জেল থেকে জেলে : মাহমুদুর রহমানের কলাম

সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরি থেকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা

Mahmudur Rahmanআজ জুলাইর প্রথম প্রভাত। ইংরেজি সন ২০১০। বাংলা তারিখ ১৭ আষাঢ় ১৪১৬। জীবন আর মৃত্যুর একেবারে সীমান্তে দাঁড়িয়ে তিরিশটি দিন পার করার পর প্রথমবারের মতো কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। না, কোনো প্রাণঘাতী অসুস্থতায় আক্রান্ত হইনি। তবে, আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি-না, এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায় যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, সেটি এই একটি মাস প্রতিটি মুহূর্তে মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। মনের ভেতরে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি সবিনয়ে সাঙ্গ করে রেখেছিলাম। যে অসহায় মা এবং স্ত্রীকে ঘরে রেখে গ্রেফতার হয়েছি, তাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না এমন আশঙ্কায় হৃদয় ভেঙে-চুরে গেলেও অনেক চেষ্টায় বাইরে থেকে অবিচল থেকেছি। অবশ্য তাদের সঙ্গে মুক্তজীবনে কতদিন পর আবার দেখা হবে, সেটিও মহান আল্লাহতায়ালাই জানেন। আমাকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনে ক্ষমতাসীনদের বিদেশি মুরব্বি রাষ্ট্রগুলোর শতভাগ সমর্থন থাকলেও একেবারেই শেষ করে দেয়া নিয়ে সম্ভবত তাদের মধ্যে মতদ্বৈধ রয়েছে। সে কারণেই আমাকে হত্যার কাজটা শুরু করেও সমাপ্তি টানা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহ এখনও তাঁর এই অকিঞ্চিত্কর বান্দাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয়ার সময় নির্ধারণ করেননি।
লেখার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। গত তিরিশ দিনে কলম একেবারেই স্পর্শ করিনি, তা নয়। ডাইরি লেখার অভ্যাস আমার কস্মিনকালে না থাকলেও গ্রেফতারের পর থেকেই সময়-সুযোগমত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের রসদ হিসেবে টুকরো টুকরো কাগজে টুকে রাখতে ভুল হয়নি। রিমান্ড চলাকালে লেখা সম্ভব ছিল না। তবে, সেই বিভীষিকাময় স্থানগুলো থেকে কারাগারে ফেরামাত্র কোনোরকম বিশ্রাম না নিয়ে আগে লেখার টেবিলে কাজে বসে গেছি। কাজেই আজও লিখতে বসে পুঁজির অভাব হচ্ছে না। কিন্তু, সমস্যা অন্যত্র। আমি যে লিখতে জানি না, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? প্রকৃতি যেমন আপন প্রয়োজনে শূন্যকে পূর্ণ করে, তেমন করেই তো এক-এগারোপরবর্তী এক বিশেষ সময়ের প্রয়োজন মেটাতেই আমি কলাম-লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলাম। তাগিদটা এসেছিল ভেতর থেকে। কিন্তু নাজিমউদ্দীন রোডের বন্দিশালার সাত নম্বর সেলে বসে কী লিখি? বন্দি জীবনের স্মৃতিচারণ আর পত্রিকার কলাম লেখার মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। ব্যক্তিগতভাবে আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমার কোনো উত্সাহ নেই। বাগাড়ম্বর করে নিজেকে মহত্ দেখানো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আত্মজীবনী তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তির মহান খণ্ডিত ও অনেকাংশে কাল্পনিক চিত্র হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও ব্যতিক্রম হয়তো আছে। আমি কোনোক্রমেই সেই ব্যতিক্রমীদের মধ্যে পড়ি না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যথাসম্ভব নিরাসক্তভাবে ঘটনা বর্ণনা করে যাব। এর মধ্যে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে ছবি অবধারিতভাবে ফুটে উঠবে, তার ন্যায্যতা-অন্যায্যতার মূল্যায়ন করার দায়িত্ব আমার নয়। জীবিত থাকি আর না থাকি, যদি কোনোদিন এ লেখাটি পাঠকের কাছে পৌঁছায়, তাহলে সে কাজটি তারাই করবেন। এক মাস ধরে অনেক ভেবে যখন লেখকের ভূমিকাটি উপলব্ধিতে এসেছে, তারপরই কেবল লিখতে বসেছি। রিমান্ডের ফাঁকে ফাঁকে এই এক মাস বহিরাঙ্গে প্রশান্ত কিন্তু ভেতরে সর্বক্ষণ ছটফট করেছি। হাতে বন্ধ্যা কলম নিয়ে সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরির লোহার মোটা মোটা শিকগুলোর ফাঁক দিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এখন আমি নির্ভার। এবার শুরু হোক আমার কথকতা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আমাকে জেলে পুরবেনই, সেটা আমার জানাই ছিল। ২০০৯-এর ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে তার পুত্র এবং জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের আনুষ্ঠানিক, সরকারি কাগজপত্র আমার দেশ-এর সাংবাদিক এম আবদুল্লাহ হাতে পাওয়ার পর পুরো একটি দিন সেই সংবাদ ছাপানোর ঝুঁকি বিবেচনা করেছি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় পেশা বদল করে সম্পাদক হয়েছি। হয়তো সেজন্যই যে সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ, যার সমর্থনে কাগজপত্র রয়েছে, সেই সংবাদ চেপে রেখে নিজে বিপদমুক্ত থাকতে মন সায় দেয়নি। ঘটনার অবধারিত ধারাবাহিকতায় এই বছরের জানুয়ারি মাসে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের তাবত্ অংশে আনুষ্ঠানিক চিঠি যা সরকারি পরিভাষায় ডিও নামে অভিহিত, পাঠানো হয়। দেশের একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এমন চিঠি দিতে পারে কি-না, সেই তাত্ত্বিক অথবা আইনি প্রশ্ন ফ্যাসিবাদকবলিত বাংলাদেশে উত্থাপন করা অর্থহীন। এই রাষ্ট্রে সরকার-পরম্পরায় ক্রসফায়ার পর্ব পেরিয়ে ষাট-সত্তর দশকের চিলি, আর্জেন্টিনার মতো আমরা এখন গুম-খুনের জমানায় প্রবেশ করেছি। জেলের এই তিরিশ দিনেই এ-জাতীয় অসংখ্য লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কাহিনী জেনেছি, যেগুলো প্রসঙ্গক্রমে ক্রমান্বয়ে বর্ণনা করব। তার আগে আপন অভিজ্ঞতার গল্প। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ডিও’র ব্যাপারে জেনে যাওয়ার পরই স্ত্রীকে বলেছিলাম, আমাকে হারানোর মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে। মাকে বিশেষভাবে না বললেও ঘনায়মান বিপদের ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি একেবারে অন্ধকারে ছিলেন না। তবে গ্রেফতারের রাতের পূর্বপর্যন্ত সরাসরি কখনও আলাপ করিনি, মা আর ছেলের মধ্যে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা আর কি! জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর পেতাম প্রধানমন্ত্রী নাকি আমার গ্রেফতারে দেরির জন্য ভয়ানক ক্ষুব্ধ। ঘনঘন বিদেশযাত্রার আগে এবং প্রত্যাবর্তনের পরে এ বিষয়ে মনিটর করা তার রুটিনে পরিণত হয়েছিল। বশংবদ দুদক নির্দেশমত ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কিছুতেই আর ধৈর্য রাখতে পারছিলেন না। ঘটনার অন্ত টানতে তাই শেষপর্যন্ত এগিয়ে আসে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা—এনএসআই। ৩১ মে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় পরবর্তী দশ দিনের মধ্যে আমাকে গ্রেফতার এবং ‘আমার দেশ’ বন্ধ করা হবে। একজন সাংবাদিক জুনের এক তারিখ সকাল এগারোটার দিকে ফোনে আমাকে এই সংবাদ দেন। আমি তখন আর্টিজান সিরামিকের উত্তরা অফিসে নিজ কক্ষে বসে কাজ করছিলাম। আগেরদিন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সভাটির স্থান নিয়ে খানিকটা বিতর্ক রয়েছে। দু’টি সম্ভাব্য স্থানের কথা আমাকে জানানো হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কিংবা এনএসআই কার্যালয়ের মধ্যে যে কোনো একস্থানে চূড়ান্ত মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়। আমার স্ত্রী এবং আর্টিজান সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজার অফিসে আগমনের জন্য প্রতীক্ষারত অবস্থাতেই আমার অপর সহকর্মী সাংবাদিক খবর দিলেন, সকাল ৯টায় হাসমত আলীকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা বাসা থেকে উঠিয়ে এনএসআই কার্যালয়ে নিয়ে গেছে। সংস্থাটির প্রভাবশালী এক পরিচালককে পুরো অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। চাকা যে অতি দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে, সেটি বুঝতে অসুবিধা হলো না। স্ত্রী অফিসে এলে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রেস ক্লাবের উদ্দেশে রওনা করলাম। বিদায়ের সময় আবেগতাড়িত হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না; বরং ঘটনার আকস্মিকতায় দু’জনাই হতবিহ্বল। এ দিনটি আসবে জানতাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি! ঘর থেকে বার হয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রীর মাথায় হাত দিয়ে শেষবারের মতো দোয়া করাও হয়ে ওঠেনি। মনে হয়েছিল, গ্রেফতারের জন্য সরকার আরও কয়েকটা দিন সময় নিতেও পারে। উত্তরা থেকে প্রেস ক্লাব যাত্রাপথেই সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর বেসরকারি সংবাদ সংস্থা শীর্ষ নিউজকে টেলিফোনে সাক্ষাত্কার দিলাম। হাসমত আলীর নিরাপত্তা নিয়ে তখন আমার গভীর উত্কণ্ঠা। প্রেস ক্লাবে পৌঁছে সরাসরি গেলাম সভাপতি শওকত মাহমুদের কক্ষে। সেখান থেকেই আবারও অন্য বেসরকারি সংবাদ সংস্থা বিডি নিউজকেও সাক্ষাত্কার দিলাম। ততক্ষণে দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। শওকত মাহমুদের সৌজন্যে আহারপর্ব সাঙ্গ করলাম। সহকর্মী আবদাল, গনি এবং সাংবাদিক রওনাক আর শওকত মাহমুদ খাওয়ার সময় সঙ্গ দিয়েছিলেন স্মরণে আছে। বিকাল তিনটায় প্রেস ক্লাব থেকে আমার দেশ-এর উদ্দেশে যাত্রার আগেই সেখানে বিকাল পাঁচটার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনও সমাপ্ত হয়েছে। গণতন্ত্রের লেবাসধারী সরকারের চরম স্বৈরাচারী আচরণের ইতিহাস জাতির জেনে রাখা দরকার।
আমার দেশ কার্যালয়ে আমার কক্ষে পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই টেলিফোন অপারেটর জানালো হাসমত আলী টেলিফোনে অপেক্ষমাণ। স্বস্তি এবং কৌতূহল নিয়ে ফোন ধরতেই ওপারে ভদ্রলোকের আতঙ্কমিশ্রিত গলার আওয়াজ পেলাম। তার বক্তব্যের সারাংশ হলো, সকাল ন’টায় সাদা পোশাকধারী লোকজন তাকে বাসা থেকে উঠিয়ে এনে এনএসআই কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, সেই বর্ণনা পরিষ্কারভাবে না দিয়ে তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে শুধু বললেন, ওখানে মানুষ যায়! এই একটিমাত্র বাক্যে হয়তো তার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। হাসমত আলীর জবানিতেই জানলাম, বন্দিত্বের একপর্যায়ে তার কাছ থেকে দু’টি কাগজে জোর করে সই নেয়া হয়েছে। পরে এই দুই কাগজেরই একটি গেছে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে এবং অপরটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসমত আলী সরকারের নীলনকশার অংশীদার হতে সম্মত হওয়ার পরই দুপুর দুটোর দিকে এনএসআই অফিস থেকে ছাড়া পেয়ে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছেন। শেখ হাসিনার ইচ্ছানুযায়ী তার পুলিশ যে ওইদিনই আমাকে গ্রেফতার করবে, এ নিয়ে আমার আর কোনো সংশয় থাকল না। ততক্ষণে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমার দেশ-এর খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। শীর্ষ নিউজ ডট কম তাদের ওয়েবসাইটে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর দিচ্ছে। ফ্যাসিবাদী সরকার যে সর্বদা নির্জলা মিথ্যার ওপরই নির্ভর করে, তার প্রমাণ পেতেও দেরি হলো না। ‘অপারেশন আমার দেশ’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এনএসআই পরিচালক স্বগৃহ থেকে হাসমত আলীকে অপহরণ করার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের কাছে বেমালুম অস্বীকার করলেন।
এদিকে উদ্বিগ্ন শুভানুধ্যায়ীরা ততক্ষণে ফোন করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আমার দেশ কার্যালয়ে এসেও পড়েছেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু করার আগেই স্ত্রীকে ফোন করে সাড়ে তিন বছর ধরে আমার সঙ্গে জেলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ কাপড়-চোপড়ের ব্যাগটিকে পাঠাতে বলে একপ্রস্থ বিদায় নিলাম। ফোনের ওপারে কণ্ঠ রুদ্ধ হওয়ার আভাস পেলাম। তিনজন মাত্র মানুষের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের সংসার থেকে একজনের ঝরে যাওয়ার আশঙ্কাপূর্ব মানসিক প্রস্তুতি সত্ত্বেও তাকে ব্যাকুল করে তুলছিল। সারাদিনের তুমুল উত্তেজনার ফলে সেই মুহূর্তে আবেগশূন্য থাকতে পারলেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত নম্বর সেলে বসে পাঠকদের গল্প বলার সময় কেবলই চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে বারবার চশমার কাচ মুছেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কই? নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই আমি কর্মজীবনে নানামুখী সাফল্য পেলেও সমস্তটা জীবন ধরে আমার ছোট সংসারের মানুষগুলোকে বড় অবহেলা করার আক্ষেপ জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসহনীয় বোধ হচ্ছে। তারাশঙ্করের মতো বলতে ইচ্ছে করছে, ‘ভালবেসে মিটিল না সাধ, জীবন এত ছোট কেনে?’
বিকেল পাঁচটার সংবাদ সম্মেলনে আমার দেশ নিয়ে প্রশাসনের বেআইনি কার্যকলাপের বিবরণী সপ্রমাণ তুলে ধরলাম। প্রাসঙ্গিক সব কাগজপত্রের অনুলিপি তুলে দিলাম সংবাদমাধ্যমের উপস্থিত সহকর্মীদের হাতে। উপস্থিত সাংবাদিকরা সহজেই বুঝতে পারলেন তথ্য মন্ত্রণালয় আমাকে প্রকাশক হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলেও ঢাকা জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে অসত্ উদ্দেশ্যে সামান্য দাফতরিক একটি রুটিন কাজ মাসের পর মাস ফেলে রেখেছেন। এই গর্হিত অপরাধের জন্য জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে এখন আমাকে জেলে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। বলে রাখা দরকার, সংবাদ সম্মেলন চলাকালীনই আমার দেশ কার্যালয় যে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার মালিকানাধীন ইমারতে অবস্থিত, তার নিচতলায় সাদা পোশাকে অসংখ্য পুলিশ অবস্থান নিতে শুরু করেছে। তখন পর্যন্ত ঢাকার জেলা প্রশাসক পত্রিকার ডিক্লারেশনও বাতিল করেননি কিংবা শিল্পাঞ্চল থানায় আমার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়নি। অথচ সর্বশেষ ব্যবস্থায় শত শত পুলিশ আসতে শুরু করেছে। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে অফিস কক্ষে ফিরে এলাম। আমার দেশ পত্রিকা অফিস ততক্ষণে অন্যান্য সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদকর্মীতে ভরে গেছে। নিজের ঘরে ফিরেই শুনলাম, আমার গাড়িসহ এগারোতলা ইমারতের নিচতলা পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। শুরু হলো দীর্ঘ অবরোধ। বাংলাদেশে সম্পাদক গ্রেফতারের পরম্পরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মরহুম পিতা শেখ মুজিবুর রহমান চালু করেছিলেন। কবি আল মাহমুদ, এনায়েতুল্লাহ খান, আবদুস সালাম, ইরফানুল বারী প্রমুখ গ্রেফতার হয়েছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে। পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসক এরশাদ গ্রেফতার করেছিলেন আতাউস সামাদকে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে তোয়াব খান ও বোরহান আহমেদও গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু প্লাটুনের পর প্লাটুন দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে একটি পত্রিকা অফিসকে এমন করে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেনি কোনো সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলগত মিত্র এবং পূর্বসূরি জেনারেল মইনের প্রচ্ছন্ন সামরিক সরকারের পাইক-বরকন্দাজদের বুটের আঘাত অবশ্য অনেক পত্রিকা অফিসকেই এক-এগারোপরবর্তী সময়ে সইতে হয়েছে। আজ যারা আমার দেশ বলাত্কারের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করছেন, তাদের অনেককেই চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাজোটের আন্দোলনের ফসল সরকারের দুর্নীতি দমন অভিযানের অংশ হিসেবে। এদের দুর্বল স্মৃতিশক্তি দেখে করুণা হয়। যা-ই হোক, কী ঘটতে চলেছে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে আমরা প্রতি সন্ধ্যার মতো পত্রিকার মেকআপের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। রাত আটটার দিকে নিচ থেকে সংবাদ পেলাম, গাড়ির পর গাড়ি দাঙ্গা পুলিশ এসে চত্বর ভরে ফেলেছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। অবরোধকারী পুলিশ সাংবাদিকদেরও আর এগারোতলায় উঠতে দিচ্ছিল না। এদিকে টেলিভিশন চ্যানেলে তখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। আমরা সবাই মিলে কাজে লেগে গেলাম যাতে যত দ্রুত সম্ভব সেলোফেন ছাপাখানায় পাঠানো সম্ভব হয়। ধারণা করছিলাম, যে কোনো সময় সেখানেও পুলিশ পৌঁছে যাবে। রাত দশটার মধ্যেই প্রথম সংস্করণের সেলোফেন পাঠিয়েও দেয়া গেল। সোয়া দশটায় খবর পেলাম ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। আনন্দিত হয়ে ভাবলাম, অন্তত পরদিনের সংবাদপত্র পাঠকদের হাতে দিতে পারব। পৌনে এগারোটায় প্রেস মহাব্যবস্থাপক আহমদ হোসেন মানিক ফোন করে জানালেন, কয়েকশ’ পুলিশ প্রেস ঘিরে ফেলেছে। প্রায় একই সময় প্রধান কার্যালয়ের নিচতলা থেকে খবর এলো দাঙ্গা পুলিশ সিঁড়ি বেয়ে এগারোতলার উদ্দেশে উঠতে শুরু করেছে। কম্পিউটার বিভাগকে তাত্ক্ষণিক নির্দেশ দিলাম সংবাদপত্রের সফট কপি ওয়েবে তুলে দেয়ার জন্য, যাতে বিশ্ববাসী তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের চরম ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। এর মধ্যেই অগ্রজপ্রতিম ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে আসন্ন গ্রেফতারের সংবাদ দিয়ে আইনি লড়াইয়ে তার সহযোগিতা চাইলাম। তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার সাধ্যমত চেষ্টা চালানোর দৃঢ় সঙ্কল্পের আশ্বাসটুকুই কেবল দিতে পারলেন। বাংলাদেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এই আইনজীবীকে দীর্ঘদিন ধরে চেনার সুযোগ হয়েছে। এদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে তার সহানুভূতি সেক্যুলারদের প্রতিই অধিকতর মনে হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সামরিক সংযোগের বিষয়টি তিনি কখনোই সর্বান্তঃকরণে অনুমোদন করেননি। অবশ্য জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের অসাধারণ সত্ ব্যক্তিচরিত্রের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। তার তুলনামূলক পছন্দের দলের এই অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারবিরোধী আচরণ তাকে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত করেছে বলেই মনে হলো। এক-এগারোর অপশাসনের দুই বছরে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়ে দু’জনা দিনের পর দিন আলাপ-আলোচনা করেছি। তার পুরানা পল্টনের চেম্বারে বসে থাকার সময় আজকের ক্ষমতাবানদের আত্মীয়-স্বজনের কত অশ্রুজলের সাক্ষী আমি নিজে।

দরজার ওপারে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র আর এপারে সাংবাদিকদের ক্যামেরা

দাঙ্গা পুলিশের এগারোতলার দিকে ধেয়ে আসা এবং আমার আসন্ন গ্রেফতার নিয়ে আমি কোনো উদ্বেগ অনুভব করছিলাম না। কিন্তু আমার দেশ যে পরদিন পাঠকের কাছে পৌঁছানো গেল না, এ কারণে উপস্থিত সবাই বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। আমার দেশ নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের এই সম্পূর্ণ আইনবিরোধী কার্যকলাপ যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিচার বিভাগেও শেষ পর্যন্ত টেকানো যাবে না, আমার মনে এই দৃঢ়বিশ্বাস সত্ত্বেও এতগুলো সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় বড় বিষণ্ন বোধ করতে লাগলাম। এর মধ্যে পত্রিকার সকল সহকর্মী তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানাতে এলেন। তারা নিজেদের মধ্যে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমটি, আমার সঙ্গে গণগ্রেফতার বরণ করবেন এবং দ্বিতীয়টি, কোনো পরিস্থিতিতেই ফজরের নামাজের আগে আমাকে গ্রেফতার হতে দেবেন না। বিদেশি প্রভুদের অন্ধ সমর্থনে যে বেপরোয়া সরকার ক্রমেই গুম-খুনে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠছে, তাদের হাতে রাতের অন্ধকারে আমাকে কোনো অবস্থাতেই সমর্পণ করা হবে না। সহকর্মীদের এমন ভালোবাসার প্রকাশে চোখ শুকনো রাখব এমন সাধ্য কই? এদিকে এগারোতলায় তখন খাদ্য ও পানির সঙ্কট চলছে। নিচতলায় পুলিশের অবরোধের মধ্য দিয়ে কারও পক্ষে হেঁটেও উপরে ওঠা সম্ভব নয়। সরকার আমাদের ভাতে এবং পানিতে মারার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। রাত ১২টার মধ্যে এগারোতলার প্রবেশদ্বারের বাইরেটা সাদা পোশাকধারী এবং দাঙ্গা পুলিশে ভরে গেছে। দরজার ওপারে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র আর এপারে সাংবাদিকদের হাতে হাতে ক্যামেরা। এ এক অসম লড়াই।
সন্ধ্যা থেকে আমার অফিসে উপস্থিত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি এবং অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সজলকে অনুরোধ করলাম ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্যে, যাতে সাংবাদিকরা কেউ হতাহত না হয়ে আমার গ্রেফতারপর্ব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়। তারা প্রশ্ন করে জানলেন পুলিশের কাছে আদালতের কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই। ঢাকার জেলা প্রশাসক উপরের নির্দেশে রাত ১০টা পর্যন্ত তার কার্যালয় ‘বিশেষ প্রয়োজনে’ খোলা রেখে আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের যে আদেশনামায় স্বাক্ষর করেছেন, তার কোনো অনুলিপি পর্যন্ত নেই। আছে কেবল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় হাসমত আলীর দায়ের করা কথিত এজাহার। আগেই উল্লেখ করেছি, দুপুর দুটো পর্যন্ত এনএসআই কার্যালয়ে হাসমত আলীকে আটকে রেখে দুটি কাগজে সই নেয়া হয়েছিল। তারই একটি গেছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। কোনো থানায় এজাহার দায়ের করতে হলে অভিযোগকারীকে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিডি অথবা এফআইআর রুজু করা আইনত বাধ্যতামূলক। হাসমত আলী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় সারাদিনের মধ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন এমন দাবি আমাকে গ্রেফতার করতে আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ করেননি। এদেশে আদালত থেকে জারি করা হাজার হাজার গ্রেফতারি পরোয়ানা মাসের পর মাস কোর্টে এবং থানায় পড়ে থাকে। বিশেষ তদবির ছাড়া সেগুলো বাস্তবায়নে পুলিশের কোনো আগ্রহ থাকে না। অথচ আমার ক্ষেত্রে একটি বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করামাত্র শত শত পুলিশ কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই জামিনযোগ্য ধারার মামলায় কোর্টের নির্দেশের তোয়াক্কা না করেই গ্রেফতারের জন্যে ছুটে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা পুরো অপারেশন মনিটর করছে। হয়তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সর্বক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন তত্পর হলে দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো সমস্যাই হতো না।
প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদকে ফোন করলাম। তিনিই যে আমাকে এই পত্রিকাটি রক্ষার জন্যে অনেকটা জোর করে মিডিয়া জগতে নিয়ে এসেছিলেন, সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমার অবর্তমানে পত্রিকা দেখা-শোনার দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানালাম। তার এবং তার স্ত্রীর গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও আমার অনুরোধ সামাদ ভাই ফেললেন না। কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হলাম।
রাত ১টার দিকে বাসা থেকে ফোন এলো। মা এবং স্ত্রীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিলাম। পুরনো ঢাকা থেকে শেফালী নামের আমার এক খালা সেদিন বেড়াতে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গেণ্ডারিয়ায় আমরা একসঙ্গে থাকতাম। তিনিও অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে আমাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে বিদায় জানালেন। আমার মা সমস্তটা জীবন শিক্ষকতা করে একমাত্র সন্তানকে মানুষ করেছেন। তিনি জানেন বিনা অপরাধে জালিম সরকারের পুলিশ তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে। সেই নৈতিক শক্তিতেই বোধহয় সেই দুঃখিনী মা নিষ্কম্প গলায় আমাকে মাথা উঁচু করে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যে সাহস জোগালেন। শাশুড়ি এবং খালা-শাশুড়ির সামনে টেলিফোনে কথা বলার সময় আমার স্ত্রীর যথাসাধ্য আবেগ চেপে রাখার চেষ্টা বুকফাটা কান্নার চেয়েও করুণ শোনাল। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তাকে তেমন একটা সময় দিইনি। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি। আর আজ চলেছি অজানার উদ্দেশে। কবে আবার দেখা হবে, আদৌ দেখা হবে কি-না জানা নেই। আমার ঘরভর্তি সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী। বিদায়ের মুহূর্তে নিজের আবেগ নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করব এমন পরিবেশ নেই। মাকে দেখার ভার স্ত্রীর কাঁধে অর্পণ করে মনে মনে ভাবলাম—ওর দায়িত্ব দেব সেই মানুষ কই? আমাদের সন্তান নেই, ওর কোনো ভাই নেই। পিতা থাকলেও অনেক বয়স হয়েছে। কন্যাকে দেখার জন্যে তার আর কত সময় অবশিষ্ট রয়েছে, সেটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। এবার সহকর্মীদের ডেকে আমাকে বিদায় দেয়ার অনুরোধ জানালাম। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনতে প্রস্তুত নয়। আমার পরম সুহৃদ, অগ্রজপ্রতিম কবি ফরহাদ মজহার সেই সন্ধ্যা থেকে একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। বিএনপির চেয়ারপার্সনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল সোহেল, ব্যক্তিগত সচিব শিমুল বিশ্বাস, শাম্মী আখতার এমপি এবং আরও পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দীর্ঘক্ষণ ধরে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। সবারই অভিন্ন বক্তব্য, এই রাতের আঁধারে আমার গ্রেফতার হওয়া নিরাপদ নয়। ক্রসফায়ার এবং গুম-খুন যে রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য আচরণ, সেখানে ফজরের নামাজের আগে আমার কোনো অবস্থাতেই যাওয়া চলবে না। সহকর্মী সাংবাদিকরা আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সম্পাদকের দরজা আগলে ঘরের বাইরে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে পড়ল। ওদিকে মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে পুলিশের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। রাত ৩টায় বিবিসি থেকে ফোন পেয়ে বেশ অবাক হলাম। বেশ কিছুদিন ধরে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির সংবাদ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রচারে ক্ষমতাসীনদের প্রতি পক্ষপাত সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারে প্রিন্ট মিডিয়ায় যে বিজ্ঞাপন দেয়, সেখানেও আমার দেশ পত্রিকার জন্যে বরাদ্দ প্রায় থাকে না বললেই চলে। কিন্তু ফোনের ওপারের মহিলার কণ্ঠস্বর এবং প্রশ্ন করার ধরন আজ যথেষ্ট সহানুভূতিশীল মনে হলো। ফ্যাসিবাদ ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আমার দেশ পত্রিকার নৈতিক অবস্থান তুলে ধরলাম। আমাদের অবরুদ্ধ অবস্থার যথাসম্ভব বর্ণনা দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে বিবিসিসহ মুক্তবিশ্বের সকল গণমাধ্যম এবং মানবাধিকারে বিশ্বাসী মানুষের সমর্থনের আহ্বান জানালাম। সেই সাক্ষাত্কার বিবিসি থেকে প্রচারিত হয়েছিল কি-না আমার জানা নেই। সাক্ষাত্কারপর্ব শেষ না হতেই শেষবারের জন্যে স্ত্রীর ফোন পেলাম। আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের হেফাজতে চলে যাব জানাতেই পারভীন স্তব্ধ হয়ে গেল। থানায়, আদালতে কিংবা কারাগারে মা এবং সে যেন কোনোদিন আমাকে দেখতে না যায়, মিনতিভরে সেই অনুরোধ করলাম। ফ্যাসিবাদী সরকারের সব অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করার মতো মনোবল আমার রয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আমার প্রিয়জনের অপমান সইতে পারব না। দেড় বছরের শাসনামলে প্রমাণিত হয়েছে ন্যূনতম শালীনতা, সৌজন্যবোধও এদের মধ্যে নেই। বারবার করে পারভীনকে বললাম, তোমাদের কষ্ট হবে জানি, তবু আমার এই শেষ অনুরোধটুকু রক্ষা কোরো।
নিরস্ত্র মানুষের সব বাধা শেষরাত সাড়ে ৩টার মধ্যেই ভেঙে গেল। ঘরের বাইরে চেয়ার ছুড়ে ফেলা, সাংবাদিকদের লাঠিপেটা এবং অগ্রসরমাণ বুটের আওয়াজ পেলাম। কয়েকজন বোধহয় দরজা আগলে রাখার শেষ চেষ্টা করেছিল। দাঙ্গা পুলিশের সবল ধাক্কায় সবাই ছিটকে পড়ল ঘরের ভেতরে। ডজন দুয়েক পুলিশের চাপে আমার সামনের টেবিলটা প্রায় গায়ের ওপর উঠে এলো। ফরহাদ ভাই সামান্য আহত হলে বললাম, আর নয়। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। চারদিক থেকে পুলিশের আগ্রাসী হাত এগিয়ে এলো আমার দিকে। সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও ফজরের নামাজ পর্যন্ত সময় চাইছে। অনুরোধ রক্ষা হবে না বুঝতে পেরে আমি কেবল শেষবারের জন্যে অজু করতে চাইলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সংলগ্ন বাথরুম থেকে অজু করে এসে বললাম, আমি তৈরি। চারদিকে অশ্রুর বন্যা। অগুনতি পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে এগিয়ে গেলাম লিফটের দিকে। মুখে হাসি ধরে রেখেছি। নইলে সহকর্মীরা আরও ভেঙে পড়বে। লিফট বন্ধ হলো। চালকের দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখেও পানি। লিফট নিচতলায় নামলো। সেখানেও অত রাতে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষ অপেক্ষা করে আছে। এমপি পাপিয়া, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলনেত্রী শিরিন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সোহেলকে বোধহয় চিনতে পারলাম। তখনও স্লোগান চলছে। গাড়িবারান্দার সামনেই একটি সাদা, দরজা খোলা, মাইক্রোবাস আমার জন্যে অপেক্ষমাণ। কাছে এগোতেই ভেতর থেকে একজন হাত বাড়িয়ে সজোরে ভেতরে টেনে নিল। আমাকে মাঝখানে ঠেলে দিয়ে আরও একজন মাইক্রোবাসে উঠল। চালকের পাশেও দেখলাম অপর এক কর্মকর্তা। মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোবাস ছুটে চলল শেরাটন হোটেলের দিকে। কোথায় যাচ্ছি জানা নেই। কেউ কোনো কথা বলছে না। জিজ্ঞাসা করাও অর্থহীন। বাংলামোটরের মোড়ে ইউটার্ন নেয়ার পর ওয়্যারলেসে কথা শুরু হলো। আবারও সোনারগাঁও হোটেল পেরিয়ে এবার উত্তরে ছুটতে লাগলাম। ছুটন্ত গাড়ির ভেতর থেকে মনে হলো বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার ইমারতের নিচতলায় তখনও বেশ লোকজন। আমাকে কি দেখতে পেয়েছে তারা? ভাবছিলাম, থানায় নিচ্ছে নাকি দেশবাসী কালই ক্রসফায়ারের মিছিলে আরও একজন বেড়ে যাওয়ার একঘেয়ে গল্প শুনবে? মিনিট দশেকের মধ্যেই জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করলাম। সঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তারা ওয়্যারলেস অথবা মোবাইল ফোনে নির্দেশ দেয়া-নেয়া ছাড়া আমার সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করেনি। ভোর ৪টার দিকে একবার ভুলের পর চালক গাড়ি নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় প্রবেশ করল। জায়গাটি অপরিচিত। আগে কখনও এখানে আসার কারণ ঘটেনি। মাইক্রোবাস থেকে নামলাম। কেউ কোনো কথা বলছে না। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেই এগিয়ে গেলাম ডিউটি অফিসারের ঘরের দিকে। চেয়ার টেনে বসেও পড়লাম। ডিউটি অফিসার এবং শিল্পাঞ্চল থানা থেকে আগত আমার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) আবদুল আহাদ প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিল পারস্পরিক কাগজপত্র লেখা এবং সই-সাবুদ সমাপ্ত করতে। ফজরের আজান শুনতেই পাশে মেঝেতে নামাজ পড়ার জন্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। একজন কনস্টেবল দয়াপরবশ হয়ে একটি জায়নামাজ নিয়ে এলো। নামাজ শেষ হলে আইও আহাদ দুই-একটি অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করল। আমার গ্রেফতারে বিলম্ব নিয়ে বেশ অনুযোগও শুনলাম। কর্মকর্তাটির কথা বলার ভঙ্গি যথেষ্ট তির্যক। অভদ্র হয়তো বলা যাবে না তবে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছিল প্রতিটি বাক্যে। সাড়ে ৫টার মধ্যেই আমাকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। জীবনে প্রথমবারের মতো থানার হাজতে পা রাখলাম।
হাজতটি বেশ বড়। এক কোণে আধা-মানুষ সমান উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা প্রাতঃকৃত্যের জায়গা। পাশে ধূলি-ধূসরিত কালো রঙের ময়লা কম্বল পড়ে আছে। ওই কম্বল পেতে বসার চেয়ে নোংরা মেঝেতে বসা অনেক ভালো। যতক্ষণ শরীরে কুলায় পায়চারি করে সময় কাটানোই মনস্থ করলাম। আমার দিকে একবার তাকিয়ে ডিউটি অফিসার চলে গেল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ফিরে এলো একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে করে। তার হাতে একটা চেয়ার। গারদের তালা খুলে চেয়ারটা দিয়ে বলল—স্যার, এখানে বসে সময় কাটান। প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদ জানালাম। বসার আয়োজন তো হলো। কিন্তু মশা এবং ভ্যাপসা গরমের যুগপত্ আক্রমণে সময় কাটানো কঠিন। ডিউটি অফিসার খানিক বাদে একটা মশার কয়েল এনে গারদের লোহার দরজার ওপারে জ্বালিয়ে আমাকে বলল—স্যার, দরজার কাছে এসে বসেন, গরম এবং মশা দুটোই কম লাগবে। আমাদের গারদের ভেতরে কয়েল দেয়ার নিয়ম নেই। পুলিশ কর্মকর্তাটির সৌজন্যে যথেষ্ট কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। আমাকে পাহারা দেয়ার জন্যে একজন সেন্ট্রি গারদের বাইরে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। ছেলেটির সঙ্গে টুকটাক গল্প করতে করতে ৮টা বাজল। কৌতূহলবশত থানার অন্যান্য সেন্ট্রিও উঁকি দিয়ে আমাকে দেখে গেল। এর মধ্যেই ক্যান্টিন থেকে নাস্তা এলো। দুটো ছোট পরোটা, ডিমভাজি এবং লেবু দেয়া এককাপ রঙ চা। আগের রাত থেকে প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। ডিমভাজি দিয়ে একটা পরোটা এবং চা খেলাম। চায়ের স্বাদটা চমত্কার লাগল।
সময় আর কাটতে চায় না। ভ্যাপসা গরমে সেদ্ধ হচ্ছি। গেঞ্জি-শার্ট ঘামে ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। দেয়ালঘেরা প্রাতঃকৃত্যের জায়গায় গোসল হয়তো করা যেত; কিন্তু সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো কাপড় নেই। ঘামের গন্ধে নিজের কাছেই অস্বস্তি লাগছে। এর মধ্যেই দুপুরে ভাত খাওয়ার প্রস্তাব এলো। এ অবস্থায় খাওয়ার রুচি হলো না। আরও এককাপ লেবু চা চেয়ে খেলাম। বসে বসে ভাবছিলাম আইন অনুযায়ী তো আমাকে আজই কোর্টে হাজির করার কথা। জামিন না পাই, আপনজনরা অন্তত জানবে আমি এখনও বেঁচে আছি। পরক্ষণেই মনে হলো, এক-এগারোর সরকার অনেক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আদালতে সোপর্দ না করেই অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখেছিল। অসহায় আত্মীয়স্বজন তখনকার ক্ষমতাবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছে প্রিয়জনের হদিসের জন্যে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেই অবৈধ সরকারেরই ফসল। চোখ বুজে একমনে আল্লাহর কাছে সবরের প্রার্থনা করে যাচ্ছিলাম। বিকাল সাড়ে ৩টায় গারদের তালা খোলা হলো। শুনলাম আমাকে আদালতে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান এসেছে। প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয় সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের অপরাধে দায়ের করা মানহানি মামলার হাজিরা দিতে গ্রেফতার হওয়ার দু’সপ্তাহ আগে সিএমএম আদালতে গিয়েছিলাম। সেদিন সহকর্মী সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান সঙ্গে ছিল। আদালতে প্রিজন ভ্যানে আসামিদের গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বড় কষ্ট লেগেছিল। এক আসামির স্ত্রীকে দেখেছিলাম কোলের ছেলেটিকে উঁচু করে ধরে আছে যাতে প্রিজন ভ্যানের মধ্যে থাকা পিতা তার সন্তানকে একটু স্পষ্ট করে একনজর দেখতে পায়। দৃশ্যটি বিশ্ববিখ্যাত ‘স্পার্টাকাস’ ছবির মতো লেগেছিল, যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী, ক্রুশবিদ্ধ স্পার্টাকাসের সামনে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী সদ্যোজাত পুত্রকে দু’হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে ছিল। যতবার ছবিটি দেখেছি, অবধারিতভাবে ওই দৃশ্যে চোখে পানি এসেছে। আমি নোমানকে ভাঙাচোরা প্রিজন ভ্যানে আসামিদের অসুবিধা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখতে বলেছিলাম। তখন কি জানতাম এত শিগগির আমাকেই প্রিজন ভ্যানে উঠতে হবে? ভেতরে ঢুকে দেখি বসার কোনো সুযোগ নেই। লোহার বেঞ্চের কাঠামো থাকলেও প্লাইউডের সবগুলো তক্তা ভাঙা। ভ্যানটির উচ্চতাও বেশ কম মনে হলো। ফলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পুরনো ঢাকার সিএমএম কোর্ট পর্যন্ত দীর্ঘ পথ ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে থেকে পা এবং ঘাড় দুটোই ব্যথা করে ফেললাম। ভিআইপি সড়ক দিয়ে আমার দেশ পার হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার সহকর্মীরা কি অফিসে আছে, নাকি ফ্যাসিবাদের পুলিশ সবাইকে বার করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে? আরও একটি চিন্তা সমস্ত পথ মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাকে যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি জামিনযোগ্য। অতএব চরম পক্ষপাতদুষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকেও এই মামলায় অন্তত জামিন দিতেই হবে। কিন্তু শত শত দাঙ্গা পুলিশ দিয়ে এত কাণ্ড করে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই, মাত্র একরাতের জন্যে আমাকে গ্রেফতার করেননি। জামিন পাওয়া যাবে না এমন মামলা গত চব্বিশ ঘণ্টায় সম্ভবত দায়ের করা হয়েও গেছে। মামলার অভিযোগটি কী হবে, অনেক ভেবেও তার কোনো কূলকিনারা করতে পারছিলাম না। বাংলাদেশের পুলিশ বানোয়াট মামলা তৈরিতে কতটা সিদ্ধহস্ত, সেটা ঠাহর পেতে আর মাত্র একঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। জনসন রোড থেকে সিএমএম কোর্টের দিকে প্রিজন ভ্যান বাঁক নিতেই অসংখ্য লোকের গগনবিদারী স্লোগানের আওয়াজ শুনতে পেলাম।

ভোরের আজানের ধ্বনি আমাকে সেই ভরসাই দিয়ে গেল

আমাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যান অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে এগোতে চেষ্টা করছে। ভেতর থেকেই শুনতে পাচ্ছি অনেকের কণ্ঠে ‘মাহমুদ ভাই’ ডাক এবং পুলিশের মুহুর্মুহু হুইসেলের আওয়াজ। সিএমএম আদালতের সামনের রাস্তায় অপেক্ষমাণ আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী এবং সাধারণ জনগণের প্রতিবাদের মুখে আমাকে কোর্টে নেয়া সম্ভব হলো না। অবস্থা বেগতিক হয়ে ওঠায় শেষ পর্যন্ত শত শত পুলিশের প্রহরায় প্রিজন ভ্যান ঢুকে গেল কোর্ট গারদ চত্বরে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরমে ভ্যানের মধ্যেই সেদ্ধ হচ্ছি। আশপাশের বিল্ডিং-এ ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকরা ততক্ষণে অবস্থান নিয়েছেন। আইও আহাদ ভ্যানের তালা খুলে একজন কনস্টেবলসহ প্রবেশ করল। দু’জনার হাতে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট। যুগপত্ বিরক্ত এবং বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাতেই পুলিশের গত্বাঁধা বুলি আউড়ে জানাল, আমার নিরাপত্তার জন্যই নাকি এই চরম অবমাননাকর আয়োজন। যেন আমি ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী। হয় আমাকে মেরে ফেলা কিংবা ছিনিয়ে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান থেকে বাইরে পা দিলেই অস্ত্র হাতে হাজার হাজার সন্ত্রাসী ঝাঁপিয়ে পড়বে! এক-এগারোর সময়ে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে এই আদালতেই হেলমেট, জ্যাকেট পরিয়ে আনার দৃশ্য মনে পড়ে গেল। জেএমবি এবং হুজির লোকজনকেও একইভাবে আদালতে হাজির করা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। বুঝতে অসুবিধে হলো না, মিডিয়া-সার্কাসের মাধ্যমে চরিত্রহননের চেনা কৌশল আমার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হতে যাচ্ছে। আমাকে পুরোপুরি চিনতে বর্তমান প্রশাসনের তখনও বাকি ছিল।
আমি বেঁকে বসলাম। আমার সাফ কথা, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানোর আগে প্রিজন ভ্যানের ভেতরেই আমাকে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে। আইও আবদুল আহাদ আমাকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। তার কাছ থেকে শুনলাম, আমার নাকি অনেক শত্রু, জ্যাকেট আর হেলমেট কেবল আমার অমূল্য প্রাণ রক্ষার জন্যই ‘সদাশয় সরকার’ বিশেষভাবে ব্যবস্থা করেছে। আমি অটল রইলাম। দল বেঁধে আসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানারকম হুমকিতেও কাজ হলো না। আমার অনমনীয়তার কাছে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের লেবাসধারী মহাজোট সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলো। তখনও বাইরে পুলিশের সঙ্গে আইনজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবীসহ প্রতিবাদী জনতার ধাক্কাধাক্কি চলছে। আরও ঘণ্টাখানিক অপেক্ষার পর অনেক কসরত করে প্রিজন ভ্যান কোর্টের একেবারে দোরগোড়ায় নেয়া হলো। চারদিকে স্লোগান এবং শত শত পুলিশের বেষ্টনীর মধ্যে হেলমেট, জ্যাকেট ছাড়াই মাটিতে পা দিলাম। এর মধ্যেই অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার দুটো ওকালতনামায় আমার সই নিয়ে গেছেন। তখনই প্রথম বুঝেছি, সরকার নতুন একটি মামলা অন্তত দায়ের করেছে। তবে কী প্রকৃতির মামলা, সেটি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগে টের পাইনি। অসংখ্য পুলিশ এবং জনতার ভিড় ঠেলে দুর্বল শরীরে সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হলেও পিঠ সোজা রেখেই আদালতে পৌঁছে সোজা কাঠগড়ায় উঠলাম। সানাউল্লাহ মিঞা, মাসুদ তালুকদার, খোরশেদ আলমসহ অনেক আইনজীবী আমার জন্যে দাঁড়ালেন। সরকারও তার পিপিবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছে। এজলাসে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। যুক্তি-তর্ক শুরু হলো। হাসমত আলীর দায়ের করা জামিনযোগ্য, বানোয়াট মামলায় সহজেই জামিন পেয়ে গেলাম। তারপর শুরু হলো দ্বিতীয় মামলা। এই মামলায় বাদী তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পূর্বরাতে আমার দেশ কার্যালয় থেকে আমাকে গ্রেফতারের সময় পুলিশকে নাকি আমারই নির্দেশে কর্তব্য-কর্মে বাধা দেয়া হয়েছে। কেবল মামলা দায়ের নয়, পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডও প্রার্থনা করল। এবার সত্যিই ধাক্কা খেলাম। মইন ও তার মার্কিন এবং ভারতীয় প্রভুর বিরুদ্ধে কলম ধরার দিন থেকেই জেলখানায় আসার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কিন্তু বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিকের একজন সম্পাদককে কোনো সরকার নির্যাতন করার অভিপ্রায়ে বানোয়াট মামলায় রিমান্ডে নিতে পারে—এমন চিন্তা কখনও মাথায় আসেনি। মনে পড়লো, পত্রিকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই আমার দেশ-এর সাংবাদিকদের মানবাধিকার প্রশ্নে আমার অনমনীয় অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সেই থেকে ক্রসফায়ার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম-খুন ইত্যাদির বিরুদ্ধে আমরা জনমত গঠনের অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে গেছি। গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত হবে, এটা মানতে পারিনি কোনোদিন। আজ আমিই রিমান্ডের শিকার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। উপস্থিত সবাইকে কিছুটা অবাক করেই তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট সরকারপক্ষের রিমান্ডের আবেদন খারিজ করে তিন দিনের মধ্যে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের রায় শোনানো মাত্র প্রসিকিউশনের এক আইনজীবীকে উচ্চস্বরে ম্যাজিস্ট্রেটকে রাজাকার বলে গাল দিতে শুনলাম। উভয়পক্ষের যুক্তি-তর্কের পুরোটা সময় ধরে একই ব্যক্তি আমাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের খিস্তি-খেউড় ও অঙ্গভঙ্গি করে যাচ্ছিল। অনেক গালাগালের মধ্যে টাউট শব্দটা বেশ পরিষ্কার শুনতে পেয়েছিলাম। দ্বিতীয় মামলায় জামিন অবশ্য হলো না। এক-এগারোর অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরার দিন থেকে জেলে যাওয়ার যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, আজ সেটাই ঘটতে চলেছে। থানার হাজত ইতোমধ্যে দেখা হয়েছে, এবার প্রকৃত জেল দেখতে চলেছি। রিমান্ড আটকাতে পেরে আমার পক্ষের আইনজীবী ও আদালতে উপস্থিত পেশাজীবী নেতারা এক ধরনের স্বস্তিসহ আমাকে বিদায় জানালেন। তাদের অভিব্যক্তিতে মনে হলো, স্বল্প সময়ের জন্য আমি যেন কোথাও বেড়াতে চলেছি। এদিকে আমার মন তখন বলছে, এক দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এই যাত্রা। রিমান্ড চাওয়ার মাধ্যমে সরকারের হীন চক্রান্ত প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে আমার নির্যাতন এখন অবশ্যম্ভাবী। প্রথম চেষ্টায় রিমান্ডে নিতে প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার বিফল হলেও দ্বিতীয়বার যে তারা ব্যর্থ হবে না, সে ব্যাপারে আমি এর মধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছি। কতখানি নির্যাতন সইতে পারব, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য। হাসিমুখেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। আজ অন্তত গত রাতের মতো গন্তব্য নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তায় ভুগছি না। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যয়নকালে পুরনো ঢাকা থেকে বহুদিন নাজিমউদ্দীন রোডের জেলখানার উঁচু প্রাচীরের পাশ দিয়ে রিকশা করে বুয়েটে গেছি। সেই উঁচু প্রাচীরের ভেতরের পৃথিবীর বাসিন্দা হব আজ থেকে। ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে তার প্রয়োজনীয় ভিসা দিয়েছেন।
জুন মাসের ২ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানটি থামল কারাগারের প্রধান ফটকের গা ঘেঁষে। ব্যাগ হাতে নেমে বিশাল প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। পেছনে পড়ে রইল আমার ৫৭ বছরের মুক্ত জীবন। ভেতরে আলো-আঁধারি। পার হয়ে আসা দীর্ঘ সময়ের চিহ্ন কারা অফিসের চারদিকে। কোন দিকে যাব বুঝতে না পেরে থমকে দাঁড়ালাম। একজন কারারক্ষী ইশারা করল ডান দিকের গলিপথের দিকে। বেশ খানিকটা অস্বস্তি নিয়েই সেখানে একজন জেল কর্মকর্তার সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, তিনি আমার পরিচয় জানেন। সামনের চেয়ারে বসতে বলে সেই ডেপুটি জেলার নিজের কাজে মন দিলেন। আধঘণ্টাখানিক পর মাথা তুলে জানালেন, আমার ডিভিশন প্রাপ্তির কোনো আদেশ নাকি তারা পাননি। কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গেই মনে করিয়ে দিলেন পরের দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় রোববারের আগে আদালতের সেই আদেশ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাত্ অন্তত তিন দিন আমাকে আম-কয়েদিদের সঙ্গে কাটাতে হবে। জেল কোড অনুযায়ী সচিব পর্যায় পর্যন্ত সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকের ক্ষেত্রে ডিভিশন পাওয়ার জন্যে আদালতের নির্দেশের প্রয়োজন পড়ে না। এটা প্রটোকল অনুযায়ী তাদের প্রাপ্যের মধ্যেই পড়ে। জেল কোডের প্রশ্ন তুলতেই ভদ্রলোক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানালেন, কোর্টের আদেশ ছাড়া আমাকে ডিভিশন দেয়া হলে তার বিপদে পড়ার সমূহ আশঙ্কা। চাকরি তো যাবেই, তার সঙ্গে উপরি হিসেবে আনুষঙ্গিক বিপদ। তাকে আশ্বস্ত করে জানালাম, সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে থাকতে আমার কোনো অসুবিধা হবে না। এবার একটু বিব্রত হয়েই তিনি জানতে চাইলেন, আমি শুকনো খাবার, বোতলের পানি ইত্যাদি সঙ্গে এনেছি কিনা। নেতিবাচক জবাব শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললেন, মুশকিলে ফেললেন; এত রাতে খাবেন কী? এক রাত উপোস করতে কিংবা পিপাসার্ত থাকতে আপত্তি নেই শুনে আমার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে তার বোধহয় কিছুটা সন্দেহ হলো। খানিকটা চুপ থেকে আড়ষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি যদি আমাকে এক প্যাকেট বিস্কুট এবং এক বোতল পানি দেন, আমি গ্রহণ করব কিনা। কোনো কথা না বলে কৃতজ্ঞচিত্তে কেবল ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে পেরেছিলাম। আমাদের আলাপচারিতার মাঝখানেই হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় উদ্ধত এক কারারক্ষী উপস্থিত হয়ে প্রচণ্ড রুক্ষভাবে সঙ্গের ব্যাগে কী আছে জানতে চাইলে বৃথা বাক্যব্যয় না করে ব্যাগটি তার দিকে এগিয়ে দিলাম। ব্যাগের সব বস্তু মাটিতে নিক্ষেপ করা হলো। আপত্তিকর কিছু না পেয়ে লোকটির বিরক্তির পারদ কয়েকগুণ চড়ে গেল। এরপর আমার পরিধেয় বস্ত্র এবং আবৃত শরীর তার মনোযোগের বস্তুতে পরিণত হলো। অন্তর্বাসের ভেতরে লুকিয়ে মোবাইল ফোন এনেছি কিনা, জিজ্ঞাসা করেই অশালীনভাবে আমার ওপর-নিচ পরীক্ষা করা হলো। আল্লাহর কাছে তখন শুধু সবর করার শক্তি চাচ্ছি। ব্যাগের দ্রব্যাদি অবহেলায় মাটিতে ফেলে রেখেই কারারক্ষী চলে গেলে নিজেই সবকিছু কুড়িয়ে আবার ব্যাগে ভরলাম। জেল কর্মকর্তাটি লজ্জিত মুখে কেবল বলতে পারলেন, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আজ হয়তো এখানে একটা চরম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যেত। আমি যথাসম্ভব নির্বিকারভাবে বললাম, যতদূর জানি ডিভিশনপ্রাপ্ত আসামির শরীর স্পর্শ করতে পারেন কেবল জেলার নিজে। একজন কারারক্ষী আপনার সামনে এই আচরণের স্পর্ধা কেমন করে পেল? এই প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে ভদ্রলোক অপর একজন রক্ষীকে ডেকে আমাকে আমদানিতে নিয়ে যেতে বললেন। ব্যাগ হাতে যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়ালাম। দ্বিতীয় একটি বিশাল দরজা পেরিয়ে এবার কারাগারের মূল অংশে প্রবেশ করলাম। রাত তখন ৯টার কাছাকাছি। দু’দিনের ধকল এবং খানিক আগের অপমানে জেলের চারপাশ দেখার উত্সাহ তখন শূন্যে। কোনো কথা না বলে রোবটের মতো সঙ্গের রক্ষীটিকে অনুসরণ করে আমদানিতে পৌঁছানোর আগেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। মনে করলাম সৃষ্টিকর্তা বোধহয় সব গ্লানি ধুয়ে দেয়ার জন্যই তার রহমতের দ্বার আমার জন্য খুলে দিলেন। আল্লাহ্র কাছে শোকর জানিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম। আমদানিতে পৌঁছে দেখলাম, বেশ দীর্ঘ টানা একটি একতলা বিল্ডিং। সেখানকার প্রথম ঘরটি সুবেদারদের অফিস কক্ষ। বড় জেলগুলোয় দু’জন সুবেদার সচরাচর দায়িত্বে থাকেন। সুবেদার ফয়েজ এবং সুবেদার ফজলু দু’জনই উপস্থিত ছিলেন। জেলের প্রধান অফিসে যে ব্যবহার জেলে প্রবেশের পর পেয়ে এসেছি, তার তুলনায় এখানকার ব্যবহার যথেষ্ট ভদ্রজনোচিত। রাতে আমাকে যে অনাহারে থাকতে হবে, সেই সংবাদ দেখলাম এরই মধ্যে আমদানিতে পৌঁছে গেছে। সুবেদার ফয়েজ একটি ত্রিকোণাকৃতির বড় পাউরুটি দেখিয়ে জানালেন, সেটিই জেলখানার বেকারিতে তৈরি বিখ্যাত পেজগি রুটি। সেই রুটি এবং জেলেরই কোনো এক ভাণ্ডার থেকে জোগাড় করা দুই বোতল পানি দিয়ে রাতের আহারের ব্যবস্থা হলো। বৃষ্টি একটু ধরে এলে বিশাল দুই ছাতা সঙ্গে সুবেদার ফয়েজ আমাকে নিয়ে এগোলেন ঢাকা জেলে আমার বাসস্থানের দিকে। তখনও জানি না জেল কর্তৃপক্ষ আমার জন্য কী ধরনের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কাদাপানি পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই শুনলাম, আমরা সাত নম্বর সেলে যাচ্ছি। এর আগে শুনেছিলাম আমার মতো হাজতিদের ডিভিশন না দেয়া হলে হাসপাতালে রাখা হয়। আমি সম্ভবত জেল কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় সেই পর্যায়ভুক্তও নই। সুবেদার ফয়েজ জানালেন, সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরি হবে আমার আবাসস্থল। সেখানে তিনজন আসামি ছিল যাদের এক ঘণ্টার নোটিশে পাশের তিন এবং চার নম্বর কুঠুরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে আমাকে জায়গা করে দেয়ার জন্য। তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আজ রাতের মতো আগের স্থলেই থাকবে। সুবেদার ফয়েজ আমাকে আপাতত মানিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানালে নিঃশব্দে হাসা ছাড়া আর জবাব খুঁজে পাইনি।
সেলে পৌঁছে তালা খোলা হলে অপর্যাপ্ত আলোর মধ্যেই ভেতরে ঢুকে হাতের ব্যাগটি রাখলাম। সুবেদারকে আগেই গোসলের ব্যবস্থার অনুরোধ করেছিলাম। সেলের বারান্দার ঠিক নিচেই ড্রামে পানি তোলা ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে রাতের মতো নিজের সেলে ঢুকলাম। বাইরে থেকে প্রহরী তালা লাগিয়ে দিল। অর্থাত্ জেলের পরিভাষায় আমার লক-আপ সম্পন্ন হলো। পেজগি রুটির একাংশ ছিঁড়ে রাতের আহারের পাট সাঙ্গ করলাম। অন্য আসামির ব্যবহার করা মাটিতে বালিশ ছাড়া কম্বলের বিছানায় পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিতেই অনুভব করলাম, জেলজীবন সত্যিই শুরু হলো। স্ত্রীকে কতদিন রসিকতা করে বলেছি, অনেক কিছু দেখা হলেও জেলখানাটা এখনও দেখা হয়নি। প্রতিবারই রাগতকণ্ঠে পারভীন (স্ত্রীর ডাক নাম) বলতো, বাজে কথা বলো না তো, আল্লাহ কখন কোন কথা কবুল করেন, কে জানে! শুয়ে তো পড়লাম, কিন্তু নিদ্রাদেবী অধরা। সেই শৈশব থেকে ফেলে আসা জীবনের কত কথা মনে হতে লাগল। কোথায় যেন পড়েছিলাম, স্মৃতি সততই দুঃখের। দুঃখ তো দুঃখই। কিন্তু সুখের কথা মনে হলেও যে চোখ ভিজে আসে, সেই নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম অন্ধকার সেলের নোংরা মেঝেতে শুয়ে। কখন ঘুমিয়েছি জানি না। তবে ঘুম ভাঙল আজানের সুমধুর আওয়াজে। বিগত প্রায় কুড়ি বছর ধরে গুলশানে থাকি। সেখানে কষ্ট করে, কান পেতে আজানের শব্দ শুনতে হয়।
পুরনো ঢাকার চিত্র একেবারে আলাদা। চকবাজারের চারপাশের মসজিদগুলো থেকে আজানের সুরেলা ধ্বনি ভেসে আসছে। হঠাত্ মনে হলো যেন শৈশবে ফিরে গেছি। গেণ্ডারিয়ায় ধূপখোলা মাঠের পাশে থাকতাম। ওখানকার এক মসজিদের মুয়াজ্জিনের অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠ ছিল। মাঝে মাঝে আমার নানা ভোরবেলায় ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন সেই আজান শোনার জন্য। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথম রাত কাটানোর পর মনে হলো, আমি যে এখনও আল্লাহর রহমতবঞ্চিত হইনি, ভোরের আজানের ধ্বনি আমাকে সেই ভরসাই দিয়ে গেল।

টুকরো কাগজগুলো পাশের সেলের বাবুকে দিয়ে বললাম যদি আর না ফিরি এগুলো আমার স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দিও

ফজরের নামাজ শেষ করে সেলের চারদিকে ভালো করে তাকালাম। রাতে যখন এই ঘরে ব্যাগ হাতে ঢুকেছিলাম, তখন কোনো কিছু লক্ষ্য করার মতো শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল না। দৈর্ঘ্যে ১২/১৩ ফুট এবং প্রস্থে টেনেটুনে ৮ ফুটের সেল। থানার হাজতের মতোই কোণে প্রাতঃকৃত্যের স্থান। মেঝেতে দুটো কম্বলের বিছানা পাতা রয়েছে। মাথার কাছে প্লাস্টিকের শেলেফ কয়েকটি বই এবং অন্যান্য টুকিটাকি দ্রব্যাদি রক্ষিত আছে। এগুলো আমি এখানে আসার আগ পর্যন্ত অবস্থানকারী আসামিদের সম্পত্তি। সেলের দেয়ালে পেরেক পুঁতে ব্যাগ ঝোলানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাদে ফ্যান ঝুলছে এবং দুই সেলের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বাল্ব থেকেই উভয় সেলের বাসিন্দাদের যত্সামান্য বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা। এর মধ্যেই ৬টা বাজার ঘণ্টাধ্বনি শুনলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকালের শিফেটর কারারক্ষী এসে গারদের তালা খুলে দিল। লক-আপ খোলামাত্র দৌড় লাগালাম বাইরের গণটয়লেটে। রাতে কষ্ট হলেও সেলের মধ্যে ওই কাজটি করার রুচি হয়নি। বাইরের টয়লেটের অবস্থাও দেখলাম ভীতিকর। দুর্গন্ধের ধাক্কায় প্রথম চেষ্টায় পিছিয়ে এসে চৌবাচ্চা থেকে বালতিতে পানি নিয়ে আগে ভাসমান ময়লা পরিষ্কার করতে হলো। প্রাতঃকৃত্য শেষে সেই চৌবাচ্চার পাশে দাঁড়িয়েই গোসলও সারলাম। সকালে গোসল করা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এখানেও তার ব্যতিক্রম করলাম না। তবে ঈষদুষ্ণ পানি ব্যবহার করার বিলাসিতা ছাড়তে হলো। এর মধ্যে প্রতিবেশীরাও যার যার সেল থেকে দিনের মতো মুক্তি পেয়েছে। চারদিক থেকে আসা উত্সুক দৃষ্টিতে দ্রুত অভ্যস্ত হতে লাগলাম।
সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ আগের রাতের মতো পেজগি রুটি আর পানি দিয়ে সবে সকালের নাস্তার আয়োজন করছি আর তিন নম্বর কক্ষের একজন প্রতিবেশী এসে হাজির। ছেলেটির নাম বাবু, অস্ত্র মামলার আসামি। সরল-সাধারণ মানুষের সোজাসুজি প্রস্তাব। যতদিন ডিভিশন ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত না হচ্ছি, ওদের সঙ্গে তিনবেলা খেতে হবে এবং কোনো টাকা-পয়সা দেয়া চলবে না। জেলের কয়েদিদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান তারা কেবল সরকারি খাওয়ার ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে না। জেলে ক্যান্টিন রয়েছে যেখান থেকে তুলনামূলক উন্নত খাদ্য কিনে ক্ষুধা নিবারণ করছে অন্তত এক-চতুর্থাংশ বন্দি। বাকিদের যেহেতু কিনে খাওয়ার মতো অর্থ সংস্থান নেই, কাজেই অতীব নিম্নমানের সরকারি ডায়েটই একমাত্র ভরসা। সকালবেলার সরকারি বরাদ্দ হচ্ছে দু’খানা আধপোড়া ধুলোমাখা রুটি এবং খানিকটা আখের গুড়। আমি যতই বলি পেজগি রুটিতেই চলে যাবে, কিন্তু বাবু নাছোরবান্দা। শেষ পর্যন্ত এই আন্তরিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হলো। জেল ক্যান্টিন যাকে জেল পরিভাষায় পিসি বলা হয়, সেখান থেকে নাস্তা এলো ঘণ্টাখানেক পর। পরোটা, ভাজি এবং ডিমভাজা দিয়ে সকালের খাওয়াটা একেবারে মন্দ হলো না। বাবুর ঘরে চায়ের আয়োজনও রয়েছে। তবে ব্যাপারটা যে বেআইনি, সেটা পরে জেনেছিলাম। এর মধ্যে সারা জেলে আমার আগমনী বার্তা রটে গেছে। বিভিন্ন সেল থেকে বন্দিরা আসছে আমার সঙ্গে পরিচিত হতে। সাত নম্বর সেলে ছোটখাটো ভিড় জমে যেতেই কারারক্ষীরা উদ্বিগ্ন হয়ে আগত অতিথিদের জেলকোড ভঙ্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। জেলের ভেতরে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া এক সেল থেকে অন্য সেলে যাতায়াত নিষিদ্ধ থাকলেও কারারক্ষীদের সন্তুষ্ট করতে পারলে তারা সচরাচর চোখ বুজেই থাকে। কিন্তু, সঙ্গত কারণেই আমার ব্যাপারটা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। আগত কয়েদিদের সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে প্রশাসনের লোক এলো আমার ছবি তুলতে। নতুন আসামির বুকে নম্বর সেঁটে ছবি তোলা বাধ্যতামূলক। ‘একে ধরিয়ে দিন’ মার্কা ছবি আর কী! ছবি তোলার জন্য আমাকে জেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে যেতে হলো। জায়গাটি সাত নম্বর সেলের কাছেই। সেখানেও আমাকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড় জমে গেল। ছবি তুলিয়ে ফিরে আসতে না আসতেই জেল অফিস থেকে পেয়াদা এসে হাজির। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জেলগেটে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তেজগাঁও থানা থেকে আইও এসে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম, পেটানো শারীরিক গঠনের খর্বাকৃতির এক ব্যক্তি অপেক্ষমাণ। নাম জিজ্ঞেস করায় জানাল ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম। প্রথম দর্শনেই লোকটিকে অপছন্দ হলো। মিনিট পনেরোর বেশি জিজ্ঞাসাবাদ জমল না। আমাকে গ্রেফতারের সময় আমার দেশ কার্যালয়ে সাংবাদিক এবং শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে কারা উপস্থিত ছিল সেটাই প্রধানত তার জিজ্ঞাস্য। এসব ব্যক্তিকে পত্রিকা অফিসে আসার জন্য আমি ফোন করেছিলাম কি-না তাও জানতে চাইল। নেতিবাচক জবাব দিয়ে আমি পাল্টা জানতে চাইলাম, আদালতের কোনো পরোয়ানা ছাড়া কোন অধিকারে সেদিন এতজন পুলিশ আমার অফিসে হাজির হয়েছিল। আমার দেশ বন্ধ করার আইনগত ব্যাখ্যাও দাবি করলাম। ইন্সপেক্টর রেজার পক্ষে আমার একটি প্রশ্নের জবাব দেয়াও সম্ভব হলো না। সে স্বভাবতই বিরক্তবোধ করতে লাগল। আমি জোর দিয়ে বললাম, আমার প্রতিটি প্রশ্ন তার প্রতিবেদনে বিশদভাবে উল্লেখ করতে হবে। কেবল একতরফা জবাব লিখে কাজ সারলে চলবে না। বিব্রত হওয়াতে তার জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটার গতি বেড়ে গেল। সওয়াল-জবাব চলাকালেই আইও আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, এখানে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো পরিবেশ নেই। আর কোনো প্রশ্ন আছে কি-না, আমার এই প্রশ্নের জবাবে সে দু’দিকে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, জিজ্ঞাসাবাদ সমাপ্ত হয়েছে। আমিও কালক্ষেপণ না করে সাত নম্বর সেলের ফিরতি পথ ধরলাম।
জেলের তৃতীয় দিন ব্যারিস্টার নাসিমউদ্দিন অসীম এবং সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো। বন্দি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ব্যগ্র হয়ে জেলগেটে গেলাম। মা ও পারভীনের কুশল জানতে চাইলে ওরা বলল, সবাই ভালো আছেন। আমার স্ত্রী যে বাস্তবে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে সেটা সেদিন আমাকে আর কেউ জানায়নি। জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে ডিভিশন দেয়নি জেনে অসীম বিস্মিত হয়ে বলল, ওখান থেকে সরাসরি প্রেস ক্লাবে গিয়ে তারা সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের কথা জানাবেন। আমার পার্শ্ববর্তী সেলের বাসিন্দারা আমাকে চাঁদা তুলে দু’দিন ধরে তিনবেলা খাওয়াচ্ছে শুনে নোমানের বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে গেল। অলিউল্লাহ নোমানের কাছ থেকে জানলাম, জেলে আসার দিনই আমার নামে দশ হাজার টাকা পিসিতে জমা দেয়া হয়েছে। পিসি শব্দটি ইংরেজি Personal Cash (ব্যক্তিগত তহবিল)-এর ক্ষুদ্র প্রতিশব্দ। এখানে জমাকৃত টাকা দিয়ে জেল ক্যান্টিন থেকে কয়েদিরা পছন্দমত খাবার কিনে খেতে পারে। প্রায় তিনদিন পার হয়ে গেলেও টাকা জমার খবরটি জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। সরকার কতখানি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে, এরপর আর না বোঝার কারণ রইল না। হাইকোর্টে রিট করে যত শিগগির সম্ভব পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করে অসীমের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। সেদিনই বিকাল ৫টার দিকে সুবেদার ফজলু এসে সংবাদ দিল, জেল কর্তৃপক্ষ আমার ডিভিশনপ্রাপ্তি মঞ্জুর করেছে। আমি চাইলে তখনই সঙ্গে আনা ব্যাগ নিয়ে ডিভিশন ওয়ার্ড চম্পাকলি, যেটি ২৬ নম্বর সেল হিসেবেও পরিচিত, সেখানে যেতে পারি। প্রশাসনের এই হঠাত্ বদান্যতার কারণ যে অসীম এবং নোমানের জেলগেটে আগমন, সেটি বুঝতে আমার কোনো সমস্যা হলো না। কেন যেন মনে হলো আল্লাহ্ আমার পরীক্ষা চাইছেন। কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করে আমি জানি, আল্লাহ্র কাছে পরীক্ষা দেয়া বান্দার সাধ্যাতীত। তারপরও যে সরকার জেল কোডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একজন নাগরিককে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনটি দিন হেনস্তা করেছে, খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছে—তাদের ডিভিশন গ্রহণ করতে মন চাইল না। সাধারণ কয়েদিদের মতো কষ্টকর কারাজীবনে অভ্যস্ত হয়েই নৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদী প্রশাসনকে পরাজিত করার তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম। উপস্থিত বন্দি, কারারক্ষী, নির্বিশেষে সবাইকে অবাক করে আমি ডিভিশন প্রত্যাখ্যান করলাম। সারা জেলে হৈচৈ পড়ে গেল। ডিভিশনপ্রাপ্তির জন্য এখানে কত আকাঙ্ক্ষা, কত হা-হুতাশ। এমন অবাক করা কাণ্ড কারা প্রশাসন জন্মে দেখেনি। স্বয়ং জেলার ছুটে এসে তিনদিন ডিভিশন না দেয়ার সপক্ষে নানারকম দুর্বল যুক্তি দিতে লাগল। আমি অনড় রইলাম। এরপর প্রচ্ছন্ন হুমকি। বলা হলো, সরকারের বদান্যতার অসম্মান করলে আমাকে আর আইনজীবীদের সঙ্গে জেলগেটে সাক্ষাত্ করতে দেয়া হবে না। আমি ওকালতনামাতেও সই করতে পারব না। কাজেই আমার মামলা লড়াও সম্ভব হবে না। জেলার মোখলেসুর রহমান আমার মতো চিজের পাল্লায় আগে কখনও পড়েননি। কঠিনভাবে তাকে বলে দিলাম, যে হুমকি তিনি দিচ্ছেন তার একটিও করার ক্ষমতা তার নেই। তর্কাতর্কির মধ্যেই শেষ পর্যন্ত একটা রফা হলো। আমি ডিভিশন ওয়ার্ডে যাব না। তার পরিবর্তে আমার সাত নম্বর সেলের সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠেই একটি চৌকি ও চেয়ার-টেবিল দেয়া হবে। ভূমি শয্যা থেকে চৌকিতে উত্তরণ ঘটল গ্রেফতারের তিনদিন পর।
আরও দু’দিন কাটল। এর মধ্যে সরকার তিনটি নতুন মামলা দায়ের করেছে। সাতাশটি মামলার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে জুনের ২ তারিখ ভোর রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানা হাজতে প্রবেশ করেছিলাম। ৭ তারিখের মধ্যে মামলার সংখ্যা দাঁড়াল একত্রিশে। কোতোয়ালি থানা পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার মামলা দায়ের করা হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে সিএমএম আদালতে আমাকে আনার দিনে আদালত এলাকায় জনগণের প্রতিবাদের অপরাধে। সেদিন আদালত চত্বরে যখন প্রচণ্ড বিক্ষোভ চলছিল, আমি তখন শত শত পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় প্রিজন ভ্যানে আটকাবস্থায় ছিলাম। বিক্ষোভের খবরও আমার জানা ছিল না। অথচ আমিই নাকি এই মামলার এক নম্বর আসামি। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী আমার উস্কানিতেই হাজারের ওপর আইনজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, সাধারণ নাগরিক সেখানে জমায়েত হয়েছিল। অভিযোগ সত্য হলে সাধারণ জ্ঞান বলে, আমাকে পাহারারত পুলিশও সমভাবে অপরাধী। তাদের সংশ্রব ও সহযোগিতা ছাড়া বন্দি অবস্থায় আমার পক্ষে লোক জমায়েত এবং তাদের উস্কানি দেয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের কথিত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রশাসনের এই উপহাসে আমি চমত্কৃত হলেও বিচারকরা নির্বিকার। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মামলা তুলনামূলকভাবে অনেক গুরুতর। উত্তরা থানায় ইসলামী জঙ্গিত্বের অভিযোগে এবং বিমানবন্দর থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের হয়েছে। সবক’টি মামলাতেই সেই অতিচেনা শোন অ্যারেস্ট (Shown Arrest)| শেখ হাসিনার এবারের শাসনকালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের শায়েস্তা করার জন্য শোন অ্যারেস্ট নামক আইনের যথেচ্ছ অপব্যবহার চলছে। যে কোনো নাগরিককে একটি বানোয়াট মামলায় গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে এন্তার মামলা দায়েরের মাধ্যমে শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে বিনা বিচারে সুদীর্ঘকাল আটক রাখার নয়া পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দেশে পুরনো কালো আইন নামে পরিচিত বিশেষ ক্ষমতা আইনের আর প্রয়োজন হচ্ছে না। গত দুই বছরে নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সপক্ষে আমার দেশ জোরালো অবস্থান নিয়ে ক্রসফায়ার, গুম-খুন, শোন অ্যারেস্ট, রিমান্ডের নামে ভয়াবহ নির্যাতন এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু সম্পর্কিত সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দূরের এবং কাছের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আজ্ঞাবহ সরকার মানবাধিকারের পক্ষে আমার দেশ-এর নৈতিক অবস্থানকে সহ্য করতে পারেনি। জনগণ তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠলে যে কোনো স্বৈরাচারী সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। আমার সম্পাদনায় আমার দেশ স্বাধীনতার কথা বলেছে, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য জনমত তৈরির যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। এই ‘অপরাধের’ জন্য হয়তো আমাকে চরম মূল্যই দিতে হবে। খবর পেলাম, নতুন তিনটি মামলাসহ তেজগাঁও থানার পুরনো মামলাতেও সরকার নতুন করে রিমান্ড প্রার্থনা করেছে। ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম কেন বলেছিল জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের পরিবেশ নেই, তাও এবার বুঝতে পারলাম। সব মামলারই রিমান্ড শুনানির জন্য সিএমএম আদালত ৭ জুন দিন ধার্য করেছে। দেখতে দেখতে সাত তারিখ এসে গেল। আজ আদালতে যেতে হবে। এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মুন্সী কবির জেলগেটে এসে জানিয়ে গেছে, সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মতো দেশবরেণ্য আইনজীবী অনেকটা প্রথাবিরুদ্ধভাবে নিম্ন আদালতে আমার পক্ষে মামলা লড়তে আসবেন। এ আমার জন্য এক বিরাট সম্মান হলেও কাজের কাজ যে কিছুই হবে না সে বিষয়ে কোনোরকম সন্দেহ পোষণ করছিলাম না। নিম্ন আদালতে রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে সেটা সবারই জানা। সাত তারিখে সিএমএম আদালত থেকে সরাসরি রিমান্ডে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। আমার মনে ক্রমেই দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে যাচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী আমার প্রাণহীন দেহটাকেই কেবল মা এবং স্ত্রীর কাছে ফেরত পাঠাতে চান। গ্রেফতার হওয়া থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ঘটনাবলী সংক্ষিপ্ত আকারে টুকরো কাগজে লিখে রেখেছিলাম। কোর্টে যাওয়ার আগে পাশের সেলের বাবুর হাতে সেই টুকরো কাগজগুলো দিয়ে অনুরোধ করলাম, যদি আর না ফিরি তাহলে কাগজগুলো যেন আমার স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। লেখার মধ্যে আমার জীবনের শেষ ক’দিনের স্মৃতিটা অন্তত তার বাকি জীবনের বাঁচার অবলম্বন হতে পারে। সন্ত্রাসের অভিযোগে আটক ছেলেটি আমার দু’হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বাবু সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমরা দু’জনই বাইরে থাকলে এই ছেলেই হয়তো দলের নেতা-নেত্রীর নির্দেশে আমার গাড়িতে বোমা হামলা চালাবে। অথচ জেলের ভেতরে মাত্র ক’দিনেই কত আপন হয়ে উঠেছে। এজন্যই মানুষ আশরাফুল মখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব।
সকাল ১০টায় জেল থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কোর্ট গারদে। বাহন সেই প্রিজন ভ্যান। এর আগে কোর্ট গারদ চত্বর পর্যন্ত এসেছিলাম। সেদিন আমাকে প্রিজন ভ্যানের ভেতরেই ঘণ্টাখানেক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। আজ সরাসরি গারদে। নোংরা, দুর্গন্ধময় গারদে আমাকে ঢুকিয়েই তালা মেরে দেয়া হলো। ঢাকা সিএমএম আদালতে সেই গারদখানার দু’পাশে চারটি হাজত রয়েছে। আমাকে রাখা হলো পূর্বদিকের শেষ সেলটায়। বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। বসতে হলে কফ, পানি এবং অন্যান্য মনুষ্য বর্জ্যময় মেঝেই একমাত্র স্থান। ওরকম জায়গায় বসতে তখন পর্যন্ত অভ্যস্ত হতে পারিনি। শুরু করলাম পায়চারি। প্রথমে ধীরে, তারপর দ্রুত এবং সবশেষে অতি দ্রুত। অনেকটা ঘোরলাগা মানুষের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেই চলেছি। চুল, কপাল বেয়ে অবিরত ধারায় ঘাম ঝরছে। দুপুর ২টার দিকে এক দঙ্গল পুলিশ এসে হাজতের দরজা খুলল। ততক্ষণে আমার ঘামে ভেজা, রুক্ষ, পরিশ্রান্ত চেহারা ভীতিকর রূপ নিয়েছে। জানানো হলো, মহামান্য ম্যাজিস্ট্রেট এজলাসে উঠেছেন। আমার মামলার শুনানির সময় হয়েছে। হাজত থেকে সামনের চত্বরে নেমে দেখি অসংখ্য পুলিশ চত্বর ভরে ফেলেছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা হাত ধরতে এলে রূঢ় কণ্ঠে আমাকে স্পর্শ না করতে নির্দেশ দিলাম। তারা থমকে পিছিয়ে গেল। শুরু হলো আদালত পানে সম্মিলিত পদযাত্রা।

এমন বেইনসাফিতে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার কথা

কড়া পুলিশ পাহারায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালাম। খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রাজ্জাক, সানাউল্লাহ মিঞাসহ আমার পক্ষে প্রায় একশ’ আইনজীবী। সরকারপক্ষেও তাবত্ পিপিসহ আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের ছড়াছড়ি। পেশাজীবী আন্দোলনে আমার সহযোগীরাও আদালতে সহমর্মিতা জানাতে এসেছেন। কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত, কপালে নিয়মিত নামাজ পড়ার গাঢ় চিহ্নযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখলে যে কেউ তাকে কট্টর মৌলবাদীর তালিকায় ফেলে দেবেন। আমার পক্ষভুক্ত ঢাকা বারের একজন আইনজীবী অবশ্য অনুচ্চ কণ্ঠে আমাকে চেহারা দেখে বিভ্রান্ত না হতে পরামর্শ দিলেন। আদালতপাড়ায় নাকি এই ম্যাজিস্ট্রেট নির্ভেজাল সরকারপন্থী হিসেবে সবিশেষ পরিচিত। সরকারপক্ষ তাদের বক্তব্য শুরু করলেন। তেজগাঁও থানার যে মামলায় আমাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, সেই মামলাতেই সরকার নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করল। সরকারপক্ষের উকিল তেজগাঁও থানার আইও রেজাউল করিমের ঢাকা জেলগেটে তিন দিন আগে করা মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে বললেন, আমাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন এবং জেলগেটে সেই বিশেষ পদ্ধতির জিজ্ঞাসাবাদের (পড়ুন নির্যাতন) পরিবেশ নেই। পিপি আরও অভিযোগ করলেন, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমি যেহেতু প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক ভাষা প্রয়োগ করেছি, কাজেই আমার শক্তির উত্স খুঁজে বের করার জন্যও থানা হেফাজতে রিমান্ড আবশ্যক। সরকারপক্ষের বক্তব্য শেষ হলে একে একে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, এ জে মোহাম্মদ আলী এবং সানাউল্লাহ মিঞা উঠে দাঁড়িয়ে রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করলেন। ঢাকা বারের সভাপতি সানাউল্লাহ মিঞার বক্তব্য প্রদানের সময় সরকারপক্ষ বার বার বাধা সৃষ্টি করায় আদালতের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকসুলভ আত্মসংযম হারালেন এবং অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞার বক্তব্যের মাঝেই সবাইকে চমকে একেবারে হুঙ্কার দিয়ে সজোরে টেবিল চাপড়ে উঠলেন। এই অসৌজন্যমূলক আচরণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো কোর্ট স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। এই অপমান কেবল ঢাকা বারের সভাপতির একার নয়, আজ ঘটনাক্রমে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও নিম্ন আদালতে উপস্থিত। বেঞ্চের এই অপ্রত্যাশিত আচরণ ঢাকা বারে আগে কোনোদিন পরিলক্ষিত হয়নি। বিস্ময় কাটিয়ে শতাধিক আইনজীবী ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। আদালতের অনভিপ্রেত ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে বিচারকার্য অব্যাহত রাখা সম্ভবপর হলো না। হট্টগোলের খবর ততক্ষণে সিএমএম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সিএমএম এ কে এনামুল হক তার এজলাস থেকে ছুটে এসে ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তালুকদারের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিচারক বিব্রতবোধ করে শুনানি অসমাপ্ত রেখেই এজলাস ত্যাগ করলেন।
আমার পরবর্তী গন্তব্য ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালত। এখানে বাদী কোতোয়ালি থানা। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আমার বিরুদ্ধে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার যে অবিশ্বাস্য ধরনের বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে, তারই রিমান্ড শুনানির জন্য সদলবলে সেই আদালতে যাওয়া হলো। আমি নিশ্চিত ছিলাম, অন্তত এই মামলাটি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কেবল খারিজই করবেন না, আদালতের সময় নষ্ট করার জন্য সরকারপক্ষকে তিরস্কারও করবেন। ভুলে গিয়েছিলাম এটা বাংলাদেশ এবং মইন-ফখরুদ্দীন তাদের শাসনামলে দেশবাসীকে ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থা’ উপহার দিয়ে গেছেন। আমরা তো বটেই, এমনকি সরকারি পিপিকে পর্যন্ত হতবাক করে ম্যাজিস্ট্রেট একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন। শুনানির প্রহসন সমাপ্ত করে আমাকে কোর্ট গারদে ফিরিয়ে আনা হলো। সারাদিনের অনাহারে, পরিশ্রমে, পানিশূন্যতায় তখন শরীরে আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। যে নোংরা মেঝেতে বসার রুচি না হওয়ায় সকাল থেকে তিন ঘণ্টা অবিরত পায়চারি করে কাটিয়েছি, সেখানেই বসে পড়লাম। ৫টা বাজলো। পুলিশ এসে জানাল, যে মামলায় ঘণ্টা দুয়েক আগে আদালত বিব্রতবোধ করেছিল, সেই মামলায় নতুন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পুনঃশুনানি হবে। অতএব আবার শ’খানেক পুলিশ নিয়ে আদালত অভিমুখে মার্চ করলাম। সেখানে পৌঁছে আমি হতবাক। আমার পক্ষের কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত নেই। ঘর ভর্তি করে রেখেছে সরকারি পিপি এবং আওয়ামীপন্থী উকিলের বহর। কী ঘটছে, তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উঠে জানালেন, আমার পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীদের উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় তারা সময় প্রার্থনা করেছিলেন এবং তাদের সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আদালতের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমার পক্ষের আইনজীবীরা সদলবলে শুনানি বর্জন করেছেন। এখন আমি চাইলে নিজেই যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করতে পারি। নইলে নিরুপায় হয়ে আদালতকে একতরফা শুনেই রায় দিতে হবে। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই নানা রকম অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে মন্তব্য করছিলেন, আমি এতই মন্দ প্রকৃতির যে আমার মামলা লড়ার জন্যে কোনো আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্য থেকেই একজন রসিকতা করে প্রস্তাব করলেন, তিনি আমাকে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করতে করুণাবশত সম্মত আছেন। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বললাম, এ অন্যায়, এর নাম বিচার হতে পারে না। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। দেশে ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে। অন্তত পরদিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখার আবেদন করলাম। ম্যাজিস্ট্রেট তার অপারগতা জানিয়ে সরকারপক্ষকে তাদের যুক্তি-তর্ক পেশের নির্দেশ দিলেন। আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। সরকারি উকিলের পর উকিল হাত-পা নেড়ে কী বলে যাচ্ছিলেন, তার এক বর্ণ কানে ঢোকেনি। তাদের বাগ্মিতা কখন শেষ হয়েছে, তাও বলতে পারব না। চমক ভাঙল ম্যাজিস্ট্রেটের কথায়। স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, আমার কিছু বলার আছে কি-না। ইচ্ছা হলে আমি সরকারপক্ষের অভিযোগ খণ্ডন করে বক্তব্য দিতে পারি। তিনি আরও মন্তব্য করলেন, আমিও তো লেখাপড়া জানি; সুতরাং আইনজীবী না থাকলেও চলবে। হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আমি কেবল বললাম, আইনজীবী নিয়োগ আমার সাংবিধানিক অধিকার এবং আমার আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য চলতে পারে না। বিচারের নামে এই একতরফা শুনানি ভবিষ্যতের জন্য অতি মন্দ নজির হয়ে থাকবে। কে শোনে কার কথা! ম্যাজিস্ট্রেট তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এজলাস ত্যাগ করলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, রিমান্ডের সিদ্ধান্ত নেয়াই ছিল, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ঘোষণা করা হলো মাত্র। সিএমএম আদালতের নিচে নেমে দেখি, পিপি গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমের কাছে বীরদর্পে তাদের বিজয়বার্তা বয়ান করছে। গ্রেফতার হওয়ার পর সাত দিনে পদে পদে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। কিন্তু আজকের মতো হতাশ ও বিমর্ষ আর কখনও বোধ করিনি। পাঠক ভাববেন না রিমান্ডের কারণে আমার এই হতাশা। আমি শুধু ভাবছিলাম বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে। আমার যদি এমন হাল হয়ে থাকে, তাহলে এদেশের দরিদ্র, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো বেঁচে আছে কেমন করে? এমন বেইনসাফিতে তো আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার কথা। কোর্ট গারদে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা ৬টা পেরিয়ে গেল। শেষতক কোর্ট পুলিশ এসে গারদের তালা খুলে দিলে জিজ্ঞেস করলাম, কোন থানা থেকে রিমান্ড শুরু হচ্ছে। জবাব শুনে খানিকটা অবাকই হলাম। আমার আয়ু একদিন বাড়ানো হয়েছে। অর্থাত্ আজ রাতের মতো জেলখানায় ফেরত যাচ্ছি। কাল আরও দু’টি মামলায় রিমান্ড শুনানি রয়েছে। সেগুলো শেষ করে তারপর থানায় নিয়ে ধোলাই শুরু হবে। সাত নম্বর সেলে ফিরে দেখি, আমার প্রতিবেশীরা মন খারাপ করে বসে আছে। রেডিও মারফত রিমান্ডের খবর তারা আগেই পেয়েছে। বাবুর কাছে যে কাগজের টুকরোগুলো পারভীনকে পৌঁছে দেয়ার জন্য গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলাম, সেগুলো আর ফেরত নিলাম না। চৌবাচ্চার ধারে দাঁড়িয়ে গোসল করেই সেলে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। সারাদিন কিছু খাইনি, তারপরও ক্ষিদে নেই। বাবু এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলো। ওটুকুই রাতের আহার। সারারাত না ঘুমিয়ে ৫৭ বছরের দীর্ঘ জীবনের ডেবিট-ক্রেডিট মেলানোর চেষ্টা করলাম।
প্রায় নির্ঘুম রাতের সব চিন্তা প্রধানত আমার প্রিয়জনদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তাদের প্রতি কৃত সমুদয় অবিচারের স্মৃতি আরও একবার জীবন্ত হয়ে ধিক্কারে ধিক্কারে আমাকে নিজের কাছেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তুলল। ক্ষমা চাওয়ারও তো আর সুযোগ রইল না। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে স্বজন হয়ে ওঠা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ৮ জুন সকালে বিদায় নিলাম। রিমান্ডের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর সর্বাঙ্গের ক্ষতচিহ্নে বহন করছে, এমন দু’জন কয়েদি সকাল থেকে চুপচাপ আমার সেলে এসে বসে রইল। তাদের দু’চোখে সারাক্ষণ অশ্রু টলমল করছিল। সেদিন কোর্ট থেকে আমাকে যে সরাসরি রিমান্ডে নেয়া হবে, সে সম্পর্কে নিঃসন্দেহই ছিলাম। তবে কোথা থেকে জানি না, এক রাতের মধ্যে যথেষ্ট মানসিক শক্তি অর্জন করে ফেলেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রিমান্ডে আমাকে শেষ করে দেয়ার ব্যাপারে কেন জানি না একরকম নিশ্চিত হয়েই কোর্টের উদ্দেশে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড, এক প্রকার গর্ববোধ মৃত্যুভয়কে বার বার অতিক্রম করে যাচ্ছিল। এই সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের কুিসত চেহারা আমাকে হত্যার মধ্য দিয়ে জাতির সামনে উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা আমার ৫৭ বছরের অকিঞ্চিত্কর জীবনকে নিজের কাছেই এক ভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তুলছিল। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমিই সর্বপ্রথম লেখা এবং বক্তব্যের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের সিলমোহর তাদের কপালে সেঁটে দিয়েছিলাম। ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী দেড় বছরে অবশ্য ফরহাদ মজহার, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখও এই বিশেষণটি একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য দিনের মতোই দুপুর ২টার পর আমাকে কাঠগড়ায় তোলা হলো। জনাকীর্ণ আদালতে ইসলামী জঙ্গিত্বের মামলায় আমার সপক্ষে আমি নিজেই বক্তব্য দিলাম। বললাম, হিযবুত তাহিররের সঙ্গে আমাকে জড়ানোর অপচেষ্টা কেবল নির্জলা মিথ্যাই নয়, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সব কণ্ঠ নানা কৌশলে রোধ করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত সত্যের বিজয়ই সাধিত হয়। আমার ক্ষেত্রেও ইনশাআল্লাহ এর অন্যথা হবে না। মিনিট পাঁচেক বক্তব্য না দিতেই পিপি বাহিনী এবং আওয়ামী আইনজীবী গোষ্ঠী সমস্বরে চিত্কার করে আমার কথা বলায় বাধা দিতে লাগল। শেষ যে কথাটি বলতে পেরেছিলাম তা হলো, আমাকে হত্যা করা যাবে; কিন্তু জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমার ঈমানের শক্তিকে দুর্বল করা যাবে না। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আমি কথা না বলে সপক্ষের আইনজীবীদের শুনানি করতে দিতে সম্মত হলাম। সানাউল্লাহ মিঞা, মাসুদ তালুকদারসহ আরও কয়েকজনের যুক্তি-তর্ক পেশ শেষে মামলার রায় শুনে এই বৈরী পরিবেশে, এত হতাশার মধ্যেও হেসে ফেললাম। উভয় মামলায় চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন তরুণ সেই ম্যাজিস্ট্রেট। রসিকতা করে ঢাকা বারের সভাপতি সানাউল্লাহ মিঞাকে বললাম, আমার আর আপনার মধ্যে আজ থেকে পেশাগত কোনো পার্থক্য নেই। আমি শুনানি করলে চার দিন রিমান্ড, আপনি করলেও তা-ই। আমি কেবল ভাবছিলাম, যারা অতিশয় গম্ভীর চেহারা নিয়ে তরুণ বয়সেই নিম্ন আদালতে বিচারকের চেয়ারে বসেন, তাদের কি এই জীবন ভালো লাগে? আমি তো জানতাম তারুণ্য সততা ও বিদ্রোহের প্রতীক।
চার পৃথক মামলায় সর্বমোট বারো দিনের রিমান্ডের বোঝা মাথায় নিয়ে কোর্ট গারদে ফিরে এলাম। সামনে অনিশ্চিত সময়। লড়াইয়ের ময়দানে আমি একা, নিঃসঙ্গ। মা আর স্ত্রীর চেহারা সামনে ভেসে উঠল। ছাব্বিশ বছরের সংসার জীবনের কত টুকরো স্মৃতি আনন্দ-বেদনার কাব্য হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে মনের গহিনে। আর কি তাদের সঙ্গে দেখা হবে জীবনে, নাকি এই শেষ! বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আমার দুঃখিনী মা আমাকে নিয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন। স্কুলে থাকতে বিয়ে হয়েছিল। একমাত্র পুত্রকে বুকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত থেকেছেন। ছেলেকে বুয়েটে পড়িয়েছেন। মনে পড়ছিল, আমার কলেজ শিক্ষয়িত্রী মা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় সেই দাউদকান্দির কর্মস্থল থেকে সে সময় দুষ্প্রাপ্য এক টিন কেরোসিন বাসে এবং রিকশায় করে ঢাকা শহরে বয়ে নিয়ে এসেছেন। রাজধানীতে তখন কেরোসিন দুষ্প্রাপ্য। রান্না করে ছেলের মুখে ভাত তুলে দেয়ার জন্যে একজন মহিলাকে অত দূর থেকে কেরোসিনের টিন ঘাড়ে করে আনতে হয়েছে। সেই একই নারী জীবন সায়াহ্নে এসে দেখছেন—তার পুত্র রাষ্ট্রের একমাত্র হর্তাকর্তা, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশের লক্ষ্য হয়ে বিনা অপরাধে রিমান্ডে নির্যাতনের মুখোমুখি। অপরদিকে সর্বংসহা, নিঃসঙ্গ স্ত্রী জায়নামাজকে আশ্রয় করে দিন-রাতের অধিকাংশ সময় সেখানেই অশ্রুজলে ভাসছে। সদ্য তরুণী মেয়েটি বিত্তহীন স্বামীর হাত ধরে বিত্তবান পিতার বিপুল বিত্ত-বৈভব ছেড়ে সংসার সমুদ্রে কিস্তি ভাসিয়েছিল প্রায় আড়াই দশক আগে। আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম শিকারে পরিণত সেই স্বামীকে আর কোনোদিন ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কায় তার হৃদয়ভাঙা হাহাকারের তীব্রতা পাশে উপস্থিত না থেকেও যেন স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছি। শোকাতুর দুই প্রবীণা ও মধ্যবয়সিনী নারীকে আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছিলাম। পুলিশের বুটের আওয়াজ আর গারদের তালা খোলার শব্দে চোখ খুললাম। কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেলাম প্রিজন ভ্যানের দিকে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা পাশ থেকে বললেন, প্রথম দিনের রিমান্ড কোতোয়ালি থানায়। আমার কাছে এই তথ্য একেবারেই অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়। জবাইয়ের পূর্বরাতে শিকারকে কোথায়, কেমন রাখল তা জেনে কী লাভ? ভ্যানের ভেতরে ঢুকতেই পেছনের দরজা সশব্দে বন্ধ করে তালা দিয়ে দু’জন অস্ত্রধারী পুলিশ অবস্থান নিল পাদানির সামনের একচিলতে জায়গায়। প্রিজন ভ্যানের ইঞ্জিন শব্দ করে জানান দিল, আসামির যাত্রা এবার রিমান্ড জীবনের অভিমুখে।

রিমান্ডের বিভীষিকা

কোতোয়ালি থানায় যখন পৌঁছলাম, সূর্য তখনও পুরোপুরি অস্ত যায়নি। সিএমএম আদালত থেকে স্বল্প দূরত্বের থানায় যাওয়ার পথে রিমান্ডের আসন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তার পরিবর্তে পথ-ঘাট ঠাহর করতেই অধিকতর মনোযোগী ছিলাম। বাল্যকাল কেটেছে পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়ায়। সে সময় নানার সঙ্গে প্রায়ই সদরঘাটের আড়ত থেকে ফল এবং পাটুয়াটুলির এক বোম্বাই মিষ্টান্নের দোকান থেকে অতীব সুস্বাদু মিষ্টি কিনতে আসতাম। প্রিজন ভ্যানের ভেতর থেকে মনে হলো, যেন বাল্যের সেই চেনা জায়গাগুলোই অতিক্রম করছি। কাছাকাছি মায়া নামে এক সিনেমা হলও ছিল। আমার নানা সিনেমা দেখা অপছন্দ করলেও নানীর শখ ছিল ষোলআনাই। অতি শৈশবে নানা ছাড়া পরিবারের আর সবাই একসঙ্গে মায়া হলে যে সিনেমা দেখতে এসেছিলাম, সেই স্মৃতিও এতদিন পর মনে এলো। ছবিটার নায়ক ছিলেন সম্ভবত দিলীপ কুমার। নস্টালজিয়ায় ডুব দিয়ে বেশিক্ষণ থাকা গেল না।
প্রিজন ভ্যান ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে থেমে গেছে। ভ্যানের তালা খোলা হলো। এক তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা এগিয়ে এসে বললেন, তিনিই কোতোয়ালি থানার দায়ের করা মামলার আইও। যথেষ্ট সম্ভ্রমের সঙ্গে নিয়ে গেলেন থানার সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে। চা এবং বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত হলাম। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি চাইলে সেই অনুরোধও রক্ষিত হলো। একে একে সেকেন্ড অফিসার এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেই কক্ষে এসে যথেষ্ট সৌজন্যের সঙ্গে পরিচয়পর্ব সাঙ্গ করলেন। দু’জনারই দেশের বাড়ি কাকতালীয়ভাবে গোপালগঞ্জে। নাম যথাক্রমে আতাউর এবং সালাহ্উদ্দিন। রাতে কী খেতে চাই, তাও সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো। সকাল থেকে পেটে তেমন কিছু না পড়লেও আমি চা ছাড়া আর কিছু খেতে চাইলাম না। আমাকে ভরসা দিয়ে জানানো হলো, সেকেন্ড অফিসারের কক্ষেই রাতযাপন এবং পরদিন রিমান্ডের আনুষ্ঠানিকতা অন্তে যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুনরায় হাজির করানো হবে। মামলা যে লজ্জাকরভাবে বানোয়াট, সেটা যেহেতু উভয় পক্ষেরই জানা ছিল, কাজেই জিজ্ঞাসাবাদ নামক বিষয়টি এই প্রাথমিক আলোচনায় কোনো স্থানই পেল না।
ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন দেখতে পেলাম। শুনলাম থানা কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট সদ্দিচ্ছা (?) সত্ত্বেও আমাকে সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে আর রাখা যাচ্ছে না। উপরের নির্দেশে হাজতে তখনই স্থানান্তর করতে হবে। আমিও তথাস্তু বলে আইও’র পেছন পেছন কোতোয়ালি থানার হাজতে প্রবেশ করলাম। ক্যান্টনমেন্ট থানা এবং কোর্ট গারদে দেখা হাজতের তুলনায় সেলটি বেশ ছোট। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। হাজতে ঢুকে দেখলাম, আমি তখন পর্যন্ত সেখানে একমাত্র আসামি। কাজেই ভাবলাম, একজন মানুষের জন্য এটিও প্রকাণ্ড সেল। এশার নামাজ হাজতে পড়লাম, মাগরিবের নামাজ আগেই সেকেন্ড অফিসারের অফিস ঘরে পড়ে নিয়েছিলাম। থানা প্রশাসনের প্রকৃত চরিত্র তখনও চেনা হয়ে ওঠেনি।
রাত আটটার পর থেকে পরিস্থিতি আরও পাল্টাতে শুরু করলো। হাজতে তিনজন নতুন আসামি ঢোকানো হলো। তাদের মধ্যে একজন ডাণ্ডাবেড়ি পরিহিত। সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখেই তিনজন বসলো। খানিকটা ভড়কে গেলেও ভাবলাম, এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে গল্প-গুজব করলেই বরং রাতটা ভালো কাটবে। ডাণ্ডাবেড়ি পরা ছেলেটিকেই নেতা মনে হলো। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, তাকে ডাকাতি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে একবার রিমান্ড পর্ব সাঙ্গ করা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড। সপ্তাহখানেক আগের রিমান্ডের চিহ্ন ফোলা হাঁটু এবং দুই হাতের কনুইয়ে দৃশ্যমান। পরে অবশ্য থানার লোকজনই জানিয়েছিল সে নাকি রাজধানীর একজন দুর্ধর্ষ, পেশাদার খুনি। ক’দিন আগে পুরনো ঢাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যায় তাকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। ওরকম রোগা-পটকা, তিরিশের ঘরে পা না দেয়া যুবককে দুর্ধর্ষ খুনি হিসেবে কল্পনা করা কঠিন। অবশ্য গুলি চালানোর জন্যে তো আর গামা পাহলোয়ান হওয়ার দরকার নেই।
সারা রাত ধরে এই ছেলেটি আমাকে ওই নারকীয় পরিবেশে যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে সেই বর্ণনায় পরে আসছি। রাত দশটায় পুনরায় গারদের তালা খোলা হলো। এবার যে পাঁচজন আসামি টলতে টলতে ঢুকলো তাদের পরনে শতছিন্ন, নোংরা, দুর্গন্ধময় পোশাক। শরীরে হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। অসংলগ্ন আচরণ করতে করতে প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর বসে পড়লো তারা। গাঁজা, সিগারেট এবং অপরিচ্ছন্ন শরীরের দুর্গন্ধে নিমেষে হাজতের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। কথিত খুনি ছেলেটি দেখলাম এদের চেনে। ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থাতেই উঠে এসে ঠেলে, ধাক্কিয়ে আমার কাছ থেকে যতটা দূরে সম্ভব দলটিকে সরিয়ে দিল। তারপর হাসতে হাসতে জানালো, এরা সবাই হেরোইনসেবী। সদরঘাট, ইসলামপুর এলাকার দোকানের বারান্দা এদের নিবাস। ওদের পুলিশ কেন ধরে এনেছে, জিজ্ঞাসা করতেই সমস্বরে যা বললো তার মর্মার্থ উদ্ধার করা কঠিন। যতটুকু বুঝলাম, তাতে আমার সন্দেহ জন্মালো—আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবেই এই মাদকাসক্তদের হাজতে আগমন। কাল সকালে হয় থানা থেকেই ছেড়ে দেবে অথবা তিন ধারায় চালান দিয়ে আদালতে কয়েকশ’ টাকা জরিমানা করা হবে। টাকাটা তাত্ক্ষণিকভাবে দিতে পারলে সিএমএম কোর্ট থেকেই মুক্তি, নইলে সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের জেলবাস। এর মধ্যেই রাতের আহার চলে এলো। একই থালার মধ্যে ভাত, ডাল এবং সবজি জাতীয় একটা কিছু। নেশাখোরদের ভাত খাওয়ার দৃশ্য দেখে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হলো। ডাল মেশানো ভাত মুখে, শরীরে, মেঝেতে সর্বত্র। কেউ কেউ খাচ্ছে এবং ঝিমুচ্ছে। চিবুতে ভুলে গেছে। একজন দেখলাম, খাওয়া অসমাপ্ত রেখে এঁটো হাতেই হাজতের টয়লেট ঘুরে এসে নির্বিকারভাবে আবার ভাতের থালায় হাত ডুবালো। নারকীয় দৃশ্য। আমার ভেতর থেকে সবকিছু উঠে আসতে চাচ্ছে। নেহাত উঠে আসার মতো পেটে কিছু ছিল না। ডাণ্ডাবেড়ির জন্যে বাসা থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে উন্নত খাদ্য এলো। ছেলেটি আমাকে অনুরোধ করলো তার খাওয়ায় ভাগ বসাতে। তার মা নাকি রান্না করে পাঠিয়েছে। খাব কী! আমি তখন প্রাণপণ চেষ্টায় বমি আটকাচ্ছি। পরবর্তী ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে দুই দফায় আরও পাঁচজনকে ঠেসে দেয়া হলো একই হাজতে।
কোনোক্রমে এক কোণে বসে আছি। এর মধ্যে মাদকাসক্তদের পেটে ভাত পড়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হলো। টয়লেটের জন্যে তো একচিলতে আধখোলা জায়গা। হাজতে আসামির সংখ্যা ততক্ষণে অন্তত পনেরোজন। কাজেই টয়লেটে যাওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে যার যার কাপড়েই কাজ সারা হতে লাগল। এরপর বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়াও নরকযন্ত্রণার সমতুল্য। ডাণ্ডাবেড়ি আমার প্রাণান্তকর অবস্থা লক্ষ্য করছিল। হঠাত্ তার বোঁচকার মধ্য থেকে ভোজবাজির মতো আগরবাতির বাক্স এবং ম্যাচ বার হলো। ছেলেটি একটা আগরবাতি জ্বালিয়ে আমার একেবারে কাছে নিয়ে এলে কৃতজ্ঞতামাখা কেবল একটা হাসি প্রতিদান দিতে পেরেছিলাম। হাতের ঘড়িতে দেখলাম, রাত প্রায় দুটো। খানিক পর আইও এসে বলল, এবার আমার জিজ্ঞাসাবাদ হবে। আমার কাছে তখন ওই নরককুণ্ড থেকে বার হওয়াই জীবন ফিরে পাওয়ার শামিল। জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমাকে শারীরিক নির্যাতন করা হবে কি-না, সেটা নিয়ে আর ভাবছি না। গন্তব্য সেই সেকেন্ড অফিসারের কক্ষ। আমার অসুবিধার জন্যে বারবার ক্ষমাপ্রার্থনা করে ভদ্রলোক চা খাওয়াতে চাইলেন। আমি ভাবলেশহীনভাবে চায়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শুরু করতে বললাম। আইও এবং সেকেন্ড অফিসার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে জানালো, তাদের কোনো জিজ্ঞাস্য নেই। আধঘণ্টাখানেক নির্বাক বসে থাকার পর আইও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। এখন আবার হাজতে ফিরতে হবে। সেখানে ফিরে দেখি, আরও জনা দুই আসামি এসেছে, যারা সম্ভবত খানিক আগেই প্রচুর মদ্যপান করেছে। কারণ গাঁজা ও বিষ্ঠার গন্ধ ছাপিয়ে মদের গন্ধে হাজত ভরে গেছে। সেই সঙ্গে আমার বসার জায়গাটাও বেদখল। কী আর করা! কোনোরকমে ঠেলেঠুলে গারদের একেবারে দরজা ঘেঁষে একটুখানি দাঁড়ানোর স্থান মিললো। শিকের ফাঁক দিয়ে নাকটাকে বাইরে নিয়ে অক্সিজেন নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম। সদ্য মৃতব্যক্তির শোকাতুর বাড়িতেও রাত পোহায়। কোতোয়ালি থানার হাজতের রাতও প্রকৃতির নিয়মে একসময় শেষ হলো। ঘড়ি দেখতে আর ইচ্ছে করছিল না। ধারণা করছি, সকাল আটটার মতো হবে। সেলের ওই জমাটবাঁধা দুর্গন্ধের মধ্যে আবার নাস্তার পাট শুরু হলো। সবাই নির্বিকারভাবে খেয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ব্যতিক্রম আমি। সকালের সেন্ট্রি ইতস্তত করে একবার খাওয়ার কথা ওঠানোয় চশমার ভেতর দিয়ে চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই পিছিয়ে গেল। সকাল ন’টায় দু’জন করে আসামিকে হাজত থেকে বের করে উল্টোদিকের ঘরে নিয়ে শুরু হলো পেটানো। হাজতে বসেই লাঠির আওয়াজ আর বাবাগো, মাগো চিত্কার শুনতে থাকলাম। এক এক দলের বরাদ্দ পনেরো মিনিট। হাত-পায়ের কবজিতে রক্তের চিহ্ন নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরতে লাগল তারা। ফিরে এসে কান্নার ফাঁকে ফাঁকে পুলিশের বাবা-মাকে উদ্দেশ করে অশ্রাব্য গালাগাল। ঘণ্টা দুয়েক এই সার্কাস চললো।
আমি গারদের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। একসময় দূরে ডিউটি অফিসারের অফিসকক্ষে মনে হলো যেন আমার সহকর্মী সাংবাদিক নাছিরকে দেখলাম। নাছির আমাদের পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার। হয়তো আমি বেঁচে আছি কি-না, খবর নিতে এসেছে। দূর থেকে হলেও ওকে দেখে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি হলো। এর মধ্যেই আসামিদের নেয়ার জন্যে প্রথম দফা প্রিজন ভ্যান এসেছে। আসামিদের গারদ থেকে বের করে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে কোমরে দড়ি এবং হাতকড়া পরানো হচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম না. আমাকেও ওই লাইনে দাঁড়াতে হবে কি-না। থানা প্রশাসন নির্বিকার, কিছুই জানাচ্ছে না। আমার আইও সেই যে রাতে ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ পর গায়েব হয়েছে, তারপর থেকে দেখা নেই। হাজতের সামনে দিয়ে যাতায়াতরত অন্যান্য কর্মকর্তা এবং কনস্টেবলদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা আমারও কোমরে দড়ি পরানোর চূড়ান্ত নির্দেশের জন্যই অপেক্ষমাণ। কোর্টহাজত থেকে আগত এক নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা আড়চোখে আমার দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত দুপুর একটার দিকে হারানো আইও এসে সংবাদ দিল আমাকে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান এসেছে। ভ্যানে উঠতে যাচ্ছি, সেকেন্ড অফিসারসহ থানার অন্যান্য কর্মকর্তা আমার সামনে প্রায় হাতজোড় করে অন্তত এক গ্লাস পানি মুখে দেয়ার অনুরোধ করল। আত্মসংযম যথাসম্ভব বজায় রেখে গম্ভীরভাবে তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলাম। আমার মানসিক অবস্থা টের পেয়ে ওদেরই একজন অনুচ্চকণ্ঠে বলল, আমার ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতনের নির্দেশ ছিল। কোতোয়ালি থানা নাকি তাতে সম্মত হয়নি। মনে আছে, সে বলেছিল বারো দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তার কথার সত্যতার প্রমাণ আমি পেয়ে যাব। সেই প্রমাণ পেতে আমাকে বারো ঘণ্টার অধিক সময় অপেক্ষা করতে হয়নি।
কোতোয়ালি থানা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে না তুলে আমাকে সরাসরি কোর্ট গারদে নেয়া হলে হতাশ হলাম। আমি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একরাতের রিমান্ডের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাচ্ছিলাম, যাতে জাতি এই ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বরূপ চিনতে পারে। কেবলই মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহ্র রহমত এবং দেশপ্রেমিক, বিবেকবান জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ ছাড়া এই মৃত্যুগুহা থেকে আমি আর ফিরতে পারব না। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কোর্ট গারদে বসিয়ে রেখে আমাকে জানানো হলো, কোর্টে না তুলেই সরাসরি দ্বিতীয় রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। প্রিজন ভ্যানের কাছে পৌঁছেই দেখি, ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম দাঁড়িয়ে আছে। সে শ্বাপদের মতো দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। চারদিকে দাঙ্গা পুলিশের মধ্যেই আমি আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার দাবি করলাম। কোনো কথা না বলে রূঢ় ভঙ্গিতে ইন্সপেক্টর রেজা প্রিজন ভ্যানে উঠতে ইশারা করল। বুঝলাম সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। প্রিজন ভ্যান স্টার্ট দেয়ার মুহূর্তে শুনতে পেলাম, কে যেন উচ্চস্বরে ডাকছে, মাহমুদ ভাই আপনি কোথায়? সর্বশক্তি জড়ো করে চিত্কার করে উঠলাম, আমি ভ্যানের ভেতরে। উঁচু লোহার গ্রিলের ফাঁকের মধ্য দিয়ে অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদারকে দেখতে পেয়ে ভরসা হলো, আমার অন্তিম বক্তব্য দেশবাসী তাহলে জানতে পারবে। ততক্ষণে মাসুদ ভাই আইও রেজার সঙ্গে বিষম তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। তিনি আদালত থেকে আমার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি নিয়ে এসেছেন, অথচ আইও দেখা করতে দেবে না। পারলে মাসুদ তালুকদারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে প্রিজন ভ্যান চালিয়ে দেয়। তর্কাতর্কি চলাকালেই আরেকজন জুনিয়র আইনজীবী আদালতের লিখিত নির্দেশনামা নিয়ে এলে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও রেজাউল করিম ভ্যানের তালা খুলে আমাকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল। অ্যাডভোকেট মাসুদকে সঙ্গে করে কোর্ট গারদে ফিরে গেলাম। আগের চব্বিশ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত সংবাদমাধ্যমকে জানানোর অনুরোধ করলাম। ততক্ষণে অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞাও আমাদের আলোচনায় যোগ দিয়েছেন। তারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করলেন। আমি তাদের আগাম বলে গেলাম পরবর্তী রিমান্ডে আমার প্রাণসংশয় রয়েছে। এক ধরনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তখন আমার মধ্যে কাজ করছিল। আইও’র অবয়বে একজন হত্যাকারীকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার কিছু হলে বাড়ির লোকজনদের দেখার অনুরোধ করে দুই আইনজীবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুনর্বার প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। দু’জনই বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ইন্সপেক্টর রেজা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিল তার শিকারকে যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার জন্যে।
পুরনো ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে ভিআইপি রোড ধরে কারওয়ান বাজারে আমার দেশ কার্যালয় অতিক্রম করার সময় ভাবছিলাম, আর কি কোনোদিন সম্পাদকের অফিসে ফিরতে পারব? আমাদের পত্রিকা অফিসের একেবারে কাছেই তেজগাঁও থানা। ভ্যান থানা অতিক্রম করে এগিয়ে গেলে বুঝলাম, আমরা অন্য কোনো স্থানে চলেছি। এদিন ভ্যানের ভেতরে আমার সঙ্গে একজন অতিরিক্ত কনস্টেবল পাহারার জন্যে দেয়া হয়েছিল। একবার ভাবলাম, কোথায় যাচ্ছি ওকেই জিজ্ঞেস করি। পরক্ষণেই মনে হলো, দরিদ্র বেচারার চাকরি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে কী লাভ? গ্রেফতারের রাতের মতো জাহাঙ্গীর গেট পেরিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রিজন ভ্যান প্রবেশ করতেই নিশ্চিত হলাম, আমাকে ক্যান্টনমেন্ট থানাতেই নেয়া হচ্ছে। স্বজনদের এই সংবাদটি জানানোর জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলেও আমি অসহায়, পিঞ্জরাবদ্ধ। এরই নাম বাংলাদেশে আইনের শাসন? যে থানা মামলা দায়ের করে, রিমান্ডে সেই থানাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা আইনত বাধ্যতামূলক হলেও আমাকে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গৃহে কোনো পুরুষ মানুষ নেই যে, ছোটাছুটি করে আমার সঠিক অবস্থান খুঁজে বার করবে। অসহায় শাশুড়ি ও পুত্রবধূ কাদের দ্বারে দ্বারে একটুখানি খবরের আশায় ছুটে বেড়িয়ে অপমানিত হবে, কে জানে? এই গণতন্ত্রের জন্যে তাহলে ১৯৭১ সালে আমরা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করেছি, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছি! আকাশ-পাতাল ভাবনার মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট থানা চলে এলো।
আজকের ড্রাইভার রাস্তা চেনে। প্রথম রাতের মতো ভুল করে অন্য জায়গায় নিয়ে গাড়ি থামায়নি। পরিচিত থানায় প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে সময়ক্ষেপণ না করে সোজা ডিউটি অফিসারের সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। আমার পেছন পেছন আইও রেজা ঘরে ঢুকে, আরেকটি চেয়ার নিয়ে আমার পাশে বসেই ডিউটি অফিসারকে নানারকম নির্দেশ দিতে লাগল। বাসা থেকে একটা ছোট ব্যাগে আমার জন্য টুকিটাকি কিছু জিনিস পাঠানো হয়েছিল। এক সেট পরিষ্কার প্যান্ট-শার্ট, একটা লুঙ্গি, টুথ ব্রাশ, পেস্ট, সাবান, কিছু শুকনো খাবার ইত্যাদি। সেই ব্যাগটি ডিউটি অফিসারের হাতে দেয়ার পর অনুচ্চকণ্ঠে দু’জনার মধ্যে কিছু বাক্যবিনিময় হলো। আমার শোনার কোনো উত্সাহ ছিল না। তবে আমার দিকে ডিউটি অফিসারের চকিত, রহস্যময় চাহনি দেখে খানিকটা সচকিত হয়ে উঠলাম। কোতোয়ালি থানার অচেনা, তরুণ পুলিশ কর্মকর্তার আজ দুপুরের ভয়ঙ্কর নির্যাতনের আগাম সতর্কবার্তার কথা মনে পড়লো। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে পূর্বপরিচিত হাজতখানায় ঢুকলাম। বাসা থেকে পাঠানো ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান সঙ্গে নিতে দেয়া হলো না। বলা হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী ডিউটি অফিসারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ব্যবহার শেষে প্রতিবার ফেরত দিতে হবে। আমি যে ফ্যাসিবাদী প্রশাসনের একেবারে হাতের মুঠোয়, সেটাই অবমাননাকরভাবে বুঝিয়ে দেয়া আর কি! নোংরা টয়লেটের ওপর দাঁড়িয়ে বদনায় পানি ভরে গোসল করলাম। আগের রাতে হেরোইনসেবীদের সঙ্গে একই সেলে গাদাগাদি করে কাটিয়ে নিজেকে বড় ক্লেদাক্ত বোধ হচ্ছিল। ব্যবহার শেষে টুথ ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান ফেরত গেল ডিউটি অফিসারের কাছে। কাল সকালে আবার চাইতে হবে। রাত ন’টার দিকে থানা কর্তৃপক্ষ পরোটা, ডিমভাজি এবং লেবু দেয়া রং চা সরবরাহ করলে সামান্য ডিমভাজি দিয়ে অর্ধেক পরোটা এবং পুরো কাপ চা পেটে চালান করে রাতের আহার সাঙ্গ করলাম। প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা উপোসের পর এই আহার। তারপর হাজতের নোংরা মেঝেতেই শুয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগলাম।

তিন আততায়ী বাংলাদেশের, না ভিনদেশের তাও কেউ জানে না

গত দু’রাত না ঘুমিয়েই কেটেছে। তার ওপর কোতোয়ালিতে সারা রাত ঠায় দাঁড়ানো। ক্যান্টনমেন্ট থানার নোংরা মেঝেতে শুয়ে ঘুমের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে এলেও ঘুমের দেখা নেই। মাঝে মাঝে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। পরক্ষণেই চমকে তন্দ্রা ছুটে যাচ্ছে। রাত বোধহয় তখন দেড়টা থেকে দুটোর মাঝামাঝি। গারদের তালা খোলার আওয়াজে চোখ মেলে তাকালাম। বাতি নেই, হয়তো বিদ্যুত্ চলে গেছে; তবে প্রকৃতির আলো আছে। সেই আলো-আঁধারিতে দেখলাম গারদের সামনে বেশ কয়েকটি ছায়া। একজনের হাতে বাক্সসদৃশ কিছু দেখতে পেলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, এই আগন্তুকরাই আমার সেলের তালা খোলার আগে থানার বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল।
গারদের দরজা খুলে গেল। খর্বাকৃতি একটা অবয়ব আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি ততক্ষণে উঠে বসেছি। লোকটি দ্রুত পায়ে এসেই আমার শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল। তাকে চিনে ফেললাম। আমার মামলার আইও ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্য একজন পেছন থেকে দ্রুত আমার চোখ বেঁধে ফেলেছে। রেজাউল করিম শার্টের বোতাম খুলে শরীর থেকে শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় ঘোর কেটে মাথা পরিষ্কার কাজ করছে। এরা আততায়ী, দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকের নির্দেশে আমাকে শেষ করে দিতে এসেছে। একবার ভাবলাম, চিত্কার করি। পরক্ষণেই মনে হলো, আমার সেই চিত্কার এই কাপুরুষদের আনন্দের খোরাকই কেবল জোগাবে। স্যাডিস্ট মহাপ্রভুর সামনে বসে রসিয়ে রসিয়ে আমার অন্তিম চিত্কারের গল্প বলে তার মনোরঞ্জন করবে। শুধু একবার মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করলাম। এর মধ্যে আমাকে একটা জ্যাকেট পরানো হয়েছে, সম্ভবত দু’হাত আটকে ফেলার জন্য। যন্ত্রের মতো কাজ চলছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। আমার কানের কাছে মধ্যরাতের আগন্তুকদের দ্রুত তালে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো সেলের কোণের দিকে, সেখানে কেবলই দেয়াল, বাইরে থেকে দেখা যাবে না ভেতরে কী ঘটছে। নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আমাকে ঠেলে বসিয়ে দেয়া হলো। সামনে আমার দুই পা প্রসারিত, কাঁধের ওপর শক্ত দুটো হাত, পেছন থেকে পিঠ একজন তার হাঁটু দিয়ে চেপে রেখেছে। পরের ঘটনায় আবারও অবাক হলাম। কেউ দ্রুত আমার কোমরের বেল্ট খুলতে শুরু করেছে। প্যান্ট খুলে ফেলা হলো। কী করতে যাচ্ছে এরা? এত ঝামেলার প্রয়োজন কী? মাথার পাশে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে একবার গুলি করলেই তো যথেষ্ট। এক-এগারোর নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় শুনেছি বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারও নাকি লোকজনকে ধরে এনে হরেকরকম নির্যাতনের মধ্যে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে ইলেকট্রিক শক দেয়। আমাকেও কি তেমন কিছু করতে যাচ্ছে? নইলে প্যান্ট খুলছে কেন? সঙ্গে আনা বাক্সের মধ্যে অত্যাচারের কোন ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে তাও জানা নেই। প্যান্ট খুললেও অন্তর্বাস অবশ্য যথাস্থানেই রইল। হঠাত্ করেই দু’দিক থেকে দু’জন আমার দু’হাত ধরে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে বলল, ‘নিয়ে চল ব্যাটাকে জায়গামত। দেখি কত বড় বীরপুরুষ।’ চোখ বাঁধা, তাই কোনদিকে ঠেলছে ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। জ্ঞান হারানোর আগে ক্রসফায়ারে নিয়ে যাচ্ছে এরকম কিছু একটা বোধহয় ভেবেছিলাম। দু’দিনেরও অধিক সময় ধরে অনাহারক্লিষ্ট, নির্ঘুম, দুর্বল শরীর আর সইতে পারল না। দুই আততায়ীর শক্ত মুঠোর মধ্য দিয়েই আমার উভয় হাত পিছলে বার হয়ে এলো।
আমি শূন্যে ভাসতে লাগলাম। কোনো কষ্ট নেই, যাতনা নেই, কেবল অনাবিল প্রশান্তি। তারপর সব অন্ধকার। জ্ঞান যখন ফিরল—আমি থানার ডিউটি অফিসারের মেঝেতে শুয়ে আছি, সর্বাঙ্গ ভেজা। সম্ভবত জ্ঞান ফেরানোর জন্য পানি ঢালা হয়েছে। পাশ ফিরতে গিয়ে কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে দেখলাম প্যান্ট যথাস্থানে আছে। তবে বেল্ট উল্টো করে বাঁধা। আততায়ীরা আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় প্যান্ট পরানোর সময় বেল্ট উল্টো হয়ে গেছে। আমার অস্ফুট, বেদনার্ত আওয়াজ শুনে ডিউটি অফিসার ছুটে এসে বলল, স্যার আপনি ভালো আছেন, কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাকে পাহারা দিচ্ছি। আমার তখন টয়লেটে যাওয়া দরকার, অথচ উঠতে পারছি না। দু’জন সেন্ট্রির কাঁধে ভর দিয়ে টয়লেটে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে ডিউটি অফিসারকে অনুরোধ করলাম আমাকে হাজতে ফেরত পাঠাতে। ফজরের আজান শুনে তখনও জীবিত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অতি কষ্টে বসে ইশারায় নামাজ পড়লাম।
সকাল সাতটা না বাজতেই ক্যান্টনমেন্ট থানার কর্মকর্তা, কনস্টেবল দল বেঁধে এসে আমাকে সহানুভূতি জানিয়ে গেলেন। রাতের হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনা পুরো থানায় জানাজানি হয়ে গেছে। ওদের কাছ থেকেই টুকরো টুকরো যে খবর পেলাম, সেগুলো জোড়া দিয়ে গতরাতে কী ঘটেছিল সেই চিত্রটি দিনভর সাজালাম। সেটাই আমার মতো করে বিবৃত করছি। রাত একটার পর একটি সিভিল গাড়িতে পাঁচজনের একটি দল ক্যান্টনমেন্ট থানায় প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা ছিল, যার একজনকে আমি চিনতে পেরেছি। অন্য কর্মকর্তার নাম জিজ্ঞাসা করে জবাব পেলাম না। সবাই এড়িয়ে গেল। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাকি তিনজনকে থানার কেউ চিনতে পারেনি। কনস্টেবল, কর্মকর্তারা একবাক্যে বলল, ওই তিনজন পুলিশ বাহিনীর কেউ নয়। তাহলে তারা কারা? তিন আততায়ী বাংলাদেশের, না ভিনদেশের তাও কেউ জানে না। দলটি এসেই কর্তব্যরত এএসআই’র কাছ থেকে আমার সেলের চাবি নিয়ে থানার বাতি নিভিয়ে দেয়। সেলে ঢোকার সময় থানার কাউকে কাছে-পিঠে থাকতে দেয়নি। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলে এরা খানিকটা আতঙ্কিত হয়ে থানার লোকজনদের ডেকে নিয়ে আসে। তারা বাতি জ্বালিয়ে দেখতে পায়, আমি সেলের কোণে অর্ধ উলঙ্গ নিথর পড়ে আছি। কর্তব্যরত কর্মকর্তা এবং সিপাহীরা মিলে আমাকে কাঁধে করে সেল থেকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে নিয়ে ফ্যানের নিচে মেঝেতে শুইয়ে দেয়। তারপর চোখে-মুখে পানির ছিটা, পায়ের তালুতে সর্ষের তেল ঘষা, মাথায় পানি দেয়া ইত্যাদি অন্তে প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফেরে। এই সময়ের মধ্যে আততায়ী বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থানা ত্যাগ করে। সর্বপ্রথমে তিন অচেনা ব্যক্তি এবং সর্বশেষ আইও রেজাউল করিম থানা ছেড়ে যায়। এমনই কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা আগে থেকে থাকলেও একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সরকারের এই বিশেষ খুনে বাহিনী কাজটা অসমাপ্ত রেখে গেল কেন? তাহলে কি আজ রাতে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে ফিরে আসবে? যে কোনো উপায়ে আত্মীয়-স্বজনদের কাউকে এই হত্যা প্রচেষ্টার সংবাদ দ্রুত জানানো দরকার। নইলে রিমান্ডের বাকি দুই দিনের মধ্যেই কোনো এক ঝোপ-জঙ্গলে আমার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকার সমূহ আশঙ্কা। পুরো থানায় পরিচিত কেউ নেই। আমার অসহায় অবস্থায় প্রশাসনের কাউকে বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। জানি না কী বুঝে সিদ্ধান্ত নিলাম অনাহারে থাকব। মনে হলো, আততায়ীর বুলেটে অথবা নির্যাতনে প্রাণত্যাগ করার চাইতে অতিরিক্ত দৌর্বল্যে হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়াই উত্তম। আজন্ম আমার রক্তচাপ বেশ কমের দিকে। সুতরাং রক্তচাপ আরও খানিকটা কমলেই হয়তো সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন সহজতর এবং দ্রুততর হবে। থানার প্রতিটি কর্মকর্তা সারাদিন ধরে অনুরোধ করেও আমাকে কিছু খেতে সম্মত করাতে পারল না।
বিকেলের শিফটে দায়িত্বরত ডিউটি অফিসার গারদের তালা খুলে আমাকে তার কক্ষে ফ্যানের নিচে বসে কিছুটা সময় অন্তত আরাম করার অনুরোধ করল। এই দু’দিনে মশার কামড়ে আমার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে; ঘামে ভিজতে ভিজতে সর্বাঙ্গ চটচটে, দুর্গন্ধময়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেটির সঙ্গে গেলাম। সেখানে গিয়ে মনে হলো, না আসাটাই ঠিক ছিল। আইও রেজা ডিউটি অফিসারের কক্ষে আগে থেকেই অপেক্ষমাণ। তাকে সেখানে দেখে গত রাতের কথা মনে করে অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলাম। লোকটি খেজুরের একটি বাক্স আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে খেতে অনুরোধ করল। খেজুর আমি বেশ পছন্দ করেই খাই। বাক্সটি দেখেই বুঝলাম, এটা আমারই বাসা থেকে এসেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ভেতর থেকে প্রবল হয়ে উঠে আসা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ক্রোধ সংবরণ করলাম। কোনো কথা না বলে সম্ভাব্য হত্যাকারীর হাত থেকেই একটা খেজুর নিয়ে মুখে দিতেই বমনেচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। লোকটি আমার চেহারার রং পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা পানি আনতে নির্দেশ দিল। একজন সেন্ট্রি ছুটে গিয়ে এক গ্লাস ফ্রিজে ঠাণ্ডা করা পানি নিয়ে এলে পুরোটাই খেলাম। ওখানে বসে থাকা আমার অসহ্য বোধ হতে লাগল। সেই মানসিক নির্যাতনের তীব্রতা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কাউকে বোঝানো কঠিন। ডিউটি অফিসার এবং ইন্সপেক্টর রেজার বাধা উপেক্ষা করে গারদে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মন শক্ত করে রাতের আসন্ন আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। আমার সেলে যাদের ডিউটি ছিল সেসব সিপাহী তো বটেই, থানার অন্য সেন্ট্রিরাও কিছুক্ষণ পরপর আমাকে ভরসা দিয়ে যাচ্ছিল। তারা দৃঢ়কণ্ঠে বলছিল, আজ রাতে আপনার ওপর যে কোনো আঘাত আমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করব। তাতে লড়াই বাধলেও পিছিয়ে যাব না। ওদের কথা শুনে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, আমি তাহলে নিঃসঙ্গ নই। সত্যের পক্ষে সিনা টান করে দাঁড়ানোর মতো সৈনিক এখনও এই দেশে আছে। মন প্রশান্ত হয়ে গেল। জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম একদিন ইনশাআল্লাহ, শুরু হবে। সেই মহান সংগ্রামে আমার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যক্তির আগাম মৃত্যু যত্সামান্য ত্যাগ স্বীকার মাত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে যে লাখ লাখ তরুণ আত্মদান করেছেন, তাদের ক’জনকেই বা আমরা চিনি। কিন্তু, এই আত্মত্যাগের ফলেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসন থেকে আমরা মুক্তিলাভ করেছি। সাম্রাজ্যবাদের দোসর, বাংলাদেশী ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী চার দশক পর দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে। সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আজ অকাতরে প্রাণ দেয়ার সময় এসেছে। অতএব, আল্লাহ ভরসা।
রাত বারোটার ঘণ্টা বেজেছে বেশ খানিক আগে। একাধিক বুটের শব্দ শুনলাম। গারদের সামনে আইও রেজাউল করিম, পাশে ক্যান্টনমেন্ট থানার ডিউটি অফিসার আহসান হাবিব। থানার বাতি জ্বালানোই রয়েছে। বলা হলো, আমার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হচ্ছে। আইও একটি কালো কাপড় বের করে রূঢ়ভাবে জানাল, আমার চোখ বাঁধা হবে। এর হেতু জিজ্ঞাসা করতেই শুনলাম, এটাই নাকি আইন। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু না হতেই আরও একজনের বুটের আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেই আওয়াজ সেলে ঢুকে আমার চারপাশে পায়চারি করছে। তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় আমার কাছে গোপন রাখা হলো। আধ ঘণ্টাখানেক ধরে জিজ্ঞাসাবাদের তামাসা চলছে। ঘুরে-ফিরে একই প্রশ্ন। গ্রেফতারের রাতে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকদের মধ্যে কারা কারা আমার দেশ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের আমি ডেকে এনেছিলাম কি-না? হঠাত্ একজন সেন্ট্রি ছুটে এসে খবর দিল, অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার আমার খোঁজে থানায় এসেছেন। উত্তেজনা চাপতে না পেরে উচ্চকণ্ঠেই বলে উঠলাম, তিনি আমার আইনজীবী। জিজ্ঞাসাবাদ থেমে গেল। মিনিট পাঁচেক পর চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। তারপর সব চুপচাপ। খানিক বাদে এক সেন্ট্রি এসে চুপি চুপি বলে গেল, আমার স্ত্রীও নাকি এসেছে। আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। কোনো ভদ্র পরিবারের মহিলাদের আসার স্থান থানা নয়। তার ওপর রাত তখন প্রায় দুটো। অপর একজন খবর দিল, মাসুদ তালুকদার ছাড়াও অন্যান্য ব্যারিস্টার এবং জাতীয়তাবাদী দলের সংসদ সদস্যরাও আমার খোঁজে এসেছেন। মনে হলো, আল্লাহ তাঁর রহমতের ভাণ্ডার আমার জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। তিনিই আমার একমাত্র নিরাপত্তাদাতা। ভোর চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আছি। জিজ্ঞাসাবাদের খবর নেই। শেষ পর্যন্ত আহসান হাবিব এসে জানালেন, আমি এবার ঘুমাতে পারি। আজ রাতের মতো জিজ্ঞাসাবাদে ইতি। আর খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেই ফজরের নামাজের ওয়াক্ত হলো। নামাজ শেষ করে ঘুমিয়ে যখন জেগে উঠলাম, তখন সকাল প্রায় আটটা। সারাদিন আর কেউ এলো না। পাহারারত সেন্ট্রির সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করে আর খানিক পরপর রঙ চা খেয়ে সময় কাটালাম। সন্ধ্যা সাতটায় আরেক দফা জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানানো হলো। তবে জিজ্ঞাসাবাদ সেলে হবে না। ভিন্ন স্থানে যেতে হবে। ডিউটি অফিসারের কক্ষে পৌঁছে যথারীতি রেজাউল করিমকে দেখতে পেলাম। তার ইচ্ছেতেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার চমত্কার অফিসে যাওয়া হলো। তৃতীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদে যোগ দিল। তরুণটি ইন্সপেক্টর রেজাউল করিমের জুনিয়র। আবারও সেই একঘেয়ে প্রশ্ন। আজ কিন্তু আমার চোখ বাঁধা হলো না। পূর্বরাতে আমাকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ পুলিশের আইনই হচ্ছে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা। আজকে এই আইন ভঙ্গ করায় ইন্সপেক্টর রেজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি-না, নির্দোষভাবে জানতে চাইলে সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। এসব ক্ষেত্রে আমারও চোখ নামানোর অভ্যাস নেই। রেজাউল করিমের চোখের ভাষায় আমি যেন পড়ছিলাম, তেল তাহলে এখনও পুরোটা যায়নি। জুনিয়রের সামনে আমার বেমক্কা প্রশ্নে দৃশ্যত অপমানিত আইও জিজ্ঞাসাবাদে সমাপ্তি টেনে আমাকে হাজতে নিয়ে যেতে বলল। আমিও কোনো সেন্ট্রির জন্য অপেক্ষা না করে ওসি’র ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা হাজতে চলে গেলাম। এই তিন দিনে থানার পথ-ঘাট মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে। তেজগাঁও থানার দায়ের করা মামলার রিমান্ডের সর্বশেষ রাতে উল্লেখযোগ্য আর কিছু ঘটলো না। তবে সেন্ট্রির মাধ্যমে খবর পেলাম সংসদ সদস্য পাপিয়া, রুনু, আইনজীবী মুন্সি কবির আমার কুশল জানতে থানায় এসেছিলেন। এদের ঋণ শোধ করা আমার সাধ্যাতীত।
বারই জুন দুপুর একটায় প্রিজন ভ্যান আমাকে আদালতে নেয়ার জন্যে এলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভ্যানে উঠলাম। যাওয়ার সময় অবশ্য ধারণা করছিলাম, আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে এখানেই বোধহয় ফিরে আসছি। আরও দুই মামলার রিমান্ড সমাপ্ত হতে তখনও আট দিন বাকি রয়েছে। তাছাড়া এই মামলাতেই সরকার পুনরায় রিমান্ডও চাইতে পারে। ঘণ্টাখানেকের পথ পাড়ি দিয়ে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ম্যাজিস্ট্রেট একজন তরুণী। অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞাকে আগেই বলে রেখেছিলাম, নির্যাতনের ঘটনা আমি নিজমুখে বর্ণনা করতে চাই। তিনি কথামত শুনানির শুরুতেই আদালতের অনুমতি নিয়ে রাখলেন। সরকারপক্ষ যথাসম্ভব বাধা দিলেও ফল হলো না। ম্যাজিস্ট্রেট সম্ভবত আমার বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে করুণাবশত কাঠগড়ায় বসার জন্য একটা চেয়ার দেয়ারও নির্দেশ দিলেন। ক্যান্টনমেন্ট থানায় রাতের তৃতীয় প্রহরের সেই লোমহর্ষক ঘটনা যতটা সম্ভব নিরাসক্তভাবে বর্ণনা করলাম। ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় কন্যাসম হওয়ায় পরনের কাপড় খোলার বর্ণনা দেয়ার সময় বিব্রত বোধ করছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেটকে সে কথাটা আমি বললামও। আমি বলে যাচ্ছি। আদালতে পিনপতন নিস্তব্ধতা, কারও চোখে পানি। আওয়ামী লীগ যে চরিত্রগতভাবে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল, সে বিষয়টি এদেশের জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণ মোটামুটি জানে। এমনকি আওয়ামী লীগাররাও জানে। তবে তারা বিষয়টি লজ্জাস্কর বিবেচনা না করে বরং একপ্রকার অহঙ্কার বোধ করে। সেই ফ্যাসিবাদী দলটি মার্কিন-ভারতের অন্ধ সমর্থনে এবার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতে’ পরিণত করেছে। আমার বক্তব্য শেষ হতেই সরকারি আইনজীবী তারস্বরে চিত্কার করে বলতে লাগলেন, এগুলো সব বানানো। আমি নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ করছি। যে রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে আমার ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হবে এমন অলীক স্বপ্ন দেখার মতো নির্বোধ আমি নই। তবে আশা করেছিলাম, এই ঘটনা সংবাদকর্মীদের বিবেক অন্তত জাগ্রত করবে। নির্যাতন ও মানবাধিকার প্রশ্নে সব সংবাদকর্মী রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করবেন। আমার সেই আশাটি অবশ্য পূরণ হয়নি। তবে সাধারণ জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, সেই সত্য আমাকে আশান্বিত করছে। ব্যক্তিগত মান-অপমানকে উপেক্ষা করে আদালতে নির্যাতনের কাহিনী বিশদভাবে বর্ণনার উদ্দেশ্যই ছিল এদেশের লড়াকু জনগণকে আরও সচেতন করে তোলা। তেজগাঁও থানার মামলায় সরকারপক্ষ নতুন করে আর রিমান্ড চাইল না। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পরবর্তী রিমান্ডে যাত্রার আগে স্বল্প সময় বিরতির জন্যে আমাকে কোর্ট গারদে পাঠানো হলো। সেখানে আদালতের অনুমতি নিয়ে আমার আইনজীবীরা দেখা করতে এলেন। পারভীন খিচুড়ি রান্না করে পাঠিয়েছে। গারদের নোংরা পরিবেশে খাওয়ার রুচি না হলেও জায়া ও জননীর খানিকটা মানসিক শান্তির জন্যে জোর করে হলেও কয়েক চামচ খিচুড়ি গলাধঃকরণ করলাম। সেদিনই প্রথম শুনলাম, রিমান্ডে আমার ওপর অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় পারভীন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। রক্তচাপ ২০০ এবং ১৩৫। যে কোনো সময় হার্ট অ্যাটাক অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা রয়েছে। পঁচিশ বছরের সংসারজীবনে ওকে অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলাতে দেখেছি। এমনভাবে ভেঙে পড়েনি কখনও। আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা তাকে সব সময় শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। এক-এগারোর পর মইনের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডকে কলমের অস্ত্রে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সময় থেকেই আমার গ্রেফতারের আশঙ্কা নিয়ে আমাদের মধ্যে বহুবার কথা হয়েছে। জেলে যাওয়ার সার্বক্ষণিক প্রস্তুতিস্বরূপ একটি ব্যাগের মধ্যে আমার প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য টুকিটাকি জিনিসপত্র পারভীন নিজ হাতে গুছিয়ে রেখেছে সেই ২০০৭ সাল থেকেই। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় দেশে-বিদেশে আওয়ামী পেটোয়া বাহিনীর আক্রমণ এবং সরকারের একটার পর একটা মামলা দায়েরেও সে কখনও বিচলিত হয়নি। স্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন হলেও সাহস হারায়নি একদিনের জন্যেও। আজ তারই অসুস্থতার সংবাদে বড় বিষণ্ন হয়ে পড়লাম। সানাউল্লাহ ভাই, মাসুদ ভাই এবং অন্যান্য আইনজীবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তৃতীয় দফা রিমান্ডের মুখোমুখি হতে অপেক্ষমাণ প্রিজন ভ্যানে প্রবেশ করলাম। তখন চোখ আমার শুষ্ক; কিন্তু হৃদয়ে অবিরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

মরতেই যদি হয়, তাহলে অন্তত আততায়ীর চেহারা দেখে চিরতরে চোখ বন্ধ করতে চাই

প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় জানলাম, আমরা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যাচ্ছি না। এবারের গন্তব্য মিন্টো রোডের ডিবি অফিস। শেখ হাসিনার আগের পাঁচ বছরের শাসনকালে সেখানেই রুবেল নামে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার এক নিরপরাধ কলেজছাত্রকে স্থানীয় মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশেরই সোর্স জালালকে খুন করে তার মৃতদেহ ডিবি অফিসের ছাদের পানির ট্যাংকের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। জালাল হত্যার বিচার নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক টালবাহানা করার অভিযোগে তত্কালীন পিপি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল হাইকোর্ট। প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এস কে সিনহা এক সুয়ো মোটো (ঝঁড় সড়ঃড়) রায়ে এই অব্যাহতি প্রদান করেছিলেন। কর্তব্যকাজে গাফিলতির জন্যে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেই পিপি অবশ্য ভাগ্যগুণে আজ বাংলাদেশের আইন প্রতিমন্ত্রী। ক্যান্টনমেন্ট থানায় আমার ওপর যে হত্যা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তারই হয়তো চূড়ান্ত রূপ দেয়া হবে ডিবি’র চারদিনের রিমান্ডে। সিএমএম আদালত থেকে মিন্টো রোডের দূরত্ব বেশি নয়। সাত-পাঁচ ভাবনার মাঝখানেই প্রিজন ভ্যান ডিবি অফিসের গেট দিয়ে প্রবেশ করল। কবজি উল্টে দেখি সন্ধ্যা ছ’টা পার হয়েছে।
জীবনে প্রথমবারের মতো ডিবি অফিসে এসে দেখলাম, যথেষ্ট পুরনো এক দ্বিতল ভবন। আমাকে নিচতলার এক হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। হাজতের সামনেটা অফিস। তিন-চারটে চেয়ার-টেবিল পাতা রয়েছে। সেখানে সবাই কাজ করছেন। পাশে একটা লম্বা বেঞ্চও রয়েছে। সম্ভবত আসামিদের খোঁজে আগত আত্মীয়-স্বজনরা সেখান বসে অপেক্ষা করেন। আমার সঙ্গে কাঁধে ঝোলানো যায় এমন একটা ছোট সাদা ব্যাগ। ব্যাগটি ডিউটি অফিসার গ্রহণ করলেন। স্যান্ডেল খুলে খালি পায়ে আমাকে হাজতে প্রবেশ করতে হলো। এর উদ্দেশ্য হাজতের মেঝে অপরিষ্কার হওয়া থেকে রক্ষা করা হতে পারে। তবে আমার কাছে মনে হলো, ব্যাপারটি প্রচ্ছন্ন অপমানের মাধ্যমে মানসিকভাবে দুর্বল করার কৌশল। এখানে সৌভাগ্যবশত আমাকে অন্তত টুথ ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান সঙ্গে রাখার অনুমতি দেয়া হলো। হাজতটি আকারে ছোট হলেও একজন আসামির জন্যে যথেষ্ট। ক্যান্টনমেন্ট থানা হাজতের মতোই সেলের এক কোণে ধূলি ধূসরিত কম্বলের স্তূপ পড়ে আছে। আমি মাটিতে বসে পড়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে তীব্র সোঁদা গন্ধযুক্ত দুটো অতিরিক্ত কম্বল আমাকে দিয়ে বলা হলো, একটি বিছানা এবং অপরটি বালিশরূপে ব্যবহার করতে হবে। নির্দেশমত মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে তার ওপর বসলাম। ঘরের কোণের ময়লা কম্বলের স্তূপ যথাস্থানে অব্যবহৃত পড়ে রইলো। টয়লেটে যাওয়ার জন্যে উঠলাম। সেলের লাগোয়া টয়লেট। আব্রু রক্ষার ব্যবস্থা ক্যান্টনমেন্ট থানার তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও টয়লেটের ভেতরের অবস্থা ভয়াবহ। মেঝে এবং প্যান সম্ভবত নির্মাণের পর থেকে কোনোদিন পরিষ্কার করা হয়নি। ময়লা জমে জমে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গণ-টয়লেটের মতোই প্যানের ওপর ময়লা ভাসছে। টয়লেটের ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা না থাকায় এবং মেঝে ভয়াবহ রকম পিচ্ছিল হওয়ায় যে কোনো সময় পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙার আশঙ্কা প্রবল। এক কোণে পানির কল এবং টয়লেটের তাবত্ কর্ম সম্পাদনের জন্যে একটিমাত্র বদনা। কলে পানি আছে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। যে কাজে ঢুকেছিলাম, সেটি সম্পন্ন না করেই বার হয়ে এসে ডিউটি অফিসারকে প্যানের ময়লা যাতে পানি ঢাললে যায় অন্তত সেই ব্যবস্থাটুকু করবার অনুরোধ করলাম। জবাব পেলাম, পরেরদিন ঝাড়ুদার না আসা পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না। একটি রাত ওই পরিবেশেই আমাকে মানিয়ে নিতে হবে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বিবেচনা করে সোঁদা কম্বলের আশ্রয়ে ফিরে গেলাম। জুনের প্রচণ্ড গরমে দরদর করে ঘামছি। খানিক বাদে আমার সেলের বাইরে মিউজিয়ামে যাওয়ার উপযুক্ত একটা পেডেস্টাল ফ্যান কোথা থেকে আনা হলো। অনেক কসরত্ করে সেটা আমার দিকে তাক করে চালিয়ে দেয়া হলে গারদের ফাঁক দিয়ে কিছুটা বাতাস সেলের ভেতরে প্রবাহিত হলে কৃতজ্ঞবোধ করলাম। ক্যান্টনমেন্ট থানায় তিনদিনে আমার শরীর থেকে যে পরিমাণ ঘাম ঝরেছে, তাতে কিডনির বারোটা বেজে যাওয়ার কথা। মশাও মনে হলো ক্যান্টনমেন্টের তুলনায় অনেক কম। ওখানে তিনদিনের অবস্থানে মশার কামড় এবং ঘামাচিতে আমার সর্বাঙ্গ ছেয়ে গেছে।
ঘণ্টাদুয়েক পর ডিবি’র কয়েকজন কর্মকর্তা এসে জানালেন, ওই রাতে আমার কোনো জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। আমি বিশ্রাম নিতে পারি। কর্মকর্তাদের মধ্যে একজনকে চিনতে পারলাম। গ্রেফতারের রাতে শত শত পুলিশের মধ্যে তিনিও ছিলেন। তাকে বিশেষভাবে মনে রাখার কারণটি হলো, গ্রেফতারের মুহূর্তে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, আমার হাত ধরেন স্যার, আপনার নিরাপত্তা আমি দেব। আমি জবাব দিয়েছিলাম, আপনি মনুষ্যমাত্র, আমি নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ ছাড়া আর কারও ওপর নির্ভর করি না। যাই হোক, তরুণটির নাম জানলাম। তিনি এডিসি নজরুল। রাতের আহারের প্রসঙ্গ উঠলে এক কাপ চা খেতে চাইলাম। বাসা থেকে পাঠানো ঝোলা ব্যাগের ভেতর থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বার করলাম। সেই বিস্কুটের প্যাকেটটি সঙ্গে রাখার অনুমতি চাইলে আবেদন মঞ্জুর হলো। ক্যান্টনমেন্ট থানায় বিশেষ রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর থেকে রাতে ঘুমানো ছেড়ে দিয়েছি। এদের হাতে মরতেই যদি হয়, তাহলে অন্তত আততায়ীর চেহারা দেখে তারপর চিরতরে চোখ বন্ধ করতে চাই। ডিবি’র সেলের চতুর্দিকে নানান কিসিমের ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। ডিউটি অফিসারদের সঙ্গে বাক্যালাপ বিপজ্জনক। বিপদটা আসামির নয়, সেটি পুলিশ কর্মকর্তার। ওপরআলাদের কোনো রকম সন্দেহ হলেই নিদেনপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি। গুরুতর কিছু ঘটলে চাকরিটাও যাবে। নিম্নস্তরের পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের সিস্টেমে সবচেয়ে অসহায় শ্রেণী। দ্বিতীয় কম্বলটা ভাঁজ করে মাথার নিচে দিয়ে ফজরের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। ঘুম তাড়ানোর জন্যে কম্বলের গন্ধই যথেষ্ট। রাত তিনটায় কম্বলশয্যা ত্যাগ করলাম।
সেলের বাইরে রাতের প্রহরীরা সবাই ঘুমাচ্ছে। কেউ চেয়ারে বসে, আর অন্যরা বেঞ্চে শুয়ে। নোংরা টয়লেটের অন্ধকারে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করলাম। গুলশানে বাস করেও সেখানকার এলিট শ্রেণীর বিলাসিতায় অভ্যস্ত না হওয়ার সুফল পাচ্ছি গ্রেফতারের রাত থেকেই। জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে উপনীত হলেও গেণ্ডারিয়ার মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর আমাকে কখনও ত্যাগ করে যায়নি। গোসল সেরে বেরিয়ে গারদের বাইরের সেই ফ্যানের সামনে জোড়াসনে বসলাম। মাথায় চুল কম থাকাও যে সুবিধাজনক, সেটা প্রমাণ হলো স্বল্প সময়ের মধ্যে চুল শুকিয়ে যাওয়ায়। সঙ্গে গামছা বা তোয়ালে নেই তাই শরীর মোছাও সম্ভব হয়নি। গায়ের পানি গায়েই শুকালো। বাড়ির কথা ভাবছিলাম। আগের দিনেই জেনেছি, মা এখন পর্যন্ত শক্ত থাকতে পারলেও পারভীন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রিমান্ডে আমার জীবন ধারণের অবস্থাটা জানলে দু’জনই অসুস্থ হবেন। চৈত্র মাসের কাঠফাটা গরমেও ঈষত্ গরম পানিতে গোসল করা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ঠাণ্ডা পানিতে সাইনাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। ডিবি অফিসে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে তো হচ্ছেই, ভেজা শরীর শুকাচ্ছি ফ্যানের বাতাসে। ফজরের আজান এবং আমার সেলের পাশের বিশাল কড়ই গাছে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির সুবেহ্ সাদেকের আগমনী জানান দিল। নামাজে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা জানালাম, আমার বন্দি জীবনে এক মুহূর্তের জন্যেও যেন জালিম সরকারের মুখাপেক্ষী হতে না হয়। জালিমের করুণা প্রত্যাশী হওয়ার পরিবর্তে আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন সর্বসময় আকাঙ্ক্ষিত। ফজরের নামাজ অন্তে এক ঘণ্টা বোধহয় ঘুমাতে পেরেছিলাম। এর মধ্যেই নতুন শিফটের লোকজন এসে তাদের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে। চেয়ার টানার শব্দ, তাদের কথোপকথন ঘুম ভাঙিয়ে দিল। রুটি, ডিমভাজি এবং রঙ চা’র বরাদ্দ দিয়ে নাস্তাপর্ব শেষ করে অন্তহীন অপেক্ষা শুরু হলো। দুপুরে কম্বলের ওপর বসে আছি। হঠাত্ দেখলাম সামনের করিডোর দিয়ে ফকরুল আলম কাঞ্চন দ্রুত হেঁটে গেল। যাওয়ার সময় মনে হলো, যেন সে আমাকে লক্ষ্য করেছে। কাঞ্চন আমাদের সংবাদপত্রের ক্রাইম বিভাগের প্রধান। মনের ভার এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। বাইরের পৃথিবী আমার অবস্থানটা এবার জানবে।
রাত এগারোটায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আইও নুরুল আমিন নিতে এলেন। তার সঙ্গে দোতলায় ডিসি ডিবি (উত্তর) মাহবুবুর রহমানের কক্ষে গেলাম। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন এডিসি নজরুল। প্রাথমিক সৌজন্য প্রদর্শন শেষ হলে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শুরু হলো। আমি অভিযোগ জানতে চাইলাম। হিযবুত তাহরিরকে জড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে ইসলামী জঙ্গিত্বের হাস্যকর অভিযোগ উত্থাপন করলেন ডিবি’র ইন্সপেক্টর নুরুল আমিন। আমার অপরাধ তিনটি। প্রথমত. হিযবুত তাহরিরের কোনো এক লিফলেটের ভাষার সঙ্গে আমার দেশ-এ প্রকাশিত সংবাদের মিল রয়েছে। দ্বিতীয়ত. আমার দেশ কার্যালয় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার যে বাণিজ্যিক ভবনের ১১ তলায় অবস্থিত, সেই ভবনেরই কোনো এক তলায় হিযবুত তাহরিরের এক কথিত নেতার অফিস রয়েছে। সেই নেতা নাকি আমার সঙ্গে তাদের সংগঠনের প্রচারের উদ্দেশ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এবং তৃতীয়ত, আমার দেশ প্রেসে হিযবুত তাহরিরের লিফলেট ছাপা হওয়ার সন্দেহ করছে পুলিশ। জবাবে আমি বললাম, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অথবা আমার কোনো লেখা নিয়ে হিযবুত তাহরির লিফলেট তৈরি করেছে এমন কোনো সংবাদ আমার জানা নেই। আর যদি আমাদের অজ্ঞাতসারে তেমন কিছু করেও থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ উত্থাপনের কোনো সুযোগই নেই। আমার লেখা উদ্ধৃত করে ইচ্ছে করলে সরকারও লিফলেট ছাপাতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ভবনে হিযবুত তাহরিরের লোকজন অফিস খুললে তার দায়িত্ব ভবন মালিকের, আমার নয়। তাছাড়া যে ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, তেমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কস্মিনকালেও আমার কোনোরকম যোগাযোগ হয়নি। এমন কোনো ব্যক্তিকে আমি চিনি না। আর সর্বশেষ, সংবাদপত্রের প্রেসের যন্ত্রপাতি দিয়ে লিফলেট ছাপানো যায় না। তার জন্য ভিন্ন প্রেস লাগে। আমি এটাও বললাম, আমার বিরুদ্ধে ইসলামী সন্ত্রাসের মামলা দিয়ে আপনারা সন্ত্রাসের মতো গুরুতর ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বিষয়কে খেলো করে ফেলছেন। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এই খেলা থেকে তাদের নিবৃত্ত হতেও পরামর্শ দিলাম। হিযবুত তাহরির নিয়ে আলোচনা এখানেই সমাপ্ত হলো।
এরপর এলো আসল প্রসঙ্গ। এডিসি নজরুল জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী বলি এবং আমার দেশ সরকারের এত তীব্র সমালোচনা কেন করে? এই প্রশ্নের সঙ্গেই আমার গ্রেফতারের প্রকৃত কারণ প্রকাশ হয়ে গেল। আরও ঘণ্টাখানেক এই বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা শেষে ডিসি মাহবুবুর রহমান উঠে দাঁড়িয়ে জানান দিলেন, আজ রাতের মতো জিজ্ঞাসাবাদের পালা শেষ। সেলে যখন ফিরলাম, দেখলাম একটা বেজে গেছে। পূর্বরাতের মতোই শেষ রাতে গোসল, নামাজ শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিন একইভাবে কেটে গেল। সকালের নাস্তাটা কোনোক্রমে গলাধঃকরণ করলেও, ওরকম পরিবেশে ভাত খাওয়ার রুচি হয় না। অতএব খাদ্য বলতে খানিক পরপর চা এবং একটা করে বিস্কুট। রাত এগারোটায় পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নুরুল আমিন আবারও সেল থেকে নিয়ে গেলেন। আজ অতিরিক্ত কয়েকটি কথা বললাম।
আমি সংবাদপত্রে লেখালেখি করি কেবল এই কারণেই আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী দলে পরিণত হয়ে যাচ্ছে না। জনমত এত সহজে প্রভাবিত হয় না। তাছাড়া আমি এমন কিছু শক্তিশালী লেখকও নই। বাস্তবতা হলো, দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে সাধারণ কর্মী পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তির অসহিষ্ণু এবং চরম অগণতান্ত্রিক আচরণই জনগণকে বাধ্য করছে তাদেরকে এই বিশেষণে অভিহিত করতে। ১৯৭৫ সালে চারটি ছাড়া দেশের সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া, শত শত পুলিশ পাঠিয়ে আমার দেশ বেআইনিভাবে বন্ধ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দেয়া, আমাকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নির্যাতন, হত্যা প্রচেষ্টা—এসবই ফ্যাসিবাদী আচরণের মধ্যে পড়ে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ঘটনার কথা শুনে উপস্থিত তিন ডিবি কর্মকর্তাই নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ আমি একাই কথা বলে গেলাম। এটাও বললাম, আমার দেশকে কেন্দ্র করে সরকারের ন্যক্কারজনক আচরণ তাদের কপালে যে কলঙ্ক তিলক এঁকে দিয়েছে, সেটি আর মোছা যাবে না। দীর্ঘ তিন যুগ পর আজও যেমন করে আমরা ১৯৭৫ সালের ১৫ জুনকে সংবাদপত্রের কালো দিবস হিসেবে ঘৃণা সহকারে পালন করে থাকি, একইভাবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম আমার দেশ বন্ধ করার অপচেষ্টার জন্যে আওয়ামী লীগকে ধিক্কার দিয়ে যাবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে এটাও বললাম, আমাকে হয়তো দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা যাবে; কিন্তু আমার দেশ বন্ধ করে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনধন্য প্রবল প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও সম্ভব হবে না। আমার বক্তব্যের ওপর কোনো মন্তব্য না করে ডিসি মাহবুবুর রহমান বারবার বলার চেষ্টা করছিলেন, তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে জনমন থেকে ভুলিয়ে দিতেই আমার দেশ পত্রিকা সজীব ওয়াজেদ জয় সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি ছাপিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের পক্ষে সব কাগজপত্র আমাদের সাংবাদিকের কাছে রয়েছে এবং সুস্থ সাংবাদিকতার সব নীতিমালা মেনেই যে সংবাদটি ছাপানো হয়েছে, এ বিষয়টি জোরের সঙ্গে উল্লেখ করলাম। তাকে জানালাম, তারেক জিয়ার দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে ওই সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি কোনোক্রমেই সম্পর্কিত নয়। এ রাতেও প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হতে দেড়টা বেজে গেল। ছাড়া পেয়ে সেলে এসে সটান শুয়ে পড়লাম। পরের রাতে জিজ্ঞাসাবাদ আরও সংক্ষিপ্ত হলো। আমার বিরুদ্ধে সরকারের নতুন মামলা দায়েরের খবর পেলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশের প্রেক্ষিতে দুদক মামলা করেছে। এই আইনবহির্ভূত কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রমাণ করলো তারা স্বাধীন তো নয়ই; বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সটেনশন মাত্র। এই প্রত্যাশিত মামলা দায়েরে কোনোরকম উদ্বেগ বোধ না করে সংবাদটি জানানোর জন্য মাহবুবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে মধ্যরাতে সেলে ফিরলাম।
১৬ জুন, দুপুর একটা। সেলে চুপচাপ বসে আছি। আইও হন্তদন্ত হয়ে এসে তৈরি হতে বললেন। তখনই আদালতে যেতে হবে। ইসলামী জঙ্গিত্বের মামলার রিমান্ড শেষ হয়েছে। আদালতে উপস্থিত হতেই আইনজীবী, সাংবাদিক আমাকে দেখে আঁেক উঠলেন। সমস্বরে বলে উঠলেন, মাহমুদ ভাই এ কী চেহারা হয়েছে আপনার! রিমান্ডের নয়দিনে আয়না দেখার সুযোগ হয়নি, তাই শুভানুধ্যায়ীদের এতখানি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠার হেতু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভাবলাম, নয়দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হয়তো আমাকে ভয়ঙ্কর লাগছে। গাত্রবর্ণ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হওয়ায় সুদর্শন হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রিমান্ডের ধাক্কায় আজ চেহারার দিকে সম্ভবত তাকানোই যাচ্ছে না। হাসিমুখেই বললাম, আয়না তো দেখিনি, কেমন করে বলবো কী চেহারা হয়েছে। যে তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটটি আমাকে একটানা আটদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন, তারই এজলাসে আমাকে তোলা হলো। ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে একবারের জন্যেও তাকাতে আমার ইচ্ছে হলো না। সরকার এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বিতর্কের পুরোটা সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে সোজা বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রিমান্ডের যে চারদিন তখনও বাকি রয়েছে, সেটি পুরো করতে পরবর্তী অজানা গন্তব্যে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে আমি দৃষ্টিপাত না করলেও তিনি সম্ভবত মাত্র ক’দিনে আমার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকবেন। মামলার সব পক্ষকে অবাক করে আমাকে রিমান্ডে প্রেরণের পরিবর্তে জেলহাজতে পাঠিয়ে যথাযথ চিকিত্সার নির্দেশ দিয়ে বসলেন তরুণ সেই ম্যাজিস্ট্রেট। ভাবলাম সুপ্ত বিবেক হয়তো জেগে উঠেছে। আমার পক্ষের সবাই বেজায় খুশি। আমি কিন্তু কোনো আনন্দ অনুভব করছিলাম না। নয়দিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় আমি শারীরিক ও মানসিক উভয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার কাছে রিমান্ড সমাপ্ত না করে জেলহাজতে ফিরে যাওয়াটা উটকো ঝামেলার মতো বোধ হলো। ভাবছিলাম, সবটা একবারে সাঙ্গ করে জেলে ফিরলেই তো ভালো ছিল।
সন্ধ্যা পার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত নম্বর সেলে ফেরার আগেই লক-আপ হয়ে গেছে। আমার প্রতিবেশীরা যার যার সেলে বন্দি। জেলে আসার প্রথম রাতের মতো ড্রামের তোলা পানিতে গোসল করে আমিও ভেতরে ঢুকে গেলাম। ডিভিশন সেল থেকে পাঠানো খাবার দিয়ে রাতের আহার শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়লাম। দীর্ঘ নয় রাত পর এই ঘুম। নির্যাতন কিংবা হত্যার আশঙ্কা নেই এমন পরিবেশে ফিরে আসতে পেরে ঘুমটা লম্বাই হলো। সকালে উঠে নাস্তার পাট শেষ না হতেই জেল হাসপাতালের ডাক্তার এসে হাজির। আমার দিকে একনজর তাকিয়েই হাসপাতালে গিয়ে অন্তত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে অনুরোধ করলেন। কথা না বাড়িয়ে ডাক্তারের সঙ্গে গেলাম। প্রথমেই ওজন পরীক্ষা। নয় দিনের রিমান্ডে ওজনের দশ শতাংশ অর্থাত্ সাত কেজি কমে গেছে। অথচ ডায়াবেটিস পাওয়া গেল না। তবে দুই হাতের চামড়া টানলেই সাপের খোলস ছাড়ানোর মতো করে উঠে যাচ্ছে। অবাক কাণ্ড, আমি একটুও দুর্বল বোধ করছি না। সমস্যার মধ্যে কোমরে এবং ঘাড়ে স্পনিডলাইটিসের পুরনো ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। তারপরও আমি রিমান্ডে যাওয়ার জন্যে উদগ্রীব। জালিমকে মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি আমার শারীরিক অক্ষমতাকে অতিক্রম করে গেছে। ডাক্তারদের বললাম, সুপারের মাধ্যমে ডিবি অফিসে আমার সুস্থতার সংবাদ জানিয়ে দিতে। তারা কিছুতেই সম্মত না হয়ে পিজি থেকে ডাক্তার ডাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। একদিন পর পিজির ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বেশকিছু বেদনানাশক এবং বলবর্ধক ওষুধ পাঠালে আমি সেগুলো ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ করলাম। নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো জেলে বসে রিমান্ডের ডাকের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

যদি রাষ্ট্রদ্রোহ করেই থাকি, মহাজোট সরকারের উচিত আমাকে মিত্ররূপে বিবেচনা করা

জুনের ষোল তারিখে ম্যাজিস্ট্রেট আমার রিমান্ড সাময়িকভাবে স্থগিত করে ভগ্ন-স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য জেলহাজতে পাঠিয়েছিলেন। চার দিনের মাথায় কুড়ি তারিখ বিকালে ডিবি পুলিশের গাড়ি নাজিমউদ্দিন রোডে এসে উপস্থিত হলো আমাকে তাদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিতে। আমি অবশ্য নির্যাতনের শেষ দেখার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। দশ মিনিটের মধ্যেই সেই পুরনো সাদা ঝোলানো ব্যাগে টুকিটাকি জিনিস ভরে ডিবির গাড়িতে উঠলাম। এবার তথাকথিত উত্তরা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। মামলার আইও মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হলাম। ডিবির এই কর্মকর্তা ছাড়াও তার ঊর্ধ্বতন একজন এসি এসেছিলেন আমাকে নেয়ার জন্যে। তার ব্যবহারেও আপাত সৌজন্যের কোনো ঘাটতি পেলাম না।
ডিবি অফিসের সেই চেনা সেলেই স্থান হলো। সেখানকার কর্মকর্তারা এমনভাবে অভ্যর্থনা জানালেন যেন ক’দিন বিরতি শেষে পুরনো কর্মস্থলে ফিরে এসেছি। প্রথম রাতে জিজ্ঞাসাবাদ হলো না। দ্বিতীয় রাতে ডাক পড়ল ডিসির দোতলার পরিচিত কক্ষে। প্রশ্নকর্তারা গম্ভীর মুখে আসামির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হবেইবা না কেন? রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে। মোরশেদুল ইসলাম অভিযোগ পড়ে শোনালেন। ঘটনা কেবল চার বছরের পুরনোই নয়, বর্তমান সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের আড়াই বছর আগের। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে উত্তরায় আমার সিরামিক প্রতিষ্ঠানের ভাড়া করা অফিসে ডজনখানেক তরুণ সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে এক বৈঠকে আমি নাকি তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সরকারকে উত্খাতের ষড়যন্ত্র চালিয়েছিলাম। অভিযোগ শুনে হাসব না কাঁদব ভেবে পেলাম না। এই প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের বিরুদ্ধে সহিংস আন্দোলন চালাল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও তাদের মহাজোটের সঙ্গী-সাথী। তাদের লগি-বৈঠার নৃশংসতায় কত মায়ের বুক খালি হলো। দিনের পর দিন আন্দোলনকারীরা বঙ্গভবন অবরোধ করে রাখল। রাষ্ট্রপতির গ্যাস, পানি, বিদ্যুত্ তো বটেই, এমনকি আল্লাহর দেয়া অক্সিজেন পর্যন্ত বন্ধ করার হুমকি দিল। সেই সন্ত্রাসী আন্দোলনের ফসলস্বরূপ সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদীদের কাঁধে সওয়ার হয়ে এলো মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন। জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দীনের আশীর্বাদে ডিজিটাল নির্বাচনে ক্ষমতায় এলেন শেখ হাসিনা। আর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা আমার বিরুদ্ধে? আমি যদি সেই সময় তেমন কোনো উদ্যোগ নিয়েই থাকি, তাহলে মহাজোট সরকারের তো উচিত আমাকে তাদের মিত্ররূপে বিবেচনা করা। রিমান্ডে এনে নির্যাতন করার পরিবর্তে আমার তো পুরস্কার প্রাপ্য। ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে একবারও না থেমে আমার জবাব দিয়ে গেলাম। ডিসি মাহবুবুর রহমান একাধিকবার আমার বক্তব্যে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও আমি নাছোড়বান্দা। নিম্নোক্ত দশটি যুক্তি উপস্থাপন করলাম :
১. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনকে সর্বদা বেগম খালেদা জিয়ার তল্পিবাহকরূপেই বিবেচনা করে এসেছেন এবং তাকে খালেদার ইয়েসউদ্দিন নামকরণও করেছিলেন। আজ যেমন গোটাদশেক উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যার যার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, আমিও বেগম খালেদা জিয়ার তেমন একজন উপদেষ্টা ছিলাম। বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবেও দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আমি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছেই সরাসরি রিপোর্ট করতাম। এক-এগারো-পরবর্তীকালে ক্যান্টনমেন্টের কয়েকজন উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির ইশারায় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দলে সংস্কারের ধুয়া উঠলেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূলধারার প্রতি আমি বিশ্বাস ও আনুগত্যে অটল ছিলাম। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রকাশ্যে অভিযুক্ত সেই খালেদা জিয়ার কথিত তল্পিবাহক প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের সরকারের বিরুদ্ধে আমার ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব কোনো যুক্তিতেই ধোপে টিকবে না।
২. ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে এক-এগারো পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের সাংবিধানিক সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার সহিংস আন্দোলন করেছে। কাজেই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা বরং সেই সময়ের আন্দোলনকারী মোর্চার বিরুদ্ধেই দায়ের হওয়া উচিত।
৩. আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে বর্তমান সরকার নীতিগতভাবে মেনে নিচ্ছে যে, প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে উত্খাতের যে কোনোরকম প্রচেষ্টা রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়ে। জেনারেল মইন অস্ত্রের মুখে প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তিনি তত্কালীন বিমান ও নৌবাহিনী প্রধান এবং নবম ডিভিশনের জিওসি লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় বঙ্গভবনে যান এবং রাষ্ট্রপ্রধানকে দিয়ে জোর করে জরুরি অবস্থা জারি করান। এর চেয়ে প্রকাশ্য রাষ্ট্রদ্রোহ আর কী হতে পারে? সুতরাং আইনের শাসনে বিশ্বাস করলে অনতিবিলম্বে উল্লিখিত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রুজু করাই বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীনসহ সুশীল (?) সমাজের যেসব রথী-মহারথী সেই সময় এই চরম নিন্দনীয় অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে ছিলেন, তাদেরও আইনত একই মামলার আসামি হওয়ার কথা।
৪. এক-এগারো থেকে ডিজিটাল নির্বাচন পর্যন্ত মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যৌথ নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হয়েছে। আমি সেই সরকারের কঠোর সমালোচক ছিলাম। বস্তুত তখন থেকেই আমার লেখালেখির সূত্রপাত। সেই বিচিত্র সরকারের আমলেও প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা কি অবিশ্বাস্য ব্যাপার নয় যে, আমি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলাম, অথচ জরুরি আমলেও সেই কথিত অপরাধে তিনি এবং মিলিটারি জান্তা আমার বিরুদ্ধে মামলা তো দূরের কথা, কোনো অভিযোগই উত্থাপন করলেন না?
৫. উত্তরার তথাকথিত বৈঠক নিয়ে প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্কালীন কৃষি সচিব এমএ আজিজের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশনের প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়, ওই বৈঠকের সঙ্গে কোনোরূপ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় নাই। যেখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেক্ষেত্রে এই দীর্ঘ চার বছর পর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ উত্থাপন করা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক। কেবল তাই নয়, ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরেবর্তীকালে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমা করা হয় এবং তাদের বিভিন্ন স্থানে পদায়নও করা হয়। তত্কালীন কৃষি সচিব এমএ আজিজ জরুরি সরকারের আমলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। মহাজোট সরকারের আমলে তিনি কেবল তার পদ ধরেই রাখেননি, তাকে একাধিকবার এক্সটেনশনও দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ তিনি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জেনারেল মইনউদ্দিন আহমেদ, ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এবং শেখ হাসিনা—চারজনেরই অত্যন্ত বিশ্বস্ত।
৬. কয়েকজন নিম্নপদস্থ তরুণ আমলার পক্ষে সরকার উত্খাতের মতো ষড়যন্ত্র করা একেবারেই অবাস্তব। আমার অফিসের নৈশভোজে উপস্থিতদের অধিকাংশই সহকারী সচিব এবং উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। গুলশান-বারিধারা এলাকায় নিয়মিতভাবে আয়োজিত যে কোনো নৈশভোজে অন্তত গোটাছয়েক সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত থাকেন। বেচারা সহকারী সচিবদের একটিমাত্র অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জড়িত করা হলে সচিবদের বেলায় দায়ের করার মতো উপযুক্ত মামলার ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
৭. রাষ্ট্রদ্রোহের ষড়যন্ত্রের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে ধারাবাহিকতার প্রয়োজন হয়। উত্তরার ওই একটিমাত্র রাতের নৈশভোজ ব্যতীত ওইসব কর্মকর্তার সঙ্গে আমার রাষ্ট্রীয় কাজ ছাড়া আগে বা পরে কখনও সাক্ষাত্ হয়নি। ২০০৬ সালের ওই রাতের পর দীর্ঘ চার বছর অতিবাহিত হয়েছে। মাঝখানে ২০০৭ থেকে ২০০৮ একটি অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। অথচ ওইসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আর কোনো ষড়যন্ত্রে আমি জড়িত হলাম না। সেই তরুণ কর্মকর্তারা এখন কোথায়, কী দায়িত্ব পালন করছেন, তাও আমার অজানা।
৮. একটি নৈশভোজের তুচ্ছ ঘটনাকে রাষ্ট্রদ্রোহ আখ্যা দিয়ে মামলা দায়ের করা হলে ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের ঘটনাকে আমরা কি নামে অভিহিত করব? সেদিন কর্মরত সচিবরা দলবেঁধে একটি রাজনৈতিক দলের জনসভা মঞ্চে উঠে প্রকাশ্যে সেই দলটির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। সেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আজ কোন ধারায় মামলা দায়ের করা হবে? সেই সচিবদের মধ্যে একজন তো আজ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক-মণ্ডলী, প্রেসিডিয়াম সদস্য। একই ব্যক্তি শেখ হাসিনার গেলবারের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। জনতার মঞ্চের অন্য কুশীলবরাও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
৯. মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আর আজ ২০১০ সালের জুনের একুশ। এই দেড় বছরের মধ্যে সরকার আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার কোনো গরজ অনুভব করেনি। এমনকি এই মাসেরই ১ তারিখে গায়ের জোরে আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ এবং বানোয়াট মামলায় আমাকে গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত এজাতীয় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। মামলা দায়ের করা হলো আমি যখন জেলখানায় বন্দি। মামলাটি যে সর্বৈব মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক, এই সহজ বিষয়টি এরপরও কি বোঝার বাকি থাকে?
১০. আমার বিরুদ্ধে সব মামলার প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়-সংক্রান্ত একটি সংবাদ আমারই সম্পাদিত পত্রিকা আমার দেশ-এ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে। সেই সংবাদ প্রকাশের পর দেশে-বিদেশে আমার এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতার ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে, আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতারা দেশের বিভিন্ন জেলায় আমার বিরুদ্ধে পঁচিশটি মানহানি মামলা দায়ের করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে ডিও পাঠানো হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহের এই বানোয়াট মামলা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেই নির্দেশের বাস্তবায়ন মাত্র। দেশের প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকই বুঝবেন যে, এই মামলার সব কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকেই উদ্ভূত।
আমার বক্তব্য প্রদান শেষে স্বাভাবিকভাবেই ডিসির কক্ষের পরিবেশ আর বন্ধুত্বপূর্ণ রইল না। যথেষ্ট বিরক্তিসহকারে মাহবুবুর রহমান আমাকে তার বন্দিশালায় ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন।
বাইশ তারিখ বিকাল থেকেই লক্ষ্য করলাম সেলের বাইরে পাহারারত সেন্ট্রি এবং কর্মকর্তাদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। তারা যথাসম্ভব আমার দৃষ্টি এড়িয়ে চলছেন। আইও মোরশেদুল ইসলাম বারদুয়েক সেলের সামনে দিয়ে ঘুরে গেলেও আমার সঙ্গে কোনো বাক্যালাপ করলেন না। এর আগে এসেই সর্বপ্রথম কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। আজ আমাকে রীতিমত উপেক্ষা করলেন, ব্যবহারে ব্যতিক্রম চোখে পড়ার মতো। আমার সেলের লাগোয়া স্থানে যে ডিউটি অফিসার বসেন, তার সঙ্গে একবার অনুচ্চকণ্ঠে কিছুক্ষণ আলাপও করে গেলেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ আইও হন্তদন্ত হয়ে এসেই আর কোনো কথা না বলে আমাকে তক্ষুনি তৈরি হতে বললেন। এই রূঢ় আচরণে বেশ অবাক হলাম। দু’দফায় ডিবিতে সাত দিনের রিমান্ডের অভিজ্ঞতায় রাত এগারোটার আগে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হতে দেখিনি। ভাবলাম ডিসির অন্য কোনো কাজের ঝামেলা থাকায় আজ আগেই জিজ্ঞাসাবাদের পালা শেষ করতে চাইছেন। তৈরি হতে পাঁচ মিনিটের অধিক সময় নেইনি। সেল থেকে বের হয়ে স্যান্ডেলে সবে পা গলাচ্ছি, পাশ থেকে ডিউটি অফিসার ফিসফিস করে এক বোতল পানি সঙ্গে নিতে পরামর্শ দিলেন। পানি লাগবে কেন? বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে গেল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমার সামনে ঝকঝকে পানিভর্তি গ্লাস রাখা হলেও কোনোদিনই পান করার প্রয়োজন বোধ করিনি। আইও এবং অপর একজন ডিবি কর্মকর্তা আমাকে নিয়ে দোতলায় ওঠার পরিবর্তে যখন র্যাবের অপেক্ষমাণ গাড়ির দিকে রওনা দিল, তখন বুঝলাম আমার এতদিনের আশঙ্কা আজ সত্যে পরিণত হতে চলেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝকঝকে গাড়িটি জোড়া কেবিন পিকআপ। সম্ভবত চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই কেনা হয়েছিল। আমাকে মাঝখানে ঠেলে পেছনের কেবিনে দু’পাশে দুই কর্মকর্তা বসলেন। সামনের কেবিনে ড্রাইভার এবং আরও একজন কর্মকর্তা।
আমাদের গন্তব্য জানতে চেয়ে কারও কাছ থেকেই কোনো জবাব পেলাম না। পাথরের মতো মুখ সবার। আমি কেবলই ভাবছি, ক্রসফায়ারের জন্য সময়টা বোধহয় একটু আগে হয়ে গেল। এসব ঘটনা তো সচরাচর রাত তিনটা-চারটার দিকে ঘটে থাকে। পিকআপ রওনা হয়ে একটু এগোতেই একজন হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে থামতে বলল। আইও পিকআপ থেকে নেমে গেলেন। ভেতর থেকেই দেখলাম, মোরশেদুল ইসলাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে ডিবিরই একজন এসির সঙ্গে কথা বলছেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২০ তারিখে এই এসিই আমাকে নিয়ে এসেছিলেন। আইও ফিরে এলে গাড়ি আবার স্টার্ট দেয়া হলো। ডিবি অফিসের প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছে পৌঁছানোর আগেই আবারও বাধা। আইওর মোবাইলে কল আসায় তিনি নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। গাড়ির ভেতরে বসেই আছি। প্রায় পনেরো মিনিট পর আইও ফিরে এসে পিকআপের ড্রাইভারকে বললেন, আমরা যাচ্ছি না। মূল অফিসের সামনে পিকআপ ফিরে এলে আমাকে নামতে বললেন। যন্ত্রচালিতের মতো নেমে এলাম।
আমাকে সেলে ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে মোরশেদ কোনো কথা না বলেই চলে গেলেন। ডিউটি অফিসারের সামনে তখন আরও দু’জন ডিবির লোক সিভিল পোশাকে বসে গলা নিচু করে কথা বলছে। সম্ভবত একবারের জন্য টিএফআই শব্দটি শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে অস্ত্রধারী প্রহরীর সংখ্যা বাড়ল। হাজতের সামনে ডিউটি অফিসারদের বসার জায়গা পেরিয়ে যে কল্যাপসিবল দরজাটা আগে কোনোদিন বন্ধ হতে দেখিনি, সেই রাতে সেটিও বন্ধ করা হলো। সব মিলে থমথমে পরিবেশ। আমাকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা যে একটা চলছে, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না। সারারাত আর কেউ এলো না। রাত তিনটার দিকে গোসল করার সময় মনে হচ্ছিল এটা শেষ গোসলও হতে পারে। নোংরা টয়লেটে যথাসম্ভব পরিষ্কার করে গায়ে-মাথায় প্রচুর পানি দিয়ে গোসল করলাম। তাহাজ্জতের নামাজ কোনোদিন পড়িনি। কী মনে করে সেটাও সে রাতে পড়লাম। জীবনের সব ভুলভ্রান্তির জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করলাম। শুধু একটা দুঃখ থেকে গেল—আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী যাদের সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করেছি কিংবা কোনো অন্যায় করেছি, তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া হলো না। ফজরের নামাজ শেষ করে চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। তখন ছ’টা বেজে গেছে। কল্যাপসিবল গেট খুলে গেল। দেখলাম অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার এবং আমার আইও অসম্ভব গম্ভীর মুখ করে দ্রুত পায়ে সেলের দিকে এগিয়ে আসছেন।

চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরানো আমাকে নেয়া হলো জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে, ঘরটি অতিরিক্ত ঠাণ্ডা

হাজতের তালা খোলার আগেই আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। অপেক্ষমাণ র্যাবের পিক-আপের দিকে যেতে যেতে নিরাসক্তভাবে বললাম, টিএফআইতে যাচ্ছি, তাই না? আমার আকস্মিক প্রশ্নে দুই কর্মকর্তাই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে বোঝালেন, আমার ধারণা সঠিক। আজ পেছনের কেবিনে আমি এবং আইও মোরশেদুল ইসলাম উঠলাম। এসি বসলেন সামনে, ড্রাইভারের পাশে। ডিবি’র মেইন গেট পার হয়ে গাড়ি মিন্টো রোডে পড়তেই দেখি, রাস্তার অপর পাশের ফুটপাতে মা আরও কয়েকজনকে নিয়ে বসে আছেন। আমার মায়ের দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বান্ধবী সায়েরা খালাকেও দেখলাম। নয়া দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক নাজমুলকে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। তখন সকাল সাড়ে ছ’টা। গ্রেফতার হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মাকে ওভাবে ফুটপাতে বসে থাকতে দেখে কষ্টে বুক ভেঙে গেল। পরবর্তী সময়ে জেনেছি, ডিবিতে রিমান্ডের প্রতিটি দিন আমার মা এবং স্ত্রী তো বটেই, জাতীয়তাবাদী দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, বুদ্ধিজীবীরা দিন-রাত পালা করে আমার সংবাদের অপেক্ষায় এভাবেই মিন্টো রোডের রাস্তায় বসে থেকেছেন। আমার মতো অতিসাধারণ একজন ব্যক্তির জন্যে তাদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার ঋণ শোধ করব এমন সাধ্য আমার নেই। তবে আমৃত্যু তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব এই অঙ্গীকার করছি। গাড়ির ভেতরে আমাকে কেউ লক্ষ্য করলেন কি-না বুঝতে না পারলেও হাত নেড়ে উপস্থিতি জানান দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।
মিন্টো রোড ছেড়ে ভিআইপি রোড দিয়ে র্যাবের গাড়ি দ্রুত উত্তর দিকে ছুটতে লাগলো। টিএফআই (টাস্ক ফোর্স ইন্টেরোগেশন) সেল কোথায় জানি না। সেই মুহূর্তে টিএফআই’র পরিবর্তে আমার মাথায় মায়ের রাস্তায় বসে থাকার দৃশ্যই ঘুরছে। যথারীতি জাহাঙ্গীর গেট অতিক্রম করতেই ভাবলাম, ক্যান্টনমেন্টের কোনো গোপন স্থানে হয়তো আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খানিক বাদে ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে গাড়ি এয়ারপোর্ট রোডে প্রবেশ করলে সন্দেহ করলাম আমরা উত্তরার র্যাব-১ হেডকোয়ার্টারে যাচ্ছি। ঠিক তা-ই হলো। আমার সঙ্গের দুই ডিবি কর্মকর্তা আগে কখনও টিএফআই সেলে আসেননি। র্যাব-১-এ ঢুকেই তারা সেন্ট্রিকে জিজ্ঞেস করলেন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা বিশেষ সেলটি কোনখানে। একাধিক সেন্ট্রির সাহায্য নিয়ে সেই বিশেষ স্থানের সামনে গাড়ি দাঁড়ালো। দেখলাম সম্পূর্ণ আলাদা এক কম্পাউন্ড। উদ্যত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে র্যাবের কালো পোশাক পরিহিত সেন্ট্রি এগিয়ে এলে পরিচয় দেয়া হলো। আমরা ওখানেই গাড়ি রেখে হেঁটে সেই কম্পাউন্ডে প্রবেশ করলাম। মাঝখানে আসামি, দু’পাশে ডিবি কর্মকর্তাদ্বয়। পেছনে অস্ত্রধারী র্যাব সদস্য। দোতলা ভবনের নিচতলায় অস্ত্রাগার লেখা একাধিক কক্ষ লক্ষ্য করলাম। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠেই দেখি সামনের দরজা বন্ধ। সম্পূর্ণ স্টিলের পাতের দরজা। উপরের দিকে ছোট্ট একটি বর্গাকৃতি কাটা অংশ রয়েছে। সেটিও ভেতর থেকে অতিরিক্ত পাত দিয়ে বন্ধ করা। অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার কলিং বেলে চাপ দিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেই কাটা অংশটি খুলে গেল। আমরা বাইরে থেকে সেন্ট্রির চোখ দুটো এবং কপালের খানিকটা অংশ দেখতে পাচ্ছি। অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার এগিয়ে গিয়ে কথা বললেন। পাত বন্ধ হয়ে গেল। আবারও অপেক্ষা। এবার দরজা খুললো, আমরা টিএফআই সেলের ভেতরে ঢুকলাম। এই টিএফআই সেলে নির্যাতনের কত কাহিনী আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
ভেতরে যেতেই সম্ভবত নিম্নপর্যায়ের একজন তরুণ কর্মকর্তা একটা রেজিস্টার নিয়ে এলেন। ডিবি’র কর্মকর্তাদের সঙ্গেও সরকারি চিঠিপত্র ছিল। সেগুলো আদান-প্রদান, রেজিস্টারে লেখালেখির ফাঁকেই সিভিল পোশাকে দু’জন সেন্ট্রি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। একজনের হাতে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র এবং অন্যজনের হাতে কালো কাপড় ও হাতকড়া। আমরা একটা করিডোরের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি বাঁদিকে সাদা রঙের ভারি পর্দার ফাঁক দিয়ে অন্য একজন সেন্ট্রি আমাকে মনোযোগ দিয়ে দেখছে। রক্তচাপ যন্ত্র নিয়ে যে ব্যক্তি উপস্থিত হলো, তাকে বললাম আমার রক্তচাপজনিত কোনো সমস্যা নেই। সে জানালো রুটিন কাজটা করতেই হবে। মাপা হলো, যথারীতি ১২০ এবং ৮০। ছেলেটি একটু অবাক হয়েই আমার দিকে তাকালো। বোধহয় ভেবেছিল আতঙ্কে ততক্ষণে নিশ্চয়ই আমার রক্তচাপ অনেক চড়ে গেছে। হাতকড়া ও কালো কাপড়অলা আমার চশমা, ঘড়ি এবং আংটি নিয়ে নিল। হাতকড়া পরানোর সুবিধার্থে দু’হাত এগিয়ে দিলাম। চোখ বেঁধে ফেলার পর দাঁড়িয়ে আছি; দুই ডিবি কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। শুনতে পেলাম, তারা বলছেন সকালে আমি কিছু খাইনি, অতএব নাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
এবার সেলে যেতে হবে। চোখ বাঁধা, কিছু দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমাকে যে বাঁদিকে ঘোরানো হলো, সেটা টের পেলাম। পা থেকে স্যান্ডেল খুলে ফেলতে বলা হলো। তারপর একটা সেলে ঢুকিয়ে এক হাতের কড়া খুলে দিয়ে সেন্ট্রি বসতে বললো। আন্দাজে দেয়াল হাতড়ে বসে পড়লাম। জায়গাটা খুবই অপ্রশস্ত বোধ হলো। বসামাত্র সেন্ট্রি অপর হাতের সঙ্গে ঝুলতে থাকা হাতকড়া গারদের লোহার মোটা শিকের সঙ্গে আটকে দিল। ওই আটক অবস্থায় বসে থাকা খুবই অসুবিধাজনক। ঠেলেঠুলে কোনোরকমে বসলাম। সেলের একপাশের দেয়ালে পিঠ রেখে পা সোজা করার চেষ্টা করলাম। অপর পাশের দেয়ালটিকে পা দিয়ে স্পর্শ করতে পারলাম। আন্দাজ করলাম, সেলটি প্রস্থে হয়তো তিন ফুটের বেশি হবে না। ধাতস্থ হয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছি। অন্য সেল থেকে যন্ত্রণাকাতর গোঙানির আওয়াজ কানে ভেসে এলো। কোনো এক ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র চলারও প্রচণ্ড শব্দ পেলাম। পরে জেনেছিলাম, যন্ত্রটি বৃহদাকার এগজস্ট ফ্যান। আল্লাহ মানুষকে মানিয়ে নেয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন। আটকানো হাত নিয়েই কিছুক্ষণ কসরত করে দেখলাম, মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারছি। কী হতে যাচ্ছে, সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তার পরিবর্তে অতীতে ডুব দিলাম। ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর সেন্ট্রি নাস্তার থালা নিয়ে হাজির হলো। চোখের বাঁধন এবং লোহার শিক থেকে হাতকড়া খোলা হলো। সেলের সেই অন্ধকারে থালায় মনে হলো রুটি এবং জাউ জাতীয় বস্তু রয়েছে। প্রহরারত সেন্ট্রিকে জানিয়ে দিলাম আমি ক্ষুধাবোধ করছি না, সে নাস্তার থালা ফিরিয়ে নিতে পারে। কোনো কথা না বলে তরুণটি থালা ফিরিয়ে নিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক পরই আবার এসে জানালো, যেহেতু আমি নাস্তা খাচ্ছি না তাই আবার চোখ বাঁধা এবং হাতকড়া লাগানো হবে। আমি হেসেই জবাব দিলাম, অবশ্যই। মিনিট দশেক চোখ খোলা থাকার সুযোগে আমি চারপাশটা মোটামুটি দেখে নিয়েছি। সরু করিডোরের দু’পাশে সারি বেঁধে গোটা দশেক সেল। কোনো সেলেই বাতির কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই উচ্চতা ও লম্বার দিকটা ঠিক বোঝা গেল না। যথারীতি কালো কম্বল দেখতে পেলাম। আমি কম্বল সরিয়ে মাটিতেই বসে থাকলাম। আমার সেলের উল্টোদিকে আর একটা প্যাসেজের মতো রয়েছে; তার শেষ মাথায় টয়লেট এবং গোসলের স্থান। কোনো এক বন্দি হাতকড়া বাজিয়ে সেন্ট্রিকে ডাকলো। তাকে ধরে টয়লেটে নিয়ে যাওয়া হলো। বোঝা যাচ্ছিল নির্যাতনের ফলে বন্দিটির হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
আরও অন্তত এক ঘণ্টা পার হয়েছে। আগের সেই তরুণ সেন্ট্রি এসে গারদের তালা খুললো। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় হয়েছে। চোখ বাঁধা এবং হাতকড়া পরিহিত অবস্থাতেই জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। আমাকে একটা চেয়ারে বসানো হলো। সামনের টেবিলের সঙ্গে হাঁটুর ধাক্কা লাগাতে বুঝলাম প্রশ্নকর্তা টেবিলের ওপারেই। জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমার চৌদ্দ পুরুষের পরিচয় এবং জন্ম থেকে ব্যক্তিগত জীবনের যাবতীয় তথ্য নেয়া হলো। কত সময় লাগলো বলতে পারব না। তবে এক ঘণ্টার ওপরেই হবে। সেলে ফিরিয়ে দেয়ার আগে জানানো হলো, এটা ছিল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ, আসলটা নাকি দ্বিতীয় দফায় হবে। অন্ধের মতো সেলে ধরে নিয়ে এলো। দ্বিতীয় জিজ্ঞাসাবাদের আগে অল্প সময়ের অপেক্ষা। তবু আগের মতোই হাত আটকে রাখা হলো গারদের শিকের সঙ্গে। উদ্দেশ্য, শারীরিক অসুবিধা সৃষ্টিসহ মানসিকভাবে নির্যাতন করে মনোবল ভেঙেচুরে দেয়া।
ওই অবস্থায় পনেরো মিনিটও পার হয়নি, আসল জিজ্ঞাসাবাদের ডাক চলে এলো। এবার জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের বাইরে চোখের বাঁধন খুলে, বুকে আসামির নম্বর সেঁটে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তোলা হলো। এসব নাটকের উদ্দেশ্য ধারণা করলাম, আতঙ্কিত করার পাশাপাশি অসম্মান করা। ছবি তোলা শেষ হলে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে। কিছু দেখতে পাচ্ছি না, তবু যেন মনে হলো এটি ভিন্ন কক্ষ। প্রথমবারের মতোই একটা চেয়ারে বসলাম। নতুন প্রশ্নকর্তা তার কাজ শুরু করলেন। একই ধরনের প্রশ্নমালা, আরও একটু বিশদভাবে। প্রশ্নের মাঝখানে বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়া অস্বাভাবিক মনে হলো। চোখ বাঁধা থাকলেও অনুভব করা যাচ্ছিল একটা তীব্র আলো পাঁচ মিনিট পরপর জ্বলছে আর নিভছে। ভেবেছিলাম টিএফআই সেলের কোনো বিশেষ তরিকা হবে। কিন্তু প্রশ্নকর্তা জানালেন, আসলেই নাকি ঘণ্টায় বার দশেক করে বিদ্যুত্ যাওয়া-আসা করছে। কোনটি সঠিক আল্লাহই জানেন। সওয়াল-জবাব অন্তত এক ঘণ্টা চলার পর দরজা খোলার এবং অনেকগুলো জুতার আওয়াজ পেলাম। টের পেলাম প্রশ্নকর্তা মুখোমুখি চেয়ার থেকে উঠে কোনো বড়কর্তাকে সেখানে বসতে দিলেন। প্রশ্নের ধরন পাল্টে গেল। পনেরো মিনিট কথিত উত্তরা ষড়যন্ত্র নিয়ে কথাবার্তা হলো। দু’দিন আগে ডিবিতে দেয়া বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করলাম। মামলা সম্পর্কে প্রশ্নকর্তাদের উত্সাহে দ্রুতই ভাটা পড়লো। এবার বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনা। কেন আমি বিনা টেন্ডারে গ্যাস কমপ্রেসর ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগের সংবাদ ছাপতে গেলাম? সরকারের এ-জাতীয় সমালোচনা করার জন্যেই আমার আজকের দুরবস্থা, সেটাও জানানো হলো। একজন প্রশ্নকর্তা অন্য মিডিয়া মালিকদের মতো আমাকে সরকারের সঙ্গে মানিয়ে চলতেও পরামর্শ দিলেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি বিএনপি’র একজন নেতার নামও উল্লেখ করলেন। আমি জবাবে বললাম, আইন করে সেন্সরশিপ আরোপ করা হোক, আমাদের লেখার আর সুযোগ থাকবে না। কিন্তু গণতন্ত্রের ডঙ্কা বাজানো হবে আর আমরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ছাপতে পারব না—এমন দ্বিমুখী আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কথা প্রসঙ্গে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুত্ ক্রয় এবং ট্রানজিট প্রদান বিষয়ে আমার অনমনীয় অবস্থান নিয়েও আলোচনা হলো। আমি সোজাসুজি বললাম, বিনা টেন্ডারে বিদ্যুত্ কেনার জন্যে সরকার অবশ্যই একদিন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হবে। বিশেষত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান যখন সেই ব্যবসার সিংহভাগ দখল করে আছে, তখন জনমনে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। আর ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে বাংলাদেশের কোনোরকম অর্থনৈতিক সুবিধা তো হবেই না, উপরন্তু আমাদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। যে কোনো সময় আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে পারি—এই আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে খানিকটা রসিকতার সুরেই বললাম, আজ আমাকে বিনা অপরাধে যেমন করে আপনারা চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন—এমনও হতে পারে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুত্ কেনা এবং দেশের অপরিসীম ক্ষতি করে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার অপরাধে বর্তমান নীতিনির্ধারকদেরও ভবিষ্যতে এখানে একইভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমার কথা শুনে উপস্থিত কর্মকর্তারা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এবার একটা বিরতি দেয়া যাক। আমার সকাল থেকে কিছু না খাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে একজন কর্মকর্তা আমি কিছু খেতে চাই কি-না জানতে চাইলে এক কাপ চায়ের অনুরোধ করলাম।
সেলে ফিরে পূর্ববত্ হাতকড়া পরে বসে রইলাম। মিনিট দশেকের মধ্যেই এক কাপ চা, দুটো বিস্কুট এবং এক গ্লাস পানি এলো। সেলে বসেই একটা বিস্কুট দিয়ে চা খেলাম। পাহারারত সেন্ট্রি সহানুভূতি মেশানো কণ্ঠে আমাকে আর একটা বিস্কুট খেতে অনুরোধ জানালে কৃতজ্ঞচিত্তে ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে মাথা নাড়লাম। চা শেষ করতে না করতেই আবার জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে যাওয়ার সময় হলো। এবার সরাসরি অভিযোগ দিয়ে শুরু হলো। বিনিয়োগ বোর্ডে আমার নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হলো। আমি পরিসংখ্যান দিয়ে জানালাম, তাদের অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা। বরঞ্চ আমার দায়িত্ব পালনকালীন সর্বশেষ বছর ২০০৫-এ সেই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের ৩৪ বছরের মধ্যে এক বছরে সর্বোচ্চ ৮৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছিল। বাস্তবতা হলো, মহাজোট সরকারের শাসনামলে বিদেশি বিনিয়োগে ধস নেমেছে। এই ব্যর্থতার জন্যে বিনিয়োগ বোর্ডের বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. সামাদকে আমার মতো চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে টিএফআই সেলে নিয়ে এসে নির্যাতন করা হবে কি-না, নির্দোষভাবে তাও জানতে চাইলাম। একজন একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, আপনার ওপর আমরা কোনো নির্যাতন করিনি। নির্যাতনের কী দেখেছেন আপনি? আমিও বলে উঠলাম, ৫৭ বছর বয়সে অন্ধকূপের মতো একটা সেলে গারদের শিকের সঙ্গে হাতকড়া দিয়ে আটকে, কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে আমাকে ফেলে রেখেছেন, অবমাননাকরভাবে দাগী আসামির মতো বুকে নম্বর সেঁটে আমার ছবি তুলছেন, ব্যঙ্গাত্মকভাবে নানারকম প্রশ্ন করছেন, আমার সংসারের মানুষগুলো জানে না আমি এখন কোথায়, কীভাবে আছি। এটা নির্যাতন নয়? এখন শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দিচ্ছেন। কক্ষে উপস্থিতদের মধ্যে যিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি এই তর্ক আর বাড়তে দিলেন না। এরপর সুশাসন নিয়ে কিছুক্ষণ মতবিনিময় হলো। বিদ্যমান ভয়াবহ বিদ্যুত্ সমস্যা সমাধানে আমি কয়েকটি পরামর্শ দিয়ে বললাম, ইচ্ছে হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। ঘণ্টা দুয়েক পর অনেকটা আকস্মিকভাবেই একজন বলে উঠলেন, আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই, আপনাদের না থাকলে ওনাকে ছেড়ে দিতে পারেন। মিনিটখানেক সবাই চুপ করেই রইলেন। তারপর একাধিক চেয়ার সরানোর শব্দে বুঝলাম, সবাই ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। পাঁচ মিনিট মতো একাই বসে রইলাম। তারপর একজন এসে সেলে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিম ও ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার অনুরোধ করলে আমি সম্ভব হলে আর এক কাপ চা চাইলাম। আন্দাজ করছিলাম, ততক্ষণে তিনটে বেজে গেছে। সেলে ফেরার পর চোখ না বেঁধেই কিছুক্ষণ রাখা হলো। একহাতে হাতকড়া ঝুলছে, অন্য হাতটা মুক্ত। অল্প সময়ের মধ্যেই চা, বিস্কুট, পানি ট্রেতে করে নিয়ে আসা হলো। আগের বারের মতোই একটা বিস্কুট এবং চা খেলাম। একজন সেন্ট্রি ট্রেটা নিয়ে যাওয়ার পর অন্য একজন যথেষ্ট বিনীতভাবে চোখ বাঁধবার এবং হাতকড়া পরানোর অনুমতি চাইলেন। এখানে আমার ইচ্ছের কোনো মূল্য না থাকলেও সেন্ট্রিটির সৌজন্য ভুলব না কোনোদিন। মনে ভরসা ফিরে এলো। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত বিদ্বেষজনিত কারণে আমার প্রতি যতই কূপিত হন না কেন, দেশের জনগণ যে আমার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে, তার প্রমাণ পেলাম টিএফআই সেলের সেন্ট্রির মমত্ববোধ প্রদর্শনে।
এবার অপেক্ষার পালা। প্রচলিত আইন অনুযায়ী আজই আমাকে রিমান্ড শেষে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করার কথা ছিল। বর্তমান সরকার আইনের যে কোনো তোয়াক্কা করে না, সেটা অবশ্য দেশের তাবত্ নাগরিক জানেন। বিকেল পাঁচটায় সিএমএম আদালতের দিনের কার্যক্রম শেষ হবে। ঘড়ি দেখার সুযোগ না থাকলেও সময় যে ততক্ষণে বিকেল চারটা পার হয়ে গেছে, সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে উত্তরা থেকে জনসন রোড পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং, আজ অন্তত আমার রিমান্ড শেষ হচ্ছে না। পার্শ্ববর্তী সেলগুলো থেকে কখনও শেকলের শব্দ, কখনও বা অস্ফুট গোঙানির শব্দে জীবিত মানুষের অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলাম। আমি নস্টালজিক প্রকৃতির লোক। চোখ বুজলেই ৫৭ বছরের স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। পাঠক হয়তো ভাবছেন আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটলো নাকি। কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা লোকের আবার চোখ খোলা আর বোজা। উভয় অবস্থাতেই তো সামনে নিকষ কালো অন্ধকার। তবে পার্থক্যটা হৃদয়ের। সেটা অনুভব করতে হলে ওই ধরনের নির্যাতনপুরীতে চোখ এবং হাত বাঁধা অবস্থায় সেল নামক অন্ধকূপে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চরম অনিশ্চয়তাময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে। অনুভব করছি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। কালো কাপড়ের ওপারে সামান্য যে ছায়ার মতো এতক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলাম, সেটাও ক্রমেই আঁধারের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। সারারাত ওখানে থাকার জন্যে মানসিক শক্তি অর্জন করবার প্রাণপণ চেষ্টা করছি। জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে ক্ষণিকের জন্যে চোখের বাঁধন আলগা হয়ে গিয়েছিল। কাপড়টা আবার শক্ত করে বাঁধার ফাঁকে দেয়ালে ঝোলানো একটা ফ্রেম দেখতে পেয়েছিলাম। সেই ফ্রেমে আটকানো ড্রিল মেশিন, হাতুড়ি, চিজেল, ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি জাতীয় বেশ কয়েকটি যন্ত্রপাতি নজরে পড়েছিল, যেগুলো কোনো মেশিন-টুলস্ কারখানায় থাকাই বেশি মানানসই হতো। আমার শরীরের কোন অংশে কোন যন্ত্রটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে ভাবছি, এমন সময় গারদের তালা খোলার শব্দে চমকে উঠলাম। একজন সেন্ট্রি চোখের কাপড় এবং হাতকড়াটা খুলে দিলে অবাক হয়ে তাকালাম। আরও বিস্মিত হলাম যখন সকালে আমার পা থেকে খুলে নেয়া স্যান্ডেলটা ফেরত দেয়া হলো। তবে কি টিএফআই রিমান্ড থেকে মুক্তি মিলছে? করিডোরের সামনে ঝোলানো ভারি পর্দাটা সরিয়ে বাইরে বেরোতেই দেখি, মামলার আইও মোরশেদুল ইসলাম বেশ উত্কণ্ঠিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। টিএফআই সেলেরই একজন সেন্ট্রি একটা মোটা খামের ভেতর থেকে আমার চশমা, ঘড়ি এবং আংটিটা বের করে হাতে দিলেন। দোতলার সেই রহস্যময় স্টিলের দরজা খুলে দেয়া হলো। যত দ্রুত সম্ভব পা চালিয়ে টিএফআই কম্পাউন্ডের বাইরে অপেক্ষমাণ ডিবি’র সাদা রঙের মাইক্রোবাসে উঠে পানি চাইলাম। ছিপি খুলে পানির বোতলটা মুখে দিতে যাব, এমন মুহূর্তে অস্ত্র হাতে কালো পোশাক পরিহিত একজন র্যাব সৈনিক এসে হাজির। রহস্যের তখনও বাকি আছে।

টিএফআই সেলে নেয়ার বৈধতার প্রশ্ন কোর্টে তুললে সরকারপক্ষ বলে আমাকে নাকি সেখানে নেয়াই হয়নি

মোরশেদুল ইসলাম জানালেন, নির্দেশ এসেছে, টিএফআই সেলে ফিরতে হবে। পানির বোতলটা মুখ থেকে সরিয়ে ডিবির গাড়ি থেকে নামলাম। টিএফআই কম্পাউন্ডে ঢুকতেই আবার চোখ বাঁধা হলো। তবে কী কারণে জানি না, হাত দুটো মুক্তই রইল। ধরে নিয়ে যাওয়া হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেই জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেন্ট্রি বা কর্মকর্তা কেউ এলেন। আঙুলের ছাপ না দিলে এবং কয়েকটি কাগজে সই না করলে আমাকে ছাড়া হবে না। একটু হেসেই বললাম, আপনাদের এসব কাগজের তো আইনত কোনো মূল্য নেই। অপরপক্ষ নিরুত্তর। বুঝলাম কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। কাগজপত্র আনা হলো। চোখ বাঁধা, তাই কাগজ কি সাদা না তাতে কিছু লেখা রয়েছে, সেটা বলতে পারব না। বিনা বাক্যব্যয়ে দশ আঙুলের ছাপ দিলাম, সম্ভবত কাগজের পাশের দিকে সংক্ষেপে নামের আদ্যাক্ষর লিখেও দিলাম। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে সর্বোচ্চ দশ মিনিট লাগল। একজন র্যাব সৈনিক এবং আইও চোখ বাঁধা অবস্থাতেই আমার দু’ হাত ধরে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এলেন। আসার সময় মন্তব্য করলাম, খানিক আগে তো চোখ খোলা অবস্থাতেই গাড়িতে উঠেছিলাম। এখন চোখ বেঁধে কী লাভ? টিএফআই সেলের যা দেখার, তা তো দেখেই ফেলেছি। বলা বাহুল্য, কেউ কোনো উত্তর দিলেন না।
এবার বিনা বাধায় র্যাব-১ এর সদর দফতর পার হতে পারলাম। গাড়ি এয়ারপোর্ট রোডে পৌঁছানোর পর মোরশেদ দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, টিএফআইতে বিলম্বের কারণে আজ আর সিএমএম আদালতে যাওয়া যাচ্ছে না। আরও একটি রাত আমাকে ডিবিতে রাত্রিযাপন করতে হবে। মিন্টো রোডে পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। পথিমধ্যে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো, আমি সুস্থ শরীরে ছাড়া পেয়েছি। টিএফআই থেকে মুক্তি পেয়ে স্বস্তি বোধ করলেও এখানে এনে অপমান করার কষ্ট মন থেকে দূর করতে পারছিলাম না। ওই স্থানে লোমহর্ষক নির্যাতনের যে সব কাহিনী শুনেছি, সৌভাগ্যবশত আমার ক্ষেত্রে চোখ বেঁধে রাখা এবং হাতকড়া পরিয়ে শিকের সঙ্গে আটকে রাখা ছাড়া আর কিছু না ঘটলেও ভেবে পাচ্ছিলাম না কোন অপরাধে আমাকে টাস্কফোর্স ইন্টেরোগেশনের মুখোমুখি করা হলো। আমি চোর-ডাকাত নই, সন্ত্রাসী নই, কোনোদিন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, সব সময় জাতির স্বার্থে কাজ করেছি। কেবল সরকারের রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনামূলক লেখালেখির জন্যই কি আজ টিএফআই সেল দর্শন? আওয়ামী সমর্থক কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবীরাই তো বাংলাদেশের প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে দখল করে আছেন। কলমের জবাব তারা তো কলম দিয়েই দিতে পারতেন। বন্দুক দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমরা গুটিকয়েক ব্যক্তি মাত্র এতদিন মহাজোট সরকারকে ফ্যাসিস্ট নামে সম্বোধন করে এসেছি। এখন সারা বিশ্ব তাদের ওই নামে অভিহিত করবে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্যাতন করেছেন, আমার পরিবারকে হয়রানি করছেন। সে ক্ষমতা তার রয়েছে। এই নির্যাতনের মাধ্যমে প্রতিহিংসা পূরণ করে তিনি এক প্রকার মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি লাভবান হয়েছেন কি? যে বিশেষ সংস্থাগুলো আমার গ্রেফতার ও নির্যাতন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের ক্রেডিবিলিটি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাড়ল না কমল!
ডিবি অফিসে যখন ফিরলাম, ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বলতে গেলে আটচল্লিশ ঘণ্টায় কয়েক কাপ চা এবং বিস্কুট ছাড়া আর কিছু পেটে পড়েনি। ডিবির কর্মকর্তারা কিছু খেতে অনুরোধ করলেও আমার তখন প্রয়োজন গোসল করে টিএফআই সেলের ক্লেদ যথাসম্ভব ধুয়ে ফেলা। অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে পূর্ববত্ খালি গায়ে ফ্যানের বাতাসে গায়ের পানি শুকালাম। সেই রাতে ভাত খেলাম। মেলামাইনের রংচটা প্লেটে ভাত এবং ডিমভাজি আর বাটিতে ডাল এলো। মাটিতে কাগজ বিছিয়ে রাতের আহারপর্ব শেষ করলাম। ডিউটি অফিসার দেখলাম উসখুস করছেন। জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাতেই জানতে চাইলেন, আমি সুস্থ আছি কিনা। প্রশ্নের নিগূঢ় অর্থ হচ্ছে টিএফআই সেলে নিয়ে আমাকে পেটানো হয়েছে কিনা। তাকে ভরসা দিয়ে বললাম, তেমন কিছু ঘটেনি, আমি ভালোই আছি। রাতে ডিসি-ডিবির কক্ষে ডাক পড়ল। জিজ্ঞাসাবাদ আর হলো না। আমাকে শুধু জানানো হলো, পরদিন আমার রিমান্ড শেষ হচ্ছে এবং দুই দফায় ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে আমি কাল সিএমএম আদালত থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরে যাচ্ছি। ডিসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজ সেলে ফিরে এলাম। সে রাতেও রুটিনের কোনো পরিবর্তন হলো না। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
২৪ জুন দুপুর একটায় আমাকে ডিবির গাড়িতে তোলা হলো। আদালতে আজ আর প্রিজন ভ্যানে যাচ্ছি না। বিদায়ের সময় এসিসট্যান্ট কমিশনার জানতে চাইলেন, মুক্ত জীবনেও আমি এমনই স্বল্পাহারী কিনা। তিনি আমাকে আটদিন এখানে প্রধানত চা এবং বিস্কুটের উপরেই কাটাতে দেখেছেন। চলে যাওয়ার দিনে তার বিস্ময় আমার কাছে প্রকাশ করলেন। কোর্ট গারদ হয়ে আদালতে যখন তোলা হলো, তখন প্রায় তিনটা বাজে। কাঠগড়ার দিকে এগিয়েই থমকে গেলাম। এমপি শাম্মীর পাশে আমার বেবী খালা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমার মায়ের একমাত্র সহোদর বোন। আমার একমাত্র মামা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং এনবিআর-এর সদস্য এম আই খান ২০০৬-এ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেছেন। খালাকে দেখে প্রচণ্ড রেগে গেলাম। আদালতের ও রকম পরিবেশে আমার পরিবার থেকে কোনো মহিলা যাতে না আসেন, পারভীনকে সেই অনুরোধ করেই গ্রেফতার হয়েছিলাম। আমার দীর্ঘদিনের রিমান্ড প্রিয়জনদের মনে কী অসহনীয় যাতনার সৃষ্টি করেছে, আমি সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইলাম না। তাদের মধ্য থেকে অন্তত একজন স্বচক্ষে আমি জীবিত এবং সুস্থ আছি দেখার জন্যই যে পুরনো ঢাকার এই আদালত কক্ষে ছুটে এসেছেন, সেই অনুভূতি আমাকে তখন স্পর্শ না করলেও আজ লেখার সময় মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। আমি খালাকে বললাম, তিনি ওখান থেকে না গেলে আমি কোনো অবস্থাতেই কাঠগড়ায় উঠব না। চোখ মুছতে মুছতে খালা চলে গেলেন। আপনজনের সঙ্গে আমার এই রূঢ় আচরণ যে তাদেরই সম্মান রক্ষার জন্য, সেটা তারা উপলব্ধি করবেন কিনা আমার জানা নেই।
আমার অসহায় ক্রোধের প্রকাশ দেখে শাম্মীসহ সবাই নিশ্চুপ; কাঠগড়ায় উঠে সানাউল্লাহ ভাইকে ডেকে টিএফআই সেলের অভিজ্ঞতা নিজমুখে বর্ণনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। আমার বক্তব্য ছাড়া আজকের আদালতের কার্যক্রমে কোনো বৈচিত্র্য নেই। আগেই জেনেছি সরকারপক্ষ নতুন করে আর রিমান্ড চাইবে না। সুতরাং, এক্ষেত্রে আমার আইনজীবীদের কোনো বক্তব্য নেই। প্রথা অনুযায়ী আইনজীবীরা আমার জামিন চাইবেন এবং সরকারি পিপির তীব্র বিরোধিতার মুখে ম্যাজিস্ট্রেট জামিন নামঞ্জুর করে আমাকে জেল হাজতে প্রেরণ করবেন। বিচারের আগেই রায় মোটামুটি আমাদের জানা। ম্যাজিস্ট্রেট বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিলে সংক্ষেপে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আমাকে টিএফআই সেলে নেয়ার আইনগত বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করলাম। সরকার পক্ষের জবাব শুনে বিস্ময়ে আমি হতবাক। তারা বলে উঠলেন, আমাকে নাকি টিএফআইতে নেয়াই হয়নি। আদালতে আমি যা কিছু বলছি, সবই নাকি আমার কল্পনাপ্রসূত। আমার কল্পনাশক্তির প্রতি সরকারের এই অপার আস্থায় বিমোহিত হলাম। সেই সঙ্গে সরকারের প্রতি এক প্রকার করুণাবোধও হলো। আমাকে আইন-বহির্ভূতভাবে টিএফআই সেলে নেয়ার পর যে জালিম সরকারকে এমন নির্জলা মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, তার কারণ তারা নৈতিকভাবে ইতোমধ্যে পরাজিত হয়েছে। এই মহা পরাক্রমশীলদের আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার মতো মনের জোর আর অবশিষ্ট নেই। যেসব পিপি ৭ জুন আমার রিমান্ড শুনানিতে অশালীন সব অঙ্গভঙ্গি করে আমাকে গালিগালাজ করেছে, তাদেরই মুখ থেকে শুনলাম, উনি সম্মানিত ব্যক্তি, আইন মান্য করে সৌজন্যের সঙ্গে ওনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অধিকতর বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। গাত্রবর্ণে আমার চেয়েও পাকা এক পিপি অনেক ইতর বিশেষণের সঙ্গে আমাকে সেদিন টাউট বলেও সম্বোধন করেছিল। আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সেই একই ব্যক্তি আজ কাঠগড়ায় আমার কাছে এসে বলল, আমি আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করি। কথাটি বলেই সে দ্রুত পায়ে আদালত থেকে বের হয়ে গেল।
জেলে যেতে হবে। আমি কাঠগড়া থেকে নেমে এলে সবাই আদালতে উকিলদের জন্য নির্ধারিত বেঞ্চে বসে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার অনুরোধ জানালেন। আদালতের অনুমতি আগেই নেয়া ছিল। বাসা থেকে খাবার এসেছে। সেগুলো না খেলে পারভীন আর মাকে সামলানো যাবে না। সাংবাদিক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ঘর ভরে ফেলেছেন। আমার দুই হাতের অবস্থা দেখে তারা চমকে উঠলেন। সাপের খোলস ছাড়ানোর মতো তালু এবং উল্টো পিঠে চামড়া ওঠা তখনও চলছে। সহকর্মী সৈয়দ আবদাল আহমদের সঙ্গে ‘আমার দেশ’ আবার চালু করার আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করলাম। সর্বমোট আধ ঘণ্টাখানেক শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে কাটিয়ে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। জেল গেটে এসে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক কর্মীদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় মনে হলো, কতদিন বাদে মুক্ত জীবনে ফিরব সেটা একেবারেই অনিশ্চিত। গ্রেফতার হওয়ার পর চব্বিশ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে আমারই নির্দেশ রক্ষা করতে গিয়ে মা এবং পারভীনের সঙ্গে দেখা হয়নি। টিএফআই সেলে নেয়ার প্রত্যুষে দূর থেকে মাকে এক নজর দেখেছিলাম ফুটপাথে বসে থাকতে। পারভীনকে দেখার সুযোগ হয়নি। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রিমান্ড জীবনের অপমান, নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করতে করতে সাত নম্বর সেলের দিকে দ্রুত গতিতে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় দূর থেকে একজনের চিত্কারে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। দেখলাম শেষ বিকেলে দলবেঁধে গল্পরত বন্দিদের মধ্যে আমার কাছাকাছি বয়সেরই একজন দূর থেকে হাতের ইশারা করে লেখার ইঙ্গিত করছেন। আমি মুখ তুলে তাকাতেই উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, স্যার কলম যেন বন্ধ না হয়। এতক্ষণের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আবেগে ভেসে গেল। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। কিন্তু আগের গতি আর রইল না। ঝাপসা চোখে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বাকি পথ অতিক্রম করে সেলে ফিরলাম। সেখানে আমার প্রতিবেশীরা অকৃত্রিম উত্কণ্ঠা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। টিএফআই সেলে নেয়ার সংবাদ আমি আসার আগেই বিভিন্ন সূত্রে তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। কুশলবিনিময় শেষে আপন কুঠুরিতে ঢুকলাম। শুরু হলো দীর্ঘ, অনিশ্চিত জেল জীবনে ফ্যাসিবাদের অত্যাচার, হয়রানি, অপমানকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার লড়াই।

রিমান্ডে নির্যাতন বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা দেশকে ’৭০-এর আর্জেন্টিনা-চিলিতে পরিণত করেছে

রিমান্ডের অভিজ্ঞতা বর্ণনা সমাপ্ত করেছি। এবার জেল জীবনের গল্প বলার পালা। তবে তার আগে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়াবহতা নিয়ে দুই-একটি কথা বলা আবশ্যক। রিমান্ডের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করে জেলখানার তুলনামূলক নিরাপদ জীবনে ফেরার দিন কয়েকের মধ্যে লোকমুখে শুনলাম, চৌধুরী আলম নামে বিএনপিপন্থী ঢাকার এক জনপ্রিয় কমিশনারকে সাদা পোশাকের পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাহাকে তদতিরিক্তকাল আটক রাখা যাইবে না।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের সমর্থনপুষ্ট মহাজোট সরকার সংবিধানের যে কোনো রকম তোয়াক্কা করে না, সেটা সরকারের দেড় বছরের কাজ-কারবার দেখার পরও এদেশের জনগণ যদি বুঝতে না পেরে থাকেন, তবে সেটা তাদেরই অপরাধ।
বিদেশি প্রভুদের নির্দেশমতো আমাদের সংবিধানের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মনগড়া ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য তথাকথিত সংবিধান বিশেষজ্ঞরা যে একপায়ে খাড়া থাকেন, তার প্রমাণ এক-এগারোর সময়ই আমরা হাতেনাতে পেয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিন মাসের মেয়াদকে কী চমত্কারভাবেই না ইলাস্টিকের মতো টেনে দুই বছর করা হলো। সেই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা না থাকলেও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ প্রতিবেশী পরাশক্তির পায়ে বিকিয়ে তারা দেদার এ জাতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অগ্রজপ্রতিম বন্ধু ফরহাদ মজহার প্রায়ই বলে থাকেন, বাংলাদেশের সংবিধান কয়েকজন উকিলের কাট অ্যান্ড পেস্ট (ঈঁঃ ্ চধংঃব) অপারেশনের ফসল, এই দলিল প্রণয়নে জনগণের কোনো ভূমিকা ছিল না। সংবিধান রচয়িতার দাবিদার সেই উকিলরাই তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের নির্দেশে এক-এগারোকে জায়েজ করার জন্য সংবিধানের বিচিত্র সব ব্যাখ্যা দিয়ে সেই সময় জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন। সময়-সুযোগ বুঝে মুখে মানবাধিকারের ফুলঝুরি ছোটালেও জরুরি সরকারের ভয়াবহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মেনে নিয়ে দেশে-বিদেশে তাদের পক্ষে ওকালতি করতে সুশীল (?) সমাজের চাঁইদের বাধেনি। অসংখ্য ব্যক্তির কাছ থেকে অভিযোগ শুনেছি, সেই সময় সংবিধানের ৩৩ ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের নাকি মাসাধিককাল নির্জন স্থানে আটকে রেখে বর্বর নির্যাতন করা হয়েছে। কেউ কেউ চিরদিনের মতোই নিখোঁজ হয়ে গেছেন। আজ নির্বাচিত সরকারের আমলে নিখোঁজ চৌধুরী আলমের এমন পরিণতি কল্পনায় আনাটাকেও আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের ভীরুতা ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলেই মনে করি। বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ চরিত্রগতভাবে ফ্যাসিবাদী হওয়ায় দলটির নেতাকর্মীরা মানবাধিকারে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না। তদুপরি বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মানবাধিকার প্রশ্নে দুর্ভাগ্যজনক নির্লিপ্ততা বাংলাদেশকে ক্রমেই একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ঙ্কর এবং চরম নিন্দনীয় সংস্কৃতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মরহুম পিতা স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকেই আরম্ভ করেছিলেন। সেই সময় সিরাজ সিকদারের মতো বামপন্থী-বিপ্লবী নেতাকে পুলিশ হেফাজতে কেবল ঠাণ্ডামাথায় খুন করাই হয়নি, তত্কালীন সংসদে এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে উল্লাস এবং দম্ভ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই ফ্যাসিবাদী অপশাসনের সাড়ে তিন বছরে তিরিশ হাজার ভিন্ন মতাবলম্বী মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষীবাহিনী এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ হত্যা করেছে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে চারদলীয় জোট সরকার আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন কৌশলের নামে উদ্ভট, অমানবিক এবং চরম নির্যাতনমূলক ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা করে। একই সরকারের সময় এলিট পুলিশ বাহিনী গঠনের নামে র্যাবের আবির্ভাব চিরস্থায়ীভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ করে দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে যতদূর শুনেছি, ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা এবং র্যাব গঠনে মানবাধিকারের ধ্বজাধারী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মৌন সম্মতি ছিল। অবশ্য যতদূর স্মরণে পড়ছে, অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালীন সেনা হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা অন্তত প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এক এগারো এদেশে মানবাধিকারের সংজ্ঞাকেই পাল্টে দিয়েছে। সেই সময় থেকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উপেক্ষা করার যে নীতি উক্ত কূটনীতিকরা অনুসরণ করে চলেছেন, তা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। ক্রসফায়ারের পর গুম-খুনের নতুন পদ্ধতি এদেশে চালু হওয়ার পরও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট নির্দ্বিধায় বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগুচ্ছে বলে সার্টিফিকেটও দিয়েছে। আমার গ্রেফতারের কিছুদিন আগে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কিত এক ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে ইইউ রাষ্ট্রদূত স্টিফেন ফ্রয়েনকে নির্দ্বিধায় বলতে শুনেছিলাম, বর্তমান সরকারের আমলে ক্রসফায়ারের সংখ্যা কমাতেই তিনি বেজায় সন্তুষ্ট। কিন্তু, আমরা সংবাদ মাধ্যমে যারা কাজ করছি, তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উল্টো চিত্রই দেখতে পাচ্ছি।
শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে তিনি একাধারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতের বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হতে পেরেছেন। বিদেশে এমন বন্ধুভাগ্য থাকলে বাংলাদেশের জনগণকে গরু-ছাগল গণ্য করে নির্বিচারে নির্যাতন বা হত্যা করার অধিকার অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লাভ করা যায়। স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের জন্য এক ‘সুবর্ণ’ সুযোগ এনে দিয়েছে। আর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে যে রাজনীতি চর্চা হচ্ছে, তাকে সরাসরি ইসলাম-বিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা ইউরোপের অব্যাহত সমর্থন লাভের অব্যর্থ কৌশল হিসেবে ডিজিটাল সরকার দেশে নিত্য-নতুন কথিত ইসলামী জঙ্গি আবিষ্কার করে চলেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা বিস্তৃত এবং ধোঁয়াশাচ্ছান্ন করে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে, যার ফলে কোনো গৃহে ইসলাম ধর্মবিষয়ক বই-পত্র পাওয়া গেলেই তাকে জেহাদি প্রকাশনা নাম দিয়ে নির্বিচারে গ্রেফতার করা যায় এবং জনগণের সকল মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হলেও সমালোচনার তেমন কোনো আশঙ্কা থাকে না। একটি কুমিরের ছানা বার বার দেখানোর গল্পের মতো করে ইসলামী জঙ্গি ইস্যুকে এই সরকার সাফল্যজনকভাবে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, হিযবুত তাহরীর, জেএমবি এবং হরকাতুল জেহাদ (হুজি)—এই চারটি সংগঠন নিয়েই এখন সংবাদ মাধ্যমে সর্বাধিক চর্চা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া বাকি তিনটি সংগঠনই সন্ত্রাসের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত আইনত একটি বৈধ রাজনৈতিক দল হলেও এবং সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, সরকার দলটিকে তাদের সংবিধান প্রদত্ত কোনোরকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দিচ্ছে না। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের সঙ্গে এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার প্রচারণাও ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীরা রাখ-ঢাক না করেই দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী এবং হিযবুত তাহরীরের নেতাদেরকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়ার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যেসব সত্য-মিথ্যা তথ্য সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস করছেন, সেখান থেকে ধারণা করে নেয়া সহজ যে উভয় দলকেই সরকার সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত করে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ রূপে দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের কাছে উপস্থাপন করার কৌশল নিয়েছে। অথচ এই দুটো দল কোনোদিন বন্ধুভাবাপন্ন ছিল এমন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। হিযবুত তাহরীর আদর্শগতভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হওয়ার কারণে তারা জামায়াতে ইসলামীকে সর্বদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতি দুর্বল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেছে। তদুপরি ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকার জন্য হিযবুত তাহরীর তাদের সঙ্গে একটা দূরত্বও বজায় রেখেছে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতারা হিযবুত তাহরীরের কর্মকাণ্ডকে হঠকারী বিবেচনা করার পাশাপাশি তাদেরকে ইসলামী আন্দোলনে বাধা হিসেবেও মনে করে। এই প্রসঙ্গে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালীন একটি ঘটনার উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছি। আমি তখনও আমার দেশ পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করিনি বিধায় আমার লেখালেখির একমাত্র জায়গা ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকা। প্রতি বুধবার সেখানে কলাম লিখতাম। সেই সময় প্রথম আলোর ফান ম্যাগাজিনে আমাদের মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর প্রিয় সাহাবি হজরত আবু হুরায়রাকে (রা.) ব্যঙ্গ করে ছড়াসহ একটি কার্টুন ছাপা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে জরুরি অবস্থার মধ্যেই বিভিন্ন মসজিদ থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হতে থাকে। এসব বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনে হিযবুত তাহরীর সেই সময় জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় অধিকতর সাহসী ভূমিকা পালন করে। অবস্থা সঙ্গিন দেখে শেষ পর্যন্ত প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান বায়তুল মোকাররম মসজিদের তত্কালীন খতিব মরহুম উবায়দুল হকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন এবং ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে মুসলমানদের মনে আঘাত দেয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিতর্কটির অবসান ঘটান। ক্ষমাপ্রার্থনা অনুষ্ঠান আয়োজনে তত্কালীন তথ্য উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সেই সময় ক্ষমতাসীন সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের দালাল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিপদ উপেক্ষা করে আমার লেখালেখির কারণে একটি ক্ষুদ্র ভক্ত পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। জামায়াতে ইসলামী দলে যথেষ্ট প্রভাব রাখেন, এমন একজন ব্যক্তি টেলিফোন করে প্রথম আলো’র বিতর্কিত কার্টুন নিয়ে আমার কলামে কিছু না লিখতে অনুরোধ করেন। অতি সজ্জন প্রকৃতির সেই ভদ্রলোককে ব্যক্তিগত সততার জন্য আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখলেও তার অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রথম আলোর ইসলাম বিরোধিতার সম্পাদকীয় নীতির কঠোর সমালোচনা করেই আমার সাপ্তাহিক কলামটি যথারীতি লিখেছিলাম। ‘নয়া দিগন্ত’ কর্তৃপক্ষ অবশ্য কোনো কাট-ছাঁট না করেই লেখাটি ছাপিয়েছিলেন। প্রথম আলোর বিষয়ে উল্লিখিত ভদ্রলোকের নমনীয় অবস্থানের পেছনে যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে পরবর্তী সময়ে দু’টি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম। একেবারে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছি এমন দাবি করব না। তবে আমার ধারণা, দু’টি কারণে তিনি প্রথম আলোর বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নেয়ার জন্য ওকালতি করেছিলেন। প্রথমত, হিযবুত তাহরীর যেহেতু ওই আন্দোলনটিতে অন্তত জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিযোগিতায় পরাজিত করে ইসলামী মূল্যবোধের পক্ষে লড়াইয়ে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, কাজেই তাদের আর অগ্রসর হতে দেয়া দলটি নিজ স্বার্থে বিপজ্জনক মনে করেছিল। আর দ্বিতীয়ত, তখন পর্যন্ত সম্ভবত জামায়াতে ইসলামী নীতিগতভাবে জরুরি সরকারকে কোনো বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে অনাগ্রহী ছিল। জামায়াতে ইসলামী এবং হিযবুত তাহরীরকে সহযোগী দল হিসেবে দেখানোর যে প্রচেষ্টা বর্তমান মহাজোট সরকার গ্রহণ করেছে, দল দু’টির আদর্শগত বিরোধ বিবেচনায় নিলে সরকারের এই প্রচারণা যে বিশ্বাসযোগ্য নয়, সেটি আশা করি বুদ্ধিমান পাঠকমাত্রই বুঝবেন।
পশ্চিমা বিশ্বে শেখ হাসিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ইসলামী জঙ্গিত্ব নিয়ে এই অতি সরলীকরণকে শেষ পর্যন্ত কোন দৃষ্টিতে দেখবে, সেটাও ভাববার বিষয়। গত বছর ৬ জানুয়ারি এদেশে সেক্যুলার মোর্চা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকারকেও আর স্বীকার করা হচ্ছে না। বিদেশ যেতে বিমানবন্দরে আইনবহির্ভূতভাবে বাধা প্রদান, গ্রেফতার, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সর্বশেষ গুম-খুন গণতন্ত্রের লেবাসে এই দেশটিকে গত শতাব্দীর সত্তর দশকের আর্জেন্টিনা অথবা চিলিতে পরিণত করেছে। সেই সময় কমিউনিস্টদের শায়েস্তা করার মহত্ উদ্দেশ্য সাধনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যেমন দক্ষিণ আমেরিকাতে তাবত্ কিসিমের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে চোখ বুজে সমর্থন দিয়েছিল, বাংলাদেশেও আজ তারা একই নীতি অবলম্ব্বন করছে। পার্থক্য কেবল কমিউনিস্ট বিরোধিতার নীতির জায়গায় এখানে ইসলাম বিরোধিতা চলছে। গত দেড় বছরে মাত্র একটিবারই আমরা বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টিকে প্রকাশ্য বিবৃতি প্রদানের মাধ্যমে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের সমালোচনা করতে দেখেছি। সেটি ঘটেছিল যখন জামায়াতে ইসলামী দলের সহকারী মহাসচিব প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে (তিনি আমারও আইনজীবী) তার স্ত্রীসহ বিমানবন্দরে শুধু হেনস্তাই করা হয়নি, উল্টো তাদের বিরুদ্ধে সরকার বানোয়াট মামলাও দায়ের করেছিল। জামায়াতে ইসলামী দলের মধ্যম সারির একজন নেতার মৌলিক অধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়ে মরিয়ার্টি সাহেব কী সঙ্কেত প্রদান করতে চেয়েছিলেন, তা তিনিই ভালো জানেন। তবে পরবর্তীতে সরকার যখন চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী কায়দায় দলটিকে মিছিল, সভা ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে বাধা দিয়েছে অথবা দলটির শীর্ষ নেতাদেরকে তুচ্ছ মামলায় গ্রেফতার করেছে; সেই সময় মার্কিন দূতাবাসের নীরবতা বাংলাদেশ সরকারকে মানবাধিকারের অধিকতর লঙ্ঘনে উত্সাহিত করেছে। অপরদিকে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মানববন্ধনের মতো নিরামিষ কর্মসূচি পালনের দুর্বল উদ্যোগকেও দেখা যাচ্ছে মারমুখী পুলিশ এখন পিটিয়ে ভণ্ডুল করে দিচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ‘মুজিববাদে’ বিশ্বাসী ক্ষমতাসীনরা ব্যতীত দেশের অন্য কোনো নাগরিককে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অধিকার দেয়া হবে না। এসব নিন্দনীয় আচরণেও ‘গণতন্ত্রের পূজারী’ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী নিদেনপক্ষে উদ্বেগ জানানোরও আর প্রয়োজন বোধ করছে না। সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আসকারা পেয়ে কতটা দুর্বিনীত হয়ে ওঠে, সেটা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।

সরকারের হেফাজতে সব মৃত্যুর হিসাব দিতে হয় না সেটাই বাস্তবতা

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রতি জনগণের মোহ যে কাটতে শুরু করেছে, সেটি ক’দিন আগের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে তাদের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, তিনবারের নির্বাচিত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো জাঁদরেল রাজনীতিবিদের বিরোধী মোর্চার স্বল্পখ্যাত প্রার্থী মনজুর আলমের কাছে লাখো ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের মাধ্যমে সরকারের প্রতি চট্টগ্রামের ভোটারদের অনাস্থা প্রকাশ পেয়েছে। কেবল বিদেশিদের সমর্থনকে পুঁজি করে কোনো স্বৈরশাসকই যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না, তারও সিগন্যাল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। জনসমর্থন হারালে একটি ফ্যাসিবাদী শাসক যে আচরণ সচরাচর করে থাকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে বিরোধী দলের প্রতি সরকারের নিপীড়ন লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার মনে করছে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে নির্মমভাবে ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতনের তীব্রতা বাড়ানো হলে মাঠের কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়বে, যার প্রতিক্রিয়ায় এদেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে একেবারে নির্মূল না করা গেলেও নিদেনপক্ষে বিলম্বিত করা যাবে। মার্কিন-ভারত মোর্চাও কৌশলগত কারণে সম্ভবত সেক্যুলার গোষ্ঠীকে এবার অন্তত এক সংসদ মেয়াদের অতিরিক্ত সময় ক্ষমতাসীন দেখতে আগ্রহী। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার জাতিকে ২০২১ সালের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ২০২১ আসার আগে দেশে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে যে আরও দু’টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেই বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় বলেই মনে হচ্ছে না। বিএনপির ক্ষেত্রে সরকারের কৌশল হচ্ছে রাস্তায় দাঁড়ালেই বেধড়ক পিটুনি লাগাও এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে শ্যোন অ্যারেস্টে বিনাবিচারে অনন্তকাল জেলে পুরে রাখ। তারপর রিমান্ডের ওষুধ তো আছেই। জামায়াতে ইসলামীর জন্য এক যুদ্ধাপরাধই যথেষ্ট। অন্যান্য ইসলামী দলকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে পারলেই সরকারি দলের রাজনীতি মোটামুটি নিষ্কণ্টক। এই অসুস্থ প্রক্রিয়ার অবধারিত পরিণতিতে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্র জবাবদিহিবিহীন এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর রূপ নিয়ে অসহায় জনগণের সামনে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ দলিলটির বিভিন্ন ধারায় নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বার বার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সেই ধারাগুলোতে প্রদত্ত নিশ্চয়তার একটি তালিকা পাঠকের অবগতির জন্য এখানে উদ্ধৃত করছি। সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে বাস্তব অবস্থা মেলালে সহজেই উপলব্ধি করা যাবে এই সরকার আদতেই বাংলাদেশের সংবিধানকে ছেঁড়া তেনার অধিক মূল্য দিচ্ছে না।
প্রস্তাবনা : আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।
অনুচ্ছেদ-১১ : প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হইবে।
অনুচ্ছেদ-২৭ : সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
অনুচ্ছেদ-৩১ : আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।
অনুচ্ছেদ-৩২ : আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।
অনুচ্ছেদ-৩৩ (১) : গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাঁহার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।
(২) : গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেফতারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাঁহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।
অনুচ্ছেদ-৩৫ (২) : এক অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।
(৪) কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাইবে না।
(৫) কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।
অনুচ্ছেদ-৩৭ : জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধসাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।
অনুচ্ছেদ ৩৯ (১) : চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।
(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে—
ক. প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হইল।
অনুচ্ছেদ ৪৪ (১) : এই ভাগে প্রদত্ত অধিকারসমূহ বলবত্ করিবার জন্য এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করিবার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল।
আওয়ামী লীগ মনে-প্রাণে, অস্থি-মজ্জায় সর্বতোভাবে একটি নির্ভেজাল ফ্যাসিবাদী দল হওয়ায় তাদের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ কম। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং বিগত দেড় বছরে আমরা দলটির অভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করেছি এবং করছি। মোটা দাগে এবারের পার্থক্যটা তৈরি করে দিয়েছে টুইন টাওয়ার পরবর্তী জর্জ বুশতত্ত্ব এবং সেই তত্ত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের পক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অকুণ্ঠ সমর্থন। আওয়ামী লীগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠা থেকেই বিএনপির পরিচিতি ছিল পরমতসহিষ্ণু একটি তুলনামূলকভাবে উদার, মধ্যপন্থী দল হিসেবে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়কালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী মোর্চার চরম হিংসাত্মক আন্দোলনের মুখে যথেষ্ট সংযম ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আইনের শাসনে বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা এবং পরবর্তী সময়ে র্যাব ও পুলিশের হাতে অসংখ্য ‘ক্রসফায়ার’ তার আগের পরিশীলিত ভাবমূর্তিকে বেশ খানিকটা কালিমালিপ্ত করেছে। ফলে, আজ যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আমাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে ভয়াবহ বিচ্যুতি গণমানুষের বেঁচে থাকাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে, তার দায়-দায়িত্ব থেকে তিনিও একেবারে মুক্ত থাকতে পারছেন না।
নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী এবং চরম দুর্নীতিপরায়ণ এরশাদ সরকারের পতনের পর এ দেশের গণমানুষ গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখেছিল, বিগত দুই দশকে বড় অকরুণভাবে সেই স্বপ্নকে হত্যা করা হয়েছে। এই স্বপ্নভঙ্গের পরম্পরা বর্ণনার আগে রাষ্ট্রযন্ত্রের আজকের চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে অন্তত কয়েকটি উদাহরণ দেয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যে বর্বরতা চলছে, সেটি আপন অভিজ্ঞতার আলোকেই পাঠকের কাছে ১১ কিস্তিতে তুলে ধরেছি। জেলে আসার পর অন্য বন্দিদের কাছ থেকে ক্রসফায়ার এবং গুম-খুনের যেসব কাহিনী শুনেছি, তারই কয়েকটি এবার বর্ণনা করছি।
প্রথম গল্পটি একজন উঠতি মাস্তানের বড়ই হ্রস্ব জীবনের কাহিনী। কলেজের গণ্ডি পেরুনোর পর চাকরি জোটেনি; কিন্তু প্রেম করে বউ ঘরে নিয়ে এসেছিল। চটপট এক পুত্রসন্তানের পিতাও হয়েছিল সে। বড় মাস্তানদের ফাই-ফরমাশ খাটা এবং ছোটখাটো অপরাধই আয়-রোজগারের একমাত্র পথ। একদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে ধরা পড়ায় অবধারিতভাবে রিমান্ডে যেতে হলো। সেখানে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে টাকা-পয়সার দরকার, তার সংস্থান দরিদ্র পরিবারটিতে ছিল না। নির্বিচারে মার শুরু হলো। প্রথমে হাত, পা, বুট ব্যবহৃত হলো, তারপর লাঠি এবং সর্বশেষ দেশি এবং বিদেশি বিশেষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার। দাবি একটাই, অস্ত্র বের করে দে। সদ্য অপরাধ জগতে যোগ দেয়া, দলে সামান্য ফাই-ফরমাশ খাটা। ফুট সোলজারের কাছে অস্ত্রভাণ্ডারের খবর থাকে না। ছেলেটিও কোনো খবর দিতে পারেনি। নির্যাতনের মাত্রা বাড়ল। এতখানি অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একসময় মারা গেল ছেলেটি। সংবিধানে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, সরকারের হেফাজতে সব মৃত্যুর হিসাব যে বাংলাদেশে দিতে হয় না সেটাই বাস্তবতা। দরিদ্র পরিবারের নির্বোধ ছেলেটির স্থান হলো নিখোঁজদের তালিকায়। মৃতদেহ গায়েব করে দেয়ার বন্দোবস্ত সহজেই হয়ে গেল। ঝামেলা বাধালো অবুঝ স্ত্রী। সে মনে করে, তার স্বামী এখনও বেঁচে আছে। অল্প বয়সী মেয়েটি অসহায় বাচ্চাটিকে কাঁখে নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ক’দিন পরপরই স্বামীর খোঁজে আসে। বধূটিও বড়ই দরিদ্র পরিবারের। পিতার এমন সামর্থ্য নেই যে, বিধবা কন্যা এবং এতিম নাতির দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্বামীর বন্ধুদের কেউ কেউ এখনও জেলে আছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেসব বন্দির সঙ্গে মেয়েটি দেখা করে পঞ্চগড়, নেত্রকোনা অথবা অন্য কোনো জেলা কারাগারে। স্বামী বন্দি হয়ে আছে এমন উড়ো খবর দিয়ে স্বামীকে খুঁজে দিতে অনুরোধ করে। সেসব অচেনা জায়গায় নিজেই গিয়ে খোঁজ করবে কিনা, সেই পরামর্শও চায়। পুলিশ হেফাজতে একসঙ্গে বন্দি অবস্থায় যে বন্ধুটির চোখের সামনে হতভাগ্য, পথভ্রষ্ট তরুণটি চিরতরে চোখ বন্ধ করেছিল, তার সঙ্গে আমার জেলে দেখা হয়েছিল। বন্ধু-পত্নীকে সত্য কথাটি বলবে কিনা, পরামর্শ চাইলে আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি। চুপ করে সেই মাস্তান ছেলেটির অশ্রুভরা চোখের দিকে কেবল তাকিয়ে থেকেছি।

চোখ বাঁধা প্রবীণ রাজনীতিকের পায়ের নখ উপড়ে ফেলা ছিল ন্যূনতম নির্যাতন

দ্বিতীয় গল্পের মূল চরিত্র জেলের ভাষায় একজন টিটি অর্থাত্ টপ টেরর। প্রায় আট বছর জেলে আটক থাকাকালে সহবন্দিদের কাছে অপরাধ জগত্ ছেড়ে দিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছে বহুবার। নিজের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে অহরহ অনুতাপ করত। পথভ্রষ্ট ছেলেকে অন্ধকার জগত্ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত পিতা। ছেলের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার দিন উত্কণ্ঠিত পিতা অপেক্ষা করছিলেন জেল গেটের বাইরে। ছেলে জেল থেকে বেরোলেই তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, যেখানে প্রিয়জনরা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তরুণটি জেল গেট দিয়ে বার হয়েই দেখল সাক্ষাত্ মৃত্যু ওত পেতে বসে আছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে চিত্কার করে আবার জেল গেটের ভেতরে ফিরে আসার চেষ্টা করল। ততক্ষণে জেল গেটের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এলিট বাহিনীর সদস্যরা অপেক্ষমাণ দামী গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এসে শিকারের দু’হাত ধরল। পিতার চোখের সামনেই ঘটছে এই নাটকীয় দৃশ্য। ছেলেকে রক্ষা করার জন্য পিতা উদ্ভ্রান্তের মতো নিরাপত্তা রক্ষীদের কর্ডন ভেঙে ছুটে আসার চেষ্টা করলেন। এক ধাক্কায় তাকে ফেলে দেয়া হলো রাস্তায়। সদ্য কারামুক্ত টপ টেররকে ততক্ষণে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে ওঠানো হয়েছে। অনেক কষ্টে বৃদ্ধ পিতা উঠে দাঁড়ালেন, চলন্ত গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টাও করলেন। যন্ত্রের গতির কাছে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের গতি পরাজিত হল। পরের দিনের সংবাদপত্রে সেই অতিপরিচিত গল্প। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধের এক পর্যায়ে ক্রসফায়ারে আরও একজন টপ টেরর নিহত হয়েছে। অকুস্থল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। পুত্রহারা পিতা অনেক সাহস করে সত্য ঘটনা জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে প্রকৃত ঘটনা তুলেও ধরেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একাকী, ক্ষমতাহীন নাগরিকের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা যায়নি। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের একই পরিণতির হুমকিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এক পুত্র গেলেও অন্য পুত্র, কন্যা, কন্যাজামাতারা তো আছে। তাদের প্রতিও তো পিতার কর্তব্য রয়েছে।
এরপর একজন ব্যর্থ প্রেমিকের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। পাড়ার সুন্দরী মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছে এক বেকার রংবাজ যুবক। একতরফা প্রেমে মেয়েটি সাড়া দেয়নি। তারপরও মনোযোগ আকর্ষণের ব্যর্থ চেষ্টা চলছেই, যাকে হয়তো খানিকটা ইভটিজিংয়ের পর্যায়েও ফেলা যেতে পারে। মেয়েটি যে যুবককে ভালোবাসে, এলিট বাহিনীতে তার যথেষ্ট জানা-শোনা রয়েছে। নাছোড়বান্দা প্রেমিককে ঘাড় থেকে নামানোর জন্য একদিন মেয়েটি ফোন করে তাকে নির্জনে দেখা করার প্রস্তাব দিল। ওয়ার্ডরোবের সেরা পোশাক পরে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেখে প্রেমের প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তার ক্ষমতাধর বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে অপেক্ষমাণ। সেই শেষ। রংবাজ তরুণটি তারপর থেকে নিখোঁজদের তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। এই ছেলেটির মতো অসংখ্য মানুষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ হয়েছে। ক্রসফায়ারে তবু লাশটা মেলে। সেটা এক ধরনের সান্ত্বনা। আত্মীয়-স্বজনরা কিছুদিন কান্নাকাটি করার পর যার যার স্বাভাবিক, দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যায়। কিন্তু নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের প্রতীক্ষার প্রহর গোনা কোনোদিন শেষ হয় না। প্রতিবার কলিংবেল বাজলে কিংবা দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজ পেলেই মনে হয়, সে বুঝি ফিরে এসেছে। প্রিয়জনের এ এক অসহনীয় বেঁচে থাকা।
সর্বশেষ কাহিনীতে হত্যাকাণ্ড দু’টি। এক বড়সড় সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য গোপন স্থানে পালিয়ে আছে। তারই পাড়ার আরেক দরিদ্র যুবককে সে ভাড়া করেছে দু’বেলা খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্যে। যুবকটি কিছুটা টাকার লোভে আর কিছুটা সন্ত্রাসীর আতঙ্কে এই কাজে সম্মত হয়েছে। একদিন দু’জনাই ধরা পড়ে। শুরু হয় নির্যাতন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা খাবার বহনকারী ছেলেটিকে দু-চারটি চড়-থাপ্পড় মারা ছাড়া তেমন গুরুতর কোনো নির্যাতন করেনি। ওদেরও গরিব ছেলেটির প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। একদিন তাকে মুক্তির আশ্বাসও দেয়া হয়। আটকাবস্থাতেই ছেলেটি কোনোক্রমে তার মায়ের কাছে পত্র দিয়ে কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করতে বলে। এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। ছেলেটি হয়তো যত্সামান্য অর্থের বিনিময়ে মুক্তিও পেয়ে যেত। সমস্যা বাধল যখন অতিরিক্ত নির্যাতনে টপ টেরর ছেলেটি পুলিশ হেফাজতেই মৃত্যুবরণ করল। লাশ ফেলে দেয়ার আয়োজন চলছে, এমন সময় খবর এলো নিহত টপ টেররের সহোদর নিজেই একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সঙ্গত কারণেই পুলিশ হেফাজতে সন্ত্রাসীর মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার গরজ বহুলাংশে বেড়ে গেল। সেক্ষেত্রে নির্যাতনের সঙ্গীকে তো আর জীবিত রাখা যায় না। অতএব দরিদ্র পরিবারের তরুণটিকেও মরতে হলো। কিছুদিন পর বস্তাবন্দি দুটো লাশ ভেসে উঠলো ঢাকার খুব কাছের এক নদীতে।
এটাই বাংলাদেশের আইনের শাসনের প্রকৃত চিত্র। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি জেনেভায় গিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রশ্নে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্সের’ কল্পকাহিনী প্রচার করে হাততালি কুড়িয়ে আনেন। আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বিকারভাবে তাদের আমলে একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যা না হওয়ার নির্জলা মিথ্যা দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী এসব তুচ্ছ বিষয়কে আলোচনার উপযুক্তই বিবেচনা করেন না। ২০০৮ সালে আমার দেশ পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা মানবাধিকারের পক্ষে সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করেছি। ক্রসফায়ার, রিমান্ডে নির্যাতন, শ্যোন অ্যারেস্টের অপব্যবহার, ইত্যাদি মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে পত্রিকাটিতে দিনের পর দিন রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে, সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। এসব বিষয়ে লেখালেখি করার সময় কখনও মনে হয়নি জীবনের পড়ন্ত বেলায় আমাকে রিমান্ডে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। আমার সেই নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা এর আগেই লিখে ফেলেছি। এখন অপেক্ষা করে আছি কবে মুক্তি পাব আর আমার সেই যাতনার কাহিনী বাংলাদেশের জনগণ জানতে পারবে। সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হবে, সেটাও আমি জানি।
নিজের কথা বাদ দিয়ে অপর একজন রাজনৈতিক নেতাকে রিমান্ডে নিয়ে নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা বলি। জেলে এসে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। অতি সজ্জন ব্যক্তিটির ওপর রিমান্ডে যে লোমহর্ষক নির্যাতন হয়েছে, সেটি শোনার পর সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই পাশবিকতার নিন্দা জানানোর উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নেই। প্রবীণ সেই রাজনীতিককে সবচেয়ে কম যন্ত্রণাদায়ক যে নির্যাতন করা হয়েছে, তা হলো চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি ভারী বস্তুর আঘাতে তার পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা। অনবরত নির্যাতনের মধ্যে ছিল শরীরের সর্বত্র পুনঃ পুনঃ ইলেকট্রিক শক প্রয়োগ এবং এক ধরনের বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ঘোরানো। অশালীন অত্যাচারের একটি নমুনার কথাও তিনি আমাকে বলেছিলেন; বিশেষভাবে নির্মিত একটি বৈদ্যুতিক পাত্রে তাকে মূত্রত্যাগে বাধ্য করা হয়, যার প্রতিক্রিয়ায় তাত্ক্ষণিক ভয়াবহ শকের ফলে মূত্রের সঙ্গে জমাটবাঁধা রক্ত অনবরত যেতে থাকে। এই ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনার সময় তিনি বার বার কণ্ঠরুদ্ধ হয়েছেন। আমিও অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। তার কান্না কেবল দৈহিক যন্ত্রণার স্মৃতির কারণে ছিল না। অপমান, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব, ক্রোধ মিলেমিশে এক প্রবীণ সম্মানিত মানুষের হৃদয়ভাঙা বেদনার বহিঃপ্রকাশ দেখেছিলাম সেদিন। সারা রাত বিনিদ্র থেকে বার বার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এ কোন সংবিধান এবং গণতন্ত্রের বড়াই করি আমরা? ব্রিটিশরা না হয় ঔপনিবেশিক নির্যাতনকারী শক্তি ছিল, পাকিস্তানিরা এক ধর্মের হলেও তারাও বিজাতীয় ছিল; কিন্তু বর্তমান শাসক শ্রেণীকে কোন পরিচয়ে অভিহিত করব—সেই প্রশ্নের উত্তর এই বন্দিজীবনে অহর্নিশ খুঁজে চলেছি। টিএফআই সেলে আমার জিজ্ঞাসাবাদের সময় কথা প্রসঙ্গে এক তরুণ (কণ্ঠস্বরে তা-ই মনে হয়েছিল) বেশ বড়াই করে কাচের বোতল ব্যবহারের মাধ্যমে এক বিচিত্র নির্যাতন প্রক্রিয়ার আভাস দিলে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাইরে থেকে যেসব অত্যাচার-নির্যাতনের বিবরণ আমরা শুনতে পাই, সেগুলো তাহলে বাস্তব। উপস্থিত অপর একজন ঊর্ধ্বতন অফিসারের বাধার কারণে আলোচনা বেশি দূর এগোতে পারেনি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়ে গেলে টিএফআই’র অন্ধকূপসম সেলে বসে বসে তরুণ অফিসারটির অসুস্থ মানসিকতার জন্য নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমরা যারা কোনো না কোনো পর্যায়ে রাষ্ট্রের শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার সুযোগ পেয়েছি, তারা ক্ষমতাসীন অবস্থায় মানবাধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখানোর ফলে আজ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থাই এক ভয়াবহ নির্যাতনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। একা ওই তরুণের দোষ কেথায়? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হচ্ছে, যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্ত্রাসীদের আদালতে বিচারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে শাস্তির বিধান করা। সেই শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু আজ যেভাবে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে, পুলিশ হেফাজতে হত্যা করা হচ্ছে এবং নির্বিচারে ক্রসফায়ারে পাঠানো হচ্ছে সেটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের লক্ষণ। বর্তমান সরকারের শাসনামলে ফ্যাসিবাদের সেই কুিসত চিহ্ন রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে ফুটে উঠেছে। এর বিরুদ্ধে বিবেকবান নাগরিকদের সাহস করে নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা আবশ্যক। জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বে উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
আগে সংবাদমাধ্যমের কথা বলি। এ দেশে সংবাদমাধ্যম কতভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নির্যাতিত হচ্ছে, সেটা আমার চেয়ে বেশি আর কে জানে? জেলে বসে খবরের কাগজে পড়লাম, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর করে এসেছেন। পাঠকদের জানিয়ে রাখা দরকার যে, জেলের ভেতরে গুটিকয়েক সরকারপন্থী পত্রিকা ছাড়া অন্য পত্রিকার প্রবেশাধিকার নেই। আমার দেশ-এর তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রশাসনের বিবেচনায় জেলে ঢোকার উপযুক্ত পাঁচ সংবাদপত্র হলো জনকণ্ঠ, সংবাদ, সমকাল, যুগান্তর এবং দি ডেইলি স্টার। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তথ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সমর্থকগোষ্ঠী আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উচ্চকণ্ঠে বলে এসেছেন, বাংলাদেশে নাকি সংবাদমাধ্যম বর্তমানে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সব দেশেই বোধহয় রাজনীতিবিদদের পেশাগত বাধ্যবাধকতায় একটু-আধটু মিথ্যাচার করতে হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এই বিশেষ কর্মে প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারে, এমন রাজনীতিবিদ সারা বিশ্বে কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শত শত পুলিশের বুটের আঘাতে আমার দেশ পত্রিকা অফিস ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পরদিন তথ্যমন্ত্রী সংসদে লিখিত বিবৃতি পড়ার সময় বার বার যে আটকে যাচ্ছিলেন, সে দৃশ্য সেদিন যারা টেলিভিশন দেখেছিলেন তাদের স্মরণে থাকার কথা। তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের পক্ষেও ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই ধরনের মিথ্যা বিবৃতি পাঠ করা সম্ভবত অস্বস্তিকর বোধ হচ্ছিল। যতদূর অবগত আছি, বাংলাদেশের বর্তমান তথ্যমন্ত্রী পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন এবং তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মানিত সদস্য। এদের মতো ব্যক্তিদের নীতিহীনতার কারণেই এদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এত সহজে হরণ করা গেছে। আওয়ামী লীগ বাকস্বাধীনতায় যে বিশ্বাস করে না, সেটি তাদের ১৯৭৫, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং এবারের শাসনামলে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ দলটি ২০০৮ সালে দিনবদলের সনদ নামক নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অবশ্য এদেশে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে অপরাধরূপে বিবেচনা করার সংস্কৃতি স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪০ বছর পরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে গড়ে ওঠেনি। জনগণ ধরেই নেয় নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতি ক্ষমতা লাভের পর ভাঙার জন্যই দেয়া হয়। অবশ্য অধিকার আদায় করে নেয়ার হিম্মত না থাকলে বলদর্পীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার জন্যে নালিশ করে কোনো ফায়দা নেই। দুর্বলের হাহুতাশই বিধিলিপি। তদুপরি বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের মধ্যে দলীয় বিভাজন প্রকট হওয়ায় তারা কোনো সরকারের আমলেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে সমর্থ হয় না। ফলে এদেশে ফ্যাসিবাদের উত্থান সহজতর হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ এখন তামাশা : সার্বভৌমত্ব আগেই গেছে, ভৌগোলিক স্বাধীনতাও যায়যায়

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রসঙ্গে শেষ আলোচনা বাংলাদেশে বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। দলীয়করণের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার দুর্ভাগ্যজনক প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা শুরু করেছিলেন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার পরবর্তী সরকারও হাইকোর্টের বিচারপতি নির্বাচনে পুরোপুরি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়নি। অথচ এই বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনাকালে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কতখানি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তার প্রমাণ ব্যারিস্টার আমিনুল হককে সে সময় অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ প্রদান। সার্জেন্ট জহুরুল হকের ছোট ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি দুর্বল ছিলেন, এটি সর্বজনবিদিত।
চারদলীয় জোট সরকার সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত হয়েছিল উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি করে। সে সময় সংবাদপত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করার কারণে সরকারের এই বয়সবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছিল। বহুল আলোচিত মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের দাবিও একই সময় জোরালো হয়ে ওঠে। চারদলীয় জোট সরকারের বিদায়ের পর জরুরি আইনের সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ আধা-সামরিক সরকার অবশেষে কাগজে-কলমে মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করে। বিচার বিভাগের তথাকথিত স্বাধীনতা লাভে জেনারেল মইন এবং ড. ফখরুদ্দীনকে সমর্থনকারী বাংলাদেশের সুশীল (?) সমাজ আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়ে। তাদের মুখপত্রগুলোতে প্রশংসার বানডাকা সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, কলাম লেখার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বিদেশি শক্তির ইশারা-ইঙ্গিতে পরিচালিত সেই সরকারের বিচার বিভাগকে কথিত স্বাধীনতা প্রদানের পুরো বিষয়টি যে একটি বিশাল ধাপ্পা ছাড়া অন্য কিছু ছিল না, তা কালক্রমে প্রমাণিত হয়েছে। দেশবাসীর স্মরণে থাকার কথা, সেই সময় একদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ডঙ্কা পেটানো হচ্ছিল, আবার অন্যদিকে সংসদ ভবনে ক্যাঙ্গারু আদালত বসিয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ অন্যান্য রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের বিচারের নামে প্রহসন চলছিল। বিশেষ সংস্থার ব্যক্তিরা আদালতে বসে প্রকাশ্যে ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারকদের কেবল নিয়ন্ত্রণই করত না, বৈরী সাক্ষীদের সংসদ ভবনের গোপন কক্ষে ধরে নিয়ে নির্যাতন করারও ব্যবস্থা ছিল। সন্ধ্যাবেলায় থানায় মামলা দায়ের করে রাত পোহানোর আগেই গ্রেফতার করার প্রক্রিয়াও বর্তমান সরকারকে শিখিয়ে গেছে মহাজোটের আন্দোলনের ফসল এক-এগারো সরকার। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও একই প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে তাদের গ্রেফতার সম্পর্কে অনেক ঘটনাই শুনেছি। হাইকোর্ট প্রদত্ত জামিনের রায় চেম্বার জজ আদালতে গণহারে স্টে করার পদ্ধতিও ব্যবহৃত হতে শুরু করে তখন থেকেই।
বর্তমান সরকার ক্যাঙ্গারু কোর্ট না বসালেও জেনারেল মইনের বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলগুলোকে আরও পরিশীলিত করে প্রয়োগ করছে। উচ্চ আদালতে বিগত দেড় বছরে যে ডজন তিনেক বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় পরিচয় নিয়ে খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে আদালত নিয়ে খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপি দুগ্ধপোষ্য শিশুমাত্র। চেম্বার জজ আদালতে বেশুমার স্টে নিয়ে আমার দেশ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের হয়েছে। সেই মামলার শুনানি রয়েছে আগস্ট মাসে। কাজেই আজ আর বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কিছু লিখতে চাচ্ছি না। নিম্ন আদালতের কাজ-কারবার নিয়েও কোনো মন্তব্য করার পরিবর্তে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি মাত্র। আশা করি, বুদ্ধিমান পাঠক যার যার মতো করে অবস্থার ভয়াবহতা বুঝে নিতে পারবেন।
১. প্রধানমন্ত্রীপুত্র এবং জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংবলিত একটি সংবাদ আমার দেশ পত্রিকায় ছাপা হয় ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে। সেদিন থেকে আমার গ্রেফতার পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় ২৬টি মানহানি মামলা দায়ের হয়েছে। সর্বশেষ মামলাটি করেছেন জ্বালানি উপদেষ্টা নিজে। বাকি পঁচিশটি মামলার বাদী আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। এই পঁচিশটি মামলার মধ্যে একমাত্র কক্সবাজার জেলার একজন অসীম সাহসী ম্যাজিস্ট্রেট দায়েরকৃত মামলাটি খারিজ করেন এই যুক্তিতে যে, মামলার বাদী কোনোভাবেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নন। মানহানি মামলায় কেবল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা দায়ের করতে পারেন। অন্য কারও পক্ষে মানহানি মামলা দায়েরের সুযোগ নেই। বাকি পঁচিশটি মামলা কিন্তু অন্যান্য জেলার ম্যাজিস্ট্রেটরা আমলে নিয়েছেন। মাগুরার ম্যাজিস্ট্রেট তো আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করেছিলেন। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের এবং আমলে নেয়াকালীন বিচারব্যবস্থার ঠিক উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগের নেতারা বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে সিদ্ধহস্ত। দেশের বিবেকবান নাগরিক মাত্রই স্বীকার করবেন যে, সেই কটূক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শালীনতার সীমা অতিক্রম করে যায়। তারেক রহমান সম্পর্কে এ ধরনের কটূক্তির প্রতিবাদে বিএনপি’র জেলা পর্যায়ের নেতাদের দায়ের করা প্রতিটি মানহানি মামলা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে খারিজ করা হয়েছে। আদালতের যুক্তি হচ্ছে, বাদীরা কেউ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নন। সুতরাং, মামলা আমলে নেয়ার ক্ষেত্রে বাদীর রাজনৈতিক পরিচয় বর্তমান সরকারের আমলে আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২. আমি গ্রেফতার হওয়ার মাসখানেক পর জামায়াতে ইসলামী দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং মহাসচিব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের দলীয় সভায় এক নেতার প্রদত্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মামলাটির উত্পত্তি হয়েছে। ওই সভায় একজন বক্তা (সম্ভবত ঢাকা মহানগরী আমির রফিকুল ইসলাম খান) মতিউর রহমান নিজামীর ওপর সরকারি হয়রানির বর্ণনাকালে ইসলাম প্রচারের সময় আমাদের মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা. আ.) যে অত্যাচার সহ্য করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন। আর যায় কোথায়? তত্ক্ষণাত্ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগে গেল। জেলায় জেলায় মামলা দায়ের এবং রাতারাতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিতে কোনো সমস্যাই হলো না। উল্লেখ্য, যে সভা নিয়ে মামলার সূত্রপাত সেখানে মতিউর রহমান নিজামী নিজে উপস্থিত ছিলেন না।
এবার উল্টোচিত্র দেখা যাক। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে যতগুলো সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তার প্রতিটিতেই পরাজিত দল কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, এদেশে স্বয়ং আল্লাহ নেমে এলেও অভিযোগমুক্ত নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন না। তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রতিবাদে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অপরাধে একাধিক মামলা দায়ের হলে একটিকেও আমলে নেয়া হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় এক্ষেত্রে ধর্মীয় আঘাতের নাকি কোনো উপাদান খুঁজে পাননি। উপাদান নেই, তাই সঙ্গত কারণেই মামলা খারিজ হয়ে গেছে। হজরত মোহাম্মদ (সা. আ.)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ কোনো কিছু করতে পারবেন না—এমন মূর্খের মতো মন্তব্যে কেন সেই আঘাত আরও বেশি করে লাগবে না, এর উত্তর আমার জানা নেই। পাঠক ভেবে দেখতে পারেন।
৩. আমার বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলার মধ্যে দু’টি দায়ের করা হয়েছে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে। তার মধ্যে কোতোয়ালি থানার দায়েরকৃত মামলার ঘটনার সময় আমি পুলিশ হেফাজতে বন্দি অবস্থায় শত শত পুলিশ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলাম। সেই মামলা আমলে নিয়ে গ্রেফতার দেখিয়ে আমাকে রিমান্ডেও পাঠিয়েছিলেন বিজ্ঞ ও স্বাধীন ম্যাজিস্ট্রেট।
৪. আমাকে সরকার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের যে সাত নম্বর সেলে রেখেছে, সেখানে সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত অন্তত ডজনখানেক সাধারণ আসামিও আটক রয়েছে। এদের মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিকবার জেলে এসেছে, এমন বন্দিও আছে। সময় পেলেই তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনি। ওদের কাছ থেকেই জানলাম, বাংলাদেশে চুক্তিভিত্তিতে জামিনের ব্যবস্থা এখন কেবল নিম্ন আদালতেই হচ্ছে না, উচ্চ আদালতেও নাকি একই সিস্টেম সংক্রমিত হয়েছে। ব্যক্তি ও আদালত ভেদে চুক্তির অঙ্ক এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। সেই টাকা কাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়, সে সম্পর্কে মুখ খোলা বিপজ্জনক। এমনিতেই এক আদালত অবমাননা মামলা নিয়ে সাংঘাতিক পেরেশানিতে আছি।
বাংলাদেশের বিদ্যমান বিচারব্যবস্থা নিয়ে লেখার সময় সংবিধানের ১০৯ নম্বর ধারার কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সকল (আদালত ও ট্রাইব্যুনালের) উপরি উক্ত বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকিবে।’ এই ধারার অর্থ সাদামাটাভাবে যা বুঝি, তা হলো নিম্ন আদালতের কর্মকাণ্ডের ওপর উচ্চ আদালতের তীক্ষষ্ট দৃষ্টি থাকবে যাতে প্রশাসন বিচার বিভাগকে কোনোভাবে প্রভাবিত করতে না পারে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির বিস্তার না ঘটে। সমস্যা হলো সরষে তো ভূত তাড়াবে, কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে তাকে তাড়াবে কে? ক্রসফায়ারের পক্ষে প্রশাসনের একটা যুক্তি সরকারে থাকতেও শুনেছি, এখনও শুনছি। পুলিশের কর্মকর্তারা অভিযোগ করে থাকেন যে, তারা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সন্ত্রাসীদের আটক করলেও তাদের সাজাবিধান করা সম্ভব হয় না। তিন কারণে সচরাচর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্ত্রাস দমনের সত্ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। প্রথমটির কথা অর্থাত্ চুক্তির বিনিময়ে জামিনের বিষয়টি আগেই উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সমস্যা যথাক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব এবং সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে সাধারণ নাগরিকের ভীতি। সুতরাং, শর্টকাট পদ্ধতি হচ্ছে ক্রসফায়ারে পরপারে পাঠিয়ে দেয়া। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা গ্রহণের পরিবর্তে ক্রসফায়ার সংস্কৃতি যে সমস্যার সমাধান নয়, তার সর্বোত্কৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে এত হত্যাকাণ্ডের পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোক্রমেই ঠেকানো যাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের আমলে অন্যান্য অপরাধ তো বটেই, এমনকি লোমহর্ষক খুনের সংখ্যাও আগের সব রেকর্ডকে অনায়াসে অতিক্রম করেছে।রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর কাছে ভয়াবহ আতঙ্করূপে আবির্ভূত হয়েছে। আইনের শাসনের ধারাবাহিক অবক্ষয়ের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাদের স্বাধীনতার পর থেকেই হতে হচ্ছিল, সেটি আরও হতাশাব্যঞ্জক রূপ নিয়েছে এক-এগারোর জরুরি শাসনকাল থেকে। এর আগপর্যন্ত সব সরকারকেই আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এক ধরনের জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণে রাখতে হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ডলার-পাউন্ড ঋণ নেয়ার সময় এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে যে কী ধরনের বিব্রত হতে হয়, তার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই রয়েছে। কিন্তু ২০০৭-এর ছদ্মবেশে সামরিক অভ্যুত্থান সেই পরিস্থিতি অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে। জাতিসংঘের বাংলাদেশ অফিস ইউএনডিপিসহ প্রায় সব পশ্চিমা দূতাবাস সেই অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার ফায়দা নিয়ে মইন-ফখরুদ্দীন জুটি তাদের শাসনামলে তাবত্ মানবাধিকারকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের ধরে অজ্ঞাতবাসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করার পদ্ধতি তারাই চালু করেছিল। একই সঙ্গে ক্রসফায়ার চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য এদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তি হলেও লোকদেখানো নিরপেক্ষতা প্রমাণের তাগিদে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও দলটির সমর্থক ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকেও কয়েকজন সেই সময় শাসক জান্তার হাতে অত্যাচারিত হয়েছিলেন। অনেকটা সে কারণেই এদেশের গণমানুষ এবার আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট চরিত্রের অন্তত কিছু পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি যদিও এমন কোনো ভ্রান্তিবিলাসে পতিত হইনি। নির্বাচনের আগেই সম্ভবত ২০০৮-এর নভেম্বরে আমার দেশ-এ মন্তব্য প্রতিবেদন লিখে শিরোনাম দিয়েছিলাম, ‘নবরূপে বাকশাল’। মহাজোট গঠন প্রক্রিয়া দেখে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম পার্শ্ববর্তী পরাশক্তির মদতে এদেশে আবার একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে। আমার ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হলে আমি সত্যিই আনন্দিত হতাম। কিন্তু গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কন্যা অত্যাচার-নির্যাতনে তার পিতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। আমি নির্যাতিত হয়েছি, আমার পরিবার অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, আমার ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত, ১৬ কোটি মানুষের ঘরবসতির রাষ্ট্রের নিরিখে সেটা এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কিন্তু এই সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যে সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহণ করছে, সেটা নিয়েই আমার যত দুর্ভাবনা। মার্কিন-ভারত কৌশলগত মৈত্রী যদি অটুট থাকে এবং সেই মৈত্রীর মূল্য স্বরূপ বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডটিকে যদি ভারতের হাঁড়িকাঠে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? বিএনপি তার সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে সমর্থ হয়নি। ডান-বামের অন্যান্য রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও অপ্রাসঙ্গিক বললে আশা করি, তারা রাগ করবেন না। ফ্যাসিবাদসৃষ্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সফল গণআন্দোলনে নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নেতৃত্ব দিতে পারেন একমাত্র বেগম খালেদা জিয়া। তবে সেই আন্দোলনের ডাক দেয়ার আগে তাকে অবশ্যই জনগণকে ভরসা দিতে হবে মানবাধিকারের প্রশ্নে তিনি আগের তুলনায় অনেক গণমুখী চিন্তা-চেতনাকে এখন ধারণ করছেন। মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফানুস উড়িয়ে ক্ষমতায় বসে শেখ হাসিনা দেশের অধিকাংশ নাগরিককে হতাশ এবং ক্রুদ্ধ করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির ‘জিরো টলারেন্স’-এর গল্প এখন তামাশামাত্র। দেশের সার্বভৌমত্ব আগেই গেছে, ভৌগোলিক স্বাধীনতাও যায়যায় অবস্থা। সুশাসনের অভাবে মানবাধিকারের ইস্যুতে বাংলাদেশ বিশ্বে নিন্দিত হোক, এটা এদেশের নাগরিক হিসেবে চাইতে পারি না। জেলে বন্দি অবস্থাতেই দেশপ্রেমিক মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সামনে ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের স্বপ্ন দেখে দিন কাটাই। বন্দিত্বের কারণে সেই গণজোয়ারে আমার কোনো অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও দুঃখ নেই। তবু সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত জোয়ার এসে রাষ্ট্র কাঠামোতে এতদিনের পুঞ্জীভূত ক্লেদ ধুয়ে-মুছে যাক, এটুকুই প্রত্যাশা।

সেক্টর কমান্ডার জয়নাল আবেদিনের ভাগ্যে ডিভিশনটা আজও জোটেনি

বাংলাভাষায় জেলজীবন বিষয়ক সাহিত্যকর্মের মধ্যে জরাসন্ধের লৌহকপাট যে সর্বাধিক জনপ্রিয়, এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত বাঙালি পরিবারের আর দশজন কিশোরের মতোই স্কুলের গণ্ডি পেরুনোর আগেই উপন্যাসটির সব খণ্ড পড়া হয়ে গিয়েছিল। জেলজীবনকে জরাসন্ধ দেখেছিলেন একজন জেল কর্মকর্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আর আমার মতো আসামি হয়ে সত্যেন সেন লিখেছিলেন রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ। যতদূর মনে পড়ে, সেই বামপন্থী রাজনীতিক ও সাহিত্যিকের উপন্যাসও পড়েছিলাম স্কুলজীবনেই।
লৌহকপাটে মানবজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনার গল্প পড়ে কৈশোরের স্বপ্নিল চোখ দিয়ে জীবনকে দেখার চেষ্টা করতাম। অপরদিকে সত্যেন সেনের লেখা এক ধরনের রোম্যান্টিক বিপ্লববাদিতায় হৃদয় আচ্ছন্ন করেছিল। কিন্তু উপন্যাস পড়া আর বিপ্লবের কল্পনা করা পর্যন্তই সার। মুক্তিযুদ্ধকালীন কয়েকজন বন্ধু মিলে হাতে লিখে পত্রিকা বের করে পাকবাহিনীর নজর এড়িয়ে সদরঘাটের মোড়ে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সেগুলো বিলি করা ছাড়া ছাত্রজীবনে কখনও রাজনীতির সংস্পর্শে আসিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মন দিয়ে লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হওয়াটাই প্রধান কর্তব্য বিবেচনা করে ছাত্ররাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থেকেছি। সত্তর দশকের প্রথমার্ধে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মুজিববাদী ছাত্রলীগ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে ঝড় তোলা জাসদই ছিল ছাত্ররাজনীতির প্রধান দুই শিবির। এর বাইরে অন্তত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৪ পর্যন্ত মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের একটা শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু সিপিবি এবং মোজাফফর ন্যাপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের মধ্যে মস্কোপন্থীদের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পেয়ে জাসদ একমাত্র প্রতিবাদী রাজনৈতিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়।
বুয়েটে আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালের জানুয়ারির একেবারে প্রথমে। আমি শেরেবাংলা হলে সিট পেয়েছিলাম। সে সময়ে চিন্তা-চেতনায় খানিকটা বামঘেঁষা ছিলাম বলে প্রথম দিকে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলেও তাদের আপসকামিতায় বিরক্ত হয়ে জাসদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। তবে সে সময়ে ইউকসু’র ভিপি এবং বর্তমানে গণফোরাম নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেমের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার গ্রেফতার হওয়ার বছরখানেক আগপর্যন্ত কাশেম ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। যাই হোক, বুয়েটে জাসদ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলেও সরাসরি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে উত্সাহ বোধ করিনি কখনও। আজকের ক্ষমতাসীন মহাজোটভুক্ত জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বছর ছয়েক সিনিয়র ছিলেন। সে সময়ের ডাকসাইটে, বিপ্লবী জাসদ নেতার বর্তমানের মুজিব-বন্দনা শুনলে মনে হয় ভিন্ন ব্যক্তির মুখের কথা শুনছি। জাসদ সভাপতি এবং আমি কেবল একই বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ভিন্ন সময়ে হলেও একই বিভাগেরও ছাত্র ছিলাম। আমরা উভয়েই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আরও একজন প্রথম সারির জাসদ ছাত্রনেতাও সে সময় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন। তিনি শরীফ নুরুল আম্বিয়া। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ৭ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত জাসদের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে সিপাহী বিপ্লবের সমর্থনে যে বিশাল জঙ্গি মিছিল হয়েছিল, তার নেতৃত্বদানকারীরা আজ যখন মরহুম শেখ মুজিব প্রসঙ্গ উঠলে গদগদ হয়ে অশ্রুবিসর্জন করেন, তখন হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। যা হোক, ব্যক্তিগতভাবে নিরামিষ ছাত্রজীবন কাটানোর ফলে কোনোদিন রাজনীতি সম্পৃক্ততার কারণে জেলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। অতঃপর দীর্ঘ পেশাজীবী জীবনের চড়াই-উতরাই পার হয়ে একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে সরকারি দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেও তার পরিণতি কোনোদিন নাজিমউদ্দীন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার হতে পারে, সেটাও চিন্তার অতীত ছিল। সরকারি দায়িত্বের সেই পাঁচ বছর কেবল নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকিনি, আমার সহকর্মীদেরও দুর্নীতিমুক্ত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছি। বিনিয়োগ বোর্ড এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থরক্ষায় বিন্দু পরিমাণ আপস করিনি। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও আমাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন করেছেন। জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ যেদিন স্বকর্ণে রেডিওতে তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলাম। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তার অসাধারণ সত্ জীবনযাপন তরুণ বয়সে আমাদেরও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল। চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে মিডিয়ায় দুর্নীতির ব্যাপক প্রচারণা থাকলেও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্নতর ছিল। জ্বালানি উপদেষ্টার কাজ করার সময় বকেয়া বিল এবং অন্যান্য অভিযোগে বিএনপি’র এমপিদের বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও একবারের জন্যেও তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী আমাকে কোনো প্রশ্ন করেননি। নাইকোর বিষয়ে আমার কঠোর অবস্থানকেও বেগম খালেদা জিয়া নির্দ্বিধায় সমর্থন করেছেন। এসব কারণেই এক-এগারোর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আমাকে অন্তত বিভ্রান্ত করতে পারেনি।
সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক জরুরি সরকার এবং জেনারেল মইন গংয়ের সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ করায় জীবনে সর্বপ্রথম জেলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় ২০০৭ সালে। সেই সরকারের দুই বছরের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই আমার সঙ্গে সরকারের এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলতে থাকে। ছদ্মবেশী সামরিক সরকারের রাজনৈতিক দোসররা ২০০৮-এর ডিজিটাল নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয় লাভ করলে কারাগার-জীবন অবধারিত হয়ে ওঠে। মহাজোটের ক্ষমতাগ্রহণ থেকে আমার গ্রেফতার পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারের দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ সম্পর্কিত মার্কিন নীতি এবং ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার বিরোধিতা করে আমার লেখালেখি অব্যাহত রাখার ফলে সরকার নিশ্চিত হয়ে যায় আমাকে গ্রেফতার এবং নির্যাতন করা হলে তাদের তেমন কোনো আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হবে না। বাস্তবে ঘটেও ঠিক তা-ই। আমি গ্রেফতার হওয়ার আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করলেও একটি জনপ্রিয় জাতীয় পত্রিকা সরকার কর্তৃক অন্যায়ভাবে বন্ধ এবং তার সম্পাদককে গ্রেফতার করা নিয়ে গণতন্ত্র ও বাক্স্বাধীনতার ধ্বজাধারী রাষ্ট্রটির ঢাকাস্থ দূতাবাস থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী আচরণ কোনো সুশীল (?) পত্রিকার ক্ষেত্রে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে করা হলে নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর হুঙ্কারে সরকারের টিকে থাকাই দায় হয়ে যেত। গ্রেফতার হওয়ার পরবর্তী পঁচিশ দিনের বন্দিত্বকালে চারপাশে চোখ মেলে দেখার মতো হুঁশ ছিল না। ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার জন্য জেলে আসার মানসিক প্রস্তুতি থাকলেও রিমান্ডে নিয়ে আমাকে নির্যাতন করা হবে, এটা বিশ্বাস হয়নি। চৌদ্দ দিনের রিমান্ডের যাতনা এবং দশ দিনের স্বাধীন বিচার বিভাগের নাটক মনটাকে এতটাই বিষণ্ন করে তুলেছিল যে, ওই চব্বিশ দিন আমার অস্তিত্বের বাইরের পৃথিবী অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে ব্যক্তির অসহায়ত্ব নিয়ে লেখালেখি করা আর নিজে প্রত্যক্ষ করার মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। এ সময়ের মধ্যে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি মন জুড়ে থেকে মনঃকষ্ট বাড়িয়েছে মাত্র। জুন মাসের ২৪ তারিখ সন্ধ্যায় রিমান্ড শেষে ঢাকা জেলের সাত নম্বর সেলের কুঠুরিতে ফিরে নতুন করে অনুভব করলাম এই বিশাল পৃথিবীর একেবারেই অকিঞ্চিত্কর, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ হয়ে আমার জীবন্ত অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। সেই অস্তিত্বের বিশাল অংশজুড়ে এখন সাত নম্বর সেলে আমার প্রতিবেশীরা এবং কারা প্রশাসনের ব্যক্তিরা। কারা প্রশাসন নিয়ে গল্প বলার আগে পাঠকের সঙ্গে প্রতিবেশীদের পরিচয় করানোটাই উত্তম।
নামে সাত নম্বর সেল হলেও এখানে কক্ষের সংখ্যা ছয়টি। নামকরণের সময় সেলের সংখ্যা সাত থাকলেও পরবর্তী সময়ে জেলখানার সীমানা প্রাচীর খানিকটা ভেতরে নিয়ে আসার প্রয়োজন পড়ে। প্রাচীরের জায়গার সংকুলান করতে তখন সাত নম্বর সেলটিকে ভেঙে ফেলতে হয়। একটি সেল কমে গেলেও নামকরণ বদলে ফেলা সম্ভব হয়নি। কারণ সাত নম্বর সেলের একেবারে পাশে আগে থেকেই ছয় কক্ষবিশিষ্ট ছয় নম্বর সেল নির্মিত ছিল। কালক্রমে জেনেছি, ছয় নম্বর সেল একসময় ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের সেল থাকলেও এখন সরকার ঘোষিত টিটি বা টপ টেররদেরই সেখানে প্রধানত জায়গা হয়। তবে আমার জেলজীবন শুরু হওয়ার আগেই সেসব টপ টেররকে কাশিমপুর কারাগারে চালানে পাঠানো হয়েছে। সেই চালানের পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক জেলখানা সফরের সম্পর্ক ছিল। মাস দুয়েক আগে তিনি জাঁকজমকের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ঘুরে গেছেন। পাঠক আবার মনে করবেন না দলের ভিআইপিদের ভবিষ্যতের বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে তিনি এখানে এসেছিলেন। প্রার্থনা করি, এক-এগারোর মতো দুর্দিন তাদের জীবনে যেন আর না আসে। আর যদি দুর্ভাগ্যক্রমে এসেও যায়, তাহলে সেই বিশেষ সময়ের মতোই বিশেষ অট্টালিকার ব্যবস্থাও আশা করি হয়ে যাবে। ফালতু কথা বলে প্রধানমন্ত্রীকে আবারও ক্রোধান্বিত করার পরিবর্তে তার কারাগার দর্শনের উদ্দেশ্য বলে ফেলি। প্রধানমন্ত্রীর পিতা পাকিস্তানি আমলে ঢাকা জেলের যে কক্ষে দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন, সেই ঐতিহাসিক এলাকাটি এবং চরম নিন্দনীয় জেলহত্যার নির্মম শিকার চার জাতীয় নেতার স্মৃতিবিজড়িত বন্দিশালা মিলে তাদের পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থে মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই মিউজিয়াম উদ্বোধন করতেই এসেছিলেন। তার জেল পরিদর্শনকালে কারা কর্তৃপক্ষ টিটিদের এখানে রাখা নিরাপত্তার স্বার্থে সমীচীন বিবেচনা না করায় দল বেঁধে তাদের কাশিমপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়েছে। জেলের পরিভাষায় এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে ‘চালান’ নামে অভিহিত করা হয়। ছয় নম্বরের গল্প বাদ দিয়ে এবার সাত নম্বর সেলে ফিরে আসি।
সাত নম্বর সেলের এক নম্বর কক্ষের বাসিন্দা দু’জন। মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন এবং ফজলু মিঞা। মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষপর্যায়ে তিনি মেজর জলিলের কাছ থেকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুটপাট এবং তত্কালীন আওয়ামী নেতাদের চোরাচালান প্রতিরোধ করতে গিয়ে মেজর জলিল ছাড়া দ্বিতীয় যে সেক্টর কমান্ডার চাকরিচ্যুত এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন, তিনিই জয়নাল আবেদিন। আশির দশকে মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সন্ত্রাসের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গোটা তিনেক মামলা ঝুলছে। বর্তমান সরকার নিজেদের সর্বক্ষণ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তি হিসেবে প্রচার করে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও সাবেক এই সেক্টর কমান্ডারের ভাগ্যে আজ পর্যন্ত জেলে ডিভিশনটা পর্যন্ত জোটেনি। অথচ সরকারি আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সব সেক্টর কমান্ডারের আদালতের নির্দেশনা ছাড়াই ডিভিশন প্রাপ্য। আওয়ামী লীগের চরিত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যে কতখানি তীব্র, তা জেলে এসে এই মুক্তিযোদ্ধার অবস্থা দেখে আবারও উপলব্ধি করলাম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মেজর (অব.) জয়নালের লাঠিতে ভর দিয়ে গণ-টয়লেটে যাওয়া এবং চৌবাচ্চার ধারে বসে অতি কষ্টে কাপড় কাচার দৃশ্য আমাকে বড় বেদনা দেয়। জয়নাল ভাইয়ের সেলমেট আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক ফজলু মিঞা হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি। পুরনো ঢাকার অর্থশালী ব্যবসায়ী লোকটির হাঁপানির অসুখ রয়েছে। রাতে আমার ঘর থেকেই তার কাশির আওয়াজ অনবরত শুনতে পাই। এই ক’দিনেই টের পেয়ে গেছি অর্থ এবং রাজনৈতিক সংযোগের জোরে জেলখানায় ফজলু মিঞার যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। লোকটি মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিনকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা-ভক্তি করে বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকবার উল্লেখ করেছি, দুই নম্বর কক্ষে আমার আশ্রয় মিলেছে। তিন নম্বর ঘরে তিনজন থাকে। একজনের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাবু (সিনিয়র) যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অস্ত্র মামলায় জেলে এসেছে। রিমান্ডে নানারকম নির্যাতনের গল্প জেলে এসে ওর কাছ থেকেই প্রথম শুনেছি। দ্বিতীয় আসামির নামও বাবু। তবে সে হোন্ডা বাবু নামেই বেশি পরিচিত। জেলে তারও প্রভাব-প্রতিপত্তি চোখে-পড়ার মতো। এখন পর্যন্ত টিটিতে প্রমোশন না হলেও এলাকার উঠতি সন্ত্রাসী। যথেষ্ট সুদর্শন তরুণটি এই পথে না এসে এফডিসিতে ঘোরাঘুরি করলে সম্ভবত বাংলাদেশের অনেক নায়কের ভাত মেরে দিত। দুই বাবুই হাজতি হলেও তাদের রুমমেট একজন কয়েদি। হাজতি আর কয়েদির পার্থক্যটা এখনও বয়ান করা হয়নি। আদালতে সাজা না হওয়া পর্যন্ত বিচারাধীন বন্দিকে জেলে হাজতি বলা হয়। যেমন আমি এখন পর্যন্ত হাজতি। মামলায় সাজা হওয়ামাত্র হাজতিদের কয়েদিতে প্রমোশন হয়। তিন নম্বর ঘরের কয়েদি ছেলেটির নাম মনির। সর্বাঙ্গে ভয়াবহ সব আঘাতের চিহ্ন তার অতীত সন্ত্রাসী জীবনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। একটি কব্জি প্রায় বিচ্ছিন্ন। অপারেশন করে কোনো রকমে জোড়া লাগানো হয়েছে। অপরাধ জগতে তার সম্ভবত একজন বিখ্যাত মামা রয়েছে, যে কারণে সাত নম্বর সেলে তার পরিচিতি ভাগ্নে মনির নামে।
চার এবং পাঁচ নম্বর কক্ষে যথাক্রমে দু’জন এবং একজন করে বন্দি। চার নম্বরে আছে রংপুর জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ও শিল্পপতি করিমউদ্দিন ভরসার বড় ছেলে। সে তার আপন ছোট ভাইকে টাকা-পয়সা সংক্রান্ত ঝগড়ার পরিণতিতে পিস্তলের গুলিতে হত্যা করে জেলে এসেছে। দেখলেই বোঝা যায়, বিত্তশালী পিতার উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেটি ভয়াবহ রকম নেশাগ্রস্ত। দীর্ঘদেহী তরুণটি ভীতিকর, অপ্রকৃতিস্থ দৃষ্টি নিয়ে সেলের সবার দিকে তাকিয়ে থাকে; কিন্তু বাক্যালাপ করে কদাচিত্। স্বল্প সময়ের কারাজীবনেই জেনে গেছি এখানেও নাকি এই ধনীপুত্রকে নেশাদ্রব্য ইয়াবা সরবরাহ করার লোকজন রয়েছে। করিমউদ্দিন ভরসার ছেলের রুমমেট আনোয়ার অস্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে এসেছে। কারওয়ান বাজার এলাকার তরুণটি নিম্ন আদালতে জামিনের চেষ্টায় রয়েছে। পাঁচ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ফয়সাল আনসারী। বাংলাদেশে জন্মলাভকারী মধ্যবয়সী মার্কিন এই নাগরিক তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুকে হত্যার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার নিহত বন্ধুটিও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ছিল। হত্যাকাণ্ডটি শেখ হাসিনার আগেকার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় ঢাকায় সংঘটিত হয়েছিল। সে গ্রেফতার হয়েছিল সম্ভবত ২০০০ সালে। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের একেবারে শেষে এসে নিম্ন আদালতে তার ফাঁসির দণ্ডাদেশ হয়। জেনারেল মইনের আমলে ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দশ বছরের বেশি জেল খাটা হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতির ক্ষমা অথবা অন্য কোনো উপায়ে জামিনের চেষ্টা করছে। মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন এবং ফয়সাল আনসারীর সঙ্গে গল্পগুজব করেই আমার প্রধানত সময় কাটছে। সাত নম্বর সেলের শেষ ঘরটিতে যে তিনজন আসামি থাকে, তারা সবাই হাজতি। এদের মধ্যে একজন মুক্তজীবনে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রলীগের মাঝারি পর্যায়ের নেতা ছিল। একমাত্র তার সঙ্গেই করিমউদ্দিন ভরসার পুত্রের বন্ধুত্ব। সেলের লোকজনের ঘোরতর সন্দেহ, এই বন্ধুত্বের পেছনে নেশার ব্যাপারটাই ক্রিয়াশীল। সাত নম্বর সেলে আমাদের এই বারো জনেরই ঘরবসতি।

ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করার লড়াইয়ে বিলম্ব : দেশকে অকার্যকারিতার দিকে নিয়ে যাবে

তিনটে দিন শুয়ে-বসে আর গল্প করে কেটে গেল। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জয়নাল ভাই ও মার্কিন নাগরিক ফয়সাল আনসারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে। মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ, প্রতি সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর দীর্ঘক্ষণ ধরে জিকির করেন। সারারাত না ঘুমিয়ে ইংরেজিতে কোরআন শরীফের তফসির লিখছেন। এর মধ্যে তার একটা তফসির পড়েও ফেলেছি। ধর্ম বিষয়ে আমার এত জ্ঞান নেই যে, সেই তফসিরের মান সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারি। তবে তফসির পড়তে আমার ভালোই লেগেছে। কোর্টে হাজিরা না থাকলে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যান এবং ওঠেন প্রায় দ্বিপ্রহরে। জয়নাল ভাই ঘুমাতে যাওয়ার খানিক আগে আমার দিন শুরু হয়। জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার একটা রফাও হয়েছে। অন্য বন্দিদের সেলের তালা সকাল ছ’টার পর খোলা হলেও আমারটা খুলে দেয়া হয় তার ঘণ্টাখানেক আগে। ফজরের নামাজ শেষ করে সেই সময় পর্যন্ত কারারক্ষীর আগমনের অপেক্ষায় থাকি। তালা খোলা হলে প্রাতঃকর্ম এবং গোসল শেষ করে সেলের সামনের টানা বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে গরম হরলিক্সের মগে আমি যখন চুমুক দিই, তখন সাত নম্বর সেলের অপর বন্দিরা এক এক করে তাদের সেল থেকে বেরোতে থাকে। ফয়সাল আনসারীর অভ্যাস অনেকটা আমার মতোই। সেও বেশ সকালেই গোসলের ঝামেলা মিটিয়ে ফেলে। অবশ্য স্বাস্থ্য রক্ষার্থে গোসলের আগে আধঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করে নেয়। আমার আবার ওই অভ্যাস কস্মিনকালেও ছিল না। এই বয়সে নতুন করে শুরু করতেও ইচ্ছে হয় না। তবে, আল্লাহ তাঁর অপার করুণা দিয়ে আমাকে যথেষ্ট সুস্থ রেখেছেন। সাড়ে সাতটায় ফয়সালের সঙ্গে দিনের প্রথম দফার আড্ডা শুরু হয়। এই ক’দিনে দুই বাবুই আমার রুটিন জেনে গেছে। ওরা ঘুম থেকে উঠে প্রথমে আমাদের জন্য গরম চা বানায়। আমবন্দির এই জেলজীবন একেবারে মন্দ কাটছে না।
আধঘণ্টা আড্ডা দিয়ে ফিরে যাই লেখার টেবিলে। ন’টার মধ্যে চম্পাকলি সেল থেকে সেবক নাস্তা নিয়ে আসে। জেলজীবনের প্রথম তিনদিন উপরের নির্দেশে আমাকে শায়েস্তা করার জন্যে ভাতে ও পানিতে মারার ব্যর্থ চেষ্টার পর জেল কর্তৃপক্ষ রণে ভঙ্গ দিয়েছে। এখন তিনবেলার আহারই ডিভিশন বন্দিদের হেঁসেল থেকে আসছে। ফয়সালের কাছ থেকে শুনেছি, ডিভিশনের বন্দিদের দৈনিক খোরাকি ৮৬ টাকা। এই টাকার সঙ্গে আমাদের পিসির (Personal Cash) টাকা যোগ করে ডিভিশনে বাজার করা হয়। এতসব বন্দোবস্ত করে যে মানের খাওয়া আসে, তাতে মোটামুটি জীবন ধারণ চলে। এর বিপরীতে সাধারণ কয়েদিদের জন্যে সরকারি বরাদ্দ মাথাপিছু মাত্র চল্লিশ টাকা। সরকারি বরাদ্দের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আবার চলে যায় জেল ও জেলের বাইরের ক্ষমতাবানদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারায়। ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলবন্দির যে খাদ্য দৈনিক সরবরাহ করা হয়, সেটা খেয়ে জীবন ধারণ কেবল এদেশের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এই অসহায়, দরিদ্র বন্দিদের ততোধিক দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন মাঝে-মধ্যে দেখা করতে এলে পরম মমতাভরে তারা যে খাবারটুকু প্রিয়জনের জন্যে নিয়ে আসে, তারও অর্ধেক চলে যায় কারারক্ষী এবং নেতা কিসিমের কয়েদিদের উদরে। সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বিদ্রোহী কবি নজরুল লিখেছিলেন :
‘প্রার্থনা করো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।’
আমাদের জাতীয় কবি আজ বেঁচে থাকলে এ যুগের দেশি শাসকশ্রেণীকে অভিশাপ দেয়ার উপযুক্ত ভাষাই হয়তো খুঁজে পেতেন না।
অন্যান্য দিনের মতো নাস্তার পাট চুকিয়ে সবে কলম হাতে বসেছি, আর ছোট এক স্লিপ হাতে কারা অফিস থেকে রাইটার এসে হাজির। আমাকে নাকি আজই গোপালগঞ্জ যেতে হবে। সেখানে কবে কার মানহানি করেছিলাম, স্মরণে না থাকলেও শুনলাম বাংলাদেশের অঘোষিত রাজধানী এবং বিশেষ কারণে পরম পবিত্র ‘তীর্থভূমি’তে তিন-তিনটে মানহানির মামলা দায়ের হয়েছে। আগামীকাল সেই মামলাত্রয়ের শুনানির দিন ধার্য করেছেন সেই জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। অতএব, আসামি চলো এবার চালানে। চালানের গল্প এতদিন শুধু শুনেই এসেছি, এবার অভিজ্ঞতা অর্জিত হতে যাচ্ছে। আমাকে নেয়ার পদ্ধতিটা কী হবে, তাও বুঝতে পারছিলাম না। প্রিজন ভ্যানের যে অভিজ্ঞতা গত চার সপ্তাহে অর্জন করেছি, তাতে ওই বাহনে চড়ে এত দূর যাওয়াটা সুখপ্রদ হবে না। তাছাড়া পদ্মা নদী পাড়ি দেয়ার সমস্যাও রয়েছে। এদিকে পয়লা জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতে অন্য মামলায় হাজিরার দিন ধার্য করা আছে আগে থেকেই। তিরিশে জুন গোপালগঞ্জ আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢাকায় ফিরতেও তো বেশ রাত হয়ে যাবে। পুরো আয়োজনটি যে আমার হয়রানির জন্যেই বিশেষভাবে নেয়া হয়েছে, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অসহায় আসামির প্রতিবাদের কোনো সুযোগ নেই। জেল কর্তৃপক্ষের নির্দেশমত চটপট তৈরি হয়ে নিলাম। এসব প্রস্তুতিতে আমার সচরাচর পনেরো মিনিটের বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। সমস্তটা দিন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে অপেক্ষা করে রইলাম। কেন জানি না, শেষ পর্যন্ত চালানে আর পাঠানো হলো না। জেল সুপার ও জেলারের সৌজন্যবোধের এতটাই অভাব যে, গোপালগঞ্জে চালান বাতিলের বিষয়টি তারা আমাকে সারাদিন জানানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করলেন না। রাতে ঘুমানোর সময়ও জানি না যে রাত পোহালেই সরকার আমার জন্যে অপর একটি চমকের ব্যবস্থা করে রেখেছে। ভোরের প্রাত্যহিক গোসল শেষ করে সেলে ঢোকার আগেই নতুন একখানা স্লিপ এসে হাজির। গোপালগঞ্জের পরিবর্তে ঢাকা সিএমএম আদালতেই যেতে হবে, সেখানে নাকি নতুন একটি মামলা দায়ের হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টা বাদে বুঝলাম, কেন কাল গোপালগঞ্জে যেতে হয়নি। ঢাকায় কে বাদী, কিসের মামলা—এসব বৃত্তান্ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকেই সকাল দশটার দিকে জনসন রোডের পরিচিত কোর্ট গারদে পৌঁছালাম। দুপুর দুটো পর্যন্ত সেখানেই বসিয়ে রাখা হলো।
অভিজ্ঞতার মূল্য আছে, এখন আর গারদে বসে অপেক্ষা করতে তেমন একটা কষ্ট হয় না। জেল থেকেই একটা বই আর পুরনো খবরের কাগজ সঙ্গে নিয়ে যাই। সঙ্গের খবরের কাগজ নোংরা মেঝেতে পেতে তার ওপর শুয়ে শুয়ে বই পড়ি। আদালত থেকে ডাক এলে বই বগলে নিয়ে হাঁটা দিই। সেই বইও আবার মাঝে-মধ্যে সিপাই-সেন্ট্রিকুল পরীক্ষার নামে উল্টে-পাল্টে দেখে। একদিন বিরক্ত হয়ে বলেই উঠেছিলাম, এই যে পাতা ওল্টাচ্ছেন, কিছু বুঝতে পারছেন আপনারা? বইটা ছিল বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কদের অন্যতম নেলসন ম্যান্ডেলার ২৭ বছর কারাভোগের অসাধারণ কাহিনী Long walk to Freedom। যা-ই হোক, কাঠগড়ায় ওঠার পর জানলাম, আজকের এই নতুন মামলার বাদী একজন ক্ষমতাবান ভিআইপি। মামলার ধারা সেই অতি পরিচিত, মানহানি। তবে প্রকাশিত সংবাদটি প্রধানমন্ত্রীপুত্র সংক্রান্তের পরিবর্তে অসীম ক্ষমতাধর এক প্রতিমন্ত্রীর পরিবার সংক্রান্ত। আইন প্রতিমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, প্রখ্যাত হাকিম হাফেজ আজিজুল ইসলাম ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নেজামে ইসলামী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। বলাই বাহুল্য, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধপক্ষ ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যান্য রাজাকারের মতোই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। হাকিম আজিজুল ইসলাম ‘নেজামে ইসলাম’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। পত্রিকাটির উদ্দেশ্য ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালানো। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করার পর আইন প্রতিমন্ত্রীর বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা অপহৃত হন। তাকে গুরুতর আহত এবং সংজ্ঞাহীন অবস্থায় একটি পরিত্যক্ত গর্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনরা উদ্ধার করেন। আমার গ্রেফতারের আগে আমার দেশ পত্রিকায় এই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার অপরাধে আইন প্রতিমন্ত্রীর ছোটভাই, বিশিষ্ট আঁতেল চিত্রপরিচালক মোরশেদুল ইসলাম আমিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করেছেন।
বিবেচনা করে দেখলাম, প্রকৃতপক্ষেই আমার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সোল এজেন্সিপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগে যোগদান করলে দেশের তাবত্ রাজাকার যে মহান মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হয়, এই চমত্কারিত্ব আমার বিস্মৃত হওয়া কোনোক্রমে উচিত হয়নি। আওয়ামী লীগ নামক পরশ পাথরকে চিনতে না পারার মাশুল তো এখন আমাকে গুনতেই হবে। মামলার ধারাই যেহেতু জামিনযোগ্য, কাজেই ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় সরকারি চাপ সত্ত্বেও অসহায়। তবে আমি সরকারি উকিলের বক্তৃতা শুনে পেটে প্রচণ্ড খিদে সত্ত্বেও নির্মল কৌতুক বোধ করছিলাম। তিনি উচ্চকণ্ঠে বলে চলছিলেন, এই মামলার ভয়ঙ্কর আসামিকে জামিন দেয়া হলে তার পালিয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকায় জামিন আবেদন নাকচ করা হোক। উত্তেজনার তোড়ে ভদ্রলোক বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন, গোটা চল্লিশেক মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আমি কারান্তরালেই রয়েছি। আইন প্রতিমন্ত্রীর ভাইয়ের দায়ের করা জামিনযোগ্য মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আইন অনুযায়ী আজ জামিন দিলেও আমাকে আদালত থেকে সেন্ট্রাল জেলেই ফিরতে হবে। পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। আসলে পিপি বেচারাও অসহায়। এমন ক্ষমতাবান বাদীর মামলায় তার প্রাণপণ লাফালাফি করে হুঙ্কার না দিলে খবর আছে। শুনানির আনুষ্ঠানিকতা শেষে জামিন মিলল, আমিও আদালতে উপস্থিত নানা পেশার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম।
আজ বন্দি জীবনের এক মাস পূর্ণ হলো। এই এক মাসে সরকারের ফ্যাসিবাদী চেহারা আরও উন্মোচিত হয়েছে। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো শীর্ষ নেতৃত্বসহ জামায়াতে ইসলামীর শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়েছে। মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে দেড় বছর পর ডাকা প্রথম হরতালের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মির্জা আব্বাস, শমসের মবিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপিরও অসংখ্য নেতাকর্মীকে বিভিন্ন বানোয়াট মামলায় সরকার আটক করেছে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের এবং চরম নিন্দনীয় যে ঘটনাটি ঘটাচ্ছে, তা হলো বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে হরতালের পূর্বরাত্রে সাদা পোশাকের পুলিশ উঠিয়ে নেয়ার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে ওঠায় বিগত কয়েক মাস ধরে কথিত সন্ত্রাসী ও বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের বিনাবিচারে হত্যার জন্য মহাজোট প্রশাসন অধিকতর ভয়ঙ্কর গুম-খুন পদ্ধতি চালু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অধিক সংখ্যায় বেওয়ারিশ লাশের সন্ধান মিলছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘতর হচ্ছে চৌধুরী আলমের মতো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মিছিলও। দেশের একজন নাগরিকের এভাবে গুম হয়ে যাওয়া একটি রাষ্ট্র কিংবা সমাজব্যবস্থার চূড়ান্ত অবক্ষয়ের প্রমাণ। রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটছে এসব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায়।
আমি গ্রেফতার হওয়ার আগে আমার দেশ পত্রিকায় গুম-খুন নিয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। শেখ হাসিনার এবারের প্রধানমন্ত্রিত্বে ফ্যাসিবাদের যে ভয়ঙ্কর উত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাকে প্রতিহত করার লড়াই এ জনগণের বিলম্ব অথবা এক প্রকার অনীহা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে নিশ্চিতভাবে অকার্যকারিতার দিকে নিয়ে যাবে। দলমত নির্বিশেষে বিবেকবান প্রতিটি মানুষের তাই আজ মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোটা অতীব জরুরি।
সারাদিন অনাহারে আদালতে কাটিয়ে বিষণ্ন মনেই জেলগেট থেকে আপন মনে সেলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত মাঝবয়সী একজন জমাদার হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে বেশ সংকোচ এবং সৌজন্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, স্যার আপনিই কি সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান? অনাবিল প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেল। আমি জেলে আসার পর থেকে সরকারের তাঁবেদার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং বুদ্ধিজীবীরা অব্যাহতভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে চলেছেন যে আমি সংবাদমাধ্যমের কেউ নই। আজই আদালতে আমার পক্ষের আইনজীবী এবং সহকর্মী সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনে এলাম টেলিভিশন টকশোতে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এমবিএ ডিগ্রির ব্যাপারটি এমন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উল্লেখ করা হচ্ছে যেন এটা কোনো লেখাপড়াই নয়। এই যত্সামান্য লেখাপড়া নিয়ে সম্পাদক হওয়ার চেষ্টা করে আমি মহা অন্যায় করে ফেলেছি। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীকুল এবং সরকারপন্থী সাংবাদিক শ্রেণী আমাকে সম্পাদক বলে স্বীকারই করেন না। আর যেহেতু আমি সম্পাদক নই, তাই তাদের মতে রিমান্ডে নিয়ে আমাকে নির্যাতন করা অথবা টিএফআই সেলে চোখ বেঁধে, হাতকড়া লাগিয়ে গারদের শিকের সঙ্গে লটকে রাখা সরকারের গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। অথচ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এই বর্ষীয়ান জমাদারের কাছে আমি ইঞ্জিনিয়ার নই, সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা নই, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান নই—কেবলই আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক। মনে হলো, এর থেকে বড় সম্মান আমার ৫৭ বছরের দীর্ঘ জীবনে আর কখনও পাইনি। ঢাকা জেলের বন্দি এবং রক্ষী উত্ফুল্ল হয়ে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। সেলে ফিরে ব্যাকুল হৃদয়ে আল্লাহকে বললাম, বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমিক সাধারণ নাগরিক তার অন্তরের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আমাকে যে স্বীকৃতি দিয়েছেন, আমি যেন তার যোগ্য হতে পারি।

সহকর্মীদের বললাম জেল আমি একাই খাটবো : যে কোনো মূল্যে আমার দেশ চালু রাখতে হবে

আজ জুলাই ছয়, আমার জন্মদিন। সাতান্ন বছরের পরিণত জীবনে এমন বিচিত্র জন্মদিন কখনও আসেনি। পুরনো ঢাকায় মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী নানার ভাড়া করা বাড়িতে যখন জন্মেছিলাম, আমার মা তখনও ম্যাট্রিকের গণ্ডি পার হননি। তারপর অবশ্য আমাকে মানুষ করার পাশাপাশি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ পাস করেছেন। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সাহসী নারীর সে এক দীর্ঘ জীবন-সংগ্রামের কাহিনী। ফজরের নামাজে আমার সেই মা এবং জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত একাকী স্ত্রীর হেফাজতের জন্যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালাম। ভোরের গোসল শেষে অন্যদিন লুঙ্গি আর শার্ট পরলেও আজ পরিষ্কার পায়জামা-পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে ফয়সালের সঙ্গে চা-পর্বে যোগ দিলাম। একটু আশ্চর্য হয়েই ফয়সাল আজ আদালতে আমার হাজিরা আছে কি-না জানতে চাইলে ঈষত্ হেসে মাথা নাড়ালাম। একটু রহস্য সৃষ্টি করে বললাম, আজ একটু সেজে-গুজে থাকতে ইচ্ছে হলো।
জন্মদিন হলেও আপনজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, আমিই তাদের জেলগেটে আসতে নিষেধ করে এসেছিলাম। তবে পারভীন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে যেভাবেই হোক কার্ড যে পাঠাবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। বিকেলে সেই প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো। জেল অফিসের রাইটার বাসা থেকে পাঠানো নতুন কাপড়, মিষ্টি, ফল এবং আকাঙ্ক্ষিত কার্ড নিয়ে এলে মনে হলো জন্মদিন আমার পূর্ণ হলো। সেলে ঢুকে আগে কার্ডগুলো একে একে খুললাম। বাল্যবন্ধু বাবলু, ছোট বোনসম বন্ধুস্ত্রী বেলী এবং ওদের একমাত্র মেয়ে সারাহ্’র কার্ড পেলাম। মায়েদের যুগে কার্ডের খুব একটা চল ছিল না। এবার দেখলাম আমার মাও পাঠিয়েছেন। কার্ড পেলাম না কেবল পারভীনের কাছ থেকে। প্রথমে ভেবেছিলাম, এভাবে জেল কর্তৃপক্ষের মারফত আমার স্ত্রী কার্ড পাঠাতে চায়নি। মুক্তি মিললে যদি দেখা হয় নির্জনে তখন হয়তো কার্ডখানা পাব। পরে জেনেছি, পারভীনের কার্ডের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মধ্যে জালিম শাসকের সর্বনাশ কামনা করায় জেল কর্তৃপক্ষ সেটি আমার কাছে পৌঁছাতে দেয়নি। জন্মদিনের বিষণ্ন সন্ধ্যায় খবরে জানলাম, আদালত অবমাননা মামলায় সশরীরে হাজিরা দেয়ার ডাক পড়েছে খোদ আপিল বিভাগ থেকে। শুনে প্রসন্নই বোধ করলাম। এই অসাধারণ স্থান দেখার সৌভাগ্য সাধারণ জনগণের হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আমার মতো আমজনতার ক্ষেত্রে সেই অসাধ্য সাধন ঘটতে চলেছে জুলাইয়ের আট তারিখে। হাইকোর্টের দু’জন আইনজীবী আদালত অবমাননার এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন আমার দেশ পত্রিকায় ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে। দুই আইনজীবীর এই বিশেষ উত্সাহের পেছনে আবার ছোট্ট একটি গল্প আছে।
শেখ হাসিনা এবার ক্ষমতা গ্রহণ করেই তার মতো করে বিচার বিভাগ সাজিয়ে ফেলার মহত্ কর্মে রত হয়েছেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি সম্প্রতি হাইকোর্টে ১৭ জন নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সেই সুপারিশে অনুমোদন দিয়েছেন। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় এই ১৭ বিচারপতি কোন পক্ষভুক্ত, সেটা বোঝার জন্যে অন্তর্যামী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এদেশের বিচারব্যবস্থার সম্ভাব্য এই দণ্ড-মুণ্ডের কর্তাদের একজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। সেই মামলায় তিনি এক নম্বর আসামি। অপর একজন তার ওকালতি জীবনে সুপ্রিমকোর্ট ভবনে বীরত্বের সঙ্গে স্বহস্তে এবং স্বপদে ভাংচুর চালিয়েছিলেন। খুনের মামলার কাহিনী এবং প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাংচুরের সচিত্র প্রতিবেদন আমার দেশ-এ ছাপা হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম উল্লিখিত দু’জনের বিচারপতি পদে শপথ পড়াতে অস্বীকার করেন। সেই থেকে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও তাদের হাইকোর্টে বিচারপতির আসনে বসার বিষয়টি ঝুলে আছে। স্বাধীন বিচার বিভাগের বাংলাদেশে তাদের বিচারপতি হওয়া বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে, এমন নির্বোধ প্রত্যাশা আমার অবশ্য নেই। বর্তমান প্রধান বিচারপতি কিছুদিনের মধ্যেই অবসরে যাচ্ছেন। তিনি শপথ গ্রহণ করাতে মেয়াদের শেষদিন পর্যন্ত যদি অসম্মতই থাকেন, তাহলে হয়তো পরবর্তী প্রধান বিচারপতিকেই এই মহত্ কার্যটি সম্পন্ন করতে হবে। তবে দু’জনাই বিচারপতি যে হবেন, এতে আমার মনে অন্তত কোনো সন্দেহ নেই। লোকমুখে শুনেছি, আদালত অবমাননা মামলার বাদী হাইকোর্টের সম্ভাব্য বিচারপতিদ্বয়ের একজনের খুবই ঘনিষ্ঠজন। সুতরাং আমার বিরুদ্ধে তার ক্ষোভকে অসঙ্গত বলতে পারি না। বাদীর প্রসঙ্গ গেল, এবার যে সংবাদ ছাপানো নিয়ে মামলা, সে সম্পর্কে দু-চারটি কথা বলি।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই নিম্ন আদালতের ওপর প্রশাসনের প্রভাবের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা কমবেশি ওয়াকিবহাল। দুঃখের কথা হলো, দিনে দিনে সেই প্রভাব কমার পরিবর্তে দৃষ্টিকটুভাবে বেড়েছে। কাজেই দেশের সাধারণ নাগরিকের প্রশাসন ও নিম্ন আদালতের হয়রানি থেকে বাঁচার একমাত্র স্থল ছিল হাইকোর্ট। রাষ্ট্র ও সমাজে নানাবিধ অবক্ষয় সত্ত্বেও জনগণ একটা আস্থা অন্তত এতদিন ধরে রেখেছিল যে, হাইকোর্টে পৌঁছাতে পারলে মোটামুটি বিচার পাওয়া যায়। এক-এগারো বাংলাদেশে বেশুমার সঙ্কট সৃষ্টির পাশাপাশি উচ্চ আদালত সম্পর্কেও সাফল্যের সঙ্গে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করতে পেরেছে। ২০০৭ সালের সেই অ্যাডভেঞ্চারের পালের গোদাদের কেবল আদালতকে নিয়ে ছেলে-খেলা করার অপরাধেই কঠোর সাজা হওয়া উচিত। রাষ্ট্রদ্রোহসহ অন্যান্য অপরাধ তো আছেই। জরুরি অবস্থার সময় হাইকোর্টের কোনো কোনো সাহসী, বিবেকবান বিচারপতি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণ করলে সেই সময় থেকে চেম্বার জজ আদালতে হাইকোর্টের রায় ‘স্টে’ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এক-এগারোর প্রদর্শিত সেই পদ্ধতি কেবল অনুসরণই করছে না, ব্যাপকতায় তাকেও বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে। এসব নিয়েই একটি তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন দুই আইনজীবী। আসামির তালিকায় আমিসহ যে পাঁচজন রয়েছেন, তারা হলেন প্রকাশক আলহাজ্ব হাসমত আলী, সিনিয়র রিপোর্টার অলিউল্লাহ নোমান, নিউজ এডিটর মুজতাহিদ ফারুকী এবং ডেপুটি এডিটর সৈয়দ আবদাল আহমদ।
আট তারিখে সকাল ন’টায় প্রিজন ভ্যান সুপ্রিমকোর্টের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল। আমি খানিকটা অনিশ্চয়তায় রয়েছি। আসামিদের নিম্ন আদালতে নিয়ে তো প্রথমে কোর্ট গারদে তোলে। সুপ্রিমকোর্টে তেমন কোনো ব্যবস্থা আছে কি-না, আমার জানা নেই। এ বিষয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ কয়েকজন কয়েদি বলল, আমাকে নাকি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে হস্তান্তর করবে। তাতে দুশ্চিন্তা বরং বেড়েই গেল। পুলিশ সহ্য হবে, কিন্তু বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেলকে কিছুতেই সহ্য হবে না। শেষপর্যন্ত প্রিজন ভ্যান থামল অতিপরিচিত জায়গায় অর্থাত্ হাইকোর্টের মাজার পেরিয়ে আইনজীবীদের গাড়ি যেখানে থামে, সেই স্থানেই। বর্তমান সরকারের কল্যাণে জানুয়ারি মাস থেকে গ্রেফতার পর্যন্ত ছ’টি মাস বলতে গেলে হাইকোর্টেই কাটাতে হয়েছে। সেই সুযোগে প্রচুর আইনজীবীর সঙ্গে তো বটেই, উচ্চ আদালতের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গেও এক প্রকার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। প্রিজন ভ্যান থেকে নামতেই পরিচিত মুখগুলো এমন সহাস্যে আমাকে সালাম এবং সমস্বরে অভ্যর্থনা জানাতে লাগল যে, ক্ষণিকের তরে ভুলে গেলাম আমি প্রায় অর্ধশত মামলার দাগী (!) আসামি। একজন জুনিয়র আইনজীবী পাশ থেকে বলে উঠলেন, মাহমুদ ভাই আপনি তো এ জায়গা চেনেনই, আমরা সোজা প্রধান বিচারপতির এজলাসে যাব। সেখানে পৌঁছেই মনে হলো আপনজনদের মধ্যে এসে পড়েছি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, আমার অনুজপ্রতিম মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবী আদিলুর রহমান খান রীতিমত শোরগোল করে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বন্দি হওয়ার পর এমন আনন্দঘন মুহূর্ত আর পাইনি। প্রথমেই আইনজীবীদের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজি সেশন। আমি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলাম, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ছাপার অপরাধে আমি কোনো অবস্থাতেই ক্ষমা চাইব না। পত্রিকার সহকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, তারাও চাইবেন না। আমি অমত করে তাদের বোঝালাম, সবাই মিলে জেলে গেলে স্বাধীন সাংবাদিকতার মহান আদর্শ হয়তো সমুন্নত রাখা যাবে; কিন্তু পত্রিকা চালানো কঠিন হবে। অতএব, জেল খাটতে হয়, সবার পক্ষ থেকে আমি একাই খাটবো। বাক্, চিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রোধ করার সরকারের সব হীন চেষ্টাকে পরাভূত করে আমার সহকর্মীদের যে কোনোভাবে আমার দেশ-এর প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবাই আমার যুক্তি মেনে নিলেন; সিদ্ধান্ত হলো তারা ক্ষমা চাইবেন।
এবার ব্যারিস্টার মওদুদ এগিয়ে এসে আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের শেষ চেষ্টা করলেন। তার যুক্তি, আমার এতগুলো মামলা রয়েছে, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা রুষ্ট হলে সেসব মামলায় ন্যায়বিচার পেতে সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসনসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও অসংখ্য মামলার ভারে ন্যুব্জপ্রায়। তাদের স্বার্থও দেখা প্রয়োজন। ঘনিষ্ঠজনেরা জানেন, জন্মাবধি আমার ঘাড়ের রগ যথেষ্ট পরিমাণে বাঁকা। মওদুদ ভাইয়ের যুক্তি প্রদর্শন সত্ত্বেও মাফ না চাওয়ার সিদ্ধান্তে আমি অটল রইলাম। মওদুদ ভাইকে বললাম, মাফই যদি চাইব তাহলে একমাত্র কলমকে সম্বল করে এক-এগারো থেকে তাবত্ বিদেশি শক্তির সমর্থনপুষ্ট অসীম ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ লড়াই করার মূল্য আর কি অবশিষ্ট থাকে? রফিক ভাই চুপ করে এতক্ষণ আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি এবার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন—মওদুদ, আমি মাহমুদকে কুড়ি বছর ধরে চিনি। আমি জানতাম, ও কিছুতেই মাপ চাইবে না। মওদুদ ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমরা আপনার সঙ্গে আছি। এর মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের আসন গ্রহণের সময় হয়ে গেল। আমারও দেশের লর্ডশিপদের চর্মচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হলো। আমাদের মামলার শুনানির সময় হলে ব্যারিস্টার মওদুদ দাঁড়িয়ে আমি ছাড়া অভিযুক্ত বাকি চারজনের ক্ষমা চাওয়ার কথা জানালেন। আমার পক্ষে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বললেন, আমরা সময়মত শোকজের জবাব দেব। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি আর একটু খোলাসা করার জন্যে প্রশ্ন করলেন, তার অর্থ কি আপনার মক্কেল মামলা কনটেস্ট (Contest) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? ব্যারিস্টার রফিক ইতিবাচক জবাব দিতেই প্রধান বিচারপতির ভ্রূ ঈষত্ কুঞ্চিত হয়ে গেল। রফিক ভাই শোকজের জবাব দেয়ার জন্য সময় প্রার্থনা করলে মামলার শুনানির পরবর্তী তারিখ আগস্টের ১২ ধার্য করা হলো। আইনজীবীদের সঙ্গে আদালত চত্বরেই আমার প্রাথমিক আলোচনার সুযোগ চাওয়া হলে প্রধান বিচারপতি সেটাও মঞ্জুর করলেন।
প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে বার হতেই আরেক নাটক। পুলিশ আমাকে তখনই জেলে ফিরিয়ে নিতে চায়। রফিক ভাই গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মাহমুদুর রহমান তার আইনজীবীদের সঙ্গে এক ঘণ্টা আলোচনা করে তবেই প্রিজন ভ্যানে ফিরবে। আমার অ্যাসকর্ট এবং কোর্ট পুলিশ রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আর তর্ক করার সাহস করল না। সদলবলে চললাম সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতির কক্ষের দিকে। প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে দূরত্ব একেবারে কম নয়। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা সেই দীর্ঘ পথে নানা বিষয়ে আমাকে অনবরত প্রশ্ন করছেন আর আমাদের ঘিরে হাঁটছেন। আসামির সংবাদমাধ্যমের কাছে বক্তব্য দেয়ার আইনগত বাধা রয়েছে। আমি বিচারাধীন মামলা নিয়ে কোনো মন্তব্য না করে কেবল বললাম, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমার লড়াই সর্বপ্রকার নির্যাতনকে উপেক্ষা করে অব্যাহত থাকবে। বার সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের কক্ষে ঢুকে দেখি, সেখানেও সাংবাদিকরা ভিড় করে আছেন। আমাকে মাঝখানে রেখে রফিক ভাই এবং মওদুদ ভাই তাদের দু-একটি প্রশ্নের জবাব দিলেন। মওদুদ ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী আমি নিশ্চুপ বসে রইলাম। বাসা থেকে আমার জন্যে কিছু খাবার পাঠানো হয়েছিল। খাওয়ার পরিবেশ না থাকলেও সবার অনুরোধে অন্তত চোখে দেখতে হলো। সহকর্মী অলিউল্লাহ নোমান জানতে চাইল আমার স্ত্রীকে আদালতে আসতে বলবে কি-না। পারভীন এখানে এলে আমাকে অন্তত একনজর দেখে যাওয়ার সুযোগ পেত। ততক্ষণে আমার ওঠার সময় হয়েছে। তাই স্ত্রীর সঙ্গে আর সাক্ষাত্ সম্ভব হলো না। বার সভাপতির কক্ষের বাইরে এসে দেখি সাদা পোশাকের পুলিশে করিডোর ভরে গেছে। তারা সম্ভব হলে ঘরে ঢুকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সবাই বুঝতে পারলাম, ওপরের চাপ উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা আর সহ্য করতে পারছে না। বিলম্ব না করে অসংখ্য আইনজীবী ও সমসংখ্যক পুলিশ পরিবৃত হয়ে ভিড় ঠেলে অতিকষ্টে দোতলা থেকে নেমে প্রিজন ভ্যান পর্যন্ত পৌঁছালাম। ভ্যানের চারপাশে তখন সাদা পোশাকে এবং ইউনিফর্মধারী শ’খানেক পুলিশ। সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতির কক্ষে আমি যতক্ষণ রফিক ভাই এবং অন্যান্য আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, সেই সময়ের মধ্যে প্লাটুনের পর প্লাটুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপ্রিমকোর্টে আনানো হয়েছে। তাদের শশব্যস্ত অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আমি আর মিনিট পাঁচেক সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে অবস্থান করলেই মহাজোটের মহা পরাক্রমশালী সরকারের পতন ঘটে যাবে।
জালিম শাসকরা যে ভীরুই হয়ে থাকে, আরও একবার তার প্রমাণ পেলাম। প্রিজন ভ্যানের ভেতরে ঢুকে দেখি সেখানে আগে থেকেই ওয়াকিটকি হাতে অতিরিক্ত দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা মহাবিরক্ত চেহারা নিয়ে অপেক্ষমাণ। দরজায় তালা না লাগিয়েই প্রিজন ভ্যান সুপ্রিমকোর্ট এলাকা ত্যাগ করায় বিস্ময়ের সঙ্গে খানিকটা আতঙ্কও বোধ করছিলাম। প্রিজন ভ্যান বার কাউন্সিল ভবনের সামনে এসে থেমে গেল। বাইরে কয়েক ডজন পুলিশের উত্তেজিত কণ্ঠের চিত্কার- চেঁচামেচির শব্দ পাচ্ছি। ভেতরের দুই সাদা পোশাকধারী দরজার কাছে গিয়ে খানিকক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে ফিরে এলো। আন্দাজ করছি পরবর্তী করণীয় নিয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আরও মিনিট দশেক অপেক্ষার পর সাদা পোশাকধারীদ্বয় নেমে গেলে প্রিজন ভ্যানের দরজায় অবশেষে তালা পড়ল। তখনও বুঝতে পারছি না আমি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে যাচ্ছি, নাকি আমাকে অন্য কোনো গুপ্তস্থানে নেয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত রমনা পার্কের মোড় থেকে প্রিজন ভ্যান ইউ টার্ন নিয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যেতেই বুঝলাম নাজিমউদ্দীন রোডেই ফিরছি। জেলে ফিরে দেখলাম, সঙ্গে যে পুলিশ হাবিলদার অ্যাসকর্ট হয়ে গিয়েছিল তার চেহারাটা মলিন। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই বেচারা প্রায় কেঁদে ফেলল। এর মধ্যেই তাকে নাকি সাসপেন্ড করা হয়েছে। তার অপরাধ প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে আমাকে সরাসরি প্রিজন ভ্যানে না তুলে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে বার সভাপতির কক্ষে যেতে দেয়া। বাংলাদেশের প্রশাসনে দরিদ্র নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা বড়ই অসহায়। এদের ওপরেই বড় কর্তাদের যত চোটপাট। প্রধান বিচারপতি যেখানে আদেশ দিয়েছেন, আমি জেলে ফেরার আগে এক ঘণ্টা আইনজীবীদের সঙ্গে মামলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারব, সেক্ষেত্রে একজন হাবিলদারের সেটা আটকানোর ক্ষমতা কোথায়? বেচারার দুর্ভাগ্যে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনে মনে স্থির করলাম, মুক্তজীবনে কখনও দেখা হলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব। সাত নম্বর সেলে ফিরে দেখি আমার সব প্রতিবেশী ততক্ষণে রেডিও মারফত আমার মাফ না চাইবার গল্প জেনে গেছে। তারা আমাকে অভিনন্দন জানানোর জন্যে উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি ফিরতেই সেলে রীতিমত হইচই করে আনন্দোল্লাস শুরু হলো। বন্দিজীবনে এই ক্ষণিক আনন্দের মূল্য অসীম।

এখন থেকে প্রতি বছর জুনে একটি নয় দু’টি করে কালো দিবস পালিত হবে

আজ ১৮ জুলাই। সকাল থেকে বড় উদ্বেগের মধ্যে আছি। সময় আর কাটতে চাচ্ছে না। জুনের পয়লা দিন সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে, ফ্যাসিবাদী কায়দায় সরকার আমার দেশ বন্ধ করার পর উচ্চ আদালতে যে আইনি লড়াই আমার সহকর্মীরা চালিয়ে যাচ্ছেন, তার একটি পর্যায়ের চূড়ান্ত পরিণতি আজ ঘটতে চলেছে। ঢাকার জেলা প্রশাসকের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হলে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে দ্বৈত বেঞ্চ সেই আদেশকে স্থগিত ঘোষণা করে সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। হাইকোর্টের নির্দেশপ্রাপ্তির পর তিন-চারদিন পত্রিকা পুনঃপ্রকাশও হয়েছিল। আমি তখন রিমান্ডে নির্যাতিত হচ্ছি। সে সময় পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের সংবাদ পেয়ে রিমান্ডের যাতনাও ভুলে গিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত হাইকোর্টের সেই আদেশ চেম্বার জজ বিচারপতি এস কে সিনহা চার সপ্তাহের জন্যে স্থগিত করলে পত্রিকাটির প্রকাশনা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগ সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। ১৯৭৫ সালে চারটি মাত্র পত্রিকা রেখে দেশের সব প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়ে হাজার হাজার সাংবাদিককে বেকারত্বের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। ১৬ জুন তাই আজও এদেশে সংবাদমাধ্যমের কালো দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কন্যাও সেই জুন মাসেরই ১ তারিখে আরেকটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করে ইতিহাসে নিজের নাম অক্ষয় করলেন।
এখন থেকে প্রতি বছর জুন মাসে একটি নয়, দু’টি করে কালো দিন পালিত হবে। সেই জুন মাসেই আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি পত্রিকাকে দ্বিতীয়বার বন্ধের মাধ্যমে এদেশে বাকস্বাধীনতাকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। চেম্বার জজ আদালতের এই সিদ্ধান্তকেও ইতিহাস তার মতো করেই মূল্যায়ন করবে। যা-ই হোক, আজ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ কেবল আমার দেশ-এর ভাগ্যই নির্ধারণ করতে যাচ্ছেন না, তারা বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতার ভাগ্যও নির্ধারণ করবেন। যে দেশে চিন্তা, বিবেক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে না, সেদেশে গণতন্ত্র যে তামাশায় পরিণত হয় এই সত্যটি আশা করি, দেশের সব বিবেকবান নাগরিক স্বীকার করবেন। সেই নাগরিক আওয়ামী লীগের মতো জন্মাবধি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলের সমর্থক হলেও। আমাদের সংবিধানের ৩৯ নম্বর ধারায় চিন্তা, বিবেক, বাক্ ও ভাব প্রকাশ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, আমার দেশ পত্রিকার ওপর সরকারের আক্রোশের আলোকে তারও কী ব্যাখ্যা দেশের সর্বোচ্চ আদালত দিতে যাচ্ছেন, সেটিও জানার জন্যে দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
দুপুর একটায় ছয় নম্বর সেলের বন্দি সোহেল রীতিমত লাফাতে লাফাতে এসে জানালো, আপিল বিভাগ চেম্বার জজ আদালতের স্থগিতাদেশ বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখেছেন, আমার দেশ প্রকাশে আর কোনো বাধা নেই। সোহেলের সর্বাঙ্গ ভেজা, মাথায়, মুখে সাবানের ফেনা। গোসলের মাঝখান থেকে উঠে এসেছে সে। চোখে পানি নিয়ে ছেলেমানুষের মতো আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর গায়ের সাবান আমার পরনের কাপড়কে মাখামাখি করে ফেলেছে। সেদিকে আমার ভ্রূক্ষেপ নেই। মনে পড়ে গেল, রিমান্ড চলাকালীন এক বড়কর্তাকে বড় গলায় বলেছিলাম, আপনার প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্যাতন করতে পারেন, হয়তো হত্যাও করতে পারবেন। কিন্তু আমার দেশ আর বেশিদিন বন্ধ করে রাখতে পারবেন না। মহান আল্লাহতায়ালা আমার সেই আশাবাদকে আজ সত্যে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নিয়ে অনেক হতাশার মধ্যেও এই রায় নিভু নিভু করে হলেও ইনসাফপ্রাপ্তির আশার প্রদীপটিকে জ্বালিয়ে রাখতে সহায়তা করবে। সন্ধ্যেবেলা রেডিওতে আমার দেশ নিয়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চমত্কার মন্তব্য শুনলাম। তিনি বললেন, এই জয় প্রতিটি সংবাদপত্রের, ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান এখানে উপলক্ষমাত্র।
আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আদালতপাড়া থেকে আরও একটি সুসংবাদ পেলাম। আমার বিরুদ্ধে সরকার ইসলামী জঙ্গিবাদ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের যে দু’টি আজগুবি মামলা দায়ের করেছিল, সেই উভয় মামলাতেই গত সপ্তাহে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেছিলাম। সরকার যথারীতি সেই আদেশ স্থগিত করার আবেদন নিয়ে চেম্বার জজ আদালতে গেলে বিচারপতি এস কে সিনহা আমার হাইকোর্টের জামিন বহাল রেখেছেন। এই রায়ের ফলে অবশ্য আমি এখনই মুক্তি পাচ্ছি না। বিচারপতি এস কে সিনহার সর্বশেষ রায় প্রদানের আগে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার তেজগাঁও থানার মামলায় আমার হাইকোর্টের জামিন তখনকার চেম্বার জজ বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন স্থগিত করে রেখেছেন। কাজেই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমার মুক্তির কোনো সুযোগ নেই। যে মামলাটির জামিন বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন স্থগিত করেছেন, সেই মামলাটি নিয়ে আমার বিশেষ তিক্ততা ও স্পর্শকাতরতা রয়েছে। তেজগাঁও থানার ওই মামলার রিমান্ডে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়েই মামলার আইও রেজাউল করিম এবং অন্যান্য অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি আমাকে নির্যাতন করে হত্যার চেষ্টা করেছিল। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে আততায়ী দলটি তাদের কাজ সম্পন্ন না করেই সে রাতে ফিরে গিয়েছিল। এই পুরো ঘটনাটি আমি সিএমএম আদালতে বর্ণনা করেছিলাম। অথচ এই মামলাতেই আমার হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত জামিন স্থগিত করেছেন চেম্বার জজ বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। কার্যত পুলিশ হেফাজতে নির্যাতিত হওয়ার পর আমি এদেশের বিচারব্যবস্থার নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কেবল তা-ই নয়, আমার বিবেচনায় ওই স্থগিতাদেশের মাধ্যমে উচ্চ আদালত দুর্ভাগ্যজনকভাবে রিমান্ডে নির্যাতনকে এক ধরনের বৈধতাও দিয়েছেন। বর্ণিত মামলায় আমার জামিনের আবেদন বর্তমানে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় আছে। জানি না কবে মাননীয় বিচারপতিদের মামলা নিষ্পত্তির সময় হবে। তাদের সেই সময় না হওয়া পর্যন্ত সরকার কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই আমাকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখতে পারছে। এর মধ্যে আদালত অবমাননা মামলায় সাজা দেয়ার একটা বাড়তি সুযোগও সরকারের হাতে থাকছে। সব মিলিয়ে অন্তত আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমার নিশ্চিত জেলজীবন।
আগেই উল্লেখ করেছি, আমার পাশের ছয় নম্বর সেল সরকারের তালিকাভুক্ত টপটেররদের আবাসস্থল। কয়েকদিন হলো সেখানে মহাজোট সরকার এবং সরকার সমর্থক মিডিয়ার বিবেচনায় দুই দুর্ধর্ষ টপটেররকে (!) নিয়ে আসা হয়েছে। এরা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দুই অ্যাসিসট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা। দু’জনার সঙ্গেই আমার সর্বপ্রথম সাক্ষাত্ ঘটেছিল ২০০১ সালে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের পর। তারপর বিগত প্রায় দশ বছরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পূর্বপরিচিত দুই রাজনীতিবিদ পাশের সেলে থাকলেও আমার সঙ্গে এখন পর্যন্ত দেখা-সাক্ষাতের কোনো সুযোগ হয়নি। আদালতে হাজিরা না থাকলে অথবা জেলগেটে কেউ দেখা করতে না এলে আমি সেল থেকে একেবারেই বার হই না। আর জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতার বন্দিজীবনের যে কাহিনী শুনছি, তাতে তাদের পক্ষে সাত নম্বর সেলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করার প্রশ্নই ওঠে না। উভয়কেই নাকি চব্বিশ ঘণ্টা তালাবন্ধ করে রাখা হচ্ছে। প্রত্যুষে এবং অপরাহেপ্ত মাত্র এক ঘণ্টা করে সময় দেয়া হচ্ছে গোসল এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম সম্পাদনের জন্য। পুরনো বন্দিদের কাছ থেকে জেনেছি, আমার সাত নম্বর সেল পার্শ্ববর্তী ছয় নম্বর সেলের তুলনায় অনেক উচ্চমানের। এই বর্ণনা থেকেই চোখে না দেখেও ছয় নম্বর সেলের অবস্থা বুঝতে পেরেছি। দু’জন বর্ষীয়ান রাজনীতিককে ওই ধরনের অন্ধকূপে সারাদিন তালাবন্ধ করে রাখা কারা-নির্যাতনের পর্যায়েই পড়ে। জেলের আইন অনুযায়ী চব্বিশ ঘণ্টা লক-আপ এক ভয়ানক শাস্তি। জেলে এসে যারা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো অপরাধ করে থাকে, সাধারণত তাদেরই এ ধরনের শাস্তি দেয়া হয়। অবশ্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামিকেও চব্বিশ ঘণ্টা লক-আপে রাখা হয়। যতদূর খবর পাচ্ছি, তাতে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখাটাই কেবল বাকি আছে। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশেই যে দুই নেতাকে বিশেষভাবে শায়েস্তা করা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি। জামায়াতে ইসলামীর বন্দি অপর তিন নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যথাক্রমে সাবেক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হওয়ায় ডিভিশন ওয়ার্ডে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। ধারণা করছি, ডিভিশন সেলে অবস্থানের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তাদের চব্বিশ ঘণ্টা লক-আপে রাখতে পারছে না। জেলখানায় কানাঘুষা শুনছি মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লার ছেলে ও জামাইকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রলীগ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিবিরের ওপর নির্মম চিরুনি অভিযান পরিচালনার পর সরকার এখন মূল দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গ্রেফতার হওয়ার আগেই আমার মনে হয়েছিল, ছাত্রশিবিরকে শায়েস্তা করে সরকার জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি ও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাত্রা বুঝতে চেয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতনের বিরুদ্ধে শিবির কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে এবং বিদেশ থেকেও কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না আসার পর জামায়াতে ইসলামীর ওপর আঘাত অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। মুক্ত অবস্থায় সরকার সমর্থক পত্রিকায় এমন আগাম খবরও পড়েছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের কোনো কোনো দেশ দলটির নেতৃত্বে নতুন মুখ দেখতে আগ্রহী। পুরনো নেতৃত্বের ওপর সাম্প্রতিক সর্বাত্মক আঘাত সেই লক্ষ্য অর্জনেই পরিচালিত হচ্ছে কি-না, এ প্রশ্নের জবাব জানতে হলে আমাদের আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে লিখতে বসে এক-এগারো পরবর্তী সময়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। জেনারেল মইন গংয়ের ক্ষমতা দখলের আগপর্যন্ত আমি দেশের রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাইনি। চারদলীয় জোট সরকারের পুরো পাঁচটা বছর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও অর্থনীতি এবং জ্বালানির বাইরে পা ফেলার প্রয়োজন ছিল না। সেই পাঁচ বছরে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একটিবারের জন্যও দেশের রাজনীতি অথবা তার দল নিয়ে কোনোরকম আলোচনা করেছি, এমন কথা স্মরণে আসছে না। বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে এদেশের সার্বভৌমত্ব যখন বিদেশিদের পদতলে অর্পণ করা হলো এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেন, সেই দুঃসময়ে একমাত্র কলমকে সম্বল করেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলাম। আমার আজকের কয়েদবাস সেই সংগ্রামেরই অবধারিত পরিণতি। রাজনীতির সঙ্গে যা কিছু সরাসরি যোগাযোগ, সে সময়েই স্থাপিত হয়েছে। যা-ই হোক, বিদেশি শক্তির কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া কয়েকজন উচ্চাভিলাষী সেনাপতির শাসনকালে জামায়াতে ইসলামী অজ্ঞাত কারণে এক ধরনের অতিরিক্ত ও অবাস্তব আত্মবিশ্বাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল বলেই আমার ধারণা। বিশেষ উদ্দেশ্যে সেই সময় ভারতীয় মিডিয়া এবং বাংলাদেশের ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার মিডিয়া যৌথভাবে দলটির সঙ্গে মঈন গংয়ের আঁতাতের গল্প নিয়মিতভাবে প্রচার করতো। এই প্রচারণার পালে সামরিক গোয়েন্দা শাখার যে প্রভাবশালী কর্মকর্তা তখন বাতাস জোগাতেন, তার নাম মেজর জেনারেল (অব.) আমিন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত পত্র-পত্রিকায় এই মেজর জেনারেল (অব.) আমিনের মরহুম চাচার জামায়াত কানেকশনকে উপলক্ষ করে তাকেও জামায়াতপন্থী হিসেবে প্রচার করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, জনশ্রুতি রয়েছে এই জেনারেল আমিনই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিশেষ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তার সঙ্গে বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতেন। ড. গওহর রিজভী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তখন উড়ে এসেছিলেন নির্বাচনপূর্ব মার্কিন-ভারত-আওয়ামী লীগ ডিল সম্পন্ন করার মহত্ উদ্দেশ্য নিয়ে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রকৃত নাগরিকত্ব নিয়েও জনমনে সন্দেহ রয়েছে। জেনারেল আমিনকে নিয়ে আরও গল্প আছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের তত্কালীন খর্বাকৃতি লৌহমানব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তার সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটা আমার মতো আমজনতার জানার কথা নয়। তবে সে সময় প্রচার করা হয়েছিল তিনি নাকি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ রক্ষা করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। হার্ভার্ডে তার সেই জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতার শ্রোতা কারা ছিলেন, এ নিয়ে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। তবে শ্রোতাদের মধ্যে একজন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ছিলেন, সেটা নিশ্চিত। মইন-জয় সাক্ষাত্পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার বিশেষ মিশনে জেনারেল মইনের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন যে সামরিক কর্মকর্তা, তিনিও একই জেনারেল আমিন। রটনা রয়েছে জরুরি শাসনকালে আঞ্চলিক পরাশক্তির গোয়েন্দা প্রধান বাংলাদেশ সফর করে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকেরও নেপথ্য নায়ক ছিলেন জেনারেল আমিন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে, এই চৌকস জেনারেল আসলে কাদের স্বার্থরক্ষা করেছেন। এহেন রহস্যজনক এক ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে জামায়াতে ইসলামী দল আজ কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, সেটা বিবেচনার দায়িত্ব দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের। তবে ২০০৮-এর নির্বাচনপূর্বকালে যে অতিমাত্রায় আস্থাশীল জামায়াতে ইসলামীকে দেখেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান বিপর্যস্ত দলটিকে মেলানো কঠিন।

কোনো সরকারই যে চিরস্থায়ী নয় : জেল কর্মকর্তাদের সেই শাশ্বত সত্য মনে করিয়ে দিলাম

এক মাস তেইশ দিন পর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। ক’দিন আগে আমাকে জানানো হয়েছিল, চার ডজন মামলার সর্বশেষ অবস্থা আলোচনার জন্য আজ জেলগেটে একজন আইনজীবী আসবেন। সকাল থেকে তার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। জেলগেট থেকে রাইটার দেখা করার অনুমতিপত্র নিয়ে এলে সেখানে ফিরোজা মাহমুদের স্বাক্ষর দেখে চমকে উঠলাম। এমন তো কথা ছিল না। মা এবং স্ত্রী দু’জনাকেই জেলগেটে আমার সঙ্গে দেখা না করতে বার বার করে বলে এসেছিলাম। প্রথমেই আশঙ্কা হলো, মা বোধহয় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরই মনে হলো, আমাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করেই শাসক শ্রেণীর জিঘাংসা মিটছে না। হয়তো আমার পরিবারকেও এখন হয়রানি করছে। উপায় না দেখে আমার নিষেধ উপেক্ষা করেই পারভীনকে এখানে আসতে হয়েছে। প্রায় ছুটতে ছুটতে জেলগেটে গেলাম। সঙ্গের কারারক্ষীরা পেছনে কোথায় পড়ে রইল, লক্ষ্যই করিনি।
জেল সুপারের কক্ষের বাইরে দর্শনার্থীদের অপেক্ষার জায়গায় পারভীন বসে আছে। উল্টোদিকের সোফায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চার-পাঁচজন কর্মকর্তা বসে নজর রাখছে। স্ত্রীর হাত ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ভালো আছ তোমরা? হাসিমুখেই সে জবাব দিল, সবাই ভালো আছি। পঁচিশ বছরের চেনামুখের হাসির আড়ালের কান্না দেখতে কোনো অসুবিধে হয়নি। গোয়েন্দা পরিবেষ্টিত অবস্থায় মন খুলে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আমার খোঁজে পারভীনের থানা থেকে থানায় ছুটে বেড়ানো, ডিবি অফিসের বাইরের ফুটপাতে রাতের পর রাত বসে থাকার কাহিনী শুনলাম নিশ্চুপ হয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে ভেতর থেকে উঠে আসা অসহায় ক্রোধ সংবরণ করলাম। লোকমুখে ক্যান্টনমেন্ট থানায় আমার ওপর নির্যাতনের খবর পেয়ে পরের রাতে ওর বড় বোন রীতা, অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার, ব্যারিস্টার মুন্সি কবির, ব্যারিস্টার অসীমকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে থানায় যাওয়ার কথাও শুনলাম। আমার সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। মনে পড়ে গেল, সেই মুহূর্তেই থানা হাজতে চোখ বেঁধে আমার জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। আইও রেজাউল করিম নাকি আমার ওপর নির্যাতনের কথা বেমালুম অস্বীকার করেছে। পারভীন ওই রাতে থানায় ছুটে যাওয়াতেই হয়তো ক্যান্টনমেন্ট থানায় দ্বিতীয় বারের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। কী চমত্কার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই না আমরা বাস করছি! একজন প্রবীণ সম্পাদকের অসহায় স্ত্রীকে থানায় থানায় ছুটে বেড়াতে হয় তার স্বামীকে থানা হেফাজতের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার অক্ষম প্রচেষ্টায়। তার বৃদ্ধা মা এবং স্ত্রীকে সারারাত ধরে ফুটপাতে বসে অপেক্ষা করতে হয় রিমান্ডের নামে নির্যাতন শেষ হওয়ার জন্য। শঙ্কা থাকে রিমান্ড শেষে সুস্থ ফিরে পাওয়া যাবে, নাকি হার্ট অ্যাটাকের গল্প শুনে লাশ দাফন করতে হবে। গণতন্ত্রের স্বঘোষিত মানসকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বছরের প্রথম দিকেই দিল্লি থেকে ইন্দিরা পুরস্কার নিয়ে ফিরেছেন। সেই পুরস্কারের মানপত্রে লেখা আছে, গণতন্ত্রের জন্যে দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপই নাকি গুণমুগ্ধ ভারত সরকার আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এই বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে। তামাশারও বোধ হয় একটা সীমা থাকা দরকার!
আমাদের তিনজনের সংসার আরও ছোট হয়ে এখন দুই প্রজন্মের দুই নারীর সংসারে পরিণত হয়েছে। শাশুড়ি-বৌয়ের সম্পর্ক নিয়ে সারা পৃথিবীতে গল্পের অভাব নেই। আধুনিকতার আগ্রাসনে বাংলাদেশেও একসঙ্গে বসবাস ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আমাকে গ্রেফতার করে আমার বাড়ির শাশুড়ি-বৌকে অবশ্য শেখ হাসিনা আরও ঘনিষ্ঠ করে দিয়েছেন। পারভীনই বলল, সে প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় মা সূরা পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিয়ে দেন। তারপর অপেক্ষা করতে থাকেন, দুপুরে বৌ ফিরলে একসঙ্গে খেতে বসবেন। অফিসের কাজ-কর্ম সেরে পারভীনের ফিরতে একটু দেরি হলেই অস্থির হয়ে ওঠেন। একমাত্র সন্তানের অবর্তমানে জননীর অসহায় বোধ করাই স্বাভাবিক। তিনজনের সংসার থেকে একজনের শূন্যতা পূরণ হওয়া কঠিন। জেলখানায় এসে আমাকে একবার দেখার জন্য মা ব্যাকুল হয়ে আছেন। এই বিচিত্র, অচেনা জায়গায় প্রথম দিন আসছে, একথা ভেবে পারভীন আজ আর মাকে সঙ্গে আনেনি।
দেখার বরাদ্দ তিরিশ মিনিট সময় নিমেষে পার হয়ে গেল। বিদায়ের আগে আমার স্ত্রী বলে গেল, আগস্টের মধ্যে মুক্তি না মিললে মাসের শেষদিকে মাকে নিয়ে আসবে। আমি সাধ্যমত তাকে নিবৃত্ত করতে চাইলাম। জানি না শুনবে কি না! আমি মন থেকেই চাই না ওরা এখানে আসুক। এই অমার্জিত সরকার দেশের কোনো নাগরিকেরই সম্মান রাখতে জানে না। এবার ক্ষমতায় এসে যুগপত্ মার্কিন ও ভারতের অন্ধ সমর্থন ক্ষমতাসীনদের এতখানি উদ্ধত করে তুলেছে যে তারা সংবিধান, আইন, মানবাধিকার কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, পশ্চিমা বিশ্বকে ইসলামী জঙ্গি নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে এবং দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতের সব অন্যায্য চাহিদা পূরণ করে তারা অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হবে। কোনো অপকর্মের জন্যই কোথাও জবাবদিহি করতে হবে না। এই জঙ্গি জঙ্গি খেলা মার্কিনিদের কাছে এক সময় ধরা পড়ে গেলেও সে দেশের শক্তিশালী ভারতীয় লবি মহাজোটের ক্ষমতায় টিকে থাকার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। শেখ হাসিনার দেশি-বিদেশি পরামর্শকরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঠিক বিশ্লেষণ করেছেন বলেই আমার ধারণা। পশ্চিমা ও ভারতীয় স্বার্থে বিরোধ না লাগা পর্যন্ত তিনি সম্ভবত নিরাপদেই থাকবেন। মিডিয়ার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে জনমতকে বিভ্রান্ত করা যে কত সহজ, সে তো আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনেই দেখেছি। অবশ্য একই সঙ্গে সামরিক এবং বেসামরিক আমলা শ্রেণীকে সপক্ষে রাখাটাও জরুরি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় এই সুবিধাবাদী আমলা শ্রেণী যে ক্রমেই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তার লক্ষণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। রেডিও-টেলিভিশনে প্রজাতন্ত্রের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা যে ভাষায় কথা বলছেন, তার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের কোনো ফারাক নেই বললেই চলে। অবিশ্বাস্য এই স্তাবকতা!
জেল প্রশাসনের সব কর্মকাণ্ডে একই ধরনের দলীয় চিন্তাধারাই প্রতিফলিত হচ্ছে। অতীতেও হয়তো এই ধারার ব্যতিক্রম ছিল না। জেলের পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকায় সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। কিন্তু আমাকে প্রাথমিকভাবে ডিভিশন না দেয়া, জামায়াতে ইসলামী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে টপ টেররদের মতো আচরণ, তাদের প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা লক-আপে রাখা, ইত্যাকার কাজকর্মের মধ্য দিয়ে জেল প্রশাসনের দেশের প্রচলিত আইন না মানার স্পষ্ট প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন বৈরী পরিবেশে আমার মা ও স্ত্রী আমাকে দেখতে এসে কোনোভাবে অসম্মানিত হলে আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হবে না। পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য হিসেবে তাদের যে কোনো ধরনের অমর্যাদা থেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করা আমার দায়িত্ব। বন্দি জীবনের অসম্মান, একাকিত্ব সহ্য করে তাদের যথাসম্ভব নিরাপদে রাখার চেষ্টা তো অন্তত করতে হবে। সাক্ষাত্কার শেষে দু’জন দুই দরজার দিকে চলে গেলাম। পারভীন জেলগেট ত্যাগ করার পর আমিও সাত নম্বর সেলের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
জেলগেটে কর্তৃপক্ষ আমাকে কিছু না জানালেও সেলে ফিরেই শুনলাম, জুলাই মাসের ২৫, ২৬ এবং ২৭ পরপর তিন দিন আমার তিন জেলায় হাজিরা রয়েছে। প্রথম দিন কক্সবাজার, দ্বিতীয় দিন ঢাকা এবং তৃতীয় দিন গোপালগঞ্জে মামলার তারিখ পড়েছে। এই রসিকতায় না হেসে পারলাম না। মন্তব্য করলাম, ভালোই তো, সদাশয় সরকার তিন দিন আমাকে কোর্টে আনা-নেয়ার জন্য একটা হেলিকপ্টার বরাদ্দ করলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। জেলের জমাদার জানিয়ে গেল, কালই আমাকে কক্সবাজার চালানে পাঠানো হচ্ছে। আমি যেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে সকালেই তৈরি থাকি। সারা রাত ঘুম এলো না। পাঠক ভাববেন না, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের হাতছানি সে রাতে আমার নিদ্রা হরণ করেছিল। আমার নিজের ঘরের জন্য মনটা বড় খারাপ লাগছিল। গত তেপ্পান্ন দিনে অনেক যুদ্ধ করে জেলজীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এই সরকারের যাবতীয় নির্যাতন সহ্য করার জন্য বাইরে থেকে যে শক্ত খোলস প্রায় দু’মাসে আমি তৈরি করে নিয়েছিলাম, আজ পারভীন সেটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে। জেলের এই রাতটাকে আবার জেল জীবনের প্রথম রাতের মতো লাগছিল, আর কষ্টের প্রচণ্ডতা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সকালে উঠে ভাবলাম দুর্বল হলে চলবে না, আজ থেকেই ফুটো হওয়া খোলস মেরামতের কাজে লেগে যেতে হবে। জালিমের কাছে কিছুতেই পরাজিত হওয়া যাবে না।
শেষ পর্যন্ত আমাকে গোপালগঞ্জেই যেতে হচ্ছে। কক্সবাজারে আগামী মাসে নতুন তারিখ পড়েছে এবং ২৫ তারিখ রাতে জেল কর্তৃপক্ষ ঢাকায় হাজিরার স্লিপ পাঠালেও ২৬-এর ভোরে সেটা পাল্টে গোপালগঞ্জে চালানের স্লিপ পাঠাল। ২৬ তারিখে ঢাকা আদালতে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। বেশ কয়েকটি মামলার বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে সেখানে পরামর্শ করতে চেয়েছিলাম। প্রচলিত আইনেও বলে, ঢাকার কোনো আদালতে হাজিরার তারিখ নির্ধারিত থাকলে সেটা সম্পন্ন করেই অন্য জেলা আদালতে যেতে হবে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দর্পে অন্ধ সরকার আদালত-আইন কোনো কিছুই না মানার পণ করে বসে আছে। জেল কর্মকর্তাদের সঙ্গে পারতপক্ষে আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। আমার লড়াই চলছে ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিতদের সঙ্গে। এখানকার সবাই নিতান্তই নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। এদেরও অধিকাংশ আমার মতোই অসহায়। আজ আর মেজাজটাকে বাগে রাখতে পারলাম না। গোপালগঞ্জের স্লিপ পাওয়ামাত্র জমাদার, কারা রক্ষীদের দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সোজা চলে গেলাম জেলগেটের প্রধান অফিসে। এখানে আসার পর এই প্রথম কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বভাববিরুদ্ধ রূঢ় আচরণ করলাম। এদের এতদিনের অবজ্ঞা, অসৌজন্যমূলক আচরণ গায়ে মাখিনি। আজ জানতে চাইলাম, আইন নিয়ে এতটা যথেচ্ছাচার করার ক্ষমতা তারা কোথা থেকে পাচ্ছে? আজ ২৬ তারিখে মামলার নির্ধারিত তারিখে ঢাকা সিএমএম আদালতে না পাঠিয়ে আইনের কোন ধারাবলে গোপালগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে, সেটাও জিজ্ঞাসা করলাম। কোনো সরকারই যে চিরস্থায়ী নয়, সেই শাশ্বত সত্যের ব্যাপারেও তাদের স্মরণ করালাম। পরিচিত জনেরা জানেন, আমার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকের চেয়ে সচরাচর উচ্চগ্রামেই থাকে। আজকের গলার আওয়াজ সম্ভবত ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের প্রধান ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের কানেও প্রবেশ করেছে। ভেতরের কারা রক্ষী, আসামিরা সব নিশ্চুপ, কর্মকর্তারা আমতা আমতা করে খোঁড়া কিছু যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করল। সেই দুর্বল যুক্তিগুলোর মধ্যে আংশিক সুখবর পেয়ে খানিকটা শান্ত হলাম। আগামীকাল ঢাকা সিএমএম আদালতে যে মামলার হাজিরা ছিল, সেই মামলায় হাইকোর্ট প্রদত্ত জামিনের কাগজপত্র নিম্ন আদালতে পৌঁছে যাওয়ায় আমার নাকি হাজিরা না দিলেও চলবে। অপরদিকে গোপালগঞ্জের মামলা জামিনযোগ্য মানহানি মামলা হওয়া সত্ত্বেও সশরীরে আমাকে না দেখে আজকের বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জেলার ক্ষমতাবান চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জামিন মঞ্জুর করবেন না। কাজেই চালানে আমাকে যেতেই হবে। হৈ চৈ করে চালান ঠেকাতে না পারলেও অন্তত হাইকোর্টের জামিনের খবরটা যে পেলাম, এটাই আমার নগদ লাভ। ঢাকা জেলের সুপার তৌহিদ এবং জেলার মোখলেসুর রহমান এখানে আসা অবধি আমার সঙ্গে যথাসম্ভব অসহযোগিতা করে চলেছে। আজ সেই অসহযোগিতার আরও একটা প্রমাণ পেয়ে মনে হলো, আমার সঙ্গেই যদি এমন আচরণ চলতে পারে তাহলে অসহায়, দরিদ্র, সাধারণ কয়েদিদের প্রতিদিন কী পরিমাণ অন্যায়-অবিচারের শিকার হতে হচ্ছে।

জেলের কঠিন জীবনযাপন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

জেলগেট পার হতেই চেনা প্রিজন ভ্যানের পরিবর্তে এক সুদৃশ্য মাইক্রোবাস অপেক্ষমাণ দেখে বিস্মিত হলাম। গাড়িতে উঠে জানলাম, আমাকে পাহারা দিয়ে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়ার জন্য ১৩ জন পুলিশ এসকর্ট সঙ্গে যাচ্ছে। এই পুলিশ দলটির দায়িত্ব আমাকে গোপালগঞ্জ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে সহি-সালামতে হস্তান্তর করা। সকাল সাড়ে ১০টায় নাজিমউদ্দিন রোড থেকে রওনা হয়ে মাওয়াঘাটে পৌঁছাতে ঘণ্টা দেড়েক লাগল। ভরা বর্ষায় একদা প্রমত্তা পদ্মার শীর্ণ রূপ পরম বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর অপার বন্ধুত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। শ্রাবণের এই পদ্মা দেখে মনে পড়ল, গ্রেফতার হওয়ার ঠিক দু’সপ্তাহ আগে ১৬ মে’র ফারাক্কা দিবসে রাজশাহীর পদ্মার চরে এক গণজমায়েতে প্রধান অতিথি ছিলাম। সেই সভায় পানিযুদ্ধ চালিয়ে আমার মাতৃভূমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মরুভূমিতে পরিণত করার অপরাধে ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি করেছিলাম।
গত দু’মাসের বন্দিজীবনে অনেকবারই মনে হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত সম্পর্কে আমার সরাসরি বক্তব্য ও লেখালেখি এই বন্দিত্বকে ত্বরান্বিত করেছে। মাঝেমধ্যে তর্জনগর্জন করলেও আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক পরাশক্তির তাঁবেদার কোনো সংবাদপত্রকে আমার দেশ-এর মতো করে বন্ধ করার ক্ষমতা এই সরকারের কোনোদিনই হবে না। দেশের স্বাধীনতা, জনগণের স্বার্থ এবং নিজ ধর্মবিশ্বাসের পক্ষে লড়াই করার পরিণতিতে জেলে আসায় আমার কোনোরকম অনুশোচনা নেই। এই পথ আমি স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছি। মহান আল্লাহতায়ালাই তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবেন। পদ্মার বুকে ফেরিতে দুই ঘণ্টা কাটিয়ে গোপালগঞ্জ জেলে পৌঁছাতে বিকেল ৪টা বেজে গেল। নবনির্মিত জেলখানার চাকচিক্য দেখে ভালোই লাগল। জেল কর্মকর্তাদের অভ্যর্থনায় সৌজন্যের কোনো ঘাটতি নেই। ছোট একটি সমস্যার কথা শুনলাম। গোপালগঞ্জ জেলে কোনো ডিভিশন ওয়ার্ড না থাকার কারণে আমাকে কারা হাসপাতালে থাকতে হবে। প্রসন্ন চিত্তে ভারপ্রাপ্ত জেলারকে আশ্বস্ত করে ঢাকা জেলে দুই মাস ধরে সাত সেলে অবস্থানের কথা জানালাম। সাত সেলের বন্দিজীবনে অভ্যস্ত হওয়ার পর ডিভিশন ওয়ার্ডের প্রসঙ্গই এখন আমার কাছে অবান্তর। হাসপাতাল ওয়ার্ডে গিয়ে রীতিমত মুগ্ধ হলাম। বিশাল একটি কক্ষে আমার থাকার আয়োজন করা হয়েছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এখানে লাগোয়া টয়লেট রয়েছে। দুটো দিন আমাকে নিজহাতে গণটয়লেট পরিষ্কার করতে হবে না জেনেই আমি পুলকিত। কারা প্রশাসনের লোকজন একে একে পরিচিত হতে এলো। তাদের কাছ থেকেই জানলাম, ২০১০ সালের প্রথম দিকে গোপালগঞ্জের নতুন জেলটি উদ্বোধন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন।
কয়েদি এবং হাজতি মিলে মোট বন্দির সংখ্যা মাত্র সাড়ে তিনশ’। এখানে এমন ওয়ার্ডও আছে যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো বন্দি ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ এই দোতলা হাসপাতালে আমিই সর্বপ্রথম বন্দি। একেবারেই নির্জন এই ওয়ার্ডে রাতে আমার জন্যে কোনো পাহারা লাগবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলারকে বললাম, আমি একা থাকতেই বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। ফার্মাসিস্ট রক্তচাপ মাপার যন্ত্র নিয়ে এলে তাকেও জানালাম, আমার রক্তচাপ স্বাভাবিকই আছে, কষ্ট করে পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। দীর্ঘপথ চলার ক্লান্তিতে রাত ১০টার মধ্যেই রাতের আহার শেষ করে হাসপাতালের পরিষ্কার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
ফজরের নামাজ পড়ে জেলজীবনের অভ্যাসমত সকাল ৬টার মধ্যেই গোসল শেষ করে নিজহাতে কাচা লুঙ্গি আর গেঞ্জি শুকানোর ব্যবস্থা করছি, এমন সময় গত রাত থেকে নিয়োজিত সেবক মোস্তফা এসে হাজির। আমি নিজহাতে কাপড় ধুয়েছি দেখে রীতিমত চোটপাট শুরু করে দিল। প্রায় কুড়ি বছর ধরে সাজাখাটা অভিজ্ঞ মেট মোস্তফার এই অসন্তোষের মধ্যে আন্তরিকতার ছোঁয়া খুঁজে পেয়ে ভালোই লাগল। অঙ্গীকার করতে হলো, যে কদিন গোপালগঞ্জে আছি অন্তত সে ক’দিন এমন গর্হিত কাজ আর করব না। সকাল সাড়ে ৯টায় সুবেদার এলো প্রিজন ভ্যান আসার খবর নিয়ে। জেল থেকে বেরিয়ে দেখলাম, অন্যরকম আকৃতির এক প্রিজন ভ্যান। পেছনটা খোলা যেখানে সাধারণ কয়েদিরা চাপাচাপি করে বসে আছে, তাদের পাহারা দেয়ার জন্যে অস্ত্রহাতে তিন-চারজন সেন্ট্রি ডালার কাছে দাঁড়িয়ে। আমাকে বলা হলো সামনে ড্রাইভারের পাশে বসতে। আমি গাড়িতে ওঠার পর আমাকে মাঝখানে ঠেলে দরজার দিকে বসলেন একজন এসআই। জেল থেকে আদালত মিনিট দশেকের পথ। সোজা কোর্ট গারদে আমাকে নিয়ে তোলা হলো। মুখোমুখি দুটো গারদ। একটায় সব বন্দিকে ঢোকানো হলো এবং অপরটায় আমি একাই। ঘণ্টাখানেক ধরে অবিরত পায়চারি করে আমার পাদুটো আর চলছে না। কোর্ট ইন্সপেক্টরের বোধহয় মায়া হলো। একটু বিব্রত মুখেই একটা চেয়ার এনে ভদ্রলোক গারদের ভেতরেই আমার বসার ব্যবস্থা করলেন। আরও আধঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে ডাক পড়ল। এজলাসে গিয়ে মনটা উত্ফুল্ল হয়ে গেল। প্রকৌশলী রিজু, হাসিন, রিপন, চুন্নু, নজরুল, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান, অ্যাডভোকেট মেসবাহ এবং আরও কয়েকজন পেশাজীবী ঢাকা থেকে এতদূর এসেছেন আদালতে আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। আমি অপরিসীম কৃতজ্ঞতাবোধে আপ্লুত হলাম। আজ শবেবরাত হওয়া সত্ত্বেও আপনজনদের ফেলে এতগুলো মানুষ গোপালগঞ্জে এসেছেন আমার কুশল জানতে। দেশপ্রেমিক পেশাজীবীদের এই সমর্থন প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে আমাকে অনুপ্রেরণা জোগায়। কাঠগড়ায় দশ আসামি বেশ গাদাগাদি করে দাঁড়ালাম। বাদী আওয়ামী লীগের এক স্থানীয় নেতা। তার পরিবারের রাজাকারি অতীতের সংবাদ আমার দেশসহ তিন-চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় সেই নেতা মানহানি মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সবাই সাংবাদিক, তবে সম্পাদক আমি একাই।
দশ আসামির মধ্যে নয়জনকে এরই মধ্যে জামিন দেয়া হয়েছে। এক আমার জন্যেই নাকি আজকের এত আয়োজন। আমি পেশায় যেহেতু আইনজীবী নই, কাজেই আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ বোঝা আমার কর্ম নয়। তবে একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে মনে হলো, এই অপচয়ের কোনো প্রয়োজন ছিল না। মামলার ধারা জামিনযোগ্য, আমি কারাগারে বন্দি, অর্থাত্ রাষ্ট্রীয় হেফাজতে আছি। এরকম পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বহীন, বানোয়াট মামলায় কেবল জামিন মঞ্জুরের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্যে আমাকে ঢাকা থেকে টেনে আনবার কী প্রয়োজন ছিল, সেটা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকল না। আমার পক্ষে স্থানীয় একজন আইনজীবী দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ বিষয় ব্যাখ্যা করে জামিনের আবেদন করলেই তো জামিন মঞ্জুর হওয়া উচিত ছিল। আমি যেহেতু সরকারের রোষানলে আছি, তাই আমার ব্যক্তিগত হয়রানির কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, তবে আমাকে টানাহ্যাঁচড়া না করলে সরকারের অনেকগুলো টাকারও তো সাশ্রয় হতো। আমাকে আনা-নেয়ার জন্য দুই দফায় গাড়ি ভাড়া, ডজনখানেক পুলিশের পুরো দুই দিনের কর্মঘণ্টা নষ্ট, তাদের খোরাকির অর্থব্যয়—তা সে যতই সামান্য হোক, ঢাকা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশ প্রশাসনে সতর্কাবস্থা, এসব করে কার কী লাভ হচ্ছে আল্লাহই জানেন! জামিন হয়ে গেলে আদালত থেকে গোপালগঞ্জ জেলে ফিরলাম। ফেরার সময় জেলা পুলিশ প্রশাসন একটা পিক-আপের ব্যবস্থা করায় সকালের প্রিজন ভ্যানে চড়তে হলো না। জেলার সরাসরি না বললেও হাবেভাবে বুঝলাম, কালই ঢাকায় ফেরত চালানে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেল প্রশাসন আবার চালান নিয়ে নাটক করতে পছন্দ করে। আগে থেকে কিছু না বলে চালানের সকালবেলা আসামিকে তৈরি হতে বলাটাই এদের রীতি। আকস্মিক নির্দেশে আসামি বেচারার যথেষ্ট মানসিক নির্যাতন হয় এবং এতেই কর্তৃপক্ষের বোধহয় অপার আনন্দ।
শবেবরাতের রাত গোপালগঞ্জ জেলেই কাটল। নিজ গৃহের কথা বড় মনে পড়ছিল। মিষ্টান্নের প্রতি আমার ভয়ানক দুর্বলতা রয়েছে। পারভীন রান্নাঘরে সচরাচর না গেলেও প্রতি শবেবরাতে আমার বিশেষ পছন্দের কয়েক ধরনের হালুয়া তৈরি করে। এবার নিশ্চয়ই রান্নাবান্না বাদ দিয়ে শাশুড়ি-বৌ কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। সারা রাত প্রায় অনিদ্রায় কাটিয়ে সকাল থেকে প্রস্তুত হয়ে রইলাম। ৯টার দিকে ভারপ্রাপ্ত জেলার নূর মোহাম্মদ এসে জানালেন পুলিশ এসকর্ট এসে গেছে, আমি যাত্রা শুরু করতে পারি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুপুর আড়াইটার দিকে ফিরলাম। সাত সেলের বন্ধুরা আমাকে সুস্থ শরীরে ফিরতে দেখে আনন্দ প্রকাশ করল। শবেবরাতের দিন যার যার বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খাওয়ার সময় আমার অনুপস্থিতি তাদের পীড়া দিয়েছে শুনে বড় ভালো লাগল। ভাবলাম, জীবন কত বিচিত্র! ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা এই সাত সেলের বারো বন্দি কত অল্প সময়ের মধ্যে স্বজনে পরিণত হয়েছি।
দেখতে দেখতে জুলাই মাসের শেষ দিন চলে এলো। মাসের শেষ দিন শুরুই হলো ভারী বর্ষণের মধ্যে। ফজরের আজান আর বৃষ্টির মিলিত শব্দে ঘুম ভেঙেছে। একটু শীত-শীতও বোধ হচ্ছে। একবার মনে হলো, দৈনন্দিন জেল রুটিনে না হয় ব্যতিক্রম ঘটাই। কী হবে আর এত ভোরে উঠে? চাদর মুড়ি দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ঘুমাই। পরক্ষণেই মনের দুর্বলতা ঝেড়ে এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠলাম। জেলখানার এই কঠিন জীবনযাপন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহাজোটের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে মনের জোর দিয়েই পরাজিত করতে হবে। বালতি এবং মগ নিয়ে চৌবাচ্চার কাছে যখন এলাম, ততক্ষণে বৃষ্টি অনেকটা ধরে এলেও একেবারে থামেনি। আমি দীর্ঘদিনের সাইনাসের রোগী, মাথায় বৃষ্টির পানি পড়লে সমস্যা বাড়ে। জেলে আসার পর থেকে শরীরকে আস্কারা দেয়া যথাসম্ভব বন্ধ করেছি। জেল কর্তৃপক্ষ যে খাদ্যই দেয়, বিনা প্রতিবাদে গলাধঃকরণ করি, যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়তে অস্বস্তিবোধ করি না। পরিষ্কারের সব বাতিক ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আজ বৃষ্টির পানিতে আমার কেশবিহীন মাথা ভেজালাম। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই টয়লেট পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া ইত্যাদি শেষ করে গোসল শুরু করার আগেই বৃষ্টির বেগ আবার বেড়ে গেল। বারান্দায় চেয়ার পেতে বৃষ্টি দেখার ফাঁকেই মনে হলো আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতৃভূমি সফরের কথা রয়েছে। মাত্র দু’দিন আগে সরকার আমাকে গোপালগঞ্জ জেল দেখিয়ে এনেছে। জেলের খুব কাছেই প্রধানমন্ত্রীর মরহুম ভাই শেখ কামালের নামে জেলা স্টেডিয়াম। সেই শেখ কামাল স্টেডিয়ামেই শেখ হাসিনার জনসভা করার কথা। জেলখানায় যাওয়া-আসার পথে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখে এসেছিলাম। এই বৈরী আবহাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর গোপালগঞ্জে যাওয়া হবে তো?
বৃষ্টির মধ্যেই ১০টার খানিক পর আমার পড়শি মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিনকে পিজি হাসপাতালে নেয়ার জন্য জেলের লোকজন এসে হাজির। ভদ্রলোক দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছেন। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি নিয়েই দিনের পর দিন অনেক কষ্টে কোরআনের তাফসির লিখে চলেছেন। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ তার প্রয়োজনীয় চিকিত্সার ব্যবস্থা করছিল না। তারা গোঁ ধরে বসে ছিল, জেলের বাইরে জয়নাল ভাইকে নেয়া যাবে না। চিকিত্সা যা হবে, সেটা জেলের মধ্যেই হবে। অথচ চোখের চিকিত্সার সুব্যবস্থা এই জেলে নেই। মুক্তিযুদ্ধের এই সেক্টর কমান্ডারকে শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। আদালত চিকিত্সার নির্দেশ দেয়ার পরও প্রশাসন বেশ কিছুদিন ওপরের নির্দেশে টালবাহানা করে কাটিয়েছে। মার্কিন-ভারত সমর্থিত সরকার মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা করবে না, এটাই স্বাভাবিক। এই প্রকৃতির শাসকশ্রেণীকে উদ্দেশ করেই মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আশ-শুরা’র ৪২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার ধর্মপরায়ণ রূপটি জনগণের কাছে বেশ দেখাতে আগ্রহী বলেই আমার সর্বদা মনে হয়েছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যবহৃত তার হিজাবপরিহিত, দু’হাত তুলে মোনাজাতরত পোস্টারের স্মৃতি দেশের অনেক নাগরিকের মনেই আশা করি এখনও উজ্জ্বল। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি প্রচারাভিযান আরম্ভ করেন হজরত শাহজালাল (র.)-এর রওজা জিয়ারতের মধ্য দিয়ে। প্রায় প্রতিবছর ওমরাহ পালন করেন, তাও দেখতে পাই। কিন্তু এগুলো সবই ধর্মের বাহ্যিক রূপ। পবিত্র গ্রন্থের মর্মবাণী হৃদয়ে প্রবেশ না করলে এসব করে কোনো ফায়দা নেই। জয়নাল ভাই যে সারারাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করেন এবং তাফসির লেখেন তার উল্লেখ আগেই করেছি। ধর্মপ্রাণ এই বীর মুক্তিযোদ্ধা চোখের চিকিত্সা শেষে আজ হয়তো একটা চশমা নিয়ে ফিরতে পারবেন।

হঠাত্ই জেল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, জামায়াত নেতা ও ডিভিশনের বন্দিরা ভালো খাবার কিনতে পারবেন না

সন্ধ্যায় রেডিওতে প্রচারিত সংবাদে জানলাম, আমার আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জ যেতে পারেননি। এছাড়া আরও একটি দুঃসংবাদ শুনলাম। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্যে সড়কপথে গোপালগঞ্জে যাওয়ার সময় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একজন সচিব ও তার সহযাত্রী বিসিক চেয়ারম্যান নিহত হয়েছেন। মাত্র দু’দিন আগে সরকার আমাকে গোপালগঞ্জ ঘুরিয়ে আনলেও এত ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীকে প্রকৃতির কাছে পরাজিত হয়ে তার সফর বাতিল করতে হলো। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আমরা নিতান্তই অসহায়—এই শাশ্বত সত্যটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা যে মানতে চান না, এটা তাদেরই দুর্ভাগ্য। আজ গোপালগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত একাধিক অনুষ্ঠানের মধ্যে তার মরহুম পিতার নামে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি প্রকল্প উদ্বোধনেরও কথা ছিল। এই প্রকল্পটির উদ্যোক্তা তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পোশাক ব্যবসায়ীরা এই প্রকল্পের জন্য গোপালগঞ্জকে কেন বেছে নিয়েছেন, সেটা বোঝা কঠিন নয়। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এই প্রকল্পের স্থান গোপালগঞ্জের পরিবর্তে বগুড়া কিংবা ফেনী হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক ছিল। আমাদের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। গোপালগঞ্জে তৈল প্রদান প্রকল্প নিয়ে পোশাক ব্যবসায়ীরা যখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে তাদেরই শিল্পে কর্মরত বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে অধিক মজুরির দাবিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রত। দিনব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশ এবং শ্রমিক মিলে একদিনে আড়াইশ’জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সংঘর্ষ তীব্র ও ব্যাপক হওয়ায় সাভার, আশুলিয়া শিল্প এলাকার প্রায় দেড়শ’ পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে।
আমার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় শিল্প শ্রমিকদের সঙ্গে বিভিন্ন কারখানায় কেটেছে। এদেশের শ্রমিকদের আমি সবসময় পরিশ্রমী, সুশৃঙ্খল এবং অনুগতই দেখতে পেয়েছি। পোশাকশিল্প শ্রমিকদের যে কোনো আন্দোলনে সহিংসতার এই তীব্রতা আমাকে প্রচণ্ড বিস্মিত করে। আমার তিন দশকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশেষ খাতের শ্রমিক শ্রেণীর এই ক্রোধকে মেলাতে পারি না। শ্রমজীবী মানুষের অসন্তোষকে উস্কে নিয়ন্ত্রণহীন করার পেছনে কোনো বিদেশি সংস্রব আছে কি-না, সেই রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার। তবে এই বিশেষ শিল্প খাতটির মালিকদের বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য রয়েছে। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প মালিকরা তাদের পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট সাফল্য লাভ করেছেন। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় যে দশ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, তার পেছনেও এদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এদের সম্পর্কে আমার কিছু অভিযোগও আছে। আমার ধারণা, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক মালিক গোষ্ঠীর একটি অংশ অতিমাত্রায় বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা কথিত অভিজাত এলাকার প্রাসাদোপম অট্টালিকায় বসবাস করেন, যেসব যানবাহনে চড়েন, তার কোনোটিরই মূল্য কোটি টাকার নিচে নয়। শুনতে পাই, বিদেশের বড় বড় শহরে তাদের একাধিক বাড়িঘর রয়েছে এবং বিদেশি ব্যাংকে তাদের সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ শুনলে আমাদের মাথা ঘুরে যাবে। মালিকদের এই আয়েশি জীবনধারা সম্পর্কে পোশাকশিল্প শ্রমিকরাও মোটামুটি অবহিত। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মনে এক ধরনের বঞ্চনাজনিত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হওয়াই স্বাভাবিক। সম্ভবত সেই ক্ষোভকেই স্বার্থান্বেষী মহল মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করে আমাদের অর্থনীতির জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের অভদ্র আচরণ ক্রমেই সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। আগেই উল্লেখ করেছি, সাধারণ এবং ডিভিশনপ্রাপ্ত আসামিদের দৈনিক খোরাকি যথাক্রমে ৪০ এবং ৮৬ টাকা। বড় কর্তাদের পকেটে খোরাকির একটি অংশ যাওয়ার পর অবশিষ্ট টাকায় সাধারণ কয়েদিদের জীবনধারণ কষ্টকর। তুলনামূলকভাবে সচ্ছল সাধারণ বন্দিরা পিসি থেকে খানিকটা উন্নত মানের খাদ্যদ্রব্য কেনাকাটা করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। পিসি থেকে প্রতিদিন মাছ অথবা মাংস ছাড়াও সপ্তাহে একদিন তেহারি সরবরাহ করা হয়। এক পিস মাছ ৬০ টাকা এবং মাংস ৭০ টাকা করে বিক্রি হয়। তেহারি এ পর্যন্ত না খাওয়ায় দাম জানা নেই। যা-ই হোক, টাকা দিলে যে কোনো বন্দি এগুলো কিনতে পারে। জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লাকে কর্তৃপক্ষ ডিভিশন না দেয়ায় দু’জনকেই সঙ্গত কারণে পিসি থেকে আমাদের তুলনায় বেশি পরিমাণে জিনিসপত্র কিনতে হয়। হঠাত্ একদিন শুনলাম, পিসি থেকে তাদের মাছ-মাংস কেনা প্রসঙ্গে সরকারপন্থী একটি পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, জেলবন্দি জামায়াত-বিএনপি নেতাদের নাকি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজার হালে রাখা হয়েছে। যারা এই আজগুবি খবর ছাপিয়েছেন, তাদের ক’টা দিন আমাদের মতো রাজার হালে রাখতে পারলে মন্দ হতো না!
বাস্তবতা যা-ই হোক, জেলের ভেতর সংবাদের প্রতিক্রিয়া হলো গুরুতর। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, জামায়াত নেতারা এবং ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিরা পিসি থেকে ভালো খাবার-দাবার আর কিনতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষের এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা আমার জানা ছিল না। সাত নম্বর সেলের সব সেবক মিলে আমার কাছে শুক্রবার তেহারি খাওয়ার আবদার ধরলে সেবক সালাহউদ্দিনকে পিসিতে তেহারি আনতে পাঠালাম। সালাহউদ্দিন খালি হাতে ফিরে এসে জানালো, নতুন নিয়ম অনুযায়ী আমার কাছে তেহারি বিক্রি করা নিষিদ্ধ। অতিকষ্টে এই অপমান সহ্য করলাম। একদিন পর আরেক নাটক। প্রতিদিন দুপুরে আমার জন্য ডিভিশন চৌকা (রান্নাঘর) থেকে একটা অতিরিক্ত ডিমভাজি পাঠানো হয়। এই ডিমভাজির আবার একটা পূর্ব-ইতিহাস রয়েছে। জেলখানার রান্না মাছে অধিকাংশ দিনেই আঁশটে গন্ধ থাকায় আমি খেতে পারি না। মেনুতে মাছ থাকলেই শুধু ডাল এবং সবজি দিয়ে ভাত খেতে দেখে ফয়সালই প্রথম আমাকে ডিভিশন চৌকা (রান্নাঘর) থেকে ডিম ভাজি করে আনার পরামর্শ দেয়। আমিও ভাবলাম উত্তম পরামর্শ, শরীরে প্রোটিনের অভাব খানিকটা পূরণ হবে। সেই থেকে দুপুরের বরাদ্দ মাছ সেবককে দিয়ে আমি ডাল, সবজি আর ডিমভাজি দিয়েই খাওয়া সারি। প্রতি সপ্তাহের বরাদ্দ হিসেবে সাতটি অতিরিক্ত ডিম সপ্তাহের শুরুতে পিসি থেকে কিনে ডিভিশনের মেটের কাছে পাঠিয়ে দিই। আজও যথারীতি ডিম কেনার জন্য সালাহউদ্দিনকে পাঠিয়েছি। সে শুকনো মুখে ফিরে এসে জানালো, আমার কাছে এখন থেকে জেল কর্তৃপক্ষ আর কাঁচা ডিম বিক্রি করবে না। আমি ইচ্ছে করলে প্রতিদিন একটা করে সিদ্ধ ডিম কিনতে পারি। সমস্যা হলো, সিদ্ধ ডিম তো আর ভাজি করা যায় না। ডিমভাজি না খেলে আমার যে একেবারেই চলবে না, তা নয়। কিন্তু উপর্যুপরি দ্বিতীয় দিনের অপমান আর সহ্য হলো না। জেল সুবেদার রুস্তমকে ডেকে পাঠিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, জেলকোডের কোন আইন বলে পিসি থেকে কেবল আমাদের পাঁচ-ছয়জন বন্দির ক্ষেত্রে পছন্দসই জিনিসপত্র কেনার সুযোগ রহিত করা হয়েছে? সব বন্দির জন্য এক আইন চলবে আর আমাদের জন্য ভিন্ন আইন সরকারের কোন নথিপত্রে লেখা আছে? সুবেদার বিব্রত হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি তাকে জেলারকে ডেকে আনতে বললাম এবং সঙ্গে করে পিসির নতুন নিয়মের বিষয়ে ওপরের লিখিত নির্দেশনামাও নিয়ে আসতে বললাম। ঘণ্টাখানেক পর রুস্তম ফিরে এসে জানালো, ভুল বোঝাবুঝির কারণেই ডিম নিয়ে এ সমস্যা বেধেছে। আমার ক্ষেত্রে অন্তত কোনো বাধানিষেধ নেই। বুঝলাম, অদৃশ্য ওপরআলা এই মুহূর্তে সামান্য ডিম নিয়ে সরাসরি বিবাদে জড়াতে চাচ্ছে না। তবে এই যুদ্ধবিরতি যে নিতান্তই সাময়িক, তাও বুঝলাম। আর এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টে আদালত অবমাননা মামলার বিচার শুরু হচ্ছে। কৌশলগত কারণে সেখানেই সরকার এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সেই মামলার নিষ্পত্তির ওপরই আমার বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।
আগস্টের ৭ তারিখ প্রাতে সূর্য ওঠা বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের জন্যে না হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হলো। ওইদিন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি পাঁচ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফরে ঢাকা বেড়িয়ে গেলেন। তিনি ঢাকা এসেছিলেন দৃশ্যত বাংলাদেশ এবং ভারতের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি সম্পাদন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সেই অনুষ্ঠানের শোভা বাড়াতে। এছাড়া অন্তরালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলাপ-আলোচনা হয়ে থাকলে তার হদিস সাধারণ জনগণের পাওয়ার উপায় নেই। বাংলাদেশ এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে ট্রানজিটের নামে ভারতের করিডোরের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ভার মেটাতে। ঋণের টাকা সুদসহ বাংলাদেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে। বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ সংরক্ষণের মহত্ উদ্দেশ্যে এদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাঁধে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা চাপালেন আমাদের দিনবদলের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশকে আরও কঠিনভাবে ভারতের নিগড়ে আটকানোর কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করে সেদেশের অর্থমন্ত্রী বীরবেশে নিজদেশে ফিরে গেছেন। জেলে বসে ধারণা করছি, বিনিময়ে আওয়ামী লীগেরও ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী (পড়ুন ২০২১ পর্যন্ত) হওয়ার আশ্বাস মিলেছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নকারী এই ডিলের মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে লাভবান হয়েছে এবং দলগতভাবে আওয়ামী লীগ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে দলটির ব্যবসায়ীগোষ্ঠী লাভের কড়ি গুনবেন। লোকসান যা কিছু হবে, সেটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির এবং সেই রাষ্ট্রের ১৬ কোটি নির্বিকার জনগোষ্ঠীর। দুর্ভাগ্যের কথা হলো, মার্কিন ও ভারতপন্থী মিডিয়া এবং সুশীল(?)রা মিলিতভাবে আমাদের এমনই মগজ ধোলাই করেছে যে, দেশের এত বড় ক্ষতি সত্ত্বেও কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ভারতের করিডোরকে জায়েজ করার জন্যে কী চমত্কারভাবেই না ক্ষমতাসীন মহল থেকে ভুটান এবং নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। আওয়ামী এবং সুশীল (?) বুদ্ধিজীবীরা এদেশের জনগণকে মূর্খ ভাবতে খুব পছন্দ করেন। নইলে এমনভাবে ভুটান, নেপালের ধাপ্পা তাদের দিতে পারতেন না। আমাদের এই দুই প্রতিবেশীর মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ যথাক্রমে ১.০ এবং ৬.০ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্যের শতকরা সত্তর ভাগের ওপর আবার ভারতের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যেটা স্থলবন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। ভুটান এবং নেপাল যদি তাদের অবশিষ্ট ৩০ ভাগ পণ্যের পুরোটাই বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি করে, তাহলে তার পরিমাণ দাঁড়াবে মাত্র ২.০ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। সুতরাং বাস্তবতা হলো, ভুটান এবং নেপাল তাদের ২ বিলিয়ন ডলার পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম অথবা চালনা বন্দর ব্যবহার করলে আমরা যে সামান্য ফি আয় করবো, তা দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তেমন কোনো লাভক্ষতি হবে না। মূলত ভারতকে করিডোর দেয়ার বিষয়টি হালাল করার জন্যেই নেপাল, ভুটানের মুলা বাংলাদেশের জনগণের নাকের সামনে ঝোলানো হয়েছে।
কাকতালীয়ভাবে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের দিনেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে মহাজোট সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। প্রশংসার বিষয়বস্তু অবশ্য সেই অতিপরিচিত ইসলামী জঙ্গি ইস্যু। মার্কিনিরা বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ইসলামী জঙ্গি এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কঠোরহস্তে দমন করে প্রশংসনীয় কাজ করেছে এবং এ কারণে মার্কিন সমর্থন অব্যাহত থাকবে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে ভারতের আসাম রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী উলফার উল্লেখ সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কৌশলগত মৈত্রীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে নিয়মিত বিরতিতে র্যাব ও পুলিশ তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাসীদের বায়বীয় সব নাশকতার পরিকল্পনা ফাঁসের যে ঢাকঢোল পেটানো নাটক মঞ্চায়ন করে চলেছে, তার সুফল পাচ্ছে মহাজোট সরকার। এসব আষাঢ়ে গল্প ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে যে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তার প্রমাণ স্টেট ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ প্রতিবেদন। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস সম্প্রতি যে দু-একটি মন্তব্য করছিল, তার গুরুত্বও স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই প্রতিবেদনের ফলে যথেষ্ট হ্রাস পাবে বলেই আমার ধারণা। কয়েক মাস আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার এক বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন, এখন থেকে গণতন্ত্র এবং সন্ত্রাস দমনই হবে মার্কিন-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। আমি অন্তত অবাক হবো না, যদি অদূর ভবিষ্যতে গণতন্ত্র পরিত্যক্ত হয়ে একমাত্র ইসলামী সন্ত্রাস দমনই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে স্বাধীনতার চেতনায় অনুপ্রাণিত জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প খোলা থাকছে না।
মাগরিবের নামাজ শেষ হতেই জেলখানার দক্ষিণের একেবারে লাগোয়া মসজিদ থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরুর ঘোষণা এলো। জীবনের পড়ন্ত বেলায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে ফ্যাসিবাদী সরকারের সব নির্যাতন, অসম্মান কেবল নৈতিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, আল্লাহর রহমতে কারাগারের বৈরী পরিবেশে রোজা রাখাটাও ধাতে সয়ে যাবে। আজ সন্ধ্যায় বাড়ির জন্যে আবার মনটা খারাপ লাগছে। এই দীর্ঘ জীবনে পরিবারের আপনজনদের সময় দিইনি বললেই চলে। সকাল আটটার মধ্যে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে ঘর ছেড়ে ফিরে এসেছি রাত দশটা পার করে। শুক্রবারেও নিয়মিত অফিসে গেছি। একমাত্র প্রতি রমজানে মা এবং স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত ইফতার করার চেষ্টা করেছি। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছর এদেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রায় প্রতিদিন ইফতারের দাওয়াত পেলেও সচরাচর সেসব দাওয়াত এড়িয়ে চলেছি। নিজগৃহে আপনজনদের নিয়ে ইফতার টেবিলে আজানের জন্যে অপেক্ষা আমার কাছে পরম তৃপ্তির একটা ব্যাপার ছিল। বাজার করার অভ্যাস কোনোকালেই ছিল না। বিয়ের আগে মা এবং পরে স্ত্রী বিনা প্রতিবাদে এই দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। অথচ রোজার মাসে প্রতি সন্ধ্যায় ইফতার কিনতে বড় ভালো লাগত। জীবনের ওই সোনালি মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আজকের চাঁদরাতে অসহনীয় বোধ হচ্ছে। ফেলে আসা জীবনের সুঃখ-দুঃখের স্মৃতি মানুষকে সমভাবে কাঁদায়। এত বছর রোজা রেখেছি সেহরিতে তেমন কিছু না খেয়েই। জেলে আর সেই সাহস করলাম না। এমনিতেই শরীরের ওজন বেশ দ্রুতগতিতে কমছে। সেহরিবিহীন রোজার পরিণতিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে সরকারের শীর্ষ মহলের আনন্দ আর বৃদ্ধি করতে চাচ্ছি না। শেষরাতে সময়মত ঘুম ভাঙবে কি-না সে নিয়ে একটা সংশয় ছিল। কিন্তু রোজার প্রথম রাতেই বুঝলাম এই দুশ্চিন্তা অর্থহীন। রাত একটায় সাত নম্বর সেলে সেহরি আসা শুরু হলো। খাবার সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েদিদের উচ্চকণ্ঠে ভাত ভাত চিত্কারে ঘুমায় সাধ্য কার! তারপর একে একে ডাল ও সবজির হাঁকও শুনলাম। বন্দিরা গারদের দুই শিকের ফাঁক গলিয়ে প্লাস্টিকের বাক্স পাঠাচ্ছে আর খাদ্য সরবরাহকারীরা বাক্সগুলো ভরে একই পথে সেলের ভেতরে চালান করে দিচ্ছে। সাধারণ কয়েদিদের বেলায় সেহরি নেয়ার জন্য সেলের দরজা খোলার বিধান না থাকলেও আমার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তার ব্যতিক্রম করলো। রাত দুটোয় জমাদার, কারারক্ষী এবং মেট আলমগীর ডিভিশন চৌকা থেকে হটপটে আমার সেহরি নিয়ে এলে সেলের দরজা খুলেই সেই টিফিন ক্যারিয়ার ঢোকানো হলো। আজকের মেনু ভাত, ডাল, সবজি এবং মাছ ভাজা। প্রথম সেহরিতে খাওয়ার জন্যে রাতের মেনু থেকে গরুর গোশত বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। সাত নম্বর সেলের বিবেচনায় রীতিমত রাজসিক সেহরি শেষ করে একবারে ফজরের নামাজ পড়লাম। জেলজীবনের প্রথম রোজা শুরু হলো।

সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে এত নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বোধহয় লাদেনের জন্যও করা হতো না

জেলজীবনে দাড়ি কামাতে আমার বড় আলস্য বোধ হচ্ছে। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে গালে চুলকানি শুরু না হওয়া পর্যন্ত দাড়ি কাটার ঝামেলায় যেতে চাই না। অপ্রশস্ত সেলে দাড়ি কামানোটাও এক ঝকমারি। বিছানার এক কোণে আয়না দাঁড় করিয়ে রেখে মাটিতে বসে রেজর চালাতে হয়। আজ ফজরের নামাজ পড়েই অপছন্দের কাজটিতে লাগতে হলো। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আমার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলার শুনানি হবে সকাল ন’টায়। প্রধান বিচারপতির এজলাসে মামলা, একটু সেজেগুজে তো যেতেই হয়! ক্ষৌরকর্ম শেষ করে বালতি হাতে চৌবাচ্চার ধারে যখন গেছি, তখন ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। সাত নম্বর সেলে সবাই ঘুমে অচেতন, আর আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি অন্যরকম সংগ্রামের। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার হাল নিয়ে এই লড়াইকে আমি মোটেও ব্যক্তিগত বিবেচনা করছি না। বর্তমান সরকার আদালতকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে মজলুমদের প্রতি যে অত্যাচার চালাচ্ছে, আমি তারই প্রতিবাদ করেছি। ফ্যাসিবাদের জোয়াল ১৬ কোটি জনগণের কাঁধে ক্রমেই শক্ত হয়ে চেপে বসছে, কারণ কোথাও শক্ত প্রতিবাদ নেই।

আমাদের সংবিধানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসঙ্গতি থাকলেও সেখানে বার বার ব্যক্তিস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এবং মানবসত্তার মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সংবিধানের সেই মহান আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করে একটি নির্যাতনকারী পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছে। সুশীল (?) সমাজের চেনা মুখগুলো সম্ভবত তাদের মার্কিন ও ভারতীয় নিয়োগকর্তাদের নির্দেশক্রমে রাষ্ট্রের এসব অসঙ্গতি দেখেও দেখছে না। তারা মূক ও বধিরের ভূমিকা পালন করছে। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম সরকার তোষণের সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করে নগদ লাভের হিসাব কষতে ব্যস্ত। সরকারের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ‘স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী’ প্রবণতাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিরোধ করার জন্য প্রকৃত দলনিরপেক্ষ, স্বাধীন ও পক্ষপাতশূন্য বিচার বিভাগের প্রয়োজন ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেখানকার অবস্থায় আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। ইনসাফ প্রাপ্তির সব ক’টা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে দেশ শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হয় কি-না, সেটি জানার জন্য আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
বাঙালি মনস্কতার পরাকাষ্ঠার কারণে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি যে তাবত্ ব্যাপারে নাটকীয়তা পছন্দ করেন, সেই তথ্য আমাদের জানা। তার সেই নাটকপ্রীতি বর্তমানে প্রশাসনেও সংক্রমিত হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টে আমাকে শুনানির জন্য হাজির করা নিয়েও জেল প্রশাসন নাটক কম করলো না। শুনেছিলাম, প্রধান বিচারপতি এজলাসে ওঠেন সকাল ন’টায়। তার আগেই বিচারপ্রার্থী, আমার মতো আসামি এবং আইনজীবীদের তার এজলাসে উপস্থিত হওয়াই রীতি। নাজিমউদ্দীন রোড থেকে সুপ্রিমকোর্ট পৌঁছাতে মিনিট পনেরো লাগে। সেল থেকে জেলগেটে যাওয়া, অতঃপর ডেপুটি জেলারের সামনে বসে প্রিজন ভ্যানে ওঠার জন্যে ডাকের অপেক্ষা ইত্যাদি প্রক্রিয়া সমাপ্ত করার প্রয়োজনীয় সময় বিবেচনা করে সকাল আটটা থেকে তৈরি হয়ে বসে থাকলাম সাড়ে ন’টা পর্যন্ত। কারা প্রশাসনের কোনো পাত্তা নেই। ভাবলাম, যে কোনো কারণেই হোক আজ আর আমাকে আদালতে নেয়া হচ্ছে না। পয়লা রোজার দিন বলে সকালে চা-নাস্তার পাট ছিল না। রাত তিনটায় শয্যাত্যাগ করার পর আর ঘুমানো হয়নি। নিদ্রার জন্য প্যান্ট-শার্ট বদলে সবে চৌকিতে গা এলিয়ে দিয়েছি, আর ডেপুটি জেলার হন্ত-দন্ত এসে হাজির। তার সঙ্গে তত্ক্ষণাত্ যেতে হবে। বিরক্ত হয়ে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে জবাবে আমতা আমতা করে যা বললো, তার অর্থ সে-ই ভালো জানে। জেলগেটে আরেক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। প্রিজন ভ্যান অনেক কসরত করে প্রধান ফটকের ভেতরে ঢোকানো হয়েছে। অর্থাত্ জেলের বাইরে অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীরা কোনোক্রমে আমাকে একনজর দেখে ফেলুক, সেটাও প্রশাসন চাচ্ছে না। এতদিন জেলগেটের প্রধান ফটক পার হয়ে বাইরে দাঁড় করানো প্রিজন ভ্যানে হেঁটে উঠতাম। পরে জেনেছি, একমাত্র শেখ মুজিব হত্যা মামলার আসামি এবং জেএমবির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের এই বিশেষ তরিকায় আদালতে আনা-নেয়া করা হতো। দেয়ালের পাশ ঘেঁষে অতিকষ্টে বিশাল ভ্যানে উঠলাম। আমাকে নিয়ে প্রশাসন যে কতখানি আতঙ্কগ্রস্ত, সেটা পুরোপুরি টের পাওয়া তখনও বাকি ছিল।
প্রিজন ভ্যান জেলগেটে থেকে রাস্তায় পড়তেই দেখলাম অন্তত গোটা চারেক পুলিশভর্তি গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যান অ্যাসকর্ট করে আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্যে। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে প্রবেশ করে দেখি, সেখানে জবরদস্ত বন্দোবস্ত। আদালতের মূল দরজা থেকে বিচারপতিদের প্রবেশের নির্দিষ্ট দরজা পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে দশ হাত পর পর পুলিশ অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওসামা বিন লাদেনকে সুপ্রিমকোর্টে নেয়া হলেও বোধহয় এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হতো না। দুই স্তর পুলিশ পাহারার মধ্যে প্রিজন ভ্যান থেকে নামলাম। মিডিয়াকে ফাঁকি দেয়ার জন্য সংবাদকর্মীদের সুপ্রিমকোর্ট ভবনের মূল প্রবেশপথের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে আমাকে পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানো হলো। আয়োজনের এই আতিশয্যে কৌতুক বোধ করে সঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তাকে আমাকে এতটা ভয় পাওয়ার হেতু জিজ্ঞাসা করে কোনো জবাব পেলাম না। সামনে-পেছনে বিস্তৃত পুলিশ কর্ডনের মধ্য দিয়ে দোতলায় প্রধান বিচারপতির এজলাসে পৌঁছালাম। যা ভেবেছিলাম তা-ই, বিচার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তবে আমার মামলার নম্বর তেরো হওয়ায় উপস্থিত বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে নিচু স্বরে গল্পগুজব করার কিছুটা সময় পাওয়া গেল। বাল্যবন্ধু ড. সালাহউদ্দিন (বাবলু) আদালতের মাঝখানের বিরতিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার জন্মদিনে জেলে ওর কাছ থেকে কার্ড পেলেও গ্রেফতারের পর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাত্। পারভীনের কাছ থেকে আগেই শুনেছি, ডিবিতে রিমান্ডের ক’দিন আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাবলু আর ওর বউ বেলী মিন্টো রোডের ফুটপাতে বসে রাত কাটিয়েছে। রাতের পর রাত পাহারায় ওদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী দলের বেশ ক’জন সংসদ সদস্য এবং সাংবাদিক, পেশাজীবীরাও বিপুল সংখ্যায় অংশ নিয়েছিলেন। বাবলু আর বেলীর একমাত্র কন্যা সারাহ্ স্কুলে পড়ে। আমার কন্যাসম বালিকাটি রেস্টুরেন্টে খেতে খুব পছন্দ করে। মুক্তজীবনে আমি, পারভীন, বাবলু, বেলী এবং সারাহ্ মাসে অন্তত একবার বাইরে খেতে যেতাম। বাবলুর কাছ থেকে শুনলাম, সারাহ্ বলেছে আমি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত ও আর কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে না। আদালতের গুরুগম্ভীর পরিবেশের মধ্যেও চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। এমন ভালোবাসার শক্তিতেই তো মাথা উঁচু করে ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে লড়াই অব্যাহত রাখতে পারছি।
শুনানির প্রথম দিনে বাবলু ছাড়াও প্রচুর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, আপনজনেরা আদালত কক্ষে ভিড় জমিয়েছেন। সাংবাদিক নেতারা এবং সংবাদকর্মীরা তো আছেনই। শেষপর্যন্ত দুপুর একটায় আমার মামলার শুনানি শুরু হলো। ততক্ষণে আপিল বিভাগের দিনের নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ। ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে যে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে, সেটি আদালত কক্ষে পড়ে শোনাতেই বাকি সময় সমাপ্ত হলো। প্রধান বিচারপতি শুনানির পরবর্তী তারিখ আগস্টের ১৬ তারিখে নির্ধারণ করলেন। একই রকম কড়া পাহারার মধ্য দিয়ে ফিরতি পথের উদ্দেশে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। তবে এবার সংবাদকর্মীদের ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়নি। আমি দোতলা থেকে নামার আগেই নিচতলায় পেছনের ছোট প্রবেশদ্বারের বাইরে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার বিপুলসংখ্যক ফটোসাংবাদিক গাদাগাদি করে প্রস্তুত। প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় হাসিমুখে, হাত নেড়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানালাম।
শুনানির দ্বিতীয় দিন সরকারপক্ষ সম্পূরক এফিডেভিট দিয়ে আমার লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন আদালতে পেশ করলো, যার শিরোনাম ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’। ওই লেখাটি শেষ করেছিলাম ছোট একটি পুনশ্চ দিয়ে। যেখানে অনেকটা দৈববাণীর মতো করে লিখেছিলাম, ‘লেখার শুরুতেই বলেছিলাম আমার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আদালত অবমাননার একটি মামলা দায়ের হয়েছে। আজই সম্ভবত আপিল বিভাগে সেই মামলার প্রথম শুনানি। পাঠক যখন আমার এই লেখা পড়ছেন, তখন হয়তো আপিল বিভাগে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদন লেখার অপরাধে আদালত অবমাননার দ্বিতীয় মামলা মোকাবিলারও আগাম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সুপথে পরিচালিত করুন।’ একই লেখার অপর একটি অংশে বলেছিলাম, ‘শুধু এটুকু আগাম বলে রাখছি, সত্য কথা প্রকাশের অপরাধে কারাগারে যেতে আমি বরং গৌরবই বোধ করব। কারাগার থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারলে আবার সত্য কথা বলব এবং লিখব, প্রয়োজনে পুনর্বার কারাগারে যাব।’ মন্তব্য প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছিল মে মাসের ১০ তারিখে এবং আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম জুনের ১ তারিখে। আদালতে সম্পূরক এফিডেভিট উপস্থাপনের রীতি অনুযায়ী পুরো লেখাটি ভরা মজলিসে পড়ে শোনানো হলো। বাদীপক্ষের মূল আইনজীবী, অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান লেখাটি থেমে থেমে পড়ছেন আর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মুখের রঙ পাল্টাচ্ছে। তারা বিস্মিত থেকে ক্রমেই ক্রুদ্ধ হচ্ছেন।
আমি বিচারপতিদের প্রতিক্রিয়ায় খানিকটা হতাশ হয়েই ভাবছিলাম, লেখাটি কি তাহলে এর আগে মাননীয় বিচারপতিদের নজরে পড়েনি? তাদের উদ্দেশেই তো আমার এই লেখা। জেনারেল মইন এবং শেখ হাসিনা আমাদের বিচারাঙ্গনের স্বাধীন সত্তার যে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করেছেন, মন্তব্যসহ তারই উল্লেখ রয়েছে লেখাটিতে। হয়তো সুশীল (?) কলামিস্ট ছাড়া অন্য কারও লেখা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিগণ পাঠের উপযুক্ত বিবেচনা করেন না। যা-ই হোক, সম্পূরক এফিডেভিট উপস্থাপন শেষ হলে আদালত এফিডেভিট গ্রহণ করার পরিবর্তে আমার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আদালত অবমাননা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিলেন। আমার গ্রেফতারপূর্ব ভবিষ্যদ্বাণী শতভাগ ফলে গেল দেখে লেখক হিসেবে সন্তোষবোধ করলেও কয়েদ খাটার মেয়াদও যে বাড়তে পারে, তাও অনুধাবন করলাম। মন্তব্য-প্রতিবেদন পাঠ শেষে আবার শুরু হলো মূল মামলা প্রসঙ্গে অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তৃতা। যথারীতি ১টায় সেদিনের কার্যক্রম সমাপ্ত হলো। প্রধান বিচারপতি সরকারপক্ষকে পরবর্তী কার্যদিবসের মধ্যে তাদের শুনানি শেষ করার নির্দেশ দিয়ে সদলবলে উঠে দাঁড়ালেন। আমিও প্রিজন ভ্যানের দিকে হাঁটা দিলাম। ১৭ তারিখে এজলাসে পৌঁছে দেখি, উপস্থিত আইনজীবীদের হাতে হাতে আমার মন্তব্য-প্রতিবেদনের ফটোকপি। অধিকাংশ আইনজীবীই গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার লেখা পড়ছেন। এই দৃশ্য অবলোকনে লেখক হিসেবে আনন্দিত বোধ করলেও আমার প্রতিপক্ষের ক্রোধের আগুনে যে ঘৃতাহুতি পড়ছে, সেটাও বুঝতে পারছি। এদিনও সরকারপক্ষ অবিরাম বলে চললো। অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের মাঝখানে কোনো কোনো বিচারপতি নানা রকম মন্তব্য করে চলেছেন। অধিকাংশ মন্তব্যের মধ্যেই আমার প্রতি অপরিসীম বিতৃষ্ণা ও ক্রোধ প্রকাশ পাচ্ছে। বিচারপতি এস কে সিনহা একাধিকবার সংবিধানের ১০৮ ধারা উল্লেখ করে সরকারপক্ষের মতামত চাইলেন যে, আপিল বিভাগ আদালত অবমাননাকারীকে যথেচ্ছা সাজা দিতে পারেন কি-না। সরকারপক্ষ অতিশয় আনন্দিত চিত্তে মাননীয় বিচারপতির সঙ্গে সবিনয়ে সহমত পোষণ করলো। মঙ্গলবার সমস্ত দিন একটানা বলেও সরকারপক্ষের শুনানি শেষ হলো না। আপিল বিভাগের অন্য সব মামলার কার্যক্রম তিনদিন ধরে থেমে আছে আমার এক মামলার দাপটে। বিষয়টি আমি বেশ উপভোগ করছি দেখে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুটা বিরক্তি সহকারে মন্তব্য করলেন, আমাদের সব মামলা তিনদিন ধরে আটকে আছে আর আপনি মজা পাচ্ছেন। ব্যারিস্টার হোসেন মইনের জামানায় আমার আইনজীবী ছিলেন। দেশের এই বিশিষ্ট আইনজীবী বাল্যকালে আমার মতোই পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় কাটিয়েছেন। জরুরি অবস্থার সময় সন্ধ্যেবেলা তার চেম্বারে বসে চা খেতে খেতে একাধিকবার আমরা সেই পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করেছি। আমি হেসেই তাকে জবাব দিলাম, আপনাদের এই বিরক্তি আমার খুশির মাত্রা আরও বাড়াতে সাহায্য করছে।
শুনানির প্রথম দিন থেকেই বিচারপতি এমএ মতিন, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি এস কে সিনহার আক্রমণাত্মক ভূমিকা লক্ষণীয় ছিল। প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম মাঝে-মধ্যে মন্তব্য করছিলেন। বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান গম্ভীরমুখে কেবল শুনেই গেছেন। চেম্বার জজের ভূমিকা পালনকারী বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন প্রদত্ত রায় সংক্রান্ত সংবাদ নিয়েই যেহেতু মামলার সূত্রপাত, কাজেই তার বিরক্ত চেহারা নিয়ে মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং শ্রবণ ছাড়া গত্যন্তর নেই। আদালতের রীতি-নীতি যতটুকু জানি, সেই ভিত্তিতে এই মামলায় বেঞ্চে তার উপস্থিতি আমি প্রত্যাশা করিনি। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনদিনের শুনানির ধারা থেকে আমি ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছি যে সাজা হচ্ছেই। বিচারপতি এমএ মতিন গত তিনদিনে অন্তত বারছয়েক বলেছেন, সংবাদ সত্য না মিথ্যা এটা বিচার্য বিষয় নয়, সংবাদ প্রকাশ করায় আদালতের কোনো অসম্মান হয়েছে কি-না, সেটাই মূল প্রশ্ন। তিনদিন ধরে শুনানি চলছে অথচ আদালতে বসার জায়গা তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর জায়গা মেলাই মুশকিল। চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি শুনতে সুপ্রিমকোর্টের অধিকাংশ আইনজীবী ছাড়াও অন্য পেশার নাগরিকরা দল বেঁধে এসেছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতিও বোধগম্য কারণেই লক্ষণীয়। এরা সবাই যে আমার প্রতি সহমর্মিতাবশত এসেছেন, তা নয়। বাংলাদেশের মতো বিভক্ত সমাজে সাংবাদিকদের মধ্যকার একটি বড় অংশ যে আমার সাজাপ্রাপ্তিতে আনন্দিত হবেন, এটা সবারই জানা। যদিও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এই মামলার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুর্ভাগ্যবশত রাজনৈতিক বিভেদের কারণে এ ধরনের সুস্থ চিন্তা আমরা বহু আগেই পরিত্যাগ করে বসে আছি। পেশাগত স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেও শত্রুর ক্ষতি এবং হয়রানি দেখার মতো সুখ বাঙালি মুসলমানের অন্য কিছুতে নেই। বুধবার সকাল পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল নিরবচ্ছিন্নভাবে শুনানি করে গেলেন। আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিগণ কেবল যে নিবিষ্ট মনে সরকারপক্ষের সব যুক্তিতর্ক শুনে গেলেন তা-ই নয়, প্রয়োজনমত আইনের বিভিন্ন সূত্র ধরিয়ে দিয়ে তাদের সাধ্যমত সহযোগিতাও করলেন। সকাল দশটার পর অবশেষে আমার আত্মপক্ষ সমর্থনের পালা এলো।

সরকারপক্ষ সময় পেল চারদিন : আমার বক্তব্যের জন্য বরাদ্দ সাকুল্যে ৫০ মিনিট

আমার পক্ষের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড দাঁড়িয়ে কোনো আইনজীবীর পরিবর্তে অভিযুক্ত নিজে বক্তব্য দেবেন—এই কথা বলামাত্র প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে বড়সড় ঝারি খেলেন। আদালতের রীতি অনুযায়ী আইনজীবীর পরিবর্তে অভিযুক্ত তার আত্মপক্ষ সমর্থন করলে এফিডেভিটে তারই স্বাক্ষর করতে হবে, অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সই করলে সেটা বিধিসম্মত হবে না। আমি জেলে বন্দি, কারা প্রশাসন আইনজীবীদের সঙ্গে জেলগেটে আমাকে দেখা করতে দিতে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে চলেছে, এসব কারণে এফিডেভিটে আমার সই নেয়া হয়নি। অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড বিব্রত হয়ে আদালতের কাছে এই ব্যত্যয়ের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে প্রধান বিচারপতি বেশ রাগতভাবেই তার আবেদন মঞ্জুর করলেন। পুরো সময়টা আমি বোকার মতো কাগজপত্র বগলে বেচারা অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কথা বলার অনুমতি পেয়ে স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছি আর ভাবছি, সূচনাতেই আদালতের মনোভাব স্পষ্ট। মাইক স্ট্যান্ডে কাগজপত্র রাখার জায়গায় আমার দলিল-দস্তাবেজ ঠিকমত রাখতেও পারিনি, দ্বিতীয় দফার আক্রমণ এলো, এবারের লক্ষ্য আমি। বিচারপতি এমএ মতিন অনেকটা ধমকের সুরে বললেন, লিখিত এফিডেভিটের বাইরে আমি কোনো কথা বলতে পারব না। এই আঘাতের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। সত্যি কথা বলতে, আমার পক্ষ থেকে যে এফিডেভিট জমা দেয়া হয়েছে তার বক্তব্য আমার মনঃপূত হয়নি। আদালত অবমাননা মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা সাধারণত যে গত্বাঁধা ভাষায় জবাব দিয়ে থাকে, তার সঙ্গে আমার এফিডেভিটের বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। সংবাদ প্রকাশের পেছনে আমার কোনো মন্দ উদ্দেশ্য ছিল না, আমি বরং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সাহায্য করতে চেয়েছি, এভিডেভিটে এ-জাতীয় বক্তব্যই বেশি। এ ধরনের জবাবের সমাপ্তিতে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনাই (unconditional apology) অধিকতর মানানসই হতো। সেটা থাকলে আদালতেরও হয়তো চারদিন ধরে এত উষ্মা প্রকাশের প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু কোনো কোনো আইনজীবীর ভিন্ন পরামর্শ সত্ত্বেও আমার বিবেচনায় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে আমি যেহেতু কোনো অপরাধ করিনি, কাজেই ক্ষমাপ্রার্থনা না করে স্বেচ্ছায় অভিযোগ মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই ক’দিন সরকারপক্ষের বক্তব্য শুনে কারাগারের সেলে বসে আমি যে জবাব তৈরি করেছি, তার সঙ্গে আমার পক্ষে আদালতে জমা দেয়া এফিডেভিটের সামান্যই মিল রয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে শুনানি চলাকালীন জেলে আমার আইনজীবীদের সঙ্গে প্রয়োজনমত দেখা করতে না পারায় নতুন করে এফিডেভিট তৈরি করাও সম্ভব হয়নি। রাতের পর রাত জেগে অনেক কষ্টে হাতে লিখে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা খসড়া তৈরি করে নিয়ে এসেছিলাম। বিচারপতি এমএ মতিনের নির্দেশ আমার কাছে অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই ঠেকলো। প্রধান বিচারপতির কাছে আমার এই কথাগুলো নিবেদনের কোনো সুযোগ পেলাম না। তার আগেই হলুদ রঙের আইনের একটি চটি বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো ৮(১) ধারা উচ্চস্বরে পাঠ করার জন্য। স্কুলের ছাত্রের মতো বুড়ো বয়সে রিডিং পড়ার পরীক্ষা দিতে হলো। পড়ে যা বুঝলাম, তাতে মনে হলো—আত্মপক্ষ সমর্থনে অভিযুক্তের বক্তব্য দেয়ার তেমন কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। অনেকটা হাত বেঁধে মুষ্টিযুদ্ধে নামিয়ে দেয়ার মতো। আসল কথা হলো, তুই ব্যাটা আদালত অবমাননা করেছিস, তোর আবার আত্মপক্ষ সমর্থন কী? পরবর্তী চল্লিশ মিনিট ধরে আমার বক্তব্য দেয়ার প্রাণপণ এবং ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যে এ কথাটিই খানিকটা ভদ্রতাসহকারে এবং আইনি ভাষার মারপ্যাঁচে আমাকে শোনানো হয়েছে। একটি উদাহরণ দিলেই অবস্থাটা পাঠকের কাছে খোলাসা হবে। অনেক উপদেশ শ্রবণের মধ্যে এটাও জানলাম, আদালত অবমাননা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি তার বক্তব্য প্রদানের সময় ‘ডিফেন্স’ (defence) শব্দটাও উচ্চারণ করতে পারবেন না, করলেই নাকি নতুন সুয়ো-মোটো (suo-moto) মামলা দায়ের হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবার বর্ণনা করছি।
অসুস্থ হয়ে পড়ে যাওয়ার আগে সাকুল্যে মিনিট তিরিশেক সময় পেয়েছিলাম। বৈরী পরিস্থিতিতে এক একটি বাক্য শেষ করাই ছোটখাটো পাহাড় অতিক্রমের মতো দুরূহ লাগছিল। বাক্যের মাঝখানেই অনবরত অন্তত তিনজনের কাছ থেকে কথার তীর ছুটে আসছে। একজন ক্ষত তৈরি করছেন, অপরজন সেখানে বাটা মরিচের মলম লাগিয়ে দিচ্ছেন। স্কুলজীবনে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মহাভারতে অভিমন্যু বধের গল্প পড়েছিলাম। তৃতীয় পাণ্ডব এবং কৃষ্ণসখা অর্জুনের ছেলে অভিমন্যু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব সেনাপতিদের ব্যূহের মধ্যে ঢুকে পড়ে আর জীবিত বের হতে পারেনি। সে ব্যূহের ভেতরে ঢোকার কৌশল জানতো কিন্তু ব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে আসার পদ্ধতি জানতো না। আমার আজকের অবস্থা অভিমন্যুর চেয়েও ভয়াবহ। অনেক বাধা পেরিয়ে ড. মিজানুর রহমান এবং ড. শাহদীন মালিকের বিচার বিভাগ সম্পর্কিত সাম্প্রতিক বক্তব্য পড়ে শোনাতে পারলাম। এ বছরেরই আগস্টের ১১ তারিখে ঢাকায় এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তারা দু’জন এদেশে স্বাধীন বিচারের নামে সাধারণ মানুষের প্রতি অবিচারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বর্তমান সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সেখানে বলেছেন, ‘দেশে আইনের শাসন সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। আইনের শাসন বলে কিছু নেই। যেখানে মানুষের বিচার পাওয়ার সুযোগ নেই, সেখানে কিসের বিচার? এখানে গরিব মানুষের জন্য আইন; যারা বড় ক্ষমতাসীন তাদের জন্য আইন নয়। জেল-জুলুম সেটা গরিব মানুষের জন্য। আজ দরিদ্র মানুষের চরম অনাস্থা বিচার বিভাগের প্রতি।’ একই বক্তৃতায় উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ স্বেচ্ছায় পরাধীনতা বেছে নিচ্ছে। কিছু কিছু বিচারক আছেন যারা বিবেককে নাড়া দেন। কিন্তু তারা ক’জন? পুরো বিচারব্যবস্থার মধ্যে কিছু বিচারকের নাম বলতে পারলে তাদের দিয়ে কি ন্যায়বিচার সম্ভব? বিচারকের মানসিকতা দরিদ্র-বান্ধব না হলে সে আইন ও বিচার দিয়ে দরিদ্র মানুষের কল্যাণ হবে না।’ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধান ড. শাহদীন মালিক চেম্বার জজ আদালতের সমালোচনা করে একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে যেভাবে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হচ্ছে, এভাবে স্থগিত হওয়া উচিত নয়। ২০০৩ সাল পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশ স্টে করার প্র্যাকটিস ছিল না। এটা এখন ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। হাইকোর্টে একটি মামলা পাঁচ-সাতদিনেরও বেশি সময় শুনানির পর চেম্বার জজের কাছে তা কয়েক সেকেন্ডের আদেশে স্টে হবে এটা ঠিক নয়। এটা শুধরাতে হবে। বর্তমানে চেম্বার জজের স্থগিত আদেশ বেশি বেড়ে গেছে। এটা কমানো উচিত। হাইকোর্টের আদেশের ওপর আপিল হলে তা স্টে না করে নিয়মিত আপিল শুনানি হওয়া প্রয়োজন।’ আমি উল্লেখ করলাম, ড. শাহদীন মালিকের বক্তব্যের সঙ্গে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’র কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এটুকু, ড. শাহদীন মালিক তার মতামত দিয়েছেন আর আমার দেশ কতগুলো মামলার ঘটনা তুলে ধরেছে। দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যে পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, সেই পত্রিকার কপি আদালতে এভিডেন্স (evidence) হিসেবে জমাও দিলাম।
সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট হিসেবে ড. মিজানুর রহমান এবং ড. শাহদীন মালিকের বক্তব্য আদালতে উপস্থাপন করা মাত্র আগুনে ঘৃতাহুতির মতো প্রতিক্রিয়া হলো। চরম বিরক্তিসহকারে প্রধান বিচারপতি জানতে চাইলেন, এই সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিটের মাধ্যমে আমি কী প্রমাণ করতে চাইছি? মামলার পরিণতি আমি তো বুঝেই গেছি। সাহস সঞ্চয় করে বললাম, বিচার বিভাগ সম্পর্কে দেশের মানুষের মূল্যায়ন বোঝানোর জন্যই আমি এই সম্পূরক এফিডেভিট দাখিল করেছি। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীও কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে বিচার বিভাগকে কাচের ঘরের সঙ্গে তুলনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে কাকতালীয়ভাবে বর্তমান প্রধান বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন। আমি বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বক্তব্য উদ্ধৃত করতে চাইলে তার অনুমতি মিললো না। পরবর্তী পনেরো মিনিট বেঞ্চ থেকে অপমানের চূড়ান্ত করা হলো আমাকে। আমি নিজেকে ‘এই-সেই’ মনে করি, সম্পাদক হওয়ার কী যোগ্যতা আছে আমার, আমি অ্যাপ্রেনটিস সাংবাদিক হওয়ার জন্য কখনও পরীক্ষা দিয়েছি কি-না, আমার তুচ্ছ শিক্ষা-দীক্ষা, আমি এতই অভব্য যে বিচারপতিদের নামের আগে মাননীয় লিখতে হয় তাও জানি না, সাংবাদিকতা না জানা আমি একজন চান্স বা দৈবক্রমে সম্পাদক (chance editor), ইত্যাকার আক্রমণে ধূলিসাত্ করে দেয়া হলো আমাকে। এই ব্রাশফায়ারের মাঝখানে বলার চেষ্টা করলাম যে, আমার এফিডেভিটে নিজের সম্পর্কে ‘এই-সেই’ জাতীয় কোনো শব্দ আমি ব্যবহার করিনি এবং অচেনা শব্দটির অর্থও আমার জানা নেই। বিচারকার্য পরিচালনাকালে দেশের উচ্চতম আদালতের লর্ডশিপ বিচারপতিরা যে এতখানি ক্রোধ ও আক্রোশ প্রকাশ করে থাকেন, সেটি আমার জানা ছিল না। আমি আইনজীবী নই, হয়তো এটাই আদালতের স্বাভাবিক রূপ। অব্যাহত আক্রমণের মধ্যেই আত্মপক্ষ সমর্থন চালিয়ে যাওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মিথ্যা তথ্য দিয়ে চেম্বার জজ আদালতে প্রভাব খাটিয়ে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্টে করার প্রমাণও দিলাম। আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার প্রতিও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার সব চেষ্টাই বিফলে গেল, মাননীয় বিচারপতিরা তাদের অবস্থানে অটল রইলেন। তাদের একই কথা। সংবাদের সত্য-মিথ্যা দেখতে তারা বসেননি। বিচারপতি এমএ মতিন রুলিং দিলেন, আদালত অবমাননা মামলায় সত্য কোনো কৈফিয়ত নয় (truth is no defence)। সংবাদ প্রকাশে আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কি-না, একমাত্র সেটাই তারা বিচার করতে বসেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য প্রদানকালে defence শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করা যাবে না বলা হলে ক্ষীণ কণ্ঠে জানতে চেয়েছিলাম, তাহলে show cause করার আর অর্থ কী, সরকারপক্ষের একতরফা অভিযোগের ভিত্তিতেই তো রায় দেয়া সম্ভব। চার মাননীয় বিচারপতির মিলিত আক্রমণ এবং পাশ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন বেঞ্চের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ও হাসির তোড়ে আমার ক্ষীণ কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল। চারপাশ থেকে আঘাতের পর আঘাত ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতেই হলো। চরম বৈরী পরিবেশে কেবল মনের জোরে টিকে থাকা অসম্ভব বোধ হলো। গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলাম। দীর্ঘ পাঁচদিন রাতে না ঘুমিয়ে থাকা, রোজার উপবাসজনিত দুর্বলতা এবং মানসিক চাপে শরীর ভেঙে পড়তে চাইলো। আমি মাইক স্ট্যান্ড ধরে পতন রোধ করতে চাইলাম। ডানদিকে আমার পক্ষের আইনজীবীদের বেঞ্চের দিকে পড়ে যাওয়ার আগে অনুভব করলাম রক্তচাপ দ্রুত নেমে যাচ্ছে। বেঞ্চের ওপর পড়ে গেলে রাজ্জাক ভাই এবং মওদুদ ভাই বোধহয় আমাকে প্রথম ধরলেন। ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে গেছে, বিচারপতিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে এজলাস ত্যাগ করলেন। মনে হলো, অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের গলা শুনলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করছেন আমার ডায়াবেটিস আছে কি-না। ততক্ষণে ফরহাদ ভাই তার কাঁধের চাদর পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে এসেছেন। বন্ধু বাবলুও দৌড়ে এলো পেছন থেকে। ভিড়ের মধ্যে সাবেক উপমন্ত্রী এবং গুলশানে আমার প্রতিবেশী রুহুল কুদ্দুস দুলুকেও বোধহয় দেখতে পেলাম। ফরহাদ ভাই তার ভেজা চাদর দিয়ে মুখ, মাথা মুছে দিলে খানিকটা সুস্থবোধ করলাম। এর মধ্যে সুপ্রিমকোর্ট বারের ডাক্তার চলে এসেছেন। রক্তচাপ মাপা হলো, আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। উপরেরটা ৯০ এবং নিচেরটা ৬০। ডাক্তার বললেন, এখনই ইন্ট্রাভেনাস স্যালাইন দিতে হবে। রাজ্জাক ভাই হাদিস উল্লেখ করে রোজা ভাঙতে অনুরোধ করলেন। আমি সম্মত না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে রইলাম। আধঘণ্টা বিশ্রামেই শরীরে দাঁড়ানোর মতো জোর পেলাম। মওদুদ ভাই, রফিক ভাই, মোহাম্মদ আলী ভাই, আদিলুর রহমান খান শুভ্র আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরদিন সকাল পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করার পরামর্শ দিলেন। মওদুদ ভাই বললেন, বিচারপতিরা এজলাসে ফিরলেই তিনি দাঁড়িয়ে আমার রক্তচাপের অবস্থা বর্ণনা করবেন এবং সুপ্রিমকোর্ট ডাক্তারের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে সময় প্রার্থনা করবেন। ডাক্তারের সার্টিফিকেট আনানোও হলো।
দুপুর বারোটার খানিক পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি পুনরায় আসন গ্রহণ করলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ উঠে আমার শারীরিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বেশ রূঢ়ভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হলেন। বেঞ্চ থেকে নির্দেশ এলো, যা কিছু কথা আমাকেই বলতে হবে। এই অমানবিকতায় বিস্মিত হলেও সোজা হয়েই দাঁড়ালাম এবং মাইক স্ট্যান্ডে মওদুদ ভাইয়ের জায়গা নিলাম। আমার শরীরের অবস্থা জানার কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে প্রধান বিচারপতি বললেন, আমার আর কোনো বক্তব্য শোনার ইচ্ছা তাদের নেই, আমার আত্মপক্ষ সমর্থন সমাপ্ত হয়েছে, পণ্ডশ্রম করে আর কোনো ফায়দা নেই। বাদীপক্ষ চারদিন ধরে বাধাহীনভাবে তাদের যত কথা বলে গেছেন, আর কারাগারে বন্দি আমি মাত্র একটি ঘণ্টাও সময় পাব না। মাথা খুব একটা কাজ করছিল না। তবু ওই অবস্থাতেই প্রতিবাদ করে বসে পড়তে অস্বীকৃতি জানালাম। বললাম, আমার বক্তব্য যেহেতু শেষ হয়নি, কাজেই আমাকে আরও সময় দিতে হবে। আমি অসুস্থ এবং রোজাদার বিবেচনায় কাল সকাল পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করছি; অন্যথায় অসুস্থ শরীরেই বক্তব্য চালিয়ে যাব। তাতে যদি আবারও জ্ঞান হারাতে হয় কোনো সমস্যা নেই। প্রধান বিচারপতি কী মনে করে সময়ের আবেদন মঞ্জুর করলেন। পরদিন সকালে আমার জন্যে মাত্র দশ মিনিট সময় বরাদ্দ হলো। মাননীয় প্রধান বিচারপতি ঘড়ি ধরে ঠিক দশ মিনিট আমার বক্তব্য শুনবেন। এ কথাটাও একাধিকবার বলে দেয়া হলো। আমি আর পাঁচটি মিনিট অতিরিক্ত সময় চাইলে সেই আবেদন অগ্রাহ্য করা হলো। সরকারপক্ষের জন্যে চারদিন আর আমার জন্যে আজকের চল্লিশ এবং আগামীকালের দশ মিলে সাকুল্যে পঞ্চাশ মিনিট। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ করা এবং আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা আমাদের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা রয়েছে। সংবিধান প্রদত্ত সেই অধিকার প্রাপ্তির কী চমত্কার উদাহরণই না আমাকে কেন্দ্র করে এখানে সৃষ্টি হচ্ছে!
এজলাস ছেড়ে প্রিজন ভ্যানের দিকে যাচ্ছি আর ভাবছি, কোর্টে আমার অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর শুনে জায়া ও জননীর হাল কী হবে। বাবলু, ফরহাদ ভাই আর শুভ্রকে আদালত থেকে সরাসরি আমার বাসায় যেতে অনুরোধ করলাম। আমি যে সামলে উঠেছি এবং বড় কোনো বিপদের ভয় নেই, সামনাসামনি এই সংবাদটি তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া খুব জরুরি। শুভানুধ্যায়ীদের উদ্বেগের মধ্যে রেখে কারও সাহায্য ছাড়াই প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। জেলে ফেরার পথে প্রাচীন রোমের কথা বার বার মনে হচ্ছিল। রোমানরা একসময় অনাহারক্লিষ্ট বন্দিদের ক্ষুধার্ত সিংহের পালের সামনে ছেড়ে দিয়ে কলোসিয়ামে বসে মজা দেখতো। দু’হাজার বছর আগের সেই অসহায় বন্দিদের সঙ্গে নিজের বর্তমান অবস্থার কোনো পার্থক্য খুঁজে পেলাম না।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বললেন, বেঁচে গেলেন ফাঁসির দণ্ড দেয়নি

প্রিজন ভ্যান জেলে পৌঁছানোর আগেই আমার আদালতে অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর রেডিও এবং গোয়েন্দা সংস্থা মারফত জেলে পৌঁছে গেছে। অন্যদিনের মতো সরাসরি সাত নম্বর সেলে যেতে দেয়া হলো না। দুই ডাক্তার তাদের জেলগেট সংলগ্ন কক্ষে রক্তচাপ মাপার যন্ত্রপাতি নিয়ে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কোনো বাধায় কাজ হলো না। তারা পরীক্ষা করবেনই। আল্লাহর রহমতে শরীরের অবস্থা ততক্ষণে ভালো হয়েছে। রক্তচাপ এখন ১০০ এবং ৭০। জেল ডাক্তার সহানুভূতির সঙ্গেই রোজা ভাঙার জন্য অনুরোধ করলে আগের মতোই অসম্মতি জানালাম। সেলে ফিরে দেখি, আমার আড়াই মাসের স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে ফেরার অপেক্ষা করছে। বরাবরের মতো দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে ফিরতে দেখে সবাই আশ্বস্ত হলো। বড় সাহেবরা জেলে এসে সামান্য অসুস্থতাতেই হুইল চেয়ারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আমি জীবনের নানারকম চড়াই-উতরাই পার করলেও মানসিকভাবে কখনও মধ্যবিত্তের স্তর অতিক্রম করতে পারিনি। কাজেই পা দুটো সচলই থাকে।
রোজা না ভাঙলেও শরীর বিশ্রাম চাইছিল। ঘণ্টাখানেকের বিড়াল নিদ্রা (cat-nap) দিয়ে উঠে দ্বিতীয়বার গোসল করে কাজে বসে গেলাম। কাল অবধারিত সাজা আসছে জানলেও আমার কোনো দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। আজকের দুর্ব্যবহারের জবাব কাল সকালে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে কেমন করে ফিরিয়ে দেয়া যায়, একমাত্র সেই চিন্তাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। আইনের বইপত্র নেই, কম্পিউটার নেই, ফ্যাক্স মেশিন নেই, থাকার মধ্যে খাতা এবং কলম। সারা রাত না ঘুমিয়ে কাজ করলাম। লিখছি আর কেটে-ছেঁটে ছোট করছি। কিছুতেই দশ মিনিট অতিক্রম করা যাবে না। সেলের মধ্যেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে পায়চারি করছি আর বিড়বিড় করে রিহার্সেল দিচ্ছি। রাতের প্রহরী মাঝে মাঝে এসে সেলের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছে। বক্তব্য শেষ করতে ক্রমেই সময় কম লাগছে। প্রথমে কুড়ি মিনিট, তারপর পনেরো, শেষপর্যন্ত দশ মিনিটে পারলাম। ততক্ষণে অবশ্য সেহরির সময়ও প্রায় শেষ। ভোর পাঁচটায় গোসল করে ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমিয়ে নিলাম। দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বক্তব্য দেয়া এবং ক্রোধান্বিত মাননীয় বিচারপতিদের ভর্ত্সনা সইবার মতো শক্তি অর্জন করতে হবে। আমার কথাগুলো লিখিতভাবে দিতে না পারলেও কোর্টের রেকর্ড তো থাকবে। যে ক’টি সংবাদপত্রেই সেই বক্তব্য ছাপা হোক, তাদের ইন্টারনেট সংস্করণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে এদেশের একজন নাগরিকের ওপর প্রশাসনিক ও বিচারিক নির্যাতনের কাহিনী। তারপর আমার অদৃষ্ট।
সকাল ঠিক সাড়ে ন’টায় বিচারপতি এজলাসে উঠলেন। আমি নিষ্কম্প চিত্তে হাতের কাগজপত্র নিয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আগামী দশ মিনিটের মধ্যে সাব্যস্ত হয়ে যাবে আমি এখান থেকে সসম্মানে জেলে ফিরতে পারব কি-না। মামলার রায় আমার কাছে তখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন, দশ মিনিট অন্তে প্রমাণ হবে যে আদর্শের জন্যে আমার এই অসম এবং কারও কারও মতে নির্বোধ লড়াই, সেই আদর্শের মর্যাদা রাখতে পারলাম কি-না। প্রথমেই সুশীল (?) ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের আগের দিনের একটি কপি আদালতে জমা দিয়ে বললাম, ওই পত্রিকাটিতে চলমান মামলারই সংবাদ ছাপা হয়েছে। সেই সংবাদে প্রধান বিচারপতির নামের উল্লেখ রয়েছে সম্মানসূচক ‘মাননীয়’ ছাড়াই। সংবাদপত্রে লেখার এটাই প্রচলিত রীতি। রাষ্ট্রপতির নামের আগেও কখনোই মহামান্য লেখা হয় না। কাজেই আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে চেম্বার জজের নাম উল্লেখকালে সেখানে মাননীয় না লেখায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। এটাও বললাম, এই মাননীয় না লেখার কারণে আমার সঙ্গে আগেরদিন আদালতে যে চরম অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি প্রত্যাশিত ছিল না। আমার বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধান বিচারপতি বিষয়টি গতকালের তাই পুরনো, মন্তব্য করে আমাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। আজ আমি কোনো আক্রমণেই পিছু হটতে প্রস্তুত নই। এরপর চেম্বার জজ আদালত প্রসঙ্গে আমার নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিলাম। তেজগাঁও থানার দায়ের করা পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার মামলায় হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত জামিন চেম্বার জজ আদালতে স্থগিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস কাগজপত্রে এই জালিয়াতি করেছে।
সম্পূর্ণ বিষয়টি বিবৃত করে আদালতকে জানালাম, আমি কেবল বন্দি অবস্থায় পুলিশের হাতেই নির্যাতিত হইনি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিচার বিভাগের নির্যাতনেরও শিকার হয়েছি। এই মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কী প্রমাণ করতে চাচ্ছি, প্রধান বিচারপতির এমন প্রশ্নের জবাবে আমি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতকে বিভ্রান্ত করার কথা বললাম। আমার দেশ পত্রিকার সংবাদে ভিন্ন মামলায় একই প্রকার জালিয়াতির উল্লেখ ছিল। আগেরদিন সাংবাদিকতায় আমার অনভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে আদালতে আমাকে chance editor নামে অভিহিত করে অবজ্ঞা এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে অন্য পেশা থেকে সরাসরি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন এমন তেরো জন সম্পাদকের তালিকা আদালতের হাতে তুলে দিলাম। সেই তালিকার মধ্যে এদেশের সাংবাদিকতা জগতে কিংবদন্তিতুল্য ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা এবং পাকিস্তান অবজার্ভার, যেটা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অবজার্ভার হয়েছিল, তার সম্পাদক আবদুস সালামের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। মরহুম আবদুস সালামকে সরকারের সমালোচনামূলক সম্পাদকীয় লেখার অপরাধে শেখ মুজিবের আমলে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছিল—উল্লেখ করতেই মাননীয় বিচারপতিদের গাম্ভীর্য বেড়ে যাওয়া লক্ষ্য করলাম। আমার অবশ্য তখন আর নতুন করে হারানোর কিছু নেই।
সরকারপক্ষের দীর্ঘ বক্তব্য প্রদানকালে বিচারপতি এস কে সিনহা এবং বিচারপতি এম এ মতিনকে আমার এফিডেভিটের একটি লাইন নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করতে শুনেছিলাম। বিচারপতি এম এ মতিন তো ওই বাক্যটি লেখার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে আরও একটি আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা যায়—এ জাতীয় মন্তব্যও করেছেন। বাংলাদেশে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে যে নানারকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, সেটাই বলা হয়েছিল উদ্ধৃত বাক্যটিতে। “That the contemnor-respondent no. 1 appreciates that the courts of Bangladesh operate in a difficult environment in so far as the independence of judiciary is concerned.” বাংলাদেশের কোনো বিবেকবান নাগরিকেরই এই বাক্যের সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ না থাকলেও আমার ওপর রুষ্ট মাননীয় বিচারপতিরা এখানেও দোষ খুঁজে পেয়েছেন। আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে বললাম, ‘মাননীয় বিচারপতিরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাক্যটির অর্থ জানতে চেয়েছেন। অর্থ অত্যন্ত সহজ। এই দেশে মন্ত্রীর নেতৃত্বে হাইকোর্টে লাঠিমিছিল হয়েছে, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তিবাসীদের ডেকে এনে বসানো হয়েছে, প্রধান বিচারপতির এজলাসসহ আদালতে ভাংচুর চালানো হয়েছে, জেনারেল মইনের প্রচ্ছন্ন সামরিক জামানায় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আদালতে বসে প্রকাশ্যে বিচার প্রভাবান্বিত করেছেন, সেই সময় সাফাই সাক্ষীদের ভয় দেখানোর জন্যে বিশেষ আদালতের গোপন কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে, কর্তব্যকাজে অবহেলার জন্য হাইকোর্ট সুয়ো-মোটো রায়ে যে ব্যক্তিকে একটি মামলায় পিপি’র দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন, তিনিই আজ বাংলাদেশের আইন প্রতিমন্ত্রী। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে সমস্যার কথা বলতে এই ঘটনাগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।”
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি নেতিবাচক মন্তব্য করলেও কেবল আমাকেই সাজা দেয়ার উত্সাহ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, সেটাও উল্লেখ করলাম। সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” আমার পরবর্তী যুক্তি ছিল, সরকারপক্ষ চারদিন ধরে বক্তব্য দিলেও আমার জবাবের জন্য আজ মাত্র দশ মিনিট সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এটা সংবিধানের ১০৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। ওই অনুচ্ছেদে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ওপর সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের (complete justice) মহান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষ তাদের বক্তব্যে অভিযোগ করেছিল, আমার দেশ-এ প্রকাশিত সংবাদে চেম্বার জজ আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে আমরা আদালত অবমাননা করেছি। এই অভিযোগের জবাবে আমি রিপোর্টের উদ্ধৃত অংশটি আদালতে পড়ে শোনালাম, “উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের রুলস্ অনুযায়ী কোনো মামলা আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে প্রথমে চেম্বার জজ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। হাইকোর্টের আদেশ বা নির্দেশনার বিরুদ্ধে প্রথমে চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করা হয়। চেম্বার জজ সেই আবেদনের ব্যাপারে যে কোনোরকম আদেশ দেয়ার এখতিয়ার রাখেন। এছাড়া আপিল বিভাগের কোনো মামলা শুনানির তালিকাভুক্ত করতে বা শুনানির জন্য দিন ধার্য করতে প্রথমে চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করতে হয়।” এতটা পরিষ্কারভাবে চেম্বার জজ আদালতের এখতিয়ারের বিষয়ে লেখার পর বাদীপক্ষের অভিযোগের যে আর কোনো ভিত্তি থাকে না, সেটাও উল্লেখ করলাম। মাননীয় বিচারপতিদের ক্রোধ, অসহিষ্ণুতা, বিরক্তি, আক্রোশ সবই টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি একেবারেই বেপরোয়া।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বেঁধে দেয়া দশ মিনিটের মাত্র তিন মিনিট বাকি রয়েছে। ঝড়ের বেগে শেষ কথাগুলো বললাম। “Watch dog এবং Custodian of truth হিসেবে সংবাদপত্রের দায়িত্ব আদালতসহ রাষ্ট্রের সব অংশ সম্পর্কে জনস্বার্থে সত্য সংবাদ প্রকাশ করা। ‘চেম্বার মানে সরকারপক্ষে স্টে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করার মাধ্যমে আমার দেশ সেই দায়িত্ব বস্তুনিষ্ঠভাবে পালন করেছে। আমি সম্পাদকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই এই সংবাদ প্রকাশের অনুমতি দিয়েছি। আমার বিবেচনায় আমি আদালত অবমাননা করি নাই। বরং মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতকে বিব্রত করে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসই আদালত অবমাননা করেছে।” শেষ এক মিনিটের বক্তব্য ইংরেজিতে দিলাম। বললাম, “My academic background in BUET, IBA and Japan, my govt. position as BOI Chairman and Energy Advisor and my pioneering role in Bangladesh in manufacturing and export of Bone China were dismissed as ‘এই সেই’ in this court yesterday. During my 34 years of ‘এই সেই’ career, two years of role of Chance Editor was most gratifying and rewarding. Under my editorship, Amar Desh stood resolutely and valiantly in favor of human rights, liberty, national interest and rule of law. I am proud of my colleagues. I salute them. They are now in problem. But, this is the price one has to pay for persuing the path of truth. I know truth is no defence here. However, truth is becoming a defence in other places as has been seen in the case of most recent Delhi High Court judgment. Most importantly, truth is the only defence in the ultimate court.
With this I conclude my submission.”
আমাকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়ার জন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়ে মওদুদ ভাই এবং রাজ্জাক ভাইয়ের পাশে বসে পড়লাম। মওদুদ ভাই আমাকে অভিনন্দন জানালেন। অ্যাটর্নি জেনারেলকে তার সমাপনী বক্তব্য দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। তার অফিসের যাবতীয় দুষ্কর্মের প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি আমাকে ‘হিরোইজম’ রোগে আক্রান্ত বলে আবার দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর সাজার দাবি জানালেন। এগারোটার আগেই আদালত মুলতবি হয়ে গেল। এজলাস ত্যাগের আগে প্রধান বিচারপতি ঘোষণা করলেন, সাড়ে এগারোটায় রায় জানানো হবে। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রধান বিচারপতির এজলাসে তিলধারণের ঠাঁই নেই। আমি জানি না সুপ্রিমকোর্টের ইতিহাসে কোনো রায় শোনার জন্য এত মানুষের সমাগম হয়েছে কি-না। অপেক্ষা করে আছি, রায় আর আসে না। সাজা যে হবে, সে তো জানা কথাই। কিন্তু সেটা কতখানি নজিরবিহীন করা যায়, এই বিষয়েই সম্ভবত মাননীয় বিচারপতিরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। শেষপর্যন্ত দুপুর সাড়ে বারোটায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ পুনরায় আসন গ্রহণ করলেন। প্রধান বিচারপতি সংক্ষিপ্ত আদেশের মাধ্যমে রায় ঘোষণা করলেন। প্রথমেই উল্লেখ করলেন, রায় বিভক্ত হয়েছে। ছয়জন বিচারপতির মধ্যে একজন সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। এরপর প্রধান বিচারপতি সাজা শোনালেন। এক নম্বর আসামি অর্থাত্ আমার ছয় মাসের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের জেল। প্রতিবেদক এবং সিনিয়র সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানের এক মাসের কারাদণ্ড, দশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক সপ্তাহের অতিরিক্ত কারাদণ্ড। প্রকাশক হাসমত আলীর দশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক সপ্তাহের কারাবাস। চিফ রিপোর্টার সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং নিউজ এডিটর মুজতাহিদ ফারুকীর অপরাধ মার্জনা করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস ছাড়া উপস্থিত অন্যান্য আইনজীবী স্তম্ভিত হলেন। আদালত অবমাননা মামলায় এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান আমাদের দেশের আইনে নেই। সুপ্রিমকোর্ট তাদের inherent right প্রয়োগ করে আমাকে নজিরবিহীন এক লাখ টাকার সাজা দিয়েছেন। শুনানিকালে বিচারপতি এস কে সিনহা কেন বার বার সংবিধানের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করছিলেন, সেটা খানিকটা স্পষ্ট হলো। আমি এবং অলিউল্লাহ নোমান সেখানেই জরিমানা না দিয়ে অতিরিক্ত জেলবাসের সিদ্ধান্ত নিলাম। অলিউল্লাহ নোমানের মতো পেশার প্রতি আদর্শবান তরুণরাই এদেশে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে। রফিক ভাই ভেতরের হতাশা প্রকাশ না করে হাসিমুখেই আমাকে বললেন, বেঁচে গেছেন যে ফাঁসির দণ্ড দেয়নি। বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেছেন, তাই আবেগ প্রকাশে কোনো বাধা নেই। আইনজীবী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে শেষবারের মতো কোলাকুলি করে অসংখ্য পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে প্রধান বিচারপতির আদালত ত্যাগ করলাম। হাজতি মাহমুদুর রহমানের আজ কয়েদিতে প্রমোশন হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসন জুন মাসের দুই তারিখে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার মামলায় আমাকে হাজতি হিসেবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছিল। উনিশে আগস্ট আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি আদালত অবমাননা মামলায় আমাকে দণ্ড দিয়ে কয়েদি হিসেবে সেই নাজিমউদ্দীন রোডেই ফেরত পাঠালেন। কেবল সাজা দেয়ার ক্ষেত্রেই নয়, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও সুপ্রিমকোর্ট সম্ভবত নতুন নজির সৃষ্টি করলেন। জুন মাসের ২ তারিখে অর্থাত্ আমার গ্রেফতারের পরদিন রুল ইস্যু করে আগস্টের ১৯ তারিখে পাঁচদিন টানা শুনানি শেষে রায়, মাত্র ২ মাস ১৭ দিনের মধ্যেই মামলার তাবত্ কার্যক্রম সমাপ্ত। এমন কর্মতত্পরতা প্রদর্শনের পর কোন দুর্মুখ আর বলবে বাংলাদেশে বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব হয়? দীর্ঘদিন জেলবাসের মানসিক পূর্বপ্রস্তুতি সত্ত্বেও মিশ্র অনুভূতি নিয়ে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম।

জীবনসায়াহ্নে এসে না হয় নির্বোধের মতো আদালতকথিত বিদ্রোহের পথপ্রদর্শকই হলাম

কয়েদিতে পদোন্নতি নিয়ে জেলে ফিরলাম। সকালে আদালতে যাওয়ার আগেই সাত নম্বর সেলের সতীর্থদের বলে গিয়েছিলাম, সর্বোচ্চ সাজা আনতে যাচ্ছি। তবে তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল, ছয় মাস কারাদণ্ড এবং দুই হাজার টাকা জরিমানা হবে। সুপ্রিমকোর্ট তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘inherent right’ প্রয়োগ করে জরিমানাটা দুই হাজারের পরিবর্তে এক লাখ টাকা করতে পারেন এবং অনাদায়ে এক মাস হাজতবাস বাড়িয়ে দিতে পারেন, এটা চিন্তার মধ্যে ছিল না। ফয়সাল আইন ভালোই বোঝে। আদালত অবমাননার অপরাধে সর্বোচ্চ ছয় মাস জেল খাটার বিধানকে অতিক্রম করে আমার সাত মাসের কারাদণ্ড ফয়সালও মানতে পারছিল না। আমার প্রতিবেশী এই মার্কিন নাগরিকটি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি তেমন একটা শ্রদ্ধা পোষণ করে না। আজকের নজিরবিহীন রায় মহাজোট আমলে বাংলাদেশ স্টাইল আইনের শাসনের প্রতি তার বিরাগ যথেষ্টই বৃদ্ধি করল। আগেই বলেছি, এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট থেকে ফিরতি পথে প্রিজন ভ্যানে উঠেছিলাম। কিন্তু জেলগেট থেকে সাত নম্বর সেলে আসা পর্যন্ত এক বিচিত্র কারণে মনের মেঘ উড়ে গিয়ে ভেতরটা ঝলমলে হয়ে উঠল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের জেলজীবনের স্মৃতি রক্ষার্থে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে যে মিউজিয়ামটি নির্মিত হয়েছে, তার পাশ দিয়েই সাত নম্বর সেলে যাতায়াতের পথ। মিউজিয়াম চত্বরে শেখ মুজিবের একটি আবক্ষ ধাতব মূর্তি রয়েছে। আজ সেলে আসার পথে হঠাত্ মূর্তিটির দিকে চোখ পড়ল। জেল প্রশাসন কাপড় জড়িয়ে মূর্তিটি ঢেকে রেখেছে। কোনো বেয়াদব পাখি কোনোরকম কুকর্ম করে যাতে মূর্তির পবিত্রতা নষ্ট করতে না পারে, সেই সদিচ্ছা থেকেই সম্ভবত জেল প্রশাসন এই কর্মটি করেছে। কিন্তু সুপার-জেলার সমস্যা বাঁধিয়েছেন কাপড় নির্বাচন নিয়ে। জেলের ভাণ্ডারে ভালো কোনো কাপড় না পেয়ে মূর্তি ঢাকার জন্য কয়েদিদের পোশাক ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে ভাবলাম, ভুল দেখছি। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকটা সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখে নিশ্চিত হলাম, আমার দৃষ্টিশক্তি ঠিকই আছে। আপিল বিভাগ আমাকে আজ থেকে কয়েদি বানিয়ে দিলেও দুই কারণে জেল প্রশাসন ইচ্ছে করলেও আমাকে কয়েদির নির্ধারিত পোশাক পরাতে পারছে না। প্রথম কারণ সিভিল মামলায় আমার সাজা হয়েছে, এ ধরনের মামলার কয়েদিদের জেলের পোশাক পরা বাধ্যতামূলক নয়। দ্বিতীয়ত, আমি সাত নম্বর সেলে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে থাকলেও প্রশাসনের খাতাপত্রে আমার মর্যাদা প্রথম শ্রেণীপ্রাপ্ত ডিভিশন কয়েদির। জেল কোড অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর কয়েদিরা ব্যক্তিগত পোশাক পরিধান করবেন। অতএব কয়েদির ডোরাকাটা পোশাক পরতে হচ্ছে না। দেশবাসী এতদিনে জেনে গেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই আমাকে বিনা অপরাধে জেলে আনা হয়েছে, আমার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অর্ধশত মামলাও দায়ের হয়েছে। আজ আপিল বিভাগ আমাকে সর্বোচ্চেরও অধিক সাজা দেয়ায় তিনি নিশ্চয়ই পরম সন্তোষও লাভ করেছেন। অথচ কাকতালীয়ভাবে আমার সাজাপ্রাপ্তির বিশেষ দিনটিতেই জেল প্রশাসন তার মরহুম পিতার মূর্তিকেই কয়েদির পোশাক পরিয়ে রেখেছে। ‘Divine justice’-এর এই নমুনা দর্শনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার যে হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলে ছিল, সেটিকে সঙ্গে করেই আমার সেলে পা রেখেছিলাম। ফয়সালের কাছ থেকে পাওয়া এক সংবাদে খুশিটা আরও বাড়ল। জেল কোড অনুযায়ী কয়েদির দৈনিক খোরাকি হাজতির চেয়ে কুড়ি টাকা বেশি। আজ থেকে আমার দৈনিক সরকারি বরাদ্দ নাকি ১০৬ টাকা হবে। টাকা বাড়লে হয়তো খাবার-দাবারের মানও আগের চেয়ে উন্নত হবে। মনে মনে ভাবলাম, হাজতির তুলনায় কয়েদি ব্যাপারটা একেবারে মন্দ নয়।
আদালত থেকে ফিরে কাপড় বদলানোরও সময় পেলাম না, ক্যামেরা হাতে প্রশাসনের লোকজন এসে হাজির। নতুন করে কয়েদি মাহমুদুর রহমানের ছবি তুলতে হবে। জেলে আসার পরদিন অর্থাত্ জুনের তিন তারিখে বুকে হাজতির নম্বর সেঁটে হাজতির ছবি তুলতে হয়েছিল। সেই ছবিতে নাকি আর চলবে না। এবার কয়েদির নম্বর বুকে ঝুলিয়ে ছবি তোলাতে হবে। তবে জেল প্রশাসন খানিকটা দয়া দেখালো। প্রথমবার ছবি তোলাতে আমাকেই জেল হাসপাতালের সামনের আঙিনায় ক্যামেরাম্যানের খোঁজে যেতে হয়েছিল। আজ ক্যামেরাম্যান নিজেই সাত নম্বর সেলে হাজির হয়েছে। পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, জেলে ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব কোনো একজন অভিজ্ঞ কয়েদিই পালন করে। ছবি তোলা শেষ হলে অন্য সেল এবং ওয়ার্ড থেকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হলো। সবাই এসেছে আমার সাজাপ্রাপ্তিতে সমবেদনা জানাতে। অধিকাংশের সমবেদনা আন্তরিক হলেও তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ যে আনন্দ অনুভব করছিল না, এমন কথা বলা যাবে না। উঁচু প্রাচীরের বাইরের মুক্ত জগতের মতো জেলের ভেতরেও আওয়ামী-বিএনপি স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে।
উনিশ তারিখে আমার সাজা হওয়ার পরদিন পারভীন দেখা করতে এলো। জুলাইয়ের ২৩ তারিখে প্রথমবার দেখা করতে এসে বড় আশা করে বলেছিল, আগস্টের ভেতরে আমি মুক্তি পেলে আর এখানে আসবে না। গতকালের রায় তার সেই আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। অনির্দিষ্টকালের কয়েদি জীবনের আজ প্রথম দিন। আমার বিষণ্ন স্ত্রী নতুন দুঃসংবাদ শোনালো। সরকার এবার আমাদের অন্নসংস্থানে হাত দিয়েছে। উপরের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর যৌথভাবে এমন হয়রানি করছে যে, পারভীনের পক্ষে আমাদের অন্ন-বস্ত্রের একমাত্র সহায় আর্টিজান সিরামিক আর বেশিদিন চালানোও বোধহয় সম্ভব হবে না। প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারপ্রধান নীতি-নৈতিকতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে একজন সাধারণ নাগরিক এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে ব্যবহার করছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা সীমাহীন। আপনজনদের নিরাপত্তা নিয়ে আমার দুর্ভাবনার কথা জানাতেই পারভীন বলল, জেলের ভেতরে আমি সুস্থ থাকলে সরকারের কোনো অত্যাচার-নির্যাতনকেই সে এবং আমার মা পরোয়া করেন না। আল্লাহতায়ালার অপার করুণায় আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি—একথা বলে স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বিদায় জানালাম। স্বাভাবিকভাবেই মনটা বড় অশান্ত হয়ে পড়ল। আর্টিজান চলবে কি চলবে না, ও নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। ঢাকা শহরে আমাদের তিনজনের একটা আশ্রয় রয়েছে, তিনবেলা আহারেরও কোনো সমস্যা নেই। এর অতিরিক্ত অর্থ-বিত্তের প্রত্যাশা দীর্ঘ পেশাগত জীবনে কখনও করিনি। জেলে বন্দি থাকার ব্যাপারটাও আমার কাছে এর মধ্যে সহনীয় হয়ে গেছে। যে কোনোদিন জেলে আসার ঝুঁকি নিয়েই তো এক/এগারো-পরবর্তী সময়ে তত্কালীন জালিম সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলাম, পরবর্তী সময়ে আমার দেশ পত্রিকার দায়িত্বও গ্রহণ করেছি। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের এই হেনস্তার বেদনা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
আদালত অবমাননার দ্বিতীয় মামলার তারিখ দ্রুত এসে গেল। প্রথম মামলার সাজা ঘোষণা আর দ্বিতীয় মামলার শুনানির মধ্যে মাত্র চারদিনের ব্যবধান। জেল কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে কোনো আইনজীবীকে দেখা করতে দিচ্ছে না। আগের মতো একাই প্রস্তুতি নিচ্ছি। আপিল বিভাগে এই মামলার রায় কী হবে, তা নিয়ে আমার কোনো উদ্বেগ নেই। আপন অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, মাসখানেকের মধ্যেই কারাজীবন একরকম ধাতস্থ হয়ে যায়। নির্মম সাজা অবশ্য ভোগ করে পরিবারের অসহায়, নিরপরাধ সদস্যরা। তাদের সেই কষ্ট দুর্বিষহ। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বাস্তবতায় আমার ভরসার স্থল এখন সৃষ্টিকর্তা এবং দেশের জনগণ। দেশের সেই সাধারণ মানুষের কাছে আমার বক্তব্য পৌঁছানোর জন্যই ‘শো-কজে’র জবাবের খসড়া তৈরিতে মনোনিবেশ করেছি। প্রথম মামলার সময় কয়েক রাত টানা না ঘুমিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। সেই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তন ঘটিয়েছি। ইফতারের পর আর কিছু না খেয়ে এশার নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পড়ি। রাত দুটোয় ডিভিশন সেল থেকে সাহির নিয়ে এলে ঘুম ভাঙে। সাহির খাওয়ার আগে-পরে ভোর ছ’টা পর্যন্ত একটানা কাজ করি। তারপর গোসলের পাট চুকিয়ে সকাল সাতটায় দ্বিতীয় দফার ঘুম। শরীর ও মস্তিষ্কের ক্লান্তির ফলে দেড়-দুই ঘণ্টা ঘুম সহজেই হয়ে যায়। দুই দফায় ঘণ্টা ছয়েক ঘুম এই বয়সে যথেষ্ট। মুক্ত জীবনেও তো এক শুক্রবার ছাড়া ছয় ঘণ্টার অধিক ঘুমানোর সুযোগ হয়নি।
দ্বিতীয় মামলার জবাবের খসড়া লেখার ফাঁকে ফাঁকে সরকার সমর্থক পত্রপত্রিকা পড়ে প্রথম মামলার নজিরবিহীন রায়ের দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছি। জেলে আসার পর থেকে প্রধানত ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারই পড়ছি। আমার মামলা নিয়ে পত্রিকাটির সংবাদ পরিবেশনের ধরনটি আমার প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আদালতে প্রদত্ত আমার কোনো জবাবই তারা ছাপানোর উপযুক্ত বিবেচনা করেননি। অপরদিকে আদালতের তিরস্কার, বিশেষত সংবাদপত্র জগতে অনভিজ্ঞতা নিয়ে লর্ডশিপদের বিদ্রূপাত্মক ও অবমাননাকর মন্তব্য পত্রিকার প্রথম পাতায় বেশ বড় করেই ছাপা হয়েছে। তবে পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয়তে রায়ের সমালোচনা করেছে। এই সম্পাদকীয় লেখার উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন নয়। আমার সাজা হওয়ায় সুশীল (?) মুখপত্রটি শ্রেণীবিদ্বেষের কারণেই অতিশয় আনন্দিত। তবে ভবিষ্যতের অজানা বৈরী পরিস্থিতিতে আদালতের এমন তরবারির আঘাতে আবার তাদের কোনো সমগোত্রীয়ের মাথা যাতে কাটা না যায়, তারই আগাম সতর্কতা হিসেবে সম্পাদকীয়তে এই আদর্শের বাণী প্রচার। তবে একই পত্রিকায় প্রকাশিত সিপিজে’র (Committee to Protect Journalists) বিবৃতি পড়ে উদ্দীপ্ত বোধ করলাম। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি সুপ্রিমকোর্টের রায়ের কঠোর সমালোচনা করে সাজা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। পুরো বিষয়টিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক আখ্যা দিয়ে সংগঠনটির ডেপুটি ডিরেক্টর রবার্ট মেহানি (Robert Mahoney) মন্তব্য করেছেন, সাংবাদিকদের কোনো রকম ভয়ভীতি ছাড়া অবশ্যই বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করার অধিকার আছে। মনে হলো, আমার এই নিগ্রহ, মায়ের চোখের পানি, স্ত্রীর হাহাকার একেবারে বৃথা যায়নি। সমাজের জমাটবাঁধা অন্ধকারের মধ্যে একখানি ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গও যদি জ্বালাতে পেরে থাকি, তাহলেই আমার মতো এক অকিঞ্চিত্কর ব্যক্তির জীবন সার্থক। মামলার শুনানির সময় আমার প্রতি অনেক রকম কটু বাক্য ব্যবহারের মধ্যে স্বয়ং প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পর্কে সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে আমাকে Path finder (পথপ্রদর্শক) খেতাব দিয়েছিলেন। এদেশের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের আদর্শ ও আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে হলেও ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সমঝোতা করাটাকেই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচনা করেন। আমি না হয় জীবনসায়াহ্নে এসে নির্বোধের মতো বিদ্রোহের পথপ্রদর্শকই হলাম। এই হঠকারিতার জন্য সর্বোচ্চেরও অধিক সাজা দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আমাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করতে তো চেয়েছেনই, সেই সঙ্গে অন্য নাগরিকদের মনেও তাদের সম্পর্কে ভীতি উত্পন্ন করতে চেয়েছেন। এই পরিণত বয়সে আমার স্বভাব পরিবর্তনের সমুদয় চেষ্টা বলাই বাহুল্য ব্যর্থ হবে। জালিমের কারাগার থেকে মুক্তি পেলে সত্যের পক্ষে আবারও ইনশাআল্লাহ কলম ধরব। আদালতের রায়ে সাধারণ জনগণ কতখানি ভীতসন্ত্রস্ত হয়, সেটা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।
দেখতে দেখতে ২৪ আগস্ট এসে গেল। আগের মতোই হাস্যকর ধরনের অতিরিক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আমাকে সুপ্রিমকোর্টে নেয়া হলো। সরকারের দৃষ্টিতে বোধহয় এই মুহূর্তে আমার চেয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গি (!) বাংলাদেশে নেই। সম্ভব হলে প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানোরও নির্দেশ দিতেন। আমিও অবশ্য তাকে উত্ত্যক্ত কম করছি না। প্রতিদিন প্রিজন ভ্যান থেকে নামা এবং ওঠার সময় উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে হাসিমুখে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাই, আদালতের বারান্দা দিয়ে এত দ্রুতগতিতে হাঁটি যে সঙ্গের পুলিশ অ্যাসকর্ট সদস্যদের তাল মেলাতে প্রায় দৌড়াতে হয়। আজ আমার প্রতিবাদ আরও দৃষ্টিগ্রাহ্য করার জন্য মার্কিন মুলুকের কালো মানুষের মতো করে মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলিত করলাম। সরকার এবং আদালতের জুলুমের বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদ জনগণকে এর চেয়ে কঠিন ও স্পষ্ট করে বোঝানোর আর কোনো সুযোগ নেই। আদালতে ঢুকেই দেখি বন্ধুবর বাবলু অপেক্ষমাণ। আমার সাজা ঘোষণার দিন বাবলু নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেদিন আদালতে উপস্থিত থাকতে পারেনি। বাবলুর কাছ থেকে পারভীনের মামার মৃত্যুসংবাদ শুনলাম। ভদ্রলোক দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। বয়স সম্ভবত সবে ষাট স্পর্শ করেছিল। শ্বশুরকুলের সঙ্গে আমার বিশেষ সৌহার্দ্য না থাকলেও বিয়ের পর থেকে এই ভদ্রলোকের সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। আমি গ্রেফতার হওয়ার মাসখানেক আগে লাল মামার বসুন্ধরার বাসায় তাকে দেখতেও গিয়েছিলাম। ক্যান্সারের একেবারে শেষপর্যায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় তাকে দেখে বেশ কষ্টও পেয়েছিলাম। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, অন্তিম সময় আসতে আর দেরি নেই। পারভীনের মামার এই মৃত্যু আকস্মিক না হলেও স্ত্রীর আপনজনের মৃত্যুশোকের সময় তার পাশে থেকে সান্ত্বনা দিতে না পারার অক্ষমতা আমাকে যথেষ্ট পীড়া দিচ্ছিল।
প্রধান বিচারপতির এজলাসে বসেই বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি মনে পড়ে গেল। জেনারেল মইনের জরুরি আইনের সময় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তার মা ইন্তেকাল করেছিলেন। সেই শোকের মুহূর্তে বিদেশি প্রভুর নির্দেশে পরিচালিত তত্কালীন সরকার বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের সঙ্গে যে অন্যায়, অমানবিক আচরণ করেছিল তার নিন্দা জানানোর ভাষা সে সময় খুঁজে পাইনি। বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থ বন্দি পুত্র তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমানকে ভিন্ন ভিন্ন থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে শেষবারের মতো আপনজনকে শ্রদ্ধা জানানোর সময়ও কোনোক্রমে মাতা-পুত্রের সাক্ষাত্ না হয়। একজন মা এবং তার দুই সন্তানকে আলাদা সময়ে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুর পর মাত্র দ্বিতীয় বারের জন্য প্রকাশ্যে কান্নারত বেগম খালেদা জিয়ার ছবি টেলিভিশনে দেখেছিলাম। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য প্রায়ই জনগণের সামনে কান্নাকাটি করেন। যাই হোক, বন্দিজীবনে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ শোনার অসহনীয় কষ্টের সঙ্গে তুলনীয় কোনো যন্ত্রণা রিমান্ডে এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। বেগম খালেদা জিয়ার মতোই আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সেলিম ও বিএনপির মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকেও বন্দি অবস্থায় মায়ের মৃত্যু সহ্য করতে হয়েছিল। দল-মত, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে যেসব বন্দিকে এই যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তাদের সবার প্রতি আমার সহমর্মিতা রইল। মনে মনে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পারভীনের মামার জানা-অজানা অপরাধের জন্য মার্জনা ভিক্ষা করে আদালতের কাজে মনোযোগী হলাম।

পশ্চিমা সরকারগুলো বাংলাদেশে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার দুরবস্থায় ক্রমেই বিরক্ত, উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে

অলিউল্লাহ নোমানকে আজও আদালতে উপস্থিত দেখে বিস্মিত হলাম। ভয় পাচ্ছিলাম ওকে না আবার সুপ্রিমকোর্ট চত্বর থেকেই পুলিশ গ্রেফতার করে। আবদালসহ অন্য সাংবাদিকরা জানাল তেমন কোনো আশঙ্কা নেই। আমার দেশ পত্রিকার সব সাংবাদিক এবং তাদের শুভানুধ্যায়ীরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নোমান আগামীকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আত্মসমর্পণ করবে। আমাদের মামলার রায় নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিক্রিয়া সংবলিত সংবাদের কাটিংসমৃদ্ধ একটি ফাইল নোমানই আমার দিকে এগিয়ে দিল। সেখানে দেখলাম ফরাসি দেশের সাংবাদিক সংগঠন রিপোর্টার্স স্যানস ফ্রন্টিয়াসর্্ (Reporters Sans Frontiers) আমার এবং নোমানের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, “The authorities are trying to relieve prison overcrowding by freeing lots of detainees, yet the Supreme Court has passed jail terms on these two journalists. This is absurd. The government and the courts are making a mistake by targeting the opposition media. They are not the enemy.”
(প্রশাসন যে সময় বিপুলসংখ্যক বন্দিকে মুক্তি দিয়ে কারাগারের জনাধিক্য সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছে, সেই সময় সুপ্রিমকোর্ট দু’জন সাংবাদিককে জেলের দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠাচ্ছে। সরকার এবং আদালত বিরুদ্ধ মতকে নিশানা বানিয়ে ভুল করছে। তারা শত্রু নয়।) আমাকে যে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে, বিবৃতিতে তারও উল্লেখ রয়েছে। বন্দিত্বের কারণে আমি পত্রিকা চালাতে পারছি না, এ বিষয়টি উল্লেখ করে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত ফ্রান্সের এই সাংবাদিক সংগঠনটি রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপেরও আহ্বান জানিয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বের সরকারগুলো তাদের স্বার্থে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ সরকারের যতই প্রশংসা করুক না কেন তাদের দেশের বিবেকসম্পন্ন জনগণ বাংলাদেশের মানবাধিকার ও বাক্ স্বাধীনতার দুরবস্থার কথা জানতে পেরে ক্রমেই বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বকে এতই কাছাকাছি নিয়ে এসেছে যে, একবিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। ডিজিটালের ডঙ্কা পেটানো চরম নিবর্তনমূলক ফ্যাসিবাদি সরকারের মূল সমস্যা এখানেই। দেশে দেশে লবিস্ট নিয়োগ করে সরকারকে খানিকটা প্রভাবিত করা গেলেও প্রকৃত অবস্থা জেনে সেসব দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে সেসব সরকারকেও এক সময় জনমতের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে। আমার দেশ-এর উপর রাষ্ট্রযন্ত্র লেলিয়ে দিয়ে মহাজোট সরকার তাদের চরম অগণতান্ত্রিক চেহারাকেই আন্তর্জাতিক মহলে উন্মোচিত করেছে। বিলম্বে হলেও এর প্রতিফল তাদের ভোগ করতে হবে।
সকাল ন’টা বেজে ঠিক কুড়ি মিনিটে আমার পূর্বপরিচিত ছয় লর্ডশিপ তাদের উচ্চ আসন গ্রহণ করলেন। দিনের কার্য তালিকায় আমার মামলার নম্বর তিন। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডাক পড়ল। সেই পরিচিত মাইক স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, দ্বিতীয় মামলার কনটেম্পট্ পিটিশন এখনও চোখেই দেখিনি এবং আগস্টের উনিশের পর থেকে গত পাঁচদিনে কোনো আইনজীবীকে আমার সঙ্গে দেখাও করতে দেয়া হয়নি। সঙ্গত কারণেই জবাবের প্রস্তুতির জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় দরকার। বিচারপতিরা অ্যাটর্নি জেনারেলের দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকালেন। সেখান থেকে ‘চমত্কার’ জবাব এলো। সরকার পক্ষের যুক্তি হলো, যেহেতু প্রথম মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত রুল ইস্যু করেছে সে কারণে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আসামির কাছে কাগজপত্র পাঠানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। দশ বছর আগের বিচার বিভাগ হলে সরকারি উকিলকে এই অজ্ঞতাপ্রসূত, তাচ্ছিল্যপূর্ণ জবাবের জন্য আদালতের কঠোর ভর্ত্সনা শুনতে হতো। কিন্তু, দিন বদলের সরকারের আমলে আদালতের পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দৃশ্যত: বিব্রত প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম বেঞ্চের নিচে বসে থাকা সুপ্রিমকোর্টের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আমার বক্তব্যের সত্যতা জানতে চাইলেন। সেখানকার নথিতে প্রমাণ মিলল, আমি সত্য কথাই বলেছি। কারাগারে আমার কাছে সমন কিংবা পিটিশন কোনোটাই পৌঁছানো হয়নি। সিস্টেম আমাকে নিয়ে কতটা বিপদগ্রস্ত সেটা বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মন্তব্যে প্রমাণিত হলো। তিনি বার দুয়েক জানতে চাইলেন, সমনই যদি আমার কাছে পৌঁছানো না হয়ে থাকে তাহলে কোন্ আইন বলে রাষ্ট্রপক্ষ আমাকে আজ আদালতে হাজির করেছে। বলাই বাহুল্য অ্যাটর্নি জেনারেল এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলেন না। সরকার পক্ষের আইনজীবীদের দ্বিতীয় সারিতে উপবিষ্ট অ্যাডভোকেট আনিসুল হক আইন অনুযায়ী আমার সময়ের দাবি যথার্থ মন্তব্য করলে অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে ২৪ ঘণ্টার সময় দেয়ার প্রস্তাব করলেন।
এই তামাশায় মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা আর সম্ভব হলো না। বেশ উচ্চকণ্ঠেই বলে উঠলাম, বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল সম্ভবত ভুলে গেছেন আমি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক একজন বন্দি। তার মতো মুক্ত মানুষ নই। একদিনের মধ্যে জবাব তৈরি করার প্রস্তাব অবাস্তব। যে আদালত এতক্ষণ ধরে সরকার পক্ষের আইনজীবীদের যাবতীয় বালখিল্যতা অম্লান বদনে সহ্য করছিলেন, তারাই আমার একটি মাত্র মন্তব্যে ভয়ানক রাগান্বিত হয়ে উঠলেন। উষ্মাসহকারে আমাকে থামতে বলে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করলেন, এসব বিষয় দেখার জন্য তারাই রয়েছেন, আমার কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমিও ভাবলাম, তাই তো, মাত্র পাঁচদিন আগে এই আদালতেই ন্যায়পরায়ণতার অনন্য উদাহরণ দেখার পর আমার মনে ইনসাফ প্রাপ্তি নিয়ে কোনো রকম সংশয় পোষণ করাটাই চরম বেয়াদবি! সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করার মহান দায়িত্ব লর্ডশিপদের ওপর অর্পণ করে আমি নীরব রইলাম। শেষ পর্যন্ত অক্টোবরের ১১ তারিখে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হলো। এছাড়া অবশ্য আদালতের কোনো গত্যন্তর ছিল না। আজ ২৪ তারিখ, পরশু থেকে উচ্চ আদালত এক মাসের শরত্কালীন ছুটিতে যাচ্ছে। তারপর বর্তমান প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন। আমার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এই মামলার বিচারকার্য সমাধা করতে তার যথেষ্ট উত্সাহ উপস্থিত সবার কাছে দৃশ্যমান হলেও তার সময় শেষ হয়েছে। তিনি দ্বিতীয়বার আমার সাজা শোনানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। দু’রাত খেটেখুটে জবাবের একটা খসড়া তৈরি করেছিলাম। সেই খসড়াটি ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের হাতে দিয়ে এজলাস ত্যাগ করলাম।
গতকাল সুপ্রিমকোর্ট থেকে ফিরে ভেবেছিলাম, সেপ্টেম্বর ৬ এর আগে আদালতে আর কোনো হাজিরা নেই। সকাল ন’টায় হাজিরার স্লিপ নিয়ে এক কারারক্ষী এসে হাজির। আজই নাকি সিএমএম আদালতে কোনো এক অজানা মামলার শুনানি রয়েছে। সংবাদ বাহক মামলা সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে। মামলার সংখ্যাও এখন অর্ধশত হতে একটা মাত্র বাকি। এই বয়সে আমার পক্ষেও এত মামলার হিসাব রাখা সম্ভব নয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে কারারক্ষীর সঙ্গে রওয়ানা দিলাম। পৌনে দশটার মধ্যে আমাকে কোর্ট গারদে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। হঠাত্ করে আদালতে আসায় আজ আর সঙ্গে করে বই এবং মেঝেতে বিছানোর জন্য পুরনো খবরের কাগজ আনা হয়নি। এদিকে শরীর বাহ্যত সুস্থ থাকলেও রমজানের অর্ধেক পার হওয়াতে ক্রমেই ক্লান্তি ভর করছে। গারদের ওই নোংরা মেঝেতেই এক সময় সটান শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখও লেগে এসেছিল। সশব্দে গারদের দরজা খোলার আওয়াজে চোখ খুলতেই একজন পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে ডাক পড়ার খবর দিল। তখনও জানি না, কোন মামলার হাজিরাতে যাচ্ছি। আজ আমার পক্ষের কোনো আইনজীবী গারদে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। আমার অসংখ্য মামলার দায়িত্ব নিয়ে তাদের মধ্যেও সম্ভবত: ক্লান্তি এসেছে। গারদ থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার পথে কোর্ট গারদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক অশিষ্ট, অতি উত্সাহী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাদানুবাদে লিপ্ত হতে হলো। কর্মকর্তাটির নাম মুরাদ। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে হাঁট ার সময় তরুণ অফিসারটি বার বার আমার কবজি ধরে চলার চেষ্টা করায় আমি যারপরনাই বিরক্ত হয়ে প্রতিবার হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছিলাম। উদ্ধত প্রকৃতির পুলিশ কর্মকর্তাটি জানাল, আমি যাতে অপেক্ষমাণ সাংবাদিক, জনতার উদ্দেশে হাত নাড়তে না পারি, সে কারণেই উপর থেকে নাকি তাকে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলাই বাহুল্য চোর, ডাকাতের মতো আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পুলিশটির আদালত পর্যন্ত ধরে নিয়ে যাওয়ার খায়েশ পূর্ণ হতে দেইনি। আমাকে নিয়ে সরকারের ভয় এবং আমার প্রতি তাদের আক্রোশ কতটা নগ্নভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে দেখে দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কাবোধ করলাম। এই সরকার রাষ্ট্রের তাবত্ অংশকে চরমভাবে দলীয়করণই কেবল করেনি, এই অতীব গর্হিত কাজ করা নিয়ে কারও মধ্যে কোনো রকম লজ্জাবোধও আর অবশিষ্ট নেই। চলার পথে দু’পাশ থেকে আদালত চত্বরে উপস্থিত জনগণ সালাম জানাচ্ছিলেন। সেই সালামের জবাব দেয়ার উপর কোনো বাধা-নিষেধ আছে কিনা, জিজ্ঞাসা করলে পুলিশ কর্মকর্তাটি নিরুত্তরই রইল।
আদালতের কাঠগড়ায় ওঠার পর জানতে পারলাম, আইন প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের রাজাকারি অতীত নিয়ে সংবাদ প্রকাশের অপরাধে যে মানহানি মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল, আজ তারই চার্জ গঠন শুনানি। অন্যান্য দিনের মতো আমার মামলায় ঢাকা বারের জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের ভিড় লক্ষ্য করলাম না। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, একই দিনে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের একটি মামলা থাকায় সঙ্গত কারণেই আমার পক্ষে আইনজীবী পাওয়া যাচ্ছিল না। ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখে পরিচিত মনে হলো। এই ভদ্রলোকই সম্ভবত তেজগাঁও থানার দায়েরকৃত পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার বানোয়াট মামলায় সরকার পক্ষের এক তরফা শুনানি করে আমাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন। সেই রিমান্ডেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে আমাকে নির্যাতনের কাহিনী আগেই বর্ণনা করেছি। রিমান্ডের রায় ঘোষণার সময় ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের চোখে-মুখে যে অপার সন্তোষ লক্ষ্য করেছিলাম, তা আজ পর্যন্ত ভোলা সম্ভব হয়নি। যাই হোক, আজকের মামলা শুনানির ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ঢাকা বার সভাপতি অ্যাডভোকেট সানাউল্লা মিঞার জুনিয়র অ্যাডভোকেট মেসবাহউদ্দিন, ঢাকার নিম্নআদালতে আমার দেশ পত্রিকার প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন এবং অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদকে দেখে খানিকটা ভরসা পেলাম। তারা চার্জ গঠন আবেদনের বিরোধিতা করার জন্য সময় প্রার্থনা করলে আমাকে বেশ অবাক করেই ম্যাজিস্ট্রেট সেপ্টেম্বরের ঊনত্রিশ তারিখ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করলেন। গারদে ফিরে প্রিজন ভ্যানে উঠতে যাব, এমন সময় অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার এসে উপস্থিত হলেন। আজকের মামলার খবর মাসুদ ভাইয়ের জানা না থাকায় তিনি সময়মত আদালতে হাজির না থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমিও খুশি মনেই জেলে ফিরলাম। ডজন ডজন মামলা এখন আর আমাকে উদ্বিগ্ন করে না। বরং ‘সাগরে পেতেছি শয্যা শিশিরে কি ভয়’ বহুল পরিচিত এই পঙিক্তটি স্মরণ করে এক প্রকার আত্মপ্রসাদ অনুভব করি।
কাল বিকালে আদালত থেকে জেলে ফেরার পর থেকেই অলিউল্লাহ নোমানের জন্য দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ২৪ তারিখে সুপ্রিমকোর্টে জেনে এসেছিলাম নোমান ২৫ তারিখে জেলগেটে আত্মসমর্পণ করবে। প্রায় তিন মাসের জেলজীবনে এখানে অনেক শিষ্য জুটে গেছে। বেলা এগারোটার দিকে তাদেরই একজনকে আমার তরুণ, বিপ্লবী সহকর্মী ও কেস পার্টনারের খোঁজ-খবরের জন্য জেলগেটে পাঠালাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে এসে জানাল, গতকাল বিকেলে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলে আসার পর ১০ নম্বর সেলের ১ নম্বর কক্ষে নোমানের ঠাঁই মিলেছে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার বিনিময়ে এই জেলদণ্ড নোমানকে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকতা জগতে অধিকতর মর্যাদা দান করবে, এটাই প্রত্যাশা করি। নোমান জরিমানা দেয়ার পরিবর্তে এক সপ্তাহ অতিরিক্ত সাজা খাটার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপসকামিতার এই বাংলাদেশে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। এখন থেকে আদালত অবমাননার অন্যায় মামলায় দেশের সব নাগরিক অনুপ্রাণিত হয়ে ক্ষমা না চাইবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে, এমন আকাশ-কুসুম প্রত্যাশা আমার নেই। তবে আমার এবং নোমানের সাজার প্রতিক্রিয়ায় ১৯২৬ সালের ঔপনিবেশিক আমলের আদালত অবমাননা আইন নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মূল্য মোটেও সামান্য নয়। বিনা প্রতিবাদে সব অবিচার মেনে নেয়ার ফলেই বর্তমান সরকার আদালতকে এতখানি নগ্নভাবে দলীয়করণ করতে সক্ষম হয়েছে। ইনসাফের জন্য কেবল আল্লাহ্র কাছে কান্নাকাটি করে কোনো লাভ নেই। ইনসাফ এবং হক আদায় করার লক্ষ্যে লড়াই করাও জরুরি। আমার দুই জেল-শিষ্যের কাছ থেকে শুনলাম, জেলগেটে নোমানের আত্মসমর্পণের সময় সহমর্মিতা জানাতে তার সঙ্গে কাল এসেছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ, প্রথাবিরোধী বুদ্ধিজীবী ও কবি ফরহাদ মজহার, সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ তিন শতাধিক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীর এক বিরাট দল। আমি এখনও জানতে পারিনি, জেলের প্রথম রাত নোমানের কেমন কেটেছে। তবে বন্দিশালার মোটা মোটা শিকের মধ্য দিয়ে এক চিলতে আকাশের দিকে তাকিয়ে জুলুমের বিরুদ্ধে এ দেশের গণমানুষের আগামী দিনের জাগরণের চিত্র দেখতে পাই। গতকাল জেলগেট পর্যন্ত নোমানকে সঙ্গ দিয়ে আতাউস সামাদ, ফরহাদ মজহার এবং রুহুল আমিন গাজী আমার স্বপ্নে দেখা সেই বিপ্লবের প্রত্যাশা উজ্জ্বলতর করেছেন। মহান আল্লাহ্তায়ালা তাদের মঙ্গল করুন।

সেহেরীর সময় কারারক্ষীর চাবির গোছার ঝনঝন শব্দে সেলের বন্ধ দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াই

গ্রেফতার হওয়ার দুই মাস সাত দিনের মাথায় মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। অবশ্য ডিবি অফিস থেকে চব্বিশে জুন ভোরে উত্তরার টিএফআই সেলে নিয়ে যাওয়ার সময় এক ঝলক মাকে দেখেছিলাম মিন্টো রোডের ফুটপাতে তজবীহ্ হাতে আরও লোকজনের সঙ্গে বসে আছেন। আমি মাকে লক্ষ্য করে হাতও নেড়েছিলাম। কিন্তু, গাড়িতে দুই দিকে দুই পুলিশ কর্মকর্তার মাঝখানে বসা আমাকে তিনি কাচের ভেতর দিয়ে দেখতে পাননি। আজ জেল প্রশাসন থেকে দেখার স্লিপ হাতে পাওয়া মাত্র সাত নম্বর সেল থেকে জেলগেট পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গেছি। সুপার অফিসের সামনে দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত সোফায় মা আর পারভীন বসে আছেন। গোয়েন্দা পরিবেষ্টিত দুই দুঃখিনী নারী কারাগারে বন্দি পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্যের দেখা পাওয়ার জন্য জেলগেটে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষমাণ। মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম জানালাম। হাসি মুখেই তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কিছুটা রোগা হয়ে গেছেন। সোফায় দু’জনার মাঝখানে আমি বসলে পারভীন সোফা থেকে নেমে আমাকে সালাম করল। আমিও স্ত্রীর মাথায় হাত রাখলাম, আজ ওর জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে উপহার দেয়ার মতো তেমন কিছুই আমার কাছে ছিল না। রোজার প্রথম দিনে এক শিশি আতর উপহার পেয়েছিলাম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কাছ থেকে। তিনি আছেন ডিভিশন ওয়ার্ডে। ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় না থাকলেও কী মনে করে পয়লা রোজায় আমার সেবক মারফত উপহার পাঠিয়েছিলেন। পারভীনকে সেই আতরের শিশিটি দিয়ে বললাম, তোমার জন্মদিনের উপহার। প্রত্যুত্তরে এক চিলতে বিষণ্ন হাসি দিয়ে পারভীন উপহারটি গ্রহণ করল। এই পরিবেশে কষ্ট করে হাসলেও ঠিক জানি, বাসায় ফিরেই দরজা বন্ধ করে কাঁদতে বসবে। দুঃখ করে লাভ নেই। এই জেলে প্রতিটি বন্দির পরিবারকেই একই প্রকার কষ্ট সহ্য করতে হয়। উপরন্তু, বন্দি জীবনও বলতে গেলে আমি স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছি। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সহজেই আপস করে অনেকের মতো সপরিবারে নিরাপদে থাকতে পারতাম। যাক সেসব কথা। জায়া ও জননীর সঙ্গে কুশল বিনিময়, সংসারের টুকিটাকি কথা এবং আমার অর্ধশত মামলার আলোচনা করতেই আধ ঘণ্টার সাক্ষাত্কার সমাপ্ত হলো। কারা প্রশাসন সময় শেষের কথা মনে করিয়ে দেয়ার আগেই উঠে দাঁড়ালাম। আগের দু’বারের মতো করেই পারভীনকে বললাম, এখানে আর এসো না। চটজলদি জবাব এলো, তুমি যেখানে থাকতে পার, আমরা তোমার কুশল জানতে সেখানে আসতেও পারি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মা ও স্ত্রীর চলে যাওয়া দেখলাম। অন্যদিন দেখা শেষ হওয়া মাত্র সেলের ফিরতি পথে হাঁটা ধরি। আজ কারারক্ষীদের সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছা হলো। একজন ডেপুটি জেলার বলে উঠলেন, স্যার আপনি দেখতে অবিকল আপনার মায়ের মতো। বাল্যকাল থেকে এই কথাটি শুনতে শুনতে প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছি। জীবনের অধিকাংশ সময় কঠিন সংগ্রামে অতিবাহিত করার পর আমার সত্তরোর্ধ মায়ের এবার বোধহয় একটুখানি শান্তি প্রাপ্য ছিল। সেই শান্তি আমি তাকে দিতে পারলাম না। স্ত্রীর নিরাপত্তা বিধানেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। তাকে এখন স্বামীর ডজন ডজন মামলার তদবিরের জন্য আইনজীবীদের চেম্বার এবং বাড়িতে দৌড়াতে হচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত আগেই শাশুড়ি-বৌ যে সোফাটিতে বসেছিলেন, সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। শেক্সপীয়রের শাইলকের মতোই সরকার আমার শরীরের মাংস কেটে কেটে নিচ্ছে। আমার এই অসম লড়াইকে সাত নম্বর সেলের ফয়সাল নির্বুদ্ধিতা বলে ভর্ত্সনা করে। অনুযোগ করে বলে, আমি নাকি মা এবং স্ত্রীর প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করছি না। তার ধারণা ভবিষ্যতে দেশের জনগণ অবিমৃষ্যকারিতার জন্য আমাকে গল্পের ‘ডন কুইক্সোট’ আখ্যা দিয়ে পরিহাস করবে। রূপক গল্পের এই বোকা নায়কটি তার ততোধিক বোকা সঙ্গীকে নিয়ে পুরনো দিনের নাইটদের মতো একটা হাড় জিরজিরে ঘোড়ায় চেপে ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে ঘর ছেড়েছিল। আমিও হয়তো তাই। কিন্তু পৃষ্ঠপ্রদর্শন করব না কখনও। নিরুদ্বিগ্ন জীবনে প্রত্যাবর্তনের সেতু নিজ হাতে পুড়িয়ে দিয়ে তবেই আমি জেল জীবন বেছে নিয়েছি।
সেলে ফিরে ফয়সালের সঙ্গে গল্প করে মনটা খানিকটা হালকা করার চেষ্টা করছি, এমন সময় অলিউল্লাহ নোমান দেখা করতে এলো।
জেলগেটে নোমানের আত্মসমর্পণের পর বেশ কয়েকদিন কেটে গেলেও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার সুযোগ পায়নি। আমার সহকর্মী তরুণটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম, জেলে কষ্ট হচ্ছে কিনা জানতে চাইলাম। মিতবাক নোমান হাসিমুখেই বলল, সে ভালো আছে। দশ নম্বর সেলের অন্য বন্দিরা তাকে সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট সম্মান দিচ্ছে। জেলগেটে ওর আত্মসমর্পণের গল্প শুনলাম। রাজবন্দিরা সাধারণত মুক্তি পাওয়ার পর ফুলেল শুভেচ্ছা পেয়ে থাকে। নোমান ভাগ্যবান। আতাউস সামাদ, ফরহাদ মজহারের মতো বরেণ্য ব্যক্তিবর্গসহ তিন-চারশ’ সাংবাদিক রীতিমত পুষ্পবৃষ্টি করে তাকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমি ভেবেছিলাম, অলিউল্লাহ নোমানকে ম্রিয়মাণ দেখব। সাহসী সাংবাদিককে জেলে এসেও যথেষ্ট উজ্জীবিতই মনে হলো। সেপ্টেম্বরের তিরিশ তারিখ ওর সাজার মেয়াদ শেষ হবে, অর্থাত্ আমাদের উভয়েরই রমজানের ঈদ জেলেই কাটবে। জেলবাসের ক’দিনে যথাসম্ভব লেখার রসদ জোগাড় করার পরামর্শ দিলাম। বেশিক্ষণ গল্প করা গেল না। বৈরী সরকারের প্রশাসন টের পেলে শাস্তি হিসেবে যে কোনো একজনকে চালানে দূরের কোনো কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। ঈদের দিন সুযোগ পেলে আবারও দেখা করতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে নোমানকে বিদায় দিলাম। আজকের শুক্রবারটা আনন্দ-বেদনা, সুখে-দুঃখে একেবারে মন্দ কাটল না।
জেলে রোজা রাখতে পারব কিনা, এ নিয়ে প্রথমদিকে সংশয় থাকলেও আল্লাহর রহমতে বিশেষ কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। তবে ঘুমের সময়টা একেবারেই পাল্টে গেছে। ন’টায় ঘুমিয়ে রাত দেড়টার মধ্যে নিয়মিত ঘুম ভেঙে যায়। ডিভিশন ওয়ার্ডের মেট আলমগীর সঙ্গে তিন-চারজন কারারক্ষী নিয়ে রাত দুটোর দিকে সাহির নিয়ে এলে প্রতি রাতেই জেগে আছি দেখতে পায়। আমার সেলের দিকে আগুয়ান কারারক্ষীর হাতের চাবির গোছার ঝনঝন শব্দ শুনলেই বিছানা ছেড়ে সেলের বন্ধ দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। বয়স আর পরিস্থিতি মানুষকে কত পাল্টে দেয়। পঞ্চাশে পা দেয়া পর্যন্ত আমার গভীর ঘুম গৃহে হাসি-ঠাট্টার বিষয় ছিল। বুয়েটে যখন পড়ি, তখন তো দিনে-দুপুরে একবার এমন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম যে আমাকে জাগাতে না পেরে দরজাই ভাঙতে হয়েছিল। অথচ এখন? আলমগীর বিস্ময়ের সঙ্গে প্রায়ই বলে, স্যার একবারের জন্যও আপনাকে ডেকে তুলতে হলো না। কারা রক্ষীদের বোধহয় ধারণা, দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম আসে না। আমি কোনো কথা না বলে কেবল হেসে ওদের সঙ্গে তাল মেলাই। আজ ঘুম ভেঙে গেল রাত একটায়। স্বপ্ন দেখছিলাম কৈশোরে ফিরে গেছি। ছেলেবেলার সাথীদের সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছি গেণ্ডারিয়ার চেনা রাস্তায়। সেখানকার স্কুলের, আমাদের ছোট্ট বাসাটার কত স্মৃতি মনের গভীরে লুকিয়ে আছে। পারভীনকেও যেন দেখলাম ছায়ার মতো দূরে সরে যাচ্ছে। কাকতালীয়ভাবে আমার স্ত্রীর জন্মও গেণ্ডারিয়াতেই, তবে নয় বছরের ব্যবধানে। অবশ্য সেখানে আমাদের দেখা হয়নি। আজ রাতের নস্টালজিক স্বপ্ন মা এবং পারভীনের গতদিনের জেলগেটে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসারই প্রতিক্রিয়া। অন্য বন্দিদের ক্ষেত্রে কী হয়, জানি না। তবে সংসারের মানুষগুলো এখানে দেখা করতে এলেই আমার কঠিন জেল জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা এলোমেলো হয়ে যায়। তাদের এখানে আসতে এত যে নিষেধ করি, তার পেছনে এটাও হয়তো একটা কারণ। সরকারপ্রধান আমাকে যতদিন সম্ভব জেলে আটকে যে রাখতে চান, এ নিয়ে জনমনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। কোন পন্থায় আমাকে রাখা হবে, সে নিয়ে সরকারের একটা সমস্যা ছিল। আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায় আমাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সেই মুশকিল অনেকটাই আসান করে দিয়েছে। অন্তত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকার নিশ্চিত হতে পেরেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক ইন্দো-মার্কিন মোর্চার চোখের বালির তালিকায় আমার নাম শীর্ষস্থানে থাকার কথা। সুতরাং গ্রেফতার থেকেই আমাকে শায়েস্তা করার সব সরকারি বন্দোবস্ত তাদের কাছ থেকেও শতভাগ সমর্থন লাভ করছে। বাস্তবতা মেনে নিয়ে মা এবং স্ত্রীকে মন শক্ত করে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিতে বলেছি। আশা করি, মহান আল্লাহ্তায়ালা তাদের ফ্যাসিবাদের সর্বপ্রকার অত্যাচার, নির্যাতন, হয়রানি সহ্য করে সংসার সমুদ্রে কিস্তি ভাসিয়ে রাখার তৌফিক দেবেন। বাড়ির কথা বাদ দিয়ে রমজান মাসের দিনযাপনের গল্পে এবার ফিরে যাই।

এক-এগারোর কুশীলবরা দুর্নীতি দমনের ছদ্মবেশে জাতীয়তাবাদী শক্তিকেই নির্মূল করতে চেয়েছিল

ডিভিশনপ্রাপ্ত কয়েদিরা তো বটেই, এমনকি সাধারণ বন্দিরা জেল প্রশাসনের অনুমতিসাপেক্ষে রমজান মাসে মাঝে মধ্যে বাড়ি থেকে ইফতার আনানোর সুযোগ পান। জেল প্রশাসনের অনুমতি পেতে হলে অবশ্য জায়গামত অর্থ-কড়ি লেনদেনের বিষয়ে উদারহস্ত হতে হয়। এছাড়া প্রভাবশালী বন্দিদের ক্ষেত্রে উপরের নির্দেশ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আমার যেহেতু লেনদেন অথবা উপরের সঙ্গে সমঝোতা উভয় ক্ষেত্রেই ভয়ানক আপত্তি রয়েছে, কাজেই জেলের ইফতারি দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছি। তবে উন্নত মানের ইফতারি কখনও কপালে জুটছে না, এ কথা বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। সাত নম্বর সেলের প্রতিবেশীরা যার যার পিসির অর্থ দিয়ে জেলের বাইরের ইফতার আনালে আমাকে শরিক না করে সেই ইফতারি কখনওই খায় না। ডিভিশন সেল থেকেও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুস সালাম পিন্টু এবং মির্জা আব্বাস কয়েকদিন পর পর তাদের গৃহ থেকে আনানো ফল, ইফতার ইত্যাদি পাঠিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করছেন।
আগেই উল্লেখ করেছি, মাওলানা সাঈদীর সঙ্গে এখনও পর্যন্ত আমার সাক্ষাত্ হয়নি। এক এগারো পরবর্তী সময়ে আমার কলাম পড়ে অভিনন্দন জানাতে বার দুয়েক ফোন করেছিলেন, এটুকু মনে আছে। এই পরিচয়ের সুবাদে তার কাছ থেকে ইফতার আশা করা যায় না। সম্ভবত, অন্তরের টানেই তিনি আমাকে এসব ইফতার সামগ্রী পাঠিয়ে থাকেন। তবে, আমি সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছি বিএনপির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসের নিয়মিত ইফতার পাঠানোতে। পাঁচ বছর একই সঙ্গে সরকারে থাকলেও এই রাজনীতিবিদের সঙ্গে সেই সময় কদাচিত্ দেখাসাক্ষাত্ হয়েছে। এক এগারোর প্রথমদিকেই তিনি গ্রেফতার হয়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে মুক্তি লাভ করার কারণে ২০০৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত জানাশোনার সুযোগ হয়নি। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় অথবা কোনোরকম স্বার্থের সংঘাত না থাকলেও বিচিত্র কারণে আমার প্রতি বিরাগ পোষণ করার ক্ষেত্রে সম্ভবত শেখ হাসিনার ঠিক পরেই তার অবস্থান। বিস্ময়কর বিরাগের উত্পত্তির কাহিনীটি খানিকটা দীর্ঘ হলেও দেশের রাজনীতি বোঝার স্বার্থে পাঠকের জেনে রাখা প্রয়োজন।
এক এগারোর কুশীলবরা দুর্নীতি দমনের ছদ্মবেশে এদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তিকেই যে নির্মূল করতে চেয়েছিল, এ নিয়ে জনমনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই বলেই আমি মনে করি। সেই সময় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের সংখ্যাধিক্য চোখে পড়ার মতোই ছিল। আওয়ামী লীগেরও কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে, তা ছিল নিতান্তই লোক দেখানো। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি শক্তির মধ্যস্থতায় জরুরি সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দেশবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করতে অসম্মতি জানিয়ে দেশেই থেকে যান। নিজ আদর্শে অটল থাকার মূল্য হিসেবে তাকে, তার পরিবারকে এবং তার দলকে অনেক ঝড়-ঝাপটা অতিক্রম করতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। যাই হোক, জেনারেল মইন পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেও বিএনপি’র অনেক শীর্ষ নেতাকে ২০০৮-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলে আটকে রাখেন। এদিকে নির্বাচন এগিয়ে আসতে থাকলে বিএনপি চেয়ারপার্সন তার দলের নেতৃবৃন্দকে মুক্তি না দিলে নির্বাচনে যোগদান করতে অসম্মতি জানান। তার অনড় অবস্থানের কাছে নতিস্বীকার করে সুশীল (?) ও সামরিক জান্তার সমন্বয়ে গঠিত সরকার নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে জাতীয়তাবাদী দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে জেল থেকে মুক্তি দেয়। সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে মির্জা আব্বাসও ছিলেন।
নির্বাচনপূর্ব সেই সময়টাতে বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে দাফতরিক কাজে সহায়তা করার জন্য আমি নিয়মিত তার গুলশান অফিসে যেতাম। সেই সুবাদে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের নানা রকম আচরণ দেখার সুযোগ হয়েছিল। জেল থেকে মুক্তি লাভের পর কুশল বিনিময়ের জন্য এক রাতে সস্ত্রীক মির্জা আব্বাস বিএনপি চেয়ারপার্সনের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। চেয়ারপার্সনের কক্ষে সেই সময় আরও কয়েকজন বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। জরুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাঙ্গারু কোর্টে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে নির্বাচনবিধি অনুযায়ী মির্জা আব্বাসকে বেগম খালেদা জিয়া ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন দিতে পারেননি। চেয়ারপার্সনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুযোগকালে তার কিছু উদ্ধত মন্তব্যে আমি ভয়ানক বিস্মিত হয়েছিলাম। তার নাম উল্লেখ না করে আমার একটি কলামে সে রাতের ঘটনা লিখলে তিনি সঙ্গত কারণেই আমার প্রতি বিক্ষুব্ধ হন। মির্জা আব্বাস নবম সংসদে বিএনপি’র নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও চরম বিরোধী ছিলেন। এই বিরোধিতা কতটা আদর্শিক কারণে, আর কতটা নিজে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারার কারণে, সেটি অবশ্য আমার জানা নেই। সে যাই হোক, তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে, বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যারা প্রভাবিত করেছিল, তার মধ্যে আমিও ছিলাম। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে আমার প্রতি তার বিরাগের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ, জাতীয়তাবাদী দলের জন্মলগ্ন থেকে চলমান আব্বাস-খোকা বিরোধে তিনি মনে করেছেন যে, আমি প্রকারান্তরে খোকাকে সমর্থন করছি। অথচ এক এগারো পরবর্তী সময়ে সাদেক হোসেন খোকার দৃশ্যত: আপসকামী মনোভাব এবং আমার প্রকাশ্য জান্তা-বিরোধী তত্পরতার ফলে আমাদের মধ্যে আগেকার যত্সামান্য যোগসূত্রও ছিন্ন হয়। আগেও সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে আমার এক-দু’বারের বেশি দেখা সাক্ষাত্ হয়নি। মির্জা আব্বাস এবং সাদেক হোসেন খোকা উভয়েই পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ এবং দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে আছেন। অন্যদিকে, রাজনীতির ময়দানে একেবারেই অপরিচিত আমার চারদলীয় জোট সরকারে হঠাত্ দায়িত্ব পালন অনেকেরই বিস্ময়ের কারণ হয়েছিল। বিএনপি নেতাদের অনেকেই ২০০১ সালে আমার উড়ে এসে জুড়ে বসাকে পছন্দ করেননি। মইন শাসিত দুই বছরে ঢাকার মেয়রের সঙ্গে একবারের জন্যও দেখা না হলেও সেই সময় আজকের মির্জা আব্বাসপন্থী একাধিক নেতা আমার বাসায় একাধিকবার এসেছেন। মুশকিল হলো, রাজনীতি আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হলে সেখানে যুক্তির কোনো স্থান থাকে না। সেই কারণেই সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মির্জা আব্বাস আদর্শিক অবস্থানের চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। যাই হোক, আমি যেহেতু কোনোরকম দলীয় রাজনৈতিক অভিলাষ পোষণ করি না, সে কারণে মির্জা আব্বাসের মনোভাব বুঝতে পেরে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমিও তাকে এড়িয়েই চলেছি। খোকা-আব্বাস বিরোধ নিয়েও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। এই বিরোধে বিএনপি দল হিসেবে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার দায়িত্ব বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী দলটির বিপুলসংখ্যক ত্যাগী, তৃণমূল কর্মিবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের। পারস্পরিক সম্পর্কের পুরনো বাস্তবতায় জেলে এসে মির্জা আব্বাসের কাছ থেকে প্রথম দিন ইফতার উপহার পেয়ে আমার বিস্মিত না হয়ে কোনো উপায় ছিল না। জেলে এলে বোধহয় এক আমি ছাড়া সবাই সজ্জন হয়ে ওঠে।
সকালে সেবক সালাহউদ্দিন মারফত খবর পেলাম, মির্জা আব্বাস শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেয়েছেন। গত দু’দিন ধরে তার মুক্তি নিয়ে সরকার নানারকম টালবাহানা করছিল। হাইকোর্ট থেকে বৃহস্পতিবার তিনি জামিন পেলেও জেল প্রশাসন উপরের নির্দেশের অজুহাত দেখিয়ে তাকে মুক্তি দিচ্ছিল না। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস নাকি মৌখিকভাবে জেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যে, তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চেম্বার জজ আদালতে আপিল করবেন। প্রশাসনের এই আচরণ সরাসরি আদালতের আদেশ লঙ্ঘন কিনা, সেই বিচার উচ্চ আদালত প্রয়োজনবোধে করবেন। শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনামলে আদালতের রায় নিয়ে প্রশাসনের এই ছেলেখেলা সর্বব্যাপী রূপ নিয়েছে। জামিনের কাগজপত্র জেলগেটে পৌঁছানোর পরও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে ফোন এলেই আদালতের নির্দেশকে কাঁচকলা দেখিয়ে বন্দির মুক্তি আটকে দেয়া হচ্ছে। মির্জা আব্বাসের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছে, আমার জানার কোনো সুযোগ নেই। তিনি ভিআইপি সেলে থাকেন, আর আমি সাধারণ বন্দিদের কাতারে। কাজেই দেখা-সাক্ষাতের কোনো সুযোগ ঘটেনি। তিনি মুক্তি পেয়েছেন, এই খবরেই আমি যথেষ্ট আনন্দিত বোধ করছি। বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হলে আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু এই রাজনীতিকের আগের চরিত্রে ফিরে যাওয়া বিএনপি’র জন্য অত্যাবশ্যক। সাদেক হোসেন খোকা এবং মির্জা আব্বাস ঢাকা শহরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক সময় কার্যকর নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণ তাদের সেই বিপ্লবী চেহারা পুনর্বার দেখতে আগ্রহী হলেও জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা, সেটা এই সরকারের বাকি মেয়াদকালে দেখা যাবে। দিন শেষ না হতেই আবার দুঃসংবাদ শুনলাম। অশিষ্ট, অগণতান্ত্রিক সরকার তার চরিত্রানুযায়ী মির্জা আব্বাসকে জেল গেট থেকে ফিরিয়ে দিয়ে নতুন মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ করেছে। কারারক্ষীদের কাছ থেকে শুনলাম, জেলগেটের বাইরে অপেক্ষমাণ মির্জা আব্বাসের স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি সরকারের এই অবিচারে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। আপন পরিবারের অসহায় অবস্থার কথা স্মরণ করে মিসেস আব্বাসের প্রতি সমবেদনা বোধ করলাম। ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করার ফ্যাসিবাদী কৌশলের অংশ হিসেবে একটার পর একটা বানোয়াট মামলা দিয়ে মির্জা আব্বাসের মতো রাজনীতিবিদদের জেলে আটক রেখে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অন্ধ সমর্থন সরকারকে ক্রমেই এক নির্যাতনকারী দানবে পরিণত করছে। এই সরকার যে কেবল ভারতের স্বার্থরক্ষা করার জন্য পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ইসলামী জঙ্গি ভীতিকে ব্যবহার করছে, সে বিষয়টি ওইসব রাষ্ট্রের জনগণ এক সময় অবশ্যই উপলব্ধি করবেন। ততদিনে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নেতার ছদ্মবেশে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নামক দানবের না উত্থান ঘটে যায়, সেটা নিয়েই যত দুর্ভাবনা। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশাল’-এর সময় আমাদের নাগরিকদের হয়েছে। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণকারী কন্যা বর্তমানে অভিন্ন লক্ষ্যে ধাবিত হচ্ছেন।

সুপ্রিমকোর্ট অঙ্গনে সন্ত্রাস সৃষ্টিকে আদালত অবমাননা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সঙ্গে নজিরবিহীন তর্কযুদ্ধের পর এদেশে স্বৈরাচারের সংজ্ঞা, চরিত্র ও প্রতীক নিয়ে বড় সংশয়ে পড়ে গেছি। বাংলাদেশে স্বৈরাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন আশির দশকে জেনারেল এরশাদ। সেই থেকে স্বৈরাচার শব্দটি তার অঙ্গের শোভা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণতন্ত্রের কথিত ‘মানসকন্যা’ শেখ হাসিনার সঙ্গে ভাই-বোন সম্পর্ক পাতিয়েও তিনি নিস্তার পাননি। গত বছর ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখের স্বৈরাচার পতন দিবসে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে বিশ্বের সর্বনিকৃষ্ট স্বৈরাচার বলে গাল দিয়েছিলেন। মতিয়া চৌধুরীর সেই গালাগালিতে জেনারেল এরশাদের রাজনীতি-তুতো ছোট বোন শেখ হাসিনা কোনো রকম মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিলেন, এমন সংবাদ কোথাও প্রকাশিত হয়নি। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী যাই বলুন না কেন, ২০০৮ সালের ডিজিটাল নির্বাচনের পর জেনারেল এরশাদকে স্বৈরাচারী নামে ডাকার অধিকার সম্ভবত আমরা হারিয়েছি। যতদূর মনে পড়ে, গুলশান-ক্যান্টনমেন্ট সংসদীয় আসন থেকে প্রতিযোগিতা করে ওই নির্বাচনে তিনি সমগ্র দেশে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। ভোটযুদ্ধে তিনি শুধু সত্ মানুষ হিসেবে পরিচিত বিএনপি’র ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহেকই পরাজিত করেননি, ভোট প্রাপ্তিতে তার অবস্থান দেশের উভয় প্রধান নেত্রীর ওপরেই ছিল।
এর আগে ১৯৯১ সালে বন্দি অবস্থায় জেল থেকে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সব ক’টিতেই বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে সেবারের সব আসনই ছিল বৃহত্তর রংপুর জেলার। সেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ আসনে দাঁড়িয়ে ঢাকায় সাদেক হোসেন খোকা এবং মেজর (অব.) মান্নানের কাছে বেশ বড় ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার দেশের কথিত ‘অভিজাততম’ এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পর জেনারেল এরশাদ যদি নিজেকে একজন জননন্দিত নেতা বলে দাবি করেন, তাহলে তার সেই দাবিকে অযৌক্তিক বলব কি করে? ব্যক্তিগতভাবে আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি জেনারেল এরশাদের নির্বাচনী এলাকারই একজন ভোটার। নির্বাচনের পর অবশ্য হাইকোর্ট সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারের পুরনো লেবেল তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করায়’ এই চৌকস জেনারেল সাহেবের জুড়ি মেলা ভার। তিনি নতমস্তকে হাইকোর্টের রায় কেবল মেনেই নেননি, কালবিলম্ব না করে ছুটে গেছেন দেশের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিপতি ‘ছোট বোনের’ কাছে। ছোটাছুটিতে ভালোই কাজ হয়েছে। এই বৃদ্ধ বয়সে জেলে যাওয়ার আশঙ্কা তিনি ঠেকাতে পেরেছেন। বাস্তবতা হলো, জনগণের রায় এবং হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে জাতীয় পার্টি প্রধানকে এখন বড়জোর সাবেক স্বৈরাচার নামে অভিহিত করা যেতে পারে।
স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদই একমাত্র শাসক নন, যার বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এই অভিযোগটি সর্বপ্রথম উঠেছিল মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। ১৯৭২ থেকে ’৭৫ সময়কালে প্যারামিলিটারি রক্ষীবাহিনী কর্তৃক দেশের জনগণ নির্মমভাবে নির্যাতিত ও বিপুল সংখ্যায় বিচার বহির্ভূতভাবে নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এবং ১৯৭৫ সালে দেশে একদলীয় ‘বাকশাল’ শাসন পদ্ধতি চালু করার কারণে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বৈরাচারী শাসক রূপে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সেসব কালো ইতিহাস আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান দোষে-গুণে পূর্ণ নিতান্তই একজন রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী কর্তৃক তার ওপর দিবারাত্র দেবত্ব আরোপের অক্ষম চেষ্টা দেখে তাদের প্রতি করুণা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আরেক গৌরবান্বিত চরিত্র মরহুম জিয়াউর রহমানকেও এদেশের ভারতপন্থী রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী সচরাচর সামরিক স্বৈরাচারী শাসকই বলে থাকেন। সব দলমতের মানুষের এসব মতামত বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করলে বলতে হবে, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের কেবল স্বৈরাচার নিয়েই ঘর-বসতি।
অসহিষ্ণুতা স্বৈরাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কাল থেকেই বিএনপি’র মধ্যে এক প্রকার উদার ও আধুনিক চিন্তা-চেতনা বিকশিত হওয়ায় দলটি সমালোচনা ভালোই সহ্য করতে পারে। বেশি অতীতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পত্রপত্রিকা ঘাঁটলে এবং সেই সময়কালীন আক্রমণাত্মক ও তীব্র সমালোচনামূলক সংবাদে বিএনপি’র ধৈর্যশীল প্রতিক্রিয়া স্মরণ করলেই আমার বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ মিলবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অবস্থান উল্টো মেরুতে। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি ক্যাডারভিত্তিক এবং ফ্যাসিবাদী মন-মানসিকতাসম্পন্ন হওয়াতে এদের শাসনামলে সর্বদাই সাংবাদিকতা এক বিপজ্জনক পেশা। দলটির প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে চারটি দৈনিক পত্রিকা বাদে আর সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তার সময়ে বাংলাদেশ অবজারভারের আবদুস সালাম চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন এবং কবি আল মাহমুদ ও এনায়েতুল্লাহ খানের মতো দিকপালরা গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিন জনারই অপরাধ ছিল অভিন্ন। তারা তত্কালীন সরকারের সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন, অথবা সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদকালে দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস এবং বিচিত্রা’র মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সমালোচকরা বলে থাকেন, তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল যে, তাকে বোঝানো হয়েছিল পত্রিকা তিনটিতে কর্মরত সাংবাদিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রাজনৈতিক আদর্শে আওয়ামী লীগ বিরোধী। শেখ হাসিনা তার এবারের মেয়াদে আমার দেশ নিয়ে যা করলেন, তা যে সাংবাদিক এবং সংবাদ মাধ্যম দলনের এক কালিমালিপ্ত ইতিহাস তৈরি করল, সেই সত্যটি আশা করি আওয়ামী পন্থী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা প্রকাশ্যে না হলেও অন্তত: মনে মনে স্বীকার করবেন। সুতরাং, অসহিষ্ণুতার মাপকাঠিতে শেখ হাসিনাকেও গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরাচারের কাতারে না ফেলে কোনো উপায় নেই।
একটি রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক স্বৈরাচারী মানসিকতাসম্পন্ন প্রশাসন দ্বারা নির্যাতিত হলে নিরাপত্তা ও আশ্রয় লাভের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু আদালত দ্বারা নির্যাতিত হলে তার উপায় কী? এই প্রশ্নের মীমাংসার আগে সংবিধানের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতার সীমা বোঝার চেষ্টা করা যাক। সংবিধানের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সুপ্রিমকোর্ট একটি কোর্ট অব রেকর্ড হইবে এবং ইহার অবমাননার জন্য তদন্তের আদেশ দান বা দণ্ডাদেশ দানের ক্ষমতাসহ আইনসাপেক্ষে অনুরূপ আদালতের সকল ক্ষমতার অধিকারী থাকিবেন।’ এই অনুচ্ছেদের পাঁচটি বিষয় নিয়ে আমার দণ্ডপ্রাপ্তির পর থেকে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে চিন্তা-ভাবনা করছি। আমার চিন্তার পাঁচ বিষয় হলো যথাক্রমে ‘অবমাননা’, ‘তদন্তের আদেশদান’, ‘দণ্ডাদেশের ক্ষমতা’, ‘আইন সাপেক্ষে’ এবং ‘সকল ক্ষমতা।’ আদালত অবমাননার অভিযোগে ক্ষমা না চেয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করায় আমার নজিরবিহীন সাজা লাভের ‘সৌভাগ্য’ অর্জন করার খবরটি জেলে বসেই ধারণা করছি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী এতদিনে জেনে গেছেন। পেশায় আইনজীবী না হয়েও আমি নিজেই যে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছি, তাও এর মধ্যে লিখে ফেলেছি। মামলা লড়তে গিয়ে শিখলাম যে কোন কথাটি লিখলে বা বললে যে আদালত অবমাননা হয়, তার কোনো সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি আমাদের ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনে লিপিবদ্ধ নেই। এটা এখন সম্পূর্ণভাবে হাইকোর্ট এবং
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের এখতিয়ারভুক্ত। শুধু তাই নয়। কোন নাগরিকের বক্তব্য এবং লেখাকে আদালত অবমাননার অপরাধ সাব্যস্ত করে সাজা দেয়া হবে, সেটাও নির্ধারণ করবেন এই মাননীয় বিচারপতিরা।
উদাহরণ দিলে বিষয়টি পাঠকের কাছে আরও পরিষ্কার হবে। যে সংবাদ প্রকাশের অপরাধে আমাকে আদালত অবমাননা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে, সেটি প্রকাশের প্রায় দুই বছর আগে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এমএম রুহুল আমিন মন্তব্য করেছিলেন, রাজনৈতিক সরকারগুলো বিচারবিভাগের এতটাই ক্ষতিসাধন করেছে যে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত: কুড়ি বছর সময় লাগবে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিমের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী উচ্চ আদালতের সার্বিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টকে কাচের ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমার সম্পাদিত পত্রিকায় ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এবং সুপ্রিমকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রধান ড. শাহদীন মালিক উচ্চ আদালত, চেম্বার জজ আদালত এবং বিচারপতিদের কঠোর সমালোচনা করে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তৃতা করেছেন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যে করিত্কর্মা আইনজীবী প্রধান বিচারপতির এজলাসসহ সুপ্রিমকোর্ট ভাংচুরে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাকে বর্তমান সরকার হাইকোর্টের বিচারপতির পদে নিয়োগ দিয়েছে। সুপ্রিমকোর্টে সন্ত্রাস সৃষ্টি করাকে আদালত অবমাননা বিবেচনা করা হয়নি। অথচ আদালত অবমাননা মামলা করার জন্য কেবল আমাকেই বেছে নেয়া হয়েছে। আমার শুনানি চলাকালে প্রকাশ্য আদালতে
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা একমাত্র আমাকেই বিশেষভাবে সাজা দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই বক্তব্য সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, সেটা পাঠক বিবেচনা করুন। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ একত্রিশ নম্বর অনুচ্ছেদেও একই অধিকারের কথা ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। ‘আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার’ শিরোনামে এই অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’
উদ্ধৃত দু’টি অনুচ্ছেদের আলোকে শাস্তি প্রদানে নজির সৃষ্টি করার জন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী নাগরিকের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি করতে পারেন কিনা, এই প্রশ্নের জবাব কার কাছে চাইব?

বিশেষ উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকারের আমলে সব নিরাপত্তা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন

এবার তদন্তের আদেশদানের বিষয়টির দিকে দৃষ্টিপাত করি। সংবিধান অনুযায়ী আদালত ইচ্ছে করলে অবমাননার অভিযোগ তদন্তের আদেশদান করতে পারেন। আমার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু হয়েছিল অন্য একটি বানোয়াট জামিনযোগ্য মামলায়, আমার গ্রেফতারের বারো ঘণ্টার মধ্যে। জেলে বন্দি অবস্থায় এবং প্রশাসনের নির্যাতনের শিকার একজন নাগরিককে জেল থেকে টেনে এনে আদালত অবমাননা মামলায় নজিরবিহীন দণ্ড দিয়ে সুপ্রিমকোর্ট নিজে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ভয়াবহ নজির স্থাপন করেছেন। আমাকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে আদালতের ব্যগ্রতাও ছিল লক্ষণীয়। জুনের ২ তারিখে রুল ইস্যু করে আগস্টের উনিশ তারিখে আমাকে সাজা প্রদান করা হয়েছে। যতদূর জানি, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিমকোর্টে আদালত অবমাননার অসংখ্য মামলা শুনানির অপেক্ষায় পড়ে আছে। সেসব মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতের কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও আমার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পেছনের উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন নয়।
আমার দেশ পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশ নিয়ে মামলা হয়েছে, আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় সেই সংবাদে বর্ণিত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দণ্ডাদেশ দান বিস্ময়কর। সেই সংবাদে প্রতিবেদক কোনো মন্তব্য না করে কেবল আদালতের কয়েকটি রায় তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরেছিলেন। সংবাদে শিরোনাম অথবা মন্তব্য হিসেবে যা ছাপা হয়েছে, সেটিও বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ও প্রবীণ আইনজীবী এবং সাবেক বিচারপতির বক্তব্য। অনুচ্ছেদ ১০৮ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের হাতে তদন্তের ক্ষমতা অর্পণ করা সত্ত্বেও কেন মাননীয় বিচারকগণ সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেননি, সেটি আমার জানার কোনো সুযোগ নেই। আমি কেবল বলতে পারি, তদন্তের নির্দেশ দেয়া হলে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের বহু অনিয়মের ঘটনা উদঘাটিত হতো। এমনকি মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে স্বয়ং অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রুজু হওয়াও অসম্ভব ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত মাননীয় বিচারপতিগণ ‘truth is no defence’ তত্ত্বের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটনের পরিবর্তে আমাকে দণ্ড দিয়ে উদাহরণ তৈরি করতেই অধিকতর উত্সাহী ছিলেন।
‘দণ্ডাদেশের ক্ষমতা’ এবং ‘আইন সাপেক্ষে’ বিষয় দু’টি একসঙ্গে আলোচনা করাটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। সুপ্রিমকোর্টের হাতে দণ্ডাদেশের ক্ষমতা থাকাটাই স্বাভাবিক এবং এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে সুপ্রিমকোর্টের সেই ক্ষমতাকে ‘আইন সাপেক্ষে’ বলার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরই একটা চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমার মতো আইন না জানা একজন নাগরিকের অভিমত। আইন বিশেষজ্ঞরা আমার ব্যাখ্যার সঙ্গে অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। আমি যতদূর জানি, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে আদালত অবমাননার সর্বোচ্চ সাজা ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা দুই হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। আমার এবং নোমানের ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্ট জরিমানা দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে যথাক্রমে এক লাখ টাকা এবং দশ হাজার টাকা করেছেন। সেই টাকা অনাদায়ে আবার অতিরিক্ত জেলদণ্ডও দেয়া হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের দণ্ডাদেশের ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও, ‘আইন সাপেক্ষে’র বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। এখন যদি দাবি করা হয়, সুপ্রিমকোর্ট যা বলবে সেটাই দেশের আইন এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংসদকে উপেক্ষা করে আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের যথেচ্ছ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। এ প্রসঙ্গে আমার সর্বশেষ আলোচনা ‘সকল ক্ষমতা’ নিয়ে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জান-মালসহ মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিমকোর্ট সংবিধান প্রদত্ত তার ‘সকল ক্ষমতা’ প্রয়োগ করলে সেটা দেশে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই সহায়ক হবে। কিন্তু আমাকে আদালত অবমাননার পথিকৃত্ (Path finder) আখ্যা দিয়ে কেবল সাজার নজির সৃষ্টি করার জন্য সব ক্ষমতার এই প্রয়োগ নিশ্চিতভাবেই বাক, চিন্তা, বিবেক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
মধ্যযুগের ইউরোপে অসহায় মহিলাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা জায়েজ করার জন্য খ্রিস্টান পাদ্রীরা এভাবেই তাদের ডাইনি (witch) আখ্যা দিতেন। আমার পাঠকের উল্লেখযোগ্য অংশই জোয়ান অব আর্কের কাহিনী জানেন বলে ধারণা করছি। ব্রিটিশ দখলদার বাহিনী চার্চের সঙ্গে যোগসাজশে জোয়ান নামের ফ্রান্সের এক বীর, কৃষক-কন্যাকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল। জোয়ানের অপরাধ ছিল, সে যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। সকল ক্ষমতার প্রয়োগ প্রসঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। দুই হাজার টাকা জরিমানার স্থলে এক লাখ টাকা করার যুক্তিটা কী? জরিমানার অঙ্ক দশ লাখ কিংবা কোটি টাকা হতে বাধা কোথায় ছিল? অনাদায়ে মাত্র এক মাসের জেলই-বা কেন? এটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো না কেন? ছয় মাস কারাবাস, কোটি টাকা জরিমানা অনাদায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমন রায় হলেই তো সরকারপ্রধানের সন্তোষের মাত্রা বাড়ত। যে দেশে বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির প্রবাদ রয়েছে, সেই দেশে ভবিষ্যতে এ ধরনের রায় হলেই বরং মানানসই হবে।
ইংরেজিতে একটা বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে ‘Power corrupts, absolute power corrupts absolutely.’ (ক্ষমতা দুর্নীতি সৃষ্টি করে, অসীম ক্ষমতা চরম দুর্নীতির জন্ম দেয়।) সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদের ‘সকল ক্ষমতা’র বিধান সুপ্রিমকোর্টে এক প্রকার স্বৈরাচারী মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে কি-না, এমন সংশয় মন থেকে দূর করতে পারছি না। পঞ্চম এবং সপ্তম সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের আলোকে দেশে এখন সংবিধান সংশোধনের মরসুম চলছে। এমতাবস্থায় অনুচ্ছেদ ১০৮ নিয়েও আইন বিশেষজ্ঞদের বোধহয় চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। ১০৪ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ ছাড়া জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিমকোর্টের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা পূর্ণাঙ্গ হবে না। সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের (complete justice) তাগিদ দিয়ে সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তির হাজিরা কিংবা কোন দলিলপত্র উদ্ঘাটন বা দাখিল করিবার আদেশসহ আপীল বিভাগের নিকট বিচারাধীন যে কোন মামলা বা বিষয়ে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের জন্য যেরূপ প্রয়োজনীয় হইতে পারে, উক্ত বিভাগ সেই রূপ নির্দেশ, আদেশ, ডিক্রী বা রীট জারি করিতে পারিবেন।’ সংবিধানের ১০৮ এবং ১০৪ অনুচ্ছেদ একসঙ্গে বিবেচনা করলে এই ধারণা পোষণ করা অমূলক হবে না যে, সংবিধান প্রণেতাগণ ‘ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করার মহান লক্ষ্যেই সুপ্রিমকোর্টকে ‘সকল ক্ষমতা’ প্রদান করেছিলেন। সংবিধান প্রণয়নের চার দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর ন্যায়বিচার বাদ দিয়ে মাননীয় বিচারপতিদের মধ্যে শুধু ‘সকল ক্ষমতা’ প্রয়োগ করার দুর্ভাগ্যজনক মানসিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও স্বৈরাচার ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। কোনো দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রমনস্ক নাগরিক রাষ্ট্রের এমন অধঃপতন কামনা করতে পারেন না।
আজ খবর পেলাম বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ডিউক গত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এসেছে। সাইফুল ইসলাম ডিউক কেবল বুয়েট থেকে পাস করা একজন প্রকৌশলীই নন, তিনি চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর দুই নম্বর ব্যক্তিগত সচিবও (পিএস-২) ছিলেন। তাকে কাল সারারাত আমদানিতে নির্ঘুম রাত্রিযাপনে বাধ্য করে আজ সকালে দশ নম্বর সেলে পাঠানো হয়েছে। সাইফুল ইসলামের আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীরও একজন সাবেক কর্মকর্তা। বর্তমান সরকার যে কোনোরকম নিয়ম-নীতি অথবা সৌজন্যের ধার ধারে না, সেটি ডিউককে এক রাত আমদানিতে রাখার মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হলো। আমদানি ওয়ার্ড এক ভয়াবহ স্থান। সেখানে রাতে শোয়া তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াই কঠিন। প্রতি রাতে দুই-তিনশ’ নতুন সাধারণ বন্দিকে গাদাগাদি করে আমদানিতে রেখে পরবর্তী দিনে বিভিন্ন ওয়ার্ড কিংবা সেলে পাঠানো হয়।
এই বন্দি পাঠানো নিয়েও জেল প্রশাসনে বাণিজ্য ভালোই হয়। জেল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলে আমদানিতে না রেখে ডিউকের সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে রাতেই ১০ নম্বর সেলে পাঠাতে পারত। হয়রানি এবং অবমাননা করার হীন উদ্দেশ্যেই নৌবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার সঙ্গে অভব্য আচরণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে সাবেক সামরিক অফিসারদের যে হেনস্তা করা হচ্ছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। জনশ্রুতি রয়েছে, ২০০৮-এর নির্বাচনে বর্তমান মহাজোট সরকারকে ক্ষমতায় আনার জন্য সেনাবাহিনী যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। পরিণাম হয়েছে বিডিআর বর্বর হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তার করুণ মৃত্যু, তাদের পরিবারের লাঞ্ছনা, জেনারেলসহ কমিশন্ড অফিসারদের ধরে ধরে জেলে ঢুকিয়ে অবমাননাকর অবস্থায় আটক রাখা, তাদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, প্রায় শ’খানেক বিডিআর জওয়ানকে নির্যাতন করে হত্যা এবং বিডিআরের পোশাক ও নাম পরিবর্তন। এক কথায় বর্তমান সরকারের প্রায় দুই বছরের মধ্যেই বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে এদেশের সব ধরনের নিরাপত্তা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।
যাই হোক, ডিউককে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় সহায়তাদানের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমার ধারণা, এই গ্রেফতারের পেছনে সরকারের উচ্চ মহলের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। ওই মামলায় কোনোক্রমে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে জড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবেই ডিউককে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ, তারপর রিমান্ড এবং সর্বশেষে জেলে ঢোকানো হলো। সাত নম্বর সেলে বসেই বন্দিদের কাছ থেকে শুনলাম, ডিউককে এমন প্রস্তাবও নাকি দেয়া হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি হলেই তাকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। প্রশাসনের লোকজন মিডিয়ায় এর মধ্যেই জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে, সাইফুল ইসলাম নাকি ঘটনার সঙ্গে তার ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তবে এই দাবিকে সর্বৈব মিথ্যা বলে নাকচ করেছেন ডিউকের আইনজীবীরা। প্রশাসনের লোকজন যে ক্রমেই সরকারদলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করছে, তার প্রমাণ প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এবারের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে যে কোনো ভিন্নমত অবশিষ্ট রাখতে চান না, সেটাও এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়েছে। তার প্রতিহিংসার আগুনে প্রয়োজনমাফিক বাতাস দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশটিকে ক্রমেই পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করছে।
বেগম খালেদা জিয়ার পিএস-২ সাইফুল ইসলাম ডিউকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয়েছিল ২০০২ সালের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। অবশ্য তার ছোটভাই শাহরিন ইসলাম তুহিনকে আগে থেকেই চিনতাম। তরুণটি পেশায় প্রকৌশলী এবং জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (AEB) কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই সুবাদেই পরিচয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিএনপি যখন বিরোধী দলে, সেই সময় তুহিন আমার বেক্সিমকোর কর্মস্থলে নিয়মিত আসত। বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও ব্যবহারে অত্যন্ত ভদ্র তুহিনের সঙ্গে আমার ভালোই হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। ২০০২ সালে আমি এবং তুহিন যথাক্রমে অ্যাবের সভাপতি এবং মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলাম। এছাড়া তুহিন আমার এক পূর্বপরিচিত ডাক্তারের ভাগ্নীকে বিয়ে করার সূত্রে আমাকেও মামা বলে সম্বোধন করত। তুহিনের সঙ্গে সম্পর্ক খানিকটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেলেও ডিউকের ক্ষেত্রে সেটা কোনোদিনই সরকারি গণ্ডি পার হয়নি। চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজ-কর্মে ডিউককে যথেষ্ট প্রভাবশালী বিবেচনা করা হতো। বেশ কয়েকজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে জেনারেল মইনকে সেনাপ্রধান বানানোতে আরও অনেকের সঙ্গে ডিউকেরও ভূমিকা থাকার জনশ্রুতি রয়েছে। অবশ্য জেনারেল মইনের কোর্সমেট মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দর ডিউকের আপন মামা হওয়ার কারণেও এই গুজব ডানা মেলতে পারে। এদিকে সাঈদ এস্কান্দরের আপন ভায়রা লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারোর সময় সামরিক জান্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন। মইন-মাসুদ জুটির সরাসরি নির্দেশ ছাড়া তারেক রহমানকে সেনা হেফাজতে নির্যাতন করার বিষয়টিও মেনে নেয়া কঠিন। সেই লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এখনও বহাল তবিয়তে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এক-এগারোর প্রধান কুশীলবদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে একমাত্র লে. জে. মাসুদই মহাজোট আমলে তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন। একদিকে আত্মীয়তার জটিলতা এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটকৌশল মইন-ফখরুদ্দীন সরকারকে এমন রহস্যময়তায় আবৃত করেছে যে, সেই সময়ের প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে উইকিলিকসের মতো কোনো নাটকীয় তথ্য ফাঁসের প্রয়োজন। সেরকম কিছু না ঘটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া দেশবাসীর গত্যন্তর নেই।

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী

আজ ছাব্বিশ রোজা। সাপ্তাহিক দেখায় আমার দেশ পত্রিকার উপ-সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম এবং অ্যাডভোকেট সালেহ্উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে মাসুম উপস্থিত হলো। আমার গ্রেফতারের পর থেকেই মাসুম নামের ছাত্রদল করা ছেলেটি দিবা-রাত্র দৌড়ে বেড়াচ্ছে আমার অর্ধশত মামলার নানান তদবিরে। আজ মামলার আলোচনা দ্রুত শেষ করে আবদালের সঙ্গে পত্রিকা নিয়েই প্রধানত পরামর্শ করলাম। সুপ্রিমকোর্টে রায় আমাদের পক্ষে যাওয়ায় পত্রিকা প্রকাশে আইনগত কোনো সমস্যা না থাকলেও আমার দেশ নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েছে। সরকারি খাতের বিজ্ঞাপন তো আগে থেকেই সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। রাজরোষ প্রকাশ পেতেই বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতারাও অনেকটাই হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানেন, বিজ্ঞাপন ছাড়া পত্রিকা চালানো আর অক্সিজেন ছাড়া হিমালয় পর্বত চূড়ায় আরোহণের চেষ্টার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দেশের স্বার্থের কথা বলে যতই প্রাণপাত করা হোক না কেন, জনগণ স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে না উঠলে আদর্শ টিকিয়ে রাখতে কষ্টের আর কোনো সীমা থাকে না। পত্রিকার অন্য অংশীদাররা আমার হঠকারিতায় ভয়ানক বিরক্ত হলেও তারা লজ্জার খাতিরে মুখফুটে এখনও কিছু বলছেন না। তবে এ কথাটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে কোম্পানিকে নতুন করে কোনো ঋণ দেয়া সম্ভব নয়। তাদের বিচারবুদ্ধিকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। নিরেট নির্বোধরাই আদর্শকে ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরে স্থান দেয়। বৈষয়িক বুদ্ধিহীনতার মাপকাঠিতে বাংলাদেশে আমাকে হারায়, এমন সাধ্য কার? এদিকে এক সিরামিক কারখানা আর মাথা গোঁজার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়া আমার কিংবা পরিবারের আর কোনো সম্পদ নেই। ব্যাংকেও এমন অর্থ নেই যে কোম্পানিকে দিতে পারি। বেশ বিমর্ষচিত্তেই দেখার পালা সাঙ্গ করে নিজের সেলে ফিরলাম।
সারারাত আর ঘুম এলো না। সন্ধ্যায় রেডিওতে শোনা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের একটি বক্তব্যে মনের অস্থিরতা বেড়েছে। তিনি বললেন, আওয়ামী লীগ এখনও বাকশালের আদর্শে বিশ্বাস করে এবং এবারের মেয়াদে বাকশালেরই কয়েকটি নীতি সরকার বাস্তবায়ন করবে। গভীর রাতে দেশের সার্বিক অবস্থার সঙ্গে আমার দেশকে মিলিয়ে একটা মন্তব্য-প্রতিবেদন লেখার ইচ্ছে হলো। জানি বন্দি অবস্থায় এই লেখা ছাপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পরক্ষণেই ভাবলাম, এখন না হোক—কোনোদিন মুক্তি পেলে আমার দেশ সম্পাদকের জেল-জীবনের গল্পের অংশ তো অন্তত লেখাটি হতে পারে! রাত জেগে বাংলাদেশের আপাত নির্লিপ্ত জনগণের কাছে আমার দেশ-এর পক্ষে এক ধরনের আবেদনই জানিয়েছি।
‘সত্যের পক্ষে দাঁড়ান’
“যুগে যুগে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারী অপশক্তি সত্যের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এদেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মাত্র ছয় মাস স্থায়ী এই বীভত্স শাসনব্যবস্থার অধীনে দেশের অধিকাংশ সাধারণ নাগরিক তখন নিপীড়িত হয়েছে। কেবল ব্যক্তিপূজা ও সরকার তোষণের জন্য চারটি দৈনিক পত্রিকা চালু রেখে দেশের সব পত্রিকা সে সময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ফ্যাসিবাদী শাসনকালে জাসদের গণকণ্ঠ, মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ এবং এনায়েতুল্লাহ খানের হলিডে পত্রিকা অফিসে প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের পেটোয়া বাহিনী যৌথভাবে বারবার হামলা চালিয়েছে, ভাংচুর করেছে, এমনকি কর্মরত সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করেছে। কবি আল মাহমুদ, এনায়েতুল্লাহ খান, ইরফানুল বারী এবং আফতাব আহমেদের মতো বরেণ্য সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার করে বিনাবিচারে দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। আহমদ ছফার মতো ভিন্নমাত্রিক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করার জন্য দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য তার খোঁজে সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে জিপে করে ঢাকা চষে বেড়িয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এই শহরেই দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন আহমদ ছফা। একদলীয় অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলাই ছিল এদের সবার অপরাধ।
তারপর তিন যুগ পার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের বর্বরতা বদলায়নি। তবে তাদের কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। এখন একদলীয় বাকশালের বদলে নির্বাচিত স্বৈরাচারের জামানা। পিতার মতো একসঙ্গে সব পত্রিকা নিষিদ্ধ না করে কন্যা বেছে বেছে ভিন্নমতের সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দরজায় তালা লাগাচ্ছেন। শীতল যুদ্ধের অবসানে বাংলাদেশে এক সময়ের ‘সমাজতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ’ বর্তমানে পুঁজিবাদী ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। আগের সাম্রাজ্যবাদী শত্রু আজ বাঙালি ফ্যাসিবাদের পরম মিত্র। বাংলাদেশে তাদের সুশাসনের প্রয়োজন মিটে গেছে। তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিত্ব দমনের ছদ্মাবরণে সমাজে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোই ইঙ্গ-মার্কিন-ভারতের সমর্থনপুষ্ট সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। সেই এজেন্ডা বাস্তবায়িত হলেই বিদেশি প্রভুরা সন্তুষ্ট। দেশের সব স্বার্থ ইজারা দেয়া হয়েছে শক্তিধর প্রতিবেশীর পদতলে। যে কোনো মূল্যে ২০২১ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকাই ক্ষমতাসীনদের মূল লক্ষ্য। জড়বাদী সমাজে প্রতিবাদের কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অপরাধে রাত্রি দ্বিপ্রহরে শত শত দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে আমার দেশ বন্ধ করা হয়েছে। সম্পাদককে তার কার্যালয় থেকে ধরে নিয়ে রিমান্ড-নির্যাতন অন্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে পাঠিয়েছে গণতন্ত্রের লেবাসধারী স্বৈরাচারী সরকার। প্রশাসনিক এবং বিচারিক নির্যাতনের এক বিচিত্র যুগলবন্দি রচনা করা হয়েছে। আমার দেশ-এর তালা দু’মাস পরে অবশ্য খুলেছে। কিন্তু এই আপাত মুক্তি কি পত্রিকাটির বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়? আমার বিবেচনায় দেশের লড়াকু, দেশপ্রেমিক জনগণ প্রতিরোধের ঝাণ্ডা হাতে রাজপথে না নামলে তাদের পক্ষে কথা বলার মতো কোনো গণমাধ্যমই এদেশে বাঁচবে না।
বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিকের কাছে তাই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। আমার দেশ স্বাধীনতার কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে, জাতীয় স্বার্থের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফেরিওয়ালারা আমাদের মাতৃভূমিকে সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির কাছে ভেট দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে। ভীরু ও প্রতিবাদহীন সমাজে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের কাছে রাষ্ট্রের সামষ্টিক স্বার্থের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। দেশপ্রেমবিবর্জিত বলদর্পীরা আমার দেশ-এর মতো জাতিস্বার্থের পক্ষের গণমাধ্যমকে টুঁটি চেপে মেরে ফেলতে চায়। ঔপনিবেশিক ভাবধারায় নির্মিত রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের নির্মমতার শিকার হয়েও ফ্যাসিবাদের কাছে আমি মানসিকভাবে পরাজিত হইনি। নিজের পরিণতির পরোয়া আর করি না। তবে দেশের বড় দুঃসময়ে সত্য ও বিবেকের স্বাধীনতার যে কম্পমান শিখাটিকে ‘আমার দেশ’ ভয়াবহ প্রতিকূলতার মাঝে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে, তাকে নির্বাপিত হতে না দেয়ার আবেদন জানাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমনটি ঘটতে দিলে সত্যনিষ্ঠার আদর্শ পরাজিত হবে। বাংলাদেশের পক্ষের এই জোরালো কণ্ঠটি রুদ্ধ হলে জনগণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফ্যাসিবাদের ভ্রূকুটিকে পরোয়া না করে তাই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পালা আপনাদের।”
আমার আবেদনটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই জানলেও মনের কথাটি প্রকাশ করতে পেরেই এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম। সেই গভীর প্রশান্তিতেই ভোরবেলায় ঘুমিয়ে পড়ে একেবারে জোহরের আজানের শব্দে চোখ খুললাম।
সাত নম্বর সেলের হাজতিদের কয়েদিতে পরিণত হওয়ার পালা চলছে। তিন মাস আগে এই সেলে পা রাখার দিনে কয়েদি ছিল মাত্র দু’জন। মার্কিনি ফয়সাল এবং বাংলাদেশী ভাগ্নে মনির। বাকি এগারোজন বিচারাধীন হাজতি। গত মাসে কয়েদিতে পদোন্নতি আমাকে দিয়েই শুরু হয়। আজ কয়েদির সংখ্যা আরও একজন বেড়ে দাঁড়ালো চারে। মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিন কিছুক্ষণ আগে নিম্ন আদালত থেকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বোঝা নিয়ে কারাগারে ফিরলেন। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র বহন করার অভিযোগে মামলা চলছিল। জয়নাল ভাইয়ের ধারণা ছিল, দুর্বল চার্জশিট এবং উদ্ধারকৃত চাপাতি ও চাইনিজ কুড়ালের সঙ্গে তার কোনো সংস্রব না থাকায় তিনি ছাড়া পেয়ে যাবেন। আজ সকালে রায় আনতে যাওয়ার সময়ও তাকে বেশ আশাবাদী মনে হচ্ছিল। বিচারাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার আশঙ্কা ছিল, তিনি সাজা পাবেনই। ফয়সালকে বেশ ক’দিন আগে আমার আশঙ্কার কথাটা বলেওছিলাম। তবে জয়নাল ভাইকে কখনও হতাশ করতে মন চায়নি। কাল সন্ধ্যায় তিনি সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, তার বিরুদ্ধে চলমান দ্বিতীয় মামলাটি হাইকোর্টে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সংবাদটি দেয়ার সময় তার উজ্জ্বল চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি সহসাই মুক্তির আশা করছেন। আজ বিকেলে সাজা নিয়ে ফিরে এসে আমাদের দুঃসংবাদ শোনানোর সময় চেষ্টাকৃত উচ্ছ্বাস তার অন্তরের বেদনাকে অন্তত আমার কাছে ঢেকে রাখতে পারেননি। মাত্র ক’দিন আগেই অভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমি নিজেই হয়েছি। জয়নাল ভাইয়ের সাজার রায় শোনার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় তার স্ত্রী আজ আদালতে কেঁদে ফেলেছিলেন। সেই কারণে আমাদের সামনে স্ত্রীর প্রতি ছদ্ম ক্ষোভ প্রকাশ তার ভালোবাসা ও উদ্বেগকেই বরং ফুটিয়ে তুলছিল। তিনি আদালতে রোরুদ্যমান স্ত্রীকে বলে এসেছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামের পথে সংগ্রাম করলে জেল-জুলুম সহ্য করতেই হবে। কান্নাকাটি করলে আদালতে না থেকে তুমি বাড়ি ফিরে যাও।” এদিক দিয়ে আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা চলাকালীন মা এবং স্ত্রীকে সুপ্রিমকোর্টে আসতে নিষেধ করেছিলাম এবং তারা সেই অনুরোধ রক্ষাও করেছিলেন। যাই হোক, কালকের মধ্যেই হয়তো আমার মতো জয়নাল ভাইয়ের বুকেও কয়েদির নম্বর সেঁটে ছবি তুলতে জেল প্রশাসন অস্থির হয়ে উঠবে। অপমান হজম করে মুখে কৃত্রিম হাসি ধরে রেখে মুক্তিযুদ্ধের এই সেক্টর কমান্ডারকে সেই ছবি তুলতেও হবে। নিত্যদিনের অপমানের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার নামই জেল-জীবন। ভাগ্য সহায় হলে হাইকোর্টে আপিল চলাকালীন সময়ের জন্য জয়নাল ভাইয়ের জামিন জুটে যেতে পারে। অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস উত্সাহ দেখালে চেম্বারের পুলসেরাতে সেই জামিন আটকে দেয়াও কঠিন হবে না। সব মিলিয়ে তার মুক্তি যে অনেক দিন পিছিয়ে গেল, এতে আর কোনো সন্দেহ নেই। আসন্ন রাতের শেষ প্রহরে পাশের সেল থেকে ভেসে আসা মেজর (অব.) জয়নাল আবেদিনের কান্নাভেজা কণ্ঠের ফরিয়াদ অন্য রাতের চেয়ে সম্ভবত জোরে এবং দীর্ঘক্ষণ শুনতে পাব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে, তার পথই যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহতায়ালা এক সময় তার ডাকে অবশ্যই সাড়া দেবেন। তবে সেই সময় কবে আসবে, সেটাও তো আল্লাহই নির্ধারণ করবেন।
গতকাল যা ধারণা করেছিলাম, তা-ই ঘটলো। আমার গোসল তখনও শেষ হয়নি, এমন সময় দেখলাম জয়নাল ভাইয়ের সেলের সামনে জেলগেট থেকে কারারক্ষী এসে উপস্থিত। নতুন কয়েদি জয়নাল আবেদিনকে তখনই মহামহিম জেলার সাহেবকে দর্শন দিতে যেতে হবে। জেলের পরিভাষায় এই দর্শনের নাম ফাইল। সারারাত ইবাদত করে বেচারা ডাক আসার খানিকক্ষণ আগে মাত্র ঘুমিয়েছেন। উপায় নেই, জেলারের সমন বলে কথা! জয়নাল ভাই ফাইলের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফিরে এসে জানালেন, ছবি তোলার পালা সাঙ্গ হয়েছে। কয়েদির একটা নতুন কার্ডও তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আগেই বলেছি, নিম্ন আদালত মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেক্টর কমান্ডারকে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে। আদালতের নির্দেশানুযায়ী সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ মানুষটির জন্য সর্বনিম্ন শ্রেণীর শ্রমের যে ক্যাটাগরি জেল প্রশাসন নির্ধারণ করেছে, তার নাম ‘সেবক’। জেলে সেবকের কাজ হলো অন্যান্য কয়েদি, বিশেষ করে ডিভিশন কয়েদিদের ফাই-ফরমাস খাটা। বয়সের কারণে জয়নাল ভাইকে হয়তো সেবকের কাজ করতে হবে না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই জেল প্রশাসন একজন শিক্ষিত, সম্মানিত মানুষের উপযুক্ত কাজ যেমন, জেল গ্রন্থাগার দেখাশোনা করার দায়িত্ব প্রদান করতে পারতো। মনে হলো, সপাটে চড়টা আমার গালেই পড়লো। যত দ্রুত সম্ভব জয়নাল ভাইয়ের চোখের সামনে থেকে সরে গিয়ে আপন সেলের অন্ধকার গহ্বরে আশ্রয় নিলাম। এরই নাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা! ধিক, এই চেতনাধারীদের। এ দেশে ভণ্ডামির কি কোনো শেষ নেই? রাত পোহাবার কত দেরী, পাঞ্জেরী?

পিসি বাণিজ্যে বছরে কোটি কোটি টাকার ভাগাভাগি বর্তমান আমলে জেলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপ

সাত নম্বর সেলের তিন নম্বর ঘরের নাজিমউদ্দিন বাবু ওরফে হোন্ডা বাবু আজ সকালে জামিনে মুক্তি পেয়ে চলে গেল। গত ক’দিন ধরেই শুনছিলাম রোজার ঈদের আগেই জেল থেকে বার হওয়ার জন্যে প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ করছিল। আদালতে বাবুর এ বাবদ চুক্তি ছিল চার লাখ টাকার। অনেক ঢাকঢোল পেটানো বাংলাদেশের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার হালহকিকত অনুধাবনের জন্যে এই জামিন কৌশলটা জানা জরুরি। শুনেছি সন্ত্রাসীদের ‘খ্যাতি’ অনুযায়ী জামিনের চুক্তির টাকা নির্ধারণ করা হয়। যার ‘খ্যাতি’ যত বেশি, তার জামিনের মিটারও তত চড়া। চুক্তি হওয়া মাত্র ষাট থেকে সত্তর ভাগ টাকা দালালকে আগাম দিতে হয়, বাকিটা জামিনের আদেশ প্রদানের সপ্তাহখানেক আগে। এই অর্থের বণ্টননামা সম্পর্কে লিখলে আবার আদালত অবমাননা মামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই চেপে যাওয়াই উত্তম। জামিন হলেই অবশ্য মুক্তির নিশ্চয়তা নেই। জেলের দেয়াল টপকাতে আরও অন্তত দুই ধাপ পার হতে হবে। আদালত থেকে জামিন আদেশপ্রাপ্তির পর শুরু হয় জেল প্রশাসন এবং এখানে কর্মরত অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের সঙ্গে দাম-দস্তুর। হোন্ডা বাবুকে এই ধাপ পেরোনো বাবদ এক লাখ টাকা গুনতে হয়েছে। এরপর রয়েছে জেলগেটের বাইরে ক্রসফায়ার অথবা গুম-খুন ঠেকানোর মূল্য।
ধারণা করছি, সর্বশেষ ধাপেই সর্বোচ্চ লেনদেন হচ্ছে। জেলে এসেই এক ভবিষ্যত্ টপ-টেররের মুক্তির চিত্তাকর্ষক গল্প শুনেছিলাম। টপ-টেররের নাম এবং কোন আমলের গল্প, সেটা বোধগম্য কারণে উহ্য রাখলাম। খুন, অস্ত্র, মাদক এবং অপহরণের একাধিক মামলার আসামি হয়ে এরই মধ্যে বেশ নাম-ডাক করে ফেলেছে তরুণটি। রাজনৈতিক সংযোগের গুণে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা সন্ত্রাসীটির মুক্তির পর তাকে ক্ষমতাবান লোকজন রীতিমত ভিআইপি প্রটোকল সহকারে পাহারা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। এমন রাজকীয় আয়োজনের জন্যে অর্থের ব্যবস্থাও করতে হয় মানানসই। যাই হোক, সকাল বেলাতেই বাবু হাসিমুখে এসে দোয়া চাইল। গত তিন মাসে ছেলেটি আমার সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিয়েছে। জেলের প্রথম কয়েকদিনের বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় সিনিয়র এবং জুনিয়র দুই বাবুই আমার সহায় ছিল। গাঁটের পয়সা খরচ করে আমাকে খাইয়েছে, কাপড়-জামা জোর করে ধুয়ে দিয়েছে, গোসলের পানি তুলে দিয়েছে এবং জেল সম্পর্কে তাবত্ ধারণা দিয়েছে। রোজার মধ্যে প্রতি সন্ধ্যায় বাদ ইফতার ওদের সেল থেকে চা তৈরি করে কারারক্ষীর মাধ্যমে পাঠিয়েছে। সিনিয়র বাবু মাস দুয়েক আগে মুক্তি পেয়েছে। দোয়া করি পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো থাকুক। জুনিয়র বাবু আজ মুক্তি পেল। জেল থেকে বার হওয়ার সব বন্দোবস্ত যে হয়েছে, সেটা ওর কাছ থেকেই শুনেছি। ক্রসফায়ার থেকে বাঁচবে কি-না, সে সম্পর্কে অবশ্য আগাম মন্তব্য সম্ভব নয়। তবে সন্ত্রাস ত্যাগ করে সুস্থ জীবনে ফিরতে পারলে সমাজের জন্য মঙ্গল হবে। বিদায়ের সময় সেই কথাটি একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দিলাম।
জেলে একশ’ দিন আজ অতিক্রান্ত হলো। গতকাল আদালতে হাজিরা শেষে সেলে ফেরার সময় নতুন একটা ব্যাপার আবিষ্কার করে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। ঢাকা জেলের সেলগুলো সব আলাদা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। দেয়ালঘেরা সেলের আঙিনায় প্রবেশ করতে হলে একটি অতিরিক্ত ফাটক পার হতে হয়। অধিকাংশ সময় ফাটকটি খোলা থাকলেও মাঝে-মধ্যে কোনো অতিউত্সাহী কারারক্ষী সেটি বন্ধ করে সামনে বসেও থাকে। অনেকটা জেলের মধ্যে জেল আর কি! কাল হঠাত্ চোখে পড়লো দেয়ালের গায়ে লেখা, বকুল। তখনই প্রথম জানলাম সাত নম্বর সেলের একটা চমত্কার পোশাকি নাম রয়েছে। বকুল আমার প্রিয় ফুলের মধ্যে একটি। এই ফুলটি কুলীন শ্রেণীভুক্ত নয় বিধায় অনেককেই অবহেলা করতে দেখেছি। বকুল ফুলের সঙ্গে আমার বাল্য ও কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পাঠক আবার কোনো রোম্যানটিক গল্প শোনার আশায় নড়ে-চড়ে বসবেন না। পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়া স্কুল, যেখান থেকে আমি ১৯৬৯ সালে এসএসসি পাস করেছি, সেই স্কুলে এক প্রকাণ্ড বকুল গাছ ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সেই গাছতলায় কবর সদৃশ বাঁধানো একটা স্থাপনাও ছিল। স্কুলের ছেলেরা সচরাচর ভয়ে ওই গাছের কাছে যেতে চাইত না। আমি কিন্তু প্রায়ই গাছের নিচ থেকে ফুল কুড়িয়ে আনতাম। এতদিনে সেই গাছ নিশ্চয়ই নতুন ইমারত গড়ার প্রয়োজনে কাটা পড়েছে। বকুলের সঙ্গে নিষ্পাপ বালকের সেই যে ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল, তার ছেদ পড়েনি কখনও।
বকুলের আরেকটা গল্প বলি। সাভারে আমার মায়ের একটা বাড়ি ছিল। পারভীন বাড়িটার নাম রেখেছিল ‘অনঘমহী’ অর্থাত্ দুঃখহীন পৃথিবী। আমার দেশ এবং আর্টিসান সিরামিকে অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় গ্রেফতারের কিছুদিন আগে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাড়িটা বিক্রি করতে হয়েছে। আমার এই সিদ্ধান্তে মা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। রাগ করে সপ্তাহ দুয়েক আমার আর পারভীনের সঙ্গে কথা বলেননি। নিজের ঘরে বসে বসে কেঁদেছেন। পারভীনের কষ্টও মায়ের চেয়ে কিছু কম ছিল না। বাড়ির নামটাও যে পারভীনেরই দেয়া। জেলে এসে কখনও কখনও মনে হয় টাকার জন্যে দুঃখহীন পৃথিবী ছেড়ে দেয়াতেই বোধহয় আমাদের অতি ক্ষুদ্র এই নিজস্ব পৃথিবীতে এত দুঃখ প্রবেশ করেছে। যাই হোক, মায়ের ওই বাড়িতেও একটা বকুল গাছ লাগানো হয়েছিল। এই ক’বছরে গাছটা বেশ বড় হয়েছে, ক’দিন বাদেই বোধহয় ফুল দিত। সেই ফুল দেখা হবে না কোনোদিন। বুড়ো হচ্ছি তো! একটুতেই মন খারাপ হয়ে যায়। আমাদের বকুল সেলের আঙিনাতেও একটা বকুল গাছ লাগানো হয়েছে। বেশ ঝাঁকড়া হয়ে বাড়ছে, যদিও ফুল দিতে অন্তত আরও পাঁচ-ছয় বছর লাগবে।
অনেক নস্টালজিয়া হলো। এবার কঠিন বর্তমানে ফেরা যাক। ভাবছি, একশ’ দিনের সালতামামি কী দেব পাঠকদের। নিজের সম্পর্কে তো অনেক কথা বললাম। হয়তো খানিক অতিরিক্তই বলে ফেলেছি। এবার জেলের অন্যান্য বাসিন্দা, বিশেষ করে সাধারণ বন্দিদের জীবনধারা সম্পর্কে কিছু না লিখলে একটা অপরাধবোধ থেকে যাবে। তাদের সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পেরেছি এমন দাবি করবো না। আমি তো সেল থেকে বার হই না বললেই চলে। তাদের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, সেটা এই সেলেরই অন্য বন্দিদের মারফত। সেকথা বলার আগে এখানে আমার জীবন ধারণের এ যাবত্ আঁকা ছবিতে সামান্য সংযোজন প্রয়োজন। পরিচিতজনরা তো জানেনই, আমার লেখালেখির চার বছরে পাঠকরাও জেনে গেছেন আমি নিতান্তই এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছেলেবেলায় বাড়িতে দামি আসবাবপত্র দেখিনি। তবে যেগুলো ছিল, সেগুলোকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখেছি, বিছানার কমদামি চাদরটা টানটান করে পাতা, বসার ঘরে নানার ইজিচেয়ারের চওড়া হাতলে ধুলো নেই, ঘরের পর্দায় ময়লা হাতের ছাপ নেই। নানী প্রচণ্ড পান খেতেন, অথচ বাসার কোনো জায়গা পানের পিকে রাঙানো নেই। মা এবং পারভীনের মধ্যে শুচি বাইয়ের প্রতিযোগিতা রয়েছে। কাজেই বাড়িঘর এখনও পরিষ্কার, আমার বাতিক আবার পরিষ্কার টয়লেটের। জেলজীবনে আমার প্রবল কষ্টের কারণ হয়েছে এখানকার অপরিচ্ছন্নতা। দশ বাই সাত সেলের মধ্যকার টয়লেটের কাছে দাঁড়িয়ে থালা-বাসন ধুয়ে সেই বাসনে খেতে হবে মনে করলেই খিদে চলে যায়। প্রথম দিকে কত রাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। এখন অবশ্য ক্রমেই অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ মানুষকে অনাহারে বেঁচে থাকার কোনো উপায় করে দেননি। কিছুটা পুরনো কথা আবারও বললাম কারণ অন্য বন্দিরা বলে, ঢাকা জেলে সাধারণ বন্দিদের যতগুলো সেল আছে, তার মধ্যে সাত নম্বর সেলটাই নাকি সবচাইতে ভালো। এমন ওয়ার্ডও এখানে আছে, যেখানে অনেক কষ্টে কাত হয়ে শুতে হয় এবং একবার গাদাগাদি করে শুলে নড়াচড়ার কোনো উপায় থাকে না। দুই-তিনশ’ বন্দির সেসব ওয়ার্ডে দুটো মাত্র টয়লেট থাকে, যার ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দেয়া আমার সাধ্যাতীত। সেসব ওয়ার্ডের সামনের আঙিনায় শত শত বন্দির মুখনিঃসৃত এতই কফ-থুথু পড়ে থাকে যে, সেখানে জুতা পরে হাঁটতেও অস্বস্তি হয়। ‘খাতা’ নামক ওয়ার্ডের এই বন্দিরা দিনের পর দিন পানির অভাবে থাকে। একজন গোসল করলে অপরজন একেবারে তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায় যাতে ছিটে আসা পানিটা অন্তত সে ব্যবহার করতে পারে। ফলে সাধারণ বন্দিদের মধ্যে চর্মরোগ, পেটের পীড়ায় ভুগছে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। জেলখানায় চিকিত্সার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। জেল ডাক্তারের কাছে যেতে হলেও ঘাটে ঘাটে কড়ি ফেলতে হবে। মৃত্যুর আগে বাইরের হাসপাতালে যাওয়ার কথা এসব অসহায় মানুষ নামের প্রাণীগুলো কল্পনাও করতে পারে না। কোনো বন্দি জেলের ভেতরেই প্রাণ ত্যাগ করলে তার নিষ্প্রাণ দেহটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয় বিনা চিকিত্সায় মারা যাওয়ার দায়-দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। শতকরা সত্তর জন পুষ্টিহীনতার শিকার কারণ সরকারি বরাদ্দে যে আহার্য জোটে, তা দিয়ে প্রাণ ধারণ যে হয় সেটাই বিস্ময়কর। পিসি থেকে নগদ টাকার বিনিময়ে খাদ্য কেনার ব্যবস্থা আছে বটে, তবে সেখানকার দুর্নীতির গল্প বন্দিদের মুখে মুখে। সবকিছু অগ্নিমূল্য। বাজারের সঙ্গে দামের পার্থক্য ২০ থেকে ৩০ ভাগ। তার ওপর ৮০০ গ্রাম কিনে ১ কেজির দাম দিতে হয়। পিসি থেকে কিনে খেতে পারে এমন সাধারণ বন্দির সংখ্যা অবশ্য হাতে গোনা। পিসি বাণিজ্য থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা ভাগাভাগি হচ্ছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত। দুর্নীতির এমন মচ্ছব দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়। জেলখানার পুরনো বাসিন্দাদের কাছ থেকে শুনেছি, দুর্নীতি সব সরকারের আমলেই ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে সেটি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। লোকে তামাশা করে বলে, দুই গঞ্জ মিলে নাকি জেলখানা চালাচ্ছে। গঞ্জ দুটো হলো যথাক্রমে গোপালগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ। কেবল জেলই বা বলি কেন, পুরো বাংলাদেশটাই তো কিশোর এবং গোপালের হাতে।

দরিদ্র বন্দিদের অনেকেই জানে না তাদের অসহায় স্ত্রী পুত্র কন্যা আদৌ বেঁচে আছে কিনা

জেলখানার আমবন্দিদের দুঃখ-কষ্টের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। পিসি’র দুর্নীতির কথা তো বললামই। যদিও অধিকাংশ হাজতি কিংবা কয়েদির সেখান থেকে কেনাকাটা করার সামর্থ্য নেই। কালেভদ্রে বাড়ি থেকে ফলমুল কিংবা অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী এলে সেগুলোও যে ক’দিন রেখে খাবে, তারও উপায় নেই। কারারক্ষী মিঞা সাহেবরা এবং নেতা কিসিমের কয়েদিদের ভাগ দেয়ার পর সেই খাবারের সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। অবশ্য কারারক্ষীরাও দরিদ্র পরিবার থেকেই এসেছে। রোজার মাসেই সাত নম্বর সেলে এক সকালে এক কারারক্ষীর নাস্তা খাওয়ার দৃশ্যে মনটা এতটাই বিষণ্ন হলো যে, সারাদিন ধরে আর মনের ভার কাটাতে পারলাম না। নাস্তার মেন্যু হলো জেলখানার ধুলোমাখা, আধপোড়া রুটি আর দুটো কাঁচা লঙ্কা। সেই লঙ্কাও আমার লাগোয়া সেলের কয়েদির কাছ থেকে বেচারা চেয়ে নিয়েছে।
জেলে এসে এক ধরনের অক্ষম ক্রোধে আক্রান্ত হয়ে আমি নিজেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে অপ্রয়োজনীয় কৃচ্ছ্রতা পালন করছি। আমার ভাঁড়ারেও সচরাচর তেমন কিছু থাকে না। সেলের চারদিকে খুঁজে-পেতে দুটো কলা পেয়ে কারারক্ষীটির হাতে দিতেই এমন লাজুক হাসি দিয়ে সে দুটো নিল যে, চোখে পানি এসে যাওয়ার জোগাড়। এরাই তো বাংলাদেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। খবর নিলে জানা যেত, কারারক্ষীর সামান্য বেতনের চাকরি জোটাতে দরিদ্র পরিবারের দেড়-দুই লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সুদিনের আশায় বাবা-মা হয়তো শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে ছেলেকে চাকরি করতে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের এই অসহায় জনগোষ্ঠীর ঘাড়ে পাড়া দিয়েই ক্ষমতাবানরা টাকার পাহাড় গড়ে চলেছে। সেই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে জেল প্রশাসনের একশ্রেণীর হর্তা-কর্তারাও যার যার ভাগ্য ফিরিয়ে নিচ্ছে।
সত্য-মিথ্যা জানি না, ঢাকা জেলের অধিকাংশ বন্দিই বিশ্বাস করে যে এই জেলের বর্তমান শীর্ষ প্রশাসনের সঙ্গে বৃহত্তর রাজপরিবারের এক প্রভাবশালী সদস্যের বেজায় খাতির। তাদের মধ্যে মাসিক লেনদেনের যে খামটা যাতায়াত করে, সেটাও নাকি যথেষ্ট স্ফীত। ২০০৭ সালে কারেন্ট জাল পেতে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলের ঘোষণা দেয়া গুরুতর অপরাধ দমন কমিটি এবং দুদকের সব বাহাদুররা কোথায় যেসব পালালো, বিমূঢ় আমজনতার আজ সেটাই জিজ্ঞাসা। মইন-মাসুদ-মশহুদ গংদের তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক’দিনের জন্যে ঘি-মাখন খাইয়ে কাজ ফুরাতেই কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছে। ভারতকে বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় পঞ্চাশ কোটি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক পরাশক্তির কাছে ইজারা দেয়া প্রয়োজন ছিল। সেই উদ্দেশ্য সাধনে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো সেনাবাহিনী দিয়ে জাতীয়তাবাদকে খণ্ড-বিখণ্ড করে সেক্যুলারদের ক্ষমতা গ্রহণ নিশ্চিত করার দেশি-বিদেশি প্রকল্প শতভাগ সফল হয়েছে। পরের ইতিহাস দেশবাসী দেখতেই পেয়েছেন। দেশে পরিবর্তন বলতে দুর্নীতির অঙ্কে বিশালতা এসেছে এবং গণতন্ত্রের লেবাসে ১৯৭৫ সালের মতো এক পরিবারের শাসন কায়েম হয়েছে। আমার জেলের গল্পের গরু রাগে-দুঃখে গাছে চড়ার উপক্রম করেছে। মগডালে চড়ার আগে বরং সেটিকে মাটিতে নামিয়ে ফেলা যাক।
তত্ত্বগতভাবে যে কোনো কারাগারই অপরাধীর সংশোধনের স্থান হওয়া উচিত। এ ধরনের বক্তব্য সংবলিত একাধিক স্লোগান ঢাকা এবং গোপালগঞ্জ জেলের দেয়ালে উত্কীর্ণও দেখতে পেয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশের জেলে যে পরিবেশ বিরাজ করছে, তাতে নিরপরাধ লোক এসে অপরাধীতে এবং ছোট অপরাধীর পেশাদার সন্ত্রাসীতে রূপান্তর ঘটারই অধিক সম্ভাবনা। এই বাস্তবতা কেবল বন্দিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, কারারক্ষীরাও একই পরিস্থিতির শিকার। যে দরিদ্র পরিবারের সন্তানটি শেষ সম্বল বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঘুষ দিয়ে কারারক্ষীর চাকরি জোগাড় করেছে, তার প্রথম লক্ষ্য থাকে কত তাড়াতাড়ি ঘুষের টাকাটি তুলে নেয়া যায়। এখানে ক’দিন চাকরি করলেই মায়া, মমতা, মানবতা—এসব কর্পূরের মতো উধাও হয়। সরকারি যত্সামান্য বেতনে সংসারের চাহিদা মেটে না। এমতাবস্থায়, দরিদ্র সেই কারারক্ষীর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তারই শ্রেণীভুক্ত জেলবন্দিদের দোহন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাই রাতে কারাগারে একটুখানি শান্তিতে ঘুমানোর জায়গা পেতে অর্থ লাগে, অসহায় আত্মীয়-স্বজন জেলগেটে দেখা করতে এলে ঘুষ দিতে হয়, এমনকি বাড়ি থেকে খাবার-দাবার এলে তার ভাগ না দিয়ে ওয়ার্ডে আনার কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণ বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করার যে ব্যবস্থা জেল কর্তৃপক্ষ করেছে, সেটি দেখলে সামান্য মানবতাবোধসম্পন্ন ব্যক্তির মনেও নিদারুণ আঘাত লাগা উচিত ছিল। অথচ, নির্বিকার জেল কর্মকর্তাদের চোখের সামনে দিনের পর দিন একই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে। হয়তো এসব শিক্ষিত তরুণরাও জেলখানায় কিছুদিন চাকরি করলেই সব অনুভূতি মরে গিয়ে তারাও যন্ত্রের মতো হয়ে ওঠে। দেখার সেই দৃশ্য সঠিকভাবে বর্ণনা করা আমার সাধ্যাতীত, তারপরও জেল না দেখা পাঠকদের কিছুটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।
জেলগেটের কাছে দোতলা একটা ইমারতের উভয় তলায় আমবন্দিদের দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পঞ্চাশ-ষাট ফুট দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট দেয়ালে অল্প ব্যবধানে গোটা বিশেক খোপ। এপাশে শ’খানেক বন্দি এবং কাচ ও লোহার খাঁচা দিয়ে পৃথক করা খোপের ওপারে কয়েকশ’ আত্মীয়-স্বজন। একে অপরের মুখ দেখা প্রায় অসাধ্য। প্রত্যেকেই একসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে আপনজনকে চিনে নেয়ার চেষ্টার ফলে সেখানে যে সম্মিলিত ধ্বনির সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে কে যে কার কথা শুনতে পায় সেটি তারাই জানে। একজন জননী ওপার থেকে তার বন্দি ছেলেকে যখন ডাকে, তখন এপার থেকে কয়েক ডজন ছেলে সাড়া দেয়। গ্রাম থেকে সদ্য শহরে আসা দিশেহারা মা ভিড়ের মধ্যে তার ছেলেকে একটু ভালো করে দেখার জন্যে ঠেলাঠেলি করে খোপের কাছে এগোতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। কখনও পারে, কখনও বা কনুইয়ের ধাক্কায় সিমেন্টের শক্ত মেঝেতে পড়ে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সেই ভূতলশায়িনী মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে কেউ টেনে তোলার চেষ্টা করে না। উদ্বেগ সইতে না পেরে দু-চারজন ব্যাকুল বন্দি এপারে শিক বেয়ে দেয়ালের ওপরে উঠে শাখামৃগের মতো ঝুলে থেকে আপন স্ত্রী কিংবা সন্তানকে একনজর দেখার চেষ্টাটাও করে। এরই মধ্যে দু’দিকেই ধাক্কাধাক্কি, মারামারি চলছেই। এই বিচিত্র দেখার বরাদ্দ সময় সাকুল্যে কুড়ি মিনিট। প্রথম দিন এই দৃশ্য অবলোকন করে আমার অন্তত মনে হয়েছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিরা চিড়িয়াখানার বোবা জানোয়ারের চেয়েও অসহায়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পেশাদার রাজনীতিবিদেরই জেলখাটার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখানে বন্দি থাকা অবস্থায় প্রতিবারই তারা কারা সংস্কারের বেশুমার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু মসনদে বসলেই প্রতিশ্রুতি পালন শিকেয় তুলে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন এবং নিজের আখের গোছানোর ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ কাজে। ক্ষমতার চাকচিক্য এমনই ভুলিয়ে রাখে যে, আবার পালাবদলের আশঙ্কা তাদের মনে উঁকি দেয়ারও সুযোগ পায় না। এই হতাশার মধ্যেও সম্ভবত ২০০৬ সালের মাঝামাঝি কারা সংস্কারের একটা পরিকল্পনা তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার হাতে নিয়েছিল। সেই পরিকল্পনার আলোকে সে সময়ের আইজি ব্রিগেডিয়ার জাকির হাসান নাকি বন্দিদের দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট লাঘবের লক্ষ্যে বেশকিছু সংস্কারের কাজ সফলভাবে সম্পন্নও করেছিলেন। তার সময়ে জেলে দুর্নীতিও যথেষ্ট কমেছিল। এসব প্রশস্তি পুরনো বন্দি এবং কারারক্ষীদের কাছ থেকেই আমার শোনা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্রিগেডিয়ার জাকিরের চাকরি তো গেছেই, সেইসঙ্গে উপরি হিসেবে তার বিরুদ্ধে নানারকম হয়রানিমূলক তদন্ত চলছে। সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তার অপরাধ হচ্ছে, তিনি নাকি যথেষ্ট পরিমাণে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ নন। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে এক তরুণ কারারক্ষীর গভীর চিন্তাশীল মন্তব্যে চমকিত হয়েছি। তার কথা হচ্ছে, পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রে একজন নাগরিক ভালো কাজ করলে দলমতনির্বিশেষে তার প্রশংসা করা হয়। তিনি সেখানে কাজের স্বীকৃতি পান। অথচ আমাদের দেশে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা ভালো কাজেরও দল খোঁজেন কেন? এই হীন মানসিকতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়ন কীভাবে হবে? স্বল্প শিক্ষিত অথচ সচেতন তরুণটির অর্থবহ প্রশ্নের জবাব দিতে আমি ব্যর্থ হয়েছি। চিন্তাশীল পাঠক জবাব খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বিপুলসংখ্যক নাগরিক কোনো অপরাধ না করেই হয় পরিস্থিতির শিকার কিংবা শত্রুপক্ষ অথবা রাষ্ট্রের বানোয়াট মামলায় অভিযুক্ত হয়ে অন্যায়ভাবে বন্দি রয়েছেন। এই শ্রেণীর মধ্যে যাদের অর্থসম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তি রয়েছে, পরিণতি যা-ই হোক, তারা অন্তত আইনি লড়াই চালাতে পারছেন। কিন্তু যারা দরিদ্র ও অসহায়, তাদের হেনস্তার কোনো শেষ নেই। বছরের পর বছর বিনাবিচারে জেলে পচে এরা তো মানবেতর জীবনযাপন করছেনই, সেই সঙ্গে তাদের পুরো পরিবারও ধংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। এমন বন্দির সঙ্গেও দেখা হয়েছে যে জানে না তার অসহায় স্ত্রী, পুত্র-কন্যা আদৌ বেঁচে আছে কি-না। জেলে মাঝে-মধ্যে একশ্রেণীর এনজিও’র লোকজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখি। এদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই জানি না। হয়তো বিদেশ থেকে টাকা-পয়সা অনুদান পেয়ে লোক-দেখানো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ডোনারের দেশের করদাতাদের ডলার, পাউন্ড, ইউরো পেয়ে এদেশের সুশীল (?) সমাজের পকেট স্ফীত হলেও সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী সেই তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে। ‘লিগ্যাল এইড’ নামের বিদেশি সহায়তায় এক সরকারি প্রকল্পের কথাও বিভিন্ন সময়ে শুনেছি। এরা কাদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে, সেটাও এক আল্লাহ আলেমুল গায়েবই জানেন। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির চার দশক মহা আড়ম্বরে উদযাপিত হলেও সমাজের কোথাও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জনগণ ভারবাহী প্রাণীর মতো সব অন্যায়-অত্যাচার বলতে গেলে মুখ বুজেই সহ্য করে চলেছে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা ডিজিটাল, দিনবদল, ২০২১ সালের ভিশন ইত্যাকার চটকদার স্লোগান দিয়ে ভাবছেন, তারা নিরাপদেই থাকবেন। সম্ভবত তারা ভুলে গেছেন যে, মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র এই ভূখণ্ডটি ষোল কোটি মানুষের ঘরবসতি। এই বিপুল জনগোষ্ঠী অনন্তকাল ধরে যাবতীয় বঞ্চনা সহ্য করে কেবল মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে সম্পদের পাহাড় গড়ার সুযোগ অব্যাহতভাবে দিয়ে যাবে—এটা হতে পারে না। বাংলাদেশে অবশ্যম্ভাবী গণবিস্ফোরণের জন্য আমি অন্তত প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করে আছি। সেরকমটি ঘটলে আজকের ক্ষমতাবানরা পালানোর পথ পাবেন না।

(চলবে)

update-manager -d
Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“জেল থেকে জেলে : মাহমুদুর রহমানের কলাম” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. মারদিয়া মমতাজ বলেছেন:

    বইমেলায় না পেয়ে বাংলাবাজার থেকে আব্বু যখন ‘১/১১ থেকে ডিজিটাল’ আর ‘নবরূপে বাকশাল’ বইদুটা আনলেন, মাহমুদুর রহমান তখন জেলে! এর আ