ক্ষমা করো বাসন্তি

বাসন্তির নাম শুনেছি, ছবি দেখেছি, জেনেছি এক বাসন্তি কিভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের হৃদয়। স্বাধীনতা পরবর্তী দুর্ভিক্ষে জেলে পাড়ার মেয়ে বাসন্তী পুরনো জাল গায়ে জড়িয়ে লজ্জা ঢাকার যে বৃথা চেষ্টা চালিয়েছিল তা বাংলাদেশের জন্য যে কতটা লজ্জার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু সে অনেক পুরনো কথা। আমার জন্মেরও আগের কথা। বাস্তবে যে বাসন্তি আবার আমার সামনে এসে দাড়াবে তা কি স্বপ্নেও ভেবেছি?

বাসার গেটে পা দিয়েই বাসন্তির  সামনে পরে গেলাম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, ঋজু শরীরে লাঠি ভর করে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে আমার বাসা থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বজ্রাহতের মতো হতভম্ব হয়ে দায়িয়ে থাকি। বাসন্তির পুরনো জালের মতোই পাতলা জাকাতের কাপড় পড়া বৃদ্ধার দিকে এক নজর তাকিয়েই লজ্জায় চোখ ফিরে আসে, ভেবে ভেবে হয়রান হই উন্নয়নের এই জোয়ারের মাঝেও মানুষ আজ কতটা অসহায়। ছাবির ত্যানার (মাছ ধরার জাল বিশেষ) মতো পাতলা জাকাতের কাপড়ে বাসন্তীদের লজ্জা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টায় বাংলাদেশের লজ্জা হয় কি না জানি না, তবে লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। সাড়ে সাত হাজার টাকা দামের মোবাইল ফোনটা জগদ্দল পাথরের মতো ভারী মনে হয়, মনে হয় এক কুড়ি বৃদ্ধার লজ্জার ঢাকার পয়সা বুঝি আমার এ মোবাইলটি দখল করে আছে। আমি বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত নই, তবু প্রয়োজনীয় এ মোবাইল বিলাসটাও আমাকে দগ্ধ করে।

আমি শাড়ি কেনার টাকা নিয়ে বাসন্তির অপেক্ষায় থাকি। শুক্রবার যায়, আবার শুক্রবার আসে, ভিক্ষুকের দল আসে, জোয়ান তাগড়া ভিক্ষুক মহিলারা পানের রস টেনে টেনে গল্পের সাথে ছোটে এ বাড়ি থেকে সে বাড়ি, কিন্তু বাসন্তি আর আসে না। জানি না বাসন্তি আদৌ বেঁচে আছে কি না, হয়তো নিজের লজ্জার সাথে সাথে পুরো দেশের লজ্জা ঢেকেছে বাংলাদেশের মাটি দিয়ে, কিন্তু আমি স্বস্তি পাই না। বারবার বাসন্তী এসে হানা দেয় আমার স্বপ্ন দুয়ারে।

বাসন্তীদের জন্য আমাদের করার কিছুই কি নেই?

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।