মমতা দ্য ফাটাকেষ্ট

ফাটাকেষ্ট খবর পড়ে না, খবর দেখে না, খবর তৈরী করে। গুন্ডা ফাটাকেষ্ট মিনিস্টার হয়ে রাতারাতি পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ভাঙ্গা  মেরুদন্ড সোজা করে দেন, অফিস আদালত থেকে দূর্ণীতি ঝেটিয়ে বিদেয় করেন, সন্ত্রাসের মুখে ঝামা ঘষে রাস্তাঘাট, পাড়া মহল্লা,  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তীর্থস্থান সবখানে শান্তি ফিরিয়ে আনেন । যেখানে অসঙ্গতি, সেখানেই ফাটাকেষ্টর সরব উপস্থিতি; কখনো বা অগ্নিমূর্তি হয়ে, কখনো বা ছদ্মবেশে। আর যতসব অনিয়ম অসঙ্গতি অন্যায় দেখেন, মারেন সেখানে, লাশ পড়ে শশ্বানে। তবে এ সবকিছুই সম্ভব হয় চলচ্চিত্রে, বাস্তবে সবকিছুই ফিঁকে, ফাটাকেষ্টোরা থেকে যায় শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের স্বপ্নের জগতে। কিন্তু হঠাৎ করে কেউ যদি ফাটাকেষ্টোর মতোই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়, আর দশজন রাজনীতিকের মতো শানশওকতের সাথে না চলে সাধারণ মানুষের কাতারে দাড়ায়, সাধারণ মানুষের মতো ঘুরে বেড়ায়, তখন মানুষের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। আর তেমনই এক বিস্ময়ের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মূখ্যমন্ত্রী। মমতা দ্য ফাটাকেষ্ট।

মা, মাটি আর মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন, তাইতো প্রতিমুহুর্তে তার ছুটে চলা জনতার কাছে। মিশে যান জনতার ভীড়ে, জানতে চান তাদের সুখ দুঃখের কথা, অভাব অভিযোগের কথা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা। তিনি জানেন, দুঃখ কষ্ট লাঘবে আগে কষ্টকে ছুঁয়ে দেখা চাই। তাইতো তিনি সাদাসিধে পোষাক আর চপ্পল চেপে পায়ে ফোস্কা ফেলে ফেলে চলতে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন সাধারণ ট্যাপ খাওয়া সান্ট্রো গাড়ীতে চেপে মহাকরণে যেতে, ভালোবাসেন সাধারণ মানুষের মতো রেড সিগনালে থামতে, গ্রীন সিগনালে চলতে, ভালোবাসেন সাধারণ মানুষের মতো প্রোটোকলবিহীন স্বাধীন জীবন যাপন করতে। কিছুদিন আগের মূখ্যমন্ত্রীদের জন্য যে রাস্তাচলাচলে দশ মিনিট করে রাস্তা ফাকা রাখার বিধান ছিল সাধারণ মানুষ আজ তার সবকিছু দেখছে নতুন আলোয়।

জনগণ প্রত্যাবর্তনের বদলে পরিবর্তনকে চেয়েছে আর তাই মমতা পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি জানেন নিজে না বদলালে বদলাবে না কিছুই। তাই তিনি অতীতের নিয়ম কানুনের পরোয়া না করে মূখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন সাধারণের বেশে। কোলকাতাকে তিনি লন্ডনের আদলে গড়তে চান, তাই সাধারণ গাড়ীতে করেই ঘুরে ঘুরে দেখেছেন পুরো শহরটাকে, নতুন করে সাজাতে শহরটাকে ভালো করে দেখা চাই আগে । সাধারণ মানুষের সমস্যা জানতে বাগদাদের কিংবদন্তীর বাদশা হারুনুর রশীদের মতোই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। না, ছদ্মবেশে নয়, প্রকাশ্যেই। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়মশৃংখল পাল্টে দিয়েছেন তিনি। তিনি জানেন, দূর্ণীতি আর সন্ত্রাসের ময়লার ভাগাড় পরিস্কারে চাই টর্নেডোর গতি। তাই তিনি দিন রাত অক্লান্তভাবে ছুটে চলেছেন। তার ঝটিকা অভিযানে পুরো রাজ্য হয়ে উঠেছে কর্মচঞ্চল । যার যেখানে যতটুকু খুঁত আছে তা নিখাদ করতে গলদঘর্ম হচ্ছেন সবাই।

তিনি জানেন, মানুষের পেটে অন্ন নেই। তাইতো তিনি এবার জঙ্গলমহলে আদিবাসীদের পাশাপাশি সকল নাগরিকের জন্যই ২ টাকা কেজি দরে চালের বন্দোবস্তো করেছেন, যেখানে পার্শ্ববর্তী এই বাংলাদেশে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা ১০ টাকা পোয়া মোটাচাল খাওয়াচ্ছেন। মমতা জানেন, মানুষ সবচেয়ে কষ্টে আছে হাসপাতালে, তাদের চাই যথোপযুক্ত চিকিৎসা, চাই মমতা। তাই ছুটে যান একের পর এক হাসপাতালে। সকল অব্যবস্থাপনা, অভাব, অভিযোগ নোট করেন, পুরো দৃশ্যপট পাল্টে দেয়ার ছক কষেণ। তার অমন দস্যিপনায় ইতোমধ্যেই বাঙুর ইনিস্টটিউট অফ নিউরোলজির অধিকর্তা শ্যামাপদ গড়াই চাকরিচ্যুত হয়েছেন, গোটা রাজ্যের অধিকর্তাদের ঘুমও হারাম করে নিয়েছেন তিনি। আর এসব তিনি কেন করছেন? কারণ তিনি সাধারণ মানুষের রাজনীতি করেন, সাধারণ মানুষের সাথেই আন্দোলন করেন, সাধারণ মানুষেরই তিনি একজন। অথচ পার্শ্ববর্তী এই বাংলাদেশের দিকে তাকালে শুধুই হতাশা গ্রাস করে।

মমতা সাধারণ মানুষের রাজনীতি করে করে, পায়ে ফোস্কা ফেলে ছুটতে ছুটতে, নেতাদের কলার চেপে ছুড়ে ফেলে সাধারণ মানুষের দাবী আদায় করে হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষেরই আপনজন। না, তিনি পৈতৃকসূত্রে মূখ্যমন্ত্রী হননি, যেমনটা আমাদের শেখ হাসিনা পেয়েছেন। তিনি স্বামীর সূত্রে প্রধানমন্ত্রী হননি, যেমনটা হয়েছেন খালেদা জিয়া। আর হবেনই বা কি করে, আজো যে স্বামীর মুখটি দেখার মতো অবসর পাননি মমতা। পরোক্ষ রাজতন্ত্রের রেওয়াজ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। বংশানুক্রমে রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার হন নেতারা। আর নারীর ক্ষমতায়নের যে গালভরা ফাঁকাবুলি এ উপমহাদেশে শোনা যায় তার পেছনে পুরুষতন্ত্রই মূখ্য। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, ইন্দিরাগান্ধী, বন্দরনায়েক, বেনজির ভূট্টো, অং সাং সুচি, মেঘবতী সবাই পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিমাত্র। খালেদা জিয়ার পেছন থেকে জিয়ার ছায়াটুকু মুছে দিলে অতি সাধারণ সুন্দরী নারী ছাড়া তার আর কিই বা দাম? শেখ হাসিনা, সোনিয়া গান্ধী সবার দিকে তাকালে একই করুণ দৃশ্যই কেবল দৃশ্যমান হয়। অথচ এসবের মাঝেও একেবারে নিজেরই যোগ্যতা, আন্তরিকতা আর অদম্য প্রচেষ্টায়, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় মমতা গড়ে নিয়েছেন নিজের ভাগ্য, খালেদা-হাসিনা-সোনিয়াদের যা কভূ স্পর্শ করার স্পর্ধা হওয়ার নয়।

উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে পরিবারের প্রাচুর্যই মূখ্য, সাধারণ মানুষের ঘাড়ে পা রেখে একের পর এক সিড়ি টপকে এভারেস্টের চূড়া দখলে মত্ত ওরা। খালেদার ক্যান্টনমেন্টে বাড়ী চাই, হাসিনার চাই গণভবন, তারেকের জন্য পার্সেন্টেজ চাই, জয়ের জন্যও চাই পার্সেন্টেজ। আর হাজারো চাওয়া নিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় পৌছতে উচ্ছিষ্টভোগী কিছু চাটুকার সঙ্গী জোটে, এদেরও কেউ কেউ কে-টু, কাঞ্চনজঙ্গা, তাজিনডং সামিট করার সৌভাগ্য লাভ করে। তবু এভারেস্টের চূড়া থেকে যায় পরিবারতন্ত্রের নায়কদের মালিকানায়। আর তাইতো খালেদা জিয়াকে আন্দোলন করতে হয় সন্তানদের জন্য, নাতী নাতনীদের জন্য, শেখ হাসিনাকেও ভাবতে হয় সন্তানদের কথা। তবে মমতার যে সন্তান নেই, পুরো পশ্চিমবাংলা জুড়ে তার সন্তান। তাকে রাজনীতি করতে হয় সে সন্তানদের জন্যই, আর তাইতো নিজেকে নিয়ে খুব বেশী ভাবনা নেই তার, এমনকি বেতন না নেয়ার ঘোণষা দিয়েছেন তিনি। অথচ ক্ষমতায় এসেই তিনি বেসরকারী শিক্ষকদের মাস পয়লা তারিখেই বেতনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।

মমতার রাজনীতি এ দেশে সতীনদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়বে কিনা তা-ই এখন দেখার বিষয়। জানি না, এতো প্রশংসা মমতার কপালে সইবে কিনা। খালেদা-হাসিনাদের প্রাচুর্য যে তাকে ইর্ষাণ্বিত করবে না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তবুও, তিনি শুভ সূচনা করেছেন, তাকে সালাম। যতদিন তিনি ন্যায়ের পথে থাকবেন,  মাটি ও মানুষের পক্ষে থাকবেন তার প্রতি থাকবে সমর্থন। ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী, ভিন্ন দেশের নাগরিক হয়েও ফাটাকেষ্টর প্রতি এ আমার অঙ্গীকার।

পথ চলতে চলতে ফোস্কা পড়ে গেছে মমতার পায়ে
Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“মমতা দ্য ফাটাকেষ্ট” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. আল আমিন বলেছেন:

    অসাধারণ লেখেছেন।
    ” তবুও, তিনি শুভ সূচনা করেছেন, তাকে সালাম। যতদিন তিনি ন্যায়ের পথে থাকবেন, মাটি ও মানুষের পক্ষে থাকবেন তার প্রতি থাকবে সমর্থন। ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী, ভিন্ন দেশের নাগরিক হয়েও ফাটাকেষ্টর প্রতি এ আমার অঙ্গীকার।”
    সহমত।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

  2. mushfiqur rahman বলেছেন:

    ডু ঘা মারেলন ডুই সোটিন কে। বেশ ভােলা লাগেেলা । ঘা যার উপের মারেলন েসে িবেবক েটা নাই

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    বিবেক জাগ্রত হোক এটাই কামনা। ধন্যবাদ মুশফিক ভাই।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন