উচ্ছিষ্টভোজী

বাংলাদেশ, গরীব দেশ। ছোট বেলা থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে এ অপবাদটি শুনে শুনে বড় হয়েছি। অথচ বিগত দু’দশকে বাংলাদেশে হয়েছে ইর্ষণীয় উন্নয়ন।  বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে তা এক কথায় অসাধারণ। তবুও বাংলাদেশের গলা থেকে গরীর পদবিটি দূর হয় না। কিন্তু কেন? বাংলাদেশের সব আছে, আবার কিছুই যেন নেই এ দেশটিতে। কি নেই, কেন নেই এ চিন্তা আমাকে প্রতিনিয়ত দংশন করে।

যে কোন উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধির জন্য প্রধান পূর্বশর্তই হলো শক্তি। শক্তি ছাড়া কোন কিছু সম্ভব নয়। আর কে না জানে বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার ভীত গড়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে। এমন একটি যন্ত্র কি আজ দেখা যায় যার পেছনে বৈদ্যুতিক যাদু কাজ করছে না। অথচ বাংলাদেশে হাজারো উন্নয়নের মাঝেও এই প্রধান ভীতটি প্রতিনিয়ত দূর্বল থেকে দূর্বলতর হচ্ছে। কিন্তু কেন, সদুত্তর দিতে চায় না কেউ।

আমি বেড়ে উঠেছি মফস্বল শহরে, রাজাপুর উপজেলা সদরে। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত স্কুলে যেতে বর্ষাকালে ভাঙ্গতে হয়েছে হাটুসমান পঁচা কাদা, একেবারে শহরের প্রধান সড়কেই। এর পর হেরিংবন্ড রাস্তা হল,   এর পরে কালো পিচে মোড়ানো হল রাস্তাটি। আর এখন? আজ গ্রাম গঞ্জে এমন একটি রাস্তা পাওয়া যাবে না যার শরীরে কালো পীচের গালিচা জড়ানো হয় নি। এই তো সেদিনও রাজাপুর থেকে বরিশাল যেতে পাড়ি দিতে হতো দু’ দু’টো ফেরি, আজ ফেরি দুটোর স্থান দখল করেছে দেশের সবচেয়ে উচু অপরূপা গাবখান সেতু আর কালিজিরা সেতু। বৈদেশিক অর্থ সহায়তায় নির্মিত রাস্তা-ঘাট আর পুল-কালভার্টের কল্যাণে এখন বাড়ী থেকে বরিশাল যেতে লাগে  ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট। অথচ উন্নয়নের প্রধান শক্তি বিদ্যুৎ কুড়ি বছরের আগের অবস্থান থেকে সড়ে আসতে পারে নি বরং আরো খারাপ হয়েছে।

আমি ভেবে পাই না যে দেশে যমুনা সেতু তৈরী করা যায়, যে দেশে পদ্ধা সেতুর কাজ শুরু করা যায়, যে দেশে হাজার হাজার মাইল রাস্তা তৈরিতে বিদেশী সাহায্য আসে, সে দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে সক্রিয় উদ্যোগ কেন নেয়া যায় না?

আসলে বাংলাদেশের শত উন্নয়ন আর অগ্রগতির মাঝে রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। বাংলাদেশ মূলত কৃষি নির্ভর দেশ। কিন্তু অনেক দেশই আছে যাদেরকে বেঁচে থাকতে হয় শিল্পকে অন্যের দ্বারে দ্বারে ফেরি করে। তাই দেশে হাজার হাজার মাইলের রাস্তা তৈরী হলে আমাদের যতটা না লাভ তার চেয়েও বেশী উপকার সেসব দেশের, যাদের গাড়ী চলবে, যাদের ফুয়েল পুড়রে। পথে প্রান্তরে টাটা-বিরলা কিংবা টয়োটা গাড়ীর মিছিল দেখলেই একথা সহজে অনুমান করা যায়।  বাংলার আনাচে কানাচে এখন মূহূর্তেই বহুজাতিক কোম্পানীয়র অখাদ্য কুখাদ্য পৌঁছে যাচ্ছে, টেকো মাথাওয়ালাকে বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে গছিয়ে দেয়া হচ্ছে রং-বেরঙ্গের বাহারী চিরুনী।

বিদ্যুত শক্তিতে আমরা যদি স্বনির্ভর হয়ে যাই তবে আমাদের সকল উন্নয়নই দারুন অর্থবহ হয়ে যাবে, যা ওদের জন্য মোটেই সুখকর নয়, যারা বিদ্যুৎ শক্তিকে পুঁজি করে আমাদের গছিয়ে দেয় বিলাস সামগ্রী। বাংলাদেশের তৈরী পোষাক শিল্প বিশ্ব দরবারে সগর্বে স্থান করে নিয়েছে, তা নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র। আর এ সেক্টরকে ধ্বংস করতে বিদ্যুত খাতকে শক্তিশালী হতে ওরা দেবে না। তাই বিএনপি হোক কিংবা আওয়ামী লীগ যারাই দেশ চালাক না কেন বিদ্যুৎ শক্তিতে আমাদের স্বনির্ভর হতে কেউই সক্রিয় সহায়তা দেবে না। বিগত বছর গুলোতে এবং বর্তমান সময়ে সরকরারগুলোর ভূমিকা মনে এ সন্দেহ ঘনিভূত করেছে যে, যারাই দেশের হাল ধরে তাদের পা-ই বাঁধা পড়ে অদৃশ্য শক্তির ফাঁদে। হয়তো বড় বড় রাঘোব বোয়ালদের ইয়া বড় হা ভরে ওঠে বিদেশী প্রভূদের উচ্ছিষ্টে। উচ্ছিষ্টভোজীরা উচ্ছিষ্ট খেয়ে খেয়ে ভূড়ি বানাবে আর দেশের মানুষ অন্ধকার থেকে ঘোরতর অন্ধকারে অন্ধের মতো ঘুরপাক খাবে। নরকের ওমে ভস্ম হবে সাধারণ দেশ বাসী, তাই দেখে বগল বাজাবে ওরা। কারণ নেড়ী কুকুরের কাছে দেশ ও দেশের মানুষের চেয়ে যে ডাস্টবিনই প্রিয়।

Be Sociable, Share!

6 Replies to “উচ্ছিষ্টভোজী”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।