স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তারিখে যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে সকল গণমাধ্যমকর্মীকে বিতারিত করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে দূর্ভেদ্য কালো দেয়াল তুলে দিয়ে অতর্কিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিপাগল হাজার হাজার নিরীহ বাঙ্গালীর উপর “অপারেশন সার্চলাইট” নামে হত্যার মিশনে ঝাপিয়ে পড়ে, যখন পাকিস্তানী সেনাদের নির্বিচার গণহত্যা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ আত্মগোপনে, যখন সাত কোটি বাঙ্গালীর স্বাধীনতার স্বপ্নের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী সেনাদের হাতে স্বেচ্ছাবন্দী, যখন শেখ মুজিব সম্পর্কে পুরো বিশ্ববাসী অন্ধকারে, তিনি পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছেন কিংবা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিভিন্ন গুজবে মুখরিত শব্দ তরঙ্গ, যখন পাকিস্তানী হায়েনাদের বর্বরতায় দিগ্বিদিগ জ্ঞানশূন্য কোটি জনতা দিশেহারা, ঠিক তখন অজ্ঞাত এক রেডিও থেকে ভেসে আসে অসহায় নিরস্ত্র নির্যাতিত বাঙ্গালীর মুক্তির বারতা,

“I Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh. I also declare, we have already framed a sovereign, legal government under Sheikh Mujibur Rahman, which pledges to function as per law and the Constitution. The new democratic government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all governments to mobilise public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh. The government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nations of the world.”

জিয়াউর রহমান শুধু নিজেকে বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার দুঃসাহসিক কাজটি করেন নি বরং একই সাথে শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামে মুক্ত-স্বাধীনভাবেই বিদ্রোহীদের সাথে আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছেন বলেও গণমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতারকৃত শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত-স্বাধীন হিসেবে পাকিস্তানে আত্মগোপনের গুজব প্রচারণাটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যে মুক্তিপাগল জনতা শেখ মুজিবের নিহত কিংবা আহত হওয়ার কিংবা গ্রেফতার হওয়ার সংবাদে বিভ্রান্ত হয়ে মুষড়ে পড়েছিল, তারাই জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় মুহুর্তেই দেহে প্রাণ ফিরে পান। প্রকৃতপক্ষে ২৫ মার্চের গণহত্যার সংবাদ বিশ্ব মিডিয়ায় সরবরাহের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে কোন সাংবাদিককে থাকার অনুমোদন না থাকায় সংবাদ কর্মীরা খবর সংগ্রহের জন্য সীমান্তবর্তী ভারতীয় বিভিন্ন শহরে অবস্থান নিয়েছিলেন। আর তাদের সংবাদ সংগ্রহের প্রধান সোর্স ছিল ভারতীয় সংবাদ সংস্থা। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা শেখ মুজিবের চট্টগ্রামে আত্মগোপনে থাকার গুজবটিকে বিশ্বে গুরুত্বের সাথে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়। এপি, ইউএআই, নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কিছু সোর্স থেকে পশ্চিমা গণমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রকাশিত হয়। আর বিশ্ববাসী ২৮ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটিকেই শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা হিসেবে প্রচার করতে থাকে।

২৬-২৭ তারিখে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত সংবাদে মনে হতে পারে যে শেখ মুজিবুর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি ভারতীয় সংবাদ সংস্থার বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু কখনোই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, বরং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তানীদের ‘অপারেশনের সার্চলাইট” সম্পর্কে অবহিত হয়ে দলীয় নেতাকমী ও পরিবারের লোকদের আত্মগোপনে পাঠিয়ে মধ্যরাতে তার গুছিয়ে রাখা হোল্ড-অলটি নিয়ে সস্ত্রীক তার বাসভবনে পাকবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেন। পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার তার এ প্রচেষ্টার সমর্থন পাওয়া যায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যাফেয়ার্স-এ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানী জান্তাদের চাপিয়ে দেয়া অনৈতিক বর্বর যুদ্ধ সম্পর্কে বক্তব্যে বলেন,

“There is no other crime which these people have committed because the cry for Independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so
far as I know, has not asked for Independence, even now But after he was arrested,
after there was this tremendous massacre, it was only perhaps understandable that the rest of the people said, Well, after this how can we live together? We have to separate”

এখানে স্পষ্ট যে শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নি এমনকি তিনি স্বাধীনতা চাননি বরং ২৫ মার্চ তারিখে পাকিস্তানী হায়েনাদের বর্বরতায় ক্ষুব্ধ পূর্বপাকিস্তানের জনগণই বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা করে। বরং পাকিস্তানী সামরিক জান্তাদের নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বশেষ রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিল হরতাল। ২৬ মার্চ শনিবার ১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় শেখ মুজিবের যে বিবৃতি প্রচারিত হয় তাতে তিনি ২৭ মার্চ দেশব্যাটী সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেন।

২৭ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাত্মক হরতাল
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যাপক গণহত্যার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (রবিবার) সমগ্র বাংলাদেশে হরতাল পালনের আহ্বান জানাইয়াছেন। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ঢাকায় প্রদত্ত এক প্রেস বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, নিরস্ত্র জনগণকে এইভাবে অবাধে গুলি করিয়া হত্যা ও তাহাদের উপর নৃশংস নির্যাতন চালাইতে দেওয়া যাইবে না। সৈয়দপুর, রংপুর, জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণের নিন্দা করিয়া বেসামরিক জনগণের উপর গুলিবর্ষণ ও নৃশংস নির্যাতন চালান হইতেছে বলিয়া খবর পাওয়া গিয়াছে। পুলিশের ভূমিকাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হইতেছে এবং সেনাবাহিনী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিয়াছে। এমন এক সময় এই নৃশংস ঘটনা ঘটিতেছে যখন প্রচণ্ড রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের ঘোষিত উদ্দেশ্য লইয়া প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সেনাপতিদ্বয় ঢাকায় অবস্থান করিতেছেন। আওয়ামী লীগ প্রধান অবিলম্বে সকল সামরিক তত্পরতা, হত্যা, নৃশংসতা বন্ধের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের নির্ভীক জনগণ মুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে প্রস্তুত। (দৈনিক ইত্তেফাক )

কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা এমন সাধারণ ঘোষণার মতো নয় যে একটি চোঙ্গা মুখে লাগিয়ে যে কেউ চিৎকার করে গেলেই তা স্বীকৃতি পাবে। বরং স্বাধীনতার ঘোষণা অত্যন্ত ব্যাপক একটি বিষয়। হ্যা, দেশ তখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর ছিল, এবং একটি মাত্র শব্দ শোনার জন্য উদগ্রীব ছিল সমগ্র বাংলা দেশ। কিন্তু এমন ঘোষণাটি যে কারো মুখ থেকে শোনার জন্য কারো প্রস্তুতি ছিল না। স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন শেখ মুজিবের কাছ থেকে আসে নি ঠিক তেমনি আসেনি আন্দোলনের জন্য নির্দেশনাবলী প্রনয়ন কমিটির ৩ সদস্য তথা তাজউদ্দিন আহমদ, আমীর-উল-ইসলাম এবং ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকেও। বরং বলা হয়ে থাকে চট্টগ্রামে জহুরুল ইসলাম মাইকে ২৬ মার্চ তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। হাস্যকর বিষয় এই যে, স্বাধীনতার ঘোষণা কখনোই সাধারণ মানুষের জন্য প্রচার করা হয় না, স্বাধীনতার ঘোষণা মূলত তাদের জন্যই প্রচার করা হয় যারা স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়ার অধিকার রাখে, অর্থাৎ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সংস্থাগুলোর কাছেই স্বাধীনতার আহ্বান প্রচার করা হয় তাদের কাছে থেকে স্বীকৃতি, সাহায্য, সহযোগিতা পাওয়ার জন্য। মাইকে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি শোনার জন্য চট্টগ্রামে কোন বিদেশী কূটনীতিক রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলেন কি না তা জানা যায় নি। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা ঠিকই পৌছে গিয়েছিল বিশ্বের আনাচে কানাচের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। সূদূর আমেরিকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ২৬ মার্চ তারিখে প্রকাশিত সংখ্যায়ই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি গোপন রেডিও স্টেশন থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন বলে পিটিআই এর বরাতে সংবাদ পরিবেশিত হয়।

লক্ষ্যণীয় সকল পত্রিকাগুলোই বিশেষ করে ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ তারিখে প্রকাশিত সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে গোপন রেডিও স্টেশনের কথা উল্লেখ রয়েছে আর সে স্টেশনটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হিসেবে পত্রিকাগুলোতে প্রচার পায় ২৮/২৯ তারিখের সংবাদে। শেখ মুজিব কিংবা তার কোন নেতা নেতা নন বরং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থেকে ২৬ মার্চ স্বাধীণতার ঘোষণা দেন মেজর জিয়াউর রহমান যা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ওয়েবসাইটেও দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ পেয়েছে। Gurmeet Karwal ও V. K. Shrivastava রচিত “Defenders of the Dawn : A Panorama of Eastern Command” গ্রন্থেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের হুবহু তথ্য পাওয়া যায় বইটির ৯০ পৃষ্ঠায়।

“An overwhelming response to the call for a general strike on 01 March 1971 brought the eastern wing to a stand still. Lieutenant General Sahabzada Yakub Khan, the Martial Law Administrator, imposed a curfew but was soon obliged to order troops back to the barracks as Mujib cautioned him of dire consequences. The incident gave a clear indication of Mujib’s firm hold on the people of East Pakistan. This hold was further substantiated when the Chief Justice of East Pakistan High Court declined to administer the oath of office to the newly appointed Governor and Martial Law Administrator, Lieutenant General Tikka Khan, on 07 March 1971. Soon civil disobedience crept into other organs of the state, notably the police and the East Pakistan Rifles. Consequently, while President Yahya Khan held a series of discussions with Sheikh Mujib in Dacca, 16 Pakistan Infantry Division was already being inducted there by air. Yahya Khan left Daca abruptly on 25 March 1971 and Tikka Khan let loose his reign of terror the same night. The next day, while the whereabouts of Mujib remained unknown, Major Ziaur Rahman announced the formation of the Provisional Government of Bangladesh over Radio Chittagong. Driven out by military atrocities, the initial trickle of East Pakistani refugees into India soon turned into a spate. In due course their number was to cross the ten million mark – each with his own account of the unimaginable brutalities inflicted mercilessly by the Pakistan Army.”

মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটি চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থিত জাপানী নৌযান রেকর্ড করতে সক্ষম হয় এবং  তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে রেডিও অস্ট্রেলিয়ার মাধ্যমে তা পুনরায় সম্প্রচারিত হয়। এখানে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সময়ের ব্যবধান ৪ ঘন্টা এবং ২৬ তারিখের ঘোষণা রেডিও অস্ট্রেলিয়ায় যখন সম্প্রচারিত হয় ততক্ষণে অস্ট্রেলিয়ায় ২৬ তারিখ দিনটি শেষ হয়ে ২৭ তারিখ শুরু হয়ে থাকবে।

হাজার মাইল দীর্ঘ ইসলামী মূল্যবোধের অলীক বন্ধন ছিন্ন করে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন-নিষ্পেশনের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অদ্ভুদয় হবে এটি পূর্ব পাকিস্তানের কৃষখ-শ্রমিক-ছাত্র-সেনা সবার কাছেই যেমন স্পষ্ট ছিল ঠিক তেমনি দিবালোকের মতো পরিস্কার হয়েছিল বিশ্ববাসীর কাছেও। বৈষম্য আর বৈমাত্রেয় আচরণের শিকার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পাশবিক অত্যাচার, নির্যাতনে স্বাধীনতার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।  ৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো আসন জয়লাভ করা আওয়ামী লীগ যদিও পাকিস্তান কনফেডারেশনের ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তথাপিও মুক্তিপাগল বাঙ্গালীর কাছে পাকিস্তানী শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে “স্বাধীনতা” অর্জনের বিকল্প কোন চিন্তা ছিল না। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের ০৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বাক্যটি ব্যবহারের কোন বিকল্প ছিল না, যদিও তা কিছুতেই স্বাধীনতার ঘোষণা নয় বরং পশ্চিমাদের প্রচন্ড চাপে রাখার একটি কার্যকর কৌশল ছিল মাত্র। ৭ মার্চ কেন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি তা ব্যাখা করেছেন ড. কামাল হোসেন তার লেখা মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল গ্রন্থে, “

“সারা দেশে প্রত্যাশা দেখা দিয়েছিল যে ৭ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। বস্তুত ছাত্র ও যুবসমাজ এ ধরণের ঘোষণার প্রবল পক্ষপাতী ছিল। ৭ মার্চ নাগাদ দলীয় সদস্যদের মধ্যে সামান্যই সন্দেহ ছিল যে কেবল স্বাধীনতাই একটি গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে। এটা পরিস্কার ছিল যে, ছাত্রসমাজ, যুবসম্প্রদায় এবং রাজনীতিসচেতন ব্যাপক জনগণের কাছে স্বাধীনতার চেয়ে কম কোন কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে দায় দায়িত্বের ভার ছিল শেখ মুজিব এবং দলের ওপরই ন্যস্ত। ৭ মার্চ স্বাধীনতা-ঘোষণার সম্ভাব্য সার্বিক ফলাফল তাই সতর্কভাবে বিবেচনা করে দেখার প্রয়োজন ছিল। একতরফা স্বাধীনতা-ঘোষণার অর্থ দাড়াত সামরি বাহিনীকে তার সকল শক্তি নিয়ে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়তে প্ররোচিত করা। এতে তারা যে কেবল শক্তি প্রয়োগেরই ছুতো খুঁজে পেত তা-ই নয়, বলপ্রয়োগে তাদের ইচ্ছা চরিতার্থ করতে তারা সবকিছুর ওপর সকল উপায়ে আঘাত হানতো। কোন নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর কি ঐ ধরণের হামলার আঘাত সহ্য করে বিজয়ী হতে পারে? বহির্বিশ্বে এর প্রতিক্রিয়াই-বা কী দাঁড়াবে? অন্যান্য দেশের সরকারগুলো কি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে? একটি সুসংগঠিত সামরিক আক্রমনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য যতদিন প্রয়োজন ততদিন টিকে থাকতে পারবে তো? এসব প্রশ্ন ছাড়াও, আর্ন্তজাতিক শক্তিসমূহের বিরাজমান বিভিন্নমুখী বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক স্বার্থসমূহের কারণে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তারা মেনে নেবে এবং স্বীকৃতি দেবে তো?- অজস্র প্রশ্নের মধ্যে এগুলো ছিল কয়েকটি যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে দেখা হলো।”

স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোগ ৭ কোটি বাঙ্গালীকে তাই ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা শোনাতে সাহসী হন নি। তিনি চেয়েছিলেন প্রচন্ড গণআন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীকে চাপের মুখে রেখে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করতে। আর তাই ক্ষমতা হস্তান্তরের খসড়া ফরমানের লিখিত ভাষ্য নিয়ে পাকিস্তানীদের সাথে শেখ মুজিব গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর থেকে ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত জাতির ক্রান্তিকালে মহান ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন কেবলমাত্র স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আর যে যা-ই বলুক না কেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার যে ঐতিহাসিক অডিও প্রমাণটি পাওয়া যায় তা একমাত্র জিয়াউর রহমানেরই কন্ঠস্বর, অন্য কারো মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার এটি প্রমাণও তৎকালীন সময়ে বিশ্বগণমাধ্যমে প্রকাশিত কোন প্রিন্ট, ছবি, অডিও কিংবা ভিডিওর মাধ্যমে কেউ দেখাতে পারেনি। অথচ জিয়াউর রহমান যে স্বাধীণতার ঘোষক তা হাজার হাজার দলিল-পত্র পত্র-পত্রিকার সংবাদে প্রমাণ মেলে। এখানে তার কয়েকটি নমুনা তুলে ধরা হলো :

  • মেজর জেনারেল সুখান্ত সিং তার The Liberation of Bangladesh, Vol. 1 (Delhi : Lancer Publishers, 1980) গ্রন্থের ৯ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘ইতিমধ্যে ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে একজন বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।’ তিনি আরো লেখেন : ‘এই ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি সেনা অফিসারগণ রাজনীতিক নেতাদের অসন্তুষ্ট করতে চাননি। অন্যদিকে ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেবার আবশ্যকতা ছিল।’
  • মেজর রফিক-উল ইসলাম বীরউত্তম, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) তার লেখা A Tale of Millions গ্রন্থের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ‘২৭ মার্চের বিকেলে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দান করেন ।
  • ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম, তাঁর গ্রন্থে—Bangladesh At War (Dhaka, Academic publishers, 1989) ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায়  লিখেছেন : মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া স্বাধীন বেতার কেন্দ্র থেকে আরেকটি ঘোষণায় বলেন : ‘বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সামরিক সর্বাধিনায়ক রূপে আমি মেজর জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি’ [“I Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaim, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the Independence of Bangladesh.”]। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরবো না, বরং বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তান রূপে (স্বাধীনতার জন্যে) প্রাণ দেব। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং সমগ্র পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোহর, বরিশাল, খুলনায় অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।’
  • মেজর সুবিদ আলী ভূঁইয়া, মেজর জেনারেল (অব.) তার লিখিত—মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস গ্রন্থের ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠায় (ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৭২) লিখেছেন, ‘মেজর জিয়াকে ২৭ মার্চের সন্ধ্যায় দেখে উত্সাহ-উদ্দীপনায় ফেটে পড়ল বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা। ঘণ্টা দেড়েক চেষ্টার পর তিনি তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি তৈরি করে নিজেই সেটি ইংরেজি ও বাংলায় পাঠ করেন। মেজর জিয়া ওই ভাষণে নিজেকে ‘হেড অব দি স্টেট’ অর্থাত্ রাষ্ট্রপ্রধান রূপেই ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তার পরের দিন আগের দেয়া বেতার ভাষণটির সংশোধন করে তিনি ঘোষণা দেন যে এই মুক্তিযুদ্ধ তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে।
  • কর্নেল অলি আহমদ, বীরবিক্রম, অক্সফোর্ড বুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থ রাষ্ট্র বিপ্লব : সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৮)-এ লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া ২৭ মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’ (মুখবন্ধ)।
  • বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী শেখ মুজিব নয় বরং জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক বলে জোড়ালো দাবী করেন।

আমার এ লেখায় অনেকের মনেই এ প্রশ্নটি উদয় হওয়া স্বাভাবিক যে তাবে কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের কোন ভূমিকা নেই? প্রকৃতপক্ষে এখানে স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে কার কতটা অবদান তা আলোচনা করা হয় নি, সেটি নিয়ে অন্য আরো একাধিক লেখা দেয়া যেতে পারে। একটা বিষয় পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন যে দেশের মুক্তিকামী জনতা স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ ছিল, এবং সবাই এটাই চাইছিল যে শেখ মুজিবুর রহমান যেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাঙ্গালী জাতিকে পাকিস্তানের অভিষাপ থেকে মুক্ত করেন। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেয়ার আগে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হয় তা আগেই উপরে তুলে ধরেছি। কিন্তু যখন ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে যায় তখন স্বপ্রনোদিত হয়ে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অনেকেই এক্ষেত্রে অভিযোগ করে থাকেন যে জিয়া ঘটনাক্রমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কথাটি একদিক থেকে সঠিক, তবে পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর জড়িত হওয়া কোনকালেই অনুমোদনযোগ্য নয়। মেজর জিয়া একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেশ রক্ষায় অকুতোভয় লড়াই করে ৬৫ এর রণাঙ্গনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, কিন্তু একজন মেজরের জন্য রাজনীতিতে নাক গলানো কখনোই শোভন নয়। আর তাই ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখেন বরং এটিকে মুজিব-ভূট্টো-ইয়াহিয়াদের জন্য তুলে রাখেন

কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে যখন নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলো, যখন রাজারবাগ, পিলখানা, ইপিআরে বাঙ্গালী সৈনিকদের সাথে তুমুল লড়াই বেধে গেল জাতির সে ক্রান্তিকালে তিনি বুঝতে পারলেন রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব নয়। বুলেটের মাধ্যমে পশ্চিমপাকিস্তানী শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার যে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছে, তার উপযুক্ত জবাব কেবল বুলেট দিয়েই দেয়া সম্ভব। তাই তিনি কোর্ট মার্শালের ভয়কে জয় করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার মতো দুঃসাহসিক ইতিহাসের জন্ম দেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, শেখ মুজিবুর রহমান পুরো জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর করে মুক্ত স্বাধীনসবুজ উদ্যানের কাছাকাছি পৌছে দিয়েছিলেন, আর মাত্র একটি গভীর খাঁদ পাড়ি দেয়া বাকি ছিল। কিন্তু জনতা যেভাবে সম্মুখে মার্চ করছিল তাতে তাদেরকে আর থামিয়ে রাখার উপায় ছিল না, আবার খাঁদ পাড়ি দেয়ার জন্য উপযুক্ত কোন সাঁকোর ব্যবস্থাও ছিল না। শেখ মুজিব পাকিস্তানী জান্তাদের সাথে আলোচনা করছিলেন যাতে বাঙ্গালী জাতিকে নিরাপদে স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ উদ্যানে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী শাসকেরা লাশের স্তুপ দিয়ে খাড়িটিকে পূর্ণ করার ষড়যন্ত্র করে। ঠিক এমই এক সময়ে মৃত্যুউপত্যকা পাড়ি দেয়ার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা নামের ক্যারিশম্যাটিক পুলসিরাত নিয়ে হাজির হলেন মেজর জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান কেবলমাত্র সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা যদি না দিতেন তবে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না? অবশ্যই হতো, তবে কতদিন পরে হতো তা বিবেচন্য বিষয়। মার্চের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে ২৩ মার্চে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রংপুরে লাশের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, তবুও কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নি। রাজনীতিতে মিছিল মিটিংয়ে রাজপথ প্রকম্পিত হবে, লাশের বন্যা বয়ে যাবে এটাই যেন স্বাভাবিক বিষয়। আর তাই শেখ মুজিব ২৭ তারিখ হরতাল আহ্বান করেছিলেন সামরিক বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবাদে। শেখ মুজিব যখন বন্দী হলেন, তখনও কান্ডারীবিহীন এ তরীর যাত্রীরা হয়তো আবারো বড় কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী দিতেন ঠিক যেমনটি দিয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পরে। হয়তো দিনের পর দিন অসহযোগ আন্দোলন হতো কিংবা সেনাবাহিনীর বর্বরতায় স্তিমিত হতো আন্দোলন। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পরেই হয়তো নতুন করে আবার স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্তরূপ পেত। কিন্তু যখন শেখ মুজিবের অবর্তমানে শেখ মুজিবের ইমেজকে ব্যবহার করে স্বাধীনতার ঘোষণাটি মেজর জিয়া দিলেন তখন আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পিছপা হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে জিয়ার ঘোষণার সাথে যদি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একমত না হতেন, তা হলে আন্তর্জাতিক মহল এ স্বাধীনতা আন্দোলনকে হয়তো দ্রুত গুরুত্ব দিতো না, তাহলে হয়তো কিছুদিন স্বাধীনতা আন্দোলন চলতো, এবং সেনা অভ্যুত্থানের দায়ে জিয়া ও বাঙ্গালী সৈনিকদের ধরে ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো হতো। কিংবা জনতার সত:স্ফূর্ত অংশগ্রহনে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তো বাংলাদেশ, ঠিক যেমনটা চলছে কাশ্মীরে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ঘোষণার সাথে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ঐক্যমত হওয়ার কোন বিকল্প ছিল না, হয়তো এটি মেজর জিয়া স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাকে আওয়ামী লীগ স্বীকৃতি না দিলে দলটির জনপ্রিয়তায় মুহুর্তেই ধ্বস নেমে যেত আর তাই তো ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী বাংলাদেশী সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ ঝাপিয়ে পড়ে। এভাবে যেমন মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার স্বীকৃতির মাধ্যমে জিয়া যেমন স্বাধীনতার অপরিহার্য ইতিহাসে পরিণত হন ঠিক তেমনি বাংলাদেশ পেয়ে যায় কাঙ্খিত স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগও ধরে রাখতে সক্ষম হয় বিপুল জনসমর্থণ।

এভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় চোখ বুলালে স্বাধীনতার ঘোষণায় কেবল একজনেরই নামে ঘুরে ফিরে বারে বারে আসে। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আর তাইতো ৭ মার্চ শেখ মুজিবের, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমানের আর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিকামী জনতার।

 আসুন, ২৬, ২৭ ও ২৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তিনটি পেপার কাটিং-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনে নেই।

 

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন