশ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এই জনগোষ্ঠিকে রক্ষা করার জন্য যে সব পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করা হচ্ছে সেগুলো মূলত অফধঢ়ঃধঃরড়হ ও সরঃরমধঃরড়হ ঢ়ৎড়পবংং এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সব পদক্ষেপের মূল কথা হল জনগণকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা। পানি বিজ্ঞানীরা মনে করেন উপকূলীয় অঞ্চলে ঈৎড়ংং উধস নির্মাণ করে নদীবাহিত পলি সঞ্চয়ণ নিয়ন্ত্রণ করে সমুদ্রগর্ভ থেকে বিপুল ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব। এর ফলে আবাদী জমির পরিমান বৃদ্ধি পাবে এবং সমুদ্রের স্ফীত জলরাশির চাপও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচু্যত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। আমরা এই ধরণের একটি প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

অনানুষ্ঠানিক খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাত (ওহভড়ৎসধষ ঝবপঃড়ৎ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। জাতীয় আয় নির্ধারণে এদের অবদান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত কর্মজীবীর সংখ্যা মোট কর্মজীবীর ৭০ শতাংশ। বিচিত্র ধরণের বৃত্তি ও পেশায় যেমনঃ হকার, ফেরিওয়ালা, রিঙ্া চালক, ভ্যানগাড়ী চালক, যানবাহনের হেলপার, কুলি-মজুর, রিঙ্া-ভ্যানগাড়ী ও যন্ত্রচালিত শকটের মিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিক, পৌরবর্জ্য সংগ্রাহক, জুতো সেলাইকারী, প্লাম্বার, নরসুন্দর, গৃহ পরিচারিকা ও গৃহভৃত্য, বাবুর্চি, বাগানের মালীসহ টোকাই শ্রেণীতে অন্তভর্ুক্ত বালক বালিকা ও কিশোর কিশোরী প্রভৃতি অসংখ্য কর্মকাণ্ডে এরা নিয়োজিত। এদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা এবং কায়িক শ্রমের কষ্ট লাঘবের জন্য একটি সৃজনধর্মর্ী প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করছি। এই প্রকল্প সফল হলে বিদেশে যারা কাজের জন্য যায় তাদের একটি বড় অংশের দক্ষতা বৃদ্ধি হবে এবং বর্ধিত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এরকম একটি গণমুখী প্রকল্প নিম্ন আয়ের পেশার মানুষদের আয় বর্ধন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রবাসে কর্মসংস্থানে সহায়তা
প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভূতভাবে সমৃদ্ধ করছে। যেসব অদক্ষ গরীব শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যায় তাদেরকে এক শ্রেণীর শ্রমিক রপ্তানীকারক সংস্থা ও দালালদের হাতে পড়ে বিদেশ যাওয়ার অর্থ সংগ্রহের জন্য জমি-জমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হয়। ব্যয়িত এই অর্থ বিদেশে কাজের মাধ্যমে তুলে আনাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গমনকারী শ্রমিকদের কষ্ট লাঘবের জন্য আমরা বিনা সুদে “বিদেশে কর্মসংস্থান ঋণ” দেওয়ার প্রস্তাব করছি। এই ঋণের পরিমান নির্ধারিত হবে কর্মসংস্থানের জন্য গমনকৃত দেশটির ভৌগলিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। আশা করা যায় এইসব কর্মজীবী মানুষ তাদের আয় থেকেই এই ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হবে। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশগমনকারী শ্রমিকরা যাতে কোনো প্রকার ধোঁকাবাজি ও প্রবঞ্চনার শিকার না হয় তার জন্য ঋণ ব্যবস্থাটিকে সুষ্ঠুভাবে বিন্যস্ত করা হবে।

সঞ্চয় পত্র
২০১০/১১ বাজেটে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশন সঞ্চয়পত্র বাদে অন্যান্য সব ধরণের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর শতকরা ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের এবং সুদ হ্রাসের ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র থেকে বিনিেেয়াগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থ বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) নীট বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশ। গত নয় মাসে সঞ্চয় পত্রে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিলো আট হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর ফলে সঞ্চয় পত্রের বিপরীতে সরকারের ঋণ করার সুযোগ তীব্রভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তি খাতে ঋণ গ্রহণের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে ঋণ নিলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। চলতি অর্থ বছরে সঞ্চয় পত্রের মুনাফার উপর উৎসে কর কর্তনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি প্রমাণিত হয়েছে। আমরা তাই প্রস্তাব করছি সকল প্রকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর উৎসে করকর্তন রহিত করা হউক। পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রাকে কিছুটা মসৃণ করার জন্য মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং অন্যান্য সঞ্চয়পত্রের সুদ যৌত্তিকভাবে ধার্য করার প্রস্তাব করছি।

আয়করের নিম্মতম সীমা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্বের উৎস হিসাবে আয়করের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে, কারণ বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে আমদানি শুল্কের গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে। আয়কর একটি প্রত্যক্ষ কর এবং এই করটির করপাতন (রহপরফবহপব) ও করের বোঝা একই ব্যক্তি বহন করে। সমাজে আয়বণ্টনে সুসাম্য প্রতিষ্ঠায় এই কর বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চলতি অর্থ বছরে কর আয়করমুক্ত আয়ের সীমা ছিল বার্ষিক ১,৬৫,০০০/- টাকা, কিন্তু ব্যাপক মুল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে এই সীমা পরিবর্তন করে উধর্্বমুখী করা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার করের হার বেশি হলেই বেশি কর আদায় হয় না। মূল্যস্ফীতি ও বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের নিরিখে করমুক্ত আয়ের সীমা বার্ষিক ৩০০,০০০/- টাকা নির্ধারণ করা সমীচীন বলে আমরা মনে করছি। এর ফলে আয়কর পরিশোধে আয়ের স্তরের নিম্মতম পর্যায়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে। আমরা আরো মনে করি আয়করের বিভিন্ন স্লাবে করের হারে কিছুটা নিম্নমুখী সংশোধন আয়কর পরিশোধে উৎসাহ বৃদ্ধি করে আয়করের সামগ্রিক পরিমানও বৃদ্ধি করবে। ফলে আয় বৈষম্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মানুষের কর্মস্পৃহাও উৎসাহিত হবে।

মূল্যসংযোজন কর
মূল্যসংযোজন কর বাংলাদেশের করব্যবস্থায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। ১৯৯২ সালে মূল্যসংযোজন কর বিএনপি সরকার প্রবর্তন করে। সেই সময় এই কর প্রবর্তনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপি সরকারকে প্রবল প্রতিরোধ ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অথচ জাতীয় উন্নয়নের জন্য দেশীয় সম্পদ সমাবেশে / সংগ্রহে এর কোন বিকল্প ছিল না। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংগে সংগে ভ্যাট আদায়ের নীট পরিমানও বৃদ্ধি পায়। বর্তমান মূল্যসংযোজন করের নানাবিধ অস্পষ্টতা, এই করের মূল চেতনার সংগে আদায়ের দ্বন্দ্ব, অস্বচ্ছতা, এবং এই কর আদায়ে দুর্নীতি আছে বলে অনেকের ধারণা। আমরা ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যসংযোজন কর সংগ্রহ সহজিকরণ, বিজ্ঞানসম্মতকরণ, যৌক্তিকিকরণ ও নিশ্চিতকরণের প্রস্তাব রাখছি। বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িদের কাছ থেকে থোক হিসাবে ভ্যাট আদায়ের পরিমান শতকরা ২৫ ভাগ কমানো এবং এরই সংগে জনজীবনে দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যে পরবর্তী অর্থবছরে ভ্যাটের আওতা আর সম্প্রসারণ না করারও প্রস্তাব করছি। অধিকন্তু আমরা ডাক্তারের ফি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, বাড়ি ভাড়া/স্থাপনা ও যাত্রী ভাড়ার উপর মূল্যসংযোজন কর প্রত্যাহারের দাবী করছি।

বয়স্ক নিবাস নির্মাণ (ঙষফ ঐড়সবং)
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। বয়স্ক লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পরমায়ু। ফলে, সমাজে বেঁচে থাকা বয়স্ক লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক পরিবর্তনের ফলে একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থাও বিলুপ্ত হবার পথে। অনেক পিতা-মাতার সন্তান রুজি-রোজগারের প্রয়োজনে পিতা-মাতার আবাসস্থল থেকে অনেক দূরে এমনকি দেশের বাইরেও অবস্থান করছে। এর ফলে বয়োবৃদ্ধ লোকদের দেখভাল করা কিংবা সেবাযত্ন করার জন্য আপন কোন লোক কাছে থাকছে না। এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও কল্যাণের কথা চিন্তা করে আমরা প্রতি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে একশ শয্যা বিশিষ্ট একটি করে বয়স্ক নিবাস নির্মাণের প্রস্তাব করছি।

ডে-কেয়ার সেন্টার
বাংলাদেশে নারীদের গৃহস্থালির বাইরে কর্মসংস্থান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কিন্তু, এদের অনেকেরই শিশু সন্তান আছে। তাদের দেখভালের ব্যাপারে এরা যদি কর্মস্থলে যাবার সময় তাদের নিরাপদ কোন আশ্রয়স্থলে রেখে যেতে পারে তাহলে এদের দুঃশ্চিন্তা লাঘব হতো। বর্তমানে কিছু সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার আছে। প্রয়োজনের তুলনায় এটি খুবই অপ্রতুল। আমরা মনে করি নারী কর্মীর সংখ্যা বিবেচনা করে সারাদেশের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। এর ফলে নারীর ক্ষমতায়ন জোরদার হবে। নারীদের পক্ষে গৃহস্থালির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণে সহায়ক হবে।

বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় অবকাঠামোগত স্বল্পতা সর্বজনবিদিত। প্রবৃদ্ধির চাকাকে সচল রাখতে হলে এবং আগামী দিনে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বৃহৎ অবকাঠামো গঠনের কোন বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে, এখন থেকেই সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প প্রণয়ন ও সম্পদ সংগ্রহের কাজে হাত দিতে হবে। আমরা যে সব প্রকল্পের কথা ভাবছি তার মধ্যে রয়েছে, রাজধানী ঢাকার সংগে সকল বিভাগীয় শহরের হাইস্পীড (ঘন্টায় ২৫০ কিঃমিঃ – ৩০০ কিঃমিঃ গতিসম্পন্ন) ট্রেন চালু করা, ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে ছয় লেন সড়ক নির্মাণ, ২য় পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং রেল যোগাযোগসহ দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মান। উল্লেখ্য যে, ২০০১-২০০৬ পর্বে ক্ষমতায় থাকাকালে আমরা পাটুরিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু
বিদ্যমান যমুনা সেতু পরিবহনের প্রবল চাপের মধ্যে আছে। এই সেতুতে রেল চলাচলের যে ব্যবস্থা আছে তাতে ট্রেন খুব ধীর গতিতে চলে। তবে, এরকম আরো একটি সেতু যে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার বিচারে অত্যন্ত কার্যকর তা বিদ্যমান যমুনা সেতু প্রমাণ করেছে। আমরা রেল যোগাযোগসহ দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছি।

বস্ত্রশিল্প
বাংলাদেশী স্পিনিং মিলগুলো এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। হাজার হাজার টন সূতা অবিক্রিত অবস্থায় মিলগুলোর গোডাউনে পড়ে আছে। যারা স্পিনিং মিলগুলো থেকে সূতা কিনে রপ্তানির কাজে ব্যবহার করে তারা ইতোমধ্যে ভারত থেকে কম মূল্যে সূতা আমদানি করে গুদামজাত করছে। ভারত বস্ত্র ও স্পিনিং সেক্টরে বিশেষ সুবিধা দিয়ে চলেছে। ফলে, বাংলাদেশী স্পিনিং মিলগুলো ভারতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। দেশীয় স্পিনাররা উৎপাদন খরচের চাইতেও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমাদের দেশের স্পিনিং, উইভিং, ড্রায়িং ও ফিনিশিং খাতের অধিকাংশ শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে দেশের ৩৪১টি স্পিনিং মিলের মধ্যে ৩৪টিই বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মিলগুলো ৩০% থেকে ৩৫% উৎপাদন হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে। এই খাতে বিনিয়োগের পরিমান ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক এই খাতে নিয়োজিত। অবিক্রিত পণ্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সংকট অব্যাহত থাকলে মিল উদ্যোক্তারা ঋণ খেলাপী হয়ে যাবে এবং শ্রমিকরা হয়ে পড়বে বেকার। মিলগুলোকে ঋণদানকারী ব্যাংকগুলোও সংকটে পড়বে।

বেশ কিছুদিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে প্রদত্ত এঝচ সুবিধার জন্য জঁষবং ড়ভ ড়ৎরমরহ একধাপে নামিয়ে আনে। ফলে, ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে কাপড় আমদানি হচ্ছে এবং এই কাপড় দিয়ে পোশাক রপ্তানিকারকরা পোশাক তৈরি করে ইউরোপে রপ্তানি করছে। এই সুযোগ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক হলেও স্পিনিং ও টেঙ্টাইল সেক্টর সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। জাতীয় স্বার্থে স্পিনিং ও টেঙ্টাইল সেক্টর এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের স্বার্থ সমন্বয় করে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত করতে হবে। এই লক্ষ্যে আমাদের প্রস্তাব হলো ঃ

ক) ভারত স্পিনিং ও বস্ত্রখাতে ডাম্পিং করছে কিনা তা পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বিষয়টি যথাযথ আন্তর্জাতিক সংস্থায় উত্থাপনের পরামর্শ দিচ্ছি।
খ) বস্ত্রখাতে নগদ সহায়তা ৫% এর পরিবর্তে ৮% করতে হবে।
গ) টেঙ্টাইল জবযধনরষরঃধঃরড়হ ফান্ড গঠন করতে হবে।
ঘ) টেঙ্টাইল ও স্পিনিং সেক্টরের জন্য সুদের হার কমাতে হবে।
ঙ) তাঁত শিল্পের জন্য ১৫ শতাংশ ঈধংয ওহপবহঃরাব প্রদান করতে হবে।

সংকট ঘনীভূত হচ্ছে
চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা নৈরাশ্য ছাড়া কোনো আশার আলো দেখায় না। সরকারি মহল দাবী করছে চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি নয়। দেশীয় একটি থিংকট্যাঙ্ক ও বিশ্বব্যাংকও প্রায় একই ধরণের প্রাক্কলন করেছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসাব বার বার সংশোধন, তথ্যের অসামঞ্জস্যতা ও হিসাব প্রক্রিয়ার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রবৃদ্ধির হারেরও রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখাতে গিয়ে ওঈঙজ (ওহপৎবসবহঃধষ ঈধঢ়রঃধষ/ঙঁঃঢ়ঁঃ জধঃরড়) যেভাবে কমাতে হয়েছে তার সংগে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবহার দক্ষতার সামঞ্জস্য নেই। আমাদের প্রশ্ন হলো যে প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে তার গুণগত মান কী। এই প্রবৃদ্ধির মূলতঃ ভোগ-ব্যয় চালিত, বিনিয়োগ ব্যয় চালিত নয়। দেশে গ্যাস, বিদু্যৎ ও জ্বালানী সংকটের ফলে এবং প্রশাসনের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে বিনিয়োগের পরিবেশ দারুনভাবে বিঘি্নত। নতুন বিদু্যৎ ও গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে রিয়েল এষ্টেট সেক্টরের মত খাতও দারুন সংকটে নিপতিত। কলকারখানার উৎপাদন কমে গেছে, শিল্প উৎপাদন সরকারি হিসাব মতেই ৬ শতাংশের নিচে। এই সব বিবেচনায় প্রবৃদ্ধির যে হার দাবি করা হচ্ছে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধিও টেকসই হবে না। সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধিতো দূরের কথা, সরকার যে প্রবৃদ্ধির হার দাবি করছে সেটাও পরিসংখ্যানে কারচুপির ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর কর্মকর্তাদের প্রতি জনৈক মন্ত্রীর রক্তচক্ষু প্রদর্শন সর্বজনবিদিত।

আমি আগেই বলেছি যে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে পড়েছে । গরীব জনসাধারণের ব্যয়ে ঝাঁপিতে খাদ্য পণ্যের হিস্সা ৬০ শতাংশ। সহজেই অনুমেয় গরীব মানুষ কি দুর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। মধ্যবিত্তরা খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের পরিমান হ্রাস করতে বাধ্য হচ্ছে। মরার উপর খড়ার ঘা এর মত যোগ হয়েছে পরিবহন ও জ্বালানী ব্যয়। ঔষধের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসা খরচও বেড়ে গেছে। জনগণের বিপুল অংশের নীট আয় হ্রাস পেয়েছে আশংকাজনক হারে। যদিও রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪১ শতাংশ, একই সাথে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৫১ শতাংশ। বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থেও (রেমিটেন্স) নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি হিসাবে জুন মাসের শেষে ঘাটতি দেখা দেবে, লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি দেখা দেবে।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হতাশাব্যাঞ্জক। সরকারি বিনিয়োগ কমে আসায় সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরকারের ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বেতন ভাতা ও সরকারের দেশী-বিদেশী ঋণের উপর সুদ প্রদান করেই রাজস্ব আয়ের বড় অংশ চলে যায়। অধিকন্তু বিদু্যৎ ও জ্বালানী খাতের উপর ক্রমবর্ধমান ভতর্ুকির চাপ বেড়ে গেলে রাষ্ট্র ভয়াবহ রাজস্ব আয়ের সংকটে পড়বে। ফলে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মোকাবিলা করতে হবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। বেসরকারী খাত ঋণ-দুর্ভিক্ষে নিক্ষিপ্ত হবে, সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হবে।

সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবী করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা হচ্ছে বিশালভাবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রশ্নে সরকারের দু’জন মন্ত্রীকে ভিন্নমত পোষন করতে দেখা গেছে। তাহলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হলো কি করে?

সারা বিশ্বে যেখানে মার্কিন ডলারের মূল্যমান কমছে, সেখানে বাংলাদেশে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যমান বাড়ছে। শেয়ারবাজারের বিপর্যয় থেকে ফায়দা লুটকারীগোষ্ঠী কতর্ৃক ডলার পাচার, ওভার ইনভয়েসিং – আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে ডলার পাচার মূলতঃ ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমার অন্যতম কারণ।

বর্তমান অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় প্রত্যেকটি সূচক নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলতঃ ভোগ তাড়িত হওয়ায় ভঙ্গুরতায় ভুগছে। মূল্যস্তর, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, বাজেট ঘাটতি, শিল্পোৎপাদন, বিদেশী মুদ্রার সংগে টাকার বিনিময় হার, বিদেশী মুদ্রার মজুত এবং কর্মসংস্থান সবই নেতিবাচক। বিগত দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ এবারই সবচাইতে সংকটজনক অবস্থায় পড়েছে।

কী রকম বাংলাদেশ দেখতে চাই

সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা তরুণ গণযোদ্ধা ও সৈনিকেরা দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপর তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। অগণিত মানুষের রক্ত, অশ্রু, শ্রমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন জাতির কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই স্বৈরব্যবস্থার ভস্মস্তূপ থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ করেছিলেন। তবে ১৯৮২ এবং ২০০৭ সালে এই গণতন্ত্র ব্যাহত করে স্বৈরশাসন প্রবর্তিত হয়েছিল। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদেরকে সংগ্রামের পথে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে হয়েছে।

শহীদ জিয়ার লক্ষ্যই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নির্যাস-সঞ্জাত। সেটা হচ্ছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে সমৃদ্ধি অর্জন।

আমাদের ভবিষ্যত স্বপ্ন ও লক্ষ্য হচ্ছে, পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষুধা, অপুষ্টি, অশিক্ষা, সামাজিক অবিচার, মানবাধিকার লঙঘন এবং শোষণ, বঞ্চনা ও কোনো ধরণের বৈষম্য থাকবে না। আমরা আগামী দশকের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব সভায় সম্মান ও মর্যাদার আসনে আসীন দেখতে চাই। সেই লক্ষ্য ও স্বপ্ন বাস্তবায়নকল্পেঃ

ঙ্ বিশ্বাসযোগ্য এবং পক্ষপাতহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা
ঙ্ কার্যকর এবং জবাবদিহিতামূলক সংসদের নিশ্চয়তা
ঙ্ একটি স্বাধীন, দক্ষ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিবর্জিত এবং দুনর্ীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা
ঙ্ মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং আইনের শাসনের নিশ্চয়তা
ঙ্ দক্ষ, দুনর্ীতিমুক্ত এবং দল-নিরপেক্ষ গণ এবং পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা

প্রশাসনিক

আমরা একটি দক্ষ, গতিশীল, যুগ-উপযোগী ও গণমুখি প্রশাসন গড়ে তুলতে চাই।

সেই লক্ষ্যে ঃ

ঙ্ স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক নীতিনির্ধারনী প্রক্রিয়া চালু করা
ঙ্ স্বচ্ছ এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা
ঙ্ সকল পর্যায়ে ব-মড়াবৎহধহপব চালু।
ঙ্ স্বাধীন দুনর্ীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা

আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও নীতি কাঠামো গড়ে তুলতে চাই যার মাধ্যমে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার পথে এগিয়ে যাবে।

সেই লক্ষ্যে ঃ

ঙ্ কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বহুমুখীকরণ
ঙ্ শিল্পখাতে অধিকতর প্রবৃদ্ধি অর্জন
ঙ্ সেবা খাতকে দরিদ্র মানুষের নিছক টিকে থাকার আশ্রয়স্থল থেকে সর্বাত্মক সমৃদ্ধির বাহনে রূপান্তরিত করা
ঙ্ রপ্তানী খাতের বহুমুখীকরণ
ঙ্ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের চাহিদার নিরিখে বিশ্বায়নের বাস্তবতার সংগে সঙ্গতি রেখে দেশীয় বাজারমুখী শিল্পায়ন

বৈদেশিক শ্রমবাজার

আমরা এমন একটি মানব সম্পদ উন্নয়ন নীতি চাই যার মাধ্যমে সম্ভব হবে ঃ

ঙ্ বিদেশে রপ্তানিযোগ্য শ্রমিকদের দক্ষ শ্রমিকরূপে গড়ে তোলা।
ঙ্ বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ নার্সদের বিরাট চাহিদার সুযোগ গ্রহণের জন্য দেশে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে উচ্চ মানের নার্সিং ইনস্টিটিটিউট গড়ে তোলা।
ঙ্ এক কথায় বিদেশে প্রেরণযোগ্য শ্রমশক্তির কারিগরি ও প্রযুক্তিগত মান উন্নয়ন।

স্বাস্থ্যবান জাতি
আমরা একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনকল্পে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করতে চাই।

যার লক্ষ্যে হবে ঃ
ঙ্ আগামী দশকের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য প্রণোদনা ও বস্তুগত সহায়তা প্রদান।
ঙ্ গরিব ও বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে নাগরিকদের জন্য নিবারণ ও নিরাময়মূলক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, আওতা ও পরিধি এবং মান উন্নত করা।
ঙ্ শিশু ও মাতৃ মৃতু্যর হার আরও নামিয়ে আনতে এবং তাদেরকে অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে শিশু ও মাতৃসেবার উন্নয়ন।

— ০ —-

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য নেয়া হবে না।